Home অনুবাদ চিনুয়া আচেবে > বিয়েশাদি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

চিনুয়া আচেবে > বিয়েশাদি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

প্রকাশঃ August 11, 2017

চিনুয়া আচেবে > বিয়েশাদি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার >> অনূদিত ছোটগল্প >>> অনুবাদ : খালিকুজ্জামান ইলিয়াস
0
0

চিনুয়া আচেবে > বিয়েশাদি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার 

[আচেবের অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসের উপজীব্য নাইজেরিয়ার ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। কিন্তু কখনো কখনো রাজনীতি বা ইতিহাস ছাড়াও সমাজিক টেনশন ও ব্যত্তির ওপর তার প্রভাব বড় হয়ে দেখা দেয়। তবে আচেবের লেখায় একটা যে-ব্যাপার প্রায় অবধারিতভাবে প্রকাশ পায় তা হল একগুয়ে চরিত্রের পরাজয় কিংবা বিয়োগান্ত পরিণতি। বস্তুত হয় এটা না-হলে ওটা either/or-এর সমর্থন তিনি কখনোই করেন না। এর বিপরীতে both/and ধরনের আপোষ কিংবা সহনশীলতার পক্ষেই তিনি মত দেন। ইবো সম্প্রদায়ের সনাতন বিশ^াস ও প্রজ্ঞায় বলে, “যখন কেউ দাঁড়ায়, তার পাশে আরেকজন উঠে দাঁড়ায়।” অর্থাৎ, একচ্ছত্র শাসন বা আধিপত্যেও স্থান ইবো সমাজে কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এই গল্পেও নতুন ও পুরাতন বিশ^াসের সংঘাতে এরকমই একটা মত ইঙ্গিতে বলা হয়েছে বলে মনে হয়। গল্পটি শিরোনাম ছাড়াই প্রথম ছাপা হয়েছিল ইবাদান থেকে প্রকাশিত পত্রিকায়, মে ১৯৫২ সংখ্যায়। – অনুবাদক]

একদিন বিকেলবেলা লাগোসে ১৬ নম্বর কাসাঙ্গা স্টিটে নিজের বাসায় বসে নায়েমেকার সঙ্গে গল্প করছিল নেনে। এক পর্যায়ে সে জিজ্ঞেস করে, “তোমার বাবাকে লিখেছ?”

“না, ভাবছি। আমার তো মনে হয় ছুটিতে বাড়ি গিয়ে সামনাসামনি বলাই ভাল।”

“কিন্তু কেন? তোমার ছুটির তো এখনো মেলা দেরি- পুরো ছয় সপ্তাহ! আমাদের এই সুখের বার্তা তাকে এখনি দেয়া উচিত।”

নায়েমেকা দুদ- চুপ করে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে শুরু করে- এমন যেন শব্দ খুঁজে পেতে দেরি হচ্ছে: “তার কাছে কতটা সুখের খবর হবে জানিনা। হলে তো ভালই হত।”

“অবশ্যই হবে, না কেন, হতেই হবে,” কিছুটা বিস্ময় নেনের উত্তরে। “হবে না কেন?”

“তুমি তো সারা জীবন লগোসেই থেকেছ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকদের সম্পর্কে তোমার ধারণা খুবই কম।”

“এই কথাটা তুমি প্রায়ই বল। কিন্তু ছেলে বিয়ে করতে বাগদত্ত হলে লোকে অসুখী হবে- এ কেমন কথা ?”

“হ্যাঁ, বিয়ের কথাবার্তা যদি তাদের মাধ্যম না হয় তো তারা ভীষণ অসুখী হয়। আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো খারাপ-তুমি আমাদের ইবো সম্প্রদায়ের কেউ নও।”

এমন গম্ভীরভাবে হঠাৎই এতো হুট করে কথাটা বলা হল যে শুনে তাৎক্ষণিকভাবে নেনে কিছু বলতে পারে না। শহরের বহুমুখী পরিবেশে সে মানুষ। একজন মানুষ কাকে বিয়ে করবে না করবে সেটা তার সম্প্রদায়ের লোকজন ঠিক করে দেবেÑ ব্যাপারটা তার কাছে হাস্যকরই বটে।

