Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ চিহ্ন > ছোটগল্প >> শ্রাবণী প্রামানিক

চিহ্ন > ছোটগল্প >> শ্রাবণী প্রামানিক

প্রকাশঃ June 22, 2017

চিহ্ন > ছোটগল্প >> শ্রাবণী প্রামানিক
0
0

চতুর্দশীর রাত, ঘন অন্ধকারে টর্চ হাতে পথচলতি মানুষ। হঠাৎ মেয়ে মানুষের গলায় গোঙানী, তারপর সশব্দ আঘাত। পথচলতি যুবক অন্ধকারে ভয় তাড়াতে গান ধরে। তার গানের সুরে মিশে যায় সৈয়দ বাড়ির বৌ আনজুর চাপা কান্না। আঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকলে একসময় জ্ঞান হারায় আনজু। তবে স্বামী মোমেন মিঞার আক্রোশ তখনো থামেনা—

‘বাঁনজা মাগী! তুই মোক চিনিস নাই এলাও, আজ তোক শেষ করি দেইম! শরীল নিঙড়ায় তেল বের করিম তোর। বছরের পর বছর যায় একনা ছওয়া জন্ম দিবার পারলুনা।’

অসাড় দেহে আরও কয়েক ঘা দেবার পর মোমেন মিঞা কুপি হাতে ঘরের ঝাঁপ খুলে বাইরে আসে। খালের জলে হাত-মুখ ধুয়ে আবার ঘরে ফেরে। মাটিতে পড়ে থাকে ‘বাঁজা বৌ’ নামে খ্যাত আনজু। বিয়ের ছয় বছরেও সে কোন সন্তানের জন্ম দিতে পারেনি। ওষুধ-কবিরাজ কোন কিছুতেই সে সম্ভবনার দ্বার উন্মোচিত হয়নি। বছরখানেক হলো দিন-রাত চলছে মোমেন মিঞার নিজস্ব চিকিৎসা। যেখানে যে শিকড়বাকরের নাম শোনে তাই এনে বৌকে খেতে বাধ্য করে। ফলের আশায় কিছুদিন উদগ্রীব অপেক্ষা এবং তারপরই চলে অ-শরীরী আক্রোশে আঘাত। মোমেন মিঞার বিশ্বাস, বংশধর ঘরে এলেই তার অবস্থা ফিরবে। সৈয়দ বাড়ির সুদিন আবার ঘুরে আসবে।

সৈয়দ বাড়ি একটাই এগাঁয়ে। পাকা পুলের পাশের বাড়িটা। এ গাঁয়ের উন্নতি আর সৈয়দ পরিবারের ধংশ দু’টোই চলেছে সমান্তরালভাবে। দোচালা টিনের ঘর, গোয়ালের পাশে আকাশসমান উঁচু খড়ের পালা। বাড়ির চারপাশে সুপারি, নারকেল গাছের আবেষ্টনী। আর তারপাশে বহুকাল আগের নড়বড়ে বাঁশের পুল। এসব ছিলো সৈয়দ বাড়ির অতীত ইতিহাস। তবে এই অহংবোধেই সম্ভ্রান্ত সৈয়দ বংশের নিঃস্ব কর্ণধার মোমেন মিঞা গাঁয়ের একমাত্র ধনী মনোহর চৌধুরীকেও আড়ালে আবডালে তার ‘ইয়ে’র সাথে তুলনা করে। এবং প্রকাশ্যে  চৌধুরীর স’মিলে একটা কাজ পাওয়ার জন্য এখন সকাল-সন্ধ্যা হন্যে দিয়ে পড়ে আছে।

