Home কবিতা চার কবির ২০টি কবিতা >> তানিম কবির / মিছিল খন্দকার / তানভীর হোসেন / নুসরাত নুসিন

চার কবির ২০টি কবিতা >> তানিম কবির / মিছিল খন্দকার / তানভীর হোসেন / নুসরাত নুসিন

প্রকাশঃ March 26, 2018

চার কবির ২০টি কবিতা >> তানিম কবির / মিছিল খন্দকার / তানভীর হোসেন / নুসরাত নুসিন
0
0

চার কবির ২০টি কবিতা >> তানিম কবির / মিছিল খন্দকার / তানভীর হোসেন / নুসরাত নুসিন

 

[সম্পাদকীয় নোট : অন্য সব বইমেলার মতো এবারের বইমেলাতে প্রকাশনা সংখ্যার দিক থেকে কবিতার বই ছিল শীর্ষে। এখানে সেইসব নির্বাচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্য থেকে কিছু বাছাই কবিতা তীরন্দাজে প্রকাশ করা হলো। কয়েকটি গুচ্ছে প্রকাশিত এই কবিতাগুলির দ্বিতীয় গুচ্ছটি আজ আপলোড করা হলো। কবি ও প্রকাশকদের প্রতি তীরন্দাজের কৃতজ্ঞতা। এখানে মনে করিয়ে দিই, আজ কবি তানিম কবিরের জন্মদিন। তানিমকে তীরন্দাজের শুভেচ্ছা]

 
তানিম কবির >>

 

কেটে যাচ্ছে মালিহা জেরিন
কেটে যাচ্ছে মালিহা জেরিন
ফর্সা হচ্ছে আলো—

মধ্যনদীতে গাড়া ব্রিজের পিলার
ছায়া তার বসে আছে কূলে
চলন্ত ট্রেনের ছায়ায়
দ্বিখণ্ডিত রোদের ফিনকি ওঠা
বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছ
দ্রুতগামী ঘ্রাণ, স্লিপারে পাথরে
এত এত স্তুতিগান
স্বরবৃত্তে দুলে ওঠা লোহার বাগান
সরে যাচ্ছে ক্রমশ

ফর্সা হচ্ছে আলো

ঐকান্তিক মাউথঅর্গানের সুর
মুছে দিচ্ছে ভ্যাসলিন
ঘনিষ্ঠ ঠোট থেকে নিভে যাচ্ছে
বিকীর্ণ শীতের সকাল
জংশন ইয়ার্ডে ছিটিয়ে রাখা
ব্রেকভ্যান, গমের বগি
নড়ে উঠছে হঠাৎ
চাকায় লিখিত দুটি নাম
গড়িয়ে চলে যাচ্ছ

কেটে যাচ্ছে মালিহা জেরিন

সেমিজের ভীষণ সেলাইগুলো
আলগা হচ্ছে আঁধারে
অনুমেয় নাভির নিকটে খসে
পড়ছে নৈঋতের গিঁট
তারকাপতনের দৃশ্যগুলো জমে
আছে শরদিন্দু তিলে
অনড় অমিলে ঝাপটানো শ্লোক
মুখস্ত করছো কি
শবচিরকূট–স্তোত্ৰশামুক?

 
বাদামের সাঁকো
আমি কেন গেজদাঁত,
বাদামি রঙের চোখ প্রত্যাশা করি!
কেন ধরি বাম হাত অফুরান গন্ধের পুষ্পশুমারি

পরাণ পড়েছে,
উঠে দাঁড়াতে কি পারবে না আর?
পত্রপোড়ানো আলো; সে আলোয় ভেসে ওঠে তার।

বাতাবি লেবুর সার-সংক্ষেপে
নড়ে ওঠে তার—তাকাবার ভঙ্গিটি।
আমি কবে ভুলে গেছি হাঁটুজল জলপাই তবু

জলের ধমক আসে
বলে মনা ডুবে যাও, ডুবে—
ডুবের ভেতরে বসে, হাঁটুজলে লালরঙ শাপলা ফোটাবে।

আমি খাঁচার ব্যবসা করি
পাখি সব করে রব খাঁচার ভেতরে
আমি পাখিঅলা, ডানা ভাঙি—উড়তে বলিনি তাকে,

