Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ চৈতালী চট্টোপাধ্যায় > ইসমত চুগতাই, নারী স্বাধীনতা এবং… >> প্রবন্ধ

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় > ইসমত চুগতাই, নারী স্বাধীনতা এবং… >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ September 6, 2017

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় > ইসমত চুগতাই, নারী স্বাধীনতা এবং… >> প্রবন্ধ
0
0

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় > ইসমত চুগতাই, নারী স্বাধীনতা এবং…

[সম্পাদকীয় নোট : ইসমত চুগতাই, উর্দুভাষার একজন অসাধারণ কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখালেখি ও জীবন নিয়ে কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের এই অসামান্য লেখাটি, পড়ুন।]

কলেজ স্ট্রিট ফেরত ট্রামে দুই তরুণীর কথোপকথন চলছিল, আমি ডিঙি মেরে মেরে শুনছিলাম। শুনতে শুনতে যা মনে হলো দুইজনই অধ্যাপিকা, একজন বাংলার, একজন সমাজবিজ্ঞানের।

বাংলা : কতো ভালো ভালো লেখক আছেন উর্দুতে…

(ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) সমাজবিজ্ঞান : হ্যাঁ , হ্যাঁ , সাদাত হাসান মান্টো , কৃষাণ চন্দর ।

বাংলা : কেন, ইসমত চুগতাইর নামটা এই সঙ্গে বললি না যে! অমন পাওয়ারফুল একজন নারীলেখক!

সমাজবিজ্ঞান : (ভাবলেশহীন মুখ) কই এর কথা তো আগে কখনও পাইনি। কি যেন নামটা উচ্চারণ করতে পারছি না ঠিকমতো।

চমকে যেতাম। যাই নি। কারণ, তার অব্যবহিত আগেই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, আরও কয়েকজনের কাছে, কয়েকটি জায়গায়। একে তো প্রতিবেশী সাহিত্য সম্পর্কে কিঞ্চিৎ নাক-উঁচু উদাসীনতায় ভুগছি বরাবর, তারপর আবার মেয়ে লেখক। ইসমত চুগতাই। আমাদের বাড়ির বুকশেলফ থেকে দু-পা বাড়িয়ে, ক-জন অসামান্য নারীলেখকের নাম নিয়ে বিদগ্ধ মহলে, আলোড়ন তোলা হয় বলুন তো? জ্যোতির্ময়ী দেবী? রাজলক্ষ্মী দেবী? কবিতা সিংহ?

ঠিক এখানেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার আর পাঁচটা অসাম্যের মতোই, লিঙ্গ রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির দপ্তরেও তার থাবা বসিয়ে দিয়েছে। চেপে দিতে চেয়েছে বারবার, মেয়েদের কণ্ঠস্বর। তাই যখন জীবিত কৃতি পুরুষের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন পূর্তি নিয়েও দিকে-দিকে শিঙা বেজে ওঠে, তখন কী নিঃশব্দেই না পালিত হয় ইসমত চুগতাই-এর জন্মশতবর্ষ, মুষ্টিমেয় মানুষের উৎসবে।

‘গল্পে আমি সবকিছুই আমার লেখার বিসয়বস্তু করে তুলি। তবে কেউ যদি এসবের মধ্যে অশ্লীল কিছু দেখে ফেলে, তো, সে জাহান্নামে যাক! আমি বিশ্বাস করি জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো যখন সত্যি সত্যি বাস্তবতার আলো-অন্ধকার মেখে আসে, তা কখনও নোংরা হতে পারে না! কিন্তু বেশীরভাগ মানুষই ভাবে কী, শুধুমাত্র পর্দার আড়ালে কাজ কারবার সেরে ফেললেই তাতে দোষ লাগে না কোনও। যতোসব অর্ধশিক্ষিতের দল।’

