Home লিটল ম্যাগ ‘চিহ্ন’ : দিকচিহ্নবাহী ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা এবং চিহ্নে প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

‘চিহ্ন’ : দিকচিহ্নবাহী ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা এবং চিহ্নে প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

প্রকাশঃ April 7, 2017

‘চিহ্ন’ : দিকচিহ্নবাহী ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা এবং চিহ্নে প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার
0
0

‘চিহ্ন’

দিকচিহ্নবাহী ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

 ‘চিহ্ন’– ঢাকার বাইরে থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন। সাহিত্যপ্রেমী একঝাঁক তরুণের সহায়তায় পত্রিকাটি সম্পাদনা করে চলেছেন গল্পকার-প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক শহীদ ইকবাল। ইকবাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, কিন্তু বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলের বাইরে বেরিয়ে এসে তিনি সতেরো বছর ধরে চিহ্ন পত্রিকাটি সম্পাদনা করে আসছেন। এই মুহূর্তে যে সংখ্যাটি আমার হাতে আছে, সেটি এর ৩২তম সংখ্যা। বোঝাই যায়, লিটিল ম্যাগাজিনের গুরুত্ব তিনি ভালই অনুধাবন করেছেন, তাই বাজারি কাগজের মোহ ত্যাগ করে প্রকাশ করে চলেছেন ‘চিহ্ন’ পত্রিকাটি। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত হলে, আমি নিঃসন্দেহ, পত্রিকাটি ভালো প্রচারণা পেত শুধু চমৎকার একটি মানসম্পন্ন লিটিল ম্যাগ প্রকাশের কারণে। এই সংখ্যাটির কথাই ধরা যাক, ‘এই সময়ের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য’ শীর্ষক ক্রোড়পত্রে সমৃদ্ধ ৩২তম সংখ্যাটি। ভাবা যায়, দশটা-পাঁচটা নয়, ২৯টি ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে এতে। গল্পকারদের তালিকায় আছেন প্রখ্যাত হাসান আজিজুল হক থেকে শুরু করে তরুণ হামিম কামাল অব্দি। পুরো তালিকাটা এরকম : নাসরীন জাহান, রাখাল সাহা, আবু হেনা মোস্তফা এনাম, উম্মে মুসলিমা, মূর্তালা রামাত, নূরুননবী শান্ত, ইবাইস আমান, সৈয়দ তৌফিক জুহরী, ওয়াসিকা নয্হাত, তাশরিক-ই-হাবিব, মাসুদ পারভেজ, গওহর গালিব, মেহেদী ধ্রুব, ইফতেখার মাহমুদ, বিপম চাকমা, শফিক আশরাফ, শাহনাজ নাসরীন, সজল বিশ্বাস, আনিফ রুবেদ, স্বকৃত নোমান, পিন্টু রহমান, আশরাফ জুয়েল, এমরান কবির, হামিম কামাল, সবুজ মন্ডল, সৈকত আরেফিন, মর্মরিত ঊষাপুরুষ ও শহীদ ইকবাল।

এখানেই শেষ নয়, আছে গল্প-বিষয়ক নতুন দুটি প্রবন্ধ, লেখক ইমতিয়ার শামীম ও হোসেনউদ্দীন হোসেন। পুনঃমুদ্রিত হয়েছে পাপড়ি রহমান, নাসরীন জাহান, সুশান্ত মজুমদার ও আবু জাফর শামসুদ্দীনের গল্প নিয়ে লেখা প্রবন্ধের। তিনশো পৃষ্ঠার এই ক্রোড়পত্রটি যে আমাদের সমকালীন গল্পকে অনেকাংশেই তুলে ধরতে পেরেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছোটগল্পের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে, গবেষক ও অনুসন্ধিৎসুদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য একটি সংখ্যা।

ক্রোড়পত্রের বাইরেও চিহ্নের নিয়মিত বিভাগগুলিও যথারীতি আছে এই সংকলনে। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, সাক্ষাৎকার, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, বই ও পত্রিকা আলোচনা, পাঠক প্রতিক্রিয়া, পত্রিকা ও পুস্তক পরিচিতি, ধারাবাহিক রচনা নিয়মিত লেখা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। সবার শেষে আছে তথ্যবহুল একটা জরুরি তালিকা- ‘বাংলাদেশের ৫০ বছরের গল্প ও গল্পকার’-এর তালিকা। আসলে গত পঞ্চাশ বছরে যত গল্পের বই বেরিয়েছে বাংলাদেশে, তারই একটা তালিকা এটি। গবেষক ও লেখকদের জন্য এই তালিকাটি যে কতটা জরুরি হয়ে ‍উঠবে, সেকথা বলাই বাহুল্য। শহীদ কাদরী আর সৈয়দ শামসুল হককেও একপাতা একপাতা করে প্রতীকী অর্থে স্মরণ করতেও ভোলেনি চিহ্ন। সংখ্যাটি উৎসর্গও করা হয়েছে তাঁদের দুজনকে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে হাসান আজিজুল হকের ৩৪ পৃষ্ঠাব্যাপী মুদ্রিত দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার, যেটি এই বিশেষ সংকলনের প্রধান আকর্ষণ বলে আমি মনে করি। তাঁর নিজের গল্প আর সমকালীন গল্পচর্চার পূর্বাপর বিশ্লেষণ বিস্তৃতভাবে তাঁর জবানিতে এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে। আমাদের সমকালীন ছোটগল্পের ধারা ও ঐতিহ্য বোঝার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে, নিঃসন্দেহে।