সৈয়দ বাড়ির মূল বসতভিটা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। পূর্বের বৈঠক-খানার ভিটায় বসতি এখন। একখানা জংসর্বস্ব টিনের ঘরের হয়তো কিছু আব্রু থাকতো যদি তা একেবারে পাকা পুলের প্রান্তে এসে তার সম্ভ্রম রক্ষায় ব্যস্ত না হতো। মোমেন মিঞা অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। শুকনা কলাপাতা দিয়ে বেড়া দেওয়া ছাড়াও পুরোনো একখানা চট ঝুলিয়েছে বাড়ির কাল্পনিক সদর দরজায়। ছোট ছাপড়া ঘরের দাওয়ার পাশে কাঁঠাল গাছ। গাছের নিচে খরের ছাউনির রান্না ঘর। সেখানে মাটির হাড়িতে সারাদিনে একবারই চাল ফুটতে দেখা যায়। মোমেন মিঞা নদীতে মাছ ধরতে যায়, সেদিন তার বউ আনজু পরম যত্নে কানভাঙা, কালো ভূত এ্যালুমিনিয়ামের কড়াইতে মাছের ঝোল রাঁধে। বাকি দিনগুলোতে কচুসেদ্ধ করে মাটির হাঁড়িতে চাল ফুটতে দিয়ে আনজু দাওয়ায় এসে বসে। পেটে ভাত নাই আর সেই সাথে কোনো কাজও নাই। দিন পনেরো আগে চৌধুরী গিন্নী তার শহরে থাকা ছেলের জন্য একটা কাঁথা সেলাই করতে দিয়েছিলো। মনোহর চৌধুরী নিজেও মোমেন মিঞাকে কাজ দিতে কখনো অরাজি হন না। তবে মিঞা তার সম্ভ্রান্ত বংশের ভদ্দরলোকী ঠাঁটবাট বজায় রাখতে অন্যদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ হাতাহতির পর্যায়ে নিয়ে গেলে মনোহর চৌধুরী অন্য সব কর্মচারীর মতামতে মোমেন মিঞাকে কাজ থেকে বাদ দিতে বাধ্য হন।

গেল বার চৌধুরীর বস্ত্র ঘরে সন্ধ্যাকালীন গল্পের মজলিসে এক কামলা বস্ত্রঘরের কর্মচারী মোমেন মিঞাকে নিজেদের সাথে তুলনা করাতে মিঞার বংশ মর্যাদায় ঘা লাগে। কামলার এই আন্তরিক কথাকে স্পর্ধা হিসেবে ধরে বিবাদের সূত্রপাত। মারামারি দলাদলির এক পর্যায়ে মোমেন মিঞা সম্পূর্ণ একা এবং নিরুপায় হয়ে চৌধুরীর কাছে যায় বিচারের আশায়। তবে বস্ত্রঘরের কাজটি তার বজায় রাখা সম্ভব হয় না। চৌধুরী কথা দেয়— ‘স্বভাব যদি বদলাবার পারস তা হইলে মোর স’মিলোত আসি দেখা করিস।’

আজ দুদিন হল ঘরে চাল নাই। কচু সেদ্ধ খেয়ে দিন রাত এই কাঁথা সেলাই করে চলেছে আনজু। সেলাই শেষ করে চৌধুরীদের বাড়িতে দিয়ে আসতে পারলেই ওরা দের’শ টাকা দেবে। আনজু আজ প্রতিজ্ঞা করেছে কচু সেদ্ধ করবেনা। কাঁথা সেলাইয়ের টাকায় চাল কিনে আনবে। মনে মনে গরম ভাপ-ওঠা ভাতের কল্পনা করে আর ক্ষুধাটা আবার মোচড় দেয়। পরশুরাতের মারের ব্যাথা এখনো শরীর ছাড়েনি। সেলাই করতে করতে আনমনে সেই রাতের কথাই ভাবছিলো আনজু। সারারাত অজ্ঞান পড়েছিলো, দেখে সকালে প্রথমে ভড়কেছিলো মোমেন মিঞা। পরে চোখেমুখে পানির ছিটে দিতেই জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ খুলে দেখেছিলো নিজের রক্তাক্ত শরীর। পিঠে শিরদাড়ার নিচে ফেটে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধেছে। এখন সে স্মৃতি মনে পড়তেই, আপনা-আপনি একটি হাত চলে গেল ভাঙা পিঠের ক্ষতস্থানে। সমস্ত শরীরে জমাট ব্যাথা নিয়ে সেদিন ও শুকনা পাতা দিয়ে চুলায় আগুন দিয়েছিলো। ভাত ফুটে উঠলে মাড় গেলে রান্না ঘরেই পিঁড়ি পাড়ে। স্বামীকে ডেকে থালায় ভাত বেড়ে সামনে এগিয়ে দেয়। কিন্তু অভুক্ত আনজুকে সামনে বসিয়ে যখন মোমেন মিঞা হাড়ির শেষ ভতটুকু মুছে নেয়, ভরপেট খেয়ে তৃপ্তির উদ্গার তোলে, তখনই আনজু ঠিক করে— ‘এরপরও মোর গাত হাত তুললে মুইও ছাড়ি দিবার নও।’

