Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ গৌতম গুহ রায় > শতবর্ষে পদাতিক : ‘অথচ জীবন তার চেয়ে বড়, ঢের বড়ো’ >> প্রবন্ধ

গৌতম গুহ রায় > শতবর্ষে পদাতিক : ‘অথচ জীবন তার চেয়ে বড়, ঢের বড়ো’ >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ April 18, 2018

গৌতম গুহ রায় > শতবর্ষে পদাতিক : ‘অথচ জীবন তার চেয়ে বড়, ঢের বড়ো’ >> প্রবন্ধ
0
0

গৌতম গুহ রায় > শতবর্ষে পদাতিক : ‘অথচ জীবন তার চেয়ে বড়, ঢের বড়ো’ >> প্রবন্ধ

 

“আমাকে কেউ কবি বলুক/ আমি চাই না।/… আমি যেন আমার কলমটা/ ট্রাক্টরের পাশে নামিয়ে রেখে বলতে পারি-/ এই আমার ছুটি/ ভাই, আমাকে একটু আগুন দাও।”

 

কবিতার মতো নিজেকে মানুষের পাশে নামিয়ে রেখে ছিলেন তিনি, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। মানুষের জন্য আগুনের প্রতাশা নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলেন, আবার সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন, জীবনের শেষ দিনগুলোয়। নিঃসঙ্গ এই পদাতিকের আর্তনাদ, “ইনাম পেয়ে জাহান্নামে/ গেছেন, বলব কী আর-/ প্রগতির লোক ছিলেন আগে এখন প্রতিক্রিয়ার।/ ফুলকি ছেড়ে ফুল ধরেছেন মিছিল ছেড়ে মেলা/ দিন থাকতে মানে মানে/ কাটুন এই বেলা।”  যিনি নিজেকে সক্রিয়তাবাদী (activist) হিসাবে ভাবতেন এবং  সেভাবেই স্বয়ংকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন জনতার ভিড়ে, সেই স্বপ্নে রাঙানো মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে শেষ বয়সে এসে কবি খেয়াল করেন যে তার এই যাত্রার পথে তিনি একাকী, নিঃসঙ্গ। শতবর্ষে এসে কবির ছবির পাসে সেই ক্ষতবিক্ষত মানুষটাও এসে দাঁড়ান, সেই একাকী মানুষটা, যিনি লিখেছিলেন, “ছড়ানো দৃশ্যের মধ্যে কিছু নিয়ে কাব্যের জগত/ রচনা করার ইচ্ছা ছিল বটে,/ভেঙেছি শপথ-বৃত্তে আজ একান্ত-বিবাদী…”

১৯১৯-এর ১২ ফেব্রিয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে জন্মেছিলেন, আদি বাড়ি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার দর্শনার লোকনাথপুরে। জন্মের পর তকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহীর নওগাঁয়। এই নওগাঁর খোলামেলা মেলামেশা তার কৈশোরকে সমৃদ্ধ করেছিলো। ১৯৩০ সালে তারা চলে আসেন কলকাতা, তাকে ভর্তি করা হয় মেট্রোপলিটন স্কুলে। কঠিন ট্রাইফ্রয়েড হয় তাঁর, শরীর ভেঙে পড়ে। ওদিকে সারা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে তার কাকা’র চাকরি যায়, বাবার বেতন কমে যায়। বড় বাড়ি পালটে তাঁদের উঠতে হয় ছোট্টো আস্তানায়। রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল কলকাতা সুভাষকে প্রভাবিত করে, ১৯৩১-এর মীরাট ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদের ঝর ওঠে তা সুভাষকে কমুনিস্টদের দিকে টেনে আনে। আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় সমর সেন তাকে পড়তে দেন “হ্যান্ড বুক অফ মার্ক্সবাদ”, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দেয়। ১৯৩৪-এ ডক শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন কমিঊনিস্ট পার্টির কর্মী হিসাবে, ১৯৪২-এ মুখপত্র ‘জনযুদ্ধ’র সার্বক্ষণিক কর্মী হিসাবে যুক্ত হোন। ১৯৪৩-এ বোম্বাইতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলনে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৪৬-এ “স্বাধীনতা” পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪৮এ কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে মার্চ মাসে তিনি গ্রেপ্তার হন, মুক্তি দিয়ে আবার নভেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় দমদম জেলে অনশন ধর্মঘটে সামিল হন, তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় উত্তরের বক্সা বন্দীশিবিরে। দু-বছর পরে মুক্তি পান, ফিরে এসে দেখেন পার্টি শতবিচ্ছিন্ন, তাঁর পরিবারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে এসময় কালে। বাবা অবসর নিয়েছেন, মা প্রয়াত হয়েছেন, দাদার টাইফয়েডে অকাল মৃত্যু হয়েছে। বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরতে তিনি ‘বুক ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি প্রকাশনায় কাজ নেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেই কাজ ছ্বেড়ে দেন। এটিই ছিলো তার প্রথম ও শেষ চাকরি করা।