ব্যতিক্রমী একটা ভালো লিটিল ম্যাগ প্রকাশের জন্য নয়, আমাদের সাহিত্যের দিকচিহ্নায়নে, বিশেষ করে ছোটগল্পের ধারাপ্রকৃতির উপস্থাপন ও সনাক্তকরণের যে কাজটি চিহ্ন করলো, তার তুলনা হয়না। সম্পাদক ও তার কর্মীবাহিনীকে এই জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

চিহ্ন সম্পাদকের অনুমতি নিয়ে আমরা তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য ৩২তম এই সংখ্যা থেকে একটা লেখা- হাসান আজিজুল হকের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রকাশ করছি। কিন্তু বলে রাখি, পাঠক, পত্রিকাটি সংগ্রহ করুন আর আর পড়ুন, আমাদের ছোটগল্প সম্পর্কে আপনার একটা প্রায়-পূর্ণাঙ্গ ধারণা জন্মাবে। কৃতজ্ঞতা ‘চিহ্ন’-এর সম্পাদক শহীদ ইকবালকে।

মাসুদুজ্জামান

[এখানে বলে রাখি, তীরন্দাজে নিয়মিতভাবে লিটিল ম্যাগাজিন ও বইয়ের আলোচনা প্রকাশিত হবে। আমরা পত্রিকা সম্পাদকদের আমাদের কাছে পত্রিকা পাঠানোসহ যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।]

আলাপচারিতা : হাসান আজিজুল হক

[‘চিহ্ন’ পত্রিকার ৩২তম সংখ্যা থেকে সংকলিত। সাক্ষাৎকারটি দীর্ঘ বলে কয়েক পর্বে এটি প্রকাশিত হবে। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।]

প্রাককথন

হাসান আজিজুল হক। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ। বয়স প্রায় আশির কোঠায়। গত ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ চিহ্নপ্রধান অধ্যাপক শহীদ ইকবালসহ কয়েকজন চিহ্নকর্মী দিনব্যাপী ব্যবধানের এই ব্যতিক্রমী সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। এটি একপ্রকার মিশনের মতো ছিল- ঠিক সাক্ষাৎকারও বলা যায় না আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে লেখকজীবন, লেখালেখির প্রস্তুতি ও বিকাশ (আদৌ কোনো প্রস্তুতি ছিল কি-না) চতুষ্পার্শ্বের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া, বাঙালি মুসলমানচিন্তা ও এই সময়ের গল্প-গল্পকারদের লেখালেখি, শ্রেয়বোধ প্রভৃতি বিষয় ধরে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করার প্রয়াস। এমন আলাপচারিতার প্রকাশ-পূর্ব খসড়া নিয়ে তাঁর সন্তুষ্টিও চোখে পড়েছে। চিহ্নের প্রতিটি সংখ্যায় যে ক্রোড়পত্র থাকে, ঠিক তেমন ধারাবাহিকতায় ‘আমাদের গল্প ও গল্পধারার ঐতিহ্য’র অংশ হিসেবে এটি মুদ্রিত হল ফেব্রুয়ারি ২০১৭-র বইমেলা সংখ্যায়। শুরুটা করলন হাসান আজিজুল হক নিজেই। – শহীদ ইকবাল, সম্পাদক, চিহ্ন]