শেষে তার মুখে কথা জোগায়, “ওই একটা কারণে আমাদের বিয়েতে তিনি আপত্তি করবেন- এমনটি বলছ না নিশ্চয়ই? আমার তো ধারনা ছিল তোমরা ইবোরা অন্য গোষ্ঠীর লোকদের প্রতি বেশ উদার।”

“সেটা ঠিক, আমরা উদার বটে, কিন্তু যখন বিয়ের প্রশ্ন আসে, তখন মানে তখন, ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আর এই ব্যাপারটা কেবল ইবো সম্প্রদায়েরই বৈশিষ্ট্য নয়। তোমার বাবা আজ জীবিত থাকতেন এবং যদি তিনি ইবিবিও-ল্যান্ডের মধ্যপ্রদেশে বাস করতেন তো তিনিও অবিকল আমার বাবার মতই হতেন।”

“জানি না, কিন্তু তোমার বাবা যেহেতু তোমাকে এত ভালবাসেন তাতে আমি নিশ্চিত যে তিনি অবিলম্বেই ব্যাপারটা মেনে নেবেন এবং তোমার গোস্তাকি মাফ করে দেবেন। তাহলে কাম অন, লক্ষী ছেলের মত তাকে একটা সুন্দর চিঠি লিখে এখুনি সব জানাও…।”

“না, লিখে কিছু জানানো ঠিক হবে না। চিঠিতে ব্যাপারটা জানালে বাবা নিশ্চিত ভীষণ আঘাত পাবে।”

“ঠিক আছে, বাবা, যা ভাল মনে কর। তোমার বাবা, তুমিই ভাল চেন।”

ওই সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় নায়েমেকে বাবার বিরোধিতা মোকাবেলার নানা উপায় খুঁজছিল- যেহেতু তিনি ওর জন্য মেয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। একবার ভেবেছিল যে বাবার চিঠিটা নেনেকে দেখাবে। কিন্তু আবার কি চিন্তা করে না দেখানোই ঠিক হবে বলে মনে করল, বিশেষ করে এই মুহূর্তে নয়। বাসায় ফিরে সে আরেকবার চিঠিটা পড়ে। মনে মনে না হেসে পারে না। উগুয়েকে তার ভালই মনে আছে। একটা মারদাঙ্গী গোছের মেয়ে যে সব ছেলেদের ধরে ঠেঙ্গাত নদীতে যাওয়ার সময়, তাকেও ঠেঙ্গিয়েছে একদিন। কিন্তু পড়ালেখায় সে ছিল এক গবেট ছাত্রী।

আমি তোমার জন্য পাত্রীর সন্ধান পাইয়াছি। তোমার সহিত খুবই মানানসই হইবে। সে আমাদের প্রতিবেশি জ্যাকব নায়েকের জ্যেষ্ঠা কন্যা উগুয়ে নায়েকে। তাহাকে উপযুক্ত খ্রীস্টান মতে লালনপালন করা হইয়াছে। কয়েক বৎসর পূর্বে তাহার স্কুল শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ায় তাহার পিতা (খুবই বিজ্ঞজনচিত ব্যক্তি) তাহাকে জনৈক পাদ্রী মহাশয়ের পরিবারে প্রেরণ করেন। সেখানে মেয়েটি একজন যথার্থ স্ত্রীর যাবতীয় কর্তব্যকর্মে দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছে। তাহার রবিবাসরীয় স্কুল শিক্ষক আমাকে অবহিত করিয়াছেন যে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাইবেল পাঠ করিতে সক্ষম। আগামী ডিসেম্বরে তুমি দেশে ফিরিলে আমরা কথাবার্তা পাকা করিব।

লাগোস থেকে দেশে আসার দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় নায়েমেকা একটা কাসিয়া গাছের নিচে বাবার সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলছিল। এই জায়গাটা বুড়োর নিরালা আশ্রয়। ডিসেম্বরের কড়া সূর্য যখন অস্ত গেছে এবং একটা ফুরফুরে তাজা হাওয়া পাতাগুলোর ওপর বইতে শুরু করেছে, তখন এখানে বসে বুড়ো বাইবেল পাঠ করে।

“বাবা,” হঠাৎ করেই নায়েমেকা বলে ওঠে, “বাবা, আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

“ক্ষমা? কেন বাবা, কি করেছ?” কৌতুহলি কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করে।

“ব্যাপারটা … মানে এই বিয়ের প্রশ্নে, বাবা।”

“কোন বিয়ের প্রশ্ন?

