Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৫]

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৫]

প্রকাশঃ January 9, 2017

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি [৫]
0
0

চিন্ময় গুহের লেখা `চিলেকোঠার উন্মদিনী’ গ্রন্থে এলিয়ট-ভিভিয়েন সম্পর্কের ধারাপাত নিয়ে অনেক প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে ভিভের কাব্যপ্রতিভার উদাহরন, তার কবিতাও রয়েছে। অক্সফোর্ডের বোদলিয়ান লাইব্রেরীতে গিয়ে রীতিমত বন্ড সই দিয়ে ভিভিয়েনের লেখা পড়েছেন চিন্ময় গুহ।  ভিভিয়েনের লেখা পড়ে তার জীবনীকারের সাথে তিনিও একমত যে  এলিয়টের সমকামীতাই  ব্যর্থ করে  দিয়েছে তার প্রথম বিয়ে।

মৃত্যুর এতদিন পরে প্রকাশিত, বহু বাধা অতিক্রম করে লেখা ভিভিয়েনের জীবনীতে বলা হয়েছে এলিয়টের মূল সমস্যা ছিল তার সমকামিতা। প্রথম জীবনে তিনি লাগামছাড়া যৌনকবিতা লিখেছিলেন যা বোলো পয়েমস নামে ১৯৯৬ সালে তার ইনভেনশান অব দি মার্চ  হেয়ার গ্রন্থে প্রকাশিত হয় এবং অজ্ঞাত কারণে যা ধ্বংস করেনি, তার সারাজীবনের সবচেয়ে গোপন কথাটি ফাস করে দেয়। প্রথম পুরুষে লেখা এইসব কবিতায় পাঠককে পায়ুকামে প্ররোচিত করা হয়। ১৯৩৪ সালের ৩ জানুয়ারী এজরা পাউন্ডকে অভাবনীয়  রকম উগ্র কয়েকটি সমকামী কবিতা পাঠান স্বয়ং পাউন্ড পর্যন্ত ঘাবড়ে গিয়ে বলে ওঠেন, নিজের অনৈতিক বদ অভ্যাসকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করছ তুমি। ভুক্তভোগী ভিভিয়েন ছাড়া এলিয়টের ঘনিষ্টজনদের মধ্যে শুধু পাউন্ড, মেরি ট্রাভেলিয়েন ও অটোরিলন মরেল সমস্যাটি জানতেন। চিন্ময় গুহের লেখা থেকে জানা যায় জেন ভারডানেল ছাড়া আরো পুরুষ প্রেমিকের কথা। বিয়ের কিছুদিন আগে অক্সফোর্ডে কার্ল কাপলিন নামে এক ইঙ্গ জার্মান ছাত্রের সঙ্গে এলিয়টের বন্ধুত্বের কথা লিখেছেন তার বন্ধু রবার্ট সেনকোর্ট। ১৯২৩ সালে ওল্ড  ফিশবোর্নের মাইলস্টোন কটেজে এলিয়টেদের সঙ্গে থাকতে আসে জ্যাক থামে এক জার্মান তরুন, যাকে প্রথমে ভিভিয়েনের কাছে চমৎকার লাগলেও ক্রমশ সে ভয়ংকর রুপ ধারন করে। এছাড়া  দীর্ঘদিনের আবাসিক সঙ্গী জন হেওয়ার্ডের সাথেও সমকামীতার অভিযোগ উঠলে মামলা করার হুমকী দেন এলিয়ট। সমকামীদের মনোজগত, বেদনার কথা উল্লেখ করে তাদের সাথে নিজের সাদৃশ্যের কথা বলেছেন মেরি ট্রাভেলিয়েনকে,

সমকামীরা সব সময় একটা ভয়ের জীবন যাপন করে। সমাজে থেকেও নিজেদের  মনে করে একঘরে, নির্বাসিত। যেভাবে নরকে বাস করে আত্মারা। আমিও নরকে বিশ্বাস করি। ভয়ের মধ্যে থাকি। নিজের ভেতর এক ভয়ের দুনিয়ায় আমার বাস।