হা. আ. হ. : মুশকিলটা হলো এই জায়গাটায়, নিজের জীবনের কথা নিজের মুখে বললে কতোটা বস্তুনিষ্ঠ হয়, অথবা যা বলতে চাই তার উল্টো একটা মানে হয়ে যায় কিনা, এমন কিছু কিছু বিষয়ে আমি কথা বলতে অসুবিধে বোধ করি। কিন্তু অনেক বিষয়ে আমি স্বচ্ছন্দে  বলতে পারি, বলা যেতে পারে যে ফ্যাকচুয়াল আর কি! আমি সেখান থেকেই শুরু করছি। বাংলাদেশের মানুষ একটু পেছনে ফিরবেই। তার জন্মস্থান গ্রামে এটাই সে প্রথমে দেখতে পাবে। হয়তো কলকাতা শহরে এটা দুশো বছর পুরনো হয়ে গেছে। তবু গ্রাম, কলকাতা শহর তিনটি গ্রাম নিয়েই হয়েছিলো। ঢাকা শহর যে গ্রাম ছিলো সেটা তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি। এখনকার বাড্ডা-টাড্ডা এক সময় গ্রামই ছিলো। আমাদের গ্রাম সে ছিলো এক অজপাড়াগাঁ। ‘অজ’ মানে একেবারেই যাকে বলা যায় যে যার নাম নিশানা কেউ জানে না। এককথায় কোন নিভৃতে কোন গ্রাম পড়ে আছে তার খোঁজ কেউ জানে না। আমার জন্মও তেমনি এক অজপাড়াগাঁয়েই। এই অজপাড়াগাঁয়ের একটু পরিচয় না দিলে আমার কথাটা ঠিক বোঝা যাবে না। প্রথম কথা হচ্ছে যে, রাঢ় এমন একটা জায়গা যেখানে বলা যায়, সতেজ, ভেজা মাটি, গাছপালা, খাল-বিল, নদী এসব জিনিস সেখানে অনুপস্থিত। এটাকে ‘খরা’ এলাকা বলা হয়ে থাকে। একটা সময় সরকারকে এমন চাপে পড়তে হয়েছিলো যে সরকারকে তখন ‘দামোদর ভ্যালি পরিকল্পনা’ নিতে হয়েছিলো, গোটা এলাকা জুড়ে খাল খুঁড়তে হয়েছিলো। এই খাল খনন আমরা চোখের সামনেই দেখেছি। এবং তখন এও দেখলাম যে আমার জমিটা যেনো খাল-খননের ভেতরে না পড়ে এজন্য একে ওকে ধরা। সব মিলে শেষ পর্যন্ত বড় খাল খনন করা হলো এবং নানান জায়গায় গেট করা হলো। ওই যে স্লুইচ গেট, যেগুলো সব সময় খোলা থাকতো। বড় খাল থেকে আবার ব্রাঞ্চ লাইন করে এদিক ওদিক সরু খাল খনন করা হয়েছে। যখন জল ছাড়ার প্রয়োজন হতো তখন জলকপাটগুলো খুলে দেওয়া হতো। তখন মূল খাল থেকে সব দিকে জল ছড়িয়ে যেতো, ফসল-টসল ভালো হতে লাগলো। আমাদের আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না। খুব খরা এলাকা আমাদের জায়গাটা আর কি। মানুষও খুব খরখরে, খরখরে মানে ওই জায়গা থেকে যে, কেউ বলে উচিত বক্তা, কেউ বলে রূঢ়ভাষী। ঝগড়াঝাটির ক্ষেত্রেও একই কথা। মানে বেশিক্ষণ মুখ চালাতে পারে না, তার মধ্যে একটা হাত চলে আসে। আমাদের গ্রামটা মুসলিম প্রধান নয়, হিন্দুপ্রধান গ্রাম। সেখানে মুসলিমরা মাত্র দশ-বারো ঘর হতে পারে। সত্য কথাই বলতে হবে যে, দশ-বারোটি পরিবার ছিলো তার ভেতরে একটা-দুটো পরিবারই ছিলো যাদের উল্লেখ করা যেতো, আশেপাশের গাঁয়েও মূল্যায়ন করতো, তার একটা বাড়ি আমাদের। তখনকার সময়ে আমাদের এলাকার পরিস্থিতি হলো- সম্পূর্ণ নিরক্ষর, সম্পূর্ণ আধুনিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এটা ঠিক কল্পনা করা যাবে না যে, ‘কেউ পাঠশালায় যেতো না’। আমাদের ফ্যামিলিতে আমরা দুই ভাই যেতাম। সেই একটা ভাই আবার ক্লাস এইট-নাইনে উঠে হারিয়ে গেলো। আমি- জানি না- কেমন করে ছ্যাচরাতে ছ্যাচরাতে উতরে গেলাম। এবং খুব অল্প বয়স থেকে সাহিত্যের প্রতি টানটা যে কোথা থেকে এলো সেটা বলতে পারবো না, ব্যাখ্যাও করতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি যে, অনেক কিছুই আমার ভালো লাগতো। বিশাল মাঠ, বাড়িতে বসে থেকেও মনে হতো যে বিশাল মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তো এমন দিবাস্বপ্ন নিয়ে আমার অনেক সময় কেটে যেতো। আর ওই এলাকায় একেক সময় একেক রূপ। যখন শরৎকাল তখন কি অসাধারণ যে সবুজ, সমস্ত ধান তখন এতো এতো বড় হয়েছে, তুমি বাইরে বের হলেই দেখতে পাচ্ছ যে সবুজ ধানের মাঠ, যতোদূর তোমার চোখ যায় শুধু মাঠই দেখতে পাবে। আর মাঠে যে আলগুলো বেশি ব্যবহৃত হয় সে আলগুলো সাদা, সে সাদাটা হচ্ছে পথ, আর দুইপাশে সবুজ ঘাস। আমার শৈশবস্মৃতি আমার জীবনে খুব প্রভাব ফেলেছে। এক্কেবারে সাধারণ বাড়ির মানুষ বলতে যা বোঝায়, তাদের সঙ্গে খেলাধুলা থেকে শুরু করে তাদের সাথে সব কিছু, মানে আমার ভেতরে কোনো আলাদা বৈশিষ্ট্য বলতে কিছু কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। আমাদের ভেতরে একটু পড়াশোনা ছিলো। আমার বড় বোন বর্ধমানে একটা ভালো গার্লসস্কুলে পড়তেন। বড় ভাই যিনি, তিনি তো মারা গেছেন। এরা তখন শখে পড়াশোনা করেছে। তাই বলে এদের বাবারা কি টাকা দিতো না? আমার বাবা তো রীতিমতো টাকা দিতো। আর কাউকে কিছু দিক না দিক, ছেলে-মেয়েরা যখন লেখাপড়া করছে, তবে স্কুলে না, স্কুলের ব্যাপারে আমার বাবা তো খুব