Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ চড়ুইভাতি > ছোটগল্প >> নাহার মনিকা

চড়ুইভাতি > ছোটগল্প >> নাহার মনিকা

প্রকাশঃ June 20, 2017

চড়ুইভাতি > ছোটগল্প >> নাহার মনিকা
0
1

চড়ুইভাতি > ছোটগল্প >> নাহার মনিকা

ফরাসি থেকে আক্ষরিক অনুবাদ করলে জায়গাটার নাম এলোমেলো দ্বীপ। নদী আছে চারপাশে, মাঝখানে বাড়িঘর। জমি এখনো কোথাও কোথাও ঢালু। রাস্তার বাঁক শুরুর পরে ছোট্ট কাঠের ব্রীজ, পার হলে আরেকটা অর্ধ বৃত্তাকার চক্করের প্রায় অর্ধেক জুড়ে পাশাপাশি চার পাঁচটা ছোট্ট কটেজ। রাস্তার উলটো দিকে অবশ্য বেশ আলীশান বাড়িঘরও আছে। তাদের পেছনদিকে শেষ আগস্টের মরা-হাজা নদী, পানি অল্পই। ক’দিন বাদে পাতায় রং ধরে ঝরা শুরু হলে এই পানিরও আর জমে বরফ হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না।

কটেজগুলোর একটা গত পরশু এসে দেখে গিয়েছি। দু’পাশে দুটো শোবার ঘর, মাঝখানে টয়লেট, শাওয়ার। আর ঢোকার মুখে বড় ঘরটায় সোফা ডাইনিং টেবিল ইত্যাদি সমেত কিচেন। কাঠের বেড়া ভেতরে নতুন হলেও বাইরে থেকে পুরনো, জীর্ণ। মুখ ধোবার আলাদা বেসিন নেই, বাকী সব কাজ চালানো মতন। কি আর করা, মাত্র তো সপ্তাতিনেকের মামলা, এত ভাবলে চলে? শহরের ভেতরে কায়সারের কলেজ, আমার কলসেন্টারের জব, সবকিছু বাসা থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে। কিন্তু এবার বাসা বদলের ফ্যাসাদে পড়ে গেছি। আগের এপার্টমেন্ট ছাড়ার নোটিশ দিয়েছি, কিন্তু নতুন এপার্টমেন্টের চাবি পেতে আরো সপ্তা তিনেক লাগবে। কায়সার এয়ার বি এন বি’র ওয়েবসাইট ঘেটে শহরতলীতে এ’কটা দিন থাকার বন্দোবস্ত করেছে। হোটেল, মোটেলে থাকার চেয়ে সস্তা। নিজেদের মত রান্নাবান্না করে থাকা যাবে। বাড়ি বদলের মত একটা অনিত্য বিষয়কে মাথার বোঝা বানাবো না- এইমত সিদ্ধান্ত নিলেও কারণে অকারণে আমাদের মেজাজ ভালো থাকছে না ইদানিং। দোষারোপের তীর মনের তুণে গোজা থাকে, রকমফের দেখলেই যেন ছিলা ধরে টান মারা যায়।

কটেজ মালিক এন্টোনিও, ডাক নাম টোনি  বয়সে যুবক। কৌতুক করে বললো- ‘মন্ট্রিয়ালে ইটালিয়ানদের প্রতি পরিবারে একজন করে টোনি পাবেন যাদের দাপ্তরিক নাম এন্টোনিও।

-‘আমরা যেদিন আসবো তার আগে একটু সাফ সুতরো করে দেবেন প্লিজ’!

সে জোর দিয়ে বললো-‘একদম ভাববেন না’।

নাহ, আর ভাববো কি? ভাবনা চিন্তা ভবের ঘাটে ভাসিয়ে দিয়ে রওনা দিলাম।

গাড়িতে যা কিছু এটেছে তা এই সপ্তা তিনেকের বসবাসের জন্য যথেষ্ঠ না হলেও জিনিষপত্রের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে বাদ দিয়েছি। নিজের শহরে ভ্রমনার্থীর মত আমাদের আগেও নিশ্চয়ই আরো মানুষ থেকেছে। নিজেকে বশ মানানোর মোক্ষম অস্ত্র বের করি, বুঝ দেই- বিপদ, মারণব্যাধি, দূর্ঘটনা ইত্যাদি মানুষের জীবনেই ঘটে। আর এতো মাত্র কয়েকটা দিন। নিজেকে পরিস্থিতির জোয়ালে বেঁধে ফেললেই ল্যাঠা চুকে যায়।

