Home ছোটগল্প ছোটগল্প ‘সাক্ষাৎ’ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

ছোটগল্প ‘সাক্ষাৎ’ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

প্রকাশঃ December 30, 2016

ছোটগল্প ‘সাক্ষাৎ’ / রাজিয়া সুলতানা অনূদিত
0
0

হেনরি জেমসের ছোটগল্প ‘সাক্ষাৎ’

রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

সেদিন, তার মৃত্যুর পর, তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কেউ একজন বলল যে সে অনেক বছর বেঁচে ছিল। অনেক লোকের সাথে তার জানাশোনা ছিল এবং সে অনেক জানত অথচ “কী দুঃখের বিষয় যে তার কথা কেউ লিখে রাখেনি!” লন্ডনের কোন সমাধিফলকে এ কথার অর্থ ছিল সম্পূর্ণ বোধগম্য। বর্তমানে এ বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। একজন শ্রোতা অনেক নোট লিখে রেখেছিল, কিন্তু সেখানে উপস্থিত থাকাকালে  সে তা স্বীকার  করেনি। নিচের গল্পটা তার যথার্থ নিদর্শন-পরদিনই আমি তা হুবহু  লিখে রাখি। তার স্মৃতিকথাগুলোর মধ্যে আমি এটা কঠিনভাবে বাছাই করে সংরক্ষণ করি; অন্যগুলোর চেয়ে এটা মন্দ নয়। আপনাদের মূল্যায়নের জন্য সময়মতন আমি সেগুলোর কিছু কিছু এখানে উল্লেখ করব।

সে বছর শহরে এক মেয়েলোকের সাথে আমার দেখা হয়। আমি যখন কিশোরী  ছিলাম, তার সাথে আমার কদাচিৎ দেখা হতো; সে পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল; পাঁচবছরে একবার আসত। খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি, বিয়ের পর যার যার পথে চলে যাই। আমরা নিজেদের মধ্যে ঠিক করে   নিতাম যে অগাস্টে ইংল্যান্ডের পশ্চিমে নির্দিষ্ট কয়েকটা ভ্রমণে যাবার সময় আমি  তাকে সঙ্গে নেব এবং সে অল্প দূরে কর্নিশ সীমান্তে থাকত বলে আমার জন্য খুব সুবিধা ছিল। অন্যান্য কাজে আসা যাওয়ার পথেই তা পড়ত। আমি ব্যবস্থা করে  ফেলতাম। সে আমাকে তার বাড়ি দেখাতে চাইত, তার মেয়েকে দেখতে আসতে বলত, সে লন্ডনে আসত না- বরং অনেক বোঝানোর পরও তার ভাই ও ভাইয়ের  গৃহশিক্ষকের সাথে একমাসের জন্য দেশের বাইরে চলে যেত। এ পর্যন্ত মিসেস চ্যান্ট্রি  আমাকে যাকিছু দেখাতে সক্ষম হয়েছে তা হল তার স্বামী, যিনি মফস্বল শহরের এক  বনেদি ভদ্রলোক; বিস্তর সম্পত্তি আর পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত পুরনো বিশাল এক বাড়ির    মালিক তিনি । অন্য এলাকায় কিছু না হলেও এই পুরনো শহরের প্রাণ হচ্ছেন তিনি।

চ্যান্ট্রি কোর্টে যাবার দুদিন আগে যেসব লোকজনের কাছে এই শহর থেকে আমি আগেও গিয়েছি, তারা দশ মাইল দূরে আমাকে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নিয়ে গিয়েছিল। আমি রাজি ছিলাম তাতে। লম্বা ড্রাইভ ছিলো সেটা তাই আমরা মধ্যাহ্নভোজে থেকে গেলাম। বাগান ও আরও কিছু স্থান তারা দেখাতে চেয়েছিল, আমরা চা খেয়ে আর যেতে চাইনি কারণ, নৈশভোজের আগেই আমাদের বাড়ি পৌঁছুতে হবে। সেখানে অনেক লোক ছিল। মধ্যাহ্নভোজের আগে আগে একটা খুব সুন্দরী মেয়ে ড্রয়িং রুমে এলো। বয়স কুড়ির নিচে, ফুলের মতো সুন্দর, সতেজ, মনোরম এক কুমারী-তার প্রকাশভঙ্গিটা দেখে মনে হলো এরকম কাউকে আমি চিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাম সে কে-পরিচয় দিয়ে বললো যে সে মিস চ্যান্ট্রি। আমি বললাম আমি ওর মা আর ওর সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছি। শুনে ও এতোটাই ভয়  পেয়ে গেলো যে বলতেই পারলো না আমার কথা আগে সে কখনো শুনেছে এবং বিরক্তিভরে প্রকাশ করলো যে আর কখনও সে আমার ব্যাপারে কিছু শুনতে চায় না। এরপরও আমার ভাবতে কোনো অসুবিধে হলো না মেয়েটি সুন্দর, কারণ, মানুষ  কিভাবে নিজেকে প্রকাশ করে এর ওপর ভিত্তি করে আমি মানুষের ভালোমন্দ বিচার  করিনে। এইটুকু জ্ঞান আমার আছে। আমি দেখলাম লুইজা চ্যান্ট্রিকে আমি যা-ই  ভাবি না কেন-তার সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা কঠিন। যে বাসায় আমি কল করি সে সেখানে থাকে, সে একা এখানে এসেছে-যেন লোকেরা এখানে তার বন্ধু, বলতে গেলে প্রতিবেশী, কদিন পরই সে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এই বাসায় কোনো কন্যা নেই কিন্তু অসম্ভব তারুণ্যে ভরা জীবনঃ উপাচার্‍্যের ওখান থেকে দুটো মেয়ে এসেছে, একটা বিবাহিত ছেলে, তার স্ত্রী, এক তরুণ বিধ্বস্ত যুবক এবং আরেক যুবক যে আগে থেকেই সেখানে আছে।