কঞ্জুস। স্কুলে আমাদেরও একটা ইয়ে ছিলো, মনেন্দ্রবাবু প্রত্যেক দিন আমাকে বলতেন এই কাল থেকে স্কুলে আসবি না। আমার এখনো মনে আছে সদ্য চা খেয়ে মুখের- মানে যে একদম চমৎকার একটা চায়ের গন্ধ মেখে মুখে নতুন যে হেডমাস্টার এসেছিলেন তিনি বললেন শোন, তোকে বৃত্তি দিয়েছে, মুসলমানদের জন্য আলাদা কি এক সিডিউল থাকে সেখান থেকে বৃত্তি পেয়েছিস, বেতন দেয়া লাগবে না। এটা না হলে কি হতো আমি তা জানি না। হয়তো চালিয়ে যেতাম, যেভাবেই হোক, কিন্তু ব্যাপারটা ওরকমই ছিলো আর কি! লেখাপড়ার গুরুত্বটা তখন একেবারেই ছিলো না। এবং আমাদের পুরো গ্রামে, শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে, পুরো গ্রামে আমিই প্রথম গ্রাজুয়েট হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে। হিন্দু নব্বুই ভাগ। স্কুলেও তাই, স্কুলে আমরা দুজন মাত্র স্কুলে যাই, আর বাকি সব হিন্দুদের, পুরো এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত। শুধু একটা ডোমদের ছেলে ছিলো, আর একটা হাড়িদের ছেলে ছিলো। এবং অসম্ভব রকমের নিরক্ষর, আর মুসলমানদের নিয়ে যা কিছু খারাপ ধারণা আছে, সেগুলো মুসলমানরা সত্য বলে প্রমাণ করেছে। এমন নোংরা, মুরগী পোষা, যত্রতত্র মুরগীর বিষ্ঠা, গরুর হাড়, এখানে পড়ে আছে ওখানে পড়ে আছে। একদিন দুদিন পর পর গরু জবাই হচ্ছে, আর সেই গরু জবাই সকলের সামনে হচ্ছে। গরু মরে গেলে তারপর শকুন আসছে। এ একটা ব্যাপার, ওই গ্রামটাতে ঢোকা যেতো না। ঢোকার আগেই নাকে এসে গন্ধ লাগতো। মারামারিও হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে এপাড়া ওপাড়া। মারামারির বিষয় হচ্ছে তোদের মসজিদে আমরা নামাজ পড়তে যাবো না, আমরাও একটা মসজিদ করবো। একবার হাত ভাঙ্গা নিয়ে মামলা চলছিলো, মানে কি বলা যায়, ওই এলাকায় একজন বিশিষ্ট মানুষ ছিলো, খুব লেখাপড়া জানতো তা না, কিন্তু তাঁকে দেখে মনে হতো এর মতো বিদ্বান, এর মতো জ্ঞানীমানুষ যেন সত্যি সত্যিই নেই। তিনি নেতৃত্ব করতেন। ষোলোটা বছর তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, একটানা। তারপর বিভিন্ন মামলায় যে জজদের ডাকা হতো। মানে গ্রাম থেকে একটু যারা জ্ঞানীগুণী লোক, তাদের ‘জজ’ হিসেবে ডাকা হতো শেষ রায়টা দেবার জন্য, এথেন্সের বিচার ব্যবস্থার মতো আরকি! এটা ওভাবেই ঠিক হতো, শেষ বিচারটা জজদের রায়ের উপরেই নির্ভর করতো। বাবা সে জজ বোর্ডের সদস্য ছিলেন। বাবা আদ্ভুত মানুষ ছিলেন। হোম গার্ডেনে আলাদা একটা শিক্ষা দেয়া হতো, মানে সেল্ফ ডিফেন্সির জন্য, উনি সেটাও নিতে গেলেন আর কি! তিনি খুব চমৎকার, মানে তারাশঙ্কর জাতীয় লোক যেভাবে গল্প বলতে পারতেন ঠিক সেইভাবে কথা বলতে পারতেন আর কি! কথা সেভাবেই বলতেন, খুব নিচু স্বরে, শুদ্ধ উচ্চারণে, এবং কোনোরকম মুদ্রাদোষ ছাড়া। এ জন্যে তার বাইরেও খুব সুনাম ছিলো। আর নানান রকমের পরোপকার, আমি বললাম না যে রাস্তাটা সিঁধে হবে না বাঁকা হবে, ওই যে ছোট লাইনের ট্রেন ছিলো, বর্ধমান থেকে কাটোয়া, আমাদের লাইনটা, আবার কাটোয়া থেকে আহমদপুর, ওই ছোটো লাইন দিয়ে আর কি। তো আমাদের স্টেশনে নেমে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত, তার মাঝখানটাতে চাড়ালগোরের গাছটা- এখানে এসে আমরা খানিকক্ষণ বসে রেস্ট নিতাম। আর সেখানে ছিলো নিকোবাবুর দোকান। যতো রকম জিনিসপত্র সারা মাসের জন্যে বাড়িতে আনতে হতো। আমি আর আমার ওই ভাই। আমরা ওইখানে বসে বলতাম, যা যা দিয়েছো সমান পরিমাণে নিয়ে যেতে হবে তার তো কোনো কথা নেই, অন্তত তাল মিসরি। তাল মিসরির ভেতরে সুতো লাগানো, সেই তাল মিসরি খসে পড়ছে, ওখানে বসে খাওয়া দাওয়া হতো। মানে একেবারে নিরুপদ্রুপ, এবং স্বাধীন একটা যাপন। বাবা খোঁজও নিতেন না, মা তো খোঁজ নিতেনই না। পাঁচ চাচি, মা-সহ, তারা সন্ধ্যেবেলা খেতে বসতেন আর আমরা তখনো পিঠের উপরে গিয়ে উপদ্রুপ করছি। মা তখন তিন গ্রাস খাচ্ছেন, আর এক গ্রাস ভাত ঘুরিয়ে আমাদের খাইয়ে দিচ্ছেন। তাদের শান্তিমতো খেতেও দিতাম না। আর দেখতেন আমার এক ফুপু। এই ফুপুর মতো দরদী মানুষ- আমার দশটা মায়ের ভূমিকা পালন করেছে সে। আট বছর বয়সে বিধবা হয়েছেন, ভায়ের বাড়িতে চলে এসেছেন, বিয়ের কোনো কথা নেই। তখন মুসলিম বিধবা বিবাহের চলটা ছিলো না। বহু বিবাহের চল একেবারেই না। আমাদের ওখানে কারো দুটো বউ ছিলো না। কোনো মুসলমানেরও দুটো বউ ছিলো না। বিধবা হবার পরে আবার বিবাহ হয়েছে, এটাও ছিলো না। বিপত্নীক বিয়ে করেছে, সেটাও খুব কম। স্ত্রী মরে গেছে আরেকটা বিয়ে করি, সেটাও ছিল না।