১৯৯০-এর শেষ দিকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে, আশি পেরিয়েছেন ততদিনে, গেস্ট হাউসে বাথরুমে পড়ে গিয়ে ভয়ানকভাবে আহত হলেন, পা ভেঙে যায়। তবুও কি অসীম মনোবল দেখেছি এই ছিন্নভিন্ন মানুষটার। আমার শহরের (জলপাইগুড়ি) সঙ্গেও তাঁর অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিলো। সে কথা শুনিয়েছিলেন, সেই “জলার্কে’র কথা, সুরজিত দাশগুপ্ত্‌, অসীম রায় সুরজিত বসু, থেকে দীনেশ রায়,কার্তিক লাহিড়ী, দেবেশ রায়ের কথা। করলা নদীর অধুনালুপ্ত মধুবাবুর ঘাটের কথা। সুরজিত বসুর বাসার কাছাকছি এই নদীর ঘাটে মাছ ধরার স্মৃতিকথা। স্মৃতির সরণিতে হাঁটতে হাঁটতে কেমন শিশুর মতো হয়ে যাচ্ছিলেন! কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত কবির যাপনের সাথে জুড়ে ছিলো সেই সমাজ বদলের স্বপ্ন, সেই সব স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা। একটা ছবি আজো চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বাংলাদেশে চূড়ান্ত অত্যাচারিত ইলা মিত্র, গোলাম কুদ্দুসের কবিতার, “স্ট্যালিন নন্দিনী” হাসপাতালে ভর্তি, কবি সাহিত্যিকদের এক প্রতিনিধি দল গিয়েছেন তাঁকে দেখতে, মাথার পশে অশ্রুসজল সুভাষ মুখোপাধ্যায়, এই অশ্রু তিনি বহন করে গেছেন আমৃত্যু। উল্লেখ্য, নাচোলে কৃষক বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রকে ১৯৫০-এর ৭ জানুয়ারি মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ গ্রেফতার করে। পুলিশ ইলা মিত্রকে প্রথমে উলঙ্গ করে জেলে বন্দী করে। তারপর বন্দুকের বাট দিয়ে মাথায় আঘাত করে, প্রায় অচৈতন্য ইলা মিত্রকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এস.আই’এর কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে পায়ের মাঝে লাঠি ঢুকিয়ে চাপ দেয়া হয়, চুল উপড়ে ফেলা হয়, যৌনাঙ্গের ভেতর গরম ডিম ঢেলে দেওয়া হয়, অসহ্য যন্ত্রণায় জ্ঞান হারান তিনি, তবুও স্বীকারোক্তি আদায় করা যায় নি। পরদিন সিপাহীরা বুট দিয়ে লাথি মারে, রাতে ধর্ষণ করা হয়। শারীরীক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, অবস্থার আরো অবনতি হলে তাঁকে কলকাতা পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। সেই সময় বিধান সভায় ইলা মিত্রের প্রসঙ্গ উঠলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাচ্ছিল্য করে উত্তর দিলে প্রতিবাদে সোচ্চার হন বামপন্থীরা, গোলাম কুদ্দুস রাতারাতি লেখেন কবিতা “ইলা মিত্র”, সুভাষ মুখোপাধ্যায় লেখেন মর্মস্পর্শী কবিতা “পারুল বোন”।

রাজনৈতিক ভাবাদর্শে নিঃস্নাত তাঁর কবিসত্তা যতখানি বিশ্বনাগরিক, ততখানি আত্মমগ্ন নয়, এই অভিযোগকে নস্যাৎ করে দিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় জীবন ও তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা, জীবনের সেই ঘনিষ্ঠ তাপ শুষে নিয়ে রচনা করেছেন একের পর এক অনন্য গদ্য, আসাধারণ কাব্যভাষায় তৈরি করেছেন স্বপ্নজগতের ভিত্তি নির্মাণের আয়ুধ। আর সৃজনে জড়িয়ে থেকেছে সাধারণ মানুষ ও তাদের আপাততুচ্ছ জীবনের নিহিত সংগ্রামের ঘাম-রক্ত-অশ্রুকথা। প্রেম সেখানে উন্মুক্ত মানবাত্মার গান গায় :

এখুনি

বাসন–ধোয়া জলে

নিজের মুখ দেখবে

ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার আর একটি সকাল।

(আমরা যাবো)

 

এমনভাবে বলা যায় যখন তা আর নিছক আর ব্যক্তিগত থাকে না, “তোমার ঘৃণার দিকে/আমি ফিরিয়ে রেখেছি/ আমার ভালোবাসার মুখ।’ অথবা “আসমুদ্রহিমাচল/ শোকস্তব্ধ আমাদের ভালোবাসা। নতমুখে উদ্ভিন্ন মাটির দিকে তাকিয়ে।”

১৯৩৭-এ যখন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “পদাতিক” পাঠকের সামনে এলো, পাঠক কবিতায় খুঁজে পেলেন তার দৈনন্দিনতার অভিজ্ঞতাকে। বাংলাভাষার পাঠকের কাছে কবিতা যখন ক্রমশ হয়ে উঠছিলো শাব্দিকতার মেদস্ফীত, সে সময় যেন সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক অনুচ্চারিত যন্ত্রণার ও প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে জেগে উঠলো কবিতা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কলমে। “পদাতিক” বা পরবর্তী গ্রন্থ নকশালবাড়ি আন্দোলনের নির্ঘোষ লাগা “ছেলে গেছে বনে” সংকলনের কবিতায় দেখতে পাই সময়ের চিহ্নায়ণ :

লালবাড়ির ভেতর থেকে আসছে

হায়নাদের হাড়ভাঙার শব্দ

ঘুমের মধ্যে আমি চমকে চমকে উঠছি

#

কালো গাড়িগুলো থেকে

ঘষে ঘষে তোলা হচ্ছে চাপ চাপ রক্ত

হরিণবাড়িতে পাগলাঘন্টি

বেজে চলেছে বেজে চলেছে বেজে চলেছে

সুভাষের এই কবিতাটি প্রসঙ্গে তপোধীর ভট্টাচার্য লিখেছেন : খুব আটপৌরে শব্দই ব্যবহার করেছেন সুভাষ অথচ তাদের দ্যোতনগর্ভ হয়ে উঠতে কোনো অসুবিধা হয়নি। শব্দকে শাব্দিকতার পিঞ্জর থেকে মুক্ত করতে পারলেই তা হয়ে ওঠে বিপুল ভারবহনের উপযোগী। সেই সঙ্গে বিবরণের বাধ্যবাধকতা থেকে সরে গিয়ে বাচন হয়ে ওঠে স্বয়ংপ্রভ, ক্রিয়াত্মক ও চিহ্নায়িত। এই লিখনকৌশল সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে স্বতন্ত্র করেছে, বিশিষ্ট করেছে।

