Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ গৌতম গুহ রায় > গুন্টার গ্রাস : ঘৃণা, বিষাদ ও ক্ষুদ্ধ সময়ের ভাষ্যকার >> প্রবন্ধ

গৌতম গুহ রায় > গুন্টার গ্রাস : ঘৃণা, বিষাদ ও ক্ষুদ্ধ সময়ের ভাষ্যকার >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ May 19, 2018

গৌতম গুহ রায় > গুন্টার গ্রাস : ঘৃণা, বিষাদ ও ক্ষুদ্ধ সময়ের ভাষ্যকার >> প্রবন্ধ
0
0

গৌতম গুহ রায় > গুন্টার গ্রাস : ঘৃণা, বিষাদ ও ক্ষুদ্ধ সময়ের ভাষ্যকার >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : গতকাল ১৮ মে বেলাল চৌধুরীর একটা গদ্য লেখা দিয়ে শুরু হয়েছিল এই আয়োজনটি। পরে তাঁর একগুচ্ছ কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। আজ প্রকাশিত হচ্ছে গুন্টার গ্রাসের ওপর লেখা আরেকটি প্রবন্ধ।  প্রবন্ধটি লিখেছেন গৌতম গুহ রায়। আগামীকাল প্রকাশ করা হবে গুন্টার গ্রাসের শেষ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক। বলা প্রয়োজন, গুন্টার গ্রাসের সামগ্রিক পরিচয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই হচ্ছে এই আয়োজনের লক্ষ্য। আয়োজনটি কেমন লাগছে আমাদের জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।]

 

 

