Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৩]

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৩]

প্রকাশঃ January 7, 2017

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৩]
0
0

বার্টান্ড রাসেল এলিয়ট-ভিভিয়েনের অসফল সম্পর্কের মাঝে দাড়িয়ে থাকা যতিচিহ্ন এক। যে বিরামচিহ্ন থামিয়ে দিয়েছে  স্বাভাবিক গতি। এলিয়টের সঙ্গে ভারসাম্যহীন দাম্পত্য,রাসেলের সাথে  অসম প্রেম, এবং শেষ পর্যন্ত এলিয়টের প্রত্যাখ্যানের ফলেই মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হন। কিছুটা সচ্ছলতার আশায় রাসেলের বাড়িয়ে দেয়া হাত স্পর্শ করেছেন এলিয়ট। বালিতে মুখ গোঁজার উটের মত মরুঝড় থেকে বাঁচতে চেয়েছেন, যে ঝড়ে উড়ে গেছে বিশ্বাস, দাম্পত্যের ভিত। বিয়ের পর রাসেল প্রথম ব্যক্তি যাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন স্ত্রীর সাথে। এর পেছনে যতটা বিশ্বাস, সৌহার্দ্য, সৌজন্যতা ছিল তার মর্যাদা রাখেননি রাসেল। হাভার্ডে যিনি তার শিক্ষক ছিলেন, যাকে শ্রেনীকক্ষে পড়িয়েছেন, পুত্রসম বলে মন্তব্য করেছেন তার স্ত্রীকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করতে সবকিছু করেছেন দার্শনিক বার্টান্ড রাসেল। বিয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই এই আনাড়ি সম্পর্ককে থিতু হতে না দিয়ে ইন্ধন দিয়েছেন স্বামী-স্ত্রীর দূরত্বে। অটোলিন মরেল এই সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করলে বলেছেন,  এ নিয়ে সন্দেহ করার কিছু নেই, তিনি ছাত্রকে এই দুর্বল বিয়ে থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অথচ বাস্তবতা হল তাদের অসহজ সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছেন। পরিচয়ের পর থেকে নিজের প্রতি ছাত্রের স্ত্রীর এমন নির্ভরতা তৈরী করেছেন যে স্পর্শকাতর সব বিষয় অকপটে খুলে বলেছেন তাকে। নিস্পৃহ স্বামীর আচরণে আহত স্ত্রী সব সংকটে ধরনা দিয়েছেন তার কাছে। স্বজন বা বন্ধুদের  নয়, নতুন পরিচিত রাসেলকেই জানিয়েছেন ব্যক্তিগত তথ্য। হানিমুনে গিয়ে তাকেই বলেছেন আত্মহত্যার ইচ্ছের কথা। অসংসারী এলিয়ট আত্মহত্যাপ্রবণ স্ত্রীকে বোঝানোর দায়িত্ব রাসেলের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থেকেছেন। রাসেলকে তার মনে হয়েছে সেরা মনস্তত্ত্ববিদ। সেপ্টেম্বরে রাসেলের বাসায় উঠে থেকেছেন বড়দিন পর্যন্ত। ডিসেম্বরের শেষে আলাদা বাসায় উঠলেও, রাসেলের ছায়া পোক্ত হতে দেয়নি অসুখী সংসারটাকে। নবদম্পতির সংসারে রাসেলের পদচিহ্ন এক গাঢ় প্রশ্ন রেখে গেছে। যে-প্রশ্নের মুখোমুখি হলে বিব্রত হতেন। তবে অটোলিন মরেল, এজরা পাউন্ড, ভিভিয়েনের ভাই মরিসের কাছে স্বীকার করেছেন এই সম্পর্ক তাদের বিয়ের কতটা ক্ষতি করেছে। ইয়েটস যেমন বলেছেন, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষকে যে-কোনো একটা বেছে নিতে হবে, পরিপাটি জীবন অথবা কাজ। এলিয়ট বেছে নিয়েছেন কাজকে। তার হয়ত মনে হয়েছে জার্মান কবি রাইনের মারিয়া রিলকের উক্তি :