আনজুর ভাবনা আর সেলাই দুটোই চলেছে উর্ধ্বশ্বাসে। খোলা আলুথালু চুল, দিকবিদিক শূন্য আনজু একের পর এক কাঁথায় ফোঁড় তুলেছে। ঠিক তখুনি মোমেন মিঞাকে দেখা যায় চালের পোটলা হাতে হন হন করে হেঁটে আসতে। পুলের ওপর থেকে ছেঁড়া চট আর কলাপাতার ফাঁকে চোখে পড়ে বউয়ের আলুথালু বেশে বসে সেলাই করার দৃশ্যটি।

‘সেলাইয়ের নাম করি বাইরে বসি থাকা! এতো ডাঙার পরেও আক্কেল নাই!’

মোমেন মিঞা চাপা গর্জন করতে করতে বৌকে শায়েস্তা করার জন্য হাতের কাছে আর কোন সহায়ক না পেয়ে জিগার ডাল ভেঙে নেয়। আনজু একধ্যানে সেলাই করছিলো বলে এতো তর্জন গর্জনেও তার হুস ফেরে না। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিঠের উপর সশব্দ জিগার ডালের আঘাত পরে। চকিতে উঠে পড়ে আনজু এবং পরবর্তী আঘাত এসে পড়ে বাঁ পায়ের হাঁটুতে। জিগার ডালের চেয়েও লোকটার মুখের তেজ আরও বেশি—

‘হারামজাদি, বাঁনজা! রূপের ঢলানি দিয়া আঙ্গিনাত বসি থাকিস। আন্দা-বাড়া, কাম-কাজ ভুলি গেইছিস? একটা ছওয়া জন্ম দিবার বেলাত নাই আমার বংশ নির্বংশ করলু তুই। মুঁই তোক তালাক দেইম।’

পূর্বের অভিজ্ঞতায় আনজু জানে কথা বাড়ালে মানুষটার মেজাজ আরও বেশি বিগরায়। তাই কোনমতে কাঁথাটা তুলে নিয়ে ঘরের ভেতর সেঁধায়। কিন্তু এবারে তার অনুমান ভুল প্রমাণ করতে হাতের লাঠি ফেলে এক লাফে ঘরে ঢোকে মোমেন মিঞা। চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টানে মাটিতে ফেলে বউকে—

‘তুই মোর ঘরোত ঢুকিলু কোন সাহসোত? মুই কইছং না, মুই তোক তালাক দেইম! বিরাও হামার ঘর থাকি!’ সে উঠে দাঁড়াতেই আবার হুঙ্কার—‘বিরাও কইছঙ!’

ভয়ে অথবা বিতৃষ্ণায় আনজু সত্যি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কাঁথাটা তখনো তার হাতে ধরা। তবে ওটা যে বয়ে নিয়ে চলেছে এ-বোধ তার এখন নাই। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে সোজা, নাক বরাবর। হঠাৎ খেয়াল হয়, দুই হাতে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে রেখেছে চৌধুরী বাড়ির কাঁথা। দু’দণ্ড দাঁড়ায়, ভাবে— ‘খ্যাতাটা নিয়ে গেল হয় তো দ্যাড়’শো টাকা পানুং হয়…না ও পাকে মুই আর যাবারই নঙ। আর টাকা এ্যালা মোর কি কামত লাগে? মোর তো ঘর-সংসার কিছুই নাই। মরিম! মুই আইজ মরিম!

