Home ছোটগল্প জব্বার আল নাঈম > পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ >> ছোটগল্প

জব্বার আল নাঈম > পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ October 7, 2017

জব্বার আল নাঈম > পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ >> ছোটগল্প
0
0

জব্বার আল নাঈম > পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ >> ছোটগল্প

পুরাতন কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় স্বপ্না। হঠাৎ দেখে, ডান দিক হতে আসছে মানুষের কঙ্কাল। ভয়ংকর দৃশ্য দেখে ভয় বাড়ে। ভয়ে শরীরের লোম পর্যন্ত দাঁড়ায়। ফিনকি দিয়ে চিকন ঘাম বেরিয়ে আসে। গা ছিমছিম করছে। স্বপ্না জড়োসড়ো হয়ে আসেছে নিজের ভেতর। দিনের আলো খেলা উপেক্ষিত হয়ে দৃশ্যমান চোখে সঞ্চারিত হচ্ছে ভয়। এর পর সে চিৎকার শুরু করে। গলাফাটা চিৎকার। চিৎকার প্রতিধ্বনি হয় গোরস্থানে। স্বপ্না আত্মমুক্তির জন্য সামনের দিকে দৌড়ায়। কিছু দূর যাওয়ার পর আবার থমকে দাঁড়ায়! কেউ একজন মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। এবার কিছুটা দিক পরিবর্তন করে বাম দিকে যায়। ভয় আরও বাড়ছে। কারণ, সামনেই কাফনের কাপড় জড়ানো লাশ। শুধু মুখের অংশটুকু খোলা।

স্বপ্না কঠিন হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পারছে না। আবার ভাবে। গোরস্থান আর শ্মশানে মরা মানুষই থাকবে। কিন্তু, সৎকার ছাড়া! ভীতসন্ত্রস্ত মনে কাছাকাছি এসে আরো বিস্মিত! মৃতদেহ স্বপ্নার পরিচিত। আলেয়া। আলেয়া স্বপ্নার মা। যদিও মরা মানুষ কারো স্বজন হয় না। স্বপ্না এমন কথা ভুলে বসেছে। লাশের পাশে মেয়ের হৃদয় বিদারক চিৎকার। চিৎকারে মৃতব্যক্তির ঘুম ভাঙে।

কী রে, কাঁদছিস ক্যান? আমি

মা, তোমার লাশ এখানে ক্যান?

লাশ কোথায় থাকবে?

মৃত্যুর পর লাশ কলার ভেলায় সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছি। সেখানেই তো থাকার কথা।

এত বড় পৃথিবীতে আমার জন্য সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর বানাতে পারলি না?

মা, আমার চেষ্টার ঘাটতি ছিল না ফুলবাগান বানানোর। তোমার কৃতকর্মের কারণে মানুষ তা হতে দেয়নি। ব্যর্থ হয়েছি।

সত্যের মতো মিথ্যা বলে মুক্তি কখনই পাবি না। সাময়িক মুক্তিকে চিরস্থায়ী ভাবাটা ভুল। তোর অবস্থাও একই হবে। মৃত্যুর পর মাটির বিছানায় ঘুমাতে পারবি না। তুই আমাকে সমুদ্রে ভাসিয়েছিলি। তোকে ভাসানোর জন্য কাউকেই পাবি না। মা, আমাকে দোষ দিচ্ছ কেন? অভিশাপ দিচ্ছ কেন? আমি চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি।

সময়ের রংমহলে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নারী তুমি। স্থানীয় নেতা, থানার হাবিলদার, পুলিশ অফিসার কেউ তোর মায়ের সৎকারে এগিয়ে আসেনি?

কেউ কেউ এগিয়ে আসতে চেয়েছিল। যখন জেনেছে আমার মা একজন পতিতা তখন কেউ আসেনি। আমি হাত জোড় করে অনুরোধ করেছিলাম, উপেক্ষিত হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছি। অথচ অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছ? অভিশাপ দিলে তোমার আত্মার মুক্তি মিলবে?

এমন সময় মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ফজরের আজান। স্বপ্নার নিদ্রাভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নও ভঙ্গ হয়। ভয়ে কাঁপতে থাকে হাত-পা। এসি ষোলোতে থাকার পরও শরীর ঘামছে। হাত-পায়ের কাঁপনে দাঁড়াতে পারছে না। উঠে বসে। টেবিলের উপরে রাখা পানির গ্লাস হাতে নেয়। এক ঢোক পানি গিলে। অলস শরীরটা আবারও বিছানায় হেলিয়ে দেয়। ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করে। দিনের আলো পেখম মেলছে। ঘড়ির কাটা আটটার ঘরে টিং টিং শব্দ করে চলছে।

দেয়ালে ফ্রেমবন্দী আলেয়া করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। স্বপ্না ছবিটি নামায়। স্থির দৃষ্টিতে দেখতে থাকে মাকে। গামছা দিয়ে মুছতে গিয়ে দু’ফোটা অশ্রু পড়ে। তীব্র শীতের সকাল। লেপ কাঁথার ওমে জল ছিটালে মানুষ যেভাবে ঝাকুনি খায়, সন্তানের চোখের পানি ফ্রেমে আটকানো ছবিতে পড়ার পর আলেয়া এসে বাস্তবের দরজায় দাঁড়ায়! ভয়ে স্বপ্নার চোখ আরও বড় হয়ে যায়। মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। অস্থিরতা নিয়ে খাটে বসে। দাঁড়ায়! একবার এক কদম সামনে, একবার পেছনে যায়। শরীরে চিমটি কাটে। চোখ কচলায়। মাথার চুল ধরে টান দেয়। সত্যি তো আমি! আমি ঘুমাচ্ছি না। মায়ের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে আছি! মাথার চুলের মতো এলোমেলো মনে হচ্ছে নিজেকে।

স্বপ্না, তুই কি ভাবছিস তা আমি জানি। তোর ভাবনার সাথে বাস্ততায় অনেক অমিল। গরমিল।

সেটা সত্য। তবে, টাকা হলে অমিল আর গরমিল থাকে না। আমার টাকা আছে। ক্ষমতা আছে। সব সাপোর্ট আমার কোর্টে। মোস্তাফিজের কার্টারে বিভ্রান্ত না হয়ে চার-ছক্কার বাউন্ডারি চাইলেই হাঁকাতে পারি। সময়ের ব্যপার মাত্র।

একটা কথা মনে রাখিস, ভুলের পাহাড়ে সা¤্রাজ্য বানানো গেলেও রানী হয়ে বসত করা সহজ নয়। ফুলের কাজ মৌমাছির জন্য মধু জমিয়ে রাখা। তোর আয়ু বড় জোর আশি নব্বই। কচ্ছপের মতো পাঁচ-ছয়’শ নয়!