মধ্যাহ্নভোজের সময় লুইজা চ্যান্ট্রি আমার উল্টোদিকে বসল, কিন্তু কথা বলার জন্য সেটা ছিল দূর। উঠে যাবার পূর্বমুহূর্তে আবিষ্কার করলাম যে আমার সঙ্গে অভদ্র  ব্যবহার করলেও আসলে সে প্রাণহীন প্রকৃতির নয় বরং প্রবল একটা কিছু তার মধ্যে আছে শুধু সাবধানে সে নিচু লয়ে চলছে। এই মেয়ের রক্তে একটা কিছু খেয়াল করলাম। ছেলেটাকে দেখে সে আকর্ষণ অনুভব করছে সেটা কেউ ধরতে পারেনি। এক তরুণ যুবক যার কথা আগেই বলেছি-সে এই বাসায় থাকে। সন্দেহ হলো এই যুবককে দেখে। আড়াআড়িভাবে মেয়েটির মুখোমুখি সে টেবিলে আমার পাশেই বসেছিল। মেয়েটির, ভঙ্গিমা, মুখ, নড়াচড়া, হাবভাব দেখে কেমন যেন বিকারগ্রস্ত লাগছিল ওকে। পাছে ধরা পড়ে যায় এই ভয়ে মেয়েটি খুবই সতর্ক ছিলো–কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য না করলে আমি কখনও এরকম ভাবতেই পারতাম না। খেয়াল করলাম, এই পুরো সময়টুকুতে মেয়েটি শুধু একবার এই যুবকের মুখ থেকে চোখ নামিয়ে নিয়েছে।  লক্ষ্য করার মতো হয়তো তেমন কোনো বিষয় নয় এটা কিন্তু এই যুবককে ঘিরে একটা নাটকীয়তা ওর আচরণে এবং এই সেই হচ্ছে এর নায়ক। আমার বাঁদিকে বসে  ছিলো যে অতিথি, সে হলেও কথা ছিলো তার মধ্যে অন্ততঃ কিছু ছিলো। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম তখন সে “এই ছেলে! এতো আমার ভাগ্নে,” বলে যেন তার সম্পর্কে বলে দিলো যেন ওর মামা সম্পর্কে আমার আরও বেশি জানা প্রয়োজন ছিলো।

আমরা বাসার উঁচু চত্বরে বসে কফি খেলাম; এই চত্বরটি ছিলো সারিবদ্ধভাবে বানানো ঘরগুলোর এক চতুর্থাংশ, দেখতে বেখাপ্পা কিন্তু মনোরম পরিবেশ, ঘাসের নিঃশব্দ মখমলের ওপর যেন কোন শোভাযাত্রায় চাকরগুলো পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল- আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ওরা। এইবার আমি অতিথির ভাগ্নেকে ভালো করে দেখে নিলাম এবং আমার বান্ধবীর মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বললা্ম। আমি  ইতিমধ্যে খামোখা একটা অস্পষ্ট উদ্বেগ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছি। আমার মনে আছে আমি কী যেন হাতড়ে খুঁজছিলাম, স্বতস্ফূর্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,-“মাগো, আমি কি   তোমার জন্য কিছু করতে পারি? খুব সম্ভব তোমার আগেই তোমার মায়ের সাথে আমার দেখা হবে। তাকে কিছু বলতে হবে?” শুনে মেয়ের মুখ রক্তিমবর্ণ, সে  অন্যদিকে মুখ ঘোরালো। অনেকদিন পার হবার পর মনে হয়েছে আমার দিকে তার  সেই ক্ষুদ্র কম্পিত, উত্তেজনাপূর্ণ অনিচ্ছা-দৃষ্টি যেন বলছিল, “ওহ, আমার আমিকে বাদ দিয়ে, শুধু আমাকে নিয়ে যাও!” ভাসা-ভাসাভাবেই কী আর প্রবলভাবেই কী এই তরুণ লোকটার কাছ থেকে এই মেয়েকে সরিয়ে নেয়ার কিছু ছিলো না। মধ্যমগোছের  এক ব্যক্তি সে, আলুথালু, বিবর্ণ, পুরনো জীর্ণ-বস্ত্র তার একটার সাথে অন্যটার কোনো মিল নেই- এই যুবক এরকম একটা সম্পর্কে একদম বেমানান। আমি একটা মনগড়া থিওরি দাঁড় করালাম-এই ছেলেটি বহু যুবকশ্রেণীর একজন যে ভাগ্যের সন্ধানে কলোনিতে যোগ দিয়ে, নানানরকম বিচিত্র সব অদ্ভুত মানুষের সাথে মিশে শেষ  পর্যন্ত কপর্দকশূন্য হয়ে বাড়ি ফেরে। বাদামি, সুশ্রী, মসৃণ মুখ, সামান্য অহংকার আছে  তার, সহজ একটা আত্মসচেতনভাব নিয়ে থাকে যা নিয়ে বাসায় কেউ কেউ কথাও তুলত। সে ঘুরে বেড়াত, বাসার চত্বরে সিগারেট খেত, কেউ কিছু বলত না তাকে, ভবঘুরে ধরনের ছিলো সে। লুইজা চ্যান্ট্রি উপাচার্যের কাছ থেকে আসা একটা মেয়ের সাথে পায়চারি করতে চলে গেল- পার্টি শেষ হয়ে গেলে ভাগ্নেও কোথায় উধাও হয়ে গেল।

ঠিক হল আমার বন্ধুরা আর আমি সাড়ে পাঁচটার মধ্যে রওনা দেব, মাঝখানে আমি একলা হবার জন্য প্রার্থনা জানালাম। আমার হাতে অনেক কাজ। আমি তখন বইয়ের  স্তূপ গড়ে তুলেছি। একটা লাইব্রেরী যেন-পুরনো বই, নতুন ছাপানোগুলো, এতো কাজ করেছি যে আমার হাতের দস্তানা ময়লা হয়ে গেছে। অন্যান্যদের মধ্যে বেশির ভাগই গিয়েছে গীর্জায়, এই সময়টুকুর জন্য সবকিছু এখন আমার অধিকারে। আমি রুমের ভেতরে ঘুরে ঘুরে সব দেখছি-নানানরকম ছবি, এক কোণ থেকে  আরেক কোণ, এক কেবিনেট থেকে আরেক কেবিনেট পর্যন্ত চীনা বাসনপত্রের বাহার। অবশেষে আমি ছোট একটা রুমের প্রবেশদ্বারে এসে পড়লাম-এখানে অন্যরকম। পর্দার ফাঁকে ফাঁকে, দরোজার পাশে সাজানো মখমলের ওপর রাখা সারি সারি উন্নতমানের পুরনো অসাধারণ সব প্লেট। ভেতরে ঢুকবো-এমন সময় যেন ছিটকে পড়লাম। দেখলাম-জানালায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমার দিকে পিছন ফিরে বাইরে তাকিয়ে আছে দুজন-আমি সঙ্গে সঙ্গে অনুধাবন করলাম ওরা ভেবে নিয়েছে এখানে ওরা একা এবং ওদেরকে কেউ দেখছে পাচ্ছে না। এদের একজন লুইজা চ্যান্ট্রি, অন্যজন সেই ভাগ্নে।   ওরা এমনভাবে দাঁড়িয়ে যে আমাকে দেখার কথা নয় ওদের। ওদেরকে চিনে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে নিজের সঙ্গে বুঝতে লেগে গেলাম আমি। একটু বাধা অনুভব করলাম তারপর সরে এলাম একেবারে। আমি জানতাম না ভেতরে গেলেই বা কেন ওদেরকে   এভাবে আবিষ্কার করবো। অপ্রস্তুত বা বিব্রত হবার মতো কিছু ঘটেনি। ওরা একে অন্যকে ছুঁয়ে ছিল না, শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলছিলও না। ওরা কি জানালা দিয়ে কিছু দেখছিল? জানিনা। শুধু জানি, মধ্যাহ্নভোজের সময় যা পর্যবেক্ষণ করেছি তাত্থেকে এখন এক ধরণের দায়িত্ব অনুভব করছি। আমি বোধকরি ওদের মধ্যকার সুন্দর ভাবটা ভেঙ্গে দিয়েছি যদিও কিছুতেই মনে হয়নি এ ব্যাপারে আমার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু পরবর্তীতে মনে হয়েছে মাথা ঘামালেই ভালো করতাম।