-‘এটা ট্রানজিট টাইম। মনে করো আমরা কোন এয়ারপোর্টে আটকা পড়েছি’,- কায়সার আমাকে বোঝাতে বসে।

যেন মনে করা আর অনুভব করা এক।  যেন চাইলেই আমি বন্যা আক্রান্ত কিংবা পাহাড় ধ্বসে পড়া মানুষদের যাতনা বুঝতে পারবো।

– আহ, কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা।

-‘কলেজে ছাত্র পড়ানোয় যতই পারঙ্গম হও না কেন, বৌকে বোঝাতে, আর তার কথা বুঝতে ধৈর্য্য লাগে’।

গলায় ঝাঁজ বেড়ে যাওয়ার আগেই আমরা থামি। টোনিকে নিয়ে কথা শুরু করি। এই বয়সেই কি ব্যবসাবুদ্ধি বাব্বা! বছর দশেক আগে সত্তর হাজার বর্গফুট জায়গা কিনেছে পানির দামে। পৌর কর্পোরেশন এখনো বাড়ি বানানোর ছাড়পত্র দিচ্ছে না। ঢালু জমি, বন্যা হবে ইত্যাদি বায়ানাক্কা তুলে আটকে রেখেছে। কিন্তু ও কি এ জমি পতিত রাখবে? গ্রীস্মকালের কটেজ বানিয়ে ভাড়া দেয়। পোর্টেবল এসব বাড়ি খুব সস্তা, পুরানো কিনতে পাওয়া যায়। অনলাইন বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাদের মত লোকও এখানে পৌছে গেলাম। আর দিনের পর দিন নাছোড়বান্দার মত সিটি কাউন্সিলের পেছনে তো লেগে আছেই যাতে বাড়ি বানিয়ে বিক্রির অনুমতি পাওয়া যায়।

-‘পারমিশন না দিয়ে সিটি কাউন্সিল যাবে কই? শহরে কত লোক আসছে দেখছো না, ছেড়ে দিতে হবে পথ’, – নাটুকে কণ্ঠে কায়সার বলে, ‘টাকার কুমীরের ওপর বসে আছে টোনি। এই মুহূর্তে ঘুমন্ত কুমীরটা নড়ে উঠলেই সত্তর হাজার ডলারে কেনা জমিতে বিশ বাইশটা বাড়ি বানিয়ে একেকটা তিন, সাড়ে তিন লাখ ডলারে চোখ বন্ধ করে বেচবে’।

-‘গত কয় বছরে এদিকটা কত ডেভেলপড হয়েছে দেখেছো’?

তা হওয়ার কথাই তো। শহরের আয়তন বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। আর এখানকার স্থানীয় ফরাসিরা যারা জাত্যাভিমানে ভোগে তারা পাততাড়ি গুটিয়ে দূরের শান্ত শহরগুলিতে চলে যাচ্ছে। তাদের ছেড়ে যাওয়া এলাকায় ইমিগ্রান্টরা নিজেদের ঘেট্যো বানিয়ে থাকছে।

তা, করিৎকর্মা টোনি কটেজ দিব্যি সাফ করে রেখেছে। ডাইনিং টেবিলে ম্যাপল পাতার প্রিন্টের নতুন রেক্সিনের টেবিল ক্লথ। পরিস্কার ফ্রিজের ভেতর মিনারেল পানির বোতল। চুলার পাশে সেদিন যে গুচ্ছের বীয়ারের ক্যান দেখেছিলাম, সেগুলো উধাও হয়েছে।

জিনিসপত্র নামাতে নামাতে দেখলাম লাগোয়া কটেজের সামনে দুটো লোক। কায়সারও এগিয়ে যায়। মিনিট দুই পর সবাই আমাদের দরজায়। জোসেফ আর ব্র্যান্ডন। জোসেফ দাঁতের মাড়ি দেখিয়ে হাসে-‘তোমাদের ঘরদোর আমিই সাফসুতরো করেছি’।

সে নাকি সংবৎসর এখানে থাকে। বলে কি? ভয়াবহ শীত পড়লে কি করো?