আমি কচ্ছপের জীবন অবহেলায় পায়ে ঠেলি। মানুষের জীবন নিয়ে পুরুষের রানী হয়েই থাকব।

স্বপ্ন স্বপ্নই থাকবে। বাস্তবতা অনেক কঠিন; দুরূহ, পাহাড় ধাক্কা দিয়ে ইঞ্চি পরিমাণ সরানোর মতো। স্বাভাবিক নিয়মে পুরুষের পেটে বাচ্চা নেয়ার মতো কঠিন হবে তোর সামনের দিনগুলো।

এখন এটাও হচ্ছে। মানুষ অসম্ভবের পায়ের শিকল কেটে পাখির ঝাঁকে উড়িয়ে দিয়েছে নিজেকে। উড়তে জানলে কেউ আটকাতে পারে না। তখন দূরও কাছে চলে আসবে।

কলিংবেল বাজতে থাকে। স্বপ্না ভাবে, সকাল সকাল আবার কে? এমন ভাবনা থেকে দরজার সামনে যায়। দরজা খোলে। দেখে পঁচিশ হইতে ত্রিশ বছর বয়সী ছেলে। ফরম্যাল ড্রেস। কাঁধে কালো ব্যাগ। হাতে ফাইল ফোল্ডার।

আমি ‘পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ’ থেকে এসেছি। গতকাল আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম।

স্বপ্না মাথা নাড়ে।

ভেতরে আসুন। আপনি এত সকালে চলে আসবেন ভাবতে পারিনি। দরজা আটকাতে আটকাতে স্বপ্না বলে, বসুন।

আপনাদের এই প্রপার্টিজ কোথায়?

উত্তরা।

বাই দ্য ওয়ে, প্রপার্টিজ ম্যাপটি দেখানো যাবে?

নিশ্চয়ই। পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের ম্যাপ ফাইল ফোল্ডার হতে বের করে সামনের টেবিলে মেলে ধরে। অনেক বড় প্রপার্টিজ। স্বপ্না খুশি। পছন্দের জমিটি এখানেই হোক। ভাবনার জগৎ ঘুরতে বেরিয়ে দেখে বিশাল এড়িয়া নিয়ে প্রপার্টিজ সীমানা। চারপাশে বড় বড় গাছ লাগানো থাকবে। এখানে দিনরাত মুক্ত বাতাস বয়ে যাবে। পৃথিবীর সব খবর বাতাসের মুখে ভাসবে। বাতাস কখনো সীমানা মানে না। এক দেশের বাতাস আরেক দেশে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। সেখানে সুখ ও দুঃখের খবর থাকবে। চেনা অচেনা মানুষের খবর থাকবে। হাজার রকমের খবর সাজানো থাকবে বাতাসের বহরে। স্বপ্নের পরিধি আরো বাড়তে থাকে; অনেক রকমের ফুল গাছ লাগানো, একেক ফুলের একেক ঘ্রাণ। পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের মুগ্ধ সুবাস নিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাতের বেলায় পরীরা ডানা মেলে নেমে আসবে… ভালোই কাটবে সেই সময়টা।

আচ্ছা, আপনার নামটা কিন্তু জানা হল না।

মুহাম্মদ আজিজুর রহমান। সবাই আজিজ বলে ডাকেন। আপনিও আজিজ বলে ডাকতে পারেন।

আজিজ সাহেব, আপনাদের প্রজেক্টটি একবার স্বচক্ষে দেখা যাবে?

নিশ্চয়। আবাসিক প্রকল্প হলে হয়ত সম্ভব হতো না। তবে, আমাদের এই প্রোজেক্ট দেখানো সম্ভব। গ্রাহক ক্রয়ের পর চাইলেই ব্যবহার করার অনুমতি দেবে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ। তা কখন দেখতে যেতে চান?

আজ দেখানো যাবে?

অবশ্যই যাবে।

তাহলে সরেজমিনে দেখে বাকি কথা বলি?

ম্যাডাম, আমার বিশ^াস জমি দেখে আপনার পছন্দ হবে। কারণ, আমাদের প্রপার্টিজের গ্রাহক স্বনামধন্য মন্ত্রী, এমপি, বড় বড় ব্যবসায়ী, সংস্কৃতি ও বিনোদন জগতের তারকারা। সেখানে দেখা সাক্ষাৎ হবে। আলাপ ও আড্ডা হবে। দেখবেন অনন্ত কালের গল্প করতে করতে সময় কেটে যাবে। মিলেমিশে ভালো থাকবেন। খুব আনন্দে কাটবে অবসর সময়। আশপাশে মাদ্রাসা, মসজিদ ও এতিমখানা থাকবে। সেই ছাত্ররা দিনরাত মঙ্গল কামনায় ব্রত। সকাল-সন্ধ্যা পড়তে থাকবে, আলিফ লাম মিম, জা লিক্বাল কিতাবু লাড়াই বা ফিহি হুদাললিল মুত্তাক্বিন… অংসখ্য তরুণ কণ্ঠে কোরআনের সুমধুর স্বর পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের চারপাশের বাতাসে ভাসবে। পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ হেফজখানা, পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ নুরানী মাদ্রাসা ও এতিমখানা, পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ জামেয়া কপিলউদ্দিন মাদ্রাসা ও পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ জামে মসজিদ। ছাত্ররা ফজর, আছর ও এশার নামাজের পর প্রপার্টিজের মালিকদের জন্য দোয়া ও জিকির করবে। মহান রবের দরবারে। কেউ কেউ ইনিয়ে বিনিয়ে দোয়া ও নাজাতের দরখাস্ত রাখবে। আরো জেনে অবাক হবেন, পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজকে সবাই দুনিয়ার স্বর্গ বলেই জানে। এরপর আপনার বিবেচনা। এমন সুযোগ আপনি ধরবেন নাকি হেলায় হারাবেন। তবে, একটা কথা সত্য সুযোগ কাজে না লাগালে পরবর্তীতে আপনাকে আপসোস করতে হবে।

আজিজের কথার চেয়ে স্বচোখে দেখেই স্বপ্না বেশি আপ্লুত। প্রকল্পটি আশপাশের জমির তুলনায় কিছুটা উঁচু। চারপাশের বেষ্টনীতে ছোটবড় গাছ লাগানো থাকলেও ভেতরে একদম ফাঁকা। প্রতি খণ্ডের মূল্য মাত্র বিশ লক্ষ টাকা। স্বপ্না চিন্তিত, এত টাকা কিভাবে সংগ্রহ করবে! আবার ভাবে, পছন্দের কাছে টাকা গৌণ। পছন্দের মূল্যায়ণে মানুষ ত্যাগ করে, আবার গ্রহণ করে। হাতে নগদ টাকা নেই। আবার এত টাকা সংগ্রহ করাও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তারপরও পছন্দকে চূড়ান্ত ভেবে আজিজের কাছে এক সপ্তাহ সময় চেয়েছে সে। আজিজ খুশি। কলিগরা বছরে একাধিক প্লট বিক্রি করলেও আজিজের পারফর্ম বাজে। ম্যানেজারের অসন্তুষ্টির কারণে এক ধরনের চ্যালেঞ্জে আছে নিজের কাছে নিজে। আজিজের দুর্ভাগ্য, ভালো ক্রেতা জোটে না। পেলেও বিভিন্ন অজুহাতে ছুটে যায়। চলতি মাসে একখ- প্লট বিক্রি করতে না পারলে চাকরিটাও ঝুলে যাবে। স্বপ্নার আশার ব্যঞ্জনায় আজিজের চাকরিটা তাহলে থাকছে। বাজারজাতকরণে তার পরিবর্তিত পলিসি নিয়েও খুশি হবেন ম্যানেজার। পিথাগোরাস আকাশে দাঁড়িয়ে আজিজ মনের পরিমাপ করছে জ্যামিতিকভাবে। চোখে মুখে আনন্দের স্রোতধারা।