চুপচাপ বসে
থাকতে বলেছি শুধু থাকো—
উড়ে টুরে চলে গেছে গেঁজদাত–বাদামের সাঁকো।

 

 

রুশাই তারুশ
অসুখও আমার,
নিরাময়ও তুই

শিরাময় সুঁই যেন
বিপুল সিরিঞ্জ যেন
ভ্যাকুয়াম পুশ-

রুশাই তারুশ মম
রুশাই তারুশ…

 
সম্ভাব্য মৃত্যুদৃশ্য
রাত্রি হয়তো তিনটা বেজে পঁয়তিরিশের ঘর
একটা ট্রেন তো দাঁড়িয়ে রইবে, অন্যটা ফরফর
ঢুকেই ভীষণ বেরিয়ে যাবে খুব গতিশীল মনে
দুইটা ট্রেনের ক্রসিং হবে কসবা ইস্টিশনে

আমি থাকব একলা যেন ঘরহারা মন ভাবুক
অল্প ভেবেই ক্লান্ত দশায় পড়বে কারো চাবুক
ভগ্নপিঠে, চোখ উঁচিয়ে দেখব ফিরে তাকে
শাশ্বত প্রেম, সত্যিকারের অতীত মগ্নতাকে

আউটারে এক চিরকালীন শিয়াল দিতেই ডাক
অন্য প্রান্তে হুড়মুড়িয়ে গজিয়ে উঠবে চাঁদ
সামান্য দূর অতিক্রমেই সালদা নদীর পানি
চিকচিকাবে ডিউটিরত লোহার বিরিজখানি

সকল প্রকার শিহরণের সর্বদা এক টের
ভাসিয়ে নিবে হঠাৎ আমার সমস্ত হেরফের
রাত্রি হয়তো তিনটা বেজে বেয়াল্লিশের প্রায়
ট্রেনের ভিতর মৃত্যু হবে নিশুতি কসবায়

 
আমার মরণ
অনন্তকাল পেছন হতে বাজল ভায়োলিন
আমার মরণ আকাশবরণ কার্যকারণহীন

আমার মরণ পার্বতীপুর ঘুরতে গিয়ে পরে
আর আসে নাই ঘরে

আমার মরণ ধাতব দুপুর জং ধরা জংশনে
দৃশ্যত অংশ নেয়

অংশ নিয়ে বংশসমেত আমার মরণ তাতে
মিলিয়ে এবং ঝিলিয়ে গেছে অসহ্য ইস্পাতে

উৎস : কেটে যাচ্ছে মালিহা জেরিন, ঐতিহ্য, মূল্য ১২০ টাকা।

 
মিছিল খন্দকার >>

 
পারাপারহীন সাঁকো
ফুলের বাগানে এত এত ফুল ফোটে
আমার তো তবু লাগছে না ভালো মোটে।

চারপাশ থেকে প্রাণ ধরে টানে কারা?
কিন্তু বিকেলে নিসঙ্গ ছিল পাড়া!

কেউ যেন ডাকে, ইশারায় বলে, আয়।
যাব কিনা ভাবি, অন্যরা চলে যায়।

কে যে ফিসফিস, কার সাথে করে রতি!
জাম গাছ হলো শিরীষ গাছের পতি।

চাকা পাংচার, থেমে আছে গাড়ি মোড়ে-
কার ছেঁড়া ঘুড়ি ভিন ছাদে গিয়ে ওড়ে!

ছিঁড়ে ফেলা চিঠি বাতাসে উড়ছে, দেখি।
কোন বুকে ধান ভেনে চলে কার ঢেঁকি!