নাহ, টোনি ওর ঘরের বেড়াটেড়া পাকাপোক্ত করে দিয়েছে। পোক্ত মানে দু’পরত কাঠের বেড়ার ভেতরে শৈত্য অপরিবাহী নতুন অন্তরণ দিয়েছে। এতে ঘরে শীত ঢোকে কম। আর  ভেতরের হিটিং তো আছেই।

জোসেফের বড় নীল চোখের নিচে ঝুলে আসা ত্বক, উঁচু নীচু আর হলদেটে দাঁত। মাথায় শাদা ক্যাপের দু’পাশ দিয়ে লম্বা চুল নেমে এসেছে। ব্র্যান্ডন সে তুলনায় যুবক, মুখে তার হাল ফ্যাশনের দাড়ি, পরন্ত বেলায়ও চোখে সানগ্লাস। দু’জনেই জানালো যে কোন সাহায্য লাগলে সব সময় তাদেরকে পেতে পারি।

বারান্দায় এসে বসতেই দুটো কাঠবেড়ালি সামনের গাছ থেকে তরতরিয়ে নেমে এলো। আমি ঘর থেকে  বিস্কুট এনে ছুঁড়ে দিলাম, তারা আশপাশে তাকিয়ে চলে যায়, খায় না। আবার সামান্য দূরে গিয়ে নমস্কারের মত হাত বুকের কাছে নিয়ে বিনীত ভঙ্গী তৈরী করে কাঁপতে থাকে।

বৈয়ামভর্তি খোসা ছাড়ানো আখরোট এনেছিলাম। খুলে একমুঠো হাতে করে যেই না ছড়িয়ে দিয়েছি, ওমনি তারা লাফিয়ে দু’হাতে ধরে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে একেকটা বড়সড় আখরোট কিচ কিচ করে খেয়ে ফুরিয়ে আরেকটার দিকে ধেয়ে যায়।

আমাদের বাঁ দিকের কটেজের সামনে দুটো বীচ চেয়ার পাতা। সেখান থেকে আততায়ীর মত এক সিৎঝু কুকুর কাঠবেড়ালিগুলোর ওপরে ঝাঁপিয়ে আসে। কিন্তু গলায় বেল্ট বাঁধা শরীর বেশীদূর আসতে পারে না। শব্দ শুনে ওই কটেজের দরজা খুলে আরেকজন বেরিয়ে আসে। শর্ট প্যান্টস আর বুশ শার্টে ভুঁড়ি আর দাড়ি গোঁফের ফ্রাঙ্ক তার পরিচয় দিয়ে হাত বাড়ায়। এখানকার গলফ কোর্সে গরমকালে কাজ করে আর শীতকাল শুরু হলে সে তার বাবা মায়ের কাছে নিউ ব্রন্সউইকে চলে যায়। বাবা মা বিচ্ছেদ হলেও পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বন্ধুর মত থাকে এটাই তার বড় শান্তির জায়গা। একটু হকচকিয়ে যাই, মাত্র পরিচয় হলো- এত ব্যক্তিগত কথা বলছে!

এখানে বড় বড় ম্যাপল আর বার্চ গাছে ঘেরা মানুষের বসবাসের সারল্যও পানির তলায় ঠাণ্ডার মতো বুকের ভেতর স্পর্শ করে! শশ্রুগুলফ সমেত ফ্রাঙ্ক যখন বাবা মায়ের কথা বলে মনে হয় নিতান্ত বালক। মাই মাদার না বলে বলছে মাই মাম। আমি চোরা হাসি চেপে রাখি যতক্ষণ না তার কুকুর ইয়াঙ্কিকে বুকে চেপে সে ঘরে ঢুকে বাটি ভর্তি বাদাম নিয়ে আসে।

  • আমি দেখছি তুমি কাঠবেড়ালিদের খাওয়াতে ভালোবাসো, এগুলো রাখো।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্মিতহাস্য বিনিময়ে সীমিত ছিল আমাদের আগের বাসায় বসবাস।  সে তুলনায় এখানে তিন প্রতিবেশী নিজের দেশে গ্রামের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। দু’দিন বাদে একদিন কাপ হাতে করে দুধ ধার করে নিয়ে গেল-‘কফির দুধ ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রচন্ড কফি তেষ্টা পেয়েছে। পরে ফেরত দেবে।

