Home কবিতা গৌতম গুহ রায় >> কবিতাগুচ্ছ
0

গৌতম গুহ রায় >> কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ January 23, 2018

গৌতম গুহ রায় >> কবিতাগুচ্ছ
0
0

গৌতম গুহ রায় >> কবিতাগুচ্ছ

 

জ্যোৎস্নাবীজ

রোদ্দুরে পেকে ওঠার আগে কিছু শস্য
ঝরে পরেছিল মাটি ও জলের ঝরঝর গানে
এখন বীজ বিষয়ক তর্কে যারা গরম হলো
ঐ জল ও মাটির গান ও গুঞ্জনের কথা
তাদের জানা নেই।
এখানে যে কোনো কর্ষণ ও ত্রাসে
উত্তেজিত গানের ধ্বনিরা বৃত্তে বৃত্তে নাচে

গা ছমছম করে ওঠা নৈঃশব্দ্যের গন্ধ
বারুদের মতো নিঃশ্বাসে স্তব্ধ হীম

মধ্যাহ্নের খরতায় জ্বলে যাওয়া প্রকৃত মুঠোয়
সবুজ ভ্রুণ
জন্মহৃত সেই সব গরমের গল্পে গল্পে নৈঃশব্দ্য
হঠাৎ আলোর মতো ফুটে উঠলো জ্যোৎস্নবীজ
ঘাতক বাতাসের ভেতর গুঞ্জনের বিষরেণু

রোদ্দুর পেকে ওঠার আগে কিছু শস্য
তখনও ঝরতে থাকে
মাটি ও জলের ঝরঝর গানের ভেতর

 
বোধিসত্ব

 

বোধি একধরনের ফল, যা পেকে না ওঠা পর্যন্ত গাছে থাকে
পাকলে ঝরে পড়ে বা পাখিতে ঠুকরে খেলে বীজটুকু থেকে যায়
বাশবনে ও ধানক্ষেতের আল ধরে লাল ডুরে শাড়ি-পরা
মেয়েরা ফিরে এলে – প্রেততন্ত্রের লাল আলোর ভেতর
ঘুমিয়ে পড়ে আহ্লাদী কুমারেরা- সবুজ বাশফুলে বা
ছেঁড়া ধান মুখে নিয়ে চলো শাশ্বত বাঘছাল
গাজা টেনে আমিও প্রেমিক হয়ে উঠি। অন্ধকারে, দুই বুকের মাঝে
ঝোলানো পোস্টারে যৌনমাছির ডানা আকা হয়

বীজমন্ত্র, নীল ছবি, নিজস্ব পাশার ভেতর
এলোমেলো খেলে যাওয়া অস্থিখণ্ড থেকে বেজে ওঠে
তোমাদের প্রেম গান, ক্রমশ ব্যবহৃত চুমুগুলো কেমন
রুদ্র সন্ত্রাস হয়ে মুখ খোলে পড়ন্ত বিকেলে
দেখি চারদিকে আমারি ডাকনাম,
মূর্ছিত বোধিসত্ব জোৎস্নার সাদা চরে

 

বপন সঙ্গীত

 

বীজ আনতে যাব, বীজ। মেঘনিবেদিত বর্ষণ
মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা লাল-কালো পালক ও ঝিনুক
রোদ ছিল তখনও ধুলোমাখা। সারারাত
পিঠে করে জলকণা ফেরি। গায়ে কুয়াশামাখা উড়ন্ত ঝাঁপি
চোখের নিচে ভাঙা ঘুমের কাঁচা রং
আলোর কাছে এলে থমকে কেন জল?

