Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ ছেয়ানব্বই টাকা আর তেলাপিয়া মাছের গল্প > ছোটগল্প >> শারমিন শামস্

ছেয়ানব্বই টাকা আর তেলাপিয়া মাছের গল্প > ছোটগল্প >> শারমিন শামস্

প্রকাশঃ June 25, 2017

ছেয়ানব্বই টাকা আর তেলাপিয়া মাছের গল্প > ছোটগল্প >> শারমিন শামস্
0
0

ছেয়ানব্বই টাকা আর তেলাপিয়া মাছের গল্প

এক

তাদেরকে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে। তারা সব মিলিয়ে পাঁচজন। একজন ক্যামেরাম্যান, একজন ডিরেক্টর, একজন নায়ক আর দুই নায়িকা। মোট পাঁচজন। পাঁচজনের একটা টিম হলেই একটা ছবি নেমে যায়। তারা ছবি নামাচ্ছিলেন। কিন্তু মাঝপথে পুলিশ বাগড়া দিয়েছে। তারা এখন বসে আছেন থানা হাজতের বেঞ্চে। কতক্ষণ বসে থাকতে হবে জানা নাই। ছবির যিনি ডিরেক্টর, তার নাম সূজন চৌধুরী। সে একটার পর একটা ফোন করছে। কিন্তু কাউকেই ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত কেউ ফোন ধরছে না। সূজন চৌধুরীর মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে ছিল। এখন সেখানে আতঙ্ক। সে একটু পর পর বেঞ্চে এসে বসছে। আবার উঠে যাচ্ছে। তার তরবরানি দেখে একজন ডিউটি পুলিশ বেশ জোরে একবার হুংকার দিলেন।

ওই মিয়া, কীসের এত ছুটাছুটি!

সেই ঝাড়ি খেয়ে সূজন চৌধুরীর তরফর কিছুটা কমেছে। কিন্তু মনের অস্থিরতা কমে নাই। সেই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে তার শরীরে। সে ক্রমাগত পা নাচাচ্ছে। ক্যামেরাম্যান ইদ্রিস সূজনের পায়ের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে একটা ছোট হাই তুললো। পাশে বসা কাইসুল (সে এই সিনেমার নায়ক) চোখ বন্ধ করে বসে আছে। সোমা এদের সবাইকে দেখলো। কাইসুল ঘুমিয়ে গেছে কি-না বোঝা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতেতে ঘুমানোর কথা না। তার পাশে বসা পপি কান্নার দমকে একটু পর পর হেঁচকি তুলছে আর সোমার হাত চেপে ধরছে। এই মেয়ে এই লাইনে নতুন। ফলে বিপদের ব্যাপারটাও এই প্রথম ঘটেছে তার সঙ্গে। বিপদ মানে এই থানা পুলিশ। সোমা সেই তুলনায় একটু অভিজ্ঞ। এর আগেও তারা ধরা খেয়েছিল। সেইবার কীভাবে কীভাবে যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছাড়া পেয়েছিল। দলের আরো কয়েকজনকে একরাত হাজতে থাকতে হয়েছিল বটে, কিন্তু সকাল বেলাতেই হাসিমুখে তারা ফিরে এসেছে। সোমার ধারণা এইবারও তারা ছাড়া পেয়ে যাবে। খুব তাড়াতাড়ি।

সোমা পপিকে একটু ধাক্কা দেয়।

– এ্যাই কাইন্দো না। এত কান্না কেন?

বিরক্তিতে সোমার চোখ ছোট হয়ে আসে। সেদিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যায় পপি। এই লাইনে সোমা তার সিনিয়র। যদিও এই জগতে তাদের নাম অন্য। সোমার নাম সুমাইয়া। আর পপির নাম ফাগুন। তাদের নায়ক কাইসুলের নাম সালমান। এইসব নাম দিয়েছে ডিরেক্টর। ছবির শুরুতে তাদের নাম আসে। ছবি মানে নীল ছবি। সোমা পপি আর কাইসুল নীল ছবিতে অভিনয় করে। সূজন তার ডিরেক্টর।