আমি সুখের হাসি দেই- ‘আমাদের পাড়ার মা চাচীদের কথা মনে করিয়ে দিলে তুমি।’

জোসেফ আর ব্র্যান্ডনকে রোজ বিকেলে ঘরে ফেরার সময় দেখি। ব্র্যান্ডন গিটার বাজায়। আমাদেরকে দেখলে বসা ছেড়ে উঠে আসে। আমরা চায়ের কাপ নিয়ে আখরোটের কৌটা নিয়ে কাঠবেড়ালিদের নিমন্ত্রণ করি। ফ্যাঙ্ক তার ইয়াংকিকে স্নান করিয়েছে, বেশ ধোপদূরস্ত। কোলে করে রাখে বলে সে আর কাঠবেড়ালির দিকে তেড়ে যায় না। কাঠবেড়ালির বাদাম খাওয়া নিয়ে আমরা হাসি। জোসেফ বলে-‘শীতকালের জন্য পাকস্থলী ভর্তি করে রাখছে। তাই বেশী খাচ্ছে, আমার মতো।’

সত্যি তো, দীর্ঘ-নিরাময়অযোগ্য-নিষ্ঠুর শৈত্যের দিনে এই নিরীহ প্রাণীটি কি খায়? থাকে না হয় গাছের কোটরে, বাড়তি লেপ কম্বলও লাগে না। লেজের মধ্যে যথেষ্ঠ পশমী আস্তরণ রয়েছে। কিন্তু ক্ষুধা? জোসেফও তাই করে?

– ‘ইয়েস, ইয়েস, প্রচণ্ড শীতে আমি বের হবো আমার কি মাথা খারাপ! মাঝে মাঝে দু’তিন দিন না খেয়ে থাকতে ভালোই লাগে আমার। মনে করি আমি হচ্ছি হিমালয়ের নির্বাসন নেয়া সাধু।’

ব্র্যান্ডন ওর পেটে গুতো মেরে বলে- ‘এই করে করে এটার কি রকম বারোটা বাজিয়েছো দেখো।’

জোসেফ ওর খোঁচা পাত্তা না দিয়ে উদাস গলায় বলে- ‘আসলেই আমার শখ ছিল জানো, একদিন এভারেস্ট মাউণ্টিংয়ে যাবো। আমার চেয়েও বেশী শখ ছিল আরেকজনের’।

গল্পের গন্ধ পেলেও কায়সার আড্ডা ভেঙে উঠে পড়ে, আগামীকালের ক্লাশ লেকচারের জন্য তাকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

আমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকি, কিন্তু জোসেফ আর কথা বলে না। ব্রান্ডন তার গীটারটা নিয়ে টুং টাং করে। নতুন শিখছে। একই লাইন বার বার বাজিয়ে মকশো করে-‘ ইফ ইউ মিস দ্য ট্রেইন আই এম অন, ইউ উইল নো দ্যাট আই এম গন’।

আমাদের কমন পরা পুরানো গান, আমিও গুন গুন করি।

সন্ধ্যার সূর্য হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যার মতো আলোর ফুল ছড়াতে ছড়াতে অস্ত যায়। গাছের পাতারা কালো ছায়ায় স্তব্ধ হয়ে থাকে। আমরা গলা মেলাই- ‘লর্ড আই এম ফাইভ হানড্রেড মাইলস এওয়ে ফ্রম হোম।

আড্ডা ভাঙার আগে জোসেফ জানতে চায়- ‘তুমি প্রতিদিন কি রাঁধো, এত চমৎকার ঘ্রাণ বাতাসে ছড়ায়।’

আমার হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা এদের নিয়ে পিকনিক করলে কেমন হয়!

না না ওই বাস্কেট ভরে খানা খাদ্য নিয়ে পার্কে চাদর বিছিয়ে খাওয়ার পিকনিক না। একে বলে চড়ুই ভাতি। সবাই মিলে রান্না করবো। আমাদের কটেজের সামনে। পোর্টেবল গ্যাসের চুলাটা আমরা ভাড়া করা স্টোরেজে  রেখে এসেছি। কাল ফেরার পথে নিয়ে আসবো।