 

চিহ্ন : এখানে একটা জিনিস, গ্রামটা তো আমরা ‘শকুন’ গল্পটার মধ্যেও দেখেছি এবং সম্প্রতি সাবিত্রী উপাখ্যান তো পড়লাম। তো ওই বর্ধমান, কাটুয়া, ধারসোনা এগুলো তো পাচ্ছি এখানে। তো এখানে তো স্যার একটা জিনিস- বগুড়া পর্যন্ত আপনার যে কানেকশান, স্টোরিটা তো বগুড়ার দিকেও গেলো কিছুটা- এটা কিভাবে ঘটলো? 

হা. আ. হ. : বগুড়ার নাম তো ছোটবেলায় শুনেছি। কটা গ্রামই বা চিনি, এমনকি আমাদের পাশের গ্রাম গোবর্ধনপুর, একটু দূরে হচ্ছে বামনগ্রাম, ক্ষীরগ্রাম, যেখানে একটা মেলা হতো। আর ওদিকে নিগন, এই আশেপাশের কিছু গাঁ সম্পর্কে জানতাম। বিচিত্র গ্রামও অনেক ছিলো। তারপর তোমার একটা গ্রামের নাম ছিলো নাসিগ্রাম। সেখানে নব্বইভাগ হচ্ছে আগুড়ে হিন্দু। আগুড়ে হিন্দু মানে অত্যন্ত উগ্র ক্ষত্রিয়। তাদের গায়ের রং সাধারণত ফর্সা হয়, তাদের মেজাজটা খুব উগ্র। আমাদের গ্রামেও কিন্তু আগুড়ে ছিলো, কিছু উগ্র ক্ষত্রিয় ছিলো, আর বাকিটা ছিলো তিলি সম্প্রদায়ের লোক। আর আমাদের গ্রামে মহারাজা বনেন্দ্রনন্দী, কাশিমবাজারের মহারাজ যিনি, উনি কিন্তু তিলি সম্প্রদায়ের লোক। ফলে, তার সুন্দরী পাত্রি জোগাড় করতে খুব অসুবিধে হয়েছিলো। কারণ উচ্চশ্রেণি থেকে তো তিনি বউ নিতে পারবেন না। বামন কায়স্থ থেকে তো তিনি বউ নিতে পারবেন না। তিলি সম্প্রদায় থেকেই নিতে হবে। তিনি প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক ছিলেন তো। উনি খুঁজতে খুঁজতে ছোট একটি মেয়ে পেয়ে গেলেন খুবই সুন্দরী ওই তিলি সম্প্রদায়ের। তাকেই উনি বিয়ে করেছিলেন, নাম হলো কাশেশ্বরী। আর কাশেশ্বরী আমার দাদির সখী ছিলো। সে জন্যেই আমাদের গ্রামে কিছু সুবিধে হয়েছিলো। একেবারেই অজপাড়াগাঁ, রাস্তাঘাটের অবস্থা একেবারেই খারাপ ছিলো। যেহেতু মহারাজার বিয়ে হয়েছে, গ্রামে শিবমন্দির হয়েছে তিনটে। পাকা উঠোনওয়ালা, বিশাল সিঁড়িওয়ালা, সেখানে গায়ের সমস্ত মেয়েরা বসতে পারতো। তার মধ্যে একটা মন্দিরে পুজা হতো, আরেকটা মন্দির বন্ধ থাকতো, আরেকটা মন্দিরে কুকুরের বাচ্চা হতো। কিন্তু কুকুরের বাচ্চা এক বছরের বেশি টিকতে পারতো না। এতো আদর তাদের দেয়া হতো, এতো আদর তারা সইতে পারতো না। যাই হোক, তারই পেছনে ছিলো একটা কুঁড়েঘর, সেখানে একজন বাস করতেন। সেই বাড়ির মেয়ে হচ্ছে কাশেশ্বরী। কুঁড়েঘর মানে মাটির বাড়ি, এখানেই কাশেশ্বরীর জন্ম। এই কারণেই তিনি যখন বিয়ে করলেন, তিলি সম্প্রদায়ের উন্নতি করার জন্যে ‘বঙ্গীয় দ্বাদশ তিলি সম্প্রদায়’ বলে তিনি একটা সংঘবদ্ধ সম্প্রদায় তৈরি করেছিলেন। একশ ছেলে তিনি পড়িয়েছিলেন। তিলি সম্প্রদায়ের জন্যে আলাদা জায়গা করে দিয়েছিলেন। আমার বাবাও সেখানে কিছুদিন ছিলেন। বাবার সাথে ওই মহারাজার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো। সে জন্যে যারা মহারাজার আত্মীয় ছিলো, তাদের সাথে আমাদেরও আত্মীয়তা হয়েছিলো। যেমন ধরো ননু কাকা বলে আমাদের একজন ছিলো, মহারাজার ভাগ্নীর ছেলে। তো উনি গ্রামে শিবমন্দির করে দেওয়া, স্কুল করে দেওয়া, আর তার সাথে গ্রামে সবচে বড় দীঘি করে দেওয়া, ওটার নামই ছিলো দীঘি। দীঘির পাড়ের কথা কল্পনা করা যায় না। আর যখন দুবছর