আনজু হাঁটছে বিরামহীন। কখনো কাঁদছে, কখনো বা প্রলাপ বকছে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় সামনে কাঁটাতারের বেড়া দেখে। তিনটে গ্রাম ছাড়িয়ে আনজু এখন ঘুঘুরহাঁট গ্রামের শেষ মাথায়। বর্ডার, কাটাতারের বেড়া এসব সে কখনো দেখেনি। এতকাল লোকমুখে শুনে এসেছে যে, বর্ডার এলাকায় ভারতীয় চোরাই জিনিস পাওয়া যায়। এর বেশি আর কিছু জানা নেই তার। সহসা একজনের গলার আওয়াজ কানে আসে। এদিক-ওদিক তাকায়। কিন্তু কাউকে দেখতে না পেয়ে কাঁটাতারের পাশের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পর চোখে পড়ে কাঁটাতারের ওপাশে যাওয়ার জন্য গেট। এবং সেটা খোলা। ওপারের কিছু মানুষের চাষের জমি কাঁটাতারের সীমারেখায় এখন এপার বাংলায়। ঘর-বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, চাষের জমি সবকিছু ভাগাভাগির নির্ধারক এই কাঁটাতারের বেড়া। দিনের আলো থাকা পর্যন্ত তিন মাইল পরপর এই গেটগুলো খোলা রাখা হয় ওপারের কৃষকদের চাষাবাদের সুবিধার্থে।

এতক্ষণ পর আনজু এটা বুঝেছে, কাঁটাতারের ওপাশটা সেই অন্য দেশ। ভারত। তাই আর দ্বিধা করে না— ‘হোক তাই হোক! মোক আর কোনঠেও খুঁজি পাবার নন। মুই ভারতই যাইম।’

এখন সন্ধ্যা নামছে। জনমানব শূন্য চরাচর। দুর্বল অনাহারী শরীরে একনাগাড়ে এতটা পথ হাঁটার ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীর ভেঙে পড়তে চায় তার। কথায় বলে, ‘রাগের মাথায় শক্তি জোগায় ভূতে।’ হঠাৎ এইভাবে দেশ ছেড়ে ভীন দেশে এসে পড়ায় আনজুর চিন্তাশক্তি কিছুটা গতি পায়। এবার তার ভাবনা হয়— ‘এঁটে আসা ভুল হোইল না কি? তার চেয়ে মোর বাপের ঘরত যাওয়া ভাল্ ছিল হয়!’

অন্ধকার রাত। চারপাশে ঝোপ-জংলা। ঝিঁঝিঁ আর গবরীপোকার ডাকে কানপাতা দায়। এতটা পথ এভাবে হেঁটে আসার পর এই প্রথম ভয় অনুভূত হয় তার। সহসা তার শরীরে এসে পড়ে তীক্ষ্ণ আলো। আলোর তিক্ততায় চোখ বন্ধ করলে, কানে আসে পায়ের আওয়াজ। চোখ-মুখ ছাড়িয়ে নিচে নেমে আসে আলো। ক্রমাগত ওঠানামা করে আনজুর শরীরে। চোখ খুলে আলোর বিপরীতে থাকা মানুষটিকে ভালো মতো দেখতে পায় না। তবে এটুকু বোঝে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আকৃতিতে বিশাল এক পুরুষ। আবারও ভয় পায় সে। পিছিয়ে যায় কয়েক পা। তখনই প্রশ্ন আসে— ‘কাঁহা যা রাহো তুম? কিছুক্ষণ নিরবতা তারপর আবার সেই কণ্ঠস্বর— ‘কিউ নেহি বোল্ রাহে তুম? ম্যা তুমকো কুছ পুঁছনা চাতি হো; বোল!’ নিরবতার প্রচণ্ডতা বাড়াতে বোধহয় থেমে যায় ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ঝিঁ-ঝিঁ-ঝঁ। আনজুর মুখে কথা সরে না। আবারো টর্চের আলোর তীক্ষ্ণতায় চোখ ঝলসায়— ‘ আমি আনজু, আনজু। বাড়ি…বাড়ি ঐ এগারো মাথা গ্রামত। এটি আইছং’…হঠাৎ টর্চের আলো নিভে যায়। আনজুর দিকে বিএসএফ জোয়ান এগিয়ে আসে, হাত রাখে ভর কাঁধে। চমকে উঠে দ্রুত পিছু হটতেই মাটিতে পড়ে যায় আনজু। আবার জ্বলে উঠলো আলো। সহসা উঠে দাঁড়ায় আনজু। জোয়ানের গলায় এখন অপেক্ষাকৃত কোমলতা— ‘আও মেরা সাথ।’ অতিক্রান্ত দু-এক মুহূর্তে জোয়ানের বিরক্তি শেষ সীমানায় পৌঁছালে আর অপেক্ষা করেনা সে। শক্ত হাতে ধরে আনজুর হাত। অশক্ত আনজুকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যেতে খুব বেশি বলপ্রয়োগ করতে হয় না তার।