শনিবার ভালো স্বাস্থ্যের পটল পাওয়া গেল দেশী দোকানে, সঙ্গে নধর বেগুন। মাংশ আর বাসমোতি চাল কিনে ফিরতি পথে দেখি জোসেফ হেঁটে হেঁটে কালভার্ট পার হচ্ছে। পিঠে একটা হ্যাভারস্যাক। রুটি আর বীয়ার কিনতে নিশ্চয়ই।

সদাইপাতি নামিয়ে রেখে এক কাপ চা নিয়ে বাইরে এসে বসি।

এখান থেকে কোনাকুনি তাকালে নদীর ধার দেখা যায়। সূর্যাস্ত দেখা যায় না, কিন্তু অস্তগামী সূর্যের আভা এসে পূর্বাকাশও খানিকটা লাল করে দিয়ে যাচ্ছে। কাঠবেড়ালীগুলি সুড়ুৎ সুড়ুৎ সামনে পিছে করে আমার মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আলসেমী ভেঙে ঘরে গিয়ে আখরোট আনতে ইচ্ছে করছে না। দেই, আরেকটু পরে দেই। প্রাণীকুলের সঙ্গে নিষ্ঠুর হওয়ার ভালোদিক, মন্দ দিক নিয়ে ভাবতে থাকি। কাঠবেড়ালীর তো আর প্রতিবাদী হওয়ার উপায় নাই। নখদন্তহীন বলেই এমন ভাবতে পারি। এদের জায়গায় যদি সাপখোপ হতো, আমার ভাবাভাবি পালানোর পথ পেতো কি? তবু আমি উঠি না, বাঁদিকের রাস্তায় ততক্ষণে জোসেফ ফিরে আসছে। দূর থেকে আমরা পরস্পর পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছি। ও আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আজকে ব্রান্ডন, ফ্র্যাঙ্ক ওরা কেউ এখনো ফেরেনি।

এসেই হৈ হৈ শুরু করে দিলো- পিকনিক তাহলে হচ্ছে কাল সকালে?

-সকালে না, যা রাধবো তা সন্ধ্যেবেলায় ভালো। বিকেলে শুরু করবো।

-জানো, আগামীকাল পূর্ণিমা। এখানে চাঁদনী রাত খুব অনুভবের বিষয়, ছিরিছাদ ছাড়া কটেজগুলোকে স্বর্গের আবাস মনে হয় তখন’- জোসেফকে কল্পনাপ্রবণ দেখতে বেখাপ্পা লাগে।

ও সিড়িতে বসে পড়ে।

-‘কী, কই গেছিলা একা একা’?

-‘চৌরাস্তার স্মোক মিট রেস্তোরা আজকে ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। আমার কাছে আগের একটা কুপণ ছিল, বলতে পারো একরকম বিনা পয়সায় পাওয়া গেল, ব্র্যান্ডন এর জন্য নিয়ে আসলাম’,- তৃপ্তির আরেক নাম সম্ভবত মিঠে হাসি। একটা পা আমাদের ঘরের পাটাতনে তুলে দিয়ে আয়েশ করে সিগারেট ধরায়।

– ‘তোমাকে কোথায় দেখছি বলতো?’

– ‘আমাকে?’, মন্ট্রিয়ালে আমার আগের বাসা একদম ডাউনটাউনে, শেরব্রুক স্ট্রিট। ওদিকটায়  তুমি গেছো কখনো?

না, অতদূরে ওর গতায়াত নেই।

ওর ভবঘুরে চেহারা, গরীব হালত দেখে আন্দাজে ঢিল ছুড়ি। আগে কাজ করেছি এমন এনজিও’র নাম করে বলি- আমার অফিসে তুমি আসছিলা হয় তো। আমাদের এণ্টি স্মোকিং প্রোগ্রাম আছে। তুমি কি অনেকদিন সিগারেট খাও?”