ঘরে নেই সাড়া, ঝুলে আছে তালা দ্বারে-
সবাই কয়েদি, সকলেই কারাগারে।

মৌচাক থেকে মধু নিয়ে যাও তুলে,
রেখে আসো মাছি সেইসব ফুলে ফুলে।

 
সন্ধ্যা পেরিয়ে
দিন চলে যায়, হেঁটে কেটে যায়, যাবে-
সিঁড়ি বেয়ে উঠে, দেখি ফুটে আছে টবে
একা এক ফুল, তার পাশে মৃদু কলি।
দ্রুত ফুটে ওঠো; মম ছোট বোন, বলি।

আলগোছে কিনা পাখিটাখি এসে ফের-
কোথাও হয়ত যাওয়া থাকে পাখিদের।
রেলিঙে হাঁটে তো; কী জানি ভাবে রে আর
উড়ে যায় নিয়ে একান্ত সমাচার।

অন্য ছাদের ঘুড়ি উড়ে গেলে; হাতে
সুতা নিয়ে বসে ছেলেপেলে দেয় যেতে।
কোনো কোনো ঘুড়ি টান অস্বীকার করে
স্বাধীনতা নিয়ে মগডালে ঝুলে ওড়ে।

পাশের কোটরে পাখির বাসায় ছানা
দেখে আর ভাবে, কবে যে মেলবে ডানা!
উড়াল বিষয়ে আমারো রয়েছে সাধ,
সন্ধ্যা পেরিয়ে পাখা মেলে ধীরে রাত।

 
আ-মরি কবিতা
কী যে সমীরণ, বাঁকা বায়ু বয়, আহা!
যাহাই কুহেলি, কুয়াশাও নাকি তাহা!

সতত সে তপে; ভ্রান্তি-ছলনে ফেলে
যেন মোরা কোনো সাগরদাঁড়ির ছেলে!

আজি শ্যাম হিয়া উথলি পরানে মেশে
জোড়াসাঁকো থেকে বজরা এসেছে ভেসে?

রণে যবে মম ক্লান্ত বাঁশরি দেখো,
একা পড়ে আছি আসানসোলের সাঁকো।

ঢের দিন হায় কাটিয়ে চিলের দলে
হয়ত মরব যে কোনো ট্রামের তলে!

সম্মুখে হেরি মাস্তুলে পাঞ্জেরি
শীতে-কুয়াশায় নোঙরে রয়েছে ফেরি।

নাঙা পদধ্বনি, দিগন্তে চলে উট-
ধ্বস্ত নীলিমা লিখে গেছে চিরকুট।

ওদিকে আয়শা মক্তব থেকে ফেরে।
চুল খোলা রোদে ঘাঁই মারে মাছ ঘেড়ে।

যে স্মিত দৃশ্যে রক্তিম হলে ফুল,
রসালো ভুট্টা বসে পড়ে নির্ভুল।

দুপুর নীরবে তাকায় হালিক টোনে
নাও, মেগ খাও’, বলে কালিদাস ফোনে।

আমি কিনা সব খুঁটিয়ে খাওয়ার কূলে-
প্যারাসুট তেল মাখি কুন্তলে-চুলে।

 
বৈশাখের দুপুরে বাগানে গাছেদের কাণ্ডকারখানা
সমুদ্র থেকে বহুপথ পাড়ি দিয়া
এসছেন কিনা যৌনকাতর হাওয়া,
পাতায় পাতায় জাগছে উত্তেজনা
এক গাছ ভাবে তার বুঝি আজ বিয়া।

ফলে সোনালুর গায়ে হলুদের দিনে
ফুরফুরা থাকে জামরুল গাছ পাশে-
বিবাহবিমুখ শিরিষের বিদ্রুপ,
ঢঙ ছাড় মাগী; টের পাবি চৈত মাসে।

বন্ধ্যা তালের মাথাব্যথা নাই তাতে
আকাশের দিকে তাকায়ে দেখছে মেঘ,
সুপারি গাছটা মাতাল চিত্তে দোলে
যেন তিনি আজ গিলছেন সাত পেগ।

বিধবা আমের আগ্রহহীন মুখ
তথাপি বাতাসে দেহ করে শিরশির,
চুপে; দূর থেকে দেখে স্বভাবের দোষে
ঘরসংসার ভাঙল রেইনট্রির।

