Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ জার্নি > ছোটগল্প >> সুমী সিকানদার

জার্নি > ছোটগল্প >> সুমী সিকানদার

প্রকাশঃ June 24, 2017

জার্নি > ছোটগল্প >> সুমী সিকানদার
0
0

নির্ধারিত স্থান থেকে পোশাক পালটে গাউন পরে বের হয়ে এলো মিমি। আজ এই সালুনে তার সময় দেয়া আছে, অনেকগুলো কাজ করাবে। ওয়েল ম্যসাজ উইথ আমলা করানোর জন্য ইজি চেয়ারে আরামে বসে চোখ বন্ধ করে রইলো সে। মন ভালো লাগছে না।

মায়াবীকে খবর দেয়া হচ্ছে, এ কয় ঘণ্টা সেই তার দেখভাল করবে।  হাঁটু পর্যন্ত লম্বা চুল মাসে একদিন মায়াবীর মালিকানায় দিয়ে মিমি খুশী থাকে।

প্রথম প্রথম মায়াবী নাম শুনে চমকাতো মিমি।  এত সুন্দর নাম।  এটা কি তোমার আসল নাম?
‘’জ্বী আপা ।‘’ মায়াবী হাসে। ‘আমাদের ওখানে অনেক  বাংলা নাম রাখে।‘
‘তাই তো দেখছি।‘
‘’ঐ যে আপা হেয়ারকাটে আছে কলি, নয়না আবার ফেসিয়ালে  হিয়া, লাবণ্য। অনেক নাম বাংলা আছে আপা। বাপমায়েই রাখসে।‘’

মিমি খুশী হতো ‘বাহ’,  খুব সুন্দর।  যেমন তোমাদের নাম তেমন তোমাদের চেহারা। তাকিয়ে থাকার মতো। এইটুকু শুনে হাসতে হাসতে তারা এ ওর গায়ে হেলে পড়তো । যেন কি মজার কথা বললাম। শান্ত নিষ্পাপ দুঃখ লুকানো আজন্ম চাহনী তাদের।  সবই বুঝি আবার কিছুই বুঝি না।

মিমি নিজের মেয়ের নাম বাংলা রাখতে চেয়ে যেন পাপ করে ফেলেছিল। শাশুড়ির মুখ ভার। কায়সার রাজী হয়নি। ‘’ কি সব বস্তাপচা  নাম। আমার মেয়ে ছবির হিরোইন হবে নাকি। আমার মেয়ের নাম হবে আমার মায়ের সাথে মিলিয়ে।‘’

সেখানে কিন্তু মিমির আপত্তি ছিলোনা।  সে শুধু ডাকার নামটা বাংলা চেয়েছিলো। জটিলতা যেখানে পারিবারিক, আধুনিকতা ততোটাই মিমির একান্ত মানসিক।  মেয়ের নাম চাইতে গিয়ে তাকে এক সময়  নিজের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে পড়তে হয় ।

কুসুম কুসুম আমলা তেল থুপেথুপে মাথায় লাগচ্ছে মায়াবী।  তার সাদা মুখ কেমন ফ্যকাশে। তাতে প্রতিদিনের রক্তেরা যেন মম চিত্তে নাচছে না আজ। তবু তার আঙ্গুল মায়ায় হাঁটে সুনিপুন। মিমি মনকে অন্যদিকে সরানোর চেষ্টায় চোখ বোজে।
শেষ পর্যন্ত শাশুড়ির সাথে মিলানো নাম নিয়ে বড় হচ্ছে মিমির মেয়ে । ডাক নাম সুহি। এই সুহি’কে মিমি মাঝে মাঝে শখ করে ‘’সুহাসিনী’’ বলে।  কায়সার কেমন একটা ব্যঙ্গ করে তাকায়। হায়রে।  সারাজীবনের অবজ্ঞা এক গালের ভেংচিতেই প্রবলভাবে মিমির চোখে কাচের প্রাবল্যে ধরা দেয়।

সেদিন  ইচ্ছে মতো কেটে ফেলা চুল আজ ঠিক করবে।  কায়সারে সাথে রাগ করে অনেকটা চুল এলোমেলো ভাবে কেটে ফেলেছে।  পরে যদিও কায়সার অনেক স্যরি বলেছে।  কিন্তু অন্তরে যেন খোদাই হয়ে গেছে তার কথাগুলো। যতবার ভাবে কান্নায় দুই গাল ভিজে আসে মিমির।  বার বার চট করে গাল মোছে সে, কেউ কি খেয়াল করছে?  দুনিয়াতে আর যাই হোক একটিও মানবিক পুরুষ নেই। একটিও সন্দেহের ঊর্ধ্বে পুরুষ নেই। সবচেয়ে মজার কথা, প্রমাণ না দেয়া পর্যন্ত তারা কেবল সাধু থাকতে চায়।

