Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৪]

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৪]

প্রকাশঃ January 8, 2017

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৪]
0
0

এলিয়ট তখন ফেবার এন্ড ফেবার প্রকাশনা সংস্থার পরিচালক। অফিসের একটি ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা। এখন তিনি রীতিমত বিখ্যাত। ভিভিয়েন যা মনেপ্রাণে চেয়েছেন এলিয়ট এখন তাই। কিন্তু বিখ্যাত টমের ধারে কাছে যাওয়ারও উপায় নেই। কারো কাছে কোনো খোঁজ নেই। এলিয়ট যেন উধাও হয়ে গেছেন এই শহর থেকে, ভিভের জীবন থেকে। তার খোঁজে এখানে সেখানে ছুটে বেড়ান। মন বলে এলিয়ট এ শহরেই আছেন। আশেপাশেই। এতদিনের চেনা মুখগেুলো বদলে গেছে, সহযোগিতা করছে না কেউ। বরং বিভ্রান্ত করছে। স্বামীর খোজ পেতে মরিয়া ভিভ বারবার ছুটে আসেন ২৪, রাসেল স্কয়ারের ফেবারের অফিসে। জীবনের শেষ চল্লিশ বছর লন্ডনের খ্যাতিমান এই প্রকাশনা সংস্থায় পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন এলিয়ট।  স্বামীর অফিসে এসেও তার  দেখা  মেলে না।  ভিভিয়েন আসা মাত্র  খবর পৌছে  যায় এলিয়টের  কাছে। অভ্যর্থনা কক্ষে অপেক্ষমান মিসেস এলিয়টকে বলা হয় এলিয়ট অফিসে নেই। স্বামীর অপেক্ষায় বসে থাকেন ঘণ্টর পর ঘণ্টা। স্ত্রীর আসার খবরে পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়েন কবি। বহুদিন চলে এই লুকোচুরি খেলা। কবির সেক্রেটারির কাছে জানতে চান অফিসের ঠিকানায় পাঠানো চিঠিগুলো এলিয়ট পেয়েছেন  কীনা। সেক্রেটারি জানান, স্ত্রীর সবগুলো চিঠি পৌঁছে দেয়া হয়েছে তাকে। দিনের পর দিন ফেবার অফিসে বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত ভিভের ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায় একদিন, চিৎকার করে বলে ওঠেন : এটা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এভাবে  কতদিন, কতক্ষন বসে থাকা যায়? আমি টি এস এলিয়টের স্ত্রী!

স্ত্রীর সাথে  লুকোচুরি খেলায় সফল স্বামী ও তার বন্ধুদের অসহযোগিতায় কোথাও তাকে খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৩৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর খবরের কাগজে ব্যক্তিগত কলমে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। বিজ্ঞাপনে স্বামীকে ৬৮, ক্লারেন্স গেট গার্ডেনের বাড়িতে ফিরে আসার আহ্বান জানান, যেটা তিনি ছেড়ে গেছেন দু’বছর আগে।

প্রিয় এলিয়ট, ফিরে এসো। পুরোনো বাড়িতে। পুরোনো ঠিকানায়। আমি এখনো অপেক্ষায় আছি।

তবুও কাজ হয় না। ভিভ জানেন না এই বিজ্ঞাপন কখনো ছাপাই হয়নি। এলিয়ট তার হাত থেকে নিষ্কৃতি চান। আর দেখতে চান না স্ত্রীর মুখ। অবসাদ হতাশায় ডুবে থাকা ভিভ বুঝতে পারেন টমই তার প্রকৃত প্রেম।  মনে হয় এই ব্যস্ত লেখকজীবনে টমের পাশে থাকা খুব প্রয়োজন। এলিয়টের কাছে প্রস্তাব পাঠান নিজের ফ্লাটের দুটো রুম ছেড়ে দেবেন নির্বিঘ্নে লেখালেখির জন্য। কিন্তু ততদিনে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন টম।

