Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আখ্যান জীবিত ও মৃতদের সাথে মিল আছে গল্পের > আখ্যান >> অপরাহ্ণ সুসমিতো

জীবিত ও মৃতদের সাথে মিল আছে গল্পের > আখ্যান >> অপরাহ্ণ সুসমিতো

প্রকাশঃ June 24, 2017

জীবিত ও মৃতদের সাথে মিল আছে গল্পের > আখ্যান >> অপরাহ্ণ সুসমিতো
0
0

জীবিত মৃতদের সাথে মিল আছে গল্পের

১.

আমার মৃত্যু সংবাদ লিখছি। খটাখট টাইপ করছি। নামের বানান লিখতে গিয়ে উত্তেজনায় অপরাহ্ন লিখে ফেলছি যেমন অধিকাংশ বন্ধুজন লেখেন। আবার টাইপ করতে গিয়ে নিজের কাছেই দ্বন্দ্ব হচ্ছে। কম্পিউটারে বানান ভুলে সমস্যা নেই, মুহূর্তে ঠিক করতে পারছি।

অগ্রিম দেখতে পাচ্ছি নূরজাহান চক্রবর্তী লাইক দিচ্ছেন। জাহ্নবী মাসী সংক্ষেপে আরআইপি লিখছেন। যে সূচালু আহমেদের কাছে ১৪৩০০ টাকা পেতাম, তিনি সবচেয়ে বড় কমেন্ট লিখছেন বিনিয়ে ইনিয়ে। মধু ভাই এখনো জানেন না। উনি প্রতি মাসের ২৮ তারিখ বেতন পান,সেদিন ফেসবুকে লগইন করেন। উনি খুব কষ্ট পাবেন ভাবতেই একটা কষ্ট কাবেরী নদীর মতো তিরতির করল বুকের হিমালয় পাদদেশে।

আমি যে মন্ত্রণালয়ে কাজ করি,সেখানে বেশুমার ঘুষ। সহকর্মীরা চটজলদি চাঁদা দিতে শুরু করেন স্মরণ সভার। ঘুষখোর লোকজন খুব উদার হয় এরকম দান খয়রাতে। বেতনের টাকায় গয়া কাশী যায়,হজ্ব করে আর ঘুষের টাকায় বউকে বাদামী ব্রা কিনে দেয়। ফেসিয়াল করে,এবেনটি বায়স্কোপ করে।

আমার ড: যে হাসপাতালে কাজ করেন সেখানে ৮০% কর্মকর্তা কর্মচারী পরষ্পর প্রেম করেন। ড: আমার ডেথ সার্টিফিকেট খসখস লিখতে লিখতে খিকখিক হাসেন;

: প্রেমের আবার প্রথম শেষ কি?

সামরান হুদা মাথা নিচু করে গল্প লিখছেন পাতার পর পাতা। মনটা নবাবগঞ্জের আমের মতো টুপলু হয়ে আছে; আহা সামরানের লেখা আর পড়ব না। মৃত্যুর পরেও আমার ইমেইল একই পাসওয়ার্ড থাকবে। খনাকে কি পাসওয়ার্ড দিয়ে যাব? সে আমার হয়ে জবাব দিবে।

খনা ছলছল কাঁদতে কাঁদতে বলবে;

: এই আমি মানসকন্যা, কতো মানুষ স্বপ্নে নদীর ছবি আঁকে। তুমি এঁকেছিলে ছায়ায় ছায়ায় আমাকে। দাও রক্ত দাও এক প্রভু জীবন।
হাঁটতে হাঁটতে পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, বাসার চাবির রিং, ফোনে অণু টেক্সট। তুমি ঘরে ফিরছো। কচুর লতি দিয়ে হাপুস হুপুস ভাত খাচ্ছো। খাবার সময় কাউকে সুন্দর লাগে না কেবল ছোট দুধের শিশু ছাড়া।

মৃত্তিকা নতুন ছবি পোস্ট করেছে। এতো মুটিয়েছে তবুও শরণার্থী ভক্তের থকথকে দল কমেন্টের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। এতো কবি আমাদের বাংলা ভাষায়। টেলিভিশনে কবিতা, গুলিস্তানে কবিতা, রিক্সায় জড়াজড়ি কবিতা, আওয়ামী বিএনপি কবিতা, ফালতু কবিতা, নমোশুদ্র কবিতা, সৈয়দ কবিতা…

এইসব পাঠ করে করেই নিজস্ব মৃত্যুর নোট লিখছি…

আহা..

২.

আমাদের বাসায় একটা ছোট্ট বিড়াল আছে। বিড়ালটার নাম নোকিয়া। পাশের বাসায় একজন মন্ত্রী থাকেন। মন্ত্রী সাহেবের মেয়েরও একটা গাটুসগুটুস বিড়াল আছে। ওমা বিড়ালটার নাম মাইক্রোসফট।

তো একদিন আমাদের বিড়ালটাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ খোঁজ। খোঁজ দ্য সার্চ। পরে দেখি আমাদের নোকিয়া মাইক্রোসফটের সাথে ঘুরঘুর করছে। জানা গেল যে মন্ত্রী সাহেবের মেয়ের মাইক্রোসফট আমাদের নোকিয়াকে বিয়ে করছে।

কী আর করা। মন খারাপ করে রইলাম।

(পাদটীকা : মন্ত্রীসাহেব আজকে চিরকুট পাঠিয়েছেন। বউভাতের নিমন্ত্রণ)

৩.

