Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি

প্রকাশঃ January 2, 2017

জাহানারা পারভীন / এলিয়ট-ভিভিয়েন : বেদনার্ত সম্পর্কের ঘুড়ি
0
0

[সম্পাদকীয় নোট :  কবি হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলিতে  টি এস এলিয়ট যখন আমেরিকা থেকে ইংল্যান্ডে চলে আসেন, তখন পরিচয় হয়েছিল ব্রিটিশ তরুণী ভিভিয়েন হেই-উডের সঙ্গে। তারপর প্রেম ও বিয়ে। কিন্তু তাদের সম্পর্কটা নানা টানাপোড়েনের কারণে জটিল হয়ে ওঠে। এলিয়টের কবিতায় ভিভিয়েনের প্রভাব নিয়েও আছে বিতর্ক। এই লেখায় দুজনের সেই সম্পর্কের অনেক জানা-অজানা কথা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন কবি জাহানারা পারভীন। আজ লেখাটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।]

প্রথম পর্ব

পরিচয়ের তিন মাসের মাথায় বিয়ে। ২৬ বছর বয়সে। পরস্পরকে ভালোভাবে জানার আগেই। দুই পরিবারের অজান্তে। বিয়েটা আকস্মিক, অপরিকল্পিত। সঙ্গীকে জানার ঘাটতি থাকায়, ব্যক্তিত্ব, স্বপ্নের ভিন্নতাকে আমলে না নেয়ায় তাড়াহুড়োর এই বিয়ে হয়ে উঠেছে সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে অসফল বিয়ে। কেন ব্যর্থ হল এলিয়ট-ভিভিয়েন সম্পর্ক? অসুখী দাম্পত্যের পুরো দায় ঠেলে দেয়া হয়েছে ভিভিয়েনের দিকে। ভিভিয়েনের সাথে এক ছাদের নীচে ১৭ বছরের সংসারে যে যন্ত্রণা, দু:স্বপ্ন, অস্বস্তির মাঝে কাটিয়েছেন এলিয়ট, সে অসুখের তিনিই নির্মাতা।

লন্ডনে আসার এক বছরের মাথায় বিয়ে। তখনো তিনি ছাত্র, অপ্রতিষ্ঠিত। বিয়ের রেজিস্ট্রি খাতায় পেশার ঘরে লিখেছেন বেকার। বাবাকে বিয়ের খবর জানিয়ে ব্যাখ্যা করেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। নতুন জীবনের শুরুতে সংসারের খরচ চালাতে সহযোগিতা চান। বিয়ের দুদিন পর এলিয়টের বাবাকে চিঠি লেখেন এজরা পাউন্ড। বিয়ের যৌক্তিকতা বুঝিয়ে বলেন, এই বিয়ে তার ছেলের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে।  ইংল্যান্ডে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাও ভুল নয়। আশ্বস্ত করেন, লেখালেখি করে সে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারবে।

আটলান্টিকের ওপাড়ে পুরো পরিবার বিয়ের খবরে ক্ষুব্ধ। অসময়ে বিয়ে-করা ছেলের নির্বুদ্ধিতায় বিস্মিত। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম যার, বিশ্বের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন যাকে, সে ঝোকের বশে এমন জীবন বেছে নিয়েছে যেখানে নেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। বাবা মার প্রত্যাশা পুরণে ব্যর্থ এলিয়টের উদ্বেগ প্রভাব ফেলে বিবাহিত জীবনে। ১৫ জুলাই বাবাকে জানান ইংরেজ মেয়েকে বিয়ে করার খবর :

আমাদের বিয়ের একমাস হয়ে গেল। আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি আমার জন্য সেই সেরা জীবনসঙ্গী। আমার যা প্রয়োজন সব আছে ওর। সাধ্যমত ও সবই করছে আমার জন্য। আমি ভিভিয়েনের কাছে ঋণী বাবা।