আমি রুমগুলো ডিঙ্গিয়ে ঘরের বাইরে চলে এলাম। চোখে পড়ল বাগানটা নিপুণভাবে  সাজানো। কিন্তু আমার মধ্যে আত্মম্ভরিতার একটা ব্যাপার আছে। ফুরোচ্ছে না যেন এই দেখা । আর কতো! গীর্জা থেকে ফিরে এলে অনেকের সঙ্গে আমার দেখা হলো।  এদের মধ্যে একজন আমাকে পেয়ে বসল। ঘোষণা দিল যে আমি কী ভাবছি এসব দেখে, বলতে হবে। সে ছিলো আধা মাইল দূরে, পার্কে। আমি তার সাথে যোগ দিয়ে ঘুরলাম, অন্যান্যরা বাসায় ফিরে গেল। কেন যেন আমার মনে হলো আমি এই অতিথি সেবিকা মহিলাকে জিজ্ঞেস করি সে লুইজার হাবভাব লক্ষ্য করছে কি না-আমার উদ্বেগ–মেয়েটা  আসলে কোন দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে লুইজার মায়ের জন্য মনে হচ্ছিলো জিজ্ঞেস করি। কিন্তু যেহেতু এ ব্যাপারে বেশি কথা বলতে চাইনি-কাজটা কঠিন ঠেকছে। যুবকটা দেখতে বেশ-শুধু এইটুকুই ভাবছি। কথা এগুতে পারছে না কিন্তু মহিলার খুব চমৎকার ব্যবহার। ভাবলাম–লুইজার সঙ্গে কথা বলার তেমন সুযোগ হয়নি  আমার। অথচ ওর মায়ের সাথে আমার কতদিনের পরিচয়। আমার খারাপ লাগছিল। মহিলা চারিদিকে অন্যমনস্কভাবে তাকাল–মনে হল এই প্রথম যেন সে নিজেকে হারিয়েছে। “ও তো ওর মাকে সবসময় লিখতো, লিখে”। আমি মনে মনে বললাম-“সবসময় লিখেনি”। আমি এই ছেলেটার ভালো দিক খুঁজছিলাম-আর ভাবছিলাম সে কেমন হতে পারে। বারবার মধ্যাহ্নভোজের সময়কার দৃশ্যটা চোখে ভাসছিল। যুবক দেখতে সুন্দর-আর দশজনার মতই। নাহয় জীর্ণ, বাদামি পোশাক, মুখে গোঁফ তো আর নেই।

“ওহ, বেচারা জ্যাক ব্র্যান্ডন,” মহিলা এমন তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো যেন সে কেউনা।

“ও কি খুব দরিদ্র?” আমি হেসে জিজ্ঞেস করলাম।

“হ্যাঁ তো। ওরা নয়জন, সবগুলোই ছেলে। বড়টা ছাড়া কারও কপালে কিছু জোটে  না। ও আমার স্বামীর ভাগ্নে। বেচারা মা’টা আমার ভাবী। যখন কিছু করার থাকে  না, তখন মাঝে মাঝে সে এখানে এসে উদয় হয়। আমার মনে হয় না সে  আমাদেরকে তেমন পছন্দ করে”। আমি সন্দেহ নিয়ে জানতে চাইলাম সে অনেকদিন ধরে তাদের সঙ্গে আছে কি না-সে অতদূর চিন্তা না করেই বলল-আগের দিন সকালে সে এসেছে। আমি ভাবলাম তাহলে তো অনেকদিন থাকবে মনে হয়।“ না গো না, সে আগামীকালই চলে যাবে”। আমার ব্র্যান্ডন সম্পর্কে অনাগ্রহ, আগের কথার সাথে এর সংশ্লিষ্টতা সে দেখতে পেলো না। মহিলা শুধু ছেলেটার চলে যাওয়ার ব্যাপারটাই স্পষ্ট করল আর আমি গত আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে যে জটিলতায় ভুগছি-সে ব্যাপারে আশ্বস্ত হলাম।

