Home অন্যান্য ব্যক্তিত্ব জাহিদ মুস্তাফা >> অপরাজেয় বাংলার সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ

জাহিদ মুস্তাফা >> অপরাজেয় বাংলার সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ

প্রকাশঃ May 22, 2017

জাহিদ মুস্তাফা >> অপরাজেয় বাংলার সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ
0
1

একেবারে তরুণ বয়সের সৃজন- অপরাজেয় বাংলা তাঁকে দিয়েছে অমরত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে নারী-পুরুষ তিন মুক্তিযোদ্ধার অবয়ব নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সেরা স্মারক- অপরাজেয় বাংলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী শুধু নয়, অগণিত পথচারি যারা হয়তো ঠিক শিল্প বোঝেন না, সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছু ধারণা রাখেন, তাঁরা ওই পথে চলতে চলতে ওই ভাস্কর্যের প্রতি সশ্রদ্ধায় তাকান নি এমন মানুষ বিরল। সবাই হয়তো জানেনওনা এর স্থপতির নাম। তিনি বাংলাদেশের কৃতী ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। গত ২০ মে শনিবার রাত পৌনে বারোটায় ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

খবর পেয়ে ২১ মে রোববার সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে হাজির হলাম। দেশের বরেণ্য চারুশিল্পীরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছেন। দেখলাম একটি অ্যাম্বুলেন্সের কাঁচের দরোজার ভেতরে নিথর শুয়ে আছেন অমর ভাস্কর। দুপুর ১২টার পর তাঁর মরদেহ নেয়া হয় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষকসম্প্রদায় ও শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন সিলেটে। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে এখানেই শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘকাল।

১৯৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের পরিকল্পনায় অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু হয়। সিমেন্ট ও কংক্রিট ঢালাই করে এই ভাস্কর্যটি গড়েন তিনি। শিল্পী তিনটি ফিগর নিয়ে একটি কম্পোজিশন তৈরি করেন। এই তিনজন মুক্তিযোদ্ধার একজন- ফার্স্টএইড বক্স কাঁধে সেবিকা, আরেকজন রাইফেল কাঁধে গ্রীবা উঁচু করে ঋজু ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো গ্রামের তরুণ আর দু’হাতে রাইফেল ধরা এক শহুরে তরুণ। তাঁর মডেল হয়ে শিল্পীকে সহযোগিতা করেন হাসিনা আহমেদ, সৈয়দ হাসান মাকসুদ ও বদরুল আলম বেনু। শেষোক্ত জন মডেল নির্মাণেও খালিদকে বিশেষ সহযোগিতা করেছেন। এমন একটা মহতী ও বড় কাজে অনেক ধরনের সহায়তা লাগে। ডাকসুর তরফ থেকে তৎকালীন সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক ম. হামিদ এই কাজ সম্পাদনে শিল্পীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর মৌলবাদীদের চাপে এই কাজটি থেমে যায়। অসমাপ্ত ভাস্কর্যটি অপসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় মৌলবাদী ছাত্র সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে অপতৎপরতা চালান। এরূপ বিরুদ্ধ এক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে আবার ওই কাজটা শুরু করে ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর এটি শেষ করেন আবদুল্লাহ খালিদ। এইসময় সদ্য নির্বাচিত ডাকসু নেতৃত্ব শিল্পীর কর্মসম্পাদনে এগিয়ে আসেন। ডাকসুর তৎকালীন সামাজিক আপ্যায়ন সম্পাদক আলী রিয়াজ, মিশুক মুনীর, চারুকলার বেশ ক’জন শিক্ষার্থী, যেমন মজিবর রহমান, জুলফিকার লেবু, আলী মোরশেদ নোটন প্রমুখ ভাস্কর খালিদকে নিয়মিত সঙ্গ দিয়েছেন। কাজটির শেষ পর্যায়ে আমরা চারুকলার শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে শাহনেওয়াজ ভবনে ফেরার সময় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ দেখতাম।

একটা ভাস্কর্য সৃষ্টির পেছনে শুধু শিল্পীর কল্পনা কিংবা স্বপ্ন থাকলেই হয় না, সেটিকে বাস্তব রূপ দিতে কঠোর শ্রম দিতে হয়। হাতুড়ি ও ছেনি দিয়ে কী গভীর অভিনিবেশে তিনি কংক্রিট কেটে ঘঁষে নিজের সৃষ্টিকে পূর্ণতা দিতে সচেষ্ট ছিলেন। কাটতে কাটতে বারবার রক্তাক্ত হতো তাঁর হাত। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না পারায় গভীর দুঃখবোধ ছিলো তাঁর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাস্কর খালিদ বলেছেন- দেশের জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দিতে না পারলেও তাঁর দুঃখের কিছুটা উপশম হতো অপরাজেয় বাংলার কাজ করার সময় নিজের রক্তাক্ত দু’টি হাত দেখে।