জেমস ই মিলার তার মেকিং অব এন আমেরিকান পোয়েট গ্রন্থেও এলিয়টের পুরুষ প্রেমিকের কথা বলেছেন। ফরাসী তরুণ জেন ভারডানেলের সাথে  ঘনিষ্টতা নিয়ে দীর্ঘ একটি অধ্যায় লিখেছেন মিলার। জেমস মিলার, রবার্ট সেনকোর্ট, চিন্ময় গুহ, সেমুয়ের জোনসসহ আরো অনেক এলিয়ট গবেষকের দাবী এলিয়টের এই স্বভাব মেনে নিতে পারেননি ভিভ। অসহজ দাম্পত্য, অবেহলায় আত্মবিশ্বাস ঠেকেছে শূন্যের কোঠায়, বেড়েছে স্নায়ুবিক  দুর্বলতা, হারিয়েছেন মানসিক স্থিতি।  শেষ পর্যন্ত তার কপালে জুটেছে উন্মাদিনী উপাধি। পরিবার থেকে দূরে মানসিক হাসপাতালে বাধ্যতামূলক একাকীত্বে করুণ মৃত্যু হয়েছে তার। তবে নিজের পরিনিতির জন্য কখনো এলিয়টকে দায়ী করেননি ভিভ। বিয়ের পর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে ঝোকের বশে রাসেলের প্রতি ঝুকলেও প্রকৃতপক্ষে ভালোবেসেছেন টমকেই। ভিভিয়েনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা,চারিত্রিক বৈশিষ্টের বৈপরীত্য দুজনের সম্পর্কের রসায়ন কার্যকর হতে দেয়নি। ভার্জিনিয়া উলফের স্বামী লিওনার্দ বলেছেন, এলিয়ট এতটাই লাজুক ছিলেন যে নিজের স্ত্রীর সামনে দাড়ি শেভ করার কথা ভাবতেই পারেন না। অর্ন্তমুখী, রাশভারী,আত্মকেন্দ্রিক এলিয়টের সাথে প্রানবন্ত, উচ্ছল ভিভের জুটি শেষ পর্যন্ত চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ। সাহিত্যের ইতিহাসের সবচে অসফল এই দম্পতির প্রতি সমালোচকদের সহমর্মিতার শেষ নেই। স্বামীর বন্ধু, স্বজন শূভ্যার্থীদের কাঠগড়ায় দাড়িয়েছেন এই নারী। এজরা পাউন্ড থেকে শুরু করে ব্লুমবারি গ্রুপের লেখকদের  সবাই পক্ষ নিয়েছেন কবির। এলিয়ট যখন লয়েল্ড ব্যাংকের চাকরি, লেখালেখি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন এই গ্রুপের সদস্যরা এলিয়ট ফেলোশিপ ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেন। এই ফান্ড থেকে নিয়মিত মাস খরচের টাকা যোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় যেন চাকরি ছেড়ে আপাদমস্তক লেখালেখি করা যায়। ভার্জিনিয়া  উলফের চিঠি থেকে জানা যায়,  ব্লুমবারির ফেলোশিপ ফান্ডের  চেয়ে অফিসের রুটিন জীবন, ব্যাংকের কেরানীর কাজকেই উপযুক্ত  মনে করেছেন। তাই প্রত্যাখান করেন বন্ধুদের প্রস্তাব। কারন ১৯১৭ সাল থেকে একই অফিসে কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এই জীবনে। চাকরিতে বাড়তি কোনো ঝামেলা নেই। আয়টাও মন্দ নয়। দুজনের দিব্যি চলে যায়। এর আগে লেখালেখির পাশাপাশি অনেক লাগসই পেশার কথা ভেবেছেন। শিক্ষকতা মোটেও ভালো লাগেনি। সাংবাদিকতার কথাও ভেবেছেন। শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে লেখালেখির সঙ্গে সাংবাদিকতার সমন্বয় করা সম্ভব নয়। লেখার সময়ে অন্য কিছুকে ভাগ দিতে চাননি বলেই বিকল্প হিসেবে ব্যাংকের চাকরি নিয়েছেন। ফেবার এন্ড ফেবারে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাংকেই থেকে গেছেন। বন্ধুদের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ার অন্যতম কারন  আর্থিক নিরাপত্তা। এলিয়ট ভোলেননি অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ যোগানোর জন্য আর্থিক নিরাপত্তা  বিশেষ করে নিয়মিত বেতন খুব জরুরী। ভোলেননি এই চাকরিটা ভিভিয়েনের বাবার সুপারিশে পাওয়া। এই ফান্ডের সাহায্য না নেয়ার কারন হিসেবে বলেছেন ঘরে অসুস্থ স্ত্রী আছে, যার দেখাশোনা, চিকিৎসা করা তার দায়িত্ব। বন্ধুদের  প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে নিশ্চিত আর্থিক আয়ের উৎস নষ্ট করতে চাননি। স্ত্রীর প্রতি  মমতার কারনেই ওয়েস্ট ল্যান্ড লেখার সময়ও  অসুস্থ ভিভকে নিয়ে  ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি করেছেন। কখনো লন্ডনে, কখনো প্যরিসে মনরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে গেছেন। তখনো তাদের সম্পর্ক ছিল ভালো। রাসেল পর্ব শেষ হওয়ার পরও অনেক বছর একসাথে সংসার করেছেন। লন্ডনের সব সাহিত্য আড্ডায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত মুক্তি চেয়েছেন স্ত্রীর কাছ থেকে। ভালেরির সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, এলিয়ট যখন অফিসে থাকতেন তখন প্রায়ই ভিভিয়েন তাকে ফোন করতেন দ্রুত বাসায় আসার জন্য। এসে গাজরের জুস করে দিতেন। কখনো কখনো বাড়িতে এলিয়টের সাথে কেউ দেখা করতে আসলে বিরক্ত হয়ে বলতেন, সবাই কেন তার স্বামীর পেছনে লেগে আছে, কেন তার সাথেই দেখা করতে আসে?  ভিভিয়েন আতঙ্কে থাকতেন কেউ তার স্বামীর ক্ষতি করবে। যেদিন তাকে ভোরে পুলিশ রাজপথে আবিস্কার করে সেদিনও জানতে চেয়েছেন, এলিয়টকে কেউ মেরে ফেলেছে কীনা। ভালেরির বর্ননা থেকে আরো জানা  যায় একবার ভিভিয়েনকে নিয়ে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গেছেন এলিয়ট। হঠাৎ ঝড় আসলে ভিভিয়েন খাটের নীচে লুকিয়ে যান। তার চোখেমুখে আতঙ্ক। ছোট বেলা থেকেই এই আতঙ্ক, অতিরিক্ত ভয় ছন্দপতন  ঘটায় জীবনে। একবার বলেছেন  মৃত্যুর পর ছুরি দিয়ে তার বুক চিরে যেন নিশ্চিত  করা হয় আসলেই মারা গেছেন কীনা। মনোবৈকল্য থেকে তৈরী হওয়া এসব অসঙ্গত আচরন সহানুভূতি পায়নি কারো।  স্বামীর জীবনে প্রথম স্ত্রীর ভূমিকা আড়াল করে ভালেরিও বড় করে দেখেছেন মানসিক অসুস্থতার সময়ের আচরন। স্বীকার করেননি এসব অস্বভাবিক আচরনের দিকে স্বামীই নিয়ে গেছেন তাকে। কবির সাহিত্যিক বন্ধুরা রাসেলের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর নিন্দা করেছেন, ভিভ যার ওপর সবচে বেশী নির্ভরশীল, যে তার  প্রধান অভিভাবক সেই এলিয়টকে প্ররোচনা দিয়েছেন  স্ত্রীকে ত্যাগ করতে। সমর্থন করেছেন ভিভকে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত। তবে রাসেলের প্রতি কারো তেমন কোনো বিতৃষ্ণা ছিল না। একাধিক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়ানো রাসেল বন্ধুদের ক্ষমা পেলেও ক্ষমা পাননি ভিভেয়েন। মৃত্যুর পরও ভিভকে আক্রমন করেছেন কবি। ১৯৩৮ সালে লেখা নাটক দ্যা ফ্যামিলি রি ইউনিয়নে এক স্ত্রীর কথা বলেছেন যে  অস্থির, কুয়াশা, ছায়ার মতো। মিসেস রোচেষ্টার চরিত্র যে ভিভ ভার্জিনিয়া উলফ তা বারবার উল্লেখ করেছেন। ভার্জিনিয়া উলফ প্রকাশ্যে বলতেন-