প্রবল মুগ্ধতা থেকে নয়, বিয়ের সিদ্ধান্তে কাজ করেছে বৈষয়িক হিসেব। এজরা পাউন্ড বোঝান যে তাকে দিয়ে কবিতা হবে, শুধু মন দিয়ে লেখালেখি করতে হবে। এর জন্য থেকে যেতে হবে লন্ডনেই। পাউন্ডের কথা শুনে মনে হয় অল্প পরিচিত ভিভিয়েন, যার সাথে আড্ডা দিচ্ছেন অক্সফোর্ডে, কফিশপে, নৌকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন টেমস নদীতে; যার প্রতি মুগ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যাকে নিয়ে যাচ্ছেন গান শুনতে, নাচের পার্টিতে, মনে হয় ভালোবাসেন তাকে। ১৯১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দ্বিধান্বিত এলিয়ট পাউন্ডের কাছে পরামর্শ চান জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের।

আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমার কি আমেরিকায় ফিরে যাওয়া উচিত, অধ্যাপক হওয়ার জন্য? বিয়ে করে সংসারী হওয়ার জন্য? সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য, মন ও চিন্তার স্বাধীনতার সাথে আপোষ করার জন্য? নাকি বেছে নেয়া উচিত শিল্পীর নিঃসঙ্গ জীবন। যেকোনো দিকে যাওয়া আমার জন্য বড় সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তটা নিতে হবে এখনই।

পাউন্ডের মনে হয় এলিয়টের স্বতন্ত্র কাব্যপ্রতিভা ইতিহাস সৃষ্টি করবে। যদি তাকে লন্ডনে রেখে দেয়া যায়।  সব দ্বিধা ছুড়ে বিয়ে করে লন্ডনে থেকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, বিয়ের জন্য ভিভিয়েনই উপযুক্ত পাত্রী। অথচ তিন মাস আগে নাচের অনুষ্ঠানে পরিচয়ের পর থেকে তার সাথে মেশাটা ছিল উদ্দেশ্যহীন, অনেকটা ফ্লার্ট করার জন্য। এও মনে হয় ভিভিয়েন হতে পারেন তার কাব্যলক্ষ্ণী। লন্ডনের রয়েল আর্ট একাডেমীর সদস্য, ইংরেজ চিত্রকরের মেয়ে ভিভিয়েন। ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দুই পরিবারের অবস্থান ভিন্ন। এলিয়ট বিশ্বাস করতেন, আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি, বাকীটা আমাদের হাতে নেই। হবু স্ত্রীর সাথে স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের অমিলকে অগ্রাহ্য করে ১৯১৫ সালের ২৬ জুন বিয়ে করেন। উত্তর লন্ডনের হেম্পস্টিড রেজিস্ট্রি অফিসে সেদিন দুজন স্বাক্ষী ছিল। ভিভিয়েনের খালা লিলিয়া ও  বন্ধু লুসি থেয়ার। পরিণত বয়সে এলিয়ট স্বীকার করেছেন প্রেমিকার চেয়ে লন্ডনকে বেশি ভালোবাসাই বিয়ের কারণ।

আমি বয়সের তুলনায় অপিরণত, ভীরু ও অনভিজ্ঞ ছিলাম। দ্বিধান্বিত ছিলাম জীবন ও পেশা বাছাই করা নিয়ে। তিন বছর হার্ভার্ডে গ্রাজুয়েট স্কুলে বাবার পয়সার পড়াশোনা করেছি দর্শনে ডক্টরেট ডিগ্রী নেয়ার জন্য, এই আশায় যে, তা দিয়ে হয়ত কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা চাকরি জোগাড় করা যাবে। তবে পড়াশোনায় আমার মন ছিল না, এমনকি ভরসা ছিল না নিজের ক্ষমতার ওপরও। শিক্ষকতায়  ভাল  করব এমন আত্মবিশ্বাসও  ছিল না। কবি হওয়ার স্বপ্ন ছিল শুধু। লন্ডনে আমি সুখেই ছিলাম। এমনকি  যুদ্ধের সময়ও। যতটা আমেরিকায় ছিলাম তার চেয়ে বেশি। পাউন্ড আমাকে এখানে থেকে যেতে উৎসাহ দেন। প্রথমে মনে হয়েছে ভিভেয়েনকে ফ্লার্ট করতে চেয়েছি। ছোটখাট প্রেম। খুব লাজুক ও অনভিজ্ঞ ছিলাম। কোনো কিছু বা কাউকে অর্জনের জন্য। শেষ পর্যন্ত নিজেকে বোঝাতে পেরেছি যে ভিভিয়নকে ভালোবাসি কারণ আমি লন্ডনে থেকে লেখালেখি চালিয়ে যেতে চেয়েছি। আর সে নিজেকে বোঝাতে পেরেছে আমাকে  লন্ডনে রেখে দেয়ার মাধ্যমে সে একজন কবিকে বাঁচাতে চেয়েছে।

