Home কবিতা জাহানার পারভীন >> পাঁচটি নতুন কবিতা এবং খালেদ উদ-দীনের লেখা ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা

জাহানার পারভীন >> পাঁচটি নতুন কবিতা এবং খালেদ উদ-দীনের লেখা ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা

প্রকাশঃ May 30, 2018

জাহানার পারভীন >> পাঁচটি নতুন কবিতা এবং খালেদ উদ-দীনের লেখা ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা
0
0

জাহানার পারভীন >> পাঁচটি নতুন কবিতা এবং খালেদ উদ-দীনের লেখা ‘স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি’ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা

 

[সম্পাদকীয় নোট : আমাদের কবিতার পাঠকেরা যাদের কবিতাপাঠের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন, জাহানারা পারভীন তাদেরই একজন। জাহানারা পারভীনের লেখা মানেই অন্য রকম কিছু, অন্য রকম ভালোলাগা। আজ তাঁর জন্মদিনে প্রকাশিত হলো তাঁর ৫টি নতুন কবিতা, সেই সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতার বই স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি-র উপর একটি আলোচনা। আলোচনাটি লিখেছেন কবি-সমালোচক-সম্পাদক খালেদ উদ-দীন।  জাহানারা পারভীনকে তীরন্দাজের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।]

 

জাহানারা পারভীন >> পাঁচটি নতুন কবিতা

 
পাখিজন্ম

দেয়ালে কয়লায় আঁকা ছবি

পাখিটা উড়তে শেখে একদিন

খড়কুটো জড়ো করে বাসা বাঁধে ঘুলঘুলিতে,
তা দেয় ডিমে, ডিম ফেটে বের হয় ফুটফুটে ছানা

মা পাখিটা আবার ফিরে যায় দেয়ালে
ক্ষুধার্ত পাখি ছানার চিৎকারে আমার ঘুম আসে না

 

সম্পর্ক

 
হোয়াংহোর তীরে বসে ছিল দুঃখিত চীন
তার পাশে তুমি…

হাতের মুঠোয় লাল মার্বেল
নরম চুলের ভাঁজে ডুবে গেছে সূর্য
পৃথিবীর সেরা সূর্যাস্তের পর আর কোনও কথা থাকে না

অভস্থ হয়ে যাওয়া বিরহকে বলি

গাছ থেকে ছায়া কেটে আনা কাঠুরের কৌশল
কখনও কখনও ব্যর্থ হয়ে যায় কুঠারের কাছে

জীর্ণ বাকল তবু প্রাণপণে ঢেকে রাখে কাঠের সম্ভ্রম…

 

সবুজ মার্বেল

বহুদিন হাতের মুঠো
খুলিনি

কেউ ভেবেছে এখানে একটি সর্ষেদানা আছে
অথবা সুগন্ধী তেজপাতা

হয়তো তুমিও ভেবেছ হাতের মুঠোতে ঘুমিয়ে আছে কোনও অলস পিঁপড়ে

অথচ একটা সবুজ মার্বেল

কোনও এক অলৌকিক বিকেলে যেখানে ভেসে উঠেছিল এক মুখ

হলুদ ক্যানভাসে আঁকা সূর্যমুখী
হয়তো সে ধানখেতে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়ার ভাই
অথবা অভিশপ্ত হাতে জন্ম নেওয়া তিল

কোনও এক নিষ্ঠুর বরফ গলা রাতে যে অদৃশ্য হয়ে যায়…

 

সমীকরণ

 
আবার দেখা হলে সাথে করে নিয়ে যাব দু-চারটি ধাঁধা

বলবো কতটা বরফ বেড়েছে উত্তরে

দক্ষিণে এখনও তীব্র গরম

সীমান্তের দূতাবাসের পাশে গুলি খেয়ে মরে যাওয়া মানুষেরা জানে

দ্রোহ আর দেয়ালে ঠেকা পিঠের বিকল্প থাকে না কোনও।

হয়তো আর মরুকরণের গল্প হবে না
আবার থামিয়ে দেবে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নে

যে প্রশ্নে নিহত হয়েছে অলৌকিক দুপুরে জন্ম নেওয়া নিরীহ শালিখ

 

 

বনভূমির গান

বোকা কবিতারা বোঝাতে পেরেছে কিছু?

