Home কবিতা চার কবির ১২টি কবিতা >> মজনু শাহ / ওবায়েদ আকাশ / মীর রবি / রুহুল মাহফুজ জয়

চার কবির ১২টি কবিতা >> মজনু শাহ / ওবায়েদ আকাশ / মীর রবি / রুহুল মাহফুজ জয়

প্রকাশঃ March 15, 2018

চার কবির ১২টি কবিতা >> মজনু শাহ / ওবায়েদ আকাশ / মীর রবি / রুহুল মাহফুজ জয়
0
0

চার কবির ১২টি কবিতা >> মজনু শাহ / ওবায়েদ আকাশ / মীর রবি / রুহুল মাহফুজ জয়

 

[সম্পাদকীয় নোট : অন্য সব বইমেলার মতো এবারের বইমেলাতে প্রকাশনা সংখ্যার দিক থেকে কবিতার বই ছিল শীর্ষে। এখানে সেইসব নির্বাচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্য থেকে কিছু বাছাই কবিতা তীরন্দাজে প্রকাশ করা হলো। কয়েকটি গুচ্ছে প্রকাশিত এই কবিতাগুলির প্রথম গুচ্ছটি আজ আপলোড করা হলো। কবি ও প্রকাশকদের প্রতি তীরন্দাজের কৃতজ্ঞতা।]

 

মজনু শাহ

 

শিল্পকূট

 

প্রত্যেক রাতের একটুখানি মরমীকেন্দ্র থাকে। যখন গাছেরা ক্রমে
হয়ে ওঠে ভৌতিক। তুমিও শিল্পকূট, তখন, মধ্যরাতের দিকে
ধাবমান নীলবর্ণ পথিক। ঘুমের মধ্যেও তুমি চোখ
রাঙিয়ে গেছ কাল। ঘুমের মধ্যেও একা পড়েছিল আম আঁটির ভেঁপু।
যখন চুপ করে বসে থাকো সর্বস্ব হারিয়ে, পাহারা দেয় অন্তরীক্ষের
নিঃসীম স্তদ্ধতা? তোমাকে আদ্যন্ত ভিখারি করে দূরবীন শাহের গান।
কে বলবে, তোমার সামনে গায়ে আগুন ধরে যাওয়া একটি সিংহ
ছুটতে ছুটতে কোন্ নির্বাণে পৌঁছবে?

 

রুটিগাছের গল্প

 

কবিতা কোন্‌খানে? রুটিগাছের গল্প শুনি, সেটাই-বা কোথায়?
তারপর ধরো, বন্ধুত্ব। যে-কোনো মদ। অগ্নিময় আঙরাখা।
প্রেতিনীর আসা-যাওয়া শুরু হলে আমরা বিষয়ান্তরে যাব।
উপমাই কবিত্ব হলে গুবরে পোকার মতো ঘুরছ কেন?
তবু উপমা রেখে মাখো অলিভ। ইতরের মানদণ্ড, মেপে নিতে
আসছে তোমাকে। পার্পল রঙের পোশাক পরে
কেউ হয়ত খতম করতেই আসছে তােমাকে। কেন পার্পল,
জিজ্ঞেস করো না। কবিতা অন্তর্হিত যদি, বেকার-পাঠক
হিরামন পাখি খুঁজতে বেরিয়েছে, আপাতত জঙ্গলের পাশে
তাকে মুততে দেখা যাচ্ছে।
নগ্ন রুটিগাছ কোনোকিছুর সাক্ষী নয় আর ।

 

এই সুফি-রাস্তার ওপর

 

উড়াই নি ফুর্তির পায়রা। দুলি নি হ্যামকে। আমার জন্যে নয়
ক্ষীরকদম। শুধু হাউই ছুটে যাওয়া দেখি, আর, কাছে কাছে ঘুরছে
একটি মোরগফুল। দাঁড়ের ময়না বলে উঠল সহসা, অনিশ্চিত! অনিশ্চিত!…

ডায়েরিতে টুকে রাখলাম সেই নির্দেশ, এই তোমার মুকুল-রাঙানো পৃথিবী
পার হও, ঘুম ঘুম যত শব্দার্থ, ছোট ছোট পদক্ষেপে পার হয়ে যাওয়া