স্বপ্না পছন্দের প্রপার্টিজ খণ্ডটির পাশে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ের কথা ভাবে। ভাবনায় মৃত মানুষের সাথে আড্ডা ও গল্প। গল্পের সূচনা কোথায় থেকে হবে? কিভাবে উপসংহার টানবে? আলেয়া বেগম স্বপ্নার কাছে বেড়াতে আসে। সঙ্গে অনেক রকম ফুল। অগোছালো জীবনের জন্য স্বপ্নাকে গালমন্দ দেয়। এভাবে হাসি খুশির ধারা অনন্তকাল বইবে এখানে। এপাড়া হয়ে উঠবে যুবক-যুবতীময়। প্রেমের বাগানে সবাই প্রেমের গান গাইবে। দুঃখবোধ শরীর স্পর্শ করবে না। তারা হয়ত আড়ালে আবডালে দাঁড়িয়ে আমাদের সুখের রথ দেখবে। কলা ক্রয়ের জন্য সুখের বায়নায় রসায়ন রান্না করবে। আহা সুখ, তুমি কতই না সুন্দর। শেষ পর্যন্ত তোমারই জয়। দুঃখরা শেষ পর্যন্ত অবহেলিত। দুঃখের জন্যও দুঃখ হয়। স্বপ্না হাসতে হাসতে ‘পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ’ হতে বেরিয়ে আসে।

গাড়িতে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছে স্বপ্না। আজিজ হিসেব কষছে কোম্পানি  থেকে কত পার্সেন্ট কমিশন পাবে। কমিশন দিয়ে মায়ের জন্য ফ্রিজ কিনবে, ছোট বোনের নতুন পোশাক। এমন চিন্তায় বিড়ালের পায়ে প্রবেশ করছিল তখন।

আজিজ সাহেব, আমার ফ্ল্যাটটি বিক্রির ব্যবস্থা করলে উপকৃত হই। গ্রাহক থাকলে জানাবেন।

ফ্ল্যাট বিক্রি করে প্লট ক্রয়ের কথা ভাবছেন?

হ্যাঁ, তাই করব। না হয় লোন করতে হবে। আপাতত লোন করতে চাচ্ছি না।

আমি দেখি, বিক্রির ব্যবস্থা করব।

তাহলে টাকা ম্যানেজের টেনশন কমবে।

অবশ্যই। চেষ্টায় বিন্দুমাত্র অবহেলা থাকবে না। কিন্তু, এখন বিক্রি করলে থাকবেন কোথায়?

তা আপাতত ভাবছি না। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

 

০২

আজিজ নতুন গ্রাহকের কাছে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের অফার নিয়ে যায়। এ তালিকায় অগ্রাধিকার সূত্রে সমাজের বিত্তবানরা। আজিজের কথায় হাসমত এমপিও পাশপাশি দুইখণ্ড জমি নেয়।

মখলেস চেয়ারম্যানকে ফ্ল্যাট ক্রয়ের অফার করে আজিজ। দু’জনের আলোচনা শোনে পাশের রুমে থাকা হা¯œা। মাঝে মাঝে নিরিবিলি থাকার জন্য একটা ফ্ল্যাট দরকার। আজিজের সঙ্গে ফ্ল্যাটও দেখতে যায় মখলেসের স্ত্রী হাসনা বেগম। ছিমছাম মনোরম পরিবেশের ফ্ল্যাটটি পছন্দ হয় তার। কেউ ছেড়ে দিয়ে খুশি, কেউ পেয়ে। কথা শেষে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে থাকে। স্বপ্না দু’কদম সামনে এগিয়ে হাসনাকে বলল, চুক্তি শেষে থাকার জন্য বাসা দেখতে হবে। তাড়াতাড়ি জানালে খুশি হব।

প্লিজ, এতো টেনশন নেবেন না। আপাতত থাকেন। আমি একমাস আগে আপনাকে বলব।

বিষণ্নতা, ক্লান্তি, রুক্ষতা অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরছে স্বপ্নাকে। সূর্যের আলোয় সব কিছু যেন অন্ধকার। অন্ধকার অলিগলি ও রাস্তা। সন্তান প্রসবের পর গর্ভবতী নিজেকে শূন্য শূন্য ভাবে, তেমনি শূন্যতা চারপাশ থেকে ঘিরে আসছে ফ্ল্যাট ছেড়ে। ভেতরে ভেতরে আজন্ম হাহাকারময় ক্রন্দন। রিক্ততার খাতায় নাম লিখিয়ে হতশ্রী। চেনা-জানা স্মৃতিময় ফ্লাটটি অন্যের দখলে চলে যাবে! তাকে খুঁজতে হবে নতুন আশ্রয়! এমনটা ভাবতেই চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। পড়ার আগেই পাড়ার উঠতি সন্ত্রাসীর মতো হাতে থাকা টিস্যু পেপার শেষ জলটুকুও শুষে নেয়।

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমেছে স্বার্থপর নগরে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। সেই সঙ্গে তুমুল গর্জন। ভারি বাতাস বইছে নগরের গলিতে। ঝড় তুফান। ঝড় তুফান আর বাতাসের প্লাবন স্বপ্নার মনের ভেতরও। হৃদয়ের ঘর-বাড়ি লণ্ডভণ্ড হচ্ছে। বাতাসের কবলে কোনো কিছুই স্থির থাকতে পারছে না। অতিমাত্রায় ঝড় তুফানে স্বপ্নার মনে অস্থিরতা নেমেছে। সে যেন সাহারা মরুভূমিতে একা! কোথাও কেউ নেই। বারান্দায় পায়চারি করছে। ঘরের দরজা জানালা খোলা। বাইরের মুক্ত বাতাস প্রবেশ করে দূষিত বাতাস তাড়াবে। পবিত্রতা খেলা করবে এখানে। নতুন মালিক পাবে পাপমুক্ত ফ্ল্যাট।

বারান্দায় ঝুলন্ত খাঁচায় দুটি পোষা ময়না। ঝড়ের তা-বে খাঁচার এককোণে জড়োসড়ো হয়ে কাঁপছে। তাদের বন্দীদশা দেখে মায়া হয় গৃহ মালিকের। খাঁচার দরজা খুলে দেয়। পাখি দুটো যেতে চায় না। ঘরের ভিতরে আসে। স্বপ্নাও পেছনে পেছনে আসে। বলে, তোমাদের ছেড়ে দিলাম। আজ হতে তোমরা মুক্ত। স্বাধীন। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াও। যখন ইচ্ছে উড়তে পারো। কেউ আটকাবে না। একটা সময় ঝড়ের প্রতাপ কমে। পাখি দুটি উঁচু বিল্ডিং পাড়ি দিয়ে আকাশ পানে উড়তে থাকে। স্বপ্না তাকিয়ে আছে। পেটে হাত রেখে ভাবে, সত্যিই পেট খালি। পেটে দানাপানি পড়ে না কত যুগ। কিন্তু, এই মুহূর্তে অ্যাকুরিয়ামের গোল্ডফিশের সাঁতার কাটার দৃশ্য দেখতে ভালো লাগে। এর আগে এমন ভালো কখনো লাগেনি। সমুদ্রে মাছগুলো ছেড়ে দিতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু, অ্যাকুরিয়ামের মাছ সমুদ্রে গেলে বাঁচবে কী করে? বিশাল সমুদ্রে গিয়ে ওদের বাঁচাটাও কঠিন।

রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো ঝড়ের সঙ্গে লড়ছে। বিদুৎ নেই। নগরে নেমেছে মধ্যরাত। মধ্যরাতের দরজা খুললে স্বপ্না অনুভব করে আরেকটি হাত। অসময়ে হাত! এই হাত ভরসার, না ভয়ের? হাতের উপর কার হাত? ভয় পায় স্বপ্না! ¤্রয়িকণ্ঠে আওয়াজ আসে, আমি হাসমত। হাসমত এমপি। ভয়ের কারণ নেই।

অ, আপনি বলেই এত বেশি ভয়।

এখন নিশ্চয় ভয় কেটে গেছে?

