Home অনুবাদ জর্জ বাতাই / একগুচ্ছ কবিতা

জর্জ বাতাই / একগুচ্ছ কবিতা

প্রকাশঃ November 7, 2016

জর্জ বাতাই / একগুচ্ছ কবিতা
0
0

অনুবাদ : বিকাশ গণ চৌধুরী

ফরাসি কবি জর্জ বাতাই। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও শিল্প-ইতিহাসবিদ। হেগেল, ফ্রয়েড, মার্কস, মার্সেল মুশ, মার্কুই দ্য সাদ ও নীৎসের ভাবশিষ্য আর ফুকো দেরিদা বদ্রিয়ার, লাঁকা, জুলিয়া ক্রিস্তেভার ভাবগুরু বাতাই কবি হিসেবেও খ্যাতিমান। ইরোটিক বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন অনবদ্য গল্প, উপন্যাস যা বাংলায় অনুবাদ করা বেশ দুরুহ। কারণ বাংলায় এই ধরনের দার্শনিক কিন্তু ইরোটিক লেখালেখির খুব একটা চল নেই। ১৯৬২ সালে লেখা তাঁর জীবনের শেষতম গ্রন্থ L’Impossible [অসম্ভব কিছু]-এর শেষাংশ ওরেস্টিয়া। এর পাঁচটি ভাগের প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ ভাগের অনুবাদ এখানে রইলো। বিখ্যাত গ্রিক নাট্যকার ইস্কিলাসের ট্রিলজি ‘ওরেস্টিয়া’, যার অনুষঙ্গ হিসেবে আমরা পাই আগামেমনন আর ওয়েস্টেসকে। ওয়েস্টেসের নামের সঙ্গে জুড়ে আছে একধরনের পাগলামি আর শুদ্ধিকরণের অন্ধকারময় ইতিহাস। জুড়ে আছে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ আর ন্যায়বিচারের প্রতিতুলনা। এই কবিতা কণিকাতেও তারই বিচ্ছুরণ ঘটেছে বলে ফরাসি কবিতা সমালোচকদের ধারণা।

ওরেস্টিয়া

ওরেস্টিয়া

ঊর্ণজাল

জীবনের সাপুড়িয়া-বীণ

অসংখ্য হত্যাকারী

মাকড়সাদের রাত

অশ্রুর নির্মম খেলা

আমার বুকেবিধেঁ থাকা মৃত্যুর লম্বা তরবারি, হে সূর্য

জিরোও  আমার হাড়ের পাশে

জিরোও  তুমি বজ্র

জিরোও  তুমি জাতসাপ

জিরোও  আমার হৃদয়

ভালোবাসার নদী রক্তে গোলাপি হয়ে যাচ্ছে

বাতাস এলো করে দিচ্ছে আমার হত্যাকারী চুল

***   ***   ***

অদৃষ্ট, হে পান্ডুর দেবী

উপহাস কর বজ্রকে

অদৃশ্য সূর্য

হৃদমাঝারের বিদ্যুৎ-চমক

নিরাভরণ অদৃষ্ট

লম্বা সাদা মোজায় থাকা অদৃষ্ট

রাতপোশাকের ফিতেয় থাকা অদৃষ্ট

 

মতভেদ

 

মেঘের জানালায়

দশ হাজার বাড়ি ভেঙে পড়ল

প্রথমে একশ তারপর একহাজার মারা পড়ল

***   ***   ***

হাঁ-খোলা পেট

ছেঁড়া মুন্ডু

লম্বা তুফানি মেঘের প্রতিফলন

অনন্ত আকাশের প্রতিমা

***   ***   ***

আকাশের অন্ধকার শিখর থেকেও

উঁচুতে

উন্মত্ত খোলা পরিসরের

উচ্চতায়

একটা আলোর রেখা

মৃত্যুর জ্যোতিশ্চক্র

***   ***   ***

আমি রক্তলোলুপ

আমি গোটা পৃথিবীটা খেয়ে ফেলতে চাই

আমি মৎস্যলোলুপ গিলে খেতে চাই সমস্ত পাগলামো

আমি গিলতে চাই সমস্ত কলুষ সমস্ত উদাসীনতা

 

আমাকে

 

আলোর জন্য হৃদয় লোভাতুর

পেট অব্যাহতি দিয়েছে সোহাগকে

অলীক সূর্য অলীক চোখ

মরকের পাইকার

পৃথিবী ঠান্ডা শরীর ভালোবাসে

***   ***   ***

নীহারের অশ্রুকণা

আঁখিপল্লবের অনিশ্চয়তা

মৃত নারীর ওষ্ঠাধর

অমোচনীয় দাঁত

প্রাণের অনুপস্থিতি

মৃত্যুর নগ্নতা

***   ***   ***

ছলনা,উদাসীনতা, দাঁতের কিড়মিড়, বাতুল সুখ, নিশ্চয়তার মধ্যে,

কুয়োর তলদেশ, মৃত্যুর দাঁতের বদলে দাঁত, প্রত্যাখ্যানের স্তুপ থেকে

লাফিয়ে ওঠে চোখ ধাঁধানো জীবনের একটা ছোট্ট টুকরো,

আমি তাকে এড়িয়ে যাই, ওটা আমাকে পীড়াপীড়ি করে;