এলিয়টের উচিত ভিভকে ছেড়ে দেয়া।

বন্ধুস্ত্রীর প্রতি উলফের বিদ্বেষের পেছনে অন্য কারন রয়েছে। ভিভের মতো উলফও জীবনের অধিকাংশ সময় আক্রান্ত ছিলেন মানসিক সমস্যায়। ভুগেছেন হিস্টোরিয়া, সিজোফ্রেনিয়ায়। ভিভের মতোই কাটিয়েছেন অসুস্থ শৈশব। অভিজাত, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবারে জন্ম নেয়া   উলফের জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে  অবসাদ, বিষন্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতায়। ১৮৯৫ সালে রিমোটিক জ্বরে মায়ের মৃত্যুর পর ১৩ বছর বয়সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ১৯০৪ সালে বাবা নেসলি স্টিফেনের মৃত্যুর পর আবারো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। প্রথমবারের মতো আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন।  প্রাণে বেচে গেলেও ভর্তি হন হাসপাতালে। তার ভাতিজা ও জীবনীকার কোরেনটিন বেলের ভাষায়, সেবার গ্রীষ্মকালে পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছিল উলফ। ১৯০৬ সালে ভাই টবি স্টিফেনের মৃত্যুর পর আবারো পাগলামী বাড়ে। প্রথম পরীক্ষামূলক উপন্যাস  জেকব’স রুমের জেকবের মত এগুলো ছিল তার  জীবনের প্রথম মানসিক আঘাত যা অব্যাহত থাকে ১৯৪১ সালের মার্চ মাসে আত্মহত্যার আগ পর্যন্ত। যদিও তার মানসিক অসুস্থতা ছিল বিশেষ বিশেষ সময়ে। পৌনপুনিকভাবে এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। থেকেছেন মানসিক হাসপাতালেও। সুস্থতার মাঝেও অসুস্থতা তাকে আজীবন ভুগিয়েছে। তার পাগলামীর কারন জীবনের নানা ঘটনা, বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু, বিয়ে, বা উপন্যাস প্রকাশ। এসব উপসর্গগুলো মানসিক অবসাদ থেকে মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরী করেছে। নিবেদিত স্বামী, বিশ্বস্ত সঙ্গী লিওনার্দ তার পাশে থেকেছেন  সব সময়। লিওনার্দ স্ত্রীর অসুস্থতা সম্পর্কে বলেছেন-

মানসিক অসুস্থতার এক পর্যায়ে সে ভীষন উত্তেজিত হয়ে পরত। উচ্চস্বরে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলত। চোখে ভ্রম দেখত। কারো কণ্ঠস্বর শুনতে পেত। উচ্চস্বরে চিৎকার করত নার্সদের সাথে। দ্বিতীয় স্তরে এই অবসাদ কয়েকমাস স্থায়ী হয়। কোমায় চলে যায়। দুদিন সে এভাবেই থাকে। অবসাদের সময় সব চিন্তা আবেগ ও ভাবনা বিপরীত প্রতিক্রিয়া করত। গভীর হতাশা ও বিষন্নতায় ডুবে থাকত। অবসাদের দিনগুলোতে খেতে চাইত না। নির্বাক হয়ে থাকত। নিজের অসুস্থতার কথা বিশ্বাস করতে চাইত না। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করত নিজেকেই।