গ্রামে এখন গভীর রাত। মোমেন মিঞার আনা চালের পোটলা এখনও পড়ে অবহেলায়। দুপুর গড়িয়ে যাবার পর মোমেন মিঞার হাঁক-ডাকেও যখন কোন সাড়া আসেনা, তখন কেবল একটু চিন্তা হয় তার। এতটা সময় তার ধারণা ছিলো— ‘ ত্যাজ দ্যাখায়া যাইবে কোনঠে? ক্ষিদার জ্বালায় সেইতো হামার ঘরত আসিয়াই ভাত আন্দিবে!’ তখন শুরু হয় বাড়ির আশে-পাশে খোঁজা। আইজুদ্দি, রহিম ব্যাপারী, বুড়িমার বাড়ি, পুকুর, ঝোপ-ঝাড়, রাস্তা কোথাও সৈয়দ বাড়ির বউকে দেখা যায় না। সবার পরামর্শে তিন ক্রোশ দুরে নিজের ছোটবোনের বাড়িতে একবার খোঁজ নিতে যায় মোমেন মিঞা। তবে ছোটবোন নিরুদ্দেশ ভাজকে নিয়ে কোন কৌতুহল দেখায় না, বরং বাড়ির পোষা মোরগের মাংস দিয়ে ভাইকে ভাত খেয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। ক্ষুধার পেটে ছোট বোনের এই প্রস্তাব তখন মোমেন মিঞার কাছে হঠাৎ লটারি জেতার মতো আনন্দের। খেতে বসে একথা সেকথার পর ছোটবোনের পরামর্শ শুনে মনে কিছুটা স্বস্তি আসে তার—

‘তোমরা হামার কথাটা একবার শোনেন, ঐ বাঁনজা মহিলাক এবার ভুলি যান। সে গেইছে তো গেইছে। যাউক। ওকে পথে পথে খুঁজি নিজের শরীল নষ্ট করেন না।’

গভীর রাত পর্যন্ত জেগে অনেক কিছু ভাবে মোমেন মিঞা। সেখানে তার স্ত্রীর জন্য কোন কষ্ট বা ভালোবাসা কিছুই অবশিষ্ট নেই। বরং মনে হয়— ‘মাও বাঁচি থাকিল তো বিয়ার জন্য পাত্রী খুঁজিল হয়।’

আনজুকে যখন টেনে-হিঁচড়ে ব্যারাকে আনা হয়, তখন তার অবস্থা প্রায় মরমর। তখন সেখানে বিএসএফ-এর চারজন জোয়ান। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় তারা ঠিক করে নেয় নিয়মমাফিক আগামীকাল তারা মেয়েটিকে ভারতীয় পুলিশে হস্তান্তর করবে। তবে আনজুর অবস্থা দেখে তারা বুঝতে পারে, সব কিছুর আগে ওকে কিছু খাবার দেওয়া প্রয়োজন।