সোমা আবার সূজনের দিকে তাকায়। সূজনকে একটু স্থির দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত কারো সাথে যোগাযোগ করা গেছে। সোমা এদিক-ওদিক দেখে। ঘরটা বড়। তাদের যেখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে আরো দুইটা বেঞ্চ মতো আছে। সেখানে দুটো লোক বসে আছে। দুইজনই মুখ বিকট হা করে ঘুমাচ্ছে। কোন হুশ নেই। থানায় বসে কেউ এত আরামে ঘুমাতে পারে জানা ছিল না সোমার। ওর খুব খিদে পেয়েছে। এই অবস্থায় খাওয়ার কথা বলার কোন সুযোগ নাই। সেই সাত সকালে রুটি খেয়ে বেরিয়েছিল। এখন বাজে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। কথা ছিল ঘণ্টা তিনেক শুটিং হবে। তারপর টাকা দেয়া হবে। সেই টাকা নিয়ে বাজারে যাওয়ার কথা সোমার। সে থাকে ফার্মগেটের একটা সাবলেট ঘরে। কাল থেকে পাউরুটি খেয়ে আছে। সকালে অবশ্য একটা ডিম খেয়েছিল। আজ বাজারে যাবার কথা। ভেবে রেখেছিল আজ মাছ কিনবে। তেলাপিয়া মাছ। কদিন ধরে তেলাপিয়া মাছ পিঁয়াজ দিয়ে ভুনা করে খেতে ইচ্ছে করছিল। দাম দেখে এসেছে সেদিন। বেশি না, কাছের বাজারে একশ ত্রিশ টাকা কেজি। বড় একটা হাফ কেজির কিনবে। মটরশুটিও কিনবে আধা কিলো। সব ঠিক ছিল। মাঝখান থেকে এই যন্ত্রণা। শুটিং তো হলো না। টাকা পাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নাই। হাজতটাজত, থানা পুলিশ, মামলা, মান অপমান সব ভুলে সোমা এখন টাকাটার কথাই ভাবতে থাকে। টাকা পাওয়া হলো না। তিনদিন ধরে শুটিং করেছে। আজ শেষ দিন ছিল। তো এখন ছবি যদি শেষ না হয় আর পুলিশের ঝামেলা চলে, ডিরেক্টর কি আর টাকা দেবে? দেবেই বা কি করে, দেবার মতো পরিস্থিতি তো থাকতে হবে আগে।

পাশে বসা পপি বেঞ্চের হাতলে হাত রেখে তার ওপরে মাথা দিয়ে রেখেছে। সবাই ক্লান্ত। কখন কি ফয়সালা হবে কে জানে। নাকি কোর্টেই চালান করে দেবে? এখন দুশ্চিন্তা হচ্ছে। রাতে কি বাসায় ফেরা হবে? কেউ কি এবার ছাড়াতে আসবে তাদের? নাহ, কোন আলামত নাই। সূজন বসে আছে ঘাড় গোঁজ করে। সোমা আস্তে আস্তে সূজনকে ডাকে।

– কিছু করতে পারলেন?

সূজন তাকায়। তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। তারপর বেশ ঝাঁঝের সাথে বলে, চেষ্টা করতেসি। দেখি কি হয়।

– কী চেষ্টা করতেসেন? কাউরে তো কিছু কইতে দেখি না। কতক্ষণ বসায়ে রাখছে…

– কিছু যে কয় না, সেটাই ভালো লক্ষণ। চুপচাপ থাকো। একজন আসবে এখন। তিনি ব্যবস্থা নেবেন।

সোমা আর কথা বাড়ায় না। তার এখন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। শরীর বড় ক্লান্ত। সারাদিন খাওয়া নাই। মাথাটাও ব্যাথা ব্যাথা। বোধহয় এসিডিটি। ছোটকাল থেকেই তার এই সমস্যা। না খেয়ে থাকলেই মাথা ধরে, গা গুলায়। একটু ভালো লাগবে এই আশায় পপির মতো সেও বেঞ্চির হাতলে ক্লান্ত মাথাটা রাখে। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে হুট করে।

 

দুই

‘সুমাইয়া সুমাইয়া…এই…এই… ওই সুমাইয়া…আরে ছেড়ি উঠ’

