Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / মৃণালিনী দেবী, রবীন্দ্রনাথ ও না-জাগা বসন্তের যুঁথিগুলি

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / মৃণালিনী দেবী, রবীন্দ্রনাথ ও না-জাগা বসন্তের যুঁথিগুলি

প্রকাশঃ May 9, 2017

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / মৃণালিনী দেবী, রবীন্দ্রনাথ ও না-জাগা বসন্তের যুঁথিগুলি
0
2

দখিনা হাওয়ায় ভরপুর যে, সে রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রেম পড়ে নেবে। অফুরন্ত প্রেম। রবীন্দ্রনাথের অজানা খনির নতুন মনি গেঁথে-গেঁথে প্রেমের সেতু বানায়নি, কোনও প্রজন্মেই এমন বাঙালি কেউ আছে নাকি? টেকনোস্যাভি ছেলেমেয়েরা নেট সার্ফ করে, রবীন্দ্রসংগীতের দু-এক কলি লিখে দিয়ে ভ্যালেন্টাইনস্ কার্ড বানাবে, আজও!

পাঠক মার্জনা করবেন! অবিমিশ্র স্পর্ধা ও আমার নারীবাদী চেতনার উন্মেষ, রবীন্দ্রনাথ পাঠ-অভিজ্ঞতায় আমাকে দিয়ে অনেক বিতর্কিত কথা বলিয়ে নেয় যে! রবীন্দ্রনাথের স্ববিরোধ ও পিতৃতান্ত্রিকতা, আমার জমাট রবীন্দ্র-ভাবনায় সর ফেলে। আর তাই আমি চোখ বুঁজে রবীন্দ্রনাথের ভিতরকার সেই পুরুষটিকে প্রত্যক্ষ করি, যিনি স্ত্রী-র সঙ্গে কোনও পরামর্শ ব্যতিরেক একের পর এক কন্যার বিবাহ স্থির করে আসছেন, বলছেন, হাসিমুখে আনন্দনাড়ূ কাটতে বসার কথা। যেন উৎসবের নিখুঁত আয়োজন-কাণ্ডে অংশ নেয়া ছাড়া, সন্তানের বিবাহের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মায়ের আর কোনও ভূমিকা থাকতে পারে না।

আমার স্বল্পজ্ঞানময় শামিয়ানা খাটানো উঠোন আমাকে ব্যথা দিয়েছে, পীড়িত করেছে খুব। যখন দেখেছি, মেয়েরা, কখনও প্রেমিকা, কখনও-বা সহধর্মিনী কল্যাণময়ী সন্ধ্যাদীপের শিখা জ্বলে জ্বলে নিঃশেষ হয়ে তাকে সম্পন্ন করে গেছেন যাপনে, সৃজনে। আর, সমান তালে পুরুষের পাশে পাশে চলার কমরেডশিপ রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব জীবনচর্যায় মন থেকে মানেনি। যেখানে, আমি, সবিস্ময়, রবীন্দ্রনাথকে লেখা তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর চিঠিপত্র-র কোনও হদিশ পাই না আজও। যেখানে রমাবাঈয়ের মতো উচ্চশিক্ষিতা মহিলাদের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনে শ্রদ্ধার কিছু অভাব দেখতে পাই। রমাবাঈ প্রসঙ্গেই এক জায়গায় দেখি, লিখছেন তিনি, অসীমের সন্ধান পাওয়া মেয়েদের পক্ষে সম্ভব নয়। এটা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস, যে, স্ত্রীলোকের মনন সেই উত্তরণে পৌঁছতে পারবে না কখনও। আর, তাই সবিস্তারে (জানি না, সেই ডিটেইলিয়ের হয়তো থাকবে পরবর্তীকালের রচনাবালীতে ঋদ্ধ-করা নান্দনিকতা ও দর্শনের সাজেশন যা কিনা স্ত্রীকে লেখা ব্যক্তিগত কথন ছাপিয়ে হয়ে উঠবে বিশ্বকবির বাণী) চিঠি লিখেছেন স্ত্রীকে। সে-সব চিঠি, সযত্নরক্ষিত। সম্বোধন করেছেন, ‘ভাই ছুটি’- যাঁর কাছ থেকে অন্তত আকাশে বিচরণের ছুটি মিলত তাঁর বিনা বিরোধে। অথচ নিজে? তিনিও কি মৃণালিনী দেবীকে ডাক দিয়েছিলেন তাঁর ছুটির নিমন্ত্রণে? কখনও? স্ত্রীর মৃত্যুর পর লিখেছেন, ‘স্মরণ’, দিকে-দিকে সাড়া ফেলেছে সে-সব কবিতা, অথচ ব্যক্তিগত জীবনে, কতবার কতভাবে স্মরণ করেছেন ওঁকে? আমরা জানি না, সত্যিই। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর মতোই, এই অধ্যায়ও কুয়াশাঘন হয়ে থাকবে, বিনা শব্দব্যয়ে। রবীন্দ্রনাথের মৃণালিনী দেবী। আমার চেতনায়, মানবীবিশ্বের একচিলতে গবাক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি, উঁকি দিয়ে দেখছেন, খোলা আকাশের নীচে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নাচগানের আসর…আজি দখিন দুয়ার খোলা…যেখানে প্রবেশাধিকার নেই তাঁর, শুধু, নিখুঁত, জলখাবারের উপাচারটুকু সাজিয়ে দেয়া ছাড়া।