আমরা বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে এর একাংশে ঢুকবো, এমন সময় আমাকে একটু দাঁড়াতে বলে পাতা জড়ো করছিলো যে লোকটা, তাকে ডেকে সে তার স্ত্রী ব্যাপারে  জানতে চাইলো। আমি লোকটাকে উত্তর দিতে শুনলাম “আমার স্ত্রীর অবস্থা খুব    খারাপ”। আমি হাঁটছি। মহিলা লোকটার অসুস্থ স্ত্রীকে দেখার জন্য চলে গেল-তারা এখানেই কোথাও থাকে। আমি চারিদিকে দেখতে দেখতে হাঁটছি। মনোরম সব দৃশ্য দেখতে দেখতে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমি পথ হারিয়ে ফেললাম। বাসার পথ আমি  জেনে আসিনি। বিরাট একটা ঝোপের কাছে যেই বাঁক নিয়েছি, দেখি আমি জ্যাক ব্র্যান্ডনের মুখোমুখি। পকেটে হাত, নিচের দিকে তাকিয়ে ও দ্রুত হাঁটছিল। এক মুহূর্ত সে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, “কেমন আছো?” জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম “দয়া করে আমাকে ফিরবার পথটা দেখিয়ে দেবে কি?” কিন্তু এক অদ্ভুত মুখভঙ্গিতে সংক্ষেপ অভিবাদন জানিয়ে ততক্ষণে সে আমাকে পার হয়ে গেছে। ওর দিকে দ্রুত  তাকিয়ে  একবার ভাবলাম ওকে থামিয়ে দিই। বাতাসে তখন ক্ষীণ এক স্বর আমাকে বলছে লুইজা ধারে কাছেই কোথাও আছে, কয়েক পা এগিয়ে গেলেই আমি তাকে পেয়ে যাবো। আমি আরেকটা বাঁকা ঝোপ পার হচ্ছিলাম, এক কিনারে দরোজাটা ফরাসী দরোজার মতো পৃথক, ঘেরা দেয়া ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট, উঁচু সবুজে ঘেরা দেয়ালের গায়ে  মূর্তি রাখা। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখার জন্য থামতেই দেখি আমার বিপরীতে লুইজা, বেঞ্চে বসে, হাত দিয়ে কোল জড়িয়ে, মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে। আমি ওর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কাছে গেলাম। সে চাগা হয়ে কাঁপছে। চেহারায় দুঃসহ  বেদনার ছাপ। ওকে এতটা ফ্যাকাশে লাগছে যে আমি ভাবলাম ও অসুস্থ। চিন্তা করলাম-ওর সঙ্গীটি বুঝি কোথাও সাহায্যের জন্য ছুটে গিয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে  মেয়েটি উঠে দাঁড়ালো, ওর সম্প্রসারিত চোখ, খোলা ঠোঁট, দেখে মনে হচ্ছে বয়স  যেন দশ বছর বেড়ে গিয়েছে। ওর কষ্ট আমাকে ভীষণ নাড়া দিলো, আমি ওর দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে নরমসুরে চিৎকার করে উঠলাম “ আমার বেচারা মা, সোনা!”  মুহূর্তের জন্য দুলে উঠলো ও। মনে হলো যেন আমার কাছে অব্যাহতি চাইছে; ও  আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল, মাথা এপাশ ওপাশ ঘোরাতে লাগল কাছে এলে দুহাতে সে মুখ ঢাকল, আমার হাত ওর হাতের ওপর রাখতে দিয়ে আমার বুকের কাছে এল। বুকের ওপর মাথা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল, করুণভাবে নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। আমি কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না, যতক্ষণ ওর ইচ্ছে করল কেঁদে হালকা হতে দিলাম। একই সঙ্গে ও নিজেকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টাও করল। কিন্তু পারল না, আবেগে আরও ভেঙ্গে পড়লো। খুব দ্রুত ঘটল তা। এই নির্জন স্থানে এই ছোট্ট দৃশ্য, হয়তবা আরও কিছু সামনে দেখবো, আমি অন্তহীন রহস্যের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলাম। বেঞ্চের ওপর এক মুহূর্ত বসে বিষয়টা নিয়ে আবার ভাবছি। তাকাতেই দেখি বাসার ভেতরে ঢোকার একটা রাস্তা।

আমাদের বাড়ি ফিরবার জন্য দরোজার সামনে চারচাকার গাড়িটা দাঁড়িয়ে। কিন্তু আমার সঙ্গীরা যারা চা পান করেছিল, তারা অতিথি সেবিকা বাড়িওয়ালীর জন্য অপেক্ষা করছিলো কিন্তু সে এখনো ফেরেনি। আমি জানালাম যে সে এক মালির  অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে গিয়েছে, তার ফিরে আসা অবধি আরেকটু অপেক্ষা করতে বললাম। আরও দুজন অনুপস্থিত, এদের একজন হচ্ছে লুইজা, আরেকজন সেই যুবক যে একটু আগে এই মেয়ের থেকে নিষ্কৃতি নিয়েছে, যাকে একটু আগে বাগানে দেখেছি। আমি কিছুটা অন্যমনষ্ক, কিছুটা বিক্ষুব্ধ, খামোখা সময় নষ্ট হলো বসে ভাবছি। এক  উর্দিপরা ভৃত্য ভাঁজকরা একটা কাগজ আমার হাতে এনে দিল। আমি অন্যদিকে ঘুরে তা খুলতে নিয়েছি এমন সময় অতিথিসেবিকা এসে পড়ল। আমার সৌভাগ্য তাতে  অন্যদের মনোযোগ বিঘ্নিত হলো–আমি কাগজে লেখাটা পড়ে ফেললাম এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই ভৃত্যকে লিভিংরুমের ভেতর দিয়ে অনুসরণ করলাম। সে কয়েকটা রুমের মধ্য  দিয়ে পথ দেখিয়ে আমাকে সেই জায়গায় নিয়ে এলো যেখানে আমি লুইজা আর ব্র্যান্ডনকে দেখে ফেলি। কাগজে লেখাটা ছিলো লুইজার। সাদাসিদে ভাবে লিখেছে

“আপনি কি চলে যাবার আগে দয়া করে জলদি আমার সঙ্গে একটু দেখা করতে  পারবেন?” ও আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য সবচে’ নিরিবিলি স্থানটা বেছে নিয়েছে।  ভৃত্য চলে গেলো। মেয়েটা সরাসরি আমার হাত ধরে ফেলল। আমি দেখলাম ওর  আগের করুণ অবস্থা নেই, চোখের পানি শুকিয়েছে, সে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করছে। দেখলাম ওর সুন্দর, সতেজ‌ সনির্বন্ধ মুখটা আমার মুখের এতো কাছে। প্রথমে মনে  হলো  সে অসংলগ্নভাবে কথা বলছে। পরে বুঝলাম ও আমার কাছে প্রতিশ্রুতি চাইছে।

“আপনাকে এখানে আমার কাছে ডেকে আনার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি সবার সামনে বলতে পারবো না, সেজন্য। আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনার খুবই দয়া যে আপনি এসেছেন। দুই সেকেন্ডে আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। আপনি আমার কাছে শপথ করুন।,” তার হাত উর্ধমুখি, একটার সাথে আরেকটা কঠিনভাবে জড়ানো। আমি বললাম,” কীসের শপথ, সোনা বেবি আমার?”

“আমি আপনার সোনা বেবি নই-কারুরই নই! কিন্তু মাকে বলবেন না। আমাকে  প্রমিজ করুন, তাকে বলবেন না”।

“তাকে কী বলবো না? আমি তো কিছু বুঝতে পারছিনে”।

“আপনি বুঝতে পেরেছেন, আপনি বুঝতে পেরেছেন”–সে বলেই চললো। আপনি  চ্যান্ট্রির কাছে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে আপনার দেখা হবে। আপনি তার সঙ্গে থাকবেন। তার সঙ্গে আপনার দেখা হবে আমার আগে। আমি নতজানু হয়ে বলছি, প্লিজ আমার   কাছে আপনি শপথ করুন।!” আমি ওকে থামালাম এবং সোজা দাঁড় করিয়ে দিলাম।  বললাম-“কখন তুমি মাকে দেখতে যাবে?”

“যত শীঘ্র সম্ভব-আমি বাড়ি যেতে চাই, আমি বাড়ি যেতে চাই!” আমি ভাবছি ও আবার কেঁদে ফেলবে। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে আবেদনভরা চোখে আমার দিকে  তাকালো।

“তুমি খুব বিপদে আছো মনে হচ্ছে। আমাকে বলো কী হয়েছে”।

“কিছু না-কেটে যাবে। শুধু বলুন মাকে বলবেন না!”