এ সময় চেষ্টা করেন নিজের মত থাকতে। একটু পড়াশোনা, পিয়ানো বাজানো, টাইপিং নিয়ে মনযোগী হন। ভর্তি হন রয়েল আটর্স একাডেমিতে, যে-একাডেমির সদস্য তার বাবা। ডেইজি মিলার ছদ্মনামে কিছুটা আড়ালে থাকার চেষ্টা করেন। সদস্য হওয়ার কথা ভাবেন ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফেসিস্ট একডেমির। এভাবে কি ভোলা যায় ১৭ বছরের সঙ্গীকে? হিস্টিরিয়া আক্রান্ত হয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। টম তখন আরো নিস্পৃহ। ভিভের কোনো খবরে কিছু আসে যায় না আর। একদিন খবর পান সানডে টাইমসের বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন টম। ১৯৩৫ সালের ১৮ নভেম্বর স্বামীর লেখা ৩টি বই, পোষা কুকুর পলিকে নিয়ে হাজির হন  সেখানে। দীর্ঘদিন পর স্বামীকে দেখে বলেন ওহ টম! টমকে দেখে উচ্ছাসিত হয়ে ওঠে কুকুর পলি। কিন্তু তার দিকে তাকানোর সময় নেই টমের। ভিভের হাত নিজের হাতে নিয়ে, জানতে চান, কেমন আছো? এরপর বক্তৃতা শুরু হয়। পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে মনযোগ দিয়ে স্বামীর বক্তৃতা শোনেন। তাকিয়ে থাকেন এলিয়টের মুখের দিকে। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে।  মনে হয় ক’বছরে কিছুটা বুড়িয়ে গেছে টম। এই টম এখন লন্ডনের বিখ্যাত কবি। রীতিমত সেলিব্রেটি। হাজারো স্রোতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে বক্তৃতা। গর্বে ভরে ওঠে বুক। এলিয়টকে নিয়ে এমন দিনের স্বপ্নই তো দেখেছেন। অথচ এই জীবনের কোথাও তার প্রবেশাধিকার নেই। কথা শেষ হতেই সামনে গিয়ে দাঁড়ান। মুখোমুখি হতেই প্রশ্ন- তুমি কি আমার জীবন আর ফিরে আসতে পার না টম? নিজের দুটো বইয়ে স্বাক্ষর করে স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলেন, এখন এসব নিয়ে কথা বলার সময় নেই। বলেই চলে যান। বিষন্ন চোখে ভিভ দেখেন টম চলে যাচ্ছে, তার জীবন থেকে দূরে, আরো দূরে, চিরদিনের জন্য। বেঁচে থাকতে এটাই শেষ দেখা।

টমের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন ভিভ। বাস্তবতাকে মেনে ব্যস্ত থাকার চেষ্টেও করেন। কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্য। এভাবেই কেটে যায় বছর তিনেক। ১৯৩৮ সালের এক ভোরে লন্ডনের রাস্তায় ভিভকে একা দেখতে পায় পুলিশ। বিপর্যস্ত, উদ্দেশ্যহীন। এর ওর কাছে জানতে চাইছেন টমের ঠিকানা। ভাই মরিস এলিয়টকে বিষয়টা জানালে এলিয়ট তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। জীবনের শেষ নটি বছর সেখানেই কাটে। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন, একা। লন্ডনের সাহিত্য সমাজ, থিয়েটার, নাচ, সবকিছুর বাইরে এক বন্দী-জীবন। এর আগেও ১৯৩৫ সালের জুন মাসে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তবে ভিভের সাথে কথা বলার পর তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানান চিকিৎসকরা। তাদের মনে হয় হাসপাতালে ভর্তির মতো অবস্থায় পৌঁছেনি রোগী। কিন্তু ১৯৩৮ সাল ততটা সহায় ছিল না। সামরিক কর্মকর্তা ভাই ও কবি-স্বামীর যৌথ সিদ্ধান্তে তাকে ভর্তি করা হয় ফিন্সবারি পার্কের নর্থহামবার ল্যান্ড হাউজে। যাদের সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছেন, জীবনের সবচে বড় দুঃসময়ে সেই স্বজনরাই পাঠায় নির্বাসনে। ১৯২৭ সালে মারা গেছেন বাবা চার্লস হেইগ উড। বৃদ্ধা মা রোজ ইস্টার রবিনসন নন, একমাত্র ভাই মরিস তার অভিভাবক। জীবনের শেষ কটি বছর কাটে এই মানসিক হাসপাতালে। এলিয়ট না হয় ভিভের হাত থেকে নিস্তার পেতে এমন পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ভাই হয়েও মরিস বুঝতে পারেননি বোনের মনের স্থিতি। স্বামী পরিত্যাক্তা, রুগ্ন, মানসিকভাবে অসুস্থ বোনের অভিভাবকত্বে ক্লান্ত মরিসও হয়ত দায়িত্ব থেকে নিস্কৃতি চেয়েছেন। যদিও পরে এর জন্য আক্ষেপ করেছেন। শেষবার হাসপাতালে দেখতে গিয়ে বোনের মুখোমুখি হয়ে চমকে ওঠেন। অনুতাপ, অপরাধবোধে আক্রান্ত মরিসের মনে হয়, আমি একি করেছি! বলেছেন, এ কোথায় রেখেছি আমার বোনকে! আফসোস করেছেন ভিভকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর জন্য। স্বীকার করেন, আমি যা করেছি সব টমের পরামর্শে করেছি। ভিভকে হাসপাতালে পাঠানো নিয়ে এলিয়ট ও মরিস পরস্পরকে দোষারোপ করেছেন। বিস্ময়ে বিহ্বল মরিস সেবার বোনকে দেখে এসে দাবি করেন- ‘ভিভিয়েন আমার মতই সুস্থ, স্বাভাবিক একজন মানুষ।’