“আমি পারব না- আমাদের অবশ্যই- মানে আমার পক্ষে নয়েকে চাচার মেয়েকে বিয়ে করা সম্ভব নয়, বাবা।”

“সম্ভব না, কেন?” ওর বাবা জানতে চায়।

“আমার সঙ্গে তো ওর জানাশোনা ভাললাগার সম্পর্ক নেই।”

“কেউ তো বলছে না সে সম্পর্ক আছে। কেন থাকবে সে রকম সম্পর্ক ?” সে জানতে চায়।

“আজকাল বিয়ে তো অন্যরকম…।”

“দ্যাখ বাবা,” সে ছেলেকে থামায়।” কিছুই অন্যরকম নয়। বিয়ে যে করে সে বউ-এর ভেতর কী দেখে? দেখে সে সৎ চরিত্র  আর সৎ খ্রীষ্টান কিনা।” নায়েমেকা বুঝতে পারে যে এই লাইনে তর্ক করে কোন ফায়দা হবে না।

“না বাবা, আমি আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করব বলে কথা দিয়েছি। উগুয়ের যে সব গুণ, এই মেয়েটিরও সে সবই আছে, এবং সে…।”

ওর বাবা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। “কি বললি?” ধীরে এবং বেসুরো গলায় জিজ্ঞেস করে ওর বাবা।           “মেয়েটি বেশ ধর্মপ্রাণ খ্রীষ্টান, বাবা ” ওর ছেলে বলতে থাকে “এবং লগোসে সে মেয়েদের একটা স্কুলে পড়ায়।”

“পড়ায়? তুই বললি পড়ায়? সাদ্ধী স্ত্রীর জন্য যদি এটাকে গুণ বলে মনে করিস তো তোকে বলি, এমেকে, কোনো খাঁটি খ্রিস্টান মেয়েরই শিক্ষকতা করা উচিৎ নয়। করিস্থিয়ানে সেন্ট পল তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, “মহিলাদের উচ্চবাচ্য না করে চুপ থাকাটাই শোভনীয়।” আসন থেকে ধীরে উঠে সে এখন আগে পিছে পায়চারি করতে থাকে। এই বিষয়টি তার প্রিয় বিষয়। চার্চের যেসব নেতা তাদের স্কুলে মেয়েদের শিক্ষকতা করতে উৎসাহ দেয় তাদের সে তীব্র নিন্দা করে। এরপর লম্বা এক হিতোপদেশের ফিরি¯িত দিয়ে সে নিজের ছেলের প্রসঙ্গে ফিরে আসে। এখন গলার স্বর কিছুটা নরম।

“কার মেয়ে সে, শুনি?”

“সে নেনে আটাঙ, বাবা”।

“কী!” যেটুকু নমনীয় হয়েছিল, এবার সেটা মিলিয়ে যায়।

“তুই বলছিস সে নেনাটাগা? এর অর্থ কী?”

“কালাবারের নেনে আটাঙ। বিয়ে করলে আমি ওকেই করব,” উত্তরটা হঠাৎই একটু হঠকারি হয়ে গেল। নায়েমেকে ভাবল এবার ঝড় উঠবে। কিন্তু না, সেরকম কিছু হয় না? তার বাবা চুপচাপ নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে। অপ্রত্যাশিত এই আচরণে নায়েমেকে বুঝতে পারে না কি করবে। বাবার এই নিরবতা বরং ভৎর্সনা-ভরা বক্তৃতাবানের চেয়ে বহুগুণ বেশি মারাত্মক। ওই রাতে বুড়ো কিছুই মুখে তোলে না।