পড়াশোনা শেষে আমেরিকা ফিরে যাওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ ছিল। বিয়ে না করলে একটাই পথ খোলা। দেশে ফিরে শিক্ষকতা করা। ভিন্ন এক জীবনের প্রত্যাশী এলিয়ট তা চাননি। তাই  পারিবারিক উত্তরাধিকার পেছনে ফেলে হেঁটেছেন শিল্পের পথে। একবছরে এজরা পাউন্ডের সাথে ওঠাবসা, লেখকদের সাহচর্য,সাহিত্যের জন্য লন্ডনের অনুকুল পরিবেশ, সর্বোপরি পাউন্ডের আশাবাদ যে তার পক্ষে কবি হওয়া সম্ভব; ফলে জীবিকার অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও লেখক হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন। এখানকার কবিদের কাব্যিক উত্তরাধিকার, সামাজিক অবস্থান, সাহিত্যে পৃষ্টপোষকতার পরিবেশ দেখে লন্ডনকেই মনে হয় স্থায়ী আবাসের উপযুক্ত। সাহিত্য বনাম দর্শন, অতীত বনাম ভবিষ্যৎ পরিবার বনাম প্রবাসের দ্বিধা কাটিয়ে লন্ডনে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সুন্দরী, প্রাণবন্ত ভিভিয়েনকে মনে হয় সেরা জীবনসঙ্গী। এতদিনের চেনা গন্ডিতে যেসব মেয়েদের দেখেছেন বিশেষ করে মা, বোনদের চেয়ে অনেক আলাদা ভিভিয়েন। এমিলির চেয়েও ভিন্ন। মুগ্ধ হন নিস্পলক দৃষ্টি, নিঃসংকোচ ব্যবহারে। ধর্মীয় রক্ষণশীলতায় বড় হওয়া এলিয়টের চোখে এই তরুণীর ধূমপানের অভ্যাসও মন্দ ঠেকে না। আমেরিকায়, এমনকি ফ্রান্সে যেসব মেয়েদের দেখেছেন, ভিভিয়েন তাদের মত নয়। এই প্রথম কাছ থেকে দেখা কোনো ইংরেজ নারীকে। হৈ চৈ করে বেড়ানো এই মেয়েটি তার স্বভাবের বিপরীত হলেও ভালো লাগে  কথা, স্বতস্ফুর্ত হাসি, ব্যাক্তিত্ব। এভাবে মূলত ভাঙতে চেয়েছেন নিজেকে, কিছুটা পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন জীবনে। তার গাম্ভীর্যের বিপরীতে ভিভের সহজ, সংবেদনশীল চালচলনে আকৃষ্ট হন। মনে হয় কিছু না করার চেয়ে ভুল করাও যৌক্তিক। ২৪ মার্চ ভিভিয়েনের সাথে পরিচয়ের পর থেকে তিন মাসের আলাপে ঘনিষ্টতা বাড়ে। নাচতে পারদর্শী, ছবি আকায় দক্ষ, অভিনয়ে আগ্রহী মেয়েটির সবচেয়ে বড় গুন তরুণ এলিয়টের মাঝে দেখতে পেয়েছেন ভবিষ্যতের সেরা কবিকে। পাউন্ডের মত তারও বিশ্বাস, এলিয়ট একজন প্রকৃত মেধাবী। আজীবন এই মেধাবীর পাশে থাকতে চান। তখনো এলিয়টের অজানা ছিল হবু স্ত্রীর শৈশবের রুগ্নতার ইতিহাস।