ওদের ভাষা, জন্মসাল, নাড়িকাটার মূহূর্ত, শোকসভার দীর্ঘশ্বাস!

ওরা জানে তুমি গাবফুল ভালোবাস
হেমলক সন্ধ্যায় শোনা তোমার দীর্ঘশ্বাস এখনও গেঁথে আছে কানে

লটারির কোনও অক্ষর মেলেনি বলে সঞ্চয়পত্রকে অভিশাপ দিয়েছ যেদিন;
সেদিনই ওরা কপালের ভাজ গুন-গুনে বন থেকে কুড়াতে গেছে কাঠ
কুড়িয়ে এনেছে কাঠুরের ছায়া, পাতার ছাই।

অথচ তুমি এসব দৃশ্য বিশ্বাস করোনি।

 

 

খালেদ উদ-দীন >> মহাকাব্যিক জীবনচরিত স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি > পঠনপাঠন

 

 

অস্তিত্বের যন্ত্রণা থেকে যে তাড়নার সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে শিল্পসত্তা যুক্ত হলে মহৎ কবিতা রচিত হতে পারে। সনাতন জীবনপাঠে বৈচিত্র্য অাছে। অাজও মানুষের অমরতার লোভ ও বিস্ময় কাটেনি। উপভোগে মত্ত কিংবা জিজ্ঞাসু মন চারপাশের দেয়াল টপকাতে চায়।

আত্মা চুরি হওয়া মানুষের শার্টের কলারে জমা মনের ময়লা বেচতে এসেছি ভেজাল শহরে। ঈর্ষার সূঁচে ফুটো হতে হতে বেঁচে যায় নির্বোধ বেলুন। তবু তাকে বলো, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সাথে দেখা হলে যেন বলে পৃথিবীর দূষিত বায়ু আর মানুষের কথা।

দীর্ঘ এক কবিতার বই স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি। চার অধ্যায়ে বিভিক্ত ৮৪ পৃষ্ঠার এই কবিতার বইতে জাহানারা পারভীন এক ঘোরলাগা কাব্যভাষায় শেষ লাইন পর্যন্ত পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রাখেন। এতে অাছে ইতিহাস, মিথ, স্মৃতি, বিরহ ও স্বপ্নকল্পনার বুনন। পারভীন মহাকাব্যিক দ্যোতনায় ‘অামি’-সত্তাকে প্রাচ্যের নানা অনুসঙ্গে, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গেঁথেছেন অাশ্চর্য শব্দমালায়। দীর্ঘকবিতা অনেকটা ক্লাসিকাল মিউজিকের মতোন। হয়তো সবার জন্য নয়। এই ধরনের কবিতার জন্য দরকার প্রস্তুত পাঠক, যিনি আসল স্বাদ আস্বাদনের জন্য দীর্ঘপাঠযাত্রায় নিমগ্ন থাকবার জন্য প্রস্তুত। এই কবিতাবইয়ে যে চিত্রকল্প এঁকেছেন জাহানারা পারভীন, পাঠে-পাঠান্তরে তাতে যেন অাপন সত্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। এবং সেই সত্তার মধ্যে যেন লুকিয়ে অাছে অামাদের শিশুবেলা ও স্বপ্নময় সারাবেলা :

তোমাকে দেখলে নায়াগ্রার কথা মনে হয়। জলপ্রপাতের ওপর ওড়া পাখি রেখে গেছে পায়ের মাপ। ছোট নূপুরের প্রসঙ্গ রেখে কেন যে মাপতে চেয়েছি চীনের প্রাচীরের দৈর্ঘ্য। জানতে চেয়েছি প্রশ্নকর্তার নাম। দর্জিবাড়ির গজ ফিতেয় নিয়েছি মনের মাপ। এসব কথার কোনো মানে হয়, যদি ঠিকঠাক শুনতে না পারো হাতের অাঙুল! বুঝতে না পারো চোখের ভাষা, ছুঁয়ে থাকা হাতের অভিমান। তবুও মেনেছি পৌরহিত্য তোমার। যাজক যেমন মেনে নেয় গির্জার হাসি। নাবিকের লবণাক্ত চোখ স্বীকার করে সমুদ্রের নুন।