“কী, তা না জানলে আমি তাকে কেমন করে বলবো?”

“আমি জানি আপনি জানেন, আপনি বুঝতে পাচ্ছেন আমি কী বলছি”। সে একটু  থেমে আবার বললো-“বাগানে আমি যা করেছি”।

“বাগানে তুমি কী করেছো?”

“আমি আপনার কাঁধে নিজেকে ছুঁড়ে দিয়ে কেঁদেছি। আমি উন্মাদের মতো আচরণ করেছি”।

“তুমি কী শুধু তা-ই বলতে চাইছো?”

“হ্যাঁ এটুকুই, আমি চাইনে মা জানুক, আমি চাই যে আপনি এব্যাপারে নিরব  থাকবেন। আপনি যদি তা না করেন, আমি আর কোনোদিন বাড়ি যাবো না। আমাকে দয়া করুন।!” গলা কাঁপছে ওর।

“মাগো, আমার তোমার জন্য শুধু রয়েছে কোমল হৃদয়-আমি বিশুদ্ধ থাকতে চাই   তোমার কাছে। কিন্তু প্রথমে আমাকে বলোঃ কেউ কি তোমার ক্ষতি করেছে?”

“কেউ আমার ক্ষতি করেনি, সত্যি বলছি”।

ও আমার চোখে তাকাল। আমিও তাকালাম ওর চোখে, ওর চে’ আরও গভীরে।  ব্যথায় জর্জর ওর চোখ, কিন্তু এমন বিশুদ্ধ যে দ্বিধাগ্রস্ত আমি ওকে বিশ্বাস করলাম।  মুহূর্ত-ক্ষণ দ্বিধা থাকলেও আমি এইবার ঝুঁকি নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-মি. ব্র্যান্ডন কি কোনো কিছুর জন্য দায়ী?”

“না, কোনো কিছুর জন্য সে দায়ী নয়, তাকে দোষ দেবেন না।” ও চিৎকার করে  বলছে।

“সে তোমার সঙ্গে বিছানায় যায়নি?”

“কোনো কথা না, হায় ঈশ্বর! ওহ ভয়াবহ একটা ব্যাপার!” বলেই সে আমার কাছ  থেকে সরে গেলো, সোফার সামনে নিজেকে দুমড়ে নিক্ষেপ করে বাহু আর মুখ সোফায় গুঁজে দিয়ে হাঁটুর ওপর বসে পড়লো। “শপথ করুন, শপথ করে বলুন, প্রতিজ্ঞা  করুন”। সে বিলাপ করতে থাকলো।

আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কিন্তু আবেগপীড়িত। অবসাদগ্রস্ত ওর দিকে তাকিয়ে  বললাম-“আমি ভীষণ অন্ধকারে আছি। কিন্তু কথা দিলাম বলবোনা”।

শুনে সে দাঁড়িয়ে আবার আমার হাত ধরলো। “ ধর্মের নামে শপথ করে বলুন, পবিত্রজ্ঞানে বলুন?” – ও হাঁপাতে লাগলো।

“ধর্মের নামে শপথ করে বলছি, পবিত্রজ্ঞানে বলছি”।

“কিচ্ছু বলবেন না, কোনো ইঙ্গিত দেবে না তাকে।”

“মা লুইজা, আমি কথা দিলে তা রাখি”।

“আপনি জানেন যে আমি আপনাকে চিনিনে। আপনি কখন চ্যান্ট্রির কাছে   যাচ্ছেন?”

আগামীকালের পরদিন, তুমি?”

“যদি পারি, আগামীকালই”।

“তাহলে আমার আগেই দেখা হচ্ছে মায়ের সাথে তোমার -ভালো তো,” আমি হেসে বললাম।

“ঠিক আছে। ঠিক আছে!” সকরুণ চোখে সে বারবার বলতে লাগল।

পাশের রুমে কার পায়ের শব্দে সে বলল –“এখন যান আপনি”।

ভৃত্য এসে জানাল আমার বন্ধুরা সব গাড়িতে চড়ে বসেছে। সে যেন বুঝতে না পারে আমি স্বর পালটিয়ে লুইজাকে বললাম-“তাহলে তোমার জন্য আমার কিছু করার নেই?”

“না, বিদায়”-যেন একটা চুমুও না দিতে পারি-ও খুব দ্রুত নিজেকে সরিয়ে নিল। ভৃত্যকে অনুসরণ করল। নিজেকে অপরাধী মনে হল আমার। আপ্যায়নকারীদের কাছে বিড়বিড় করে বলছিলাম যে লুইজার সাথে বসা দরকার অথচ চাইনি কেউ জানুক।  বেশির ভাগ লোক সিঁড়ি থেকে আমাদেরকে বিদায় জানাল কিন্তু আমি জ্যাক ব্র্যান্ডনকে দেখলাম না। ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসা সেই বিকেলে যখন বাড়ি ফিরছি, গাড়িতে আমার বন্ধুরা দেখল আমি চুপচাপ আর বোকার মতো বসে আছি।

আমি দুদিন পর চ্যান্ট্রির সাথে দেখা করতে গেলাম এবং জেনে নিরাশ হলাম যে লুইজা এখনো ফেরেনি জেনে হতাশ হলাম যদিও সেদিন ওর কাছে থেকে চলে আসার সময় বুঝেছিলাম ও অসুস্থ এবং বিছানা নেবে। তবে ওর মা জানে তা জানে নয়া। আমি তো এই মেয়ের ব্যাপারে সতর্ক অনুসন্ধানী। আমার জন্য একটু কঠিনই ছিলো ব্যাপারটা কারণ, ওর বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে। হেলেন জেনে খুশি যে ইতিমধ্যে আমরা পরিচিত হয়েছি। তার আসার দিন এখনো ঠিক হয়নি কিন্তু হেলেন ধরেই নিয়েছে যে ও বেশি দেরি করবে না। আমি থাকতে থাকতেই ফিরবে। সেই স্থানের আকর্ষণ, ফুলটি হচ্ছে এই মেয়ে । ঘুমন্ত, রুপোলি, পুরনো বাড়িটা হচ্ছে আরেক আকর্ষণ, অবকাশ যাপনের জন্য উত্তম জায়গা।  রক্তবর্ণ মদ পানের প্রকৃ্ত স্থান।   চোখ জুড়ানো ড্রইংরুমের দিকে তাকালেই মনে হবে অনেক সকাল কেটেছে এই ঘরের জাঁকজমকের কাজে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বার্লিনের পশমি সুতোয় বোনা সূচের নতুন কাজ আর মাঝে মাঝে তার বিরতি দারুণ দেখতে! হেলেন সবসময়ই এইসব চিরায়ত, শ্বাশত ব্যাপারগুলোতে আছে –অতীত আর ভবিষ্যতকে সে জড়িয়ে রাখে  অয়েলক্লথে, ঐকান্তিক, দারুণ সব মুহূর্ত চলে আসে কথোপকথনের সময়, ধ্যানমগ্ন  মতামত প্রকাশ পায় তখন। ক্রিস্টোফার চ্যান্ট্রি জোক করতেন অনেক সময় যখন  উনি কাদাযুক্ত লেগিংস পরে দু পা ফাঁক করে নিরাসক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন। জোক করার জন্য এগুলো ছিলো তার কাঁচামাল। তার মনটা ছিলো পূর্ণ এক দুগ্ধপাত্র আর  সরের মতো ঘন ছিল তার রসবোধ।

