Home অভিনন্দন চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / শঙ্খ ঘোষকে অভিনন্দন

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / শঙ্খ ঘোষকে অভিনন্দন

প্রকাশঃ December 25, 2016

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / শঙ্খ ঘোষকে অভিনন্দন
0
1

চৈতালী চট্টোপাধ্যায় / সূর্যোদয় আসন্ন তবে?

—————–

সম্পাদকীয় নোট

২০১৬ সালের জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। ৮৪ বছর বয়সী কবি এর আগে ভারতের পদ্মভূষণ হন ২০১১ সালে। পেয়েছেন দেশিকোত্তম, রবীন্দ্র পুরস্কার-সহ ভারতের আরও বহু সম্মান। শঙ্খ ঘোষের আগে ভারতের মাত্র পাঁচজন বাঙালি সাহিত্যিক জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। ১৯৬৫ সাল থেকে ভারতীয় সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য এই পুরস্কার দিয়ে আসছে ভারতীয় জ্ঞানপীঠ। প্রথম বার পুরস্কার পান মালয়ালি কবি জি শঙ্কর কুরুপ। দ্বিতীয় বছর অর্থাত্ ১৯৬৬ সালে জ্ঞানপীঠ পান তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭১-এ দ্বিতীয় বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে পুরস্কার পান বিষ্ণু দে। ১৯৭৬ সালে আশাপূর্ণা দেবী। তিনিই জ্ঞানপীঠ জয়ী প্রথম মহিলা সাহিত্যিক। তার পর ১৯৯০ সালে পুরস্কৃত হন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৯৬ সালে মহাশ্বেতা দেবী। তার দীর্ঘ ২০ বছর পর জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাচ্ছেন কোনও বাঙালি লেখক।]

—————–

যে-ভয়ঙ্কর সময়ের মাঝখান চিরে আমাদের চলাচল, তাকে ব্যাকড্রপে রেখে, এক কথাশিল্পী – প্রায়শই বলতেন, ‘বেঁটে মানুষের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে, সূর্যাস্ত আসন্ন তবে।’ সে-সময় সদ্য পড়ছি পাবলো নেরুদার মেমোয়ার্স, যেখানে উনি লেখেন, ‘The poet gives us a gallery full of ghosts shaken by the fire and darkness of his time.’ শিহর জাগতে গিয়েও থমকে গেছে। কেঁপে উঠতে গিয়েও কাঁপিনি, কেননা তার আগেই তো আমি পড়ে ফেলব শ্রী শঙ্খ ঘোষের সেই অসামান্য সত্তরের দশকমুখি কবিতাখানা – ‘অর্কেস্ট্রা’ :

ভোর এল ভয় নিয়ে, সেই স্বপ্ন ভুলিনি এখনো।

 

স্থির অমাবস্যা, আমি শিয়রে দাঁড়িয়ে আছি দিগন্তের ধারে

দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে

আমার শরীর যেন আকাশের মূর্ধা ছুঁয়ে আছে।

 

বুক থেকে হাতে খুলে নিয়েছি পাঁজর আর তালে তালে নাচে সেই হাত

গ্রহনক্ষত্রের দল ঝমঝম শব্দে বেজে ওঠে।

স্তূপ হয়ে অন্ধকারে সোনাভরা সুর ওই ওঠে আর উঠে ঝরে পড়ে

 

সেই সুরে খুলে যায় নামহারা গহ্বরের মৃতদেহগুলি

পিছনে অলীক হাতে তালি।

অবসন্ন ফিরে দেখি ঘাসের উপরে শুয়ে আছে

 

পুরনো বন্ধুর দল

শিশির মাখানো শান্ত প্রসারিত হাতগুলি বাঁকা।

 

আর, জেনে যাব, কবিতা কখন হিমশীতল আশ্রয় হয়ে ওঠে। যে-নিরাপত্তা নশ^র, তার ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে আবারও আমি পড়ব শঙ্খ ঘোষকে, ‘…আমার অতীত নেই, ভবিষ্যতও নেই কোনোখানে।…’ আর, ‘কবির অভিপ্রায়’ চোখে মেখে মানুষের দৈনন্দিনতায় প্রশ্ন ফেলব, ‘কাল রাত্রে কি কোনো কবিতা পড়েছেন আপনি? কিংবা এই সাতদিনের মধ্যে কখনো? একমাসের মধ্যে? একাকী, গত ছ’মাসে, না-জানা নতুন কোনো কবিতা?’

এত কথার মুখবন্ধ এ-কারণেই, শ্রী শঙ্খ ঘোষ পেলেন ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। এই তথ্যটি জানিয়েই, হাস্যকর ঠেকল খুব! কোনো সম্মানই কি সর্বোচ্চ হতে পারে, ওঁর নক্ষত্র-ছোঁয়া উচ্চতার পাশে? কী অসম্ভব আসক্তিময় হাহাকার নাকি প্রার্থনায় যিনি লেখেন, ‘…ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।’ মন কিন্তু তখনও লালকমল-নীলকমল হয়ে জেগে আছে প্রহরায়। বলছে, ‘তোমার কোনো ভিত্তি নেই / তোমার কোনো শীর্ষ নেই / কেবল তক্ষক,’ আর, আমরা, সেই কবে, অল্পবয়সী ছিলাম যখন, মাথা নীচু করে খুঁটে তুলছি সেইসব, শূন্যতার মোহরগুলি। পাঠ নিচ্ছি, মুহূর্তেই মুহূর্তের শেষ! আরও কী শুনেছি? ‘জীবন তোমার কাছে দাবি করেছিল যেন প্রত্যেক মুহূর্তে তুমি কবি।’ তাকে কি কোনো পুরস্কারে মেপে নেয়া যায়? সম্ভব?