কবি চান ভাষাকে নিজের ইচ্ছা মতো চালনা করতে, এক খাত থেকে অন্য খাতে বাহিত করেই তার সুখ। “যথাপ্রাপ্ত ধারণাকে বিনির্মাণ করে এবং ধারণার শৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত করে কবির জগতকে দেখা আর উপস্থাপনার অজ্ঞাতপূর্ব পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ফলে প্রতি মূহূর্তে তার বাচন অস্থির, অনিশ্চিত ও অনির্দেশ্য কক্ষপথ খুঁজে নেয়। সমসময়ের আরো অনেক কবিই রাজনৈতিক সময়বোধ ও চেতন বিশ্বের বাসিব্দা হলেও তাদের কবিতার স্ব স্ব ভিন্ন পাঠকৃতির পরিচয় পাই আমরা, যেমন পাই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে। কবির প্রিয় বিষয় কবিতা, আবার সেই কবিতা থেকেই তার সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটে যায়, অতৃপ্তি নাকি সীমাকে অতিক্রম করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা? নিজেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণ কি থাকে তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান পাও্য়া যায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবিতা থেকে গদ্যে সরে গিয়েছিলেন তেমনি এক অনুদ্ঘাটিত কারণে।

কবি  সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বুকের সাথে বুক দিয়ে সেঁটে আছেন রাজনৈতিক কর্মী সুভাষ, মার্কসবাদে বিশ্বাসী সাংস্কৃতিক কর্মী সুভাষ, ১৯৩৯ থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী, ১৯৪২ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাপে বিকশিত শৈশব, আবগারি বিভাগের আধিকারিক বাবার বদলির চাকরির কারণে তাকেও ঘুরে বেড়াতে হয় নানা যায়গায়, যা তার অভিজ্ঞতার ঝুড়ি সমৃদ্ধ করেছিল। স্কটিশচার্চ কলেজের মেধাবী ছাত্র সুভাষ ছাত্র রাজনীতির কারণে পরীক্ষা না দিয়েই কলেজের  ছাত্রজীবনের ইতি টানেন। পথে নামেন আদর্শকে সামনে রেখে। ড. নীহাররঞ্জন রায়ের কথায়, “তারপর সুভাষ পদাতিক হয়ে বাংলার পথে ঘাটে মাঠে বেরিয়েছেন দেশের অগণিত মানুষের পরিচয় নেবার জন্য, তাদের দুঃখ সুখ, আনন্দ বেদনা,আসা আকাঙ্ক্ষাকে হৃদয়ের মধ্যে গ্রহণের জন্য, নিজের যথার্থ পরিচয় পাবার জন্য। সে-সুদীর্ঘ কয়েকটি বৎসর সুভাষের অজ্ঞাতবাস, নগর সাহিত্যের মুখর কোলাহল থেকে আত্মনির্বাসন। এ-অজ্ঞাতবাস, এ-নির্বাসন ব্যার্থ হয়নি; পদাতিক জীবন তাঁকে কিন্তু ঐশর্যের সন্ধান দিয়েছে, দেশের মাটির সঙ্গে পরিচয় দিয়েছে”(আমার বাংলা, মুখবন্ধ), এই সুভাষ তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁর দেশ ও সেই স্বপ্ন দেশের মানুষের জন্য, কখনো লেখনীতে কখনো মিছিলের সামনে থেকে।