সোমার মনে হয় বহুদূর থেকে কেউ ডাকছে। কাকে ডাকছে? সুমাইয়া নামটা চেনা চেনা। কিন্তু তার যেন মনে হচ্ছে, তাকেই ডাকছে। সে একবার সাড়া দেবে বলে ভাবে। কিন্তু ঘুমে চোখ এমনি জড়িয়ে আসছে, কীভাবে সাড়া দেবে, হাত নেড়ে নাকি কথা বলে- বুঝে উঠতে পারে না সে। একবার কিছু একটা বলার চেষ্টা করে বটে। কিন্তু কোন কথা কিছুতেই বের হয় না মুখ দিয়ে।

এইবার একটা ধাক্কা। ঘাড়ে। আস্তে নয়। বেশ জোরেই।

তর কি মাথা খারাপ? থানাই বইসা মরণ ঘুম দিছস?

এইবার প্রায় লাফ দিয়ে উঠে বসে সোমা। তার নামই যে সুমাইয়া, তাকেই যে ডাকা হচ্ছিলো, সেটাই ঠিকমত ধরতে পারছিল না সে। তবু চেষ্টা করছিল একটা কিছু বলার। কিন্তু…! অবাক চোখে সে আশেপাশে তাকায়। সূজন আর কাইসুল দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই বসা পপি আর ক্যামেরাম্যান ইদ্রিস। সুমাইয়া বোকার মতো তাদের দিকে চেয়ে থাকে।

– আমাদের ব্যবস্থা হইসে

– হইসে?

আনন্দে প্রায় চেচিয়েই উঠেছিল সোমা।

হুস! ঠোঁটের ওপরে আঙুল রেখে তাকে থামতে বলে কাইসুল।

– এত চ্যাঁচায়ো না।

সূজন আবার ফোন কানে নেয়। একটু ওদিকে সরে কার সাথে যেন কথা বলে ফিরে আসে।

– আমরা যাইতে পারমু। বড় ভাই নিতে আসছে। ম্যালা ট্যাকা পয়সার ব্যাপার। তয় ঝামেলা আরেকটু আছে।

– কি? কি ঝামেলা?

সূজনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে সুমাইয়া। জবাব দেবার আগে এক মুহূর্ত চোখাচোখি হয় সূজন আর কাইসুলের।

– তোরে যাইতে অইবো। বেশি দিন না। তিন চার দিন।

প্রায় ফিসফিস করে বলে সূজন।

– আমারে? কই? কই যাইতে অইবো?

– আছে। একখানে নেবে। শুধু ট্যাকায় কাম হয় না। চিন্তা নিস না। অসুবিধা হবে না। ফিরত এসে আবার কাম করতে পারবি। আর যদি না যাস, এইখানেই পচে মরবি। আমরাও। তাই তাফালিং করিস না। এমুন তো না যে নতুন কিছু। এই কইরাই খাস। এখন শুধু পেমেন্ট পাবি না। কিন্তু বদলায় মুক্তি পাইবি। বুঝছোস?

এক নিঃশ্বাসে ফিসফিসিয়ে কথাগুলো বলে থামে সূজন। কিন্তু সোমার দিকে তাকায় না। কাইসুলও না। দুজনেই তাকিয়ে আছে দুই দিকে। যেন এই কথার পর আর কোনো কথা চলে না।

পাশে বসা পপিকে দেখে সোমা। মনোযোগ দিয়ে হাতের নখের গাঢ় ম্যাজেন্টা কালার নেইলপলিশ দেখছে সে। কোন কথাই যেন কানে ঢোকেনি তার।

– আমারে কে নেবে?

শিশুর মত প্রশ্ন করে সোমা।

– কে নেবে হেইডা তাগো ঘরে গেলেই জানবি। এতো জাইনা কি করবি এখুন? মনে রাখিস যে নেবে তারাই তর আমার রক্ষাকর্তা। বুঝছোস?

