Home অনুবাদ জেমস টেট > ‘মিথ্যের পাঠ্যপুস্তক’ থেকে আরো ১৩টি গদ্যকবিতা >> ভাষান্তর : রনক জামান

জেমস টেট > ‘মিথ্যের পাঠ্যপুস্তক’ থেকে আরো ১৩টি গদ্যকবিতা >> ভাষান্তর : রনক জামান

প্রকাশঃ August 23, 2017

জেমস টেট > ‘মিথ্যের পাঠ্যপুস্তক’ থেকে আরো ১৩টি গদ্যকবিতা >> ভাষান্তর : রনক জামান
0
1

সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতা [পর্ব ৩]

জেমস টেট > মিথ্যের পাঠ্যপুস্তক থেকে ১৩টি গদ্যকবিতা

ভূমিকা

জেমস টেট। পুরো নাম জেমস ভিনসেন্ট টেট। মার্কিন কবি।ইতিপূর্বে তীরন্দাজে তাঁর ১২টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। এবার প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর আরও ১৩টি নতুন কবিতা।

টেট জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালে কানসাস সিটিতে। স্থানীয় কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং Iowa Writers’ Workshop থেকে MFA ডিগ্রি। আমেরিকান সমকালীন গদ্যকবিতার অন্যতম পথিকৃৎ জেমস টেট। বিশটির বেশি কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে আছে The Ghost Soldiers (2008); Worshipful Company of Fletchers (1994)। শেষ বইটির জন্য ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড পেয়েছেন। Selected Poems (1991) তাকে কবিতায় পুলিৎজার পুরষ্কার এনে দেয়। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে Distance from Loved Ones (1990); Constant Defender (1983); Viper Jazz (1976); এবং The Oblivion Ha-