একদিন পর যখন সে নায়েমেকাকে ডেকে পাঠায় তখন ওকে নিবৃত্ত করার সবরকমের কৌশলই সে প্রয়োগ করে। কিন্তু যুবকের অন্তর তখন কঠিন হয়ে গেছে। শেষে ওর বাবা হাল ছেড়ে দেয় এই বলে যে ছেলে বখে গেছে, তার আর কোন আশা নেই।

“তোকে ভাল মন্দ পথের পরিচয় দেয়াটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। তোর মাথায় এই চিন্তাটা যে ঢুকিয়েছে জানবি সে তোর গলাতেও ছুরি চালিয়েছে। এটা স্বয়ং শয়তানের কারসাজি ছাড়া আর কী?” এই বলে সে ছেলেকে হাত নেড়ে বাতিল করে দেয়।

“নেনেকে দেখলে তুমি মত পাল্টাবে বাবা।”

“ওকে আমি কোনো দিনই দেখব না,” বুড়ো বলে। সেই রাত থেকে বাপবেটায় কচিৎ কথাবার্তা হয়। সে অবশ্য মনে মনে আশা করতে থাকে যে একদিন ছেলের বোধদয় হবে এবং সে জানবে কী মারাত্মক সর্বনাশার পথে সে ধাবিত হয়েছে। এখন থেকে সে দিনরাত তাকে প্রার্থনায় স্মরণ করতে থাকে।

নায়েমেকার কথা ধরলে বলা যায় বাবার দুঃখে সে গভীর মর্মবেদনা অনুভব করে। কিন্তু সেও আশা করতে থাকে যে একসময় ব্যাপারটা মিটে যাবে। যদি সে জানত যে তার সম্প্রদায়ের ইতিহাসে কোনো মানুষ এমন কোনো মেয়েলোককে বিয়ে করেনি যে ভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলে, তাহলে হয়ত তার আশা করার তেমন সুযোগ থাকত না। কয়েক সপ্তাহ পরে এক অশীতিপর বৃদ্ধ মন্তব্য করে, “বাপু, এমন কথা এর আগে কখনো শুনিনি।” এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি সে তার সম্প্রদায়ের সবার হয়েই বলে। সে অন্যদের সঙ্গে এসেছিল ওকেকের প্রতি সমবেদনা জানাতে যখন তার ছেলের আচরণের খবর রাষ্ট্র হয়ে গেছে। ততদিনে অবশ্য নায়েমেকা লাগোস ফিরে গেছে।

“এমন ঘটনা কেউ কখনো দেখেনি”; বিরসভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বুড়ো আরেকবার এই কথা বলে।

“আচ্ছা, এ ব্যাপারে আমাদের লর্ড কী বলেন ?” আর একজন জিজ্ঞেস করে। পুত্ররা তাদের পিতৃগণের বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করবে; পবিত্র গ্রন্থেই আছে এটা।”

“কলিকালের সবে তো শুরু প্রায়,” আরেকজনে কেউ বলে।

এভাবে শুরু হয়ে তা শাস্ত্রীয় বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়। তখন খুব বাস্তব বুদ্ধিধারী একজন, মাডুবোগউ, এই সব আলোচনা আবার সাধারণের বোধগম্যের ভেতর টেনে নামিয়ে আনে।

“তোমার ছেলের ব্যাপারে কোনো গুনিন কোবরেজ দেখাবার কথা ভেবেছ কি?’’ নায়েমেকার বাবাকে সে জিজ্ঞেস করে। “ওতো অসুস্থ নয়,” জবাব আসে।

“তাহলে কী? মনে তার গরল। এজন্যই দরকার এক গুনিন কোবরেজ যে ওকে সঠিক পথে ফেরাবে। ওর যে দাওয়াই লাগবে সেটা হল আমালিলে। স্বামীদের বেপথু ভালবাসাকে আটকে রাখতে এই একটি ওষুধ মেয়েরা বেশ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে।”

“মাডুবোগউ ঠিক বলেছে,” আরেক ভদ্রলোকের মন্তব্য, “এ ধরনের বিমারে লাগসই দাওয়াই।”

এসব ব্যাপারে নায়েমেকার বাবা তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন পড়শিদের চেয়ে খানিকটা এগিয়ে ছিল। এখন সে মুখ খোলে, “আমি কোনো ওঝা কবিরাজ ডাকব না। মিসেস ওচুবা হওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। আমার সন্তান যদি আত্মহননের পথ বেছে নেয় তো নিক, নিজের হাতেই সে নিক নিজের প্রাণ। আমি তাকে সাহায্য করতে যাব কেন?”