-‘হ্যা, তা প্রায় তিরিশ বছর তো হবেই। তবে তোমাদের অফিসের মতন অফিসে আরো সিরিয়াস কারণে গেছি। আমি নেশাগ্রস্থ হয়ে গেছিলাম। প্রায় বারো বৎসর নিয়মিত পট খাইতাম’, ক্ষয়া দাঁতের দেখা মেলে আবার।

-‘তারপর ছাড়লা কি করে’-

-‘ঐ অফিসে গিয়ে হেল্প নিলাম। অত সহজ ছিল না। কিন্তু শরীর খারাপ হচ্ছিল, আর ড্রাগ নিতে পারতেছিলাম না। পেটে আলসার হয়ে গেছিল। অপারেশন করে হাসপাতালে থাকলাম প্রায় দুই মাস। তখন ড্রাগের নেশা ছুটে গেছিল। কিন্তু সিগারেট ছাড়তে পারি নাই, দেখো, এটা সঙ্গে নিয়েই কফিনে ঢুকবো।’

পরদিন আমাদের পোর্টেবল গ্যাস কুকার স্টোভ জ্বলে উঠলে তিন মূর্তিমান চারদিক ঘিরে ধরে সসপ্যানে মুরগী মশলা ইত্যাদি ঢালা দেখে।

কায়সার ঘোষণা দেয়-‘আমার বৌ এর রান্না করা উড়তে না পারা এই পাখিটা যে না খেয়েছে তার জীবন বৃথা।’

ব্র্যান্ডন ওর গীটারে সুর বাজায়- ইফ ইউ মিস দ্য ট্রেইন আ’ম অন, ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস এওয়ে ফ্রম হোম।

ফ্র্যাঙ্ক সামনের আঙিনা ঝাড়ু দিয়ে পাতা সরিয়ে চেয়ারগুলি গুছিয়ে দিয়েছে।

কায়সার সবাইকে বীয়ারের ক্যান খুলে সার্ভ করে।

ঢাকনা খুললে তরকারীর ঘ্রাণে নাকের ফুটো জোরসে ফুলিয়ে বাতাস টানে জোসেফ।

– ‘ঘ্রাণ দিয়ে পেট ভরিও না। স্পেশাল ডেসার্টও আছে।’

– ‘কি ডেসার্ট খাবো আমরা?’

চালকুমড়োর মোরাব্বা, পাঞ্জাবে একে বলে পেঠা। মিষ্টান্নও সারা ভারতবর্ষে কত ভ্রমণ করেছে, তা নইলে মোরব্বা কি করে পাঞ্জাবে গিয়ে পেঠা হয়ে যায়? আমি অবশ্য পেঠাকে আরো মোরব্বা বানাতে এক লিটার দুধ ঘন করে আধলিটার বানিয়েছি। এক কৌটো নারকোলের দুধ মিশিয়ে জ্বাল দেবো, তাতে এলাচ আর লবঙ্গ। মোরাব্বায় চিনির আস্তর থাকলেও আরো খানিকটা মিষ্টি দেবো। তারপর মোরাব্বার টূকরোগুলি দিয়ে দুধ জ্বলতে জ্বলতে মাখন মাখন, নারকোল নারকোল ঘ্রান ছড়াবে তখন আঁচ কমিয়ে অনেকক্ষন রেখে দেবো। আমাদের গ্রামের মোরব্বা পাঞ্জাব হয়ে মন্ট্রিয়ালে এসে মানচিত্র আকঁবে।

জোসেফ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে। ব্র্যান্ডন ওর আইপ্যাড আনতে যায় দৌড়ে- ‘দাঁড়াও রেসিপি লিখে নেই।’

কপট রাগ দেখাই- ‘এখন রেসিপি লিখে আমার রান্নার দেরি করিয়ে দিলে খেতেও দেরী হবে বলে দিলাম। আর এসব তুমি ইউটিউবে পাবে।’

-‘না না’, জোসেফ সজোরে মাথা নাড়ে। ‘সব যদি ইউ টিউবে পাওয়া যেতো! আমার আইরিশ দাদী যে অনেক পেয়াজকুচি আর একটু পনির মিশিয়ে কিমা দিয়ে পাই বানাতো, তা আমি ওই হতচ্ছাড়া ইউটিউবে কত খুঁজেছি! আমি নিশ্চিত তোমার এই সুইট ডিশ ভেরী স্পেশাল।’

সন্ধ্যার কমলা রং ফিকে হতে দিয়ে আমরা পাঁচজন গ্যাসের চুলার পাশে ঘন হয়ে বসি। হাড়িতে মাংস সেদ্ধ হচ্ছে। ফ্রাঙ্ক খুশীতে বাগ বাগ- বলে, ‘আজকে দারুণ ভোজ হচ্ছে, মনে হচ্ছে আমরা জঙ্গলে কাঠ কাটি আর খাই! সন্ধ্যেবেলা আগুন পোহাই।

আচমকা জোসেফ বলে ওঠে- আমার মতে ইথিওপিয়ান ফুড সবচে মজার।

আমিও এবার সোজা হয়ে বসি- ‘শোন, আমাদের খানাদানা পৃথিবীতে সেরা। আমার রান্না খাও, আঙুল চেটে চেটে ঘরে যাবে বলে রাখছি।

কায়সার আমাদেরকে থামায়, বলে- ‘আমাদের এই স্বল্পায়ু আবাস সুখকর করে তোলার জন্য তোমাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। চিয়ার্স!’