এক সন্ধ্যেয় ডিনার খেতে আমি একটু তাড়াতাড়িই চলে আসি। অবাক হয়ে দেখি  বিপদ্গ্রস্ত সেই মামণি ড্রয়িংরুমে। তাকে তখনো বিপদগ্রস্তই দেখাচ্ছে এবং আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে যে আমার সাথে ওর একা দেখা করতে পারবে। আমরা ওর বাবামার  জন্য বারবার বাধা পেলাম। এর মধ্যে আর কথা বলার সুযোগই পেলাম না। রাতে ডিনারের পর আমি ওকে পিয়ানোর পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য ইঙ্গিত করলাম। ওর বাবা ধূমপান করতে ঘরের বাইরে গেছে, মা গ্রীষ্ম শেষে ছোট্ট আগুনের চটচট আওয়াজের পাশে বসে ঝিমুচ্ছে।

“কথামতো বাড়ি ফেরোনি যে?”

সে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “ আমি পারিনি, পারিনি আমি”।

“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব অসুস্থ”।

“আমি অসুস্থ,” ওর সাদামাটা উত্তর।

“তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন। কাউকে দেখানো দরকার”।

সে হতাশার সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল-“কোনো লাভ হবে না-কেউ জানবে না”।

“কেউ জানবে না মানে, কী বলছো তুমি?”

“কেউ বুঝবে না”।

“তোমাকে তাদের বোঝাতে হবে”।

“কখনো না, কক্ষনো না, সে পুনর্বার বললো-“ কক্ষনো না”।

“আমি স্বীকার করি, আমি জানি নে”। কন্ঠে রাগত ভাব এনে আমি জবাব দিলাম।

আমি জোরেশোরে বললাম । কারণ, দায়িত্ব থাকা সত্বেও আমি কিছু করতে পারছি নে। আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছিল।

“তোমার তো স্বীকার করবার দরকার নেই”।

আমার সব সয়ে যেতে হচ্ছিল। একটু অপেক্ষা করে আমি বললাম-মি. ব্র্যান্ডনের কী অবস্থা?”

“আমি জানি নে”।

“সে কি চলে গেছে?”

“সেইদিন সন্ধ্যেবেলাতেই”।

“কোন সন্ধ্যেবেলা?”

“যেদিন তুমি সেখানে ছিলে। আমি আর ওকে দেখিনি”।

এক মুহূর্ত নিরব থেকে ঝুঁকি নিলাম-“এবং আর কোনওদিন ওর সঙ্গে তোমার দেখা হবে না। হা”।

“কখনো না, কক্ষনো না”।

“তাহলে তুমি সুস্থ হয়ে ওঠোনা কেন?”

একটু দ্বিধা করলো সে । তারপর বলল-“কারণ, আমি মারা যাচ্ছি”।

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। আমরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছি। হেলেন চ্যান্ট্রির ঘুম ভেঙ্গে গেছে-সামান্য গজগজ করছে- কী হয়েছে জানতে চাচ্ছে। আমি বলে ফেললাম –হেলেন, শোনো, আমার কোনো ধারণা নেই”। পরক্ষণেই আমি চিৎকার করছি-“ও অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, ও অসুস্থ-আসো, ওকে ধরো!”

মিসেস চ্যান্ট্রি ছুটে এল, সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে তার বুকে মাথা এলিয়ে দিল, কদিন আগে যেভাবে ও আমার বুকে মাথা রেখেছিল। পার্থক্য শুধু এবার ওর চোখে পানি নেই, কোনো কান্না নেই, অদ্ভুত এক করুণ নিরবতা এবার। তখন সে অজ্ঞান হয়নি, শুধু হতাশা ছিলো। এবার তার চোখে তাকিয়ে বেচারা হেলেন ভয় পেয়ে গেলো। যেন কী দেখে ফেলেছে। লুইজার ঘাড়ের ওপর দিয়ে হেলেন আমাকে ভয়ার্ত এক বিচিত্র দৃষ্টি দিলো। বিচ্ছিন্ন এক মুহূর্ত যেন। মেয়ে বলছে সে অসুস্থ নয় কেবল ক্লান্ত, শুধুই ক্লান্ত  এবং সে ঘুমোতে যেতে চাইল। “ওকে নিয়ে যাও, নিয়ে যাও ওকে, ওর সঙ্গে যাও” আমি ওর মাকে বললাম-ঠেলে রুম থেকে বের করে দিলাম ওদের। আমার এরকম  করার পেছনে আরেকটা কারণ ছিলো । আমার ভেতরের উত্তেজনা লুকোতে চাইছিলাম আমি। অল্পক্ষণ পর ওরা অন্যরুমে চলে গেলে ক্রিস্টোফার চ্যান্ট্রি সিগার শেষ করে  ভেতরে এলেন। আমাকে বলতে হলো ওরা কোথায়। এও বললাম যে লুইজা এত বেশি অবসাদগ্রস্ত যে ওর মাকে সঙ্গে যেতে হয়েছে। “ওর শেষ হয়নি, শেষ হয়নি এখনো? হতচ্ছাড়া ওই জাহান্নামে সে কেন গিয়েছে?” এই ভালো মানুষটি কেমন মায়ায় বকবক করছে। আমি তাকে বলতে পারলাম না এই বিষয়টাই আমার জানা দরকার। আমি বই পড়ার ভান করছি আর ভেবেই চলেছি কেন লুইজা গিয়েছিল সেখানে? ক্রিস্টোফারের সঙ্গে কথা বলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার জন্য আমার ওয়াদা রক্ষা করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। উনার স্ত্রী না থাকায় কিছু প্রয়োজনীয় কথাবার্তা হলো। প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলার পর তিনি মেয়ের কাছে যেতে রাজি হলেন–যদি উদ্ধার করা সম্ভব হয় কী হয়েছে ওর। উনি চলে গেলেন-আমি আমার রুমে এলাম-মনে হচ্ছে এখনো ঘুমোনোর সময় হয়নি। আমি জানি হেলেন ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। রাত এগারোটায় ফিরল সে।

“খুব অস্বাভাবিক অবস্থা ওর-ওখানে কিছু একটা ঘটেছে”।

“কী ঘটেছে?”