কখনো খুঁজি নি কোনো সংজ্ঞা। সন্ধ্যার ধূপছায়া ঝুঁকে আছে।
এই সুফি-রাস্তার ওপর। আমি রক্ষা করে চলি নিচু কোনো সুর।
আরও অনন্ত কোনো পুস্তক আর অন্ধকারে প্রস্থান, যেখানে কবিতা
ও বাঘিনী। নোনা হাওয়া ক্রমে ক্ষইয়ে দিচ্ছে সমস্ত মুখরতা।

কোনো তত্ত্বনির্ণয় করি নি। শুধু কোনো ক্লাউন যখন গুটিয়ে নেয় তার
পেখম, তার ইশারার ছন্দ, চাবুক, ঝুড়িভর্তি ডুমুর বয়ে নিতে থাকি।
তার অর্ধউচ্চারিত পঙক্তিমালা আমারই, আমাতে বিলীন হতে দেই
তার মৃত্যুরঙিন অবয়ব।

উৎস >> বাল্মীকির কুটির, চৈতন্য

 

ওবায়েদ আকাশ

 

হর্ষতরঙ্গ

 

হর্ষতরঙ্গ, তুমি নিবেদিতার জন্য এক টুকরো
জায়গাজমি রেখ

জানো যে, অসময়ে বজ্র-বিষয়ক মামলায়
তার চুলের গভীর দিয়ে ঢুকে পড়েছে রাষ্ট্রীয় শোষণ

এখন সে সমুদ্রকে বাজার আনিয়ে দেয়, গভীর রাতে
তার কামনার পাশে উন্মুক্ত করে ব্যক্তিগত মহার্ঘ শরীর

নিবেদিতা বোঝে তার নিশ্বাসের ওপর
কত দ্রুত গজিয়ে উঠছে সারি সারি দালান সভ্যতা

অথচ তার জন্য একটি কামরাও বরাদ্দ নেই, যেখানে সে
অন্তত নিজের শরীরটাকে খুলে
এক মুহূর্ত বিশ্রাম করিয়ে নিতে পারে!

আনন্দলহরী, তুমি নিবেদিতার বুকের ওপর থেকে
একটিও আগাছা উপড়ে ফেলতে যেও না

 

পাশের বাড়ি

 

পাশের বাড়ির মেয়েটি ব্যক্তিগত রূপ
মুখস্থ করে প্রতিদিন
একদিন পৃষ্ঠাগুলো খুলতে খুলতে
যখন একান্ত রাত্রির প্রয়োজন হলো

এই প্রথম সে সম্ভাব্য পরীক্ষার কথা ভাবল

তার জন্য নোটস এবং খাতা পেন্সিল বলপেন সমেত
অজস্র শুভাকাঙ্ক্ষী চারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে

মেয়েটি কিছুই দেখল না কিংবা সকলই দেখে
কারো সাহায্য ছাড়াই
হুড়মুড় পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়ল

শাওয়ার থেকে ঝরে পড়ছে প্রশ্নপত্রের ঝাঁঝ
দিনের পর দিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মুখে
বৎসরান্তের সমস্ত আলো হামলে পড়েছে

মেয়েটি আলোয় অবগাহন করছে আর
দূরদূরান্ত থেকে প্রেরক উড়িয়ে দিচ্ছে
ঋজু বর্ষণের হাওয়া

 

সকল পতিত পালকে

 

আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েছ পাখির পালক নিয়ে
বিদ্যাভ্যাসের সৌন্দর্য বর্ণনা
অথচ পালক তার মধ্যাকর্ষণ বনিবনা ছেড়ে
সাদা হৃদয়ের ক্ষতে
ব্যক্তিগত পতনশীলতা মুদ্রিত করে রাখে

জঙ্গলের বিপরীত থেকে পালক-বিদীর্ণ বুলেট
ধানক্ষেতের নিরীহ পাঁজরে বর্ষিত হতে দেখেছ-
ঝাউগাছের বিমূঢ় বেদনা হামলে পড়েছে তাতে