জার্মান ভাষায় একটা কথা আছে, Grenzginger, যিনি সীমানা অগ্রাহ্য করেন তিনিই বিশ্ব নাগরিক। ঘৃণা, বিষাদ ও প্রতিবাদের আয়ুধ হাতে সেই বিশ্বনাগরিকের নাম গুন্টার গ্রাস। ঝাঁকড়া গোঁফের দীর্ঘদেহী জার্মান, হাতে তুলি ও কলম ধরে যিনি গােটা জীবনটাই একটা বৃহৎ ক্যানভাসে পরিণত করেছিলেন, তাতে ছিলাে নানা রঙের ঝলকানিতে বিস্ময়ের রঙঝুরি। ঋজু মেরুদণ্ডে তিনি সবসময় প্রতিবাদ মুখর, যার প্রতিবাদ পক্ষ ছিলাে নিজের মতো, যেজন্য বিতর্ক ছিলাে তাঁর সাথী, সমালােচকদের আক্রমণকে অলঙ্কার করে নিয়েছিলেন। সাতাশি বছরের এই রঙিন জীবন চিরতরে থেমে যায় ২০১৫, ১৩ এপ্রিল ভােরে, থেমে যায় টিন ড্রাম-এর দ্রিমি দ্রিমি নাদ। জার্মানির স্যুবেক শহরের হাসপাতালে নােবেলজয়ী গুন্টার গ্রাস হৃৎস্পন্দন চিরতরে থেমে গেলাে, থেমে গেলাে বিপন্ন বিশ্বের আম-মানুষের জীবনের হৃৎস্পন্দন শুনতে উদগ্রীব একটি বিরাটহৃদয়।
বাংলার সঙ্গে তার সম্পর্কের টান নিবিড়। বারংবার কলকাতার দিকে ছুটে আসা, ভাত শিকারের যুদ্ধে জীবন বাজি রাখা মানুষগুলাের সঙ্গে দাঁতে দাঁত দিয়ে নিয়ত যুদ্ধমগ্ন দুঃখী বাংলার মানুষ ও জীবনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কে নিজেকে জুড়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু এর বাইরেও তিনি ছিলেন যে কোনােরকম প্রাতিষ্ঠানিকতার ছকের বাইরে, স্বতন্ত্র উচ্চারণে দৃঢ় একজন শিল্পস্রষ্টা, যিনি বিনা দ্বিধায় তার ভুলকেও স্বীকার করতে পারেন, স-রবে তার প্যাশনকে ঘােষণা করতে পারেন, তার ভিন্নমত তুলে ধরতে পারেন।
১৯২৭ -এর ১৬ অক্টোবর প্রাচীন ‘ফ্রি সিটি আব ড্যানজিগ’ এর উপকণ্ঠে লাবেসভেগ -এ জন্মেছিলেন গুন্টার গ্রাস। এই ‘ড্যানজিগ’ বর্তমানে পােল্যান্ডে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই সন্ধি অনুযায়ী লিগ অব নেশনসের অধীন একটি মুক্ত নগরী হিসাবে উন্মুক্ত থাকে এই শহর। স্লাভ, ইহুদিসহ নানা জাতি ও বর্ণের মানুষ এখানে ছাউনি বেঁধেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলাে জার্মানরাই। বাবা উইলহােম গ্রাস ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট এথনিক জার্মান, মা হেলেন গ্রাস রােমান ক্যাথেলিক। তার শৈশব কাণ্ডবিয়ার গ্রাম্য পরিবেশে প্রভাবিত ছিলাে। মা ছিলেন। কাশুবি নামে একটি স্লাভ প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মেয়ে, শৈশবেও তাই কাশুবিয় লােককথা ও সংস্কার তাকে প্রভাবিত করেছিলাে, যার সুফল আমরা পরে তার লেখায় দেখতে পাই। পারিবারিক মুদির দোকান ছিলাে তাদের। গুন্টার মায়ের কাছ থেকেই শিল্পসাহিত্যের অনুরাগ পেয়েছিলেন। এই ‘ড্যানজিগ’ শহরকে ঘিরেই গুন্টারের আত্মজীবনীর ঢঙে লেখা তিনটি উপন্যাস তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। টিন ড্রাম, ক্যাট এ্যান্ড মাউস, এবং ডগইয়ার্ড, এইতার ড্যানজিগ ট্রিলজি। এই উপন্যাস ত্রয়ীতে জার্মানিতে নাৎসি বাহিনীর উত্থান, তাদের ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা, ক্রমশ এই ক্ষমতার বিস্তারের উগ্র-জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, যার পরিণতি বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের বীভৎসতা, ব্যক্তি মানুষের সংকট ও সামাজিক বিপন্নতা নিয়েই গুন্টার গ্রাসের উপলব্ধির উচ্চারণ তাঁর সৃজন। ১৯৫৯ -এ গুন্টার তাঁর প্রথম উপন্যাস টিন ড্রাম প্রকাশ করেন। প্রকাশেই তীব্র বিতর্কে এই উপন্যাসটি ইউরােপীয় সাহিত্যাকাশে ঝড় তােলে। এটিকে ইউরােপীয় ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ এর মূল টেক্সট বলা হয়। এখানে কৌতুকের আড়ালে জমাটবাঁধা কান্না, হাসি মস্করার ‘সুগারকোটের আড়ালে গুরুভার গাম্ভীর্য, আনন্দের উচ্ছসিত খুশির নীচে গভীর বিষন্নতা, সব নিয়ে জমাট সময়ের ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত উপাখ্যান এই টিন ড্রাম। উপন্যাসটির নায়ক অস্কার ম্যাজারেত। অস্কার ড্রাম বাজায়, তার ড্রামের শব্দে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের (বা গীর্জার) জানালার কাচগুলাে ঝনঝন করে সহস্র খণ্ডে ভেঙে পড়ে।