সংকোচে জানাই আজ, ডাকঘর নির্দিষ্ট ঠিকানার সীমারেখা মেনে আমি ছিলাম ওঁর নিকট-প্রতিবেশী। সেই আবাসনে আমার বাসা থেকে ডিঙি মেরে পৌঁছে যাওয়া যেত ওঁর বাসগৃহে। তাই, আমার যাবার কোনো সময়-অসময় ছিল না। অবশ্য ওঁর কাছে কারো জন্যই, ফিরিয়ে দেয়া থাকে কি? যা থাকে, তা হল অগাধ স্নেহ, প্রশ্রয়, বায়না-মেটানো, আর প্রতিটি মানুষকে তার যোগ্য সম্মান! কতবার কতরকমের সংশয়-অসংশয় জড়ো করে ওঁর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। সব মুছে গেছে। বলা ও না-বলা কথা মিলিয়ে উৎপাত করেছি প্রচুর। চোখ বুজে, আজও, স্পষ্ট, দেখতে পাই, শান্তিনিকেতন।

মহালয়ার দিন গৌরপ্রাঙ্গনে ছাত্রছাত্রীদের আনন্দবাজার বসেছে। হঠাৎ আশ্বিনের ঝড় ধুলো-ধুলো করে দিচ্ছে চারিপাশ। তার মাঝখান দিয়ে, জলকাদা না-বাঁচিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন উনি। তখন, রবীন্দ্রভবনের ডিরেক্টর। আবার আমি কিছু অনর্থ ঘটিয়েছি নিজের সঙ্গে। চিঠি দিয়ে ওঁকে জানিয়েছি সেসব। মতামত চেয়েছি। ওই ঝড়ঝঞ্ঝাতে, ছুটে গিয়ে, স্পর্ধার প্রতীকের মতো জানতে চাইলাম, ‘উত্তর?’ ওঁর ক্ষমাসুন্দর কৌতুকের হাসি আর মৃদু কণ্ঠস্বর জানাল, ‘চিঠি পাবে।’ তারপর পূর্বপল্লির পথে, চলে গেলেন, বজ্রবিদ্যুৎভর্তি নিজেকে নিয়ে।

অনেক ঘটনা। ছোট। বড়। যেসব কিনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় এই পরিসরে। এখানে থাক তাঁর সম্মানপ্রাপ্তিতে আমাদের পাওয়া আনন্দের কথা। প্রণাম ও শ্রদ্ধাভাবনা। একটু হলেও থাক আমার কন্যার কথা। যে ওঁর ‘সকালবেলার আলো’ গায়ে জড়িয়ে নিয়ে, ‘সুপুরিবনের সারি’ পথে হাঁটতে হাঁটতে বড় হয়ে গেল অনেক। এখনও এই বই দুটি ওর উজ্জ্বল উদ্ধার!

আমি, আমার ঝোলা ব্যাগে, একসময়, পারলে এই এখনও এমনকী, শঙ্খ ঘোষের ‘জার্নাল’ নিয়ে ঘুরেছি। পথে, বিপথে পড়েছি সে-বই। আর, যেভাবে প্রবাদ বলে থাকে, বাইবেলের যে-কোনো একটি পাতা খুললেই তুমি পেয়ে যাবে সংকেত ও পথনির্দেশ, তেমনই ওই নানা মাপের এন্ট্রিগুলি আমার চিন্তায় অন্ন ও জল যুগিয়েছে কত, কতবার!

লিখেছিলাম ‘অনুমানভজনা’ (উৎসর্গ শ্রী শঙ্খ ঘোষ) :

আমার রক্তপাতে অন্যের বিঘœ ঘটে,

ব্যথা তাই তাকে তুলে রাখি!

আমার দশদিক শুধু বারুদে ভরেছে,

আমি দেশলাই কখনও জ্বালিনি!

আমার চোখের সামনে কাঁটাতার,

নীলমণিলতা দিয়ে ঢাকি!

ওই যে মৃতের আড্ডা, ‘ভালোবাসি’, বলি,

অমনি মাথা নেড়ে ওরা জেগে ওঠে!

শুনুন, উপরোক্ত সব-ই, এ-কবিতা যে লিখেছে তার,

ভুলেও না-করা কর্মগুলি!

সে তো দূরত্বে থাকে,

অনুমানভজনা করে, তবে,

হয়তো একদিন ইচ্ছে হবে

আজ, সূর্যাস্তের ক্ষণেও, এই অদ্ভুত বন্ধ্যা সময় যখন, শঙ্খ ঘোষের এই সম্মানপ্রাপ্তি, সূর্যোদয়ের সিলভার-লাইন বুঝি সকলের কাছে। আর, আমরা যারা নানাভাবে ওঁর কাছ থেকে, ধ্বংসস্তূপে আলো কুড়িয়েছি, আশ্রয় খুঁজেছি, আজও খুঁজি…হ্যাঁ, এই লেখা সেই কৃতজ্ঞতা।

কলকাতা, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. বুক থেকে হাতে খুলে নিয়েছি পাঁজর আর তালে তালে নাচে সেই হাত
    গ্রহনক্ষত্রের দল ঝমঝম শব্দে বেজে ওঠে।
    স্তূপ হয়ে অন্ধকারে সোনাভরা সুর ওই ওঠে আর উঠে ঝরে পড়ে”

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close