নাহ। বেড়েছে। অন্ধকারে আজীবন ভয় আমার। ভয় কাটবে না। হঠাৎ আপনি এখানে?

ভাবলাম তুমি একা। দেখা করে যাই।

কে বলেছে আমি একা? আর একা হলেও আপনাকে আসতে হবে কেন?

দেখা করার ইচ্ছে হলো তাই।

কই, আমার তো ইচ্ছে করে না। ডাকতে যাইনি কোনদিন। অনিয়মের গিটার বাজাতে বাজাতে হাত দুটি বিষরক্ত! কথার সুর উঠছে না। খুঁজে পাচ্ছি না ছন্দ। গতি আসছে না কাজকর্মে। আমার থেকে আমার কার্বন কপিও আসছে না। একা ও নিঃসঙ্গতা আলিঙ্গন করে আছি। বিভ্রান্ত মুহূর্তের মতো হাতের মুঠোয় হাত আটকায় না। অথচ সমাজের চোখে প্রতিষ্ঠিত ছিল আমার অবস্থান। মিথ্যাচার কতদিন মানতে পারি! সাজানো কাচের দেয়াল ভেঙে দিতে ইচ্ছে হয়। অদ্ভুত শৃঙ্খল আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল। জানি না, আমার আগামি দিন কোথায় রচনা হবে!

স্বপ্না, আমিও তোমার মতো একা থাকতে চাই। খুব একা।

হাসমত সাহেব, জীবনটা খেলনা নয়। খেলতে খেলতে বেলা শেষ হয় না। আমার অলস বেলা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিয়েছি। ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছি। এখন আমার কাছে আমার কিছু নেই। যৌবনের সুখ আর সংসার আপনার নামে কোরবানি করেছি। এসবের জন্য আপনিও কম দায়ী নন। দ্বিতীয়বার আপনার মুখোমুখি হতে অনিচ্ছুক আমি। এখন ভেবে দেখতে পারেন এখানে থাকবেন না চলে যাবেন?

ভেবে চিন্তে কথা বলেছ?

একদম।

এখন ঝড় তুফান বইছে। কিভাবে যাব?

এখনও দিনের টেবিলে সন্ধ্যা, আশংকার কারণ নেই। আর মরে গেলে দুর্গন্ধ কমবে। আপনার মতো মানুষ বেঁচে থাকা মানে সমাজের আশংকা কয়েকগুণ বেড়ে চলা।

কাজটা ভালো হচ্ছে না।

ভুল করতে করতে ভালো কাকে বলে ভুলে গেছি।

হাসমত হনহন করে বেরিয়ে যায়।

ভালো মন্দের খতিয়ান অশুদ্ধ যাযাবর। যাযাবরের চরণদাসী আমি। আমি নতুন কিছু ভাবছি ভিন্নভাবে। জয়রথের জন্য। ব্যাকুল হয়ে ঐকূলে যেতে চাই না আর।

স্বপ্নার মোবাইল বাজছে। ওইদিকে খেয়াল নেই। দৃষ্টি বারান্দায়। দৃষ্টির বিপরীতে যেন জীবন। দৃষ্টির সম্ভাব্য একটা সীমা থাকে। জীবনের সেটা নেই। তাই এটা নিয়ে ভাবারও কিছু নেই।

আবারও ফোন বাজছে

স্বপ্না, আমি রাবেয়া। পারমানেন্ট ক্লায়েন্ট পেয়েছি। রাজি থাকলে তোমার ফোন নম্বর ও ঠিকানা দেবো। দীর্ঘ সময় ধরে সার্ভিস নিতে চায় লোকটা। টাকা পয়সাওয়ালা। যা চাইবে দিবে।

না রে। যে পথ ছেড়েছি সে পথে আর নয়। লাভ থাকলেও না। আপাতত মৃত্যুচিন্তায় উ™£ান্ত আমি। মৃত্যু পরবর্তী সময় নিয়েই বেশি ভাবছি।

এত তাড়াতাড়ি মৃত্যু নিয়ে ভাবার কারণ দেখছি না। সমাজ যা করার করবে।

কিন্তু আমার চিন্তাকে এর বাইরে কোন ভাবেই বের করতে পারছি না। চিন্তার ভেতরে বারবার পরকালই আসছে। সেই কাল বড় বিশাল। বিশাল সময়ে কোথায় থাকব, সেটার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে আমাকে।

সমাজ তোমার পরিকল্পনার প্রতি সম্মান জানাবে?

নিজের শ্রমে-ঘামে তৈরি তাজমহলের মালিক শাজাহান। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে ঘুমাবে শাহজাহান ও মমতাজ। ব্যতিক্রম ঘটে না সে নিয়মের। আমার মতো চুনোপুঁটির বেলায় নিয়ম বদলাবে কোন হিটলার?

 

০৩

আজিজ দুইজন ক্লায়েন্ট নিয়ে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ দেখাতে আসে। দু’জনই উত্তরার স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। সম্প্রতি দু’জনেই পবিত্র হজ¦ পালন করে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ দেখছে। কিছু দূরে উঁচু জায়গায় একজন মহিলা ফুল গাছ রোপণ করছে। আজিজ ইশারায় দেখাল, মহিলা ওই খ-টি ক্রয় করতে কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছে। খুব সুন্দর জায়গা। সেখানে সে বিভিন্ন ধরনের ফুল গাছ লাগাবে। সবাই সেই ফুলের ঘ্রাণে উপকৃত হবে। দারুণ জমবে। জম্পেশ আড্ডা হবে। প্রপার্টিজ দেখতে আসা ব্যক্তি দু’জন বারবার স্বপ্নার দিকে তাকায়। চিনতে পারে। কাছাকাছি হলে চেহারা আরো পরিষ্কার হয়।

আজিজ, এখানে তারও সমাহিত হবে! তাকে আমরা ভালো করে চিনি। কী কাজ করে জানি।

জি¦ স্যার

এটা কিভাবে সম্ভব!

স্বপ্নার কানে কথাগুলো বাজে। সে পাশ কাটিয়ে সামনে হাঁটে। রাস্তায় সিএনজির অপেক্ষায় আছে।

কে কি করল তা আমাদের কাছে মুখ্যবিষয় না।

তোমাদের কাছে মুখ্য না হলেও আমার কাছে মুখ্য।

হাসনা ফ্ল্যাটের টাকা পরিশোধের কথা জানায় মখলেসকে। মখলেস বলল, তুমি গিয়ে পরিশোধ করে এসো। আমার অন্য কাজ আছে।

সঙ্গে তোমাকেও যেতে হবে।

সব কাজে আমাকে জড়াও কেন?

তোমাকে না জড়ালে কাকে নিয়ে যাব?