আজ বিকেলে বাসায় ঢুকতেই দেখি জানালার কাছে একটা সুন্দর পাখি। কী সুন্দর লেজ। ঠোঁটটা একদম রাঙামাটির মতো সুন্দর। পাখিটা দেখেই আমার মন ভালো হয়ে গেল। ঠোঁট গোল করে শিস দিয়ে উঠলাম। আশ্চর্য,পাখিটাও দেখি শিস দিচ্ছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

পাখিটাকে বললাম;

: কিরে সুন্দরটা,নাম কি?

: ইয়াহু

: ইয়াহু?

আমি হো হো করে হেসে দিলাম।

: তো বাবজী কোত্থেকে?

: আমেরিকা থেকে

: সে তো বুঝেছি, পাছা দেখে বুঝেছি। আমেরিকানদের পাছা ভারী

পাখিটা বিমর্ষ হলো। মুখ ঘুরিয়ে বলল;

: ছি আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? কানাডার লোকজন খুব ভদ্র হয় বলে জানি।

: দু:খিত। আন্তরিক দু:খিত। তাছাড়া আপনি তো অতিথি পাখি।

পাখিটা খানিকটা উজ্জল হলো। দেবব্রতের মতো একটা সুর ধরলো।

বললাম ;

: বাইরে কেন ? ভিতরে আসুন,প্লিজ।

টুপ করে এক লাফে জানালা থেকে আমার সোফায়। সোফাটা যেন বাগদাদ বা কাবুল।

ইয়াহুর পা-টা খানিকটা নোংরা হলেও ভদ্রতা করে আর কিছু বললাম না। হুমায়ূন ফরিদীর মতো স্মার্টলি বললাম;

: কিছু খাবেন? বেলের শরবত বা হালিম?

: জ্বি না। জিমেইল খাব।

: হোয়াট? মানে কি? বুঝিনি।

আমি বোকার মতো ইয়াহুর সুন্দর ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইলাম।  ও বলল;

: জানেন গুগল আমাকে কিনে ফেলতে চাইছে। সাহস কতো! এই জন্যই জিমেইলকে খুঁটিয়ে খাবো।

ইয়াহু রাগে কাঁপতে লাগল। আমি আর কিছু বললাম না। থাক। আমি আদার ব্যাপারী মানুষ। মার্কিনী মুলুকের বড় পুঁজি ছোট পুঁজি’র বিষয়।

উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। না জানি বেদন, না জানি রোদন। আমার মতো কে আছে আর! বাইরের মন্ট্রিয়ল আজ ভালোবাসার মতো সুন্দর।

৪.

আমার এক বান্ধবী মেলবোর্ন থাকে। মাঝে মাঝে কথা হয়। ওর ভালো নাম মোসাম্মত রুদাবা খাতুন। ডাক নাম রসুন। বেশ মেধাবী। ও বাম হাতে সব কাজ করে। ছোটবেলা ওর মা ওকে খুব পিটিয়েছে এই বামহাতি বলে। কাজ হয়নি। আমি ওকে গতকাল বললাম;

: আচ্ছা রসুন তুই তো বাম হাতে সব কাজ করিস, ডান হাতে কি করিস?
: চাকু ধরি

শুনে ভয় পেলাম।

৫.

ফেসবুকে আমার একজন গুনী বন্ধু আছেন প্রায়ই লুঙ্গি পরে ছবি পোস্ট দেন। বন্ধুটার একটা মিষ্টি মেয়ে আছে ৪ বছর। বাপ মেয়ে ছবিতে সারক্ষণ হাসি হাসি। আমি একদিন বললাম;

: ভাইজান এই যে এয়ার কন্ডিশন পরে ছবি দেন,ভালো কথা। মাঝে মাঝে প্যান্ট পরা ছবি দিতে পারেন তো। মেয়ে বড় হলে তো মুশকিলে পড়বে। সবাই বলবে বৃহস্পতি’র বাবা একটা ক্ষ্যাত (মেয়ে বৃহস্পতিবারে জন্মেছে বলে নাম রেখেছে বৃহস্পতি)।

আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বন্ধুটি ছবি পোস্ট করেছে। কী সুন্দর ঝকঝকে ছবি। প্যান্ট পরা স্মার্ট ছবি। আচমকা খেয়াল করি পিচ্চি কিউট বৃহস্পতি লুঙ্গি পরে আছে।

৬.

আমার নানা আবার বিয়ে করবেন। বাসায় মামা খালা সবাই প্রচন্ড আপসেট। বরযাত্রায় লোক পাওয়া গেল না। নানা আমাকে বললেন;

: লিচু, তোর মুসলমানির সময় তোকে কতো সোনাদানা দিয়েছি। এখন আমার পবিত্র কাজে আমার সাথে চল।

আমি মহা আনন্দে রাজি হলাম। বিয়ে হলো ধুমধাম। নতুন নানীজানের আগের পক্ষে একটা মেয়ে আছে। সরলা নাম। এবারের বই মেলায় তার ৮টা কবিতার বই বেরুবে।

সরলা আবার আমার ফেসবুক বন্ধু হলেন। আজ দেখলাম তার স্ট্যাটাসে বইগুলোর সারি সারি প্রচ্ছদের ছবি। কী সুন্দর। আমি দৌঁড়ে মন্তব্য করলাম;
: খালামনি অভিনন্দন।

কমেন্টটা আবার আমার বড়বোন দেখে ফেলেছে। সাথে সাথে আমাকে ইনবক্স।
: দাঁড়া, খালামনি বলা বের করছি। বাসায় আয় আজ …

খালামনি ডেকে কাউকে এই প্রথম বাসায় যেতে ভয় পাচ্ছি।

৭.

পাড়া ঘুমালো ফেসবুক ঘুমালো
স্ট্যাটাস দিয়েছি
তোমার বিশ্রী ছবিতে লাইক দিয়ে

কমেন্টও দিয়েছি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close