এরকম মানসিক পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন উলফ। বিভিন্ন পর্যায়ে ১২ জন মনোচিকিৎসক তার চিকিৎসা করেছেন, যাদের সবাই তাকে মানসিক রোগী বলে উল্লেখ করেছেন। শুধু চিকিৎসকরাই নয়, অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে স্ত্রীর মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা করা স্বামী লিওনার্দ আত্মজীবনীতে প্রশ্ন তুলেছেন উলফ কি সত্যি পাগল, নাকি উন্মাদ? ভিভিয়েনের মত তিনিও স্বামীর জীবন অতিষ্ট করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। লিওনার্দ কিভাবে পাগল স্ত্রীর দেখাশোনা করেছেন তাকে সামলেছেন তা জানতে চেয়ে পরামর্শ নিয়েছেন এলিয়ট। উলফের ১৯৪১ সালের জানুয়ারীতে আবারো আক্রান্ত হন বিষন্নতায়। তখন বিটইউন দ্যা এক্টস উপন্যাসের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রকাশকের প্রশংসাও বিশ্বাস হয় না। মনে হয় লেখাটা খুব বাজে হয়েছে। প্রকাশনা পিছিয়ে দেন। মনে হয় কোনো একটা কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন। এই অবস্থা থেকে নিস্কৃতি পেতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। লিওনার্দকে এই জীবন থেকে রেহাই দিতে ওভারকোটের পকেটে ভারী পাথর ভরে ২৮শে মার্চ ওরাস বাড়ির অদূরে নদীতে ডুবে যান। এর আগে ১৮শে মার্চ একই ভাবে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বারের চেষ্টা সফল হয়। ১ মাস পর ২৮ এপ্রিল খুজে পাওয়া যায় তার মৃতদেহ। আত্মহত্যার চিরকুটে লিখেছেন, বেচে থাকার উদ্দেশ্য হারিয়ে গেছে, হারিয়ে ফেলেছেন শিল্পকেও।

প্রিয়তম,

বুঝতে পারছি আবারো পাগল হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে আবারো সেই দু:সহ সময় পার করতে হবে আমাদের। এবার আর সেরে উঠব না। আবারও শুনতে পাচ্ছি সেই কণ্ঠস্বর। কোনোভাবেই কাজে মনযোগ দিতে পারছি না। আমি হয়ত আর লিখতে পারব না। এবার তাই করতে যাচ্ছি, যা করা উচিত। আমাকে তুমি জীবনের সর্বোচ্চ শান্তি দিয়েছ। মনে হয় না এমন দু:সহ অসুস্থতা নিয়েও দুজন মানুষ এর চেয়ে বেশী ভালো থাকতে পারে। আর যুদ্ধ করতে পারছি না। জানি তোমার জীবনকে নষ্ট করে ফেলছি আমি। এও জানি, আমাকে ছাড়াই তুমি বাচতে পার এবং পারবে। দেখো আমি ঠিকভাবে লিখতে, এমনকি পড়তেও পারছি না। সব সুখের জন্য আমি তোমার কাছে ঋণী। তুমি সব সময় আমার প্রতি ধৈর্যশীল ছিলে। আমাকে যদি কেউ বাচাতে পারত সে হ্চ্ছ তুমি। তোমার জীবন আমি আর নষ্ট করতে চাই না।