এরপর আর কোন কথা হয় না। আধাঘণ্টার ভিতরে থানা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে তারা পাঁচজন। থানা থেকে বেরিয়েই সোমার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে একটা সাদা রঙের মাইক্রোর দিকে প্রায় টেনে নিয়ে যায় সূজন। যেন শক্ত করে চেপে ধরে না রাখলে পালিয়ে যাবে সে। অকারণেই সূজনের এত সাবধানতা। সে তো যাবেই। না গিয়ে উপায় নাই। সেও জানে। সে কোন প্রতিবাদ করে না। সূজন তাকে প্রায় টেনে নিয়ে আসে মাইক্রোর কাছে। সাঁই করে খুলে যায় দরজা। ভেতর থেকে কেউ একজন খরখরে গলায় বলে, ভিত্রে ঢুকো।

জায়গাটা অন্ধকার। গাড়ির ভিতরে কয়জন, কিন্তু কিছু বোঝা যায় না। সোমা টের পায় তার নিতম্বে হাত রেখে পেছনের সিটে যেতে ঠেলছে কেউ। সে নিঃশব্দে উঠে যায়। ঝট করে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ির দরোজা।

 

তিন

আমি যে ঘরে শুয়ে আছি, সেই ঘরটায় কোন ফ্যান নাই। কোন খাটও নাই। আমি শুয়ে আছি মেঝেতে। একটা চাদর বিছানো, তাতে। কোন বালিশও নাই। আমারে দুইবেলা খেতে দেয়। ভাত আর সবজি। কোন কোন দিন ডাল। গত ছয় দিন ধরে এই চলতেসে। আমি কবে বাড়ি যাবো, জানি না। দিনের এই সময়টায় আমার ছুটি। এই সময়টায় চোখ বন্ধ করে আমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম আসে না। সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়া আমি ছোট্ট ঘরটায় দাঁতে দাঁত চেপে শুয়ে থাকি।

আমারে আনার পর থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন পুরুষ আমার সাথে শোয়। একবার না। একেক জনে দুই তিনবার বা তারো বেশি। এরা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কোথা থেকে যেন আসে। আর সকালে এরা চলে যাবার পর যে লোকটা আমার খাবার আর পানি দেয়, সেই লোকটাও আসে। তার খিদাও কম না।

আমি কবে মুক্তি পাবো, আমি আসলেই জানি না। এদের জিজ্ঞেস করেছি। বলেছে, পাবো। কবে পাবো তার কোনো উত্তর নাই। আমাকে রাখা হয়েছে তালা দিয়ে। কেন আমারে তালা দিয়ে রাখছে, তারো কোন উত্তর নাই। লোকগুলার শখের কোনো শেষ নাই। যত রকম নোংরা ইচ্ছা আছে, সবই তারা আমার উপর দিয়া মিটায়ে নিতে চায়। এখন এই ভর দুপুরে, খা খা রৌদমাখা দিনে, আমি টের পাই, আমার শরীর ভেঙে পড়ছে। আমি আর পারতেসি না। পাতলা চাদরের বিছানায় কোনমতে হাত পা কুকড়ায়ে আমি পড়ে থাকি।

বাইরে খুব রোদ হচ্ছে আজ, বুঝতে পারি শুয়ে শুয়ে। চোখ বন্ধ করে তলপেটের ব্যাথাটাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করি আমি। বাড্ডায় আমার ছোট ঘরটার কথা মনে পড়ে। পাশের বাড়ির বুড়ি খালার কথা মনে পড়ে। কাঁচাবাজারের পাশে ছদরুলের সিডির দোকানের কথা মনে পড়ে।