এসব উচ্চারিত হচ্ছে কোথায়? এক গোঁড়া, ধর্মান্ধ মেয়ের পরিবারের মেয়ের আত্মকথায়। যেখানে পর্দাপ্রথার কোন বিকল্প নেই। ইসমত চুগতাই, আজ থেকে শতবর্ষ আগে এগুলো লিখে গেছেন। নবম গর্ভের সন্তান ইসমত যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সেখানে পুরুষের জন্য আকাশ উদার মনের আশা নাই। আর মেয়েরা? ‘আমার পরিবারে প্রত্যেক স্ত্রীলোক – মা, পিসি, বোন সবার চোখে মুখে ভয়ের ছায়া ফুটে থাকতো। ওরা জানতেন, সমাজ ওদের জন্য একটা নির্দিষ্ট স্টেশন অব্দি চলাফেরা বেঁধে দিয়েছে। সেই সীমানা ছাড়াতে গেলেই হাতেনাতে শাস্তি পেতে হবে।’ গা গুলিয়ে উঠতো, ইসমতের, দম আটকে আসতো।

ইসমত চুগতাই সে-ই নারী , যে উর্দু ভাষায় মেয়েদের লেখালিখির যে আবদ্ধ জায়গা, নিষিদ্ধ এলাকা , সেখানে হাত রাখলেন। পিতৃতান্ত্রিক লক্ষণরেখার বাইরে পা বাড়ালেন ইসমত চুগতাই।

পিতৃতন্ত্র না ক্ষমতাতন্ত্র, যে নামেই ডাকি না কেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে দেখেই বাড়িয়েছেন তার জ্ঞানের পরিধি। টর্চলাইট ফেলেছেন দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচারে।

‘অঝোরে কেঁদে চলেছি। কে যেন বীভৎস ভাবে মেরেই চলেছে। দৈত্যাকার একটা লোক। অসহায় কাতরভাবে মাড় খেয়ে চলেছে কালো কালো একরত্তি একটা বাচ্চা। আমি তখন এতোই ছোট সবকিছু ঠিকভাবে মনেও পড়ে না। শুধু এটুকু, ঐ বিশাল, আছড়ে-পড়া বেতের সাঁই সাঁই শব্দ। মনে গেঁথে গেছে আজোও শুনতে পাই সেই আওয়াজ। সম্ভবত তখন থেকেই আমি উপলব্ধি করি যে বৃহৎ পীড়ন করে ক্ষুদ্রকে। তখন থেকেই আমার অবচেতনে বলশালী লোককে মনে হয় মস্ত বড় স্তম্ভ। যার পাথেয়র কাছে আবর্জনার মতো পড়ে আছে দুর্বলেরা। শক্তিশালীর কাছে মাথা নোয়াতে আর দুর্বলকে তুচ্ছ করতে শিখি। কিন্তু, আমার চেতনার মধ্যে লুকিয়েছিল এমন একটা বোধ যা আমি বুঝতে পারি নি। যখনই দেখেছি কোন জমকালো প্রাসাদকে শ্যাওলা গ্রাস করছে, নির্মমভাবে প্রাসাদের দেয়াল দখল নিচ্ছে আগাছা। আর বুনো লতারা খুব গোপনে মনে মনে উল্লাস বোধ করেছি। ঐসব তুচ্ছ ঘাস আর শ্যাওলার ক্ষমতায় অভিভূত হয়েছি।’