অন্য সবকিছু ছাড়তে হবে।  টলস্টয়ের অপ্রীতিকর গৃহস্থালী। র‍্যদার ঘরদোর, আরামহীনতা। সবই একদিকে ইঙ্গিত করছে। তোমাকে বেছে নিতে হবে হয় এটা, নয় ওটা। হয় সুখ, নয় শিল্প।

রিলকের মত এলিয়টও  বেছে নিয়েছেন শিল্পের পথ। বিবাহিত জীবনেও নিঃসঙ্গতাই প্রাপ্য হয়েছে। স্ত্রীর মানসিক সংকটকে আরো প্রকট করার জন্য রাসেলকে কখনো ক্ষমা করেননি। দুজনের প্রতিই ছিল অন্ধ বিশ্বাস। দুজনের দিক থেকেই এটি দ্বৈত আঘাত। বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত স্মৃতি আমৃত্যু জঘন্য ঘটনা বলে মনে রেখেছেন। রাসেলকে মনে হয়েছে শয়তানের প্রতিমূর্তি। অন্যদিকে হার্ভার্ডে পড়ার সময় এলিয়ট সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করলেও কবিতার দিকে ঝোকার পর তার প্রতি আগ্রহ কমে যায় রাসেলের। রাসেল দাবি করেছেন তিনিই ওয়েস্টল্যান্ড লেখার ধারণা দিয়েছেন এলিয়টকে।  এলিয়টের কবিতায়, বিশেষ করে নাটকে সংসারের অশান্তি, স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার কথা এসেছে। ওয়েস্টল্যান্ড কাব্যেও এসেছে অসুখী দম্পত্যের প্রসঙ্গ। ‘মার্ডার ইন দ্যা ক্যাথেড্রাল’ নাটকে রাসেল ও ভিভ দুজনকেই আক্রমণ করেছেন। প্রথম জীবনে রাসেলের লেখার অন্ধ ভক্ত এলিয়ট পরে এ নিয়ে নীরব থেকেছেন। সেই কঠিন সময়ে মানসিকভাবে আতংকে, আত্মিকভাবে অবসাদ, অধিকারচুত্য হওয়ার রোগে ভুগেছেন। দাম্পত্যের অশান্তি তার সৃষ্টিশীলতার জন্য আশির্বাদ হয়ে এসেছে, কবি এও  জানেন ভিভিয়েন তার সঙ্গে খুশী নয় বলেই রাসেল তাদের জীবনে আসতে পেরেছেন। বলেছেন :

এই বিয়েটা ভিভিয়েনক সুখী করেনি। আমার ক্ষেত্রে এই বিয়ে এমন এক মানসিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যার ফলে ওয়েস্টল্যান্ড লেখার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।

১৯৯৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে ভালেরি বলেছেন, ভিভিয়েন আমার স্বামীকে এত ভুগিয়েছেন বলেই ওয়েস্টল্যান্ড লিখতে পেরেছেন। আমরা এই কাব্যের জন্য তার কাছে ঋণী। এলিয়টের পক্ষে এই কাব্য লেখা সম্ভব হত না যদি না ভিভ তাকে ঐ নরকে নিয়ে না যেত।

এই কথার সমার্থক এক চিঠিতে ১৯২৯ সালে ই এম ফস্টারকে এলিয়ট বলেন :

তুমি এই কবিতাটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে গুরুত্ব দিয়েছ। হয়ত তোমার কথাই ঠিক। ওয়েস্টল্যান্ড হয়ত তাই,যুদ্ধ ছাড়াই একটা লড়াই।