আমাকে কবে ছেড়ে দেবে আমি জানি না। আমাকে পুলিশে ধরেছিল। আমি নীল ছবির নায়িকা সুমাইয়া। একটা ছোট চিপা ঘরে নীল ছবির শুটিং হয়। আমি কাইসুল আর পপি সেই ছবিতে পার্ট করি। এই নিয়া আমার এখন আর কোন অনুতাপ নাই। তেরো বছর বয়স থেকে আমি দেহ বেচে খাই। তেরো বছর আমার নাম ছিল সোমা। সেই নাম পাল্টায়ে ছবি, রানী, মিনাক্ষী হয়ে এখন হয়েছে সুমাইয়া। এখনও আমার একই কাজ করতে হয়। কিন্তু নিজের ইচ্ছায়। আমি কারো কাছে বাধা না। আমি একটা বাড়িতে নিজের টাকায় ভাড়া থাকি। নিজের ভাত নিজে কিনে খাই। বোরখায় মুখ ঢেকে চলি। এলাকায় আমারে অত কেউ চেনে না। চিনলেও ঘাটায় না। সব দিক ম্যানেজ করা আছে। ওই সূজন আর কাইসুলই সব করে। এইসব ম্যানেজ করার বদলি ওরা সপ্তায় দুই-তিন দিন আমার ঘরে কাটায়। এটা একটা চুক্তিমতো।

আমাদের পুলিশে ধরছিল। এখন ওরা ছাড়া পেয়ে গেছে। কিন্তু আমি পাই নাই। যারা ওদের ছাড়ায় নিছে, তারা আমারে ধরে নিছে। এইটা আরেকটা চুক্তি। সূজন কাইসুলের সাথে এদের চুক্তি। চুক্তি আমারে নিয়া, কিন্তু আমি এর কোনো পক্ষেই নাই। আমি আছি এই গরমে আগুন হওয়া ঘরের মেঝেতে, ঘামতেসি। তলপেটে ব্যাথা, হয়তো রক্তও যাইতেসে। তাতে কিছু যায় আসে না। সন্ধ্যায় এরা আবার আসবে।

হঠাৎ আমার শরীর আরো খারাপ লাগতে থাকে। পানির পিপাসাও পায়। অথচ এই ঘরে কোনো পানির ব্যবস্থা নাই। বেশ্যার পানি খাওয়া লাগে না বলেই এদের ধারণা। আমি শুধু বেশ্যাই না, খারাপ ছবির নায়িকা। জগতের যত অপকর্ম আছে সবই আমি করি। শুধু যে করি তাই না, আলোর নিচে, ক্যামেরার সামনে করি। আমারে মানুষের কাতারে কেউ ফেলে না। রাস্তার ধারের আবর্জনার সাথে এক কাতারে ফেলে। আমি তাতে কিছু মনে করি না। এইসব মনে নিলে পেটে ভাত, তেলাপিয়ার তরকারি জুটে না। ইস, আবারো তেলাপিয়ার কথা মনে আসতেসে। বাড়িতে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ার ইচ্ছা হইসিলো। হইলো না।

আবার একটা ব্যাথার ঝলক আমার সারা শরীরে পাক দিয়ে ওঠে। আমি কাতরাতে থাকি। মনে হয়, আমি আর বাড়িতে ফিরবো না। হয়তো মরে যাইতেসি। বিছানায় পেটের ভিতরে হাত পা ঢুকায়ে দিয়ে আমি ব্যথাটা কমানোর চেষ্টা করি। কমে না। বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করে রোদ বাড়তে থাকে। ঘরের ভিতরটা আরো উত্তপ্ত হয়ে যায়। ঘামে সারা শরীর ভিজে যায় আমার। তেষ্টা বাড়ে। মাথার ভিতরটা শূন্য- যেন আমি ভেসে উঠতেসি আবার ডুবে যাচ্ছি। যখন ডুবতেসি তখন ডুবতে ডুবতে কোথায় যেন তলায়ে যাচ্ছি। কী কষ্ট কী কষ্ট। কেউ কি আছে পানি দেবে আমাকে? ওই লোকটা কই যে আমাকে খাবার দেয়? খাবার দিতে না আসুক, অন্তত আমাকে খাবলে খাবার জন্যও তো সে সারাদিন অপেক্ষায় থাকে। তার ওস্তাদরা গেলেই সে ঝাপায়ে পড়ে আমার উপ্রে। সে কই? সে আসলে বলতাম, আমারে একটু পানি দাও। বেশ্যার পিপাসা হয়। বেশ্যার প্যাটে ব্যাথা হয়। বেশ্যার রক্ত যায়। বেশ্যারও ধর্ষণ হয়!