১৯৪১-এর ২২ জুন হিটলারের নাজি বাহিনী সোভিয়েত রাশিয়ার উপর ঝাপিয়ে পড়লো, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের উপর এই আঘাতে প্রগতিশীল বিশ্বে ব্যাপক ও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। সোভিয়েতের উপর আগ্রাসনের বিরোধিতা করে বাংলায় তৈরি হলো “সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি, ২১ জুলাই ১৯৪১। এই দেশে তখন কিছু অংশের মানুষ হিটলারের জয়ের স্বপ্ন দেখতেন ব্রিটিশ বিরোধিতার যায়গা থেকে। তাই প্রগতিশীল সংস্কৃতি কর্মীরা এই বিরুদ্ধে প্রচারে নামেন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয় যখন কমিউনিস্ট পার্টি এদেশে “জনযুদ্ধ নীত” গ্রহণ করে(১৯৪১, ১৫ ডিসেম্বর)। এই ঘটনার প্রভাব পড়ে বাংলার কবিতা, কথাসাহিত্য, নাট্য-আন্দোলনেও। এই সময় সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি ঢাকাতেও তাদের কাজের পরিধি বিস্তার করে। ১৯৪২-এর ৮ মার্চ সেখানে সোভিয়েত সুহৃদ সংঘ একটি সভার আয়োজন করে। রেলওয়ে শ্রমিকদের মিছিল নিয়ে আসার পথে আক্রান্ত হয়ে নিহত হন তরুণ কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দ। প্রতিশ্রুতিমান এই লেখকের মৃত্যু প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই পটভূমিকাতেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ২৮ মার্চ ১৯৪২ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী সমাবেশ। সমাবেশে যামিনী রায়, গোপাল হালদার, আবু সৈয়দ আইয়ুব, হিরণকুমার সান্যাল প্রমুখ একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট তৈরি করার উপর গুরুত্ব দেন। এই দাবি মতেই অতুলচন্দ্র গুপ্তকে সভাপতি করে “ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ” তৈরি হয়, সম্পাদক হন যুগ্মভাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও বিষ্ণু দে। ১৯৪২ এর ১৯-২০ ডিসেম্বর কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে সম্মেলন হয়। এই কর্মকাণ্ডে সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায়, গদ্যে এর প্রভাব পড়েছিলো। এ সময় আর বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ভাষ্যকে সাহিত্যের ভাষায় যুক্ত করেছিলেন, অরুণ মিত্র, বিমলচন্দ্র ঘোষ, মণীন্দ্র রায়, সমর সেন, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় এদের অন্যতম। চল্লিশের এই সমাজসচেতন কবিদের হাত দিয়ে বাংলা কবিতারও এক স্বতন্ত্র নির্মণে উত্তরণ ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ ভূমিকা তীব্র হয়ে ওঠে।  ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, বিশেষত চিনের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কলম ধরেন তাঁরা। গোলাম কুদ্দুস ও তিনি যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেন “একসূত্রে” নামে একটি কবিতা সংকলন। এর ভূমিকায় লেখা হয় : …পৃথিবীর ঘটনার সঙ্গে আমাদের যোগ আজ আন্তরিক। এর ফলে কাব্যের ক্ষেত্রে নতুন সুর ধ্বনিত হয়েছে।.. মৃত্যু যদি এতই অনিবার্য তাহলে একটা আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কে জানে হয়তো সেই মৃত্যুর মধ্যেই জীবন প্রচ্ছন্ন আছে। এমনি করেই চরম বিপদের দিনে নির্জীব জাতির বাঁকা মেরুদণ্ডটা সোজা হয়ে আসে।”  ১৯৩৭-এ জাপান চীন আক্রমণ করে, এ সময় কমিনিস্টদের নেতৃত্বে চীনের গণবাহিনীর প্রায় পাঁচ লক্ষ সদস্য রক্তাক্ত প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশ নেয় উত্তর ও দক্ষিণ চীনের ১৫০টির মতো জেলাকেন্দ্র জাপানি দখল মুক্ত করে। চীনের জনগনের এই জাপ-বিরোধী প্রতিরোধে উল্লসিত সুভাষ লেখেন “চীন, ১৯৪১” কবিতাটি।

“… বজ্রের দাপট কন্ঠে, বাহুতে পৌরুষ/ স্বপ্নে জাগে ছিন্নপত্র সংসারের ছবি,/ চোখে জ্বলে বিপযর্স্ত উত্তরপুরুষ।/ শৃঙ্খল দুহাতে দেবে?/ -এখনো কোমরবন্ধে রয়েছে কার্তুজ;/ কঠিন প্রতিজ্ঞা নেয় মাঠের সবুজ।” আবার এদেশের প্রেক্ষাপটে দেখি ১৯৪২শে ৮ মার্চ জাপানের হাতে রেঙ্গুনের পতনের পর ৬ এপ্রিল জাপান ভারতের মাটিতে বোমা বর্ষণ করে, যুদ্ধাতংক বাংলাকেও আতঙ্কিত করে। এই সময় ফ্যসিবিরোধী প্রচারাভিযানে সুভাষ গান বাধেন : বজ্রকন্ঠে তোলো আওয়াজ/ রুখব  শত্রুদলকে আজ।

যারা জাপানের সাহায্য নিয়ে ব্রিটিশ বিতারণের কথা ভেবেছিল তাদের নস্যাৎ করে লেখেন : “দেবে না জাপানী উড়োজাহাজ/  ভারতে ছুঁড়ে স্বরাজ।” ওদিকে বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচার আন্দোলনে অক্লান্ত সুভাষ, বুকে তাঁর সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের স্বপ্ন অমলিন। “স্তালিনগ্রাদ” কবিতাটি তার বার্তা নিয়ে সেসময় মুখেমুখে ঘুরছে। ১৯৪২-এর ১৫ সেপ্টেম্বর জার্মানি অবরুদ্ধ করে স্তালিনগ্রাদ নগরীকে। কঠিন লড়াইয়ের পর ১৯৪৩ সালের ৩১ জনুয়ারি মুক্ত হয় সে নগরী। সুভাষ লেখেন : এমন কুরুক্ষেত্র ইতিহাস দেখেনি কখনো।/ বসন্ত গলিতপত্রে ;/ বাতাস বারুদগন্ধ, অন্ধকার বিদ্যুতখচিত;/ রৌদ্রালোকে লেগেছে গ্রহণ।/ ছুটে আসে পঙ্গপাল শত্রুর জোয়ার-/ ট্যাংক,মৃত্যুঝলকিত কামান, সওয়ার।/ লুব্ধ চোখে ঝলসায় আগুন।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোতেই বাংলার জনজীবনে মারাত্মক আঘাত হানে পঞ্চাশের মন্বন্তর। সংবেদনশীল কবি, সাহিত্যিকরা এই ভয়ানক বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে, অনুসন্ধানী দৃষ্টি ও সংবেদনশীল মন নিয়ে। যার ছাপ পরে চল্লিশের কবিদের কবিতায়। চল্লিশের দশকের এই সংবেদনশীল কবিদের ভিন্নতা ছিলো তাদের সমাজমনস্কটা ও রাজনৈতিক সচেতনতার ভাষাকে কবিতায় যুক্ত করা। তিরিশের দশকে যেখানে ক্রমশ কবিতার ভাষা হয়ে উঠছিলো দুরূহ অনুষঙ্গে অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য, সেখানে চল্লিশে সুভাষ সমর সুকান্ত গোলাম কুদ্দুস প্রমুখের হাত ধরে একটা নতুন বাঁকে এলো বাংলা কবিতা। তিরিশের জীবনানন্দ ব্যতিক্রম, সুধীন্দ্রনাথ বা বিষ্ণু দে’র বিরুদ্ধে অভিযোগ যে কবিতাকে ধীরে ধীরে সাধরণ পাঠকের বোধগম্যতার থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যদিও এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি পালটা যুক্তি আছে কিন্তু এটা ঘটনা যে বিষ্ণু দে ও সুভাষ সম-সমাজমনষ্ক হলেও কবিতার নির্মাণে তাঁদের ফারাক আসমান-জমিন। চল্লিশের এই কবিরা দুর্বোধ্যতাকে পরিহার করে সচেতনভাবে কবিতার পরিচিত শব্দ ও সহজ অন্বয়ের সাহায্যে কবিতায় আনে, সুমিতা চক্রবর্তীর ভাষায়, “ধ্বনির ঝঙ্কার, অনুভবের অনুরণন ও চিত্রকল্পের দ্যুতি’ সুভাষের কাছে তখন কবিতা “সমুদ্রের একটি স্বপ্ন/ মিছিলের একটি মুখ।”