মরিস কখনো বিশ্বাস করেননি তার বোন পাগল। যেমনটি বিশ্বাস করেননি ভিভের জীবনীকার কোরেল সেমুয়ের জনসন। ভিভকে মাসসিক হাসপাতালে পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দীর্ঘ তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে ‘পেইন্টেড শেডো-এ লাইফ অব ভিভিয়েন এলিয়ট’ গ্রন্থে দাবি করেছেন ভিভ মোটেও পাগল ছিল না। তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোরও প্রয়োজন ছিল না। পারিবারিক সাহচর্য, স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত করে অযথাই তাকে বাধ্য করা হয়েছে শেষ জীবনটা মানসিক হাসপাতালে কাটাতে। অনেকটা বন্দীর মতো। সেই একলা বছরগুলোতে নি:সঙ্গতা নেভাতে লেখালেখি করেছেন। লিখেছেন ডায়েরি, গল্প, কবিতা আত্মকথা; ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রসঙ্গ। স্ত্রীর কাব্যশক্তি, লেখকসত্তা নিয়ে মায়ের কাছে প্রশংসা করেছেন এলিয়ট। বলেছেন, ‘ভিভ একজন সত্যিকারের কবি। তবে অন্য মেয়েদের মত নারীবাদী নয়।’

এলিয়ট সম্পাদিত ক্রাইটেরিয়নে ছাপা হয়েছে ভিভিয়েন এলিয়টের গল্প। পত্রিকার নামটিও ভিভের  দেয়া।  স্ত্রীর কাব্যবোধের ওপর আস্থার কারণেই ওয়েস্টল্যান্ড লেখা ও সম্পাদনার সময় বারবার তার পরামর্শ নিয়েছেন। ক্রাইটেরিয়ন শুরু করার পর আলাদা অফিস না থাকায় ঘরেই করেন পত্রিকার কাজ। এই পত্রিকা প্রকাশে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন ভিভিয়েন। সামাল দিয়েছেন সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ। স্ত্রীকে কবি উৎসর্গ করেছেন অ্যাশ ওয়েডনেসডে কবিতা। এলিয়টের জীবনে আসা নারীদের নিয়ে লেখা ‌‘ওমেন কামস এন্ড গো’ প্রবন্ধে লুইস মিনাল্ড এলিয়টের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বলেছেন :