তৎকালীন জার্মানিতে রক্ষণশীলদের প্রত্যাখ্যানের মুখ হয়ে ওঠে গ্রাসের সাহিত্য। টিন ড্রাম প্রকাশের আগেই ১৯৫৮ সাল থেকেই একটি দুটি করে পরিচ্ছদ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বের হচ্ছিলাে। পরের বছর বইটি প্রকাশের পর নানা দেশের পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রে এটি এলেও অনুবাদ নিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এর ভাষ্যে যৌনতার বাড়াবাড়ি রয়েছে এই অভিযােগে ইউরােপের অনেক দেশের সরকার এর অনুবাদে আপত্তি জানায়। গ্রাসের বয়ানে ‘পূর্ব ইউরােপের দেশগুলাে থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত দেশশাসকেরা কেউ এই বইয়ের অনুবাদের অনুমতি দেয়নি।’ ১৯৬৯ -এ বইটির অনুবাদ প্রকাশের সময় পােলিশ সরকার তা অনুমােদন করেনি। অবশেষে দশ বছর পরে ১৯৭৯ তে পােলান্ডে এর অনুবাদ বের হয়। এটি অবলম্বনে তৈরি হয় ভালকার সনড্রফ-র ফিল্ম। ১৯৯৯ -তে সাহিত্যে নােবেল পুরস্কার পান গুন্টার গ্রাস।
অন্য ইউরােপীয় ভাষার সঙ্গে জার্মান ভাষার উচ্চারণে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ইংরেজি, স্প্যানিশ বা ফরাসি ভাষার অনুবাদের তুলনায় এটির যথাযথ ভষান্তর কিছুটা অসুবিধাজনক। গ্রাস এদিকটি জোর দিয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্য যাতে বিশ্ববাসীর কাছে সঠিক অর্থে পৌঁছায় তার জন্য তিনি অনুবাদকদের আলাদা গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন অনুবাদকেরা অনূদিতব্য বইয়ের সবচেয়ে নিষ্ঠাবান পাঠক। তিনি তাই অনুবাদকদের নিয়ে কর্মশালা করতেন তার বই অনুবাদের আগে। এই কর্মশালা কত গুরুত্ব নিয়ে দেখা হতাে তা গুন্টারের বাংলা অনুবাদক দেব্রত চক্রবর্তীর লেখা (দেশ, মে’ ১৫) থেকে জানা যায়, চিনা অনুবাদিকা (মান্দারিনা) টিন ড্রাম-এর গদ্যাংশের মধ্যে একটি শব্দ পেয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন জার্মানে ব্রাউসেপুলভার কী জিনিস? (যা ইংরাজীতে ফিজ পাউডার, বাংলা করলে ফেনিল পাউডার) তখন দোকান বন্ধ হয় হয়। একজন ছুটলেন দোকান থেকে ব্রাউসেপুলভার -এর একটা প্যাকেট আনতে। দেখে চিনা অনুবাদিকা বিস্মিত। সত্যি সত্যি দেখলেন তার মধ্যে থুতু দিলে সেটা বিজবিজ করে উঠছে।…মজাদার এই পাঠক্রম গ্রাসেরই ব্যক্তিগত উদ্ভাবন। সাহিত্যের বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি আদর্শ আন্তর্জাতিক মিলনসূত্র।
যে বছর গুন্টার নােবেল পেলেন তার পরের বছর ভারতে উদ্‌যাপিত হয় জার্মান উৎসব (২০০০-২০০১)। উৎসব কমিটি সাহিত্য আকাদেমির সহযােগিতায় জার্মান কবিতার অনুবাদের একটি কর্মশালা করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কোনাে একজন জার্মান কবিকে, নাকি বেশ কয়েকজনের কবিতা নিয়ে এই কর্মশালা হবে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে আয়ােজকদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দেয়, অবশেষে ঠিক হয় একজন প্রতিনিধিত্বকারী জার্মান কবিকে বাছা হবে। কিন্তু কোন জন? অবশেষে গুন্টার গ্রাসকে নির্বাচন করা হয়। এই নির্বাচন নিয়ে অলােকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছিলেন : সংশয় নেই, বর্হিবিশ্বের সঙ্গে বিনিময়ে গ্যেয়টের মতাে অভিজাত রাজদূত জার্মানির আর কেউ নেই। কিন্তু তার জায়গাটা মাথার উপরে, প্রত্যহ চলাচলের অতিশায়ী স্মৃতিচর্চা। গুন্টার গ্রাস সেই তুলনায় আমাদের সকলের খুব কাছের মানুষ। সবচেয়ে বড়াে কথা, কথায় কথায় তার সঙ্গে ঝগড়া বাঁধানাে যায়।