কবির এই যুদ্ধযাত্রার যোগ্য সহযাত্রী ছিলেন তার সহধর্মিনী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৫২তে দুজনে মিলে বজবজে চলে আসেন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসাবে। এ সময় পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে চটকল শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁদের সাথী হয়েছিলেন, বজবজে একটি ছোট্টো ঘরে দুজনের সংসার তখন। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মীর কবিচেতনার একটি উদাহরণ এসময়ে লেখা একটি কবিতা “সলেমানের মা”। বজবজের মজুর বস্তিতে তাদের প্রতিবেশী ছিলেন একটি জোলা পরিবার। বাবা মা ও মেয়ের সেই পরিবারের মেয়ের নাম সোলেমান, বাবা বাবর আলী মন্ডল। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে বাবর আলী মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন, সোলেমান তখন ছোট্ট শিশু। পাগল স্বামীকে নিয়ে সোলামানের মা বাপের বাড়ি চলে আসে, কিন্তু সুতো কালোবাজারে চলে যাওয়ায় মামাদের গামছা বোনা বন্ধ, রুজি নেই। মামারা বাধ্য হয়ে তারি জোগানের কাজ নিয়েছে, মা বাধ্য হয়ে কলকাতা চলে যায় জীবিকার সন্ধানে। একদিন সোলেমান মায়ের খোঁজে কলকাতা আসে, ততদিনে তার মায়ের ভিন্ন সংসার। কলকাতায় এসে চটকল শ্রমিকদের মিছিলে ঢুকে পড়ে সে, সেই মিছিলের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই ঘটনা তাঁর মধ্যে কবিতাটির বীজ অঙ্কুরিত করে, প্রথাগত বিশেষণ ব্যবহার না করে ব্যঞ্জনাময় চিত্রকল্পে শুরু হয়েছে কবিতাটি, “পাগল বাবর আলীর মত আকাশ।” কবির দৃষ্টিতে দেশ সে-সময় এমন এক আকাশের নীচে যা স্বচ্ছ নয়, পাগলের চোখের মতো ঘোলাটে, শূন্য, খ্যপাটে, দিশাহীন।

“পাঁচ ইস্টিশান পেরোনো মিছিলে/ বার বার পিছিয়ে পড়ে/ বাবর আলীর মেয়ে সলেমান/ খুঁজছে তার মাকে।” একটি নিঃসম্বল অসহায় মেয়ে যেন হয়ে ওঠে সব মানুষের প্রতীক, যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে হয়েছে নিরাশ্রয় ও উদ্বাস্তু, যারা খুঁজে ফিরছে মমতা, নির্ভরতা আর আশ্রয়। “এ কলকাতা শহরে/ অলিগলির গোলকধাঁধায় তুমি,/ সলেমানের মা?… মিছিলের গলায় গলা মিলিয়ে/ পিচুটি-পড়া চোখের দুকোন জলে ভিজিয়ে/ তোমাক ডাকছে শোনো, /সলেমানের মা”- এভাবেই মেয়েটির আর্তি হয়ে ওঠে কবির আর্তি, পাঠকের আর্তি। এই বাবর আলীকে নিয়ে গদ্য লিখেছেন সুভাষ, “বজবজ থানার দক্ষিণের এক গাঁয়ের বাবর আলি মন্ডল হঠাৎ বদলে গিয়ে আমার কবিতার একটি উপমার ভিতশুদ্ধ এভাবে নাড়িয়ে দেবে আগে ভাবতে পারিনি।” বাবর আলি ভালো হয়ে ফিরে এলে “এই প্রথম বাবর আলি তার মেয়েটার দিকে তাকাল..সেও বাবর আলিকে ঠিক চিনতে পারছে না। বাবর আলি চুল আঁচড়েছে বলে নয়, টায়ারের তৈরি জুতো পায়ে গলিয়েছে বলে নয়- আসলে চোখের চাউনিটা বদলে গিয়ে গোটা মানুষটা একদম বদলে গেছে। লণ্ঠনের চিমনির মধ্যে যেমন আগুনটা স্থির হয়ে থাকে, তেমনি স্থির হয়ে আছে বাবর আলির চোখের দুটো তারা.. …বজবজের মাথায় যে আকাশটা দেখছি তার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে হঠাৎ কেন যেন বাবর আলীর চোখের কথাই মনে পড়লো। পাগল বাবর আলী নয়। যে বাবর আলী ঠকঠকি তাঁতের সামনে বসে সারা রাত জেগে জীবনের সঙ্গে শেষবারের মত বোঝাপরা করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে, একবার তার চোখের সঙ্গেই এই গনগনে আকাশটার তুলনা চলে।