 
উপশম
অর্ধপরিচিত বন্ধুর সামনে কোনো বিমূর্ত কারণে মুষলধারে কান্নার পর যেমন
লাগে, তেমন একটা লাগা বহুকাল হলো জাপটে ধরে আছে। দূর থেকে
লঞ্চের ডাক আসবে, মৃত্যুর মতো অনতিদূরের বিষন্ন বাশি নদীর এমন
নিকটে একটা নির্জন বাড়ির কথা ভাবি মাঝে মাঝে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে
পড়ি। দূর ধানক্ষেতে রাতে চোখ দুটো খুলে পড়া কৃষকের অস্থির হাতড়ানো
দুই হাত তখন আমার বুকের মধ্যে নড়াচড়া করে। তার আঙুলে বাজা থরথর
ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়। রাতকে তখন আবারও অর্ধপরিচিত বন্ধুর মতো মনে
হতে থাকে। নিজেকেও মনে হয় অপরিচিত। নিজের সামনে তখন চিৎকার
কামড়ে ধরে কাঁদতে আমার কেমন যে লাগে রে মিথুন!

 

 

উৎস : পুষ্প আপনার জন্য ফোটে, জেব্রাক্রসিং, মূল্য ১৪০ টাকা।

 
তানভীর হোসেন >>

 

 

ক্ষুধা
বিযুক্ত পাপড়ি গেল উড়ে।
আলো, আলোর আঁধারে ফুটে গেল দৃক
যেন আর কোনাে অন্ধতা ধরে নেই
লিলিথের ত্রপা! সজাগ পাখিটির পাশে
বৃদ্ধাটি যেন সব জেনেই পুঁতে গেছে খুঁটি,
পশুর সমুখে ন্যাড়া মাঠ, ক্ষুধা নড়ে ওঠে
মঠের গম্বুজে, দূরে। যতদূর উড়ে
মরে গেছে পূর্ণিমার ফানুস।
ধোঁয়ায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী খুলে খুলে
আসলে আমি লক্ষ্য করছি আমাকেই।

 
ইঞ্জিনঘর
হুইসেল দেয় সন্ধ্যার ট্রেন আজ ঝড় বৃষ্টির দিন
দশ বিশ ত্রিশ ক্রোশ দূর স্থির জংশন লোকজনহীন
রিকশার নীল হুড খুব নীল ভাদ্রের শেষ এই কয়দিন
নীল প্লাস্টিক সব পর্দার জল ধরলেই জ্বর হয় খুব
ঘোর হয় চোখ ঝাপসায় জ্বর নামলেই দিই খুব ডুব
বন্যায় গুম হয় সব চর হয় গুম খাল হাল চাষবাস
সেই বৃদ্ধের যার কেউ নাই যার পুত্রের আর খোঁজ নাই
ওই বৃদ্ধের

ইঞ্জিনঘর
ইঞ্জিনঘর বিভ্রাটহীন
ইঞ্জিনঘর খুব সুস্থির

দেয় বিদ্যুৎ, নাই বিদ্যুৎ তার যন্ত্রীর।
দেয় সিন্দুক, নাই সম্পদ তার যন্ত্রীর।

ইঞ্জিনঘর         চুপ রক্তের
ইঞ্জিনঘর         ঘর্মাক্তের
ইঞ্জিনঘর         সব শূদ্রের
ইঞ্জিনঘর         মন্দনহীন
ইঞ্জিনঘরময়    হিটলার।

ছায়াকর
ছায়ার ভেতর আঁকতে চেয়ে ছায়ার অবভাস,
তুলি হাতে বসে আছি বিব্রত বর্ণের সাথে দেবী,
নাতিশীত প্রতিবেশে নাই আলোর তীব্র উদ্ভাস।

সাইকো অয়নবায়ুভুক ঘোরে আর ঘোরে বেহিসাবি,
মেলা শেষে ছায়াগোধূলিপথে চাঁদের প্যারাবোলা,
আঁধারে তার গোলাকারে বসা সৌম্য আফিমসেবী।

কাঁপে হাত কাঁপে মন ফুটে ওঠে দূরে ইটভাটা,
বনের ওপারে খল ডাকিনীর ঘরে জাগে প্রেত,
ভুলেছি কৌশল কখন কেমনে হবে ছায়া আঁকা।

মানুষ ঠুনকো খুব তবু মানুষেই রাখি প্রেম,
মানুষে আঁধার খুব তবু মানুষেই খুঁজি আলো,
দ্রুত প্রকাশিত হও দেবী তব রূপ ঢাকে হেম।

খোলো ছায়া আমি ছায়াকর ছায়ার ভেতর যাবো,
ছায়ালীন যদি না হই তবে কার ছায়া আঁকাবো!