একদা, লিখেছিলাম মৃণালিনী দেবীকে, আমার ভাবনামতো, নিজের মধ্যেই বসন্তের ঐশ্বর্যে মজে থাকতে শিখে নিয়েছিলেন যিনি:

ভবতারিণী।/ এই নামটির আয়ু মাত্র ন-বছর নয় মাস।/ তারপর বিবাহ-উত্তরণ,/ একটি পুরুষ-সংশোধন (নাকি কাব্যিক)-/ কবিপত্নী, নাম মৃণালিনী।/ শুনেছি, বিখ্যাত পুরুষের/ কীর্তির খিড়কিদুয়োরে/ আলো দেবে বলে/ কোনও-কোনও নারী ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছে,/ আপনি সে-নিষ্ক্রমণ-বাতিও নন,/ বহুর মধ্যে একাকিনী।/ রান্নাঘরে নিখুঁত মিষ্টান্ন গড়েছেন,/ স্নান দিয়েছেন,/ আর স্বহস্ত অনুদিত রামায়ণ/ লোককথা, কোথায় কুয়াশায় চলে গেছে। মনে হয়,/ আপনি, হ্যাঁ, নিরুপায়, কিন্তু দুঃখিনী ছিলেন কি!/ নিজের জন্য নয়,/ গাজিপুরে, শিলাইদহের বোটে/ জোড়াসাঁকো, শান্তিনিকেতনে/ আপনার হৃদয়পদ্ম ফুটে উঠেছে বারবার,/ পরের কারণে।/ আজ মনে হয়, এই এমনি-ই,/ আপনাকে স্রোতস্বিনী ডাকা যেত যদি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(2)

  1. অফুরন্ত শুভেচ্ছা শ্রদ্ধেয় ‘চৈতালী চট্টোপাধ্যায়’কে! স্বল্প কথায় অনেক সুন্দর করে মৃণালিনী দেবী’র জীবন-সত্যের নিগূঢ় দিকটি তুলে ধরার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। লেখাটি অনেক ভালো লেগেছে! নিরন্তর শুভ কামনা তীরন্দাজের জন্য!

  2. ‘স্ত্রীর সঙ্গে কোনও পরামর্শ ব্যতিরেকে একের পর এক কন্যার বিবাহ স্থির করে আসছেন…’ – কথাটি ঢালাওভাবে মেনে নেওয়া গেল না। কারণ, বড় মেয়ে মাধুরীলতার বিয়েতে পণের টাকা নিয়ে বরপক্ষের সঙ্গে বেশ দরকষাকষি হয়, বরপক্ষের আচরণে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী উভয়েই নাখোশ ছিলেন। তাতে বুঝা যাচ্ছে মেয়ের বিয়ে নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শলা-পরামর্শ ভালোই হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের এই লেখাই তার প্রমাণ : ‘আমাদের বাড়িতে অনেক বিবাহ হইয়া গিয়াছে – আমার কন্যার বিবাহেই প্রত্যেক কথা লইয়া দর দস্তুর হইল। ইতঃপূর্বে এমন ব্যাপার আর হয় নাই। এ ক্ষোভ আমার থাকিবে। দশ হাজারের উপর আবার আরো দুই হাজার চাপাইয়া ব্যাপারটাকে আরো কুৎসিত করা হইয়াছে। পরমাত্মীয়কে প্রসন্ন মনে দান করিবার সুখ যে আমার আর রহিল না, আমাকে পাক দিয়া মোচড় দিয়া নিংড়াইয়া লওয়া হইল। … এ বিবাহে আমার এবং বেলার মার উভয়েরই মনের মধ্যে একটি ক্ষতরেখা রহিয়া গেল, এমনকি তিনি কন্যার মাতা হইয়াও এ বিবাহে যথেষ্ট উৎসাহী হন নাই।’

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close