এসময় তাঁর কবিতায় এই জীবনযন্ত্রণা বারে বারে উঠে এসেছে, যেমন “অগ্নিগর্ভ” কবিতায়, “গোটা দিন নয়/ দিনের আধখানা এখানে জীবন।/ সন্ধ্যে হলে অন্ধকারে মোড়া অন্তহীন পাথারে/ ডুব দাও।” “কবিতাকে এসময় রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্বাস থেকে পোস্টারের মতো ব্যবহার করছেন তিনি :

এত রাত্রে কে যায়?

-ভাইরে, আমি রাম;

আমি রহিম।

এ অসময়ের কবিতায় উৎসমূলে ছিল তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রত্যয়। জেল খেটেছেন পার্টির কর্মী হয়ে, সারা জীবন নিজস্ব জীবিকার খোঁজ করেননি, এক অনাড়ম্বর জীবনযাপন করে গেছেন।

যে স্বপ্ন তাঁর উদ্দীপনার উৎস ছিলো, একসময় এসে তা তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল, শেষজীবনের এই যন্ত্রণা তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। তবুও তিনি মানুষের প্রতি দরদ থেকে চ্যুত হননি। আজীবন তিনি ছিলেন নতুন পথের দিশারি, আটপৌরে, সাধারণ কথন ও জীবনের কাছ থেকে তাঁকে জানাশোনার অভিজ্ঞতার বুননে বুনেছেন তাঁর কবির ভাষ্য। জাদুকরের মতো সম্মোহনী কৌশলে তৈরি করেছেন তার সৃজন-ইঙ্গিত। কথার সঙ্গে কথা কেবল/ জুড়লেই তো হয় না/ হয় না যেন হাতের শেকল/ কিংবা গলার গয়না/… এমন করে জুড়বে কথা সাটে/ কথায় যেন কথার জোড় থাকে/…প্রকৃতি দেখো, কত সহজে আটে/ পরামণুর ভেতর ক্ষমতাকে।”(জোড় কলম) মানুষের প্রতি অপার ভালোবাসাই ছিলো তার সৃজন আয়ূধ। তাইতো অদ্ভুত মায়ার স্বরে লিখতে পারেন, “শোকাকুল সন্ধ্যাকাশে মোছা/ এয়োতির আরাধ্য সিঁদুর। (এই আশ্বিনে) বা “লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মতো/ আকাশটাকে মাথায় নিয়ে/ ও-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে/ রেলিঙে বুক চেপে ধরে/ এইসব সাতপাঁচ ভাবছিলো (ফুল ফুটুক না ফুটুক)।”

এই ভালোবাসার উৎস মানবাত্মার প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর অপার প্রেম তাঁর। এই প্রসঙ্গে তাঁর আত্মজৈবনিক গদ্য থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে, “শীতকালে শুধু পায়ের পাতাটুকু ডোবে এমন নদী তিস্তা। হেঁটে পার হবার সময় পেছেনে যদি তাকাও দেখবে আকাশের পিঠে পিঠ রেখে হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে প্রকাণ্ড এক দৈত্য। আসলে দৈত্য নয়, হিমালয় পাহাড়।

নন্দীগ্রামের এক অখ্যাত গাঁয়ে নোনা-লাগা তালগাছের বন পেরিয়ে আকাশের কোলের কাছে প্রথম ছোট্ট একটা ফোঁটা, তারপর আস্তে আস্তে তালগাছের মতো বড় হয়ে উঠল কী ওটা? আগন্তুক এক জাহাজের মাস্তুল। আর স্যামনের বালিয়ারি পেরিয়ে ধূ ধূ করে উঠলো নীল সমুদ্র। বঙ্গোপসাগর।

এই আসমুদ্রহিমাচল আমার বাংলা-পর্বত যার প্রহরি, সমুদ্র যার পরিখা।…

আররো কাছে এলো সেই মূর্তি। রাস্তার ধূলো থেকে কী যেন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। তার জ্বলন্ত দুটো চোখ কুয়াশায় কী যেন খুঁজে খুঁজে ফিরছে। ঠিক মানুষের হাতের মতো তার সামনের দুটো থাবা। আঙুলগুলো যেন আগার দিকে একটু বেশী সরু। গায়ে একটুও লোম নেই। কোন জন্তু?  সামনাসামনি হতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। অমৃতের পুত্র মানুষ। বারো-তেরো বছরের উলঙ্গ এক ছেলে। ছুটে পালিয়ে এলাম স্টেশনে। কিন্তু আজোও সেই দুটো চোখ আমাকে থেকে থেকে পাগল করে। দু-হাতে সোনা ছাড়ানো নদীমালার দিকে তাকিয়ে তার নিঃশ্বাস শুনি। শ্রী লিকলিকে আঙুল দিয়ে সেইসব খুনীদের সে সনাক্ত করছে- শহরে গ্রামে বন্দরে গঞ্জে জীবনের গলায় যারা মৃত্যুর ফাঁস পরাচ্ছে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে দিচ্ছে না যারা মানুষকে।