এলিয়টের যৌনজীবন অন্যদের চেয়ে আলাদা। এদিক থেকে তিনি নি:সঙ্গ, স্বতন্ত্র। ভিভিয়েনকে সত্যিই ভালোবাসতেন। স্ত্রীর লেখা পছন্দ করতেন, নিজের লেখায় তার পরামর্শ নিতেন।  স্ত্রীর সাহিত্যিক প্রতিভা নিয়ে গর্বিত এলিয়ট কখনো বন্ধুদের কাছে বা নিজের পরিবারের কাছে প্রকাশ্যে স্ত্রীর  সমালোচনা করেননি। তবে নিজেদের মানসিক ও শারিরীক অসুস্থতা, অর্থনৈতিক সংকট ও অবসাদ নিয়ে অভিযোগ ছিল।

জীবনের নানা প্রসঙ্গের স্মৃতিচারণে ভিভের ডায়েরিতে তার কাব্যবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ডায়রিতে ভিভ লিখেছেন :

তোমরা যারা বহুবছর পর আমার এই লেখা পড়ছ, তারা এখানে খুঁজে পাবে আমাদের সম্পর্কের আসল সত্য।

ভার্জিনিয়া উলফের মত তারও বিশ্বাস তিনিই কবির জীবনের প্রধান নারী, যে তার জীবন ও সাহিত্যকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। এলিয়টের লেখায় বারবার যার প্রসঙ্গ এসেছে। ভিভ জানতেন এলিয়টের সাথে তার বিচ্ছেদের আসল কারণ, তার জীবনের রহস্য; যা হিস্টিরিয়া বাড়িয়ে তাকে ড্রাগে আসক্ত করে তোলে- দাবী কোরেল স্যামুয়েলের। ভিভ জানতেন তাকে নিয়ে খুশী নয় টম। টমের বিরুদ্ধেও তার ক্ষোভ ছিল। জন মিডলটন মারেকে বলেছেন, তার রোমান্টিক স্বামী হয় পাগল, নয়ত সূক্ষ্ণভাবে নীতিহীন এবং ভয়ঙ্কর।

১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি সকালে মরিসের ফোন আসে। গতরাতে মারা গেছেন ভিভিয়েন। ৫৮ বছর বয়সে। হার্ট অ্যাটাক। কারো কারো মতে অতিরিক্ত ওষুধ সেবনই মৃত্যুর কারণ ছিল। খবরটা শুনে চমকে ওঠেন কবি। ওহ মাই গড! চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে জল। দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বন্ধু জন হেওয়ার্ড ও অন্যরা অবাক হন এমন প্রতিক্রিয়ায়। মানসিক হাসপাতালে নয় বছর স্ত্রীকে একবারের জন্য দেখতে না গেলেও স্ত্রীর অন্তোষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেন কবি। মরিস ও ফেবারের কয়েকজন প্রতিনিধিসহ মরদেহের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে পিনারের সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছান এলিয়ট। ভিভ দেখে যেতে পারলেন না বেঁচে থাকতে যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন, মৃত্যুর পর সেই এসেছেন শেষবিদায় জানাতে। পিনারে মায়ের কবরের কাছে সমাহিত করা হয় ভিভকে। যদিও তার ইচ্ছা ছিল বাবার কবরের কাছে থাকার। সমাধি ফলকে লেখা হয় উইথ লাভিং মেমোরিজ অব ভিভিয়েন হেইগ এলিয়ট : মৃত্যু ২৯ জানুয়ারি, ১৯৪৭। সমাধি ফলকে লেখা হয়েছে মৃত্যুর ভুল তারিখ। ভিভ মারা গেছেন ২২ জানুয়ারি। মরিস সমাধি ফলক তৈরি করালেও ভুল সংশোধনের চেষ্টা করেননি। ভুল জীবনের বোঝা বইতে বইতে ক্লান্ত ভিভ মৃত্যুর পরও সমাহিত হয়েছেন ভুল তারিখে। সবার জীবন থেকে পরিত্যাক্ত এই নারী যেন আকাশের এক খসে পড়া তারা, সবার অজান্তে হারিয়ে গেছেন অন্ধকারে। ‌