ছাব্বিশ বছরের মুখচোরা, বিষন্ন, সুদর্শন যুবক এলিয়টকে প্রথম দেখাতেই ভিভিয়েনের মনে হয় আমেরিকান রাজপুত্র। কিছুটা পুরোনো ফ্যাশনের। তার ভরাট কণ্ঠস্বর, বাচনভঙ্গি, শ্যেনদৃষ্টি, সর্বোপরি কবিতার জন্য এই তরুণের প্রেমে পড়েন ভিভিয়েন। এছাড়া মাকেও এক হাত দেখে নেয়ার ইচ্ছে। এলিয়ট-ভিভিয়েন দুজনেই এর আগে অন্যজনকে ভালোবেসেছেন। ফ্রান্সে থাকার সময়ও এমিলি হেলকে চিঠি লিখেছেন এলিয়ট। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ। এলিয়টের সাথে পরিচয়ের আগে চালর্স বাকল নামে এক স্কুল শিক্ষকের সাথে বাগদান হয় ভিভের। অসুস্থতা, ভগ্নস্বাস্থের কারণে মেয়ে বিবাহিত জীবনে সুখী হতে পারবে না এমন আশংকায় বিয়ে ভেঙে দেন মা রোজ হেইগ উড। তার মনে হয় কখনো মা হতে পারবে না ভিভ। দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য যতটা বাস্তববাদী হতে হয়, ততটা কৌশল রপ্ত করা মুশকিল তার শৈশব থেকে অসুস্থতা নিয়ে বড় হওয়া মেয়ের পক্ষে। তাই মেয়ের বিয়ের বিপক্ষে অবস্থান নেন মা।  মায়ের আশংকাকে মিথ্যে প্রমাণ করে সংসারী হওয়ার জেদ হয় ভিভের। অনেকটা গোপনে বিয়ে করেন এলিয়টকে। তবে ভিভিয়েনের ওপর বিরক্ত হয়ে নয় মাসের সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছেন চার্লস বাকল এমন মতও রয়েছে। হয়ত এলিয়টকে বিয়ে করে ভুলতে চেয়েছেন পুরোনো প্রেমিককে। বিয়ের পর শশুরবাড়িতে ওঠেন কবি। ২৩ জুলাই বাবাকে লেখেন :

আমি শূন্য হাতে বিয়ে করেছি। ভিভিয়েন জানে আমাকে বিয়ে করে ওর পাওয়ার কিছু নেই। আমার মতো চালচুলোহীন একটা ছেলেকে বিয়ে করে ওর কোনো লাভ হয়নি।

১৭ বছরের সংসারে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে টমকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাকে লন্ডনে টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছু করেছেন যেন বাবা মায়ের চাপে হার্ভার্ডে গিয়ে দর্শনে শিক্ষকতা করতে না হয়। ১৯১৬ সালে এলিয়টের ভাই হেনরিকে লেখেন :

আমি টমের কবিতার দেখাশোনা করি, প্রকৃত জিনিয়াসের মতো। একদিন সে বড় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

