Home চলচ্চিত্র চণ্ডী মুখোপাধ্যায় > বিশ্ব-চলচ্চিত্রে শরণার্থী : চ্যাপলিন থেকে ঋত্বিক ঘটক > চলচ্চিত্র

চণ্ডী মুখোপাধ্যায় > বিশ্ব-চলচ্চিত্রে শরণার্থী : চ্যাপলিন থেকে ঋত্বিক ঘটক > চলচ্চিত্র

প্রকাশঃ September 18, 2017

চণ্ডী মুখোপাধ্যায় > বিশ্ব-চলচ্চিত্রে শরণার্থী : চ্যাপলিন থেকে ঋত্বিক ঘটক > চলচ্চিত্র
0
0

চণ্ডী মুখোপাধ্যায় > বিশ্ব-চলচ্চিত্রে শরণার্থী : চ্যাপলিন থেকে ঋত্বিক ঘটক > চলচ্চিত্র

ডায়াস্পোরা এবং উদ্বাস্তু কি সমার্থক? এ প্রশ্ন ওঠে। সমার্থক হােক বা না হােক, এই দুটি শব্দের মূল অর্থ কিন্তু প্রায় কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। বিচ্ছেদবিন্দু তেমন থাকে না। ৬০৭ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে ইজরাইল থেকে যে ইহুদি জনগোষ্ঠী একান্ত বাধ্য হয়ে  দেশ ত্যাগ করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, ওল্ড টেস্টামেন্টে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে ডায়াস্পোরা গোষ্ঠী হিসেবেই। ডায়াস্পোরার মূল উৎস হিসেবে ভেবে নিতে হয় ‘ডিয়াসপেবেল’ শব্দটিকে, যার ব্যবহার রয়েছে ওল্ড টেস্টামেন্টে। ১৮৭৬ সালেই ডায়াস্পোরা শব্দটি ইংরেজি শব্দকোষে জায়গা করে নেয়। আর তারও ৭৫ বছর পর থেকে তো শব্দটির বহুল প্রচলন শুরু হয় ইংরেজিতে। ১৯৫০ সাল থেকে ‘ডায়াস্পোরা’ শব্দটির অর্থ ক্রমশ পরিবর্তনশীল হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায় স্থানান্তকরণের প্রশ্ন। ডায়াস্পোরা এমন এক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, যাঁরা যে-কোনও কারণেই হােক, নিজের মাতৃভূমি তথা হােমল্যাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, মাতৃভূমির প্রতি সতত এক টান নিয়ে দেশান্তরে থাকেন। গৃহাকুলতার এই যে অন্বেষণ, এ ডায়াস্পোরারই লক্ষণ। এর সঙ্গে আমাদের দেশভাগ এবং তারই ফলে উদ্বাস্তুদের কোথায় যেন অবশ্যই একটা মিল আছে। ইউরোপের ইতিহাস কিন্তু নানা ডায়াস্পোরার সাক্ষী। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে তো খুব কম করে হলেও দু’লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষ ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে। এই ধারা সমানে চলতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ ইউরোপ থেকে আমেরিকায় যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর আরেকটি অন্যতম ডায়াস্পোরা হল আইরিশ উদ্ধাস্তু-স্রোত। বিশাল এক দুর্ভিক্ষের ফলে প্রায় অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি আয়ারল্যাণ্ড অধিবাসী ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন নানা প্রান্তে— বিশেষ করে ব্রিটেন, কানাডা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড প্রভৃতি রাষ্ট্রে।