লম্বা চুলটা শেষ বার দেখেছিলো ঝুমু । তার এপার্টমেন্টেই ফোর্থ ফ্লোরে থাকে সে।  মিমি চুলে ফুল লাগিয়ে গাদোয়ালে সেজে বিয়েতে যাচ্ছিলো।  ঝুমু  মিমিকে দেখে এত খুশী হয়ে গেলো  দৌড়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছে ।

“দোস্ত দারুণ বিজলি মাইরি রে।‘’
ঝুমুর কথাতেই মেঘ কেটে যায়। খিলখিল হাসে। কষ্টটা আলগোছে সরতে থাকে। কোন দুঃখ অনেকক্ষণ সাথে থাকে যতক্ষণ না কেউ তাকে দেখতে পায়। লোকজনের আওয়াজে দু;খবোধের তীব্রতা কিছু গুটিয়ে যায়।

তোমার মন খারাপ কেন মায়াবী। কি হয়েছে?  নিরবতা ভাঙে মায়া।

‘’আপা আমার শশুড়মশাই  আমার শাশুমাকে মেরেছে।  এমন মার মেরেছে।  আমি কেন চাকরি করি তাই। সে শুনেছে পার্লারের মেয়েরা নাকি চান্স পেলেই শুয়ে শুয়ে ইনকাম করে। অর্ধেকের বেশী পয়সাই নাকি আমি শুয়ে শুয়ে পাই।  স্বামী কিচ্ছুটি বললো না গো আপা। বিড়ি ধরাই বাহিরে চলে গেলো।  এলা বেতন নিতে ঠিক সময় মতো গুতোবেনে।‘’

মিমি শান্ত থাকে।  চোখের সামনে মেলা বইটার  কালো লেখাগুলোতে মন দিয়ে চায়, পারে না।  ভুল মানুষকে ভালবাসার পাহাড়কাটা বেদনা জাতিস্মরের মত কুরেকুরে খেতে থাকে তাকে।

আঘাত যে করে সে  নিজেকে  উচ্চমার্গের ভেবে নেয়। অন্যের আঘাত করতে না পারার অদৃশ্য শক্তিটাকে টের পায়না হয়তো।
বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে  ফিরেই সব সরাসরি হয়ে গেলো লাইভ।  বাচ্চাটা্র কানে গেলো কিনা কে জানে।  বুবাই জানে বাবা রেগে গেলে অনেক চিৎকার করে।  জিনিসপত্র ভাঙে এটেনশন সিকনেস আছে।  বাবা রাগ করলেই গিটার নিয়ে বসে বুবাই।  যেন সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না বা শুনতে চাচ্ছে না। জীবন কে এড়িয়ে কি মনের আশ্রয় মেলে? কাঁটাগাছের আবার ফুল ।

বউকে সন্দেহ ছাড়া কায়সার থাকতে পারে না।  সন্দেহগুলোও অদ্ভুত। মিমি কেন এত ফিগার মেইটেইন করে।  এত বাইরে কেন  যেতে হবে।  যায় কেন আপডেট দেয় না।মিমি কেন সিরিয়াল দেখে না।  নতুন কোন আশিক জুটেছে ঠিক।
এই সমস্ত ভাবনা সারাক্ষণ কায়সারের মাথায়।  মিমির ক্লান্তি আসে। সারারাত কেটে গিয়ে অবসন্ন ভোর হয়। ভোর কি রঙ নিয়ে ফুটবে তার  সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। মিমির সন্দেহ হয়, ভোর আসে, নাকি আসে না!

রাত ফুরালেই ফের ঠিকঠাক।  সব ভাণ।  তখন মিমিকে হেসে হেসে কথা বলতে হয়।  যেন রাতে যা  যা হয়েছে  সে সব ভুলে গেছে। এ এক অসহ্য সঙ্গবাস।  সব বিষয়ে ‘না’ শব্দ বলে বলে মিমির ভেতর থেকে কুরেকুরে সবটা আবেগ তুলে নিয়েছে কায়সার।  এখন শুধু দুই ভাগে পড়ে আছে শাঁসহীন নারিকেলের বিভৎস ক্ষতবিক্ষত বহিরাংশ।

মায়াবী এসেছে , হাল্কা করে চুল্গুলো ঘাড় থেকে তুলে ঘাড় মুছে নিলো।  এতটুকু স্পর্শে কেন যেন চোখে জল ভরে এলো  মিমির । যদিও টাকা দিয়ে কেনা এই সেবা তবু অনেক অন্তর থেকে সেবা করে মেয়েটা।  রোদ থেকে এসেছেন আপা , পুরো চুল তো ঘেমে গেছে। আমি শুকিয়ে নিচ্ছি।
নিচু গলায় কথা বলে চলছে  মিমির সাথে মায়াবীর