গ্রাস নিছক একজন সাহিত্যিক বা চিত্রকর নন, তিনি ছিলেন বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানির নতুন গড়ে ওঠা আত্মপরিচয়ের কাণ্ডারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জার্মানি জুড়ে হুহু শূন্যতা, জায়মান বিবেকের গরজে জেগে ওঠে গ্রুপ ৪৭’, হাইনরিশ ব্যোলের সঙ্গে গ্রাসও ছিলেন যার পুরােধা। সে সময় গ্রাস তার টিম ড্রাম এর তাল লয় নিয়ে ক্ষুদ্রাকৃতি অস্কারের তীব্র নিখাদ স্বরে প্রাচীন জার প্রতিষ্ঠানের কাচ ভেঙেচুরে পড়ার মধ্য দিয়েই সূচিত করলেন নয়া জার্মান সাহিত্যের কালান্তর। জার্মান ভাষার সঙ্গে একাত্ম কবি অলােকরঞ্জন দাশগুপ্তের মূল্যায়ন স্মরণযােগ্য, ‘শূন্য প্রহরের সঙ্গে মােকাবিলা করতে গিয়ে লেফগার ব্রেশট, অনল্ড স্মিড়ট, পাউল সেলান এবং গুন্টার আইশ গদ্য ও কবিতার পরস্পর বিষম মাধ্যমে হিমসিম খাচ্ছিলেন। গুন্টার গ্রাস ই দুই রীতিকম্পকে একাকার করে দিয়ে বলার কথা ও সাঙ্কেতিকতার মধ্যে মেরু-মৈত্রী ঘটিয়ে দিয়ে সাতচল্লিশ গােষ্ঠীর মধ্যমণি হয়ে উঠলেন। যুদ্ধ এবং শান্তির, বাঁচা ও মরার থিম পুরােপুরি নিজের কাঁধে তুলে নিয় তাঁকে একই সঙ্গে প্রণেতা ও প্রবক্তার দায়িত্বে অঙ্গীকার করে নিতে হল। গ্রাস সর্ব অর্থে ছিলেন অন্যরকমের মানুষ, তােয়াক্কাহীন। প্রথা ভাঙার মূর্তিমান কালাপাহাড়, কাপট্যহীন। ২০০৬ – তার আত্মজীবনী পিলিংদ্য অনিয়ন প্রকাশিত হয়। জীবনের সূচনা পর্বে তিনি যে জার্মান নাৎসী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তা নিজেই এখানে জানান।
মূচিতার কথা না ভেবে, ইচ্ছা করলে যা তিনি না জানালেও পরতেন। কিন্তু সবসময় দ্বিধাহীন সৎ ছিলেন গুন্টার। পিলিং দি ওনিয়ন-এ গুন্টার গ্রাস স্বীকার করেন তারুণ্যের ঔদ্ধত্যে নাৎসি ওয়াপেন এস এস-এর সদস্য পদ গ্রহণ করেছিলেন, যা তাঁর কাছে চুড়ান্ত ও অন্তহীন লজ্জা। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখেন তারুণ্যের ঔদ্ধত্যে যাকে বরণ করেছিলাম, পরে তাকে লজ্জায় লুকোতে চেয়েছি। কিন্তু ভার কমেনি, তাই আজ স্বীকার করলাম।গােটা ইউরােপের চেতন জগৎ ক্ষুদ্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এই স্বীকারােক্তিতে, তিনি তবুও ভ্রুক্ষেপহীন থেকে যান। ১৯৪৩ -এ, ১৬ বছর বয়সে ‘এয়ার ফোর্স’ অক্সিলারিতে ‘চাইল্ড সােলজার’ হিসাবে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি, এরপর ‘সাবমেরিন সার্ভিস’-এ নিযুক্ত হন, তারপর বদলি হন মিলিটারি ফোর্স-এ ‘ওয়াপেন এস এস প্যালজার ডিভিশন’এ। ১৯৪৫ এর ২০ এপ্রিল চেক রিপাবলিকের মারিয়েনবাদের যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি আহত অবস্থায় বদলি হন। তাকে আমেরিকায় যুদ্ধবন্দি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাদিকা বিস্মিত। সজিবপুলভার-এর একটা পাগল হয় হয়। একজন আহত অবস্থায় কিছুদিন কাটাবার পর ১৯৪৬-এ তার মুক্তি লাভ হয়। ছাড়া পেয়ে যুদ্ধের পর বুরবাগকালি লিঃ-এর পটাশ কারখানায় কপলার বয় হিসাবে কাজ করেন এবং সেখান থেকে নিখোঁজ বাবা-মায়ের খবর পান। তারপরই সােভিয়েত বাহিনী ড্যানজিগজয় করে ও এথনিক জার্মানদের বহিষ্কার করে।