এই রকম ডায়াস্পোরা পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে ঘটেছে, যা পাল্টে দিয়েছে নানা সময়ে নানা ভাবে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র। ডায়াস্পোরাকে ঘিরেই তো তৈরি হয় শরণার্থী-স্রোত। শিল্প-সাহিত্য-সিনেমাকেও যথেষ্ট প্রভাবিত করেছে এই ডায়াস্পোরা। সাহিত্যে ‘ডায়াস্পোরা সাহিত্য’ বলে আলাদা করে একটা শাখা গড়ে উঠেছে। তাত্ত্বিক দিক থেকে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, স্টুয়ার্ট হল, এডওয়ার্ড সাঈদ, জেমস ক্লিফোর্ড প্রমুখ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই ভাবুকরা সাংস্কৃতিক উৎপাদন- যার মধ্যে অবশ্যই চলচ্চিত্রও পড়ে- সাম্প্রতিক বিশ্বের নানা ঘটনার নিরিখে দেখার চেষ্টা করেছেন। যেমন, বিশ্বসিনেমায় দেশভাগজনিত শরণার্থী, ডায়াস্পোরা ভাবনার যে প্রকাশ ঘটেছে, চলচ্চিত্রে তা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ভারতীয় দেশভাগ চলচ্চিত্রের সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে। উত্তর ঔপনিবেশিক সময়ে দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত তো আছেই, কিন্তু এশিয়ার অন্যান্য কয়েকটি দেশেও এই দেশভাগের স্মৃতি বা ট্ৰমা রীতিমত অন্যান্য শিল্পের মতো চিহ্নিত হয়ে আছে চলচ্চিত্রেও। সেটাই স্বাভাবিক। সিনেমা তো আর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। কোরিয়ান ছবি দেশভাগকে সরাসরি উপস্থাপিত করে। শুধু বিংশ শতাব্দীতে নয়, একবিংশ শতাব্দীতেও। কোরিয়ান সিনেমা এক যুদ্ধোত্তর পরিবেশের মধ্যে দিয়েই পুনর্গঠিত হয়। নিঃসন্দেহে প্যালেস্টাইন ও ইজরাইলও শরণার্থী সংক্রান্ত সিনেমায় বেশ স্মৃতিকাতরই। অন্তত এই মুহূর্তে চারটি ছবির কথা মনে পড়ছে : ওয়েডিং ইন গ্যালিলি, ডিভাইন ইন্টারভেনশন, দ্য বাবল এবং ওয়ান্টজ অ্যাণ্ড বসির। পরস্পর সম্পর্কিত এই চারটি ছবির মধ্যে প্রথম ও শেষের ছবির মধ্যেকার নির্মাণকালের ব্যবধান প্রায় একুশ বছর। যথাক্রমে ছবি চারটির নির্মাণকাল হল ১৯৮৭, ২০০২, ২০০৬ এবং ২০০৮ সাল। এসব ছবি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অবশ্য দক্ষিণ এশিয়া এবং কোরিয়ান দেশভাগজনিত ছবিগুলি থেকে বেশ স্বতন্ত্ৰ। ছবিতে সীমান্ত এসেছে এক দিগন্তময় স্পর্ধায়। দক্ষিণ এশিয়ার ছবিগুলো যখন ক্রমশই স্মৃতির প্রতি বিনয়ী হয়ে ওঠে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার ছবি-নির্মাতারা স্মৃতি বা ট্ৰমায় আক্রান্ত না হয়ে সীমান্ত বা শরণার্থী স্রোত নিয়ে অনেক বেশি যুক্তিবাদী। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, আবেগ একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে দিয়ে একটি চলচ্চিত্ৰ করিয়ে দেয়, তার একান্তই অভাব রয়েছে এইসব ছবিতে। আবেগ ও যুক্তির সুষম সংমিশ্রণের মধ্যে দিয়ে তাই তৈরি হয়েছে ইজরাইল বা প্যালেস্টাইনের ছবি। ফিলিস্তিন চলচ্চিত্রকার মাইকেল খলিফি ‘ওয়েডিং ইন গ্যালিলি’ ছবিটি যখন নির্মাণ করেন, তখন এই বঙ্গেও দেশভাগের অভিঘাত চলছে। সমসাময়িক সময়েই, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অস্থির আরবের একটা কার্ফু-অধ্যুষিত গ্রাম। সেখানকার এক বিয়ের অনুষ্ঠানকে ঘিরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের গ্রামে কীভাবে পরবাসী হয়ে আছেন গ্রামবাসীরা। সেই পরবাসী বোধকে ক্রমশ আন্তর্জাতিক করে তোলেন পরিচালক যুক্তি ও আবেগে। আরবি ভাষার আজও এক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘ওয়েডিং ইন গ্যালিলি’। আশ্চৰ্য, ১৯৪৭ সালেই অবিভক্ত ভারত যখন অবিরাম উদ্বাস্তু স্রোত বহন করছে ইজরাইল তখন উদ্বাস্তু সমস্যাতেই স্মৃতিকাতর। একবিংশ শতাব্দীতেও কায়রোয় এক দাঙ্গার পর পায়ে হেঁটে বিশাল এক মরুভূমি পেরিয়ে উদ্বাস্তু স্রোত ইজরাইলের সীমান্তে এসে পৌঁছুচ্ছে। এর সবই ইজরাইলী চলচ্চিত্রে রীতিমত প্রভাব ফেলেছে। ইজরাইল সরকার শরণার্থীদের ক্ষেত্রে বেশ শ্রেণিবিভেদ করে নিয়েছে। যেমন কিছু কিছু রিফিউজিকে বর্ডারেই আটকে পত্রপাঠ তাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানাে হচ্ছে। কিছু কিছু শরণার্থীকে অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেফতার করে আটকে রাখা হচ্ছে কারাগারে। সরকারের সাফাই, এদের জেলবন্দি করার একটাই উদ্দেশ্য— শরণার্থীদের অনুপ্রবেশে উৎসাহিত না করা। তৃতীয় আরেক শ্রেণি সরকারিভাবে রিফিউজি শিলমোহর পায়, যারা কার্ফুর ভেতর ইজরাইলে থেকে পালিয়ে আসেন। এই শরণার্থীরা তেল আবিব এলাকায় কাজ জোগাড় করে নেন। তেল আবিবের শরণার্থীদের নিয়ে অনন্য এই ছবিটি তৈরি করেন পরিচালক শাই কারনেলি পোলাক। ছবির নামই ‘রিফিউজি’। মূলত দু’একটি গল্পকে কেন্দ্র করে তিনি ইজরাইলের শরণার্থী সমস্যাকে এক নারী- যার একমাত্র পুত্ৰ শরণার্থী যাত্রার মধ্যেই মারা গেছে, আরেক নিঃসঙ্গ মানুষ- যিনি এই শরণার্থী স্রোতেই হারিয়েছেন তার পরিবারবর্গকে।

ইজরাইল এবং প্যালেস্টাইন দুই দেশই এই দ্বিধাবিভক্ত দেশ-সংস্কৃতি-যুদ্ধকে সিনেমায় অনেকটাই প্রাধান্য দিয়েছে। যেমনটা দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়াও। ভারতবর্ষের মতো এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অনেক দেশেরই রয়েছে সচেতনভাবে ‘দেশভাগ’-এর অতীত এবং সুদীর্ঘ ইতিহাস। প্যালেস্টাইন-ইজরাইল-ভিয়েতনামের দেশভাগের রয়েছে এক যুদ্ধক্ষত অতীত। রয়েছে গৃহযুদ্ধের স্মৃতিজনিত ট্রমা। ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যাবে শুধু পরিকল্পিত দাঙ্গা। এছাড়া সুদানের রিফিউজিদের নিয়ে নানা সময়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ছবি নির্মাণ করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতারা। সেসব চলচ্চিত্রে যে সব সময় রাজনীতি এসেছে তা নয়, আবার রাজনীতিকে বর্জন করা হয়েছে এমনও নয়। আসলে অস্থির একটা সময়কে উপস্থিতি করার প্রয়াস— যার সবটা অতীত নয়, খানিকটা সমসাময়িকও। অভিবাসন বা মাইগ্রেশনের মূল সমস্যা নিয়ে প্রচুর তাত্ত্বিক ডিসকোর্স আছে। বিশেষত সাহিত্যে তো এটা সব সময়ই ট্ৰমাকেন্দ্রিক তাত্ত্বিক বিষয়। বিশ্ব-চলচ্চিত্রে এই তাত্ত্বিকতাটাকে যে সব সময় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে তা নয়, বরং যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে এগিয়ে গিয়েও আবেগকে এড়ানো যায়নি। সিনেমা যেহেতু দৃশ্যমাধ্যম এবং গণমাধ্যম তো বটেই, পাশাপাশি এক বিশাল বিনিয়োগ, তাই আবেগের প্রাধান্য সেখানে আবশ্যিক হয়ে পড়ে। বিশ্বসিনেমায় শরণার্থীরা কীভাবে দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে এখন অবধি পূর্ণাঙ্গ কোনো কাজ হয়েছে, এমনটা জানা যায় না, তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু হয়েছে। এখানে পূর্ণাঙ্গভাবে না হলেও খানিকটা নমুনা-সার্ভে করা যেতে পারে, যা থেকে এই বিষয়ের একটা রূপরেখা দাঁড় করানো যাবে।

চলচ্চিত্রের জন্মের সামান্য কিছু পরেই শরণার্থীরা এসে গেছেন সিনেমায়। যেমন ১৯১৭ সালে তৈরি চার্লি চ্যাপলিনের একটি ছবির নামই তো ‘ইমিগ্র্যান্ট’। অবশ্য চার্লি সারা জীবন চলচ্চিত্রে যে ইমেজ নিৰ্মাণ করে গেছেন, তা শরণার্থীরই– যিনি স্বদেশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আর শুধু সিনেমাতেই বা কেন, আমেরিকাতে তো চ্যাপলিনের ওপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করে তো রিফিউজিসম করে তোলা হয়েছিল। মার্কিন দেশে চ্যাপলিন ছিলেন পরবাসীই। কখনও তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি।

‘ইমিগ্র্যান্ট’ নির্বাক ছবি, তবে ছবিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসেই নির্মাণ করেন চ্যাপলিন। হলিউডের আহ্বানে তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ‘ইমিগ্র্যান্ট’ এবং শরণার্থীর গল্প, আটলাণ্টিক পেরিয়ে যা মার্কিন দেশে চলে আসে। অবশ্যই চ্যাপলিনীয় কৌতুক পুরো ছবিটারই নির্ভরতা। ছবিতে একটি দৃশ্য আছে যেখানে ইমিগ্র্যাণ্ট অফিসারের পিছনে লাথি মারছেন চ্যাপলিন। অনেক পরে, ১৯৫২ সালে যখন ‘অ্যান্টি-আমেরিকান’ কমিশনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল চ্যাপলিনকে, তখন এই দৃশ্যটির কথা উঠেছিল— চ্যাপলিনকে মার্কিন-বিরোধী