সহজ সম্পর্ক কয়েক মাসেই হয়ে যায় জটিল। তৈরি হয় অস্বস্তি, দূরত্ব। এলিয়টের কোনো কোনো জীবনীকারের মতে ছাত্রজীবনে বন্ধু জেন ভারডানেলের সঙ্গে সমকামীতার সম্পর্ক থাকায় বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে সহজ হতে পারেননি। স্বাভাবিক যৌনজীবনে ফিরতে বিয়ে করলেও বিয়ের পর যৌনতাকে, নারীর সাথে মেশাকে মনে হয় অপরাধ, পাপ। এই দ্বৈততায় বিবাহিত জীবনও একাকীত্বে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এলিয়টের বিয়ে নিয়ে দুরকম মত পাওয়া যায়। একপক্ষের ধারণা, সাধু সন্ন্যাসীর মত ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন এলিয়ট, পরিণত হয়েছেন সন্তে। অন্যপক্ষ মনে করে, তার জন্যই পাগল হয়ে গেছেন ভিভিয়েন। পাউন্ড এলিয়টের বাড়ির নাম দেন ম্যাড হাউস- পাগলের বাড়ি। ১৯১৫ সালের পুরোটাই কেটেছে অর্থনৈতক সংকটে। নতুন সংসার, লেখালেখি, খণ্ডকালিন চাকরি সবকিছু মিলিয়ে অচেনা প্রবাসে বেশ সংগ্রামী জীবন। তবে স্ত্রী পাশে থাকায় জীবন আগের চেয়ে সুন্দর। এ সময় লিখেছেন :

লেখার চেষ্টা করছি। অনেক ব্যস্ততার মাঝেও জীবন এখন খুব চমৎকার, অসাধারণ। আগে যা কখনো ছিল না। দীর্ঘ কবিতার জন্য উপকরণ সংগ্রহ করছি, প্রস্তুতি নিচ্ছি। যে জীবনযাপন করছি তা আমার কাঙ্ক্ষিত ছিল।

অথচ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বিবাহিত জীবনের সংকট। এই সময়কেই বলেছেন অসাধারণ। দীর্ঘ কবিতার যে উপকরণ সংগ্রহের কথা বলেছেন তা এই সময়ের জীবনে থেকে নেয়া। এরই মধ্যে মারা গেছেন জেন ভারডানেল। বিয়ের দু’ সপ্তাহ পর সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ ইস্টবার্নে হানিমুনে যান। সেখানে গিয়েও থেকেছেন আলাদা। এলিয়ট ঘুমিয়েছেন বারান্দায় ইজিচেয়ারে, নববধু বেডরুমে। ইস্টবার্ন থেকে লেখা চিঠিতে নতুন পরিচিত বার্টান্ড রাসেলকে ভিভিয়েন জানান, সেখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে। এলিয়টের ধর্মীয় বিশ্বাস, যৌনতা ও নারী সম্পর্কে ধারণা, স্বভাবিক যৌনজীবনে অস্বস্তিতে অসহজ হয়ে ওঠে বিবাহিত জীবন। ইহুদীদের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করতেন, নারীদেরও একই চোখে দেখতেন কবি। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর শীতলতায় তৈরি হয় দূরত্ব। এই সম্পর্কের কফিনে পেরেক ঠুকেছেন বার্টান্ড রাসেল। বিয়ের দু সপ্তাহ পর শিক্ষক বার্টান্ড রাসেলের সাথে স্ত্রীর পরিচয় করিয়ে দেন। দার্শনিকের সাথে নববধুর স্বাক্ষাতের পর পাল্টে যায় অনেক কিছু। ৯ জুলাই রাসেল নবদম্পতিকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানান। সেদিনের আলাপ প্রসঙ্গে আত্মজীবনীতে রাসেল লিখেছেন :

শুক্রবার সন্ধ্যায় আমার হাভার্ডের ছাত্র এলিয়ট ও তার নব নিবাহিত স্ত্রীর সাথে রাতের খাবার খেয়েছি। এলিয়টের গাম্ভীর্য, রহস্যময়তার কারণে ভেবেছিলাম তার স্ত্রী জটিল কেউ হবে। কিন্তু মেয়েটা খুব একটা মন্দ নয়। তবে কিছুটা হালকা।

হালকা বলার কারণ প্রথম পরিচয়েই নববধুর খোলামেলা, অকপট কথাবার্তা। আলাপের প্রথম দিন স্বামীর শিক্ষকের কাছে  ব্যক্তিগত অস্বস্তি তুলে ধরা। সেদিন ভিভিয়েন জানান, এলিয়টের সাথে তার অন্তরঙ্গ হতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এলিয়টকে উজ্জীবিত করার জন্য বিয়ে করলেও তা না পারায় হতাশ। এলিয়টও বিয়ে করেছেন উজ্জীবিত হওয়ার জন্যই। রাসেলের মনে হয়, মেয়েটা খুব দ্রুত এলিয়টকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এই অস্বস্তি, সংকোচ বাড়িয়ে তৃতীয় পক্ষ হয়ে ওঠেন রাসেল; ঘি ঢালেন অসহজ সম্পর্কের আগুনে।