একই অবসাদের  শিকার, একই শহরের মেয়ে, বন্ধুর স্ত্রীর প্রতি সহানূভূতির পরিবর্তে কটুক্তি বিস্ময় জাগায়। এটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মাত্র নয়। নারীবাদী লেখক হিসেবে যিনি গোটা দুনিয়ার নারীদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন, কলম ধরেছেন নারী লেখকদের পক্ষে। যিনি তার একজনের ‘নিজস্ব এক ঘর’ গ্রন্থে বলেছেন নারীর লেখক হতে হলে চাই ৫০০ পাউন্ড রোজগার ও নিজের লেখার ঘর। এমন তত্ত্ব নিয়ে  যিনি নারীবাদের এক নতুন কণ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, সেই উলফ নিজের গোত্রের এক অসহায়, অসুস্থ, স্বামী পরিত্যক্তা নারীর বিপক্ষে দাড়িয়েছেন। যে স্বামীর অবহেলা সইতে সইতে ক্লান্ত, তার মত একই মানসিক সমস্যায় বিপর্যন্ত, চিকিৎসা নিয়েছেন একই চিকিৎসকের কাছে। সেই বন্ধু স্ত্রীর  প্রতি সামান্যতম সহানুভূতি দেখাননি উলফ। উলফের অবজ্ঞা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ভাল লাগেনি ভিভের। অটোলিন মরেলের কাছে অভিযোগ করেছেন, তাদের বিয়ে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মজা করেছেন উলফ। এমনকি যখন  অসুস্থতা বা পায়ের সমস্যা নিয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন তখনো এসব নিয়ে উলফের কটুক্তি সইতে হয়েছে। টমকে যখন ভিভ হন্যে হয়ে খুজছেন তখন স্ত্রীর কাছে ফিরতে টমকে নিরুৎসাহিত করেছেন। বলেছেন ভিভকে তার ছেড়ে দেয়া উচিত। ভিভিয়েনকে মানসিক হাসপাতালে পাঠোনোর পরও কমেনি রুঢ়তা। বলেছেন,

একটা নার্সিং হোমে আছে এলিয়টের স্ত্রী। এটা নিয়ে আমার কোনো অনুতাপ নেই। জানি না এলিয়ট আবার বিয়ে করবে কীনা। নাকি একাই কাটিয়ে দেবে বাকী জীবন।

ভিভিয়েনকে অপছন্দ করার কারন রয়েছে। এলিয়টের সাথে দেড় দশকের ওঠাবসায় কখনো কখনো টমের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছেন উলফ। উলফের ডায়েরীতে প্রকাশিত হয়েছে ব্যক্তি এলিয়টের প্রতি মুগ্ধতা। এই অনুভূতি বন্ধুত্বের চেয়েও বেশী। ১৯১৯ সালে নিজের প্রকাশনা সংস্থা হোগার্থ প্রেস থেকে এলিয়টের দ্বিতীয় কাব্য প্রকাশের উদ্যোগ নেন উলফ। তখনো কবি হিসেবে তার তেমন পরিচিতি তৈরী হয়নি। ১৯২৩ সালে প্রকাশ করেন ওয়েস্টল্যন্ড। যদিও একই সময়ে জেমস জয়েসের উপন্যাস ইউলিসিস প্রকাশের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজের প্রকাশনী থেকে ছাপার আগে প্রকাশক উলফ রাত জেগে নিজে হাতে টাইপ করেছেন ওয়েস্টল্যান্ডের পান্ডুলিপি। ব্যক্তিগত বিষয়েও এলিয়টের প্রতি বাড়তি মনযোগ দিয়েছেন। উলফের ভালো লাগা নিয়ে এলিয়টের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার মনে যে বন্ধুত্বের চেয়ে বাড়তি অনুভিূতি ছিল স্বীকার করেছেন উলফ। ১৯৩৫ সালে বোন চিত্রশিল্পী ভানেসা বেলকে লেখা চিঠিতে বহু বছর আগে এলিয়টের সাথে দেখা হওয়ার স্মৃতিচারন করে বলেছেন, এই স্মৃতি তার প্রত্যাশাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

অনেক বছর আগে টম এলিয়টের সাথে দেখা হয়েছিল। যাকে আমি ভালোবাসি। অথবা বাসতে পারতাম। আমরা দুজনেই তখন খ্যাতির শীর্ষে। সাহিত্য জগতে দুজনেরই অবস্থান ছিল মজবুত। তোমার কি মনে হয় বেল? বন্ধূত্বের জন্য যৌনতা কতটা প্রয়োজন? আর ঠিক কোন পর্যায়ে এসে ভালোবাসা শারিরীক সম্পর্ক বা যৌনতায় রূপ নেয়?

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close