এসময় গুন্টার গ্রাস ও তাঁর পরিবার জার্মানিতে রিফিউজি হিসাবে থাকতে শুরু করেন। দু-বছর খনিতে কাজ করেন, পাথর কাটার প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি এসময়ই তিনি কটাকাডেমি ডুসেডর্ফ-এ ভাস্কর্য ও গ্রাফিক্স নিয়ে পড়াশােনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে ‘ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস’-এ ভর্তি হন। ১৯৫৫-তে গ্রাসের প্লাস্টিক ও গ্রাফিক আর্টের একটা প্রদর্শনী হল স্টুটগার্টে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে কবিতা তার প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধোত্তর কালে এই সাহিত্যচর্চাই তার মূখ্য সৃজনভূমি হয়ে ওঠে। তিনি অতীতকে পরিশীলতা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযােগী করে ফিরিয়ে দেওয়াকেই লক্ষ্য হিসাবে স্থির করলেন। এই সময় তাঁর ভাস্কর্য শিক্ষা তাঁকে এই নির্মাণে সাহায্য করেছিলাে। তিনি বুঝেছিলেন, লিখতে গেলে প্রথমে জগদ্দল পাথরকে ভাঙতে হবে এবং শিল্পের অনুপযুক্ত উদ্ধৃতাংশ বা আবর্জনাকেও শিল্পে যুক্ত করে কাজে লাগাতে হবে। গ্রাস কবিতা ও ছবিকে একসূত্রে গেঁথে নিয়ে সৃষ্টিতে মগ্ন হন। কাঠকয়লা বা জলরঙের আঁচড়ের সঙ্গে অক্ষরের নির্মাণকে পাশাপাশি জুড়ে দেন। তাঁর ছবিগুলােও কবিতা বা গদ্যকে রসদ জুগিয়ে চলছে। স্কেচ বা চিত্রের সঙ্গে যেভাবে জুড়েছিলেন কবিতাকে, ঠিক সেভাবেই সমাজনীতিকে জুড়েছিলেন সাহিত্যের সঙ্গে।
১৯৫৬-তে তিনি প্রকাশ করলেন ‘ড়ি ফেরসুইগে ডেয়ার ভিন্ডহুইনার’ বা ‘আবহ মােরগের অগ্রাধিকার। এর পর প্যারিসে চলে আসেন। শুরু করলেন তার ট্রিলজির কাজ। তিনি যেনাে গ্যেটের সেই কথাকে আপ্তবাক্য ধরে লেখা শুরু করলেন, ১৮২৭ এ গ্যেটে ‘উইবার কুনস্ট উন্ড আলটারটুম’-এ লিখেছিলেন, সময় এসেছে, জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের শক্তিতে কুলাবে না, প্রয়ােজন বিশ্বতােমুখী সাহিত্যের। নিজস্ব লােককথা, মিথ ও তার পরাবাস্তবতা, রহস্যময়তাকে আত্মস্থ করে তার সীমাহীন অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে শুরু করলেন পেয়াজেঁর খােসা ছাড়ানাের কাজ। গতিময় বর্ণিল গদ্যে গ্রাসব্যক্ত করতে থাকলেন সময়ের ভাষ্য। হন্স শ্যাভাব ফেলিশের ভাষায় : ‘গ্রাসের কথনভঙ্গির মধ্যে একটাবন্য ভয়ঙ্কর ছন্দ খেলা করে, বড় কঠিন ছন্দ তা। শরীরের মধ্যে তিনি একটি আলােড়ন তুলে দেন, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে।বাস্তবের চরিত্রগুলােকে তিনি সামনে আনেন এবং তাতে নিজস্ব ভঙ্গিতে রং চড়ান, রংয়ের আলােকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয় অনন্য এক জগৎ, সেখানে খেলা করে মানব জাতির সহস্র বছরের আহরিত সম্পদ। বাস্তবের সীমা ছাড়িয়ে জেগে ওঠে পরাবাস্তব ব্যাপ্তি। টিন ড্রাম থেকে তার শেষের দিকের আত্মজীবনীমূলক লেখা, সবটাতেই এই সীমা ও সীমাহীনতার দেখা মেলে। তাঁর শৈশবের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বয়ানে লেখা ‘পেঁয়াজের খােসা ছাড়াতে ছাড়াতে’-তে তিনি তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি থেকে তুলে এনেছেন নানা চরিত্রকে।
টিন ড্রাম-সহ উপন্যাস ত্রয়ীর পর গুন্টার গ্রাসের মনে হলাে, আবার কবিতায় ফিরে আসবেন, কবিতাকে নতুন অস্ত্র করে নতুন সমরে নামলেন। ১৯৬০ ও তৎকালীন সময়ে তিনি বার্লিনের প্রাচীরকে ঘিরে মানুষের আশা নিরাশা, স্থান-স্থিতি সংক্রান্ত নানা সমস্যাকে কবিতায় তুলে আনলেন, সঙ্গে কাঠ-কয়লার বা জলরঙের চিত্রে সেগুলােকে সংবেদনশাণিত মুখরতা দিলাে। স্বতন্ত্র এক প্রকরণের ব্যবহার শুরু হলাে, শব্দ ও চিত্রের সমবায়ী শিল্পকর্ম। গদ্যের মতাে তার কবিতাও জার্মানির নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন ও স্বপ্নহীনতার দিনপঞ্জি। যেমন তার ‘পারিবারিক’ কবিতাটি :