এটা বিস্ময়কর যে দ্বিতীয় বিয়ে শান্তি দিলেও শেষ করে দিয়েছে সৃষ্টিশীলতাকে। ভিভিয়েনের সাথে কাটানো দিনগুলো – যাকে বারবার দুঃস্বপ্ন বলেছেন সেই দুর্বিষহ দিনেই লেখা হয়েছে সেরা সব সাহিত্যকর্ম। এ সময়ের লেখা ‘উইসপারস অব ইমমরালিটি’, ‘ওয়াইফস অব মেন’, ‘সনস অব গড’-এ নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিশ্বাসহীনতার প্রভাব পড়েছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও রাসেলের সাথে বজায় রেখেছেন সামাজিকতা। এলিয়টের মৌনতায় উৎসাহিত হয়েছেন রাসেল। ভিভিয়েনের সাথে বন্ধুত্বকে যৌনতার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছেন। লেখার জন্য যে উদ্দীপনা চাই, নিজের সৃষ্টিশীলতাকে সক্রিয় রাখতে যে প্রেরণা চাই, তার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন ভিভিয়েন। স্ত্রীর দেখাশোনা, দৈনন্দিন গৃহস্থালীর দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন এলিয়ট। তার অসুস্থ স্ত্রীকে হাওয়া বদলের জন্য লন্ডনের বাইরে নিয়ে গেছেন রাসেল। শিক্ষকতার কাজে লন্ডনের বাইরে থাকার সময়ও স্ত্রীর খেয়াল রাখার জন্য রাসেলের শরণাপন্ন হয়েছেন। চেয়েছেন এসময় স্ত্রীর পাশে এমন কেউ থাকুক যে তাকে বুঝতে পারে। ভিভিয়েনের দেখাশোনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ১৯১৫ সালে হানিমুন থেকে ফেরার পর আবারো আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে  উঠলে রাসেলকেই দেয়া হয় বোঝানোর দায়িত্ব। ১৯১৬ সালের ৭ থেকে ১৬ জানুয়ারি নিজের খরচে ভিভিয়েনকে তুরস্কে বেড়াতে নিয়ে যান রাসেল। কিছুটা পরিবর্তনের জন্য। এই উপকারের জন্য রাসেলকে ধন্যবাদ জানান। প্রশ্ন ওঠে রাসেলকে নিয়ে বিরক্তি ও বিদ্বেষ সত্ত্বেও কেন স্ত্রীর অসুস্থতায় তার সহায়তা চেয়েছেন? ভিভিয়েনের কাছ থেকে দায়মুক্তি? পিটার একরয়েডের লেখা এলিয়টের জীবনী এ লাইফের আলোচনা করতে গিয়ে ‘দি ট্রুথ অব রাসেল এন্ড ভিভিয়েন‌‌’ প্রবন্ধে এমন প্রশ্নই তুলেছেন এন্ড্রু ব্রিংক। ১৯২৫ সালের ২১শে এপ্রিল এলিয়ট রাসেলকে লিখেছেন, তাদের বিয়ের দুর্ভাগ্য নিয়ে রাসেলের ধারণাই ঠিক। রাসেলের সাথে আবারো দেখা হওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়ে তার প্রশংসা করে বলেন আপনি একজন সেরা মনোবিজ্ঞানী। কদিন পর ৭ মে লেখা চিঠিতে প্রকারান্তরে আবারো নিজেদের মাঝে রাসেলকে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন :

ভিভিয়েন বলে, আপনি তার কাছে দেবদূতের মত। আমি নিশ্চিত আপনি ওর জন্য সাধ্যমত সবকিছু করেছেন। খুব ভালোভাবে ওর খেয়াল রেখেছেন। এমনকি আমার চেয়েও ভালোভাবে। মাঝেমাঝে অবাক হই আপনি কিভাবে এতটা পারেন। ওর জীবনের জন্য আপনার কাছে আমরা ঋণী।