-‘শোন তাহলে, আমি একবার মুসলিম হয়েছিলাম। অফিশিয়ালি নাম পরিবর্তন করে হয়েছিলাম ইউসুফ। জোসেফ থেকে ইউসুফ।’

-‘আর নাম বদলের ফি জোগাড় করতে গিয়ে ফতুর হয়ে গেছিলে’- এবারও ব্র্যান্ডন গলায় কৌতুক আর ঝাঁজ মিশিয়ে বলে। এই ছেলেটা জোসেফের নাড়ীনক্ষত্র সব জানে!

আমাদের বিস্মিত তাকানো পাশ কাটিয়ে জোসেফ গুন গুন করে বলতে থাকে- ‘ইথিওপিয়ান মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। কিভাবে তা জানতে চেয়ো না। এখানে তো মুসলিম মেয়েরা লিগ্যালি খ্রিস্টান বা অন্য বিধর্মীদের বিয়ে করতে পারে। আর আবেবে আমাকে কোন জোর করে নি কিন্তু আমিই ইচ্ছা করে, মনে হয়েছে ওকে খুশী করি। ও খুশী হলে আমার ভালো লাগবে। আহা সেই সেই ভালোবাসা যার জন্য আবারো জন্মাতে পারি আমি। আবেবেকে যদি দেখতে তাহলে আমার কথা বিশ্বাস করতে। কী দারুণ চীজ বানাতো ঘরে। মশলাদার কিমা জারিয়ে কিট্টো বলে একটা পদ রাঁধতো। আর কী দারুণ সব টার্ট, পুডিং। এখন মনে হয় আমি আবেবে’র সঙ্গে সঙ্গে ওর রন্ধনশৈলীরও প্রেমে পড়েছিলাম’। দু’টো বৎসব, হ্যা পাক্কা দুই বছর এমন সুখে ছিলাম আমি, প্রতিদিন ভোরে মনে হতো বীজ ফেটে সদ্য নতুন চারা হয়ে গজাচ্ছি আমি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে শিশুর বিস্ময় নিয়ে দেখতে পারছি, কারণ আমার সঙ্গে আছে আবেবে। ইংরেজি বা ফরাসি দু’টোর কোনটাই ভালো জানতো না। তখনো বেশীদিন হয়নি সে এখানে এসেছে। ওকে দেখে আমার মনে হয়েছে এই নারীটির ত্বক স্পর্শ করলে ওর ভাষা বুঝবো আমি। ওকে ছুঁয়ে থাকার প্রতিদিন আমার ভেতরে নতুন বৃক্ষের অংকুরোদ্গম হতো।’

– ‘আর আমরা এখন বুড়ো হাবড়া পাইন গাছ দেখছি’,- ফ্রাঙ্ক এবার খোলাগলায় হেসে পরিবেশ হালকা করতে চায়।

-‘আবেবে এখন কোথায়?’ – কায়সার জানতে চায়।

জোসেফ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। পূর্ণিমা রাতের আলো ওর কপালে এসে লাগে। হঠাৎ খেয়াল করি সে তার ক্যাপ খুলে রেখেছে, কাঁধের দু’ধারে নেমে চুলে তাকে ঋষির মত দেখায়।

-‘ আমরা ওল্ড মণ্ট্রিয়ালের দিকে থাকতাম। আবেবে একটা সিনিয়র সিটিজেনদের হোমে কাজ করতো, পার্ট টাইম, আর পার্ট টাইম ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখতো। বুড়ো বুড়িদের স্নান করাতো। এ কাজটা ওর ভালো যে লাগতো তা আমাকে স্নান করিয়ে দেয়া দেখে বুঝতে পারতাম। কী যে মায়াময় একেকটা স্নান এর স্মৃতি আছে আমার। আমার মনে হয় আবেবে যত মানুষকে স্নান করিয়েছে, তারা তাকে ভুলতে পারেনি। মনে হয় যারাই ওই মেয়েটির হাতের স্পর্শ পেয়েছে তারা তাকে নিজের করে রেখে দিতে চেয়েছে। আমি তো অনেক সৌভাগ্যবান যে ওর ঠোঁট স্পর্শ করতে পেরেছিলাম’।