“আমি বুঝতে পারছিনে। ও কিছু বলছে না”।

“তাহলে তুমি এমন ভাবছো কেমন করে?”

“ও সাংঘাতিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে, বলেছে কিছু একটা ওখানে হয়েছে”।

“আর কিছু বলেনি?”

“কিচ্ছু না, ও বলতে নিয়ে থেমে যায়। বলে খুব ভয়াবহ ব্যাপার”।

“খুব ভয়াবহ?”

“ভয়ানক” বেচারা বান্ধবী আমার চোখে পানি নিয়ে বিড়বিড় করে বলছে। মায়ের চেহারা জুড়ে করুণ আশংকা!

“কিন্তু কিভাবে? ও তোমাকে কোনো সূত্র বা তথ্য দেয়নি?”

“ও কিছু করেছে”।

আমরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছি মুহূর্ত-ক্ষণ, “করেছে?” “কার প্রতি?”

“ও আমাকে তা বলেনি-বলেছে বলতে পারবে না। বলতে চেষ্টা করে কিন্তু গলায় আটকে যায়”।

“বাজে কথা। ও কিছুই করেনি”। আমি বললাম।

“ ও কী করতে পারে?” হেলেন আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করছে।

“ ও অসুস্থ, ওর কিছু একটা হয়েছে, ও ভুল বকছে”।

“ওর বাবাকে আমি তাই বলেছি”।

ও ওর বাবাকে কী বলেছে?”

“কিছু না, ও ওর বাবাকে বলবে না। সে ওর কাছেই আছে এখন। সে ওর হাত ধরে আছে, ও চোখ বন্ধ করে মুখ ঘুরিয়ে আছে,”

“খুব শীঘ্রই ডাক্তারের কাছে পাঠাও ওকে”।

“আমি ইতিমধ্যে ডেকে পাঠিয়েছি”।

“তুমি কি চাও আমি ওর কাছে বসে থাকি?”

“ওহ, আমি থাকবো!” হেলেন বললো। তারপর সে জিজ্ঞেস করলো-“তুমি তো সেদিন ছিলে সেখানে, তুমি কী দেখেছো?”

“কিছু দেখিনি,” আমি দৃঢ়ভাবে উত্তর দিলাম।

“সত্যিই কিছু দেখোনি?”

“সত্যি বলছি,”

ওখানে কেউ কি ওকে সাহায্য করার মতো ছিলো না?

আমি একটু বিব্রত বোধ করলাম। “বেচারা হেলেন, তুমি তো দেখোনি ওদের!”

“ও কারও দিকে তাকাচ্ছে না এটা কি ভালো?”  হেলেন আনমনে বললো।

“বেশ- আমি তোমার বন্ধুদের ব্যাপারে কিছু বলতে চাইনে –কিন্তু তারাই বা কত ভালো! বিশ্বাস কর সে অসুস্থ –এটা শুধু আতঙ্কজনক একটা কল্পনা”।

“এটা শুধু আতঙ্কজনক কল্পনা-!” মিসেস চ্যান্ট্রি এই আইডিয়াটা লুফে নিলো। আমি   ভাবছি আমি তাকে গ্রহণযোগ্য একটা কিছু দিচ্ছি-যখন বললাম-লুইজা তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে সে মেনে নিচ্ছিলো।

বলেই রাখি-লুইজা কখনোই সেরে ওঠেনি। মনে আছে অন্যরকম একটা সপ্তাহ ছিলো   সেবার। আমার জীবনের সবচে’ অস্বস্তিকর সপ্তাহ ছিলো সেটা। ডাক্তার বলেছিলেন  ওর বাবামায়ের হার্ট দুর্বল এবং কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। ডাক্তার জানতে চেয়েছিলেন মেয়ে সম্প্রতি কোনো ভয়ংকর শক বা আঘাত পেয়েছে কি না। কিন্তু তিনি আর কিছু বলতে পারেন নি মেয়ের এই অসুখের ব্যাপারে। এই নিমজ্জনের  কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে ছিলো না। লুইজা তার রুমে শুয়ে থাকলো-বিছানায় যেতে  অস্বীকৃতি জানালো-সম্পূর্ণরুপে সাদা, দুর্বল, অন্যমনস্ক, সব কিছুতেই মাথা নাড়ানো,  পুষ্টিহীন ওকে ক্ষুদ্রাকার লাগছিলো, সময়ে সময়ে সে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে “মা, মা”  করে ডাকতো যেন ও সাহস সঞ্চয় করছে বড় কোনো স্বীকারোক্তির । সে সাহস ওর  কখনও হয়নি। একটা অদ্ভুত প্রনোদনা ঘুরে ফিরে ওর মনে আসত –ঠোঁটে অচেনা লোকের সেই গভীর ভয় ফুটে উঠতো। মনে হত থেকে থেকে ও উপশম খুঁজত ভুলতে না পারা কোনো চেতনা থেকে এবং তারপর দুর্ভেদ্য নৈঃশব্দে আবার নিজেকে খুঁজে পেত। আমি এসব জানতে পেরেছি ওর মায়ের কাছ থেকে (দিনে আমি ধীর পায়ে তিন চারবার ওর রুমে যেতাম।)। প্রথমদিনের পর স্থানীয় ছোট ডাক্তার জানালেন যে তিনি সমুদ্র-ভ্রমণে আছেন এবং এক্সেটার শহরে একজন কলিগের সাথে পরামর্শ করে দেখতে চান। সেই কলিগ এলেন এবং কিছুই করতে পারলেন না। শেষে লন্ডনে বড় ডাক্তারের কাছে দেখাতে বললেন। বড় ডাক্তার একজনকে টেলিগ্রাফ করা হলো এবং বিমানে করে তিনি এলেন। তিনি চমক লাগা মন্তব্য করলেন, বললেন এমন কমনীয়, সুন্দর বাড়িতে একটা তরুণী মেয়ে ফুলের মতো ফুটে থাকার কথা। লুইজার গত হয়ে যাওয়া সেবিকা ওর ওপর কোনও আলো ফেলতে পারেনি। সে দেখতো লুইজার মন সবসময় খারাপ। যখন সে আসা বন্ধ করে দেবে, তার দু একদিন আগে সে একথা বলেছিলো। আমাদের দিনগুলো ছিলো নিরানন্দ রাতগুলো ছিলো ভীতিকর। আমি হেলেনের সাথে পালাক্রমে মেয়ের কাছে বসতাম।