‘’ পাঁচটা মেয়ে একসাথে কাজ করি। এক বাড়ীতে থাকে একসাথেই ঘরে ফিরি। আমাকে না বিসওয়াস করুক তাদেরকে তো বিসওয়াস করবে। কাওকে তো বিসওয়াস করবে।  ইস্তার কাম আমরা মেয়েরা করি আর,  তারা কেবল নেশা করবে ।  সারাদিন ঘুমাবে আর, টাকা ফুরালেই  ধরিয়া ধরিয়া মাইরবে ।‘’  নিরুপায় কান্নায় তার শরীর ফুলে দুলে উঠছে।মুখ কাপড়ে ঢাকা। চোখের ভাষাকে ঢাকা কঠিন।

মিমির শ্যম্পুকরা চুল ঝিরঝিরে হয়ে গেছে।  তার মন আগের চেয়ে শ্বাস নিচ্ছে বেশী।  মায়াবী তাকে এবার আয়ূর্বেদিক বডি ম্যাসাজ দেবে।  উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো মিমি।
‘’চোখ বন্ধ করেন আপা। শরীর ছেড়ে নরম করেন।‘’
মায়াবী ধীরে ধীরে কাঁধ ম্যাসাজ শুরু করেছে।  তার প্রতিটি আঙ্গুল খুব বাধ্য এবং শিক্ষাপ্রাপ্ত।  কোন কোন অংশে একটু ব্যথা যুক্ত চাপ দিতে হয় আর কোথায় মোলায়েম ভাবে নিতে হয় সে জানে।  আরামে ঘুম চলে আসে মিমির।

‘’আমার শাশুড়ী  চোখে ভালো দেখেনা তবু সংসারে সবার কাজ করে।  নিজের মা’কে  চোখে দেখি নাই,। জন্মের পর পর মরিয়া গেলো। এই শাশুড়ি মা সেই ছোট বয়সে বউ করি ঘরে আনছে ।  খাওয়াইছে পরাইছে।  চুল বান্ধে দিছে গো আপা।  এই মা আমাকো ভগবানে মিলাইছে।‘’

‘’জামাই আরেক মাইয়া নিয়ে ঘুরে আমি খবর পাই।  কিন্তু সে স্বীকার যায় না।  অবশ্য কুনো পুরুষ কুনো আকাম স্বীকার যায় না হারামখোর।  আমিও তো জোয়ান আছি। ম্যালা সময় ইচ্ছা লাগে শরীর তাপ চায়।  তখন তারে বাহানা ধরে।  কিসের বাহানা সব বুঝি গো আপা। তখন মন চায় সত্য সত্য কাউরে নিয়া ভাগি।  শুধু এই বুড়া মায়ের লাগি লুইচ্চা স্বামীরে ছাড়ি নাই। ‘’

মিমির হাতে ভাজ করা পোশাক তুলে দেয় মায়াবী।  তার কাজ আজকের মতো শেষ।

পাঁচ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে ফুরফুরে বেরিয়ে এসেছে মিমি।  আজ সন্ধ্যায় কায়সারের সাথে কিছু কথা বলার কথা।  জট খুলে গেছে ক্রমশ। মায়াবীদের মত চুপ  থাকার অখন্ডতা আর নেই। তার বুবাই আছে।

ভয়ংকর শূন্যের মাঝে আঁকড়ে থাকা ভালবাসাকে সুন্দর ভেবেছিলো।  অবিশ্বাসকে সে অপ্রেম ভাবেনি।  ভেবেছিলো এভাবেই হয়তো সব চেয়ে বড় প্রেমটা তাদের দুজনের কাছে আসবে।  প্রথম চুমুর মতো, প্রথম চেনা অচেনা শরীরের ধীরে ধীরে চেনা বাতাবরনের মত। শরীর  বেশক তৃষ্ণায় কুঁকড়ে আসে।  নীলশাড়ীতে লেপ্টে থাকা নীল পাঞ্জাবীদিনেরা মূহূর্তেই সময়ের  নেগেটিভ হারিয়ে ফেলেছে।  ছবিরা আর স্মৃতিতে ফিরবে না।

মিমি আজ  মন খুলে কথা বলবে।  অদ্ভুত রকমের শান্ত অথচ গুমোট হয়ে আছে সবটুকু বাতাস। কায়সারের সাথে  মুখোমুখি  এটাই শেষ কফির ধোয়া উড়বে হয়তো । তবু অবিশ্বাসের  ঘরে আর থাকতে চায়না।  প্রেমহীনতায়  থাকবে না মিমি ।  বুকের ভতরে কান্নাটা দলা পাকিয়ে শুকিয়ে গেছে। সারাদিনের উন্মুখ কদম একটানা ভিজিয়ে মিমির বদলে  কেবল কাঁদছে আষাঢ। ‘প্রথম কদম ফুল’ নিয়ে কি যেন একটা গান আছে, কিছুতেই মনে পড়ছে না।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close