একবছর পরে- টানা জাল, ওইপাড় থেকে এইপাড় পর্যন্ত, যারা টানছে তারাও পাড়ে আছে। আর মাঝামাঝি যখন আসছে, এই রকম বড় বড় রুই মাছ লাফ দিয়ে ওইপাড় থেকে এই পাড়ে পড়ছে। সে দৃশ্য দেখার মতো। তারপর যখন জালটা তুলছে, প্রচুর পরিমাণে, অন্তত বিশ-ত্রিশ কেজি ওজনের রুই কাতলা। সেসব মাছ তখন বিক্রিও করা হতো, গাঁয়ের লোকেদেরও দেওয়া হতো। আশেপাশের গাঁয়ের ভেতরে আমাদের ওটাই পাকা স্কুল। গাঁ এতো পশ্চাৎপদ হলে কি হবে, আশে পাশের সব গ্রাম থেকে ছেলে- মেয়ে নাই, একটাও মেয়ে নাই, সমস্তই ছেলে, এ একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেছিলাম যে, মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর চল, কি হিন্দু কি মুসলিম, কারো ছিলো না। আমাদের গ্রাম থেকে একটিও হিন্দু ছাত্রী আমার সময়ে হয়নি। একটা হিন্দু মেয়ে লেখাপড়া করেনি। পাঠশালা পর্যন্ত বড় জোর, তাও সকলে নয়। প্রচুর পোড়ো মাঠ, সেই মাঠের মধ্যে ছেলেদের জন্যে ভাগাড়, তিন চারটে দীঘি, তারমধ্যে আবার বিরাট একটা মাঠ যাকে আমরা বলি ষাটতলার মাঠ। এটা আমাদের ফুটবল খেলার মাঠ ছিলো। স্কুলের পাশ দিয়ে বোর্ডিং হাউস ছিলো, তালগাছ ছিলো, অনেক। আর তাদের অনেক জমি ছিলো, সে জমির আয় দিয়েই স্কুলের খরচ কিছু উঠতো। আমি পরবর্তীকালে কমুনিস্ট হয়ে গিয়েছি, তারপরও কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক এই ব্যবস্থা অস্বীকার করতে পারি না। ওই ব্যবস্থা না থাকলে আমি যে কোথায় লেখাপড়া করতাম। ওইখানে লেখাপড়া- প্রথমে দাশু মাস্টারের পাঠশালা। প্রথমে তো বামন গাঁয়ে সেখানে আমরা তিন চারজন গিয়ে একটা লোকের বৈঠকখানায় ভর্তি হয়েছিলাম। তারপর দেখা গেলো যে পণ্ডিত ওখান থেকে চলে এসে দাশু মাস্টারের পাঠশালায় টিচার হলেন, দুজন টিচার। আর দাশু মাস্টার তার বাড়িতে পাঠশালা করলেন। কালী পুজা করতেন, যেখানে লোকজন এসে দাঁড়াতো। আটচালা, মানে শুধু চাল আছে, দেয়াল-টেয়াল কিছু নেই, রাস্তা থেকে ছয় ইঞ্চি উঁচু হবে মেঝেটা। সেখানে প্রথম শ্রেণি, তারপর দ্বিতীয় শ্রেণি, তারপর তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলে আরেকটু উন্নতি হতো আমাদের। উনার যে গরুর গোয়ালটা ছিলো তার একদিকে গরু থাকতো আরেক দিকে আমরা দু-পেয়ে গরুগুলো। আমার মনে আছে আমরা সাতজন ছিলাম, ঘষতে ঘষতে মরতে মরতে কে কতোদূর যে গিয়েছে, কেউ ফাইভে ছেড়েছে- কেউ সিক্সে ছেড়েছে, কেউ এইটে ছেড়েছে। আমার চাচাতো ভাইটা এইট-নাইনে ছেড়েছে। তার মানে সত্যিকার অর্থে, নিরক্ষর একটা গ্রাম। যেখানে একেবারেই নিন্মশ্রেণি না হলেও মোটামুটি একটা শ্রেণি বসবাস করতো, খালের ওপার-এপার দিয়ে- তিন ঘর ব্রাহ্মণ, কিছু ক্ষত্রিয়-ডোম আর বাগদী। হাড়িরাও, এরা গ্রামের বাইরে। একদিকে মুচিপাড়া, মুচিপাড়া বরাবর বাউরিপাড়া, এগুলো একেবারে ভাগ করা ছিলো। কেউ কারো এরিয়াতে যেতো না। মুচিরা গরু মরে গেলে চামড়া ছড়াতো, একটা মুচি জুতো-টুতোও বানাতো। আমাকেও ওরা জুতো বানিয়ে দিয়েছিলো, অবলা মুচি। আমি বললাম কাকা দাও বানিয়ে একটা। এদিন ওদিন করতে করতে শেষ পর্যন্ত দিলো। ওটা তো তেমন নয়, দীর্ঘ সময় রোদে পুড়িয়ে শুকিয়ে সে যে কি জিনিস