প্রমাণ করার জন্য। এই কমিশনের চাপেই শেষ অবধি আমেরিকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন চ্যাপলিন। চ্যাপলিন তো নিজেকে শরণার্থীই ভেবেছেন আমৃত্যু। আসলে দেশের সীমানায় বিশ্বাস ছিল না তাঁর। বিশ্ব-নাগরিক হিসেবেই নিজেকে ভাবতেন। চ্যাপলিনের প্রায় সমস্ত ছবিতেই কোনও না কোনওভাবে এসেছে ‘আউটসাইডার’ চেতনা বা শরণার্থী ভাবনা। প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকেই পৃথিবীর প্রায় সমস্ত সৃজনশীল মানুষকে ঘিরে ধরেছিল শরণার্থী-বোধ। যেমন প্ৰখ্যাত ফরাসি পরিচালক জঁ রেনোয়া এরই প্রভাবে ১৯৩৫ সালে নির্মাণ করেন ‘টনি’। ছবির নায়কের নামেই ছবি। আপাত এক প্ৰেমকাহিনির আড়ালে এখানে উঠে আসে উদ্বাস্তুর ছিন্নমূলতাই। টনি ইতালি থেকে ফ্রান্সে আসা এজজন উদ্বাস্তু। নারী-প্ৰেমকেন্দ্রিক অস্তিত্বের সংকটকে ঘিরে ছবিটি। পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাসে উদ্বাস্তুরা নানাভাবে ছড়িয়ে রয়েছেন। সিনেমা নির্মাতারা নিজেরা সরাসরি এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন সিনেমার সূত্রেই। এটা তো ঠিক, নিজভূমে পরবাসী- এটা তো যে-কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের সংকট। তাঁরা ক্রমশই হয়ে ওঠেন নিজেরই মুদ্রাদোষে একা। সিনেমায় গল্প বলা শুরু হওয়ার সময় থেকেই, অর্থাৎ নির্বাক যুগের শুরুতেই উদ্বাস্তু বিষয় হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের। চ্যাপলিনের ‘ইমিগ্র্যান্ট’-এর দু’বছর আগেই উদ্বাস্তু-জীবন ছবিতে এসেছে। মার্কিন পরিচালক রেজিনাণ্ড বার্কার ১৯১৫ সালে তৈরি করেন ‘দ্য ইতালিয়ান’- যার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি ইটালি থেকে মার্কিন দেশে আসা এক অভিবাসী। তাঁর ছেড়ে আসা প্ৰেম, পরদেশে তাঁর নিগ্ৰহ, ইত্যাদি নিয়েই ছবিটি। এটাই প্রথম উদ্বাস্তু পর্যায়ের চলচ্চিত্ৰ— এমনটা বলা হয়তো খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না। সিনেমার সেই শৈশবকাল থেকে আজ একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল সিনেমার যুগ অবধি অসংখ্য ডায়াস্পোরা-রিফিউজি-অভিবাসন বিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কোনও কোনও পরিচালক তো চিহ্নিতই হয়ে আছেন ডায়াস্পোরা চলচ্চিত্রকার হিসেবে। আমাদের আলোচনায় সেই প্রসঙ্গে আসতেই হবে। তার আগে বিশ্বসিনেমার শরণার্থীকেন্দ্ৰিক ছবির দিকে আবার কিছুটা দৃষ্টি দেওয়া যায়।