চ্যান্ট্রি কোর্ট যেন সেই ছড়া সম্পর্কে সচেতন ছিলো যা এর কক্ষগুলোকে বেদনার্ত করে  তুলতো। এর ধূসর পুরনো মাথা সেই কন্যার ভাগ্যের ওপর নুয়ে আসতো। যেসব লোকজন আসত –তাদেরকে বারণ করা হলো;  ডিনার অনুষ্ঠানের মতো হলো-শুধুই  চাকরবাকরদের দ্বারা চালানো। আমি ক্রিস্টোফার চ্যান্ট্রির সাথে একা বসে থাকতাম। তার দাঁড়ানো চুলগুলো মনে হতো যেন রহস্য । আমার প্রহরগুলো লুইজার সাথে নিরব থেকে নিরবতর হচ্ছিল। সে আমার দিকে বলতে গেলে তাকায়ই না। রাতে খেয়াল করলে বুঝতাম ও কী ভাবছে। একবার ও পান্ডুবর্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি হাঁটু গেঁড়ে ওর বিছানার পাশে বসে খুব নরমস্বরে বললাম-

“মাকে না হয় বলতে না পারো, আমার কাছেও কি পারো না?”

আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ও বললো-“তাতে কী এসে যায় এখন-আমি তো মরেই যাচ্ছি?”

আমি মাথা নাড়লাম আর হাসলাম। “তুমি মারা যাবে না যদি তুমি এই ভাবনাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো”।

“আপনি তাহলে ওর সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করবে”-সে বললো। “ সে নিরাপরাধ,  নিরাপরাধ সে”।

“তার মানে কী তুমি অপরাধী? কোন্‌ তুচ্ছ জিনিষ তুমি এতো বড় করে দেখছো?

“আপনি একে তুচ্ছ বলছেন?” ও হোঁচট খেলো এবং থামলো।

“নিশ্চয়ই, সোনা”। তারপর আমি একটা বড় রকমের ঝুঁকি নিলাম।

“আমি নিজেও তা প্রায়ই করে থাকি!”

“আপনি? কক্ষনো নয়, না! আমি ওর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছি”। সে বললো।

এবার আমি হতবুদ্ধি। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।

“তুমি কীভাবে নিষ্ঠুর হলে?”

“বাগানে। আমি হঠাৎ করেই বদলে গেলাম, আমি ওকে তাড়িয়ে দিলাম, আমি  বললাম যে তাকে আমার ভীষণ ভয়”।

“তুমি তা কেন করলে?”

“কারণ, আমার লজ্জাবোধ হলো”।

“লজ্জা?”

“আমি বাসায় তার সঙ্গে যা করেছি”।

“কী করেছো তুমি?”

কয়েক মুহূর্ত সে চোখ বুজে থাকলো, যেন সে তা ভুলতে চেষ্টা করছে। “ আমি তাকে খুলে বললাম”। ও বলতে নিলো। কিন্তু পারলো না। ওর উচ্চারণ করবার মতো শক্তি ছিলো না।

“আমি জানি তুমি তাকে কী বলেছো। লক্ষ লক্ষ যুবতী মেয়ে তোমার আগেও যুবকদের একথা বলেছে”।

“তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, জিজ্ঞেস করা হয়েছে তাদেরকে! তারা আগে বলেনি। আমি তো তাকে চিনতাম না। সে আমার যত্ন নেয়নি। আগের দিন তাকে প্রথম দেখি, আমি তাকে অদ্ভুত সব কথা বলি, সে ভদ্রলোকের মতোই ব্যবহার করে”।

“সে তো হতেও পারে ভদ্রলোক!”

“তারপর ফিরে আসার আগে যখন আমরা বাইরে বাগানে হাঁটতে গেলাম, বাতাস যেন আমাকে বয়ে নিয়ে গেছে-ভাবছিলাম আমি তাকে কী বললাম- কেন সেই কথা বললাম -আমি খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম”।

“খেই?”

“আমি ভয়ংকর দুর্ব্যবহার করেছি ওর সঙ্গে-রাগ করেছি। কোনোভাবেই আর সেই  কথাকে ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আমি তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আমি তাকে প্রায় আঘাতই করে বসি”।

“বেচারা লোক”! আমি হাসি।

“হ্যাঁ, তার জন্য আমার দুঃখ হয়। সে ছিল দয়ালু, কিন্তু আমাকে সে এভাবেই জানবে সবসময় যেভাবে চিনেছে!”

আমি বললাম- মনে কোরোনা যে সে তোমাকে মনে রাখবে-সে অন্য মেয়েদের সঙ্গে  যাবে”।

“আহ, সে আমাকে ভুলে যাবে!” ও নরমস্বরে নিরাসক্ত ভাবে চিৎকার করল”।

আমি দেখলাম যে ভুল কথা বলে ফেলেছি। আমি উপুড় হয়ে কাছে এসে ওকে চুমু  খেলাম। যখন মাথা উঁচু করলাম, দেখি ওর মা বিছানার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে। একই  কারণে হাঁটুতে নিচ হয়ে। যখন লুইজা বুঝতে পারল মা আদর দেবার জন্য ঠোঁট ছুঁইয়েছে ও মাকে আলিঙ্গন করার জন্য দুহাত বাড়িয়ে দিলো, তাকে কাছে টেনে নিতে  পেরেছিল ও এবং আমি আবার শুনলাম শতবারের মত ও “মা, মা” করে ডাকছে।

“বলো সোনা”। ওর মা সাড়া দিলো।

শতবারের মতোই ও থেমে গেলো আবার। সেই নিরবতা গভীর, অতল; আমি ভীষণ  নার্ভাস হয়ে গেলাম। উঠে অন্যদিকে চলে গেলাম।

“মা, মা”-করে মেয়ে বারবার ডাকছে আর মা সেই ডাকে সঙ্গে সঙ্গে গভীরভাবে  সাড়া দিচ্ছে । কিন্তু মেয়ে শ্বাস নিচ্ছে জোরে জোরে। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছি  অনুজ্জ্বল ভোর, শুনছি পৃথিবীর বিষাদতম চাপা গোঙানি। ও স্পষ্ট করেই বলছে “আমি মরে যাচ্ছি,” সেই রাতে একঘন্টার মধ্যে অচেতন অবস্থায় ও মারা গেলো।   প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তার এলো, নিশ্চিত করে বললো-হার্টের সমস্যা। বেচারা   লুইজার বাবা-মা স্তম্ভিত, অচেতন প্রায়; আমি অর্ধেক ভ্রমণ বাদ দিয়ে ওদের সঙ্গে  একমাস থেকে গেলাম। এই স্তম্ভিত, অচেতনবৎ অবস্থার মধ্যেও আমি আমার অঙ্গীকার রক্ষা করলাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close