সেই দুটি চোখ শান্তি চায়। বাংলার বুক জুড়ে সবুজ মাঠের সোনালি ফসলে, চাষীর গোলাভরা ধানে ভরে উঠুক শান্তি। কারখানায় কারখানায় বন্ধনমুক্ত মানুষের আন্দোলিত বাহুতে বাহু মেলাক শান্তি। যুদ্ধ নয়, আনাহারে মৃত্যু নয় আর। কোটি-কোটি বলিষ্ঠ হাতে স্বাধীন সুখী জীবন, এবার শান্তি। যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষের ঘনায়মান অন্ধকারে দুটি চোখ জেগে আসমুদ্রহিমাচল এই বাংলায় পাহারা দিচ্ছে আর মাটি থেকে দুটো হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দু-পায়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে সে। তোমারাও হাত বাড়াও, তাকে সাহায্য করো।”

সুভাষ মুখোপাধ্যয়ের এই আর্তি তাঁর অন্তরের আর্তি, আমৃত্যু তিনি উচ্চারণ করে গেছেন জীবনের এই শ্লোক। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পাশাপাশি দুটোই আসা উচিত, তোমাকে কবিও হতে হবে, আবার রাজনীতি সচেতনও। “পদাতিক”-এর উচ্চারণ তাই :  উদাসীন ঈশ্বর কেঁপে উঠবে না কি/ আমাদের পদাতিক পদক্ষেপে?” সচেতন কবি সত্তরের রক্তস্নাত সময়ে দাঁড়িয়ে লেখেন : যখন একসঙ্গে হাত মুঠো করে দাঁড়াতে পারলেই/ আমরা সব কিছু পাই-/ তখন/ বিভেদের এক টুকরো মাংস মুখে ধরিয়ে দিয়ে/ চোরের দল/ আমাদের সর্বস্ব নিয়ে চলে যাচ্ছে।(অদ্ভূত সময়)।  দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তর মানুষের অনিবার্য নিয়তি হতে পারে না। এই আশা বুকে নিয়ে সৃজন সেনানী সুভাষ লিখেছেন কবিতা, বেধেছেন গান। “এই আশ্বিনে” কবিতায় উপবাসক্লিষ্ট, বঞ্চিত মানুষের পক্ষে লেখেন : ক্ষমা নেই-/ শোকাকুল সন্ধ্যাকাশে মোছা/ এয়োতির আরাধ্য সিঁদুর।/ ক্ষমা নেই-/ এ আশ্বিন স্মৃতিভারাতুর।/ কাঁধে কাঁধে সান্নিধ্য দাঁড়াও।/ হাতে হাতে বজ্র হান।/ ভূমিকম্পিত বিস্ফোরণে চাও-/ শৃঙ্খলের কলঙ্ক মোচন।” মিছিলের মানুষ হয়ে ছিলেন মানুষের সাথে, “মিছিলে দেখেছিলাম একটি মুখ,/ মুষ্টিবদ্ধ একটি শাণিত হাত/ আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত :/ বিস্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র/ আগুনের শিখার মত হাওয়ায় কম্পমান।” (মিছিলের মুখ)

সমাজচেতনা ও প্রকৃতিবোধ সুভাষের কবিতায় মিলে মিশে থাকে। মানুষ ও পরিবেশ তাঁর কাছে সমার্থক হয়ে ওঠে কখনো কখনো। ও মেঘ/ ও হাওয়া/ ও রোদ/ ও ছায়া/ যাচ্ছি (যাচ্ছি)। পদাতিকের সেই কবিতাটি, “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,” অথবা সেই দু লাইন, যা তাঁর জনপ্রিয়তম উচ্চারণ- “ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত”, সম্ভবত ১৯৫৬-তে লেখেন এই কবিতাটি, এই পর্বে শ্রমিক আন্দোলনের একটি ক্রান্তি পর্ব সূচিত হচ্ছিল, এই সময়ের কবিতায় আমরা দেখি তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নকে, বিপ্লবী চেতনায় দীক্ষিত কবি তখন পারিপার্শিক ঘটনাওবর্তে ব্যথিত ও আশাভঙ্গের বেদনায় কুন্ঠিত। একসময় যে কবি “হতাশের কালো চক্রান্তকে ব্যর্থ করার/ শপথ আমার; মৃত্যুর সাথে এটিও কড়ার-/ আত্মদানের; স্বপ্ন একটি পৃথিবী  গড়ার” (দীক্ষিতের গান)। তিনি এসময় লেখেন “কে যেন ডাকছে আমায়। কে/ -মিছিলের সেই মুখ;/ দিগন্ত থেকে দিগন্ত জুড়ে বাড়িয়ে দিয়েছি হাত।/ সে কি স্বপ্ন?/ সে কি মায়া?/ সে কি মতিভ্রম? (“জয়মণি স্থির হও”), যিনি একসময় লিখেছিলেন, “ক্রমাগত চোখ রাঙিয়ে রাঙ্গিয়ে/ যারা হয়ে গেছে অন্ধ/ তাদের নাকের কাছে ধরে দিও/ ফুলের একটু গন্ধ।” কিন্তু ফুলের বিলাসমগ্নতা নয় লালিত্য ছিঁড়েফুড়ে তিনি হয়ে ওঠেন সমাজ সচেতন কর্মী, “করাতের দাঁতে ঘিষ ঘিষ শব্দ” পেরিয়ে এসে তিনি লিখলেন, “ফুলকে দিয়ে/ মানুষ বড় বেশি মিথ্যা কথা বলায় বলেই/ ফুলের ওপর কোনোদিনই আমার টান নেই।/ তার চেয়ে আমার পছন্দ/ আগুনের ফুলকি-/ যা দিয়ে কোনোদিন কারো মুখোশ হয় না।” নিজের সামনে এসে দাঁড়ান কবি, তার দ্বিধা ফুটে ওঠে মনে, “পুড়ে পুড়ে ছাই হবে সেই আত্মক্ষয়ী আগুন।” জনচিত্তের উত্তেজনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবি সামনে ধুসর অন্ধকার এসে দাঁড়ায়, “আমি নির্জন, নিঃসঙ্গ- যে মিছিলের মুখ, যে বিশ্বাস তাকে জ্বালিয়ে রেখেছিল তা দৈনন্দিন শহরের জীবনযাপনের ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল” (অগ্নিকোণে)।