সকল পতিত পালকে নিরন্তর শোকের আবহ
স্বনির্বাচিত ভাষা-বন্দনায় একূল ছেড়ে ওকূল খরস্রোতা থাকে-
আর তাতে ভেসে যেতে থাকে সংসার, সেমিনার থেকে
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার তাবৎ সম্পর্ক-কোরাস…

বহুবার পালকবেষ্টিত হয়ে নিজেকে হারাবার স্রোতে
তিল তিল করে নিজেকে গুটিয়ে এনেছ প্রস্থানের পিঠে

তার কোমল অদ্ভুত ঘ্রাণে সম্মোহিত হতে
একদিন নিজেই হঠাৎ বিস্মৃত হয়েছ পালকের সমুদ্রগমন

 

উৎস >> তথ্যসূত্র পেরুলেই সরোবর, মাওলা ব্রাদার্স
মীর রবি

 

স্যাডনেস প্লাটুন

 

নির্মল সকালের মতন কোমল আর নির্জীব প্রতিটি মুখ আয়নাসদৃশ্য রোদের
কপাট খুলে দেয়। আমরা জানতে থাকি সূর্যদেব সমস্ত গ্যালাক্সির প্রতি বিমুখ;
বিক্ষুদ্ধতা তার পৃথিবীর কোনো কুমারীর প্রতি। কামরাঙা বাগানে স্প্রে
বিকেলের বোতাম খুলতে খুলতে যখন সব পাখি, ঘরে ফেরার আয়োজন করে,
সেহেতু চাঁদও তার প্রস্তুতি সারে প্রতিটি রাত তাকেই জেগে থাকতে হবে।

কেউ জাগুক কিংবা না জাগুক
সূর্য দেব
চন্দ্র দেবতা
জাগতে থাকেন।
জাগতে থাকেন একজন ব্যর্থ প্রেমিক, প্রেমিকা হারাবার পর রোজ সে পরকী-
য়ার নেশায় একটা হুতোম পাখির মুখোশ পড়ে। মুখোশের আড়ালে চাপা পরে
লিখিত পাপ, চিহ্ন সব মুছে দিতে থাকে শোকার্ত প্লাটুনের প্রতিটি খাঁজ।

 

প্রত্নতত্ত্ব

 

দিগন্তপ্লাবিত সবুজ মাঠ, কালো পাখির গান আর মৃতদের গীত, মিশরীয়দের
পিরামিড আমাদের জীবাশ্মের স্মৃতি খোঁজে। গঙ্গারিডই রাজ্য, রাজা ও রানির
কেচ্ছা ঠাকুমা’র ঝুলি ভরে পাঠ করান দেবদূতের প্রস্থান। প্রস্থান সংগীতের
সঙ্গে সঙ্গে অমর পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করি, কাব্যগ্রন্থ মেলে আবৃত্তি করি
মহামিলনের গান।

শঙ্খ ফুঁকে আকাশ রোদ- দেবতাদের স্বর্গযাত্রা, আর্য-অনার্য কিংবা দ্রাবিড়
সমবেত আদিম প্রত্নতত্ত্ব বা নৃ-বিজ্ঞান, মরে পড়া শাবকের গন্ধ শুকে শুঁকে
বলে দেন– বহু প্রাচীন, মানুষ প্রাচীন সভ্যতার। অথচ ওরা জানে না আমরা
সভ্য হতে হতে উত্তরাধুনিকেই মরে গেছি।
শামুকনামা

 

নকশিকাঁথা রিপু করে মাছরাঙা ঠোট, পিন-ক্ষতে কঁকিয়ে ওঠে শিমুল ফুল
কার্পাস চোখ দ্যাখে সাদা-কালো ব্যথা, বসন্ত বাউরি উড়ে যায়…
খসে পড়া পালকে পড়ে থাকে কিছু রঙিন দুঃখ।

পিনপতন নীরবতায় ডাকবাক্স সাইরেন
পিঠ উল্টে কাভার্ডভ্যান দৌড়
পিকাসোর ক্যানভাস কিংবা বিষ্ণুদা’র কবিতা
পোড়ামুখে সুখ শোঁকে ছ্যাকরার হাত