আমাদের মিউজিয়ামে
প্রতি রবিবারেই আমরা সেখানে যাই-
একটা নতুন বিভাগ খােলা হয়েছে।
আমাদের গর্ভপাতক সন্তানেরা, পাণ্ডুর, গম্ভীর জ্বণগুলি
স্বচ্ছ কাচের ভিতর বসে বসে
তাদের গুরুজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনারত।

অথবা :

হপ্তাখানেক আগে রাজমিস্তিরিরা এসেছিলাে।
এনেছিলাে যা-কিছু জরুরি।
ওরা সেই মােরগটা, যাকে আমরা এড়াতে চেয়েছিলাম,
পাঁচিলরুদ্ধ করে দিয়েছিলাে।
কিন্তু কোথেকে গুড়ি মেরে আসে এই স্বর?
আজ, এখন পর্যন্ত স্যুপ-টুপ ঠাণ্ডা জুড়িয়ে যায়।
কাঁপতে কাঁপতে সরে দাঁড়াই আমরা আর মুর্গিদের চেয়ে দেখি,
ওরা যখন সিমেন্ট খসিয়ে কমিয়ে দেয়,
আসলে কি চায় ক্যালসিয়াম?
(রাজমিস্ত্রিগিরি)

কবিতা পাঠকের চৈতন্যকে উকে দেওয়ার কাজ করে, সঙ্গে তৈরি হয় কবির নিজস্ব ভাষা। বাংলা ভাষার জার্মান ভাষাবিদ কবি অলােকরঞ্জন দাশগুপ্ত তার কবিতা নিয়ে আলােচনা প্রসঙ্গে আর এক কবি ও নাট্যকার ব্রেশ্‌ট প্রসঙ্গ এনেছেন, লিখেছেন : “ব্রেশটও সতর্কীকরণের কবিতা লিখে চিরদিনের মতাে আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। কিন্তু সেই কবিতা তর্জনীময়, নির্বোধের মগজে বিধে বসে যায়। গ্রাস কিন্তু নখের ডগা অবধি প্রতীকী, তার উত্তীর্ণ রচনায় কাউকেই দীক্ষিত করা হয়নি।”
জার্মান সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে বা চ্যন্সেলার উইলি ব্রান্টের হয়ে ১৯৭২-এ নানা সফরসূচিতে যেসব ভাষণ লিখেছিলেন গুন্টার গ্রাস, সেখানে উঠে এসেছিলাে মানবিক অগ্রগতির ভূমিকা। সে বছরই তার কবিতাপ্রতিম বই শামুকের দিনপঞ্জি থেকে প্রকাশিত হয়, যেখানে বৃত্তান্তে রাজনীতি ও শিল্প নিগূঢ় ভাবে জড়িয়ে আছে। এর চার দশক পরে, ২০১২ তে ইরানের বিরুদ্ধে গােপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযােগে পশ্চিমি দুনিয়া তােলপাড় শুরু করে। ইজরায়েলের সঙ্গে আরব দুনিয়ার তীব্র বাদানুবাদ চলতে থাকে। বিখ্যাত জার্মান দৈনিক স্যুভয়েচে সাইটুংয়ে এই সময় গুন্টার গ্রাস একটি কবিতা লিখেছিলেন, যার শিরােনাম ছিলাে ‘যা বলার, তা তাে বলতেই হবে। কবিতার আক্রমণ অভিমুখ ছিলাে ইজরায়েলি প্রভুত্ববাদের দিকে, গ্রাস লিখেছিলেন যে ইজরায়েলের মতো পরমাণু শক্তিধর ক্ষমতা যদি ইরাকের মতো আঘাত বিপর্যস্ত দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে তবে সে দেশটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এতে প্রবল সমালােচনার ঝড় ওঠে তার বিরুদ্ধে, কিন্তু বক্তব্যে স্থির ছিলেন এই স্পষ্টবক্তা কবি।
১৯৯৩, তিনি তখন জার্মানির সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বনাগরিক, তার সনেট সিরিজ প্রকাশিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি উচ্চারণে খচিত হচ্ছে দেশ যন্ত্রণা। এই সূত্রে বন্ধু হুলটার হ্যালারারকে চিঠি লিখলেন, যেটি তীব্র আলােড়ন তুলেছিলাে, সেখানে বার্লিনের প্রাচীর ভাঙার পর নয়া নাৎসিদের বিদেশবিদ্বেষী দাপট ও সুযােগসন্ধানী রাজনীতি-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ হানলেন গুন্টার গ্রাস। একসময়ের কবিতাও হয়ে উঠলাে সংগত ঘৃণা ও বিষাদ-প্রতিবাদের ভাষ্য।

একবস্তা বাদাম
আর আমার বানােনতুনদাতের পাটি নিয়ে
আমায় যেন গাের দেওয়া হয়।
যেখানটায় শুয়ে থাকবাে।
কুড়-মুড়, মড়মড়শব্দ উঠলেই
অনুমান করা যাবে;
এই সে-ই,
এখনাে সেই লােকটাই।
(পথের টিফিন / অলােকরঞ্জন দাশগুপ্ত অনূদিত)