ব্যারাকের একটি কামরায় এককোণে পড়ে আছে আনজু। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না, এখানে এই অবস্থায় তার ঘুমানো ঠিক হবে কি-না, ওরা ওকে নিয়ে কি করতে চায় এ প্রশ্নেরও কোন উত্তর খুঁজে পায় না আনজু। ভাবনার এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুম ভাঙে তল পেটে আর বুকের অসহনীয় চাপে। কঁকিয়ে উঠতেই তার মুখ চেপে ধরে একটি বলিষ্ঠ হাত। নিভৃত অন্ধকারে আসুরিক শক্তির কাছে নিজেকে সমর্পন করতে বাধ্য হয় আনজু।

হঠাৎ কোথাও একটা আলো জ্বলে ওঠে। মুহূর্তে কামরার আলো-ছায়ায় আনজু চিনতে পারে সন্ধ্যাবেলার দেখা সেই প্রথম জোয়ানকে। সহসা কিছু কথা, বুটের আওয়াজ, আলোর ঝলকানি— আর এর মধ্যেই পালিয়ে যায় জোয়ানটি।

পরদিন সকালে বিএসএফ ব্যারাকে গোপন বৈঠক বসে। গতরাতের ঘটনায় বিতর্কিত জোয়ানটি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এবং ক্ষমা চায়। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়— এই ঘটনা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে এবং ধরা-পড়া মেয়েটিকে ভারতীয় পুলিশে হস্তান্তর করা হবে। সেখানে আনজু ছিল সম্পূর্ণ প্রতিরোধহীন। নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভারতীয় সীমানায় প্রবেশের অপরাধে অপরাধী আনজুকে তারা চার মাসের জন্য জেল হাজতে পাঠায়।

এখন আনজু ভারতের উত্তরবঙ্গের একটি জেলের কয়েদী। সেই রাতের পর প্রায় তিন মাস চলে গেলেও সে এখনো সুস্থ হয়নি। ক্রমশ বাড়ছে তার শারীরিক সমস্যা। তবে আনজুর অন্তরাত্মা জানে, কী কারণ এই অসুখের। কয়েদী আনজুকে তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে করানো হয় প্যাথলজিক্যাল টেস্ট। এবারে মেডিক্যাল সায়েন্সে লিখিতভাবে ধরা পরে তার রোগের পটভূমি সমেত ইতিবৃত্তান্ত। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নতুন মোড় পায়।

আবার মামলা-শুনানি, উকিল, জজ, কোর্ট সবকিছু ঘটতে থাকে নিয়ম মতো। আনজুর মত বা অমতের কোন প্রশ্ন সেখানে ওঠে না। শুধু অবস্থানের বদল ঘটে। এবারে অপরাধী, ঘটনার সূত্রপাতের সেই জোয়ান এবং ভিকটিম আনজু। শুনানির এক পর্যায়ে বিএসএফ জোয়ানকে দেখিয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, সে তাকে চেনে কি-না। মাথা তুলে তাকায় আনজু, স্বচ্ছ দিনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে ব্যারাকের অন্ধকার রাতের ঘটনা, আবছা আলোয় দেখা মানুষটি। তার স্পষ্ট গলার স্বীকারোক্তি— ‘হামার এই ম্যানষের উপরে কোনই রাগ নাই, অভিযোগ নাই। এই ম্যানষের কারণেই মুঁই পরমান দিবার পারছঙ, হামার সন্তান জন্ম দিবার ক্ষমতা আছে। মুঁই বাঁনজা না…বাঁনজা না।’ তার দীর্ঘ অসুখী দাম্পত্যের এই সুরাহায়, মনে মনে অজস্র ধন্যবাদ জানায় তার স্রষ্টাকে। ধীরে ধীরে চোখ ঘুরিয়ে আপাদমস্তক আরেকবার দেখে জোয়ানটাকে।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close