একসময় যাকে ঝোকের বশে বিয়ে করেছেন, বছরের পর বছর যাকে নিজের কাছে আসতে দেননি,  যার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন মাসের পর মাস, মানসিক বিপন্নতায় পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে পাঠিয়েছেন মানসিক হাসপাতালে;  হাজারো আকুতি সত্ত্বেও যাকে একবারও দেখতে যাননি; সেই স্ত্রীর মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েন টি. এস. এলিয়ট। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে নোবেল ভাষণে এলিয়ট বলেছেন শব্দ নিয়েই তার কাজ। কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছু করতে চাননি জীবনে। তারুণ্যে এই শব্দের কারিগরের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভিভি, সঙ্গী হয়েছেন কবি হওয়ার স্বপ্ন পুরণের। লন্ডনে টিকিয়ে রাখার জন্য সম্ভব সবকিছু করেছেন। স্কুলে খণ্ডকালীন চাকরি ও পত্রিকায় রিভিউ লিখে সামান্য আয়ে বেঁচে থাকার দিনগুলোতে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। লয়েল্ড ব্যাংকের চাকরিটাও পাওয়া শশুরের সুপারিশে। আজ সব আছে। খ্যাতি, অর্থ। শুধু ভিভ নেই। স্ত্রী বেঁচে থাকতে তার শূন্যতা এভাবে অনুভব করেননি।  অথচ তার না-থাকাটা বড় বেশি বাজে এখন। বিষণ্নতা ভর করে মনে। এতদিন পর মনে হয় ভিভের সাথে বেঁচে থাকাটা যেমন মুশকিল ছিল তেমনি তাকে ছাড়া বাঁচাও অর্থহীন। এতদিন ভিভের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর অপরাধবোধ তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এখন মনে হয় সবকিছুর পরও ভিভই ছিল জীবনের আনন্দ, স্বস্তি। জন হেওয়ার্ডসহ বন্ধুদের কাছে স্মৃতিচারণ করেন যৌথজীবনের। বলেন, পরস্পরকে কতটা ভালোবাসতেন। এই পরিস্থিতি এক অর্থে যন্ত্রণাই বাড়িয়ে তোলে। জীবনে এখন অনেক সম্মান, স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতাও একঅর্থে যন্ত্রণার। হয়ত এটা স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুরতায় বিবেকের দংশন। উপলব্ধি করেন, মানসিক হাসপাতালে বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য হওয়া ভিভিয়েনের অসহায়ত্ব, তার মানসিক সংকটের পেছনে নিজের ভূমিকা।  এজরা পাউন্ডকে লেখেন :

আমি এমন অনেকগুলো বড় ধরনের ভুল করেছি, যা তার এই বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থা তৈরি করেছে। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে ভিভিয়েন আমাকে এখানে রেখে দিয়েছে। দেশে ফিরে যেতে দেয়নি। সেখানে গেলে অধ্যাপনাকেই বেছে নিতাম। হয়ত আর একটি  কবিতার লাইনও লেখা হত না। এই পরিণতি থেকে সরিয়ে আমার জীবনের ভিন্ন ভবিষ্যৎ তৈরির পেছনে ভূমিকা রেখেছে ভিভিয়েন।