“কিন্তু দোষটা তো ছিল ওচুবারই,” মাডুবগউ বলে। “সে তো ভাল একটা কবরেজ ধরতে পারত। যা হোক সে কিন্তু দারুন চালাক মহিলা।”

“চালাক? আরে বল খুনি, শয়তান খুনি মেয়ে মানুষ সে,” কথাটা বলল জোনাথন। এই লোক পড়শিদের সাথে খুব একটা বিতণ্ডা করে না কারণ তার মতে ওরা যুক্তিতর্ক দিতে জানে না। “ওষুধ তার স্বামীর জন্যই তৈরি করা হয়েছিল এবং আমি নিশ্চিত এতে তার উপকারই হত। কিন্তু ওই কোবরেজের খাবারে শয়তানি করে ওষুধটা মিশিয়ে বলা হল যে ওষুধের গুনাগুণ একটু পরখ করে দেখা হচ্ছে।”

ছমাস পর নায়েমেকা তার নতুন বৌকে তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি দেখাচ্ছিল :

তোমার বিবাহের ছবি পাঠাইয়াছ। আমি ভাবিয়া অবাক হই এতটা অসংবেদনশীল কী করিয়া হইলে? আমার ইচ্ছা হইতেছিল ছবিটা ফেরত ডাকে পাঠাইয়া দেই। কিন্তু দ্বিতীয়বার চিন্তা করিয়া তোমার স্ত্রীর অংশটুকু কাটিয়া পাঠাইয়া দিলাম। উহার ছবিতে আমার কাজ নাই। ইচ্ছা করে তোমার ছবিও না রাখি।

নেনে চিঠিটা পড়ে নিজের কর্তিত ছবির দিকে তাকায়। ওর চোখ ভরে ওঠে জলে। ফোঁপাতে শুরু করে সে।

“কেদোঁনা, লক্ষ্ণী,” ওর স্বামী প্রবোধ দেয়। “মানুষ হিসেবে বাবা অসৎ নন, এবং দেখ একদিন আমাদের বিয়ে তিনি মেনে নেবেনই।” কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়, সেই একদিন আর আসে না।

এভাবে পুরো আটটি বছর পার হল; নিজের সন্তানকে নিয়ে ওকেকের কোনো গরজই নেই। তার মধ্যে মাত্র তিনবার (যখন নায়েমেকা ছুটিতে দেশে আসতে চেয়েছিল) মাত্র তিনবার সে ওকে লিখেছিল।

একবার এভাবে লিখল :

আমার ভিটায় তোমাকে আসতে দিতে পারিনা। তুমি কোথায় কিভাবে ছুটি কাটাইবা কিংবা সেক্ষেত্রে তোমার জীবনটাই অতিবাহিত করিবা তাহাতে আমার করণীয় কিছুই নাই।

নায়েমেকার বিয়ে সংক্রান্ত কটুকাটব্য কেবল তার গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; লাগোসে বিশেষ করে তার স্বগোত্রীয় যারা কাজ করত তাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়াটা আরেকভাবে দেখা দেয়। ওদের স্ত্রীরা তাদের সমিতির সভায় একত্রিত হলে নেনের প্রতি তেমন বৈরিতা দেখা দেয় না। বরং তারা ওকে একটু বেশিই পাত্তা দিতে থাকে- এমন যেন সে বুঝতে পারে সে ওদের একজন নয়, বাইরের কেউ। কিন্তু ক্রমে এসব সংস্কার উৎরে নেনে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব পযর্ন্ত গড়ে তোলে। ক্রমে কিছুটা ঈর্ষার সঙ্গেও ওরা মেনে নেয় যে গৃহস্থলি কাজে নেনে ওদের চেয়ে কিছুটা বেশিই করিৎকর্মা।