 
তুমি-আমি
বায়ু বইছে ডিঙি কাঁপছে এই যমুনায়
জল দুলছে মৃদু ফুলছে আর কেউ নাই
জানি তুমিও সেই রাত্রির কথা ভাবছো
সেই চাঁদটি তার উষ্ণতা নিয়ে কাঁপছো
হা হা মানসে কত প্রশ্নের নীল অভিবাস
কেন বেদনা কেন তাড়না এত হাহাকার
আমি ভিজেছি সেই সাগরে যার স্ফীত বুক
আর মেরেছি ক্রুর রাক্ষস যারা স্মৃতিভুক
তুমি কাঁপছো আমি হাসছি তুমি নিরাকার
আমি যান্ত্রিক গোর খুঁড়ছি হবে প্রতিকার
আধা জ্যোৎস্না ধীর বৃষ্টির ফোঁটা চমকায়
দেখ রশ্মির স্নায়ু ট্রেইলে আর আমি নাই।

 
আইসক্রিমঅলা
শীতকে এক কাঠের বাক্সে ভরে
ঘুরছে লোকটা, বিক্রি করছে রঙ
বেরঙের খুচরা শীত

জমানো আঁচল খুলে বাক্সের দিকে
এগিয়ে যাচ্ছে গ্রীষ্মক্রান্ত হাতেরা

আধুলি কুড়িয়ে কুড়িয়ে লোকটা বাড়ি
নিয়ে যাবে শুধু শীতের বাষ্পটুকু।

 

 

উৎস : রাতের অপেরা, জেব্রাক্রসিং, মূল্য ১৩০ টাকা।

 
নুসরাত নুসিন >>
কিরিচের গান

 

 

দেখে ফেলা স্বপ্নের দরজায় চাবুকের হিরন্ময় গান ঝুলে থাকে
অমীমাংসার হাওয়া বেয়ে দিগন্তরেখা চলে গেছে রুঢ় অস্তকালে

এইসব মগ্নদিনে ঈশানের আকাশ ছেড়ে কাফনে মোড়ানো এক তানপুরা
ধরেছি। নিজস্ব আঙুলে এমন এক সুর—এমন মাধুর্য পরিবাহী—এখন।
খসে পড়া উড়ন্ত পাতাটির হলুদ শিরা বেয়ে নিচে নেমে যেতে পারি
আমিও।

নিঃশব্দ পতন বুঝে নেবে নিঃশব্দ পথের ইশারা

একটি সচল ঘোরের রেখা ঘূর্ণিপাক তৈরি করতে করতে গতিশীল
যাত্রারম্ভ করে আর আমি সেই ঘূর্ণায়মান গতির শিকার, বক্র ও বেগের
শিকার, স্থিত আবাহন, সুর ও সুরার শিকার। চোখ চক্রকাল ডুবে আছে
শীতে—বরফ নিঃসৃত অনিন্দ্য কিরিচ কামনায়।

এইসব মায়াপ্রহরের শীতকাল শেষে কিরিচের গান নিয়ে আমি এখন
ফিরে যেতে চাই

 
সাজঘর

 

 

সাজের প্রবাহ, আমি খুলে ফেলেছি পোশাক–

এমনকি সুতো সমান পর্দার কপাট। অবমুক্ত শেকড় ছড়িয়ে একমাত্র
গাছেরাই পারে মাটিগর্ভে শরীরে শরীর মিশিয়ে প্রেম ও সাধনার অখণ্ড
পরিচালন। এতদিন ব্যঞ্জনাগুলো শুধু রূপকথা ফুল ছিল, তোমার
অনির্ণিত চোখ ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই তোমাকে প্রসাধনী বানিয়ে উড়েছি
তিরতির হাওয়ায়। এতদিন জনপ্রিয় উপাখ্যানে শুনেছি, পোশাকে
সৌন্দর্য বাড়ে, শিখে নাও রঙ ও বদল, অপহৃত হনন কৌশল।
লালপাতা শরীরে চোখকে বানিয়েছি তৃষ্ণা, প্রেমের বিপরীতে হত্যা
জেনেছি অথচ আমার পালক কিন্তু অনুক্তই রয়ে গেছে।