ক্লাস নাইনের পর-ই ওর পড়ালেখার পাট চুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাবা । কেননা, ক’দিন পরেই তো বিয়ের ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু, ইসমত সরাসরি বাবার চোখে চোখ রেখে কথা বললেন, যা নাকি কেউ পারেনি কখনও! দাগী আসামীরাও নাকি ওর চোখের দিকে চাইলে, অপরাধ কবুল করে দিতো। হ্যাঁ, যা বলছিলাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোয়াসিম বেগ চুঘতাই সদ্য নাস্তা সেরে বসে বসে কাগজ পড়ছিলেন। মা হাঁড়িতে সুপুরি কুচোচ্ছিলেন, যা নাকি মেয়েরা করেই থাকে। এখনই শুরু হবে সেই সাহসী সংলাপ, বাবা ও মেয়ের মধ্যে, পরবর্তী সময়ে যে কথাবার্তা স্থান করে নেবে তার লেখাতেও, কেননা সেদিনের সেই একটুকরো সংলাপ খুলে দিয়েছিলো ইসমত চুগতাইয়ের পর্দা। তাঁর মেধায় আছড়ে পড়েছিলো খোলা হাওয়া। না হলে ঐ পিতৃতান্ত্রিক জাঁতিতে তিনি পিষ্ট হয়ে, অসহায়, মুখশুদ্ধি, সংসারে মিশে থাকতেন হয়তোবা। আমরা বঞ্চিত হতাম একজন ইসমত চুগতাই থেকে।

– আমি আলীগড়ে পড়তে যেতে চাই। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবো।

– কি হবে দিয়ে, জুগনুর লেখাপড়া মিটতে আর বড়জোর আর দুই বছর। তারপরই তোমাদের বিয়ে

– আমি পরীক্ষা দেবোই।

– কোথাও যেতে হবে না তোমাকে।

– তাহলে , পালিয়ে যাবো

– কোথায়?

– যেখানে হয়।

– তার মানে?

– হ্যাঁ, চান্দা নিয়ে স্টেশনে গিয়ে যে কোন একটা গাড়িতে উঠে পড়বো।

– তারপর?

– নেমে পড়বো যে কোন স্টেশনে। আর লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ঠিক জেনে নেবো সে অঞ্চলের মিশন স্কুলটা কোথায়! একবার সেখানে পৌঁছাতে পারলে আমিও খ্রিস্টান হয়ে যাবো, ব্যাস। তারপর তো যতো খুশী লেখাপড়া করার বাঁধা থাকবে না কোনও।’

এই সংলাপের পর ইসমত চুগতাইয়ের মা চুল ছিঁড়ে অভিশাপ দিতে লাগলেন, কিন্তু ওঁর অনমনীয় জেদের কাছে মাথা নোয়ালেন বাবা। দূরে, হোস্টেলে থেকে লেখাপড়ার ব্যবস্থা হলো ওঁর, যা অকল্পনীয়, সে সময়, ঐ পরিবারটির পরিপ্রেক্ষিতে। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সেই প্রথম জেহাদ ঘোষণা, এই বিপ্লবীনীর। শুধু তাই নয়, এই একফালি সংলাপের মধ্য দিয়েই, আমরা টের পাবো , ছোট্ট একটা আলোকিত চারাগাছ পোঁতা হলো, ধর্মীয় অন্ধকার উঠোনে, যা পরে মহীরুহ হয়ে ওঠে, ওঁর জীবন ও লেখায় সবরকম ধর্মীয় অন্ধকার, বিভেদ ঢেকে দিতে চাইবে সমাজের সব স্তর থেকে।

পুরুষের প্রভুত্ব কে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছেন ইসমত চুগতাই, বারবার। মেয়েদের যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি লিখতে এতোটুকু অস্বস্তি পান নি। তিনি বারবার ছুঁয়ে গেছেন নিম্ন মধ্যবিত্ত, বিধবা, বেশ্যা ও প্রান্তিক মহিলাদের জীবনকথা। ওঁর তীক্ষ্ণ ক্যামেরার মতো চোখ দেখতে পেয়েছে, যৌনকামনা বাসনা সবসময় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত নৈতিকতা দিয়ে আড়াল করে রাখেন মহিলারা, তাদের তথাকথিত, শেখানো নীতি, আদর্শ, লজ্জা ও নীরবতা দিয়ে ভুলে থাকেন এ-সব। অথচ, নিম্নবর্গের বা দরিদ্র নারীরা কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সোজাসুজি প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন না। শুধু তো মেয়েদের কথা নয়, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যে চিরপ্রচলিত ঘৃণার তরঙ্গ বয়ে যায়, তাকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন, সব ধর্মের গোঁড়ামির মধ্যে যে নিহিত আছে অন্তঃসারশূন্যতা, কী চমৎকার ভাবেই না মেলে ধরেছে ওঁর কলম। এসেছে, মায়াদয়াহীন রাজনৈতিক খেলার কথা। আত্মকথায় তিনি বলেন, ‘আমার কলম কোন শিল্পীর তুলি নয় বরং, সাধারণ ক্যামেরা। যা প্রকৃত বাস্তবতাকে চিত্রায়িত করে। কলম আমার হাতে অসহায়, কারণ আমার মন একে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমার মন আর কলমের মাঝে কোনকিছুই বাধা হতে পারে না… সাইকোলজি এবং মেডিকেল কোর্সে যে সব বই নির্দিষ্ট থাকে, চাইলে লোকে তাকেও অশ্লীল বলতে পারে।…’