বুঝতে পেরেছি। সব তোমার চালাকি।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ত্রীর সঙ্গে আসতে হয়। ফ্লাটের আশপাশ মখলেসের চেনা চেনা লাগছে। অলিগলির পথও। পথের মাথায় সুসজ্জিত বিল্ডিং। ছয় তলা বিল্ডিংয়ের তিনতলা ফ্লোরের হাতের ডান পাশের ফ্ল্যাট। হাসনা ঠিক ঠিক তিনতলার ডান পাশের দরজায় নক করল। তখনই মখলেসের মনের দরজা খুলে যায়। মগজের প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে আঘাত করতে থাকে পূর্ব পরিচিত কেউ। দরজা খোলে স্বপ্না। আসুন বলতে গিয়ে মখলেসের দিকে নজর, কথা আটকে আসে স্বপ্নার। হাসনা হাসতে হাসতে ভেতরে গেলেও মখলেস কিছুক্ষণ দাঁড়ায়।

মখলেসের স্ত্রী পেছন ফিরে, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে এসো।

মখলেস ভাবে, একবার ভেতর থেকে বেরিয়েছি। বেশ কষ্ট হয়েছে। সময় অপচয় হয়েছে অনেক। আবার ভেতরে গেলে তোমার সাথে স্নায়ুদ্বন্দ্ব বাড়বে।

স্বপ্না, কিচেন কোন দিকে?

মখলেস ইশারা করে হাতের বাম দিকে। হাসনা কিছুটা বিস্মিত! তুমি জানো কিভাবে?

আমতা আমতা করে মখলেস। এ ধরনের বিল্ডিংয়ের কিচেন আর বাথরুম কোন দিকে থাকে তা বলতে গেলে অতি মেধাবী মানুষ হতে হবে না। স্বপ্না নিচের দিকে তাকায়।

আমি দেখে আসি।

শব্দহীনভাবে স্বপ্না ও মখলেস দাঁড়িয়ে আছে। হাসনা দেখা শেষে হাসমতকে বলে, তুমি তো কিছুই দেখলে না। আমার কিন্তু পছন্দ হয়েছে।

হাসনা, বিল্ডিংয়ের স্ট্রাকচার দেখলেই বুঝতে পারি, বিল্ডিং কেমন। তুমি কথা বলো, আমি নিচে আছি বলে মখলেস বেরিয়ে আসে।

হাসনা কিছুটা বিব্রত স্বরে স্বপ্নাকে বলল, কিছু মনে করবেন না। আমার হাজবেন্ড এমনই। মেয়েদের সামনে খুব লজ্জা পায়। বিব্রতও হয়।

অ। সব মেয়েদের সামনে?

হুম।

সব সময়?

এখন তো দেখলেই। তোমাকেও কত লজ্জা পেয়েছে।

কিছু সময় থাকার পর হাসনাও বিদায় নেয়।

গাড়ি যাচ্ছে পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের দিকে। হাসনা গাড়ির গ্লাস খুলে বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখছে। আকাশ দেখছে। নবনির্মিত ভবন দেখছে। দেখতে দেখতে বোধোদয় হল, বাংলাদেশ অনেক সুন্দর দেশ। আসলে আগে বুঝতে পারিনি। মখলেস, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সুইজারল্যান্ড যাব না। দেশে থাকব। তামার কাছে থাকব। মৃত্যুর পর পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজে একসঙ্গে ঘুমাব।

তোমাকে একটা কথা বলি। তুমি স্বপ্নার ফ্ল্যাটটি নিয়ো না। এরচেয়েও ভালো ও সুন্দর ফ্ল্যাট কিনে দেব তোমাকে।

এটা আমার পছন্দ। এটিই নেব। আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছি। না হয় সুইজারল্যান্ড চলে যাব। দেশে আর ফিরব না। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ওখানেই থাকব।

তাহলে বিকল্প চিন্তা করা যাক। আমিও আরেকটা ফ্ল্যাট নেব। দুইটার মধ্যে সুন্দরটাই দু’জনে বেছে নেব। রাজি?

আগে এই ফ্ল্যাটটি নিই। তা পরে ভাবা যাবে।

গাড়ি পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের সামনে চলে এসেছে। হাসনা গাড়ি হতে নেমে প্রপার্টিজ দেখছে। দারুণ প্রজেক্ট! আমাদের পরবর্তী ঠিকানা? আমার কোনো অভিযোগ থাকবে না। সত্যি, অসম্ভব সুন্দর জায়গা। এরপরই আসে আজিজ। আজিজের মিনিট বিশেক পর স্বপ্না। স্বপ্নাকে দেখে হাসে হা¯œা। আপনিও এখানে চিরদিনের ঠিকানা নেবেন?

সেটাই ভাবছি।

ভালোই হবে।

তাহলে আমরা প্রতিবেশী হব।

মখলেস তা দেখে হাসনাকে ডাকে।

আজিজের খুশির সীমা নেই। সৃষ্টিকর্তা তার দিকে মুখ ফিরিয়েছে। বিক্রি বাড়লে কমিশনের পরিমাণ বাড়ে। গ্রামে ছোটখাটো একটা বিল্ডিং বানানোর পরিকল্পনা আঁটছে। এরপর বিয়ে করবে। লাল শাড়ি পরে সুন্দরী বউ আসবে। বোনের বিয়ে হবে। সুখী সংসার হবে। এরপর গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে আসবে শহরে। এখানে হবে আমাদের সুখের ঠিকানা। আজিজের স্বপ্ন দিনকে দিন আরো বড় হতে থাকে। ডালপালাও মেলে।

চেনা জানা ফ্ল্যাট ছেড়ে স্বপ্না উন্মাদের মতো রাস্তার অলি গলি ঘুরছে। বাকি জীবন কাটানোর জন্য কোথাও একটা ঠিকানা দরকার। ছোট-বড় একটা বাসা। সিঙ্গেল শোনলে কেউ ভাড়া দিতে রাজি হয় না। এমনকি বাসাও দেখতে দেয় না। কেউ কেউ মুখের উপর বলে ‘বাসা খালি নেই।’ মন খারাপ হয়। অল্প পরিচিত একজন ভাড়া দেয়ার আশ^াস দেয়। সমস্যার কথা শোনে, পরিচিত ব্যক্তিটি উল্টো জানতে চায়, এত বয়স পর্যন্ত সিঙ্গেল কেন? বিয়ে না করার কারণ কী? সমাজ আপনাকে ভালো চোখে দেখবে না। আমাকেও না। লোকে মন্দ বলে জানবে। স্বপ্না রাগে হনহন করে হাঁটতে থাকে। চারপাশের সব কিছু বড় অচেনা লাগছে।

স্বপ্না ভাবে, এই শহরে কোনো আগন্তুক আমি! মানুষের নিষ্ঠুর ব্যবহারে রীতিমত বিস্মিত। পতিতা বলে, নষ্টা বলে কটুক্তি করে।

বাসা বিক্রি করেছি। এখানে আর কতদিন থাকা যায়! এমনটা ভাবতে ভাবতে রাত বাড়ে, ফিরতে গিয়ে উদ্ভ্রান্ত মস্তিষ্ক তাড়িত করে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় পতিত সূর্যের জৌলুস কিছুটা কমে আসে। তাকে পৃথিবীর দড়ি দিয়ে আটকানো অসম্ভব! সূর্য আপন নিয়ম ব্যতিরেকে অন্য নিয়মে অচল। কল্পনার বাতুলতায় স্বপ্না হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়ায় অনেকগুলো মোড়। কিন্তু কোনো পথই খোলা নেই। কোন দিকে যাবে? নিজেই নিজেকে বহন করতে পারছে না। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। অদৃশ্য কোন সাপ দংশন করছে। স্বপ্না চিৎকার করছে হৃদয়ের মালিকানা আরেকজনের দখলে দিয়ে। সবহারা স্বপ্না মুড়ির ঠোঙার মতো। ছুঁড়ে ফেলেছে নিজেকে। সে জানে না এমন স্বপ্ন কেন দেখছে। চোখ বেয়ে বর্ষার ¯্রােত নামে। দ্বীপের মাঝে একা। নিজের সঙ্গে একা।