সারাজীবন কবির আকাশে উড়েছে এই বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি। তবে প্রকাশ্যে ভিভিয়েন সম্পর্কে কখনো অনুতাপ করেননি। ভিভিয়েনের মৃত্যুর চার দশক পর ১৯৮৪ সালে এই বিয়ে ও বিয়োগাত্মক সম্পর্ক নিয়ে  মাইকেল হেস্টিংসের লেখা নাটক টম এন্ড ভিভের মঞ্চায়নের পর আলোচনায় আসেন তারা। নাটকের তথ্য-উপাত্তের জন্য মাইকেল ভিভের ভাই মরিসের সাথে যোগাযোগ করেছেন। মরিস তাকে জানিয়েছে তার বোনের সাথে এলিয়টের সম্পর্কের সত্যটা। দশ বছর পরে এই নাটক নিয়ে টম ও ভিভ নামে চলচ্চিত্র তৈরি হয়। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখেন নাট্যকার মাইকেল হেস্টিংস। টম ও ভিভ নাটক ও ছবিতে তাদের বিয়ে, অসম দাম্পত্য, এলিয়টের সাহিত্যক জীবন, ভিভের পাগলামী, তার মৃত্যু ও তাদের সম্পর্কের নানা সমীকরণ তুলে ধরা হয়েছে।  ছবিতে এলিয়ট সম্পর্কে ৫টি অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমত, এলিয়ট ওয়েস্টল্যান্ড এ ভিভিয়েনের অবদান অস্বীকার করে নিজেই সব কৃতিত্ব নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, স্ত্রীর গভীর ভালবাসার সাথে প্রতারণা করেছেন এলিয়ট। তৃতীয় অভিযোগ হল; এলিয়ট  ছিলেন নিষ্ঠুর, শীতল, আত্মকেন্দ্রিক। ভিভিয়েনের বাবার সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে হাতিয়ে নিয়েছেন স্ত্রীর সম্পত্তি । মানসিকভাবে সুস্থ থাকার পরও  ভিভকে হাসপাতালে পাঠাতে প্ররোচণা দিয়েছেন মরিসকে। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর  মুখ দেখেননি। ছবিতে ভিভিয়েনকে দেখানো হয়েছে মেধাবী, নিজে সৃষ্টিশীল হয়েও যে স্বামীর লেখালেখির পরিচর্যা করেছে। এলিয়ট ধীরে ধীরে তার প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন। ১৯৩০ সালে অটোলিন মরেলকে জানান, ভিভিয়েনকে আর দেখতে চান না। ভিভ এমন এক নারী, যে নৈতিকভাবে অপ্রীতিকর, শারীরিকভাবেও বিতৃষ্ণ।

রাসেলের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও অনেকবছর থেকেছেন এক ছাদের নীচে। এলিয়টের চিঠিপত্র এবং বন্ধুদের মন্তব্য অনুযায়ী বেশ আন্তরিক, স্বভাবিক ছিল সম্পর্ক। স্ত্রীর অসুস্থতা ছাড়া অন্য কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনেনি খুব কাছের মানুষের কাছেও। প্রশ্ন ওঠে এই অপ্রীতিকর, বিতৃষ্ণ নারীর সাথে ১৭ বছর  কিভাবে সংসার করলেন কবি? নাকি নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছেন স্ত্রীর প্রতি বিদ্বেষ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ভিভের জীবনীকার স্যামুয়ের জোনস ছুটে গেছেন অক্সফোর্ডের বোদলিয়ার লাইব্রেরিতে। সেখানে রয়েছে ভিভের ডায়েরি, চিঠিপত্র, নোটবুক, আত্মকথা। সেখানে ভিভিয়েন লিখে গেছেন সংসার, বন্ধু, বইপত্র, জীবনের অবসাদ-আনন্দের নানা খুটিনাটি।  লেখা পড়ে বোঝা যায় ভিভের ভাবনার সবটুকু জুড়েই ছিলেন এলিয়ট। জানা যায়, এলিয়টের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তার সাথে যোগাযোগের জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছেন, কতটা তীব্রভাবে ভালবাসেন স্বামীকে। বইমেলার উদ্বোধনীতে টমকে শেষবারের মত দেখার স্মৃতিচারণও করেছেন ডায়েরিতে। টমকে লেখা চিঠিতে প্রকাশ পেয়েছে তাকে দেখার তীব্র ইচ্ছা, তার কাছে ফেরার প্রবল আকুতি। স্বামীর সাথে যোগাযোগে ব্যর্থ, ক্লান্ত ভিভ ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘টমকে হারানোর নিষ্ঠুর যন্ত্রণায় প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি।’

ভিভের অসহায়ত্ব দেখে এক বান্ধবী টমের নিন্দা করলে তাকে সতর্ক করে বলেন, স্বামীকে নিয়ে কোনো সমালোচনা শুনতে চান না।  সে যত কাছের বান্ধবীই হোক না কেন।