ঘিঞ্জি হয়ে জুড়ে থাকে  কপালে,

রক্তের সরু একটা ধারা আমার কান্নার সঙ্গে মিশে আমার জঙ্ঘা ভিজিয়ে দেয়,

প্রতারণা আর নির্লজ্জ অর্থলিপ্সা থেকে জন্মানো একটা খুদে,

নিজের সম্পর্কে  আকাশের উঁচু নাগাল মতো উদাসীন,

আর ঘাতকের পবিত্রতা তো আর্তনাদকে চিরে দেওয়া বিস্ফোরণ।

***   ***   ***

আমি আমার ভিতর একটা থিয়েটার খুলেছি

যেখানে একটা ছদ্ম-ঘুম অভিনয় করে

একটা লক্ষ্যহীন ছল

একটা কলঙ্ক যা আমায় অসুস্থ করে

কোন আশা নেই

মৃত্যু

মোমবাতি ফুঁয়ে নিভে গেছে

আমি আমাকে মৃতদের মধ্যে ছুঁড়ে দি

 

রাত্রি আমার নগ্নতা

নক্ষত্ররা আমার দাঁত

আমি আমাকে মৃতদের মধ্যে ছুঁড়ে দি

সাদা রোদের পোশাকে

***   ***   ***

একটা নগণ্য বিধবার মতো

মৃত্যু আমার হৃদয়ে বাস করে

ও ভীরু ও ফুঁপিয়ে কাঁদে

আমার ভয় হয়

আমি বমি করে দিতে পারি

বিধবা আকাশের দিকে চেয়ে হাসে

এক টানে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে পাখিদের

***   ***   ***

আমার মৃত্যুতে

নক্ষত্রদের ঘোড়ার-দাঁত

মৃদু হ্রেষাধ্বনিতে হাসে আমি মৃত্যু

 

উদাস মৃত্যু

স্যাঁতস্যাতে কবর

নুলো সূর্য

মরা-দাঁতের গোরখোদক

আমায় নিশ্চিহ্ন করে

দাঁড়কাকের পাখাওয়ালা দেবদূত

কেঁদে কেঁদে গায়

প্রভুর গৌরব

আমি ছোটসব কৌটোদের শুন্যতা

আর নিখিল বিশ্বে

আমার অনুপস্থিতি

উল্লাসের ভেঁপু

পাগলের মতো বাজছে

আর সূর্যের ষাঁড়ের-চোখ

ফেটে পড়ছে

মৃত্যুর অশনি

ভরিয়ে তুলছে ব্রহ্মান্ড

বিপুল আনন্দে

আঙুলের নখগুলোকে পিছনে টানছে

আমি কল্পনা করি

অনন্ত গভীরতায়

জনমানবহীন এক বিস্তীর্ণতা

আকাশকে যেমন দেখি তার থকে আলাদা

যেখানে কোনো ঝকমকে আলো নেই

কিন্তু আকাশের থেকেও বড়ো

আগুনের সব চাদর

নিশান্তিকার মতো চোখ ঝলসে দিচ্ছে

আবয়বহীন বিমূর্ততায় ফাটলের লম্বা লম্বা দাগ

ভুলে যাওয়া জিনিসের

অসারতার স্তূপ

এখানে বিষয় আমি

ওখানে বিষয়বস্তু বাতিল হয়ে যাওয়া ধারণার ব্রহ্মান্ড

যেখানে আমি  ছুঁড়ে ফেলি জঞ্জাল

বন্ধ্যাসব ইশারা

রাজ্যের খাবি-খাওয়া

আর ভাবনার সব মোরগ-ডাক

অনন্ত দম্ভের কারখানায় তৈরি

হে অস্তিত্বহীনতা

তুমি তো নকল দাঁতে ভরা একটা তোরঙ্গের মতো

আমি  সেই তোরঙ্গর ওপর ঝুঁকি

অনুভব করি

আমার কামনা বমি করার অভিলাষ

হে অবসন্নতা

পরমানন্দ থেকে আমার পতন

ঘুমন্ত আমি যখন

চিৎকার করে উঠি

তুমি যে আছ আর যে হবে

যখন আমি আর থাকব না

জনৈক বধির

রামহাতুড়ির ঘায়ে

আমার মুন্ডু ফাটাবে

***   ***   ***

আলোর ঝলক

আকাশচূড়া

পৃথিবী

আর আমি

***   ***   ***

আমার হৃদয় তোকে থু থু করে ছুঁড়ে ফেলে নক্ষত্র

নিরূপম সন্তাপ

আমি হাসি তবুও নিরুত্তাপ

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close