রাসেলের সাথে ডিনারের দুদিন পর বাবা-মার সাথে দেখা করতে আমেরিকার জাহাজে চড়েন এলিয়ট। রাসেলকে দিয়ে যান স্ত্রীর দেখাশোনার দায়িত্ব। এলিয়টের একা আমেরিকা যাওয়ায় ক্ষুব্ধ ভিভিয়েন এক বন্ধুকে লেখেন, এমন সুন্দরী  স্ত্রীকে অন্যের কাছে  রেখে যাওয়া কি বুদ্ধিমানের কাজ? অথচ একই সময়ে লেখা চিঠিতে রাসেল বলেছেন, সমুদ্রে সাবমেরিনের ভয়ে স্বামীর সাথে আমেরিকা যেতে রাজী হননি ভিভিয়েন। দেশে ফিরে এলিয়ট বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন বিয়ে এবং লন্ডনে থেকে যাওয়ার যৌক্তিকতা। এলিয়ট দম্পতি ছেলেকে বন্ধ করে দেয়া মাসোহারা দিতে রাজী হন। বাবা-মার মন রাখতে পুত্র প্রতিশ্রুতি দেন হাভার্ডে পিএইচডি শেষ করার। তবুও বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি তারা। সন্তানের ব্যর্থতা বড় হয়ে ওঠে বাবা মার  চোখে। এলিয়ট আমেরিকার জাহাজে  চড়েছেন ১৮ জুলাই। ফিরেছেন সেপ্টেম্বরের শুরুতে। ছয় সপ্তাহে অনেক দূর গড়িয়েছে টেমসের জল। এলিয়টের অনুপস্থিতির সময়টা বাবা মার সাথে সাসেক্সের পৈত্রিক বাড়িতে  কাটান ভিভয়েন।  দু সপ্তাহ পর ২২ আগস্ট বান্ধবী অটোলিন মরেলকে রাসেল জানান ছুটি কাটাতে এই সপ্তাহের শেষে গসিংটনে আসতে পারবেন না। সেদিন ভিভিয়েনের সাথে দুপুরের খাবার খাবেন। এলিয়ট যাবার পর এই তাদের প্রথম দেখা। সেপ্টেম্বরে ফিরে আসার আগে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। লন্ডনে ফিরেই স্ত্রীকে নিয়ে ইষ্টবার্নে হানিমুনে যান এলিয়ট, রাসেল যাকে নকল হানিমুন বলে তাচ্ছিল্য করেছেন ।

কারণে অকারণে এলিয়ট দম্পতির পাশে দাঁড়িয়েছেন রাসেল, করেছেন আর্থিক সহায়তা। স্ত্রীর ছোটখাট শখ পুরণে অসমর্থ, দরিদ্র কবির সুন্দরী, অসুখী স্ত্রীর মন জয় করতে দামী উপহার দিয়েছেন। বিনিময়ে  তাকে দিকে পাণ্ডুলিপি টাইপ করিয়ে নিয়েছেন। ১৯১৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত রাসেলের প্রবন্ধ সংকলন জাস্টিস ইন ওয়ার টাইম এবং একই বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত দি পলিসি অব দি এন্টেন্ট গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি টাইপ করে দেন ভিভিয়েন। প্রথমে লন্ডনের হাই ওকেম্বেতে হাই স্কুলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা শুরু করেন। সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া এলিয়টকে রাসেল তিন হাজার ডলার ধার দেন। ১৯২৭ সালে আর্থিকভাবে থিতু হওয়ার পর ঋণ শোধ  করেন এলিয়ট। এক পর্যায়ে রাসেল এলিয়টকে তার ফ্লাটে এসে থাকার প্রস্তাব দেন। অন্তত আগামী বড়দিন পর্যন্ত। এতে বাড়ি ভাড়ার খরচতো বাচবে। স্ত্রীকে নিয়ে নিজের মতো করে সংসার পাতার পরিবর্তে ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বরে হানিমুন থেকে ফেরার পর লন্ডনের বারি স্ট্রিটের ৩৪, রাসেল ম্যানসনের ফ্লাটে ওটেন এলিয়ট। আত্মজীবনীতে রাসেল বলেছেন :

যেহেতু তারা গরীব, তাই তাদের আমার দুই রুমের ফ্লাটে থাকতে দিয়েছি। এক বাসায় থাকায় তাদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। দুজনকেই আমি খুব পছন্দ করতাম ও দুর্দিনে সাহায্য করতে উদগ্রীব ছিলাম,ততদিন পর্যন্ত,যতদিন পর্যন্ত না মনে হয়েছে, তারা নিজেদের সমস্যাকে উপভোগ করছে।

রাসেলের ফ্লাটে যে কামরায় তাদের থাকতে দেয়া হয়, সেটা খুব ছোট। জামা কাপড় রাখার একটা আলমিরা থেকে বড় নয়। এলিয়টকে প্রায়ই ঘুমাতে হত ড্রইং রুমে বা হলরুমে। ছোট সেই কামরায় একাই ঘুমাতেন ভিভিয়েন। বলা যায় রাসেলের বাসায়ও যে খুব স্বাচ্ছন্দে ছিলেন দুজন তা নয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে মাত্র। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বেচে গেছে বাড়িভাড়ার খরচ। আর্থিক দুর্দিনে সেটাও বড় সাশ্রয়। সেই ফাঁদে পড়েছে সংসারের শান্তি। হয়ত আর্থিক স্বাচ্ছন্দে বড় হওয়া স্ত্রীকে কিছুটা নিরাপদে, ভালো রাখতে চেয়েছেন।  নারীর প্রতি শিক্ষকের দুর্বলতা, একাধিক বিয়ে, একের পর এক সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা তখনো কানে আসেনি। চার বার বিয়ে করেছেন রাসেল। ভিভিয়েনের সাথে পরিচয়ের আগে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে প্রথম স্ত্রীর সাথে। দুজন প্রেমিকার সাথেও সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটেছে। নিঃসঙ্গতা নেভাতে মনযোগী হয়েছেন ছাত্রের স্ত্রীর প্রতি। কিছুদিন আগে যে সম্পর্কের সুত্রপাত, রাসেলের ফ্লাটে ওঠার পর তা ডালপালা ছড়ায়। নববিবাহিত স্ত্রীর প্রতি টমের উদাসীনতার বিপরীতে রাসেলের মনযোগ, পরিচর্যা উপভোগ করেন ভিভ। রাসেলের বয়স তখন ৪৩, ভিভিয়েনের ২৭। সব প্রয়োজনে ভিভিয়েনের পাশে দাঁড়ান রাসেল। পেশাদার নৃত্যশিল্পী হতে ভিভ ভর্তি হন নাচের স্কুলে, ফি দেন রাসেল। আর্থিক দুর্দিনে এমন সুহৃদ পেয়ে খুশী এলিয়ট। রাসেলও তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ইংল্যান্ডের সাহিত্যিক, সুধীজনদের সাথে। তার মাধ্যমে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা ছাপার সুযোগ আসে। রাসেলের মাধ্যমে পরিচয় হয় ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এথিকস এর সম্পাদক সিডনি ওয়াটারলু এবং মনিস্ট পত্রিকার সম্পাদকের সাথে। ওয়াটারলু তাকে নিউ স্টেটমেন্ট, মানচেস্টার, গার্ডিয়ান, ওয়েস্ট মিনিস্টার গেজেট পত্রিকার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। লন্ডনের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়া, ছেলের উঠতি সাহিত্যিক ক্যারিয়ার দেখে খুশী হন বাবা-মা।

পাউন্ডের মত রাসেলও বাবা-মার সাথে তার দূরত্ব কমানোর চেষ্টার করেন। পাউন্ড চিঠি লিখেছেন এলিয়টের বাবাকে। রাসেল লিখেছেন  শার্লট এলিয়টকে। ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন মা পিএইচডি শেষে শিক্ষকতার জন্য ছেলেকে বোঝাতে রাসেলকে অনুরোধ করেন। ফিরতি চিঠিতে রাসেল তাকে আশ্বস্ত করেন সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে। পাউন্ড লেখেন :

হাভার্ডে পরিচয় হলেও লন্ডনে আসার পর আপনার ছেলেকে ভালোভাবে চেনার সুযোগ হয়েছে। এলিয়ট আমার খুব প্রিয়। ছাত্র হলেও অনেকটা বন্ধুর মত। পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে তার লন্ডনে থেকে যাওয়ার কারণ না বুঝলেও আমি মনে করি  পিএইচডি শেষে ইংল্যন্ডে সে ভালো কাজের সুযোগ পাবে। নিজের যোগ্যতায় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ হবে তার। সে এখন পিএইচডির প্রস্তুতি নিচ্ছে। হাই ওকেম্বেতে স্কুল শিক্ষকের চাকরিটা পিএইচডির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। স্কুল কর্তৃপক্ষ উচ্চশিক্ষার জন্য আগামী গ্রীষ্মে তাদের শিক্ষককে ছুটি দিতে রাজী হয়েছে।

একই চিঠিতে ভিভিয়েনকে নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেন, যাকে নিয়ে এলিয়টের অভিভাবকদের সবচেয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল। এই চিঠিতে রাসেল এলিয়টের লেখালেখির উন্নতির জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন ভিভিয়েনকেই :

ওর স্ত্রীকে যতটা বুঝতে পেরেছি, মনে হয়েছে খুব চমৎকার মেয়ে। এলিয়টের মঙ্গল চিন্তায় সে খুব উদ্বিগ্ন। আর স্বামীর লেখার স্বাধীনতা যেন ক্ষুন্ন না হয় সে বিষয়ে খুব সচেতন। এলিয়টের জন্য যা ভাল তা যেন সে করতে পারে সে বিষয়েও সচেষ্ট সে। এলিয়টের ওপর মেয়েটার বড় প্রভাব হল এলিয়ট আর ওদের সাথে মেশে না যারা নিজেদের ভরটিসিস্ট বলে পরিচয় দেয়। ভিভিয়েনের প্রভাবেই ওদের কাছ থেকে সরে এসেছে আপনার ছেলে।

বিয়ের একমাস পর এলিয়টের মাকে লেখা চিঠিতে ভিভিয়েন সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করলেও সাবেক ও বর্তমান বান্ধবীদের কাছে করা মন্তব্যে বৈপরীত্য চোখে পড়ে। প্রথম আলাপে রাসেলের মনে হয়েছে ভিভ অভদ্র। আত্মজীবনীতেও ভিভের নিন্দা করে বলেছেন- সে একজন অভিনেত্রী, কিছুটা অভদ্র, সুবিধাবাদী। অটোলিন মরেলকে লিখেছেন :

ভিভেয়েনের প্রতি এলিয়টের গভীর ও নি:স্বার্থ ভালোবাসা রয়েছে। ভিভিয়েনও স্বামীকে খুব ভালোবাসে। খুব ভক্ত সে স্বামীর। তবে এলিয়টকে গভীরভাবে ভালোবাসলেও স্বামীর প্রতি কখনো কখনো নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে। দস্তেয়ভস্কির উপন্যাসে যেমন দেখা যায় তেমন ধরনের নিষ্ঠুরতা। ঠিক প্রতিদিনের ঘটনা নয়। সে এমন এক নারী যে ছুরি যুগে বাস করছে। হয় সন্ত, নয় অপরাধী হিসেবে এর সমাপ্তি ঘটবে। আমি ঠিক জানি না কোনটা ঘটবে। ভিভের ভেতর দুটো গুণই বিদ্যমান।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close