গ্রাস বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে এসেছেন, বিশেষ করে ভারতে, ১৯৭৫ সালে প্রথম সংক্ষিপ্ত সফরে আসেন, এসেছিলেন কলকাতাতেও। কিন্তু এই সফর তাঁকে কলকাতার প্রকৃত চেহারার সঙ্গে পরিচিত করাতে পারেনি, তিনিও একাত্ম হতে পারেননি, একটা ভাসাভাসা বিচ্ছিন্ন ছবির ছাপ নিয়ে গিয়েছিলেন বিভ্রান্ত গুন্টার। অস্বস্তির এই কাটা তুলে ফেললেন তিনি ১৯৮৬-তে আবার এলেন। ডেরা বাঁধলেন বারুইপুর। মাস ছয়েকের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। লিখলেন ‘জিভ দেখানাে’ (Zunge Zeigen) যা ভুলভাবে অনূদিত হলাে ‘জিভ কাটো লজ্জায়’। এখানেও কলকাতার চিত্রায়ণ নিয়ে বিতর্কের সামনে পড়লেন তিনি। কিন্তু এই শহরকে তিনি সত্যি ভালােবেসে ফেলেছিলেন। এর গােপন গভীর কষ্টকে উপলব্ধি করেছিলেন। ১৯৮৬-তে গ্রাসের লেখা ‘দ্য প্লেবিয়ান রিহার্স দি আপরাইসিং’ নাটকের বাংলা মঞ্চায়ন উপলক্ষে স্ত্রী উটেকে নিয়ে সে সময় কলকাতা আসেন। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মিশেছিলেন, ভিড় ঠাসা লােকাল ট্রেনে, বাজারের থলি হাতে ঘুরে বেড়াতেন। এই উপলব্ধি পাই তার লেখায়- কালীপুজো আসছে। দেওয়ালের ধারে মাথা নিচু করা। নর্দমার জলে ভর্তি তিন হাজার বস্তি। তাদের পাশে শুধু রাত্রি আর তাদের পাশে শুধু রাত্রি আর তাদের ভয়ঙ্কর হা মুখে জিভ দেখালাম, নদী পেরিয়ে গেলাম, সীমান্ত মুছে দিলাম।” সীমান্ত অগ্রাহ্য করে চলে যাওয়া গুন্টার গ্রাস, সেই বিশ্বনাগরিক, যার নজরে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের রক্ত মাংস, কষ্ট ও ক্ষয় ধরা পড়তাে। যিনি গােটা জীবন ধরে ক্ষুদ্র সময়ের ধারাভাষ্যকারের কাজ করে গেছেন।
দগদগে সজীব জীবনের হৃৎস্পন্দন প্রান্তিক কলকাতা গ্রাসকে ঝাকিয়ে দিয়েছিল। এই কলকাতার তীব্র স্পন্দন। ইউরােপীয় অনেক সাহিত্যিকের কলমেই প্রকাশিত হয়েছে, দামিনিক ল্যাপিয়ার -এর “সিটি অব জয়” বা মার্গাৎরিৎদুত্রাসের “ইন্ডিয়া সং”,- এদেশীয় অমিতাভ ঘােষের ‘ক্যালকাটা ক্রমােজম’-এ কলকাতার যে যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারা দেখি গ্রাসের কলকাতা তা নয়, এখানে নাগরিক জীবনের প্রাণস্পন্দন যেই মানুষগুলাে তাদের আর্তিকে গ্রাসের লেখায় স্পর্শ করা যায়, যার অনায়াস চিহ্নায়ন “ঈশ্বরের বিষ্ঠা” যিনি লােকাল ট্রেনের যাত্রায় প্রত্যক্ষ করেন “হাতগুলাে হাতে হাতে আচ্ছন্ন”, “হার জিরজির চাষির আর হৃষ্টপুষ্ট গিন্নীরা সব পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, উকিল ও মাঝারি অফিসারদের মাঝখানে স্ফুরিত চোখে ভিখারী”। আবর্জনা কুড়ানো মা ও শিশুর বেঁচে থাকার যুদ্ধ, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া ভাের ও পানের জলহীন দুপুরে তিনি দেখতে পান “বিষ্ঠা ও ক্লেদময়নগর”। তার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে বন্যা প্লাবিত বাংলার বিপুল সাড়ম্বরে উদ্‌যাপিত দুর্গোৎসব। এক দিকে দারিদ্র ও ক্ষুধায় ছটফট করতে থাকা কলকাতা ও মধ্যবিত্তের সামাজিক উদাসীনতায় অবাক ও ক্রুদ্ধ গ্রাস সেই যন্ত্রণার ছবি তুলে আনেন তার লেখায়।
গ্রাসকে ভালভাবে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করে শুভরঞ্জন দাশগুপ্তের “ক্যালকাটা রিভিজিটস গুন্টার গ্রাস : ইন্টারভিউস এন্ড এসেজ”-এ সংকলিত ছয়টি সাক্ষাৎকার, যেখানে শুভরঞ্জন কলকাতাকে “Throbbing Centre of Culture” বলে অভিহিত করা হয় গ্রাসের উত্তর “One Comes to Examine the Preventing Consciousness which promotes culture” গ্রাসের কাছে কখনই সংস্কৃতি, সমাজচেতনা বিমুক্তকিছু ছিল না।