-‘আবেবে এখন কোথায় জো?’ এইবার আমি অস্থিরতা প্রকাশ করে ফেলি।

‘আমি সিনিয়ের হোম থেকে ওকে আনতে যেতাম। বাস মেট্রো করেই যেতাম। বাসে করে ফিরবে তাতে আনতে যাওয়ার কি? এই নিয়ে ও ঠাট্টা করতো। কিন্তু আমার ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ভালো লাগতো। ও শেষ করতো রাত ন’টায়। আমার ওদের রিসেপশনে বসে থাকতেও ভালো লাগতো, দেখতাম ও পরিস্কার টাওয়েল নিয়ে মেম্বারদের ঘরের দিকে যাচ্ছে। আমার দিকে নরম করে চেয়ে একটু হাসতো। তাতেই আমার মনপ্রাণ সজীব হয়ে উঠতো।  তো ডিসেম্বরে ক্রীসমাস এর দু’দিন আগে ওকে আনতে যাচ্ছি। মেট্রো থেকে বেরিয়ে এক দমকা কনকনে বাতাসে মুখ মাথা বরফ বানিয়ে চলে গেল। আমি জ্যাকেটের হুডে মাথা ঢেকে হন হন করে হাটছি। মিনিট পাঁচেকের পথ।’

‘আহ!’, জোসেফের কণ্ঠ ভেঙে ভেঙে আসে। ‘চারতলা বিল্ডিংটার সামনে ভীড় আর আকাশে লেলিহান আগুনের শিখা। রাতে কাল ধোয়া দেখার উপায় নেই। মানুষের চিৎকার, এম্বুলেন্সের আওয়াজ, ফায়ার ব্রিগ্রেডের সাইরেন সবকিছুর ভেতর আমি আবেবের মুখ দেখলাম দোতলার এক জানালায়। ওর হাত দেখতে পেলাম, যেন হাতটা কাঁচের জানালা ঘষে পিছলে নিচে নেমে যাচ্ছে’।

– ‘তারপর?’ আমি, কায়সার দু’জনই রুদ্ধশ্বাস।

জোসেফ চুপ করে যায়। ব্র্যান্ডন জানায় যে সেটি মণ্ট্রিয়ালের স্মরণকালের বড় অগ্নিকাণ্ড ছিল। ঐ ওল্ডহোমের বারো জন মানুষ, আবেবেকে নিয়ে তেরজন পুড়ে গেছে। ও নাকি অন্যদের সাহায্য করতে করতে নিজেকে বাঁচাতে পারেনি।

ডিনার সার্ভ করা হলে জোসেফ হাত গুটিয়ে বসে থাকে-‘আমার এসব খাবার খাওয়া মানা। ইতিওপিয়ান মশলাদার খাবার এত খেয়েছি যে স্পাইসি ফুডের কোটাও শেষ হয়ে গেছে।’

সবাই আবার পার্টি মুড ফিরিয়ে আনতে হৈ চৈ শুরু করে দেই।

– ‘তোমরা খাও, আমি দেখি। আমি আমার ডিনার করে ফেলেছি, এই চড়ুইভাতির প্রক্রিয়া রান্নার প্রনালী, মশলার সুঘ্রাণ, চারপাশ ঘিরে আমাদের বসে থাকা এতে আমার খাওয়া হয়ে গেছে।’

সহসা জোসেফকে কেমন দূরের মানুষ বলে মনে হয়। কয়েক হাত দূরের নিজের কটেজের দিকে হাঁটা দিলেও মনে হয় অনেক দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। ওর চুল চাঁদের আলোয় জলপ্রপাতের মত কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে আসছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. সত্যিই, দু-চোখকে অশ্রুসিক্ত করার মতো একটি অনিন্দ্যসুন্দর গল্প! পড়ে অনেক ভালো লাগল। লেখকের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। আর তীরন্দাজের জন্য অশেষ শুভ কামনা।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close