নায়েমেকা এবং তার নবপরিণীতা যে দিব্যি সুখে সংসার করছে এই খবরটা ইবোদেশের কেন্দ্রে অবস্থিত ওই ছোট্ট গ্রামটিতে পৌঁছে যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে ওর বাবা অন্য হাতেগোনা আর দুচারজনের মত কিছ্ইু জানত না। তার ছেলের নাম উচ্চারিত হলেই সে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করত যে লোকে তার সামনে নায়েমেকা সম্পর্কে কিছুই বলত না। প্রবল ইচ্ছাশক্তিবলে বেশ সাফল্যের সঙ্গেই ছেলেকে সে মনের অন্তরালে ঠেলে দিয়েছিল। সত্য যে এই শক্তির চাপে বুড়ো প্রায় মরতে বসেছিল, কিন্তু শেষ পযর্ন্ত সে পেরেছে, সে জিতে গেছে।

এরপর একদিন সে নেনের কাছ থেকে একটা চিঠি পায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠিটা খুলে সে চোখ বোলায়। কিন্তু হঠাৎ তার মুখের ভাবে পরিবর্তন আসে এবং সে একটু আগ্রহ নিয়ে পড়তে থাকে।

…আমাদের দুই ছেলে যখন থেকে জানতে পেরেছে যে তাদের একজন দাদুভাই আছে, তখন থেকে বায়না ধরেছে তার কাছে যাবে। জানি আপনি ওদের দেখতে চান না কিন্তু সে কথা ওদের কিছুতেই বলতে পারছি না। বাবা, আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করি। আগামী মাসে নায়েমেকার ছুটি আছে; তখন সে দুচার দিনের জন্য আপনার নাতিদুটোকে নিয়ে দেশে যাক। আমি এখানেই থাকব…।

বুড়ো  হঠাৎ অনুভব করে যে এত বছর যে কঠিন অর্গল সে দিয়ে রেখেছিল তা যেন আলগা হচ্ছে। নিজেকে সে বোঝায় যে না, কিছুতেই হার মানা চলবে না। ভাবাবেগের যত ফাঁকফোকর আছে সবগুলোতে সে ফের খিল দিতে চেষ্টা করে। যে সংগ্রাম সে করে যাচ্ছিল সেটারই আবার একটা মহড়া দেওয়ার চেষ্টা হল। সে জানলার শিকে ঠেস দিয়ে বাইরে তাকায়। আকাশ ঘন কাল মেঘে ঢেকে গেছে। বেশ জোরে বাতাসও শুরু হয়েছে। মুহূর্তে চারদিক ধূলা আর শুকনো পাতায় ভরে গেল। কখনো কখনো, যদিও বিরল, তো কখনো প্রকৃতিও মানুষের সংগ্রামে অংশ নেয়। এটা ছিল সেরকম একটি সময়। শীঘ্রই বৃষ্টি শুরু হল। মৌসুমের প্রথম বারিষ। বড় বড় ফোঁটায় নামল বৃষ্টি, সঙ্গে বিদ্যুচ্চমক আর বজ্রপাত। স্পষ্টতই ঋতু পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ওকেকে প্রাণপন চেষ্টা করে নাতি দুটোর কথা না ভাবতে। কিন্তু বুঝতে পারে যে এখন সে একটা হারের লড়াইয়ে নেমেছে। একটা প্রিয় হামদ গুনগুন করে গাওয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু টিনের চালে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা সেই গানের তানে আনে অসঙ্গতি। আবার মনে আসে বাচ্চা দুটোর কথা। ওদের মুখের ওপর কি করে  সে দরজা বন্ধ রাখবে? হায়, মানুষের মন, কে বোঝে এর কারসাজি? তার মনে ভেসে ওঠে যেন পরিত্যক্ত দুটো বাচ্চা বিষন্ন মুখে বাইরে ওই ক্রুদ্ধ ঝড় জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে- অথচ তার ঘরের দুয়ার অর্গল দিয়ে সাঁটা।

ওই রাতে বুড়োর ঘুম হয় না, ঘুম আসে না পরিতাপে- এবং একটা দুর্বোধ্য ভয়ও থেকে থেকে হানা দেয়- সে হয়তো বাচ্চা দুটোর মুখ না দেখেই মরে যাবে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close