শুধু অভ্যস্ত চোখ অন্ধ পরিক্রমায় জেনেছে, আমি নির্মিত হয়েছি
সাজঘরে। দুনিয়াজোড়া অবমুক্ত শরীর সমাচার। এইসব লালা ও রূপ
শিখে গেছি, একেকটি পোশাক পরার ভঙ্গিতে এখন একেকটি পোশাক
খুলে ফেলি আর অন্ধ পরিক্রমার অন্ধকার অবশ্যই দরজা, অপাঙক্তেয়
সাজের পরিধি পেরোনোর…

 

লিবিডোজ্বর

 

 

সাপেদের মধ্যে যারা সঙ্গমে আত্মহত্যা ভালোবাসে, সঙ্গমের অধিক
মিলনপ্রবণ, তাদের সরল লীলায়িত গোপন একদিন একজোড়া কাছিম
অনধিকার আবিষ্কার করে ফেলে। ওরা বুঝে নেয়, কিছু গোপন সঙ্গমের
অধিক মিলনপ্রবণ – এই অভিজ্ঞান ওরা খোলসে প্রোথিত করে।

মিলনপ্রয়াসীদের বিপরীতে আমি কিছু প্রাণিপ্রজাতি দেখেছি। সঙ্গম
প্রবণতায় টান এলে এরা গাছেদের মতো বল্কল খুলে ফেলে। তারপর
প্রকাশ্য প্রণোদনা যাপন করে।

 
জোনাকি, আগুন
পৃথিবীতে নিরশ্রু আলো ঠিক কোন পথ ধরে আসে? এই পথে
শান্তিনগরের কুটির, গুচ্ছ জোনাকগ্রাম কতদূর?

ঘুম ভেঙে আলো আসে তবু

এই প্রশ্ন একদিন নিজস্ব বাতাসে মুহুর্মুহু আছড়ে পড়েছিল। ঈশানের
নিশানা ধরে বহুদূর যেতে না যেতেই জানা গেছে, জোনাকির কোলে
বসে আছে থইথই অন্ধকার, পথে পথে প্রতিসরণ ছড়িয়ে জেগে আছে
তারা- জ্বলে ওঠার, উজ্জ্বলসম আলোর বাসনায়।

ঘাসের অনুজ পাতারাও সমতলে বিছানা বিছিয়েছে উপরিতলে আকাশ
দেখবে বলে।
ডানাহীন
নক্ষত্রহীন
ছায়াপ্রতিম
তারাটি জেগে থাকে,
রাত্রির মতো নীরবতায়,
জোনাকির মতো পিদিমগুলো কতটা জাগায় জীবনআগুন!

 
বিরহের উৎকৃষ্ট ঘাসফুল ভায়োলিন
আজ আবার হাতে পেলাম ধুতুরার আশ্চর্য চেরাগ। চোখে ছড়িয়ে দিল
তীর্যক আলোর প্রতিদান। এমনতর আলোয় আমি নিজেই পাঠ করতে
চেয়েছি আহত মুদ্রার নিরশ্রু গান, দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস আর বিরহের
উৎকৃষ্ট ঘাসফুল ভায়োলিন। আমার বিপরীত চোখে এক অনাসক্ত বাদক
আর আমি ধুতুরা আলোয় আশ্চর্য জাদুমায়ার রুপালি গিট খুলি, আহা!
বন্ধন আমার নহে বলিয়াই কোনো বন্ধনকে ধরিয়া রাখতে পারি না।
আজ এমনই একটি শুনানি হলো যে বন্ধনে অনাসক্তি ও আনুগত্যের
পরিণাম এক।

গান যে করে সে আনন্দের দিক হইতে রাগিণীর দিকে যায়
গান যে শোনে সে রাগিণীর দিক হইতে আনন্দের দিকে যায়

তার মানে তুমি বলতে চাও বিরহই মৌলিক। আজ দেখতে পেয়েছি,
বাদকের চোখ বিপরীত পথের অভিমুখে…

উৎস : দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস, কাগজ প্রকাশন, মূল্য ২৫০ টাকা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close