Home আমার বইমেলা জুনান নাশিত / আমার বইমেলা

জুনান নাশিত / আমার বইমেলা

প্রকাশঃ February 27, 2017

জুনান নাশিত / আমার বইমেলা
0
0

“…বহেড়া তলার এখনকার লিটল ম্যাগ চত্বরে বসেই বইটি নিজেই বিক্রি করেছি। বিক্রিও হয়েছিল বেশ। বিক্রির পাশাপাশি ছিল তীব্র প্রাণময় আড্ডা। তখন প্রতি লিটলম্যাগ ধরে ধরে আলাদা স্টল ছিল না। বহেড়া তলাকে ঘিরেই মূল স্টল ছিল। বাকি জায়গাটা ছিল ফাঁকা। সেখানে বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে চলতো আড্ডা। অনেক সময়ই এমন হয়েছে মেলা বন্ধের হুইসেল বাজছে, বহেড়া তলায় আমাদের সে আড্ডা যেন আর শেষই হতে চাচ্ছে না। একে একে লাইট নিভিয়ে দেয়া হচ্ছে। অগত্যা ইচ্ছে না থাকলেও পরের দিন দেখা হওয়ার আশা নিয়ে মেলা ছেড়েছি।”

 

জুনান নাশিত / আমার বইমেলা

 

বইমেলা মানেই আনন্দের শিহরণ। বইমেলা মানেই রক্ত ছলকে ওঠা। টিপটিপে আনন্দের রেশ মগজ থেকে সারা অস্তিত্বে ছড়িয়ে পড়া। বইয়ের সান্নিধ্যের পাশাপাশি প্রিয় লেখক ও লেখক বন্ধুদের পাশে পাওয়া। ভালোলাগায় বুঁদ হওয়া। বইমেলা মানেই আড্ডার আনন্দে টগোবগো হওয়া, অনর্থক ও অফুরান কথায় শূন্য মুহূর্তকে ভরিয়ে তোলা।

তো এই বইমেলার অভিজ্ঞতা দুভাগে ভাগ করেই আমাকে বলতে হচ্ছে। নিয়মিত লিখতে শুরুর আগে ছিল একরকম অভিজ্ঞতা।  লেখাপ্রকাশ ও বইপ্রকাশের পর থেকে সে অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি হয়েছে নি:সন্দেহে ভিন্ন। বইপ্রকাশের আগে যখন মেলায় যেতাম শতশত লোকের ভীড়ে নিজের দু’একজন কাছের কেউ অথবা সহপাঠীদের নিয়ে মেলায় ঘুরতাম, পছন্দের বই কিনতাম। দূর থেকে  প্রিয় লেখককে কিছুটা শ্রদ্ধা মেশানো আবেগের দৃষ্টিতে দেখতাম। ভেতরে ভেতরে আপ্লুত হতাম। কিন্তু কাছে ভেড়ার ইচ্ছে হতো না। বেছে বেছে বই কেনার আনন্দ ছিল অতুলনীয়। খুব ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সান্নিধ্যে ছিলাম, বইকেই আপন ভেবে বড়ো হয়েছি। তাই বইয়ের সঙ্গ আগাগোড়াই আমার কাছে লোভনীয়। আর বইমেলা সে লোভের সংসারে কেবল আগুনই জ্বালাতো না, তা নিবারণও করতো। সেই অর্থে লেখা প্রকাশ শুরুর আগেও বইমেলা নিয়ে আগ্রহের কমতি কোনদিক থেকেই ছিল না। আজো যেমন নেই।