বলা বাহুল্য, এই ধরনের সব ছবি নিয়ে আলোচনা এই পরিধিতে সম্ভব নয়। শুধু কিছু প্রতিনিধিত্বমূলক ছবির প্রসঙ্গ টেনে আনা যাক। পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে যাওয়ার গল্প নিয়ে ইতালির পরিচালক পিত্ৰোতা জার্মির ‘দ্য পাথ অব হোপ’। সিসিলির একদল খনিশ্রমিক পরিবারবর্গ সমেত সীমান্ত ডিঙোয়— আশার রাজ্যে যাওয়ার আশায়, তাদের সীমান্ত ডিঙানোর লড়াই নিয়েই ‘পাথ অব হোপ’। এই সমস্যা যুদ্ধোত্তর জাপানেরও। হলিউড বার বার উদ্বাস্তু-স্রোতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। হলিউডের প্রবাদপ্রতিম পরিচালক এলিয়া কাজানের মতো পরিচালকও করেছেন ‘আমেরিকা আমেরিকা’। এর কাহিনিতে অনেকটাই সত্যতা রয়েছে। স্মৃতির প্রতি টান, নিজের জন্মভূমির টান, ছবিটির চালিকাশক্তি। তুরস্কের এক প্রান্তিক গ্রাম থেকে তথাকথিত স্বপ্নের দেশযাত্রার কাহিনি। সমস্ত পরিবারই তুরস্ক ছেড়ে মার্কিন মুলুকে। মাটির টানে পড়ে থাকেন এক বৃদ্ধ— পরিবারের প্রবীণতম সদস্য। মার্কিন দেশে এসে একের পর এক পরিবারের সকল সদস্যকেই মার্কিন মুলুকে নিয়ে আসে নায়ক। শুধু আনতে পারে না তাঁর বৃদ্ধ বাবাকে। তিনি স্বদেশের টানে অনড়। ছবির শেষে কিছু কথা শোনা যায় অফ ভয়েস-এ : “অ্যাণ্ড হি ডিড ব্রিং দেম। ইট টুক নাম্বার অব ইয়ারস বাট ওয়ান বাই ওয়ান, হি ব্রট দেম হেয়ার, একসেপ্ট ফর হিজ ফাদার। দ্যাট ওল্ড ম্যান ডায়েড হয়্যার হি ওয়াজ বোর্ন।”

বিভিন্ন পরিচালক বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিভেদে শরণার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে ছবি করেছেন। যেমন জাপানের অন্যধারার বিশ্বখ্যাত পরিচালক নাগিশা ওসিমা ১৯৬৮ সালে এক কোরিয়ান রিফিউজিকে নায়ক করে ছবি করেন। মূলত কমেডি, কিন্তু অন্তঃস্রোতে শরণার্থীদের অমরত্বের বয়ান। জাপানে এক কোরিয়ান রিফিউজির ফাঁসির হুকুম হয়। কিন্তু ফাঁসি দেওয়ার পরও তাঁর মৃত্যু হয় না। এরপর কী হবে, আইনের চোখেই বা কী করা যাবে- বিচারকমণ্ডলীকে ঘিরে এক কমেডি। শরণার্থীদের নিয়ে মূলত পরাবাস্তব ছবি হলেও পরিচালকের রাজনৈতিক ভাবনা ও বক্তব্য খুবই স্পষ্ট এই ছবিতে। সেনেগালের পরিচালক ওসমান সেমবেনে ১৯৬৬-তে নিৰ্মাণ করেন ‘ব্ল্যাক গার্ল’। ফ্রান্সে এক কালো নারী কীভাবে ক্রমশ একা হয়ে যান, স্বদেশ ছেড়ে পরদেশে এসে তাঁর এই নিঃসঙ্গতা। শরণার্থীর একাকিত্ব ছবিতে ওসমান নিজস্ব আঙ্গিকে- উগ্র নয় কিন্তু বিনয়ী হয়েও প্রতিবাদমুখর। গত শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে নানা রিফিউজি সমস্যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছবি। ১৯৪৮-এ তৈরি জর্জ স্টিভেনের ‘আই রিমেম্বার মামা’-তে এক নরওয়ে পরিবারের উদ্বাস্তু জীবনের উথাল-পাথালকে চিত্রিত করা হয়। মার্কিন পরিচালক মিচেল লিশেনের ‘হােল্ড ব্যাক দ্য ডন’ এই সিরিও-কমিক ছবিতে উদ্বাস্তু সমস্যাকে টেনে আনা হয়েছে অন্য কায়দায়। গল্পের নায়ক রুমানিয়ার এক গিগলো। সে আমেরিকায় ঢুকতে চায় এক মার্কিন নারীকে বিয়ে করে। মূলত উদ্বাস্তু