হলো, কোনো কাজই নেই ও দিয়ে। একমাত্র ওই খড়ের আঁটি তুলে গাদা করার জন্যে পায়ে দেয়া হতো, যাতে পা ক্ষতবিক্ষত না হয়ে যায়। তো এরকম এক আধজন মুচি ছিলো। আর দুএকজন ভালো ঢুলি ছিলো, ঢাক বাঁজাতো দু’তিন জন। একজন চড়বরি বাজাতো। এগুলো মুচিপাড়ায়। আর বাউরি পাড়াতে ছিলো কাহারÑ যারা পালকি বইতো আরকি। আমিও পালকি চড়ে বিয়ে করেছি। তো পালকি আমাদের নিজেদের ছিলো। তারপর তোমার শৌখিন টোপ্পর গাড়ি। মানে গরুর গাড়িরই, মানে ছাপড়া তোলা, তোমরা টোপ্পরই বলো তো বোধ হয়? সে টোপ্পরের আমাদের বাহারী কতো, বাঁশ চেঁছে কোনোটা নীল রঙ কোনোটা লাল রঙ, এভাবে চমৎকারভাবে সাজানো আরকি। আর আমাদের গরুর থেকে মোষের সংখ্যা বেশি ছিলো। শক্ত মাটি, এজন্যে গরু রাখাটা মুশকিল হতো। আমাদের অন্তত সাত আটটা মোষ ছিলো। আর গরু এক জোড়া ছিলো, তা ছাড়া গাই-টাই সেগুলো আলাদা হিসেব। তারপর দুয়েকটা ঘোড়াও পুষেছিলো। সর্বশেষ ঘোড়াটায় আমি চড়েছি। পারিবারিক কলহ তাও আমি দেখেছি। আমাদের বাড়ির পাশে ছিলেন শেখ পরিবার, তাদের সাথে আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিলো। ওই শেখেদের পরিবারেই আমার ফুফুর বিয়ে হয়, যে ফুফু আট বছর বয়সে বিধবা হয়। আমার দুই চাচি তারা ওই পরিবারে একজন এই পরিবারে একজন, পরস্পরে বোন, তারপরেও শত্রুতা, শত্রুতা যেনো করতেই হবে- সাম্প্রদয়িক দাঙ্গা আর কি। আমাদের গ্রামের একটি জামাইকে মেরে ফেলেছিলো পাশের গ্রামের উগ্র ক্ষত্রিয়রা। মেলা হতো, মোষ বলিদান হতো, তারপর তোমার পাঠা বলিদান হতো, সেইখানে ওরা যাচ্ছিলো। মেয়েটা হারিয়ে গিয়েছিলো আরকি। পাশের গ্রামে খোঁজ নেবার জন্যে দুজন যাচ্ছিলো। তো আমাদের গ্রামের একজন জামাই, খুব ভালো মানুষ। একটা ডাক্টার ছিলো, প্রচুর মদ-টদ খেয়েছে, আর প্রচুর পরিমানে যারা হাড়ি, চণ্ডাল ওদের মদ খাইয়েছে। তারপর ওরা একটা বটগাছের তলায় পিটিয়ে মেরেছিলো তাদের। একটাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার আমাদের গ্রামে। আর দুয়েকটা শিকার হয়েছিলো, বর্ধমানে একজন, কাটুয়ায় দুয়েকজন, আর কলকাতার কথা তোমরা তো জানোই। তো এই যে মারামারি হলো, আমাদের গ্রামে কিন্তু লাগলো না। ওরা একটা গলির মুখে আর একটা আস্তানায় গুলি করলো। আমাদের গ্রামের সামান্য কিছু মুসলিম তারা পুরো গ্রামের হিন্দুদের সতর্ক করছে! আয় তোরা আয়। আর রাত্রি বেলা তো স্যার আমাদের পড়াতেন, দাশু মাস্টার। রাতেও পড়তে হতো। রাতে অবশ্য আমরা পড়ার থেকে পরস্পর খেলা করতাম বেশি। মাস্টার মশাই ঠিক মতো আসতো না, আর বৃহস্পতিবারে তো আসতোই না কিংবা এসেই ছুটি দিয়ে দিতো। যাই হোক মন্দ কাটেনি সময়টা। তারপর যখন মারামারিটা বাঁধলো, তখন দাশু মাস্টার বললেন এই আমার সঙ্গে আয় তোরা। আমরা মাস্টারের পিছে পিছে যাচ্ছি, গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে যারা হিন্দু, আর দাশু মাস্টারের গলাটাও ছিলো উচ্চ, গম্ভীর। তখন মাস্টার মশাই হুংকার দিয়ে বললেন, আমি ছাত্র নিয়ে যাচ্ছি, খবরদার। তারপর বললেন মারামারি করছো করো, আমি আমার ছাত্রদের তার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছি। তখন এরকম মানুষও ছিলো। তারপর