আর, এই ভাবনারই ফসল তাঁর যাবতীয় লেখালিখি। ওঁর বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত গল্প ‘লিহাফ’-এর জন্ম। একজন নারীলেখক হিসেবে আড়াল আবডাল না খুঁজে, স্পষ্ট কথা লেখা মানেই তো বিতর্ক। শুধু সে সময় নয়, এই সময়েরও মাপে, এমনকি সমাজ তাকে শাস্তির বিধান দেবে। ইসমত চুগতাইয়ের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটলো। এ লেখা শুধু বিতর্কের ঝড়ই তুললো না তাঁর জীবনকেও পর্যুদস্ত করে তুললো সঙ্গে সঙ্গে। ফলে, লাহোর আদালত পর্যন্ত বারবার দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে তাকে। ‘আমি আসলম সাহেবকে বললাম, আপনি আপনার ‘গুনাহ কি রাতে’ গল্পে এমন সব অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছেন! এমনকি শুধুমাত্র সুড়সুড়ি দেয়ার জন্যই যৌনপ্রক্রিয়ার এমন সব পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন’… ‘আমি বোঝাতে চাইছি যে ঈশ্বর আপনাকে পুরুষ হিসেবে গড়েছেন এতে আমার কোন হাত নেই। আর আমাকে যে মেয়ে হিসেবে গড়েছেন তাতে আপনারও কোন হাত নেই। আপনার যা খুশী লেখার অধিকার আছে সেখানে আমার কোন হাত নেই। আপনার যা খুশী লেখার অধিকার আছে, সেজন্য আমার অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই। একইভাবে আমি যেভাবে লিখতে চাই তারজন্য আপনার কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না…’

ক্রমশ একা হয়ে গিয়েছিলেন ইসমত চুগতাই। তাঁর নিজস্ব ধারালো, যুক্তিবাদী, সংস্কারমুক্ত মনের কারণে তাঁর পরিবারও দূরে সরে যাচ্ছিলো একসময়। ওঁর জীবনে, টিকে ছিলো সাদাত মান্টোর বন্ধুতা, সেই মান্টো, যিনি ওঁর কাছে, ওঁর গল্পে, মাই ফ্রেন্ড, মাই এনিমি।

আমার এই প্রতিবেদন শেষ হবে এবার। আর, শেষে থাকবে, ইসমত অর্থাৎ আরবিতে অপাপবিদ্ধ অর্থবহ এই নারীলেখিকার চারপাশে পাপবিদ্ধ আবহ যে চিন্তনের জন্ম দেয় তাঁর মধ্যে, তার-ই একঝলক :

‘আমি ক্ষীণ কণ্ঠে বললাম, পৃথিবীটাও নোংরাতে ভর্তি, সেগুলো তুলে আনার কি প্রয়োজন?’ বললাম, ‘তুলে আনা হলে তবেই সেটা দৃষ্টিগোচর হয়, আর মানুষ সেটা পরিষ্কার করার প্রয়োজন বোধ করে।’ বিচারক হাসলেন।’

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close