সমস্যা বা অনুপ্রবেশ নিয়ে যে সিরিয়াস ট্রিটমেন্ট, তার ঠিক বিপরীত প্রান্তে এই ছবির অবস্থান। অনুপ্রবেশের কুটকচাল থেকে পরিচালক তৈরি করেন কমেডিগ্যাগ। পাশাপাশি গ্রেট ব্রিটেনের পরিচালক এডওয়ার্ড ড্রিটিক অত্যন্ত সিরিয়াসভাবেই উপস্থিত করেন এক ইতালিয়ান উদ্বাস্তুর প্রাত্যহিক অবিরত জীবন সংগ্রাম। পৃথিবীর সেরা পরিচালকদের অনেকেই শরণার্থী সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। যেমন জার্মান পরিচালক রাইনার ওয়েনার ফাসবিন্দার সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করেন ‘আলী : ফিয়ার ইট্‌স দ্য সোল’। এর কাহিনির কেন্দ্রে আছে জার্মানিতে অনুপ্রবেশ করা মরক্কোর এক যুবকের অসম প্রেম । এই অনুপ্রবেশকারী যুবক প্রেমে পড়েন তার চেয়ে পাঁচিশ বছরের বড় এক প্রৌঢ়া নারীর। এই প্রেমের মধ্যে দিয়েই পরিচালক ফাসবিন্দাৱ উপজীব্য করেছেন দেশ হারানো এক যুবকের স্বদেশ-অনুপস্থিতির যন্ত্রণাকে। শরণার্থী ছবিতে যে-সব বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ রয়েছে, তা কিন্তু শরণার্থী সমস্যা বা ভাবনাকে কার্যত অন্যতর কাঠামােচিন্তার পরিসরকে তুলে ধরে। এই পর্যায়ের এরকম আরও কিছু ছবি রয়েছে, যেমন ক্লেয়ার ডেনিসের ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ বা জোনাস মেকাসের রেমিনিসেন্স অব জার্নি টু লিথুয়ানিয়া’। শেষের ছবিটির মূল ভাবনা হল স্বদেশে ফিরে যাওয়ার তাগিদ। ঋত্বিক ঘটকের মতোই নিজের বাস খোঁজার নিরন্তর চেষ্টা। এই পর্যায়ের আরও কয়েকটি ছবি হচ্ছে : জোয়ান সিলভারের ‘হেস্টার স্ট্রিটস’, জী ম্যারি টেনোর ‘দি স্ল্যাপ অ্যাণ্ড দ্য কেয়ারেস’ বা ভিনসেন্ট ওয়ার্ডের ‘দি নেভিগেটর; অ্যান ওডিসি অ্যাক্রোস টাইম’। ইতালির স্বনামখ্যাত পরিচালক বার্নার্ড বার্তোলুচিও খুব সক্রিয়ভাবে আগ্রহ দেখিয়েছেন রিফিউজি ফিল্মের প্রতি। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি তৈরি করলেন ‘ভিসিজড’। এক ব্রিটিশ পিয়ানোবাদকের সঙ্গে আফ্রিকা থেকে আসা এক রিফিউজির সম্পর্কের টােনাপোড়েনের গল্প এটি। ফ্যামিলি রোনান্সের বাইরে বেরিয়ে বার্তোলুচির মুন্সিয়ানায় ছবিটি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের একক।

‘পাটিশন অব মেমোরি’ দিয়েই যে সব সময় নির্মিত হবে রিফিউজি ফিল্ম, এমন নাও হতে পারে। সীমান্ত ভেঙে অন্য দেশে যাত্রার যে চিত্রকল্প বা স্মৃতির স্তব্ধতা নিয়ে এক ভবিষ্যৎ অন্বেষণ ক্রমশই হয়ে ওঠে অনেক চলচ্চিত্রকারের প্রিয়তম বিষয়। যেমন গ্রিসের পরিচালক থিওডরোস আঞ্জেলোপোলুশ, যিনি স্মৃতির স্তব্ধতার ভবিষ্যৎ মৃত্যুকে ঘিরেই মিলন-উৎসব করেন। আর সেখানে ফিরে আসা স্মৃতি— প্রিয় মেমারি— ফেলে আসা সময়, এক উদ্বাস্তু জীবনের অন্য ইতিহাস। পরিচালক আঞ্জেলোপোলুশের