জীবনের সব কিছু হারিয়ে পথে বসেছি, আর হারানোর ভয় কিসের? আমার হারানোর ভয় নেই। তারপরেও মনের গহীনে চিন্তার রেখা উঁকি মারে। স্বপ্না খেয়ে না খেয়ে দিন অতিবাহিত করে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বেঁচে থাকাতে বেশ অনীহা। চেয়ারে মাথা রেখে দুলছে। দুলতে দুলতে ভাবছে জীবনের অতীত বীজগণিত, পাটিগণিত, ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি, উপপাদ্য ও সম্পাদ্যজ্ঞান। একেক অংকের একেক ধরন। সেই জটিলতার একটিও ধারণ করতে শিখিনি। গণিত মাস্টার গণিত বোঝানোর পরিবর্তে আঙুল দিয়ে শরীরের গ্রহ নক্ষত্রের হিসাব কষে উপগ্রহ বের করেছে। অবহেলায় জীবন গেল সকাল হল না। তবু চারপাশে রাত বাড়ছে।

দরজার কড়া নড়ার শব্দ। অসময়ে কড়া নড়ছে! কলিংবেলের পরিবর্তে কড়া নাড়ছে কেন? এই কড়া একজন ছাড়া কেউ নাড়ে না। তাহলে কি মখলেস আবার এসেছে? দরজা খুলে চিন্তার ব্যতিক্রম কিছু দেখেনি। স্বপ্না ভেতরে আসতে আসতে বলে, তুমি আবার ফিরে এসেছ কেন? নিশ্চয় বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে?

না, তা হবে কেন? আমার বয়স হয়েছে। সত্য-মিথ্যার মতো সকল সম্ভবনার অজুহাত ছুড়ে ফেলে এখন বউয়ের আঁচল ধরে শেষ নিঃশ^াস নিতে চাই।

তাহলে কোন মতলব নিয়ে এখানে মিস্টার মখলেস? বিপদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত বিধ্বস্ত হয়ে আছো মনে হয়েছে। তোমাকে এমন বিধ্বস্ত দেখালে আমার খুব হাসি পায়। খুব হাসতে ইচ্ছে করে।

আমি বিভ্রান্ত তোমাকে নিয়ে।

তা কেন?

শুনবে? তোমার এই ফ্ল্যাট বিক্রি করার দরকার নেই। আর পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজে প্লট নেয়ারও দরকার নেই। তুমি এই ফ্লাটেই থাকো। মৃত্যুর পর কোথায় তুমি ঘুমাবে তা আমি ভাববো।

আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে তুমি?

সমস্যা!

কার সমস্যা? কিসের সমস্যা?

প্লিজ প্রশ্ন করো না, উত্তরও চেয়ো না। যেটা বলছি সেটা শোনো।

উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশ্ন করেই যাব। পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজে প্লট কেনা না কেনা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। সেই জ্ঞান কেউ না দিলেই ধন্যবাদ দেবো।

মখলেস স্বর নিচু করে, আমার কথা না শুনলে পস্তাবে।

বোকা মানুষ বারবার সাপের লেজে পা রাখে। আমি অত বোকা নই, যে তোমার লেজে আবার পা রাখব। তুমি স্ত্রী সন্তান বিদেশে পাঠিয়ে যৌবনের অন্ধজ¦ালায় সতের বছরের স্বপ্নার কাছে আশ্রয়-প্রশ্রয় খুঁজেছিলে। অন্ধ স্বপ্না তোমাকে বুকে জড়িয়ে একযুগ দুই বছর কাটিয়েছে। একসাথে এক বিছানায় থাকার পরও তুমি আমার আপন কেউ না। প্রতিদান হিসেবে এই ফ্ল্যাট! আচ্ছা, একটা জীবনের দাম একটা ফ্ল্যাট! দীর্ঘদিন এক সঙ্গে থাকার পরও আমরা কেউ কারো কিছু না। কোনো সম্পর্ক নেই! গ্রহ থেকে উপগ্রহের সমান দূরত্বে আমাদের বসবাস! চোখ থাকতে অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়াতে হচ্ছে। কলার ভেলায় ভাসছে আমার মায়ের লাশ। পাড়ে ভিড়লেই তিরে বিদ্ধ হতে হবে। অথবা শিয়াল, শকুন এবং কুকুর কামড়াবে। আমার চারপাশে কেবল ভয় আর ভয়। শান-শওকত দিয়ে জীবন পার করা অসম্ভব। যে নারীর স্বামী সন্তান নেই, সমাজ তাকে কি বলে উপহাস করে তা তুমি বুঝবে না। কারণ তুমি পুরুষ। পৌরুষ তোমাদের অহংকার। স্বামী একজন নারীর জীবনে পোশাকের মতো সৌন্দর্য বাড়ায়। আর মাতৃত্ব নারীর আজন্ম অহংকার। অলংকার। আমি সব কিছু ছেড়ে তোমার হাতে আমাকে তুলে দিয়েছিলাম। ভাবছ একবার, কত বড় বোকা আমি?

স্বপ্না, তোমার আবেগ ভরা কথা শুনতে এখানে আসিনি।

এখানে তোমাকে কে ডেকেছে! কেন এসেছ? ঠক, প্রতারক, মিথ্যাবাদীর জায়গা আমার কাছে না। এমনকি ছায়া মাড়াতেও অনিচ্ছুক। পতিতারও ধর্ম আছে, নিয়মের ভেতরে থেকে অনিয়ম করে না। তোমাকে মনিব ভেবে সব দিয়েছি। অতিরিক্ত সুবিধার লোভে অন্য পুরুষের সঙ্গও নেইনি। সেই তুমি আমাকে শাসন করতে এসেছ!

চুপ করো, আমার বাসায় উঁচু গলায় কথা! ফ্ল্যাট আমার স্ত্রী ক্রয় করেছে। স্মরণে রেখো।

নিজের বলে দাবি করার সৎ সাহস তোমার নেই। এই মুহূর্তে বের হয়ে যাও। লজ্জা থাকলে কখনো সামনে আসবে না।

যাচ্ছি, তবে, চূড়ান্ত হিসেবে বসব তোমার সঙ্গে। হাড় থেকে হাড়ের দূরত্ব তখন টের পাবে।

নার্সিসাসের মতো আত্মপ্রেমে নিজেকে জড়িয়ে কান্না করে স্বপ্না। কান্না শেষে ঘৃণা হয় নিজেকে। আয়নার সামনে গিয়ে থুথু ছোড়ে নিজের প্রতিবিম্বে।

 

০৪

আজিজ সাহেব, আমি একা মানুষ। আত্মীয় স্বজন কেউ নেই। মারা যাওয়ার পর সৎকারের ব্যবস্থাটা আপনি করবেন? এতটুকু দায়িত্ব পালন করলে মৃত আত্মা শান্তিতে ঘুমাবে।

মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে এত চিন্তিত হওয়ার কোনো কিছু নেই। সব মানুষই মৃতের সৎকারে এগিয়ে আসে।

আসে না।

এক নতুন কথা শোনালেন।

আজিজ সাহেব, নতুন কথা নয়। লাশ মাটি দিতে না পেরে কলার ভেলায়  ভাসিয়ে দিয়েছি।

এ যুগে এটাও হয়?