একটা সুঁই বিধে গেলে সম্বিত ফিরে পায় বোকা শামুক।

 

উৎস >> অ্যাকোয়ারিয়ামে মহীরুহ প্রাণ, দৃষ্টি।

 

রুহুল মাহফুজ জয়

 

ভূগোল

 

পৃথিবী ভ্রমণের ইচ্ছা হলে আমি আম্মার মুখের দিকে তাকাই

দরিদ্র বেদনা সব কপালে জমে হয়েছে আফ্রিকা-এশিয়া
মুখের নিচের দিকে থুতনিতে দৃশ্যমান লাতিন আমেরিকা
দুই গালে হাসির ভিতর লেপ্টে আছে ইউরোপ
আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়া

স্নো-ফল প্রসঙ্গে মা’র চোখে শীতকাল এঁকে গেছেন বাবা
ইচ্ছেই তখন সুবিপুল সাইবেরিয়া

পৃথিবী ভ্রমণের ইচ্ছা হলেই আম্মার মুখের দিকে তাকাই আমি

দেখি—
সমস্ত কাঁটাতার একেকটা বাবা
বাবার ফেলে যাওয়া মহাদেশ-
অবজ্ঞা
উচ্চতা বিষয়ক

 

শাদা পাহাড় আইসক্রিমের একটু পরপর, তারও বেশি নীল
ভয়ংকর। নিচের দিকে বায়ু শনশন মেঘের একলা মস্তানি টের পাই,
আকাশ মনোটোনের ভাই- অইখানে দেখার অতকিছু নাই।
গ্যাব্রিয়েলারাও বাতাস বটে উইড়া উইড়া এদিক-সেদিক যায়, আমি
কি আর একাই ডাকি তারে? যেকোনো ভাষাই তারে ডাকবার পায়।
ভালো না চরিত্র- ভদকার নেশায় গ্যাব্রিয়েলারে ডাইকা ডাইকা
বাতাস চিবাই, আল্লার কীড়া— আসমানেতে উড়বার কালে দেখবার
কিছু নাই।

 

পরীবিবি

বুড়িগঙ্গা পাড়ে চলে গেছে মাটিখোড়া
গুপ্তপথ, অই দুর্গ ধরে দৌড়ে গেছে
যে রাজপুত্র সেনাপতি সিপাহী ও ঘোড়া-
পলায়নপর মোঘল সেসব, চেটেছে।
রূপসুহাসিনী পরীর সুনামী দেমাগ।
কী এক অসুখ তার আজম-বিরাগ,
তা লিখে না ইতিহাস! মৃত্যুর বাগান
অমর করেছে নবাব শায়েস্তা খান।

মরে গিয়ে তুমি মরোনি— অই লালবাগে
ইরান দুখত রয়েছ চিরঘুমে শুয়ে।
তোমার পাথর আমি শুনেছি শাহবাগে।
বসে; পাশাপাশি কন্যা-মায় আছো দু’য়ে
ধনী কবরে পাহারা বসায়ে পাথর-
মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখে পিতার আদর।

 

ভাষা ও বিষাদ

কখনো কখনো মৃতরা সন্ধ্যার পাখির চেয়েও বাচাল-
কিচিরমিচির ভাষায় প্রলাপ বকে যায়

দাদীর চাহনিকে মনে হতো নির্বাক সিনেমাযুগ।
সাদাকালোয় দৃশ্যমান বড়ফুফুর কবর

মাটির উঠান অজস্র ফুল আষাঢ়বারান্দা মৃত্যুবাহক—

একটানা বৃষ্টির মধ্যে সবাক হয়ে ওঠে দাদীমার চোখ
ভাতঘুমে
পৃথিবী না দেখা সন্ততিরা কীসব যেন বলে যায়

মৃতদের ভাষা বোঝার জন্যে দশ বছর বয়সে আমি মরে গেছি
বৃষ্টির শব্দকে বর্ণমালা ধরে শিখে যাচ্ছি মৃত্যুনিনাদ

-জীবন খুঁইয়েছি ভাষা ও বিষাদে—

[সংক্ষেপিত]

উৎস >> কালো বরফের পিস্তল. জেব্রাক্রসিং

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close