আমি যখন পৌঁছলাম, দেখলাম চেঁচামেচি আর হৈ-হুল্লোড়, অনেক রাত পর্যন্ত। সুতরাং এর ভেতরেই দাশু মাস্টারের পড়াশোনা ছিলো। গ্রামে এমন কিছু ঘটনা ছাড়া গ্রামে কিন্তু সবার ভেতরে সম্প্রীতি ছিলো। আর তাছাড়া আমি মূলত মুসলমান পাড়ার ছেলেদের সাথে বেশি মিশতাম না। ওই মাঝে মাঝে রাতে হা-ডু-ডু এসব খেলতাম। বাকি খেলাধুলা মেশামেশি সব হিন্দুপাড়ার ছেলেদের সাথে। একজন তো অন্তরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো। সে এখনো জীবিত আছে। আমি বইও উৎসর্গ করেছি তার নামে। সমরেশ নন্দী। স্কুলের সময়টাও খুব চমৎকার ছিলো। মাস্টার দুয়েকজন কড়া পণ্ডিত ছিলেন। দুর্গাশংকর পণ্ডিত ছিলেন। সুবিরাম চক্রবর্তী ছিলেন, তার একশ বছর বয়স হয়ে গিয়েছে, হয়তো এখনো জীবিত আছেন। এইভাবে স্কুল, প্রকৃতি, মাঠ-ঘাট- যাকে বলে- এরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে গ্রাম্যভাবে মানুষ আমরা। স্কুলের লাইব্রেরি থেকেই আমি বেশি পড়াশোনা করেছি। স্কুলের লাইব্রেরিতে আমি ওয়ার এন্ড পিস, ইয়েটস অনুবাদ পেয়েছি পাঁচ খণ্ডে। আমি সেখান থেকেই ব্রাদার্স কারমাজোভ পেয়েছি, দস্তভস্কির ক্রাইম এ্যান্ড পানিশমেন্ট পেয়েছি আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিতে, চিন্তা করো। মনীন্দ্র বাবু খুব রাগ করতেন। সপ্তাহে দুদিন বই দেওয়া হতো তো, স্যার বলতেন কি বই নিবি যা যা…। তারপরে ছিলো সস্তা বই এবং শিশুসাহিত্যের যে সমস্ত বইটইগুলো তখনকার, সেগুলোও ছিলো। তখন আমাদের এই সুনির্মল বসু তারপরে সত্যজিতের বাবা সুকুমার রায়, তার বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, ওদের বই ছিলো। সত্যজিতের তখন লেখার প্রশ্নই ওঠে না। এদের এই বই তারপরে অলিভার টুইস্ট ডিকেন্সের বই পড়া, দস্তভস্কির বই পড়া, আলেকজান্ডার পোপের বই পড়া। বইগুলো বাংলাতেই ছিলো, খাঁটি ইংরেজি বই তখনও আমরা ঠিক পড়তে পারি না আর স্কুলের ওরকম বই রাখতো না। কিন্তু এই বইগুলিই বা কে আনে! আলেকজান্ডার ডুমার বই তোমরা তো এখনোও দেখোনি। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের শাপমোচনের গল্প। তার চিতাবহ্নি নামে একটা উপন্যাস আছে, আরে বাপরে বাপ- সে উপন্যাস সকালবেলা পড়তে শুরু করেছি আর সন্ধ্যাবেলায় দেখি আলো আর নেই বইও শেষ, ছেড়ে দিলাম। তারপর শৈলেন্দু মুখোপাধ্যায় যে কি-না কাজী নজরুল ইসলামের ক্লাস ফ্রেন্ড। শৈলেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় নয় তারপরে মানে না মানা এসব অদ্ভুত বই, এগুলো দিয়ে সিনেমা হয়েছিলো, খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো এসব বই। তখন কৃষ্ণচন্দ্র দে টে- এরা গান করত, তখন তো হেমন্তর আর্বিভাব হয়নি। ধনঞ্জয়ের গান একটু বয়স হলে শুনলাম- কোন হিসেবে হরো হৃদে দাঁড়িয়েছিস মা পদ দিয়ে শখ করে জিহ্বা বারায়েছো যেন কতো নেকামি ভারী সুন্দর এসব গানগুলো। যাত্রা গ্রামে হয়েছে অন্য গ্রামে হলেও দেখতে গেছি- রাণী চণ্ডীদাস। সিনেমাও তখন ছোট ছোট প্রজেক্টর নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন গ্রামে দেখাত।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close