লেখা প্রকাশ শুরুর পর বইমেলায় যাওয়ার অনুভূতিতে ভিন্নতা এসেছে।  এই ভিন্ন অনুভূতির বয়সও প্রায় আড়াই দশক। লেখা প্রকাশ শুরুর পর ভেতরে ভেতরে নিজেই নিজের আইডেনটিটি তৈরির বিষয়ে আস্থাশীল হয়েছি। মনে হয়েছে আমিও নিজেও মেলার একটা অংশ। একধরনের অংশীদারিত্বের বোধ তৈরি হয়েছে। এছাড়া তত দিনে স্বসময়ের লেখককুলসহ অগ্রজ অনুজ লেখকদের সাথেও তৈরি হয়েছে আন্তরিক এক বন্ধন। এর ফলে বইমেলায় বই কেনা ও ঘোরাঘুরির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে তীব্র তুমুল আড্ডা, যা ছিল মেলার মূল চৌম্বকীয় অংশ। লাগামছাড়া সেসব আড্ডার স্মৃতি সত্যিই মোহনীয়। বিশেষ করে আমার প্রথম বই ‘কুমারী পাথর’ বের হওয়ার বছরের কথা কখনই ভোলার না।

২০০১ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। স্বরব্যঞ্জন বইটি প্রকাশ করে। স্টলে থেকেছি খুব কম সময়ই। বহেড়া তলার এখনকার লিটল ম্যাগ চত্বরে বসেই বইটি নিজেই বিক্রি করেছি। বিক্রিও হয়েছিল বেশ। বিক্রির পাশাপাশি ছিল তীব্র প্রাণময় আড্ডা। তখন প্রতি লিটলম্যাগ ধরে ধরে আলাদা স্টল ছিল না। বহেড়া তলাকে ঘিরেই মূল স্টল ছিল। বাকি জায়গাটা ছিল ফাঁকা। সেখানে বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে চলতো আড্ডা। অনেক সময়ই এমন হয়েছে মেলা বন্ধের হুইসেল বাজছে, বহেড়া তলায় আমাদের সে আড্ডা যেন আর শেষই হতে চাচ্ছে না। একে একে লাইট নিভিয়ে দেয়া হচ্ছে। অগত্যা ইচ্ছে না থাকলেও পরের দিন দেখা হওয়ার আশা নিয়ে মেলা ছেড়েছি।

বইমেলায় হাঁটাটাও খুব ভালো লাগতো। পুকুড়ের পাড় ধরে পুরো মেলাটা কয়েকজন মিলে চক্কর দেয়াটাও ছিল খুব আনন্দের। বহেড়া তলা থেকে শুরু করে আবার বহেড়া তলায় ফিরে আসা। তখন মোড়ক উন্মোচনের এতো হিড়িক ছিল না। লেখক-অলেখকে ঠাসা আজকের মেলার মতো হঠকারিতা আর চাটুকারিতাও বোধহয় কিছু কম ছিল।

এখনও আমার কাছে মেলার অন্যতম মূল আকর্ষণ সেই আড্ডা। কিন্তু হায়, নানা বাস্তবতায় সময়ের রঙ পাল্টে যায়। আমরাও সময়ের সিঁড়ি পাড়ি দিয়ে চলে এসেছি অনেক দূর। তাই তীব্র তুমুল আড্ডা এখন স্মৃতির দোলনা হয়ে গেছে। যে কেবল মাঝে মাঝে কষ্টের দোলনায় দোলায়।

বইমেলায় এখনও যাই। অনেক সুহৃদ লেখক, প্রকাশক ও কবিবন্ধুর সাথে দেখাও হয়। কুশল বিনিময় হয়। আড্ডাও হয়। কিন্তু তুমুল সেই আড্ডার প্রাণময়তা কি আছে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি। মন বলে আছে, এখনও আছে। কারণ বই যেখানে মূল আকর্ষক সেখানে আকর্ষণের ঘাটতি হওয়ার কোন কারণই নেই। তাই বইমেলা প্রাণ, বইমেলা সেই জায়গা যেখানে সকল ব্যস্ততাকে ঝেড়ে ফেলে অন্ধ মোহের বশে ছুটে যাওয়া যায়।

জুনান নাশিত : কবি, সাংবাদিক।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close