বোদলিয়ান লাইব্রেরিতে দেয়ার জন্য ভিভিয়েন যেসব লেখা ভাইকে দিয়ে গেছেন তার অধিকাংশই জমা পড়েনি। মরিসের গ্যারেজে রহস্যজনক আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অধিকাংশ লেখা। এলিয়টকে লেখা চিঠিগুলোও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক চিঠি এলিয়ট ফেবার অফিসে বসে নিজের হাতে পুড়িয়েছেন। অবশিষ্ট কিছু গায়েব করেছেন দ্বিতীয় স্ত্রী ভালেরি। যে-কটা চিঠি আছে সেগুলো্ তাদের সম্পর্ককে খুব স্পষ্ট করে  না। তবুও বোদলিয়ান লাইব্রেরিতে জমা-পড়া চিঠি, ডায়েরি, কবিতা আলো ফেলে আড়ালে রাখা সত্যের। ভিভের জীবনী লিখতে গিয়ে এলিয়ট-ভিভিয়েন সম্পর্কের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে নিয়ে সবার মত ভিভকে দোষারোপ না করে আসল সত্যকে জানতে, এসব নথিপত্র নিয়ে দিনের পর দিন পরে থেকেছেন স্যামুয়ের। ভিভিয়েনকে নিয়ে লেখা জীবনী এ পেইন্টেড শোডো-তে স্যামুয়ের দাবী করেছেন, সমকামী ছিলেন এলিয়ট, প্রকাশিত জীবনের বাইরে যাপন করেছেন গোপন জীবন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই বিয়ে করেছেন ভিভকে। বিয়ের পরও ভয়ে ছিলেন যে ভিভ হয়ত তার যৌনজীবনের সত্য ফাঁস করে দেবেন আর কেলেংকারীর মুখোমুখি হবেন তিনি। তবে স্বামীর অক্ষমতা মেনে নিয়েছেন ভিভ। ভিভের জীবনীকার এও দাবী করেছেন যে অন্য পুরুষের  সাথে মেশার জন্যই স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছেন এলিয়ট। এরপর বিভিন্ন সময় যাদের সঙ্গে থেকেছেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন স্বঘোষিত সমকামী। ভালেরিকে বিয়ে করার আগে জন হেওয়ার্ড নামের বন্ধুর সাথে অনেক বছর এক ফ্লাটে থেকেছেন  যে কিনা সবার কাছে নিজেকে সমকামী হিসেবে পরিচয় দিত। ফরাসী বন্ধু জেন ভারডানেলকে এলিয়টের প্রথম পুরুষ প্রেমিক বলে দাবী করেছেন স্যামুয়ের। তার অভিযোগ, এমিলি হেল ও মেরি ট্রাভেলিয়ানকে এলিয়ট ব্যবহার করেছেন। বার্ধক্যে বিয়ের উছিলায় একজন ভক্ত নার্স খুঁজে নিয়েছেন যে আমৃত্যু তার সেবা করেছেন। পেইন্টেড শেডো প্রকাশের পর বেরিয়ে আসে নতুন সত্য। এতকাল ইংরেজ সমালোচকরা যা আড়ালে রেখেছেন, সেসব চলে আসে সামনে। ভারতীয় এলিয়ট গবেষক, প্রাবন্ধিক চিন্ময় গুহ এই বইটিকে আমলে নিয়ে বলেছেন :

এমন একেকটা বই লেখা হয় কখনো কখনো যা পুরোনো ধ্যান ধারণার শেকড় উপড়ে দেয়। এই বইটিও সেরকম। যদিও তা জীবনানন্দের ভাষায় বিমর্ষ পাখির রঙে ভরা। ভিভিয়েন কি ছিলেন স্বামীর অবিচারের শিকার? তাদের ব্যর্থ দাম্পত্যের কারণ কি শুধু এলিয়টের শারীরিক অক্ষমতা, কিংবা ভিভিয়েনের স্নায়বিক ও মানসিক অস্থিরতা নয়? অন্য কিছু যা একদিন হিমশীতল অন্ধকারে লুকানো ছিল? নিষেধাজ্ঞার বাধা অতিক্রম করে অস্পষ্টতার আলো আধারি পেরিয়ে এই নতুন অনুসন্ধান কি পারল আমাদের সামনে উপস্থাপন করতে ভিন্ন মানবীকে? ভয়ঙ্কর দুটি স্বীকারোক্তি ভিভিয়নের পূনমূল্যায়নকে উসকে দিয়েছে।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close