হয়, আপনি এখনও সব মানুষ চেনেন না। আমি মানুষের সাথে অমানুষ সেজে মানুষ চেনার চেষ্টা করেছি।

এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। আপনি ওসিয়ত করে যাবেন, কেমন খাটিয়া লাগবে? চন্দন কাঠের খাট, না সাধারণ খাট হবে? কোন দেশ থেকে আমদানি করা কাপড় মুড়িয়ে আপনি ঘুমাতে চান। কেমন আতর-গোলাপ লাগবে। গোলাপ জল কতটুকু দিয়ে গোসল করাতে হবে। কোরআন তেলাওয়াতে এক শ, না দুই শ হাফেজ লাগবে?

না না এত হাফেজ লাগবে না। আরও কম হলেও চলবে।

কান্নার জন্য কয়েকজন পুরুষ ও মহিলা নিয়ে আসব। এদের কেউ কাঁদবে উচ্চস্বরে, কেউ গড়াগড়ি দিয়ে, কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলবে। নামকরা গোর খোদকের সঙ্গেও আমার জানাশোনা আছে। চাইলে তাকে দিয়েও সুন্দর ভাবে কবর বানাতে পারেন। এলাকার সব মসজিদে আপনার নামে সপ্তাহব্যাপী মিলাদ চালু থাকবে। চারদিনের দোয়া মাহফিলে চাইলে দশটি গরু কাটার আয়োজন করতে পারি। আপনি ব্যবস্থা করে যাবেন। তবে আপনাকে একটা নিশ্চয়তা দিচ্ছি টাকা পয়সার কোন ধরনের হেরফের হবে না।

কথা শোনে স্বপ্নার চোখের একপাশে সামান্য জল জমে। সেই জলের ফাঁকে বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনে সামান্য সময়ের জন্য উঁকি দেয়া সূর্যের মতো হাসিও। টিস্যু দিয়ে জমা জল মোছে।

আজিজ সাহেব, আপনি অনেক উপকার করছেন। অথচ একসাথে এককাপ চা খাওয়ার আয়োজন করিনি। আপনি বসুন। এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি। আজিজ অমত করতে পারল না। চায়ের কাপ হাতে আলাপ আড্ডা জমে। ম্যাডাম, মার্কেটিংয়ের সুবাদে অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়েছে। এর মধ্যে আপনি ব্যতিক্রম।

স্বপ্না হাসতে হাসতে বলে আপনি ঠিক বলেছেন, আসলেই ব্যতিক্রম। কোনদিন কারো চরিত্রের সঙ্গে মিলে না, আর মিলবেও না।

মেলাতে না যাওয়াই ভালো। আপনি অনলি ওয়ান পিস। ফটোকপি নেই। হাহাহা…

তাই?

সত্যি বলছি।

আপনার কথা শুনে আড্ডার ক্ষুধা বেড়েছে। আরো কিছুদিন বেঁচে থাকার স্বপ্নও নতুন করে জাগল।

চলুন আজ এক সঙ্গে বাইরে কোথাও নাস্তা সারি

তা করা যায়। আপনার আপত্তি না থাকলে দুপুরে একসঙ্গে খেতে চাই।

আপত্তি থাকবে কেন? আপনাকে অনেক দিন অফার করব করব ভেবেও করা হয়নি।

একজন ক্লায়েন্টের বাসায় এপয়েনমেন্ট আছে। কাজ শেষে সোজা দুপুরের খাবার টেবিলে চলে আসব। রেডি থাকবেন।

পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের চুক্তি ও অন্যান্য কাজে মখলেসের বাসায় আজিজ। স্যার, যে হারে বুকিং চলছে আগামি দুইমাসের মধ্যে হয়ে যাবে। চাইলে সীমিত সময়ে আরেকটি সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। পরবর্তী জেনারেশনের জন্যও বুকিং। সেক্ষেত্রে আপনি পনের পার্সেন্ট কমে পারবেন।

তা ঠিক আছে, তবে, আমি পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।

স্যার, তা কেন হবে?

বলব। তবে আপনার কাছে নয়। আপনার বসের কাছে। দ্রুতই সাক্ষাৎ করারও ইচ্ছে রয়েছে। অফিসের ম্যানেজার বা চেয়ারম্যানের ভিজিডিং কার্ড বা কন্ট্রাক্ট নম্বর থাকলে দেবেন। সময় করে আলাপ করব।

নিশ্চয়ই। আমি যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেবো। তবে, আপনি অফিসে এলে খুশি হব।

আজিজের মন খারাপ। অন্যদিকে স্বপ্নাও লজ্জায় লাল। যেন জীবনে প্রথম কোন যুবকের সামনে বসেছে। কথা বলতে পারছে না। আলাদা এক অনুভূতি কাজ করছে। আজিজের মনেও আস্তে আস্তে খুশির দোল লাগছে। অতীত ভুলে হৃদয়ের দক্ষিণমুখী দুয়ার খোলে। তরতর বাতাস বইছে।

ম্যাডাম, আপনার হোম কোথায়?

এখানেই।

গ্রামের বাড়ি?

এখানেই।

জন্মস্থান?

সম্ভবত এখানেই।

সম্ভবত কেন?

জানি না।

আচ্ছা আগে খেয়ে নেই।

সামনা সামনি বসা। আবারও রাজ্যের নীরবতা নেমে আসে। স্বপ্না নীরবতা ভাঙে, একবারে চুপচাপ থাকলে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। তারচেয়ে কিছু একটা বলা ভালো।

কৌতূহল জাগানিয়া একটা প্রশ্ন…

বলুন। শুনি।

উত্তর যদি না পাই; আর প্রশ্ন করলে যদি মনে কষ্ট নেন, তাই কিউরিসিটি দমন করি।

হাহাহা… আমাকে রাগি মনে হয়?

ঠিক তেমন না। তারপরও। আসলে ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক হলে যা হয়। বলুন তো আপনার প্রিয় রং কী?

আমার পরনে যা দেখতে পাচ্ছেন।

আপনারও দেখছি সাদা রং! এই রং পছন্দ হওয়ার পেছনে আলাদা কোনো কারণ আছে?

সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই।

ফুল?

শাপলা আমার ভালো লাগে।

শাপলা?

হুম। শাপলা পানিতে ভাসে। আর আমি জমিনে। এই শহরে ভাসি। ভাসতে ভাসতে শুকিয়ে যাই। এরপর আপনার সাথে গল্পে বসি।

বাই দ্য ওয়ে, আমার কৌতূহলটা মেটাবেন?

বলুন।

আমি মার্কেটিংয়ের লোক। পেশাগত কারণে অনেকের সাথে মিশতে হয়। কথা বললে বোঝা যায় কে কী করছেন। ধরুন, ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললাম, ব্যবসার কথা বলবেন। চাকরিজীবীর সঙ্গে কথা বললাম চাকরির কথা বলবেন। আবার প্রবাসীদের সাথে কথা বললে, প্রবাসজীবনের আলোচনা আসা স্বাভাবিক। আপনার সাথে কথা বলে কিছুই বুঝতে পারছি না।

স্বপ্না হাসে। একেবারে উচ্চস্বরে।

হাসছেন কেন?