একটা পাখি উড়তে উড়তে এসে মাথার ভেতর
বীজধান রেখে গেছে। একটু একটু করে ফাটছে সেই বীজ
রোদ্দুর, তার সোনা গায়ে চিকচিকে ধুলো, উড়ে আসে

সারাদিন একটা বীজের গায়ে একটাই গান
সারাদিন একটা গানের পেটে একটাই গাছ

রাতচরা মেঘেরা পাখিপ্রেমে পাগল হলো
ওম নিয়ে খেলাচ্ছলে ডাক দিল মেঘ
ধূলিমাখা রোদ্দুরে, থেমে ওঠা পিঠ তার
নিচে তার বীজধান
ক্রোধ হয়ে নেমে আসে। জল হয়ে ভেসে আসে

সংকেতে সংকেতে এইভাবে মাটি ফুঁড়ে ওঠা মাথা
বপনে ও সমর্পণে ধুলো মেখে গান
সারারাত পিঠে করে জলকণা ফেরি

 
নষ্ট বীজ

 

দাহ শেষ হলে জেগে থাকে একলা প্রহর
অন্তহীন, মনে হচ্ছে একটা দমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নেবে
স্পন্দনহীন, ব্রহ্মাণ্ডের গভীর অন্ধকারের দিকে
বায়ুরুদ্ধ, আলোক উত্থান সম্ভাবনা নাই
তাই অস্থিখণ্ডের মতো নদীজলে ভেসে যায় অসংখ্য মাথা
অবিনাশী ও নিশ্চুপ ছায়া হয়ে সেই দব অনন্য করোটি
মাটির কলসের ভেতর জেগে থাকা তারাগুলো
নিবির, জলের গায়ে লেগে আছে হননের গান, নষ্টবীজ

 

জলরেখা

 

জলের কাছে না গেলেও ফেনাচিহ্ন দেখা যায়
জলরেখা সরে গেছে অনেক দূরে
সরে যাচ্ছে
ফেনাশীর্ষের আলো, খুশীর মতো ঝকঝকে
দূরে আরো দূরে একটা নিঃসঙ্গ নৌকা
দুলতে দুলতে
ছোটো হতে হতে
দিগন্তরেখার বিন্দুর মতো
ডাকে, দিগন্তের ডাক
ফিরিয়ে দিচ্ছে লবনাক্ত বাতাস
নোনাধরা শরীরে ফেনাচিহ্ন লেগে থাকে
জলরেখা সরে যায় দূরে, আরো দূরে

 
বাঁশি

 

তারপর জল জল আর জল
কাশবনে পরে আছে তোমার ব্যক্তিগত শ্রাবণরাতের
ভাঙা কাঁকন। তার রিনিঝিনি জলের ভেতর
বাজতে বাজতে এই বসন্তে আমার দরজায় কেন
কড়া নাড়ে? এখন তো ধূসর কোনো
জমাট অশ্রু ওড়ে না আকাশে, খুশির মতো
ঐ নীল চাদর উড়ে যায়। একা পোষ্য কুকুর
খুঁড়ছে এবাড়ি ওবাড়ি। এখন কেন ঐ
রিনিঝিনি বাজে?

শব্দ, তুমি তো হাওয়াবাগানের ছিন্নপেখম, অজস্র
উড়ে বেড়ায়, সবুজ পাতায় পাতায় রঙিন হাসির মতো
লেগে থাকে, লজ্জামুখী এক বাঁদরের হর্ষে
তখন বৃষ্টি নামে, বসন্তের গুটি গায়ে ষোড়শী
যন্ত্রণাকাতর রাতে নিঃস্ব শব্দের সেই প্রেমহীন বাঁশি
মুক্ত হাওয়ায় সাগরের দিকে ছুটছে, যে নোনা বাতাস
তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুং-এর মতো উদ্ধত রয়ে গেছে আজও…

 

তেজস্ক্রিয় মেঘ

 

বাদাম ভাঙলেই দেখতে পাবে একটা আর্তমুখ
সমস্ত তেল শুষে নিয়ে একটা পলকহীন চোখ
এক্কেবারে সাদা করতল পেতে আছে
আপনার সামনে : ভিক্ষা দাও
ভাত দাও ছায়া দাও নিদ্রা দাও কাম দাও
শুধু বাদাম দিও না
কোনো বাঁশিওয়ালা হাত এ হাতে দিও না।