কবিতা থেকে একসময় নির্বাসন নিয়ে গদ্য লিখেছেন, তাঁর অভিজ্ঞতার রোজনামচা সেইসব গদ্য, “রংমশাল”-এর জন্য লিখেছেন ‘আমার বাংলা’, তার গদ্যগ্রন্থ ‘ডাকবাংলার ডাইরি’, ‘নারদের ডাইরি,’ ক্ষমা নেই’ প্রভৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেইসব অভিজ্ঞতার মণিকাঞ্চন। ‘আমার বাংলা’র প্রাক-কথনে লিখেছিলেন, “আমরা কালের হাতের পুতুল। ইতিহাসের এই ভাঙা গড়ার শুরু আছে, কিন্তু শেষ নাই..স্মৃতির কাজ শুধু রোমন্থন নয়। কিন্তু সংকল্পগুলোকে খুঁচিয়ে গনগনে করে তোলা। শুধু দীর্ঘশ্বাস নয়। ঝড়ের হাতে জীর্ণ পাতাগুলোকে বসিয়ে দিয়ে বৃষ্টির মুখে কিন্তু উজ্জীবনের মন্ত্র পড়া।” এই উজ্জীবনের মন্ত্র উচ্চারণের কবি সুভাষ তাই চির অমলিন রয়ে যাবেন। কবিতা, গদ্য, উপন্যাস, রিপোর্টাজ-এর সাথে সাথে অনুবাদের কাজ করেস গেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিশেষত নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, হাফিজের কবিতা থেকে চার্যাপদ, গাথাশপ্তশতী। নিজের বিশ্বাস অবিশ্বাসের ক্রান্তি মুহূর্তে আশ্রোয় নিয়েছেন অনুবাদে, হিকমত ও নেরুদার কবিতার কাছে তিনি ঋণ স্বীকার করেছেন দ্বিধাহীনভাবে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বিবর্তনে তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। হিকমতের “জেলখানার চিঠি” জনপ্রিয় হয়েছিল তার অনুবাদের গুণে, তার প্রত্যয় ও প্রত্যাশা প্রতিফলিত হচ্ছিলো সেখানে : “সব চেয়ে সুন্দর শিশু/ আজও ডাগর হয়ে ওঠেনি।/ আমাদের সব চেয়ে সুন্দর দিনগুলি/ আজও আমরা পাইনি।”

সুভাষ মুখোপাধ্যায় সবসময় মানবাত্মার আর্তি বহন করতে চেয়েছেন তার কবিতায়, গদ্যে; তাঁর কাছে কখনো মানুষ আর শিল্প ভিন্ন হয়ে থাকেনি। সময়চিন্তা তাই তাঁকে চালনা করেছে সর্বদা, এই আত্মদহনের কারণেই তিনি কখনো কখনো একা হয়ে গেছেন তার সঙ্ঘ থেকে। ব্যক্তিগত স্তরে বিধ্বস্ত কবি লেখেন : এ এক ভারি অদ্ভূত সময়।/ কে কার আস্তিনের তলায় কার জন্যে/ কোন হিংস্রতা লুকিয়ে রেখেছে/ আমরা জানি না।/ কাঁধে হাত রাখতেও এখন আমাদের ভয় (অদ্ভূত সময়)।” এই অদ্ভূত সময়ে এসে সুভাষ বড্ড নিঃসঙ্গ হয়ে যান, যিনি সাহিত্য আকাডেমি, আনন্দ, সোভিয়েত, জ্ঞানপীঠ, বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম সম্মান অর্জ করেছেন, তাঁকে চেষ্টা করলেও অবমূল্যায়ন করা যায় না, আজো তাঁর কবিতার আগুন আমাদের উসকে দেয়, মিছিলের সাথে যুক্ত করে, জীবনের গান গেয়ে হয়ে নামা সেই মিছিলের সামনে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ঢোলগোবিন্দ দেখেন জগতটাকে পালটানোর স্বপ্ন, এই স্বপ্ন চিরকালিন। চিরকাল কথাবলার আটপৌরে রীতিতে বলা তার কথা আমলিন থেকে যাবে, “অনুভূতিকে জুড়ে জুড়ে তবে যুক্তি হয়। কবিরা অন্তর্গত অনুভূতির জোগানদার। সেই অগোছালো আপাত-অনর্থক আকরিক অনূভূতিগুলোকে জ্বাল দিয়ে মনের কারখানায় মিলে যার যা গড়বার সার্থক ধাতু। আগাগোড়া চোখের ওপরে সাঁতরে পার হোয়া নয়, ডুবুরী হয়ে ডুব দেওয়া।” যিনি একাকীত্বের যন্ত্রণায় থেকেও লিখতে পারেন, “একজন মানুষের খুব বেশি চাই না। তার চাই/ শুধু একটি মাত্র বর/ কেউ তার প্রতীক্ষায় থাকবে (জল সইতে)। বিপন্ন বাংলার পাঠক চিরকাল আপনার প্রতীক্ষায় থাকবে সুভাষ মুখুজ্জে। কবিতাপ্রিয় মানুষের সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close