কথা শুনে।

আমি তো চরম ফাঁকিবাজ। কথাই আমার ব্যবসা। আপনার মতোই মার্কেটিংয়ের লোক। তবে, আমি একটু ব্যতিক্রম। নিজের মার্কেটিং করতাম। সত্যিকারার্থে আমার ব্যবসার কথা শোনার পর অনেক দূরে চলে যাবেন। আয়নার সামনে যে দাঁড়ায় তাই দেখায়। অথচ, আমি দাঁড়ালে কিছুই দেখা যাবে না। কারণ, আমি আমার ভেতরে নেই। সমাজে আমার কাজের স্বীকৃতি নেই। শোনার পর থুথু ফেলবেন। তারপরও বলছি। কৌতূহল মিটে যাক। আমি সাবেক পতিতা। যৌনকাতর পুরুষদের মনোবাসনা পূরণ করে পেটের খাবার জোটাতাম। এখন রিটায়ারমেন্টে আছি।

একথা শোনার পর আজিজের চেহারায় কিঞ্চিৎ পরিবর্তন আসে। আজিজ বোকার মতো তাকায়। স্বপ্না খাবার শেষে বিল পরিশোধ করে বেরিয়ে আসে।

পরিচয় জানার পর সবাই আমাকে ছেড়ে দূরে চলে যায়। চলে যাওয়াটাই ভালো। কেউ জড়িয়ে কষ্ট পাবে তা আমার অসহ্য লাগবে। ভাবে স্বপ্না।

সন্ধ্যার কিছু আগে আজিজের ফোন, ম্যাডাম, ম্যানেজার স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।

অবশ্যই।

স্বপ্না সকাল সকাল পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ অফিসে আসে। ম্যানেজারের কক্ষে প্রবেশ করে বিস্মিত হয়! ম্যানেজার মুস্তাফিজও বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে যায়! স্বপ্না কী করবে, বুঝতে পারছে না। বেরিয়েও আসতে পারছে না। অতীতের অনেক কিছুই হঠাৎ হঠাৎ সামনে এসে বিস্মিত করে দেয় মানুষকে। মোস্তাফিজ বসতে বলেন। আমাকে দেখার পর আপনার মনে অসংখ্য প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, পুরাতন কথা সামনে আসছে, বুঝতে পারছি। সেসব বাদ দিন। আজ বরং ব্যবসায়িক আলাপ করি। ব্যক্তিগত বিষয় ব্যবসায় টানলে সমস্যা বাড়ে। আবার ব্যবসায় ব্যক্তিগত বলতে তেমন কিছু থাকে না। স্বপ্না, বলুন কী খাবেন, চা অথবা কফি?

চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, নাহ। কিছু খাব না।

কিছু অন্তত খাবেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আজ আমাকে অবাক করার জন্যই ডেকেছেন বুঝি? এই চেয়ারে বসে নাজাতনামার ব্যবসা নেমেছেন। এর চেয়ে বেশি অবাক হওয়ার কিছু থাকে?

মানুষের উপকারের কথা ভেবে শুরু করেছি।

ধর্মের ডাক শিয়ালের মুখে। শহরের প্রতিষ্ঠিত অনেক পুরুষকে হাড়ে হাড়ে চিনি।

সমস্যা এখানেই। না চিনলে সম্ভাবনা বাড়ে। দয়া পসরা মিলে। পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ একখ- জমি আপনার কাছে বিক্রি করেছে? আমাদের এই জমি বরাদ্দের কিছু নিয়ম রয়েছে।

নিয়মগুলো জানতে পারি?

অবশ্যই, যাওয়ার সময় ক্যাটালগ দেবো। বাসায় নিয়ে পড়বেন। আর দুঃখিত যে, আমাদের নিয়মের মধ্যে আপনি পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজের জমি ক্রয় করতে পারছেন না।

স্বপ্নার চোখ আগুনের মতো জ¦লজ¦ল করে! পারছি না মানে?

জমি ক্রয় লিস্ট আছে। সেই লিস্টটাও দেখে নেবেন।

টাকার বিনিময়ে জমি নেব। লিস্ট সেখানে গৌণ।

অন্যরাও টাকার বিনিময়ে এমন সুযোগ নেবেন। এখানে জমির বিনিময়ে শরীর নয়। তারপরও বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে দুঃখিত।

আমার জমি আমি নেব। এটা আমার অধিকার। প্রয়োজনে আইনের পরামর্শ নেব।

আপনার একজনের জন্য ব্যবসার ক্ষতি কোম্পানি করবে না। কাস্টমার ছুটে যাবে। এই সিদ্ধান্ত ব্যবসার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। আপনি আইডেন্টি ক্রাইসিসে ভুগছেন। জমি দেব কিভাবে? স্থায়ী ঠিকানা দিতে পারবেন? বাবার নাম। গ্রামের ঠিকানা?

আমি ভাসমান। তারপরও বাকি শর্ত মেনে কাগজপত্র জমা দিয়েছি।

আসলে আপনার সাথে বিজনেস করতে চাচ্ছে না পুষ্পশয্যা প্রপার্টিজ। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। এই কবরস্থানে সমাজের সম্ভ্রান্তরা মৃত্যুর পর ঘুমাবেন। তাদের পাশের কবর একজন পতিতার! এটা জানলে ব্যবসায় দারুণ ধস্ নামবে আগামী তিনদিনে। লাভের ব্যবসায় ক্ষতির মুখে পড়তে চায় কোন মূর্খ? আমি অন্তত সেই দলে নেই।

কথার এক পর্যায়ে রুমে প্রবেশ করে হাসমত ও মখলেস। স্বপ্না স্বাভাবিক। সামান্য হাসে। দু’জনের কেউ কোনো কথা না বলে পাশের চেয়ার টেনে বসে। স্বপ্না মুস্তাফিজের দিকে তাকায়, বিধর্মীর মুখে ধর্মের বাণী! ভণ্ড প্রতারকের হাতে বিদ্যার ব্যবসা। ভোগের খেলায় যে ব্যবসা আপনারা শুরু করেছেন সেই খেলার শিকার হবে পরবর্তী ফেরেস্তারা। সেই দিন আমার দল ভারি হবে। ভোগ ও বিলাসের জন্য স্বীকার-অস্বীকার খেলায় আপনারা বেশ পারদর্শী। রাগে-ক্ষোভে স্বপ্নার ইচ্ছে হয় তিনজনের গায়ে থুথু মারতে।

হাসমত সিগারেটে আগুন ধরায়। দ্বগ্ধ হয় স্বপ্না। অসম্ভব যন্ত্রণায় ছটপট করতে থাকে। বাড়ছে শরীরের তাপমাত্রা। কলিজা পুড়ে বের হচ্ছে ব্রিকসফিল্ডের ধোঁয়া। বাতাসে মিশে যাচ্ছে সেসব পোড়াগন্ধ।

মুখ বাঁকা করে মখলেস, শোনো, সব বয়সে এক রকম বিনোদন ভালো লাগে না। কবরে অন্তত ভালো থাকতে চাই।

স্বপ্না নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ভেতরের আগুন নেভাতে চোখ দিয়ে পানি ছাড়ছে। দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

স্বপ্নার প্রিয় ফুল শাপলা। হাসিমুখে শাপলা হাতে গেটের সামনে অপেক্ষা করছে আজিজ। জন্মদিনে প্রিয় ফুল উপহার পেয়ে নিশ্চয়ই খুশি হবে। বিস্মিত হয়ে বলবে, এই হেমন্তে কোথায় পেলে শাপলা?

স্বপ্না বিস্মিত ভঙ্গিতে সামনে এসে দাঁড়ায়। অব্যক্ত চোখ জোড়া রক্তের মতো। আজিজের মুখ থেকে হাসি উধাও। স্বপ্না কয়েক কদম সামনে হাঁটে। দাঁড়ায়। আপনিও প্রতারকের আরেক পুত্র!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close