আরেকটি ছবি ‘ল্যাণ্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’। এক মা অবৈধ সন্তানদ্বয়ের কাছে মিথ্যে বলেছিল যে তাদের বাবা জার্মানিতে থাকে। কন্যা ও পুত্র, এই দুই ছােট ছেলেমেয়ের জার্নি নিয়ে এই ছবি। মাতৃভূমি নয়, পিতৃভূমির দিকে তাঁদের যাত্রা। নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, এমনকী ছোট মেয়েটি ধর্ষণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। একটি দৃশ্যে ছোট ছেলেটি তার বোনকে ঘুম থেকে ডেকে বলে, “ওঠ, ভোর হয়েছে, আমরা জার্মানিতে এসে গেছি।” তখনই বোঝা যায়, তারা বাবার সন্ধান না পেলেও পেয়েছে পিতৃভূমি। সেই অর্থে ‘ল্যাণ্ডস্কেপ অ্যাণ্ড দ্য মিস্ট’ও হয়ে ওঠে স্বদেশ সন্ধানের ছবি।

একবিংশ শতাব্দী। বিশ্বায়ন। ওয়ান ভিলেজ। হাতের মুঠোয় পৃথিবী। আর সেই সময়ই একক মানুষ ক্রমশ হয়ে ওঠেন যেন এক দূরতর দ্বীপ। বিশ্বসিনেমাতেও খুব স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে এই বিচ্ছিন্নতা। পৃথিবীর বিভিন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক শরণার্থী বােধে আক্রান্ত হন। দেশভাগ-উদ্বাস্তু মনন-বিচ্ছিন্নতা-বাসভূমির অন্বেষণ— এই সবকিছুকে ছবির বিষয় করে তোলেন তাঁরা। বেলজিয়ামের জঁ পিয়ের ডারেভেলের ‘লোরনাস সাইলেন্স’, মালয়েশিয়ার তাই মিং লিয়াংয়ের ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু স্লিপ অ্যালোন’, গ্রেট ব্রিটেনের পাওল পোলানিস্কির ‘লাস্ট রিসর্ট’ এবং কেন লোচের ‘ইট্‌স এ ফ্রি ওয়ার্ল্ড’, ইরানের মজিদ মাজিদির ‘বারান’- এইরকম একবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত অসংখ্য ছবির কথা এসে পড়ে, কোনও না কোনওভাবে যার কেন্দ্রে এসেছে দেশহারানো আর স্বদেশটানের যন্ত্রণার কথা। এই শরণার্থী-চেতনা আচ্ছন্ন করেছে আঁভা গার্দ-খ্যাত চিহ্নিত পরিচালকদেরও। একবিংশ শতাব্দীর চলচ্চিত্ৰ যেন স্বদেশ-স্মৃতিরই চলচ্চিত্র।

আর আশ্চর্য, যে-দেশের মানুষের জীবনে ঘটেছে এক অসহনীয় স্মৃতি- ‘দেশভাগের তুমুল যন্ত্রণা’, শরণার্থী জীবনের অকল্পনীয় দুর্ভোগ- সেই ভারতবর্ষের সিনেমায় সবচেয়ে অনুপস্থিত শরণার্থীরাই। এক ঋত্বিক ঘটক বা একজন নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ বা তানভির মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পারে’র মতো ছবিগুলিকে মনে হয় যেন বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অথবা বাংলা বাদ দিলে পাচ্ছি গোবিন্দ নিহালনির ‘তমস’ বা এম এস মথুর ‘গরম হাওয়া’। এই হল মোটামুটি ভারতীয় সিনেমায় শরণার্থী চেতনার ছবি। হায়! দেশভাগ আর শরণার্থী জীবনের যন্ত্রণা প্রায় অনুপস্থিত আমাদের সিনেমায়।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close