কুচো মাছের মতো বাঁশিতে আঁশটে গন্ধ লেপ্টে আছে
বাদামি শরীরে তেলের মতো পিছল শব্দ লেপ্টে আছে
কাচপোকার মতো আলোয় সবুজ শব্দ উড়ে উড়ে আসে
বিষণœ চোখে আতঙ্কের নখ, বেজে ওঠে ঢাক
দ্রিমি দ্রিমি শব্দে কোনো চুমু হয় না, কামগন্ধময় মুঠো
ভেতরে দুষ্টু শব্দরা তেল মেখে বসে থাকে
হাত থেকে খসে গেলে বাঁশি
ওতো নিছকই এক বংশদ্বদ, খাড়া এসে সামনে দাঁড়ায় :
যুদ্ধ দাও; কাঁদি
রক্ত দাও; চাটি
বারুদ দাও : ফাটি
বাদাম দিও না, যে হাতে ঢাকের কাঠি সে হাত
এহাতে দিও না, চকমকি ও শ্লেটপাথর এ হাতে
নতজানু সময়বৃক্ষ তবুও বাঁশি বাজে

তালতাল শব্দ ফুঁড়ে জেগে ওঠা আর্ত মুখ
তেজস্ক্রিয় বাজনায় জেগে ওঠা অনন্ত মেঘের মতো

 
আকাশে

 

ক্লান্তি, ক্রোধ ও কাম বিষয়ে যত কথা
কামিনি তুমি প্রত্যহ আমার কাছে পৌঁছে দাও
আমি সারারাত তার পাপড়ি ছিঁড়তে ছিঁড়তে
শেকড়ে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করি। ভোর হয়ে এলে
ঘামে ভেজা প্রভাতী রোদ সবকিছু মিথ্যা বলে, এক
শ্রম কারাগার ও অলীক কমিউন থেকে
সমস্বরে বেজে ওঠা বিউগলে সর্বস্বান্ত মানুষ
তার মানবীকে জড়িয়ে কাঁদে আর
আঙুল দিয়ে দেখায় উড়ন্ত চোখ, আকাশে

 
মিথ

 

বালু ও পাথরের জনম গাঁথারও এক আদিকাল থাকে
আগুনখেকো পাহাড়ের গন্ধ থেকে যেমন জন্ম নেয় আদি রমণ কথা
রাত জেগে অগ্নিবর্ণ ঐ উদগীরণ, স্ফলন

পিপুলগাছের অসভ্য ছায়ায় দুটো পাথর, কপালে সিঁদুর
গা থেকে ঝেড়ে ফেলছে বালুকণা, অভ্র চিক্ চিক্ করে ওঠে
দেহময়। মৃত জলপ্রপাত ভরে থাকা কানো লাভাস্রোত
কানা পুরুষের মতো দাপিয়ে ওঠে, সমুদ্রতল ছুঁয়ে
পূবের সেই পাহাড়ি গ্রাম
গাঢ় অন্ধকারের গা থেকে খুলে পরে একটার পর একটা হলুদ পালক
ঝরে পরে তার নরম শরীরের আলুথালু জ্যোৎস্না

আগুনের পেখম থেকে প্রতিরাতে জন্ম নেয় একটা গ্রহণ গল্প
বর্ষার ধূ ধূ বিস্তারে ফ্যাকাসে মুখগুলো
কথা চায়, নৃত্য চায়
অরণ্যের গভীর ধোঁয়া থেকে প্রতিরাতে জন্ম নেয় একটা স্বতন্ত্র মিথ

 

ভাঙা অক্ষর

 

হাসিগুলো ভেঙে গেছে, আর শব্দখণ্ডগুলো
পালকের মতো ভাসতে ভাসতে ভরিয়ে দিচ্ছে ঘর
সেদিন তোমার দৃষ্টিপথে ছিল না পথচারী,
ছিল না পাখি মেঘ
তোমার স্নানের ঘরে কুয়াশারা
পালকের কাছে হাত পেতে প্রার্থনা করে
পাখি কাহিনী
ভাঙা শব্দ, ভাঙা হাসি কুড়োতে কুড়োতে
পথের পাথর জলের গন্ধে ভাসে বুদবুদের ফাঁকা বুকের ভেতর
মুখ তোলে পালক, মুখ তোলে বাতাস
সন্ধ্যা বাড়ে, রাত বাড়তে থাকলে জুড়ে যায় শব্দ
খণ্ড খণ্ড অক্ষরেরা
ভাঙা আয়নার মতো

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close