পাঁচবার এশিয়া ভ্রমণে মধ্যে তিনবার কলকাতায় এসেছেন। তার কলমে এ দেশের মানুষ বারে বারে উঠে এসেছে, উঠে এসেছেন গান্ধি বা সুভাষ প্রসঙ্গ। ভারত ও বাংলার স্পন্দনকে তিনি যে কতটা নিবিড়ভাবে অনুভব করতেন, তা তার সৃষ্টিতে খুঁজে পাওয়া যায়। ২ অক্টোবর, গান্ধি জয়ন্তী উদ্‌যাপনে গান্ধি দর্শন বিরােধী রাজনৈতিক নেতাদের “লােক দেখান” গান্ধি প্রীতি দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন গুন্টার গ্রাস। মুখােশের ও অন্তর্লোকের দৈন্য ঢাকতে বহির্লোকের রােশনাইয়ে ক্ষুদ্ধ গ্রাস মনে করেন যে গান্ধিকে পরিত্যাগ করাটাই এদেশের সর্বনাশের কারণ। সুভাষচন্দ্র বােসকে নিয়ে তার একটা অদ্ভুত দুর্বলতা জন্মেছিল। বিভিন্ন আলাপচারিতায় তিনি টুপি খুলে সম্মান জানিয়েছেন এই বাঙালি জননেতাকে। কলকাতাকে নিয়ে তাঁর উপন্যাস Zunge Zeigen (জিভ দেখাও) এর সূচনা করেছেন এভাবে- “সামরিক টুপির নিচে প্রকাণ্ড একটা চশমা সমেত মস্ত মাথা তুলে আদ্যন্ত ব্রোঞ্জের মূর্তিটা একরত্তি ঘােড়ায় ছুটে চলেছে; লক্ষের দিকে মুখ করে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলছে, “দিল্লি চলাে! দিল্লি চলাে!” অথচ এক বিন্দু নড়াচড়া নেই, নিশ্চল… ঘােড়ায় চড়া এই মহানায়ককে দেখা মাত্রই আমি অস্ফুটে বলে উঠি, এই তাে সুভাষচন্দ্র বােস, নেতাজী।” হতাশার সঙ্গে লিখেছেন “সারা দুনিয়া একদিন ওঁর বক্তৃতা রুদ্ধশ্বাসে শুনেছে। সুভাষচন্দ্র বােস নামের প্রবাদ পুরুষ সমস্ত বাঙালির কাছে স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেলেন।”
পরবর্তীতে গুন্টার গ্রাসের বিখ্যাত উপন্যাস কল অফ দ্য টোড-এ জার্মান ও পােল্যান্ডে যুদ্ধ-উত্তর সময়ের কথা এসেছে। এই উপন্যাসে তিনি একটি বাঙালি চরিত্রকে এনেছেন, সুভাষচন্দ্র তার নাম। যিনি বংলাদেশ থেকে সাইকেল রিক্সা আমদানি করে পােল্যান্ডের আবহাওয়াকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এই পােল্যান্ডেরই “ড্যানজিগ” গ্রাসের জন্ম-শহর।
ভারতবর্ষ ও তার মানুষজনকে আরও নানা লেখায় ছুঁয়ে গেছেন তিনি।
১৯৭৭-এ প্রকাশিত দ্য ফ্লাউন্ডার-এর “ভাস্কো রিটার্ণ” পরিচ্ছদে উঠে এসেছে ভারতের কথা। ওখানে যেন তার প্রথম ভারত দর্শনের যন্ত্রণা, দুর্দশা ও দারিদ্রের মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তব, তার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রতিরােধ ও উল্লাস।
কলকাতাকে নিয়ে গুন্টার গ্রাসের “সুর্ধে সাইগেন” বা “জিহ্বা দেখাও” যেন এ শহরেকে নিয়ে তা তীব্র প্রেমের সংরাগ। কালীপূজার পৌত্তলিক মূর্তিটি তাকে যেন যুক্ত করে মানুষের অন্তনিহিত উল্লাস ও কান্নার সঙ্গে। দেবীর রক্তবর্ণ ও প্রকাশিত জিটিই যেন কোন অন্তনিহিত অর্থ নিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কলকাতা তার কাছে “আনন্দ নগরী” নয়, তাঁর কাছে এ শহর দুর্দশার, উল্লাসের শহর। তিনি এই শহরের মানুষদের গায়ে গা ঘেঁষে অনুভব করতে চেয়েছিলেন, থেকেছিলেন শহরতলীর বারুইপুরে। তবুও হয়ত রয়ে গেছে কিছু সীমাবদ্ধতা, যা চর্চিত হয়েছে কিন্তু চর্চিত হয়নি তাঁর “প্যাশন”-এর, যেজন্য তিনি ভিড় লােকাল ট্রেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সওয়ার হয়েছেন, বাজারের থলে হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের ভিড়ে। ১৯৮৮-র অক্টোবরে হামবুর্গ-এর “ভেলট অফ জোনটাগ”-এ হান্স-গেয়র্গ স্টুনিস লিখেছিলেন “Grass is incapable of giving Calcutta’s reality a comprehensible literary shape.” অনেকের মতো ফলকার হাগ-এর মতো ছিল, গ্রাস কলকাতা দর্শনের “Shock” ও “Revulsion”-কে কাটিয়ে উঠে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। তাঁর এই সীমাবদ্ধটাকে বুঝেছিলেন বলেই হয়ত সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন যে কলকাতাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখা তার সাধ্য নেই, এটা কেবল একজন বাঙালি লিখতে পারবেন। এখানেও এই বাংলার সাহিত্য মেধার প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও সম্মান উচ্চারিত হয়েছিল। তিনি এতটাই একাত্ম হয়েছিলেন বাংলার সঙ্গে যে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর তিনি দ্বিতীয় বাঙালি হবেন যিনি নােবেল পাবেন।

এই আয়োজনের পূর্ববর্তী দুটি লেখা পড়ুন নিচের লিংক দুটিতে ক্লিক করে :

বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ

গুন্টার গ্রাস > কবিতাগুচ্ছ >> অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত / হায়াৎ মামুদ / মাসুদুজ্জামান / শেহাবউদ্দীন আহমেদ অনূদিত

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close