এভাবে ভিভিয়েনের জীবন থেকে সরে যাওয়ার পরও বারবার নিজেদের মাঝে আসতে দিয়েছেন রাসেলকে। যে পাউন্ড তার জীবনের পরম মিত্র, তার বিপরীত শিবিরের রাসেলের ওপর  বাড়িয়েছেন নির্ভরতা।  রাসেল হয়ে উঠেছেন তার অর্থনৈতিক ও মানসিক নির্ভরতার প্রতীক। তার চোখে রাসেল একজন সেরা দার্শনিক, মনস্তত্ত্ববিদ। এর মাঝে আমেরিকা থেকে পিতার মৃত্যুর খবর আসে। ছোট ছেলের জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে বলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আক্ষেপ করেছেন বাবা। দেখে যেতে পারেননি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ডে কবিতা বিষয়ক বক্তৃতা দিতে আবারো আমেরিকায় যান। সেখান থেকে ১৯৩৩ সালে ডিভোর্স চেয়ে চিঠি পাঠান। এরই মাঝে ১৯২৭ সালে সদস্য হয়েছেন এংলিকান চার্চের। স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হবেন বলে মনস্থির করে ফেলেছেন। চার্চের যাজকেরাও নিরুৎসাহিত করেন বিবাহিত জীবনে। তবে ডিভোর্সে ভিভের সম্মতি পাওয়া যায় না। বিয়ে বাঁচাতে আরেকটা সুযোগ চান। টমের কাছে নিজেকে প্রমাণের জন্য। আরেকটি হানিমুনের প্রত্যাশায় থাকা ভিভের কাছে এ এক অপ্রত্যাশিত আঘাত। ভিভের ধারনা আর্থিক অনটন ও পরিবারের সাথে দূরত্ব কমে গেলে টম আবারো তার কাছে ফিরে আসবে। কোনো আলাপ বোঝাপোড়া ছাড়া টম তাকে ছেড়ে দিতে চায় এটা মানতে প্রস্তুত নন। ১৯৩২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যেদিন টম আমেরিকার জন্য রওয়ানা দেন সেদিনও তার ব্যবহার ছিল স্বাভাবিক, একবারের জন্যও মনে হয়নি আমেরিকা গিয়েই পাঠাবেন ডিভোর্সের চিঠি। একবছর পর ১৯৩৩ সালে এলিয়ট লন্ডনে ফিরলেও ফেরেননি ৬৮, ক্লিয়ারেন্স গেট গার্ডেনের বাসায়। স্ত্রীর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ান। বন্ধুদের বলেন, তার কোনো তথ্য যেন না দেয়া হয় ভিভিয়েনকে। সতর্ক থাকেন তার ঠিকানা ভিভিয়েন যেন না পায়। টমের খোঁজে হন্যে হয়ে সম্ভাব্য সব জায়গায় ধরনা দেন ভিভিয়েন। কারো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এলিয়টের বন্ধুরাও তাকে এড়িয়ে চলছেন। যে এজরা পাউন্ডের পরামর্শে এই বিয়ে, যিনি ভিভকে বুঝিয়েছেন যে তরুণ এলিয়টের পাশে থাকা মানে এক প্রকৃত কাব্যপ্রতিভাকে উৎসাহিত করা, কবিতাকে রক্ষা করা। এলিয়টকে যিনি বুঝিয়েছেন ভিভের মত সাহিত্যপ্রেমী মেয়েকে হাতছাড়া না করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ, সেই পাউন্ডও এই বিয়ে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। বিরক্ত হয়েছেন এলিয়টের সংসারের অশান্তিতে । বন্ধুর সংসার জোড়া লাগাতে চেষ্টা করেননি ভার্জিনিয়া উলফ বা অন্য কোনো লেখক বন্ধু। লন্ডনের সাহিত্য সমাজেও তখন পরিত্যাক্ত  ভিভ।  অসুস্থ নারীর সাথে অসনীয় সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর জন্য সহানুভূতি কুড়িয়েছেন টম।  স্ত্রীর যত ত্রুটি – অসুস্থতা, পাগলামী; প্রচার পেয়েছে , পেয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close