আবদুল্লাহ খালিদ আরেকটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন চাঁদপুরে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের চিহ্ন সম্বলিত এক হাত নিয়ে এই কাজ। ১৯৭৪ সালে তিনি আরো ক’জন শিল্পীর সঙ্গে বিটিভিতে আবহমান বাংলা নামে ৪৪৭ বর্গফুট আয়তনের ম্যুরাল করেন। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত দ্বিতীয় জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ ভাস্করের পুরস্কার লাভ করেন খালিদ। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ১৯৯৫-৯৬ সময়কালে বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তর ভবনে টেরাকোটা ম্যুরাল করেন বাংলার আর্থসামাজিক বিষয়কে অবলম্বন করে। ১৯৮৭ সালে ভারতের মাদ্রাজে সার্ক দেশসমূহের ট্রাডিশনাল টেরাকোটা কর্মশালায় বাংলাদেশের শিল্পী-প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

এসব কমিশন কাজের পাশাপাশি নিয়মিত ছবি আঁকতেন খালিদ। ঘরের ভেতরে পুষ্পশোভিত ফুলদানির ছবি এঁকেছেন অজস্র, প্রকৃতি নিয়েও নেহাত কম আঁকেন নি। জলরঙে ও অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা ছবি নিয়ে তিনটি একক প্রদর্শনী করেছেন তিনি। বাস্তবানুগ ভাস্কর্যের মতো ছবিও আঁকতেন বাস্তবে দেখা পাওয়া বিষয় নিয়ে। বাংলাদেশ সরকার চলতি বছর তাঁকে একুশে পদক দিয়ে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে।

শিল্পী হিসেবে খালিদ বড় ছিলেন বটে, তবে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আরো অনেক বড়। আজকের অনেক খ্যাতনামা শিল্পীর শিক্ষার্থী জীবনের ব্যয়ভার বহন করেছেন খালিদ। ১৯৮১ সালে শিক্ষাসফরে আমরা কতিপয় সহপাঠী চট্টগ্রামে খালিদ ভাইয়ের বাসায় আকস্মিকভাবে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি ও ভাবী যে আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন তা কখনো ভুলবার নয়। নানা প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে দেখা হতো তাঁর সাথে। স্বল্পভাষী এ মানুষটির সঙ্গে কখনো কখনো কুশল বিনিময় ছাড়াও শিল্পপ্রসঙ্গে কথা হতো। বিটিভিতে আমার কর্মস্থলে তিনি কয়েকবার এসেছেন, প্রতিবার এসে তাঁদের করা ম্যুরাল পরিদর্শন করেছেন।

একবার এলেন মেয়ের বিয়ের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে। আমি অবাক হয়েছিলাম ভিন্ন একটি আমন্ত্রণপত্রে সপরিবারে আমাকে দাওয়াত করায়। তিনি আমাকে ঠিকই মনে রেখেছেন। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠান বলে যেতে পারিনি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে আমার মতো অধমের প্রতি খালিদ ভাইয়ের সস্নেহ ভালোবাসা চিরকাল মনে রাখবো। তিনিও বাংলাদেশের মানুষের কাছে অমর হয়ে থাকবেন তার অপরাজেয় বাংলা-র মতো অনন্য সৃষ্টিকর্মের জন্য। আপনাকে বিদায়ী কুর্নিশ, সৈয়দ আবদুল্লাহ খলিদ।

[পূর্বে প্রকাশিত লেখাটির ঈষৎ পরিবর্তিত সংস্করণ]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. “শিল্পী ও ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ অপরাজেয় বাংলা ও বাংলাদেশের সঙ্গেই বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।”
    –জাহিদ মুস্তাফা।
    অনেক সুন্দর ও তথ্যসমৃদ্ধ স্ট্যাটাস! শ্রদ্ধেয় অমর ভাস্কর ‘সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ’-এঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা! লেখককে অশেষ ধন্যবাদ; অফুরন্ত শুভেচ্ছা তীরন্দাজের জন্য!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close