সারাদিন আমি পড়ে পড়ে কাতরাই। লোকটা আসেনা। কেউ আসে না। মাগরেবের আযানের শব্দ পাই। মরা বিকালের আলো সরে গিয়ে অন্ধকার নামে। মনে হয়, এই ঘর থেকে আর কোনদিন মুক্তি হবে না আমার। হয়তো আজই আমার জীবনের শেষ দিন। হয়তো আর কোনদিন বাড্ডায় ওই বাড়িতে ফিরবো না। হয়তো আমি মরে যাচ্ছি। ব্যাথার ঘোরে আমি বুঁদ হয়ে থাকি। ঘুমাই, না জ্ঞান হারাই, জানা নাই আমার। সন্ধ্যার অনেক পরে নাকি কিছু পরেই, বুঝি না, দরজা খুলে ঢোকে কেউ।

– ওই ওই মাগি, যাহ, যাহ বাড়ি যাহ!

আমি কোনমতে চোখ তুলে তাকাই, দেখার চেষ্টা করি লোকটাকে। চিনতে পারি। সেই খাবার দেয়া লোকটা।

যাহ্! তারাতারি ভাগবি। এইখান থেকে বের হয়ে সোজা যাবি গলি ধরে। তারপর বড় রাস্তায় উঠে কিছু দূর সামনে গিয়ে তারপর ট্যাক্সি নিবি। বাসে উঠবি না খবরদার। এই নে ভাড়ার টাকা।

পিপাসায় আমার বুক ফেটে যায়। তবু আমি হাঁচরেপাচরে উঠে বসি। লোকটা অস্থির চোখে এদিক ওদিক তাকায়। কোথা থেকে একটা চাদর এনে আমার হাতে দিয়ে বলে, এটা গায়ে জড়া।

আমি কোনমতে চাদরটা গায়ে জড়াই। তারপর শরীরে যতটুকু শক্তি আছে তাই নিয়ে যত তারাতারি পারি বাড়িটা থেকে বের হই। পিছন থেকে লোকটা চাপা স্বরে বলে, ওই খানকি, আস্তে যা। কারো লগে কথা কবি না।

বড় রাস্তা পর্যন্ত আসতে আমার জীবনের বাকি শক্তিটুকু ক্ষয় হয়ে যায় প্রায়। নিজেকে কোনমতে টেনে আনি সে পর্যন্ত। তারপর ট্যাক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি। আমার হাতে একটা কড়কড়ে একশো টাকার নোট। ট্যাক্সি ভাড়া। যদি আমি ট্যাক্সিতে না উঠে বাসে উঠি, তবে টাকাটা বেঁচে যাবে। তাই দিয়ে আজকের রাতের খাবারটা কেনা যেতে পারে। আর একটু ব্যাথার ওষুধ। বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি ঝটপট হিসাব কষি। পাশ দিয়ে হুশ হাশ শব্দে ট্যাক্সি যায়। কেউ কেউ গতি ধীর করে জানতে চায় কোথায় যাব আমি। আমি কিছু কই না। বোকার মতো সামনে তাকাই। আমার থেকে একটু দূরেই বাস এসে থামে একটা। ফারামগেট ফারামগেট- কনডাকটার চ্যাঁচায়। কয়েক মুহূর্ত ভেবে কী না-ভেবেই আমি ছুট লাগাই। বাসটা ধরতে হবে। বাসের ভাড়া চার টাকা। বেঁচে যাবে ছিয়ানব্বই টাকা। চাল, মসুর ডাল, আলু আর কাঁচামরিচ। পারলে একটা ডিম। তেলাপিয়া মাছ এইবার আর হবে না। শরীর সারলে তারপর তেলাপিয়ার কথা ভাবা যাবে। ভাবতে ভাবতেই আমি বাসের হ্যান্ডেল ধরে উঠে পড়ি। কোণে একটা খালি সিটও পেয়ে যাই। চাদরটা দিয়ে ভালো করে জড়াই মাথা মুখ। তারপর চোখ বুজে হেলান দিই সিটে।

আমি বাড়ি যাচ্ছি আর আজ রাতে গরম ভাত ডাল তরকারির জন্য পুরো ছেয়ানব্বই টাকা আমার ডান হাতে ধরা আছে!

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close