ফ্ল্যাপে কবি শামীম রেজা লিখেছেন : ‘

পারিপার্শ্বিক সমাজ বাস্তবতার বাঁক-বদলের মতোই জাহানারা পারভীন নিজেকে পূর্বাপর কাব্যগ্রন্থ থেকে আলাদা করে তাঁর জাত চিনিয়েছেন স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি দীর্ঘ কবিতায়। মহাকাব্যিক দ্যোতনার মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের সঙ্গে আমি সত্তার যে সংশ্লেষ স্থাপনের চেষ্টা, নিজস্ব কাব্যভাষায় তার স্বার্থক উপস্থাপন এই কাব্যগ্রন্থ। বাস্তব-পরাবাস্তব-অধিবাস্তবের মেলবন্ধন স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি কাব্যগ্রন্থটি। প্রতীচ্য ও প্রাচ্যের নানা প্রসঙ্গ অনুষঙ্গের অবতারণার ভিতর থেকেও একবারও ভুলে যাননি কবি, তাঁর আপন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্থানিকতা। এখানেই জাহানারা পারভীনের স্বাতন্ত্র স্পষ্ট।

এই কাব্যগ্রন্থে লক্ষ করা যাবে সেরকমই কিছু অনুষঙ্গ :

জন্মগ্রামে ফেলে এসেছি বিপ্লবী কাস্তের ধার। নাড়িপোঁতা মাটিতে গজানো খেজুরগাছের অধিকার। অামার অভিধানে যত শ্লোক, দুঃখিত বর্ণমালা, কথাসূত্রে কখনো বলিনি। অহল্যার ঘুম ভাঙাতে অাসবে, ভাঙাবে অক্ষরের জেদ, নেই এমন অপেক্ষার তাড়া।

এ যুগে মনস্তাত্ত্বিক ও যন্ত্রকেন্দ্রিক যে বৈপরীত্য সেখানে প্রবল হাহাকার যেমন অাছে, তেমনি সৃজিত হচ্ছে বহুরৈখিক চমক। সময় কখনও নিরাশ করে না। সেই প্রাচীন যুগ থেকে কবিতাই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শেকড়ে। শিল্পের অবয়বে কবিতা হয়ে ওঠে সর্বগমনের শেষপাঠ। বাংলা ভাষা-ভাষী ভূগোলে কবিতা যেখানে শেকড়ের সন্ধান দেয়, সেখানে ভাঙা-গড়া এক চিরায়ত খেলা। এরকম কিছু পঙ্‌ক্তি  :

ধোপাঘর ফেরা শার্ট চিনেছে তোমাকে? সেলাইকলে মাথা পেতে সূঁচের ঘা সয়ে যারা নির্মাণ করেছে পোশাকের মর্যাদা। তাদের ভগ্নাংশ মানুষের সেলাইকরা সম্পর্কের মতো ঠুনকো। সেই সেলাইকন্যা, সেলাইপুত্ররা মেরামত করতে পারেনি ছেঁড়া কপাল।

সেলাইকন্যাদের ছেঁড়া কপাল অার মেরামত হয় না। এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন কেবল বাড়ে। দ্রুত বিভাজিত হতে থাকে অামাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। এ যুগে মানসিক বৈপরীত্য ও অাত্নযন্ত্রণা কখনও কখনও চরম হতাশা নিয়ে অাসে। জাহানারা পারভীন তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন সেই ছবি। কখনও খণ্ড খণ্ডভাবে আবার কখনও ইঙ্গিতে :

তোমার কালাপানি হল যেদিন, শহরের বেড়ালেরা ভোট দিয়েছে দুধ-মার্কায়। সেদিনও মেনেছ সালিসের রায়। কোনো উকিল বলেনি, মাননীয় গুজব, চিলের কাছ থেকে ফিরিয়ে অানা হোক অাহত কান। জানি এমন দিনে উড়িয়ে দিতে নেই ক্ষোভের পায়রা, শুকনো শামুকের খোলে রাখতে নেই নতুন চিড়ে।

[দুই]

যাপিত দ্বন্দ্বে নিরন্তর ছুটে চলা। এখানে ওখানে কেবল কোলাহল, কে অার কবে পেয়েছে খুঁজে অতল শিল্পসমুদ্রের তল। তবু জীবন কখনও থেমে থাকে না। প্রবহমান স্রোতে ভেসে যায় স্বপভেলা :

তালপাতার বাঁশি বাজাতে না পারার অপরাধে পাইনি সিনেমা হলের টিকেট। মায়ের মাটির ব্যাংকে লুকিয়ে রেখেছি চতুর্থ দাবি। তৃতীয় দাবি বাবার পকেটে। দ্বিতীয় বর্ষে পায়ের রক্তপাতে পাওয়া যায়নি মমতার ডেটল। ওষুধের দোকানে ঠেলে এসেছি জুতোর একপাটি। প্রথম বর্ষে শহর থেকে অনেক দূরে সরে গেছে নদী- যেভাবে জীবন থেকে সরে যায় প্রেম। মহাসাগরের জল ধুয়ে দিয়ে গেছে জংধরা উপশহরের পায়ের মরচে। পঞ্চম বর্ষে ধানদূর্বা নিয়ে বরণ করা তোমাকে বসতে দিয়েছে হাতির দাঁতের কারুকাজ করা পিঁড়ি। পিঁড়ির মালিকানা পাওয়ার পর জানতে চাওনি ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে এসেছি কার রোল নম্বর। জন্মদিনে খালি হাতে বাড়ি ফেরা অামি চেয়েছি শুধু এক গ্লাস পবিত্র জল, অাবে-জমজমের।

প্রতিটি চিত্রকল্পে সে এক মায়াবী অালোড়ন। সেপথে কখনও অাবেগ, কখনও প্রকৃতির মায়াবী রূপ তুলে ধরে জাহানারা পারভীন এঁকেছেন কাঙ্ক্ষিত শিল্পচিত্রই। সেরকম কিছু পঙ্‌ক্তি :

মধ্যনদীতে পিঠ দেখানো কালো শুশক সেও? পিঠ দেখিয়েছে বন্ধুরা সব। তবু বন্ধুর চোখের জলে ভাসিয়ে জেদ, অহং, স্বস্তি। এতটুকু তিলের সমান বরাদ্দ মমতার খোঁজে ছুটতে ছুটতে অার ফেরা হয়নি নিজের কাছে। সব প্রস্থান প্রার্থিত নয়। তাই ফিরিয়ে দেয়া হোক শাপলা বিল, পুকুরের যৌবন। মেধাবী ছায়াদেরও চাই। যারা অামাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বালকের পিঠের ঘামাচির সাথে। বিনিময়ে ফিরিয়ে দেব ঝিনুকের বুক থেকে কেড়ে নেয়া মুক্তা।

অামাদের চিরায়ত জীবনের অংশ হয়ে যাওয়া মিথ, ইতিহাস, হাসি-কান্না ও নানাবিধ অপূর্ণতার হাহাকার যেমন অাছে এই কবিতায়, তেমনি প্রবহমান নদীর ছলাৎছল ঢেউয়ের ভাষাও। কবি এই বইতে সুনিপুণভাবে সেলাই করে গেঁথেছেন আমাদের সমগ্র জীবনপ্রণালির এমন এক মালা, যে-মালার প্রতিটি ফুল তুলে অানা হয়েছে হাজার বছরের ভাষাসিঁড়ির এক-একটি ধাপ থেকে। ঘোরলাগা এই কাব্যে পাঠক যেমন নিজেকে খুঁজবে, তেমনি খুঁজে পাবে তার অতীত, বর্তমান, এমনকী ভবিষ্যতও।
জীবনানন্দ দাশ একবার বলেছিলেন, দীর্ঘ কবিতার দিন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তবু আমরা মাঝে মাঝে এমন কিছু দীর্ঘ কবিতা পাই যা আমাদের স্নায়ুকে মোথিত করে নতুন এক অভিজ্ঞানে পৌঁছে দেয়। জাহানারার এই দীর্ঘ কবিতাটি তেমনই এক কবিতা যা আপনাকে ভাবাবে, চিন্তনের গভীরতম প্রদেশে আলোড়ন তুলবে।
অসাধারণ এ কবিতার বইটি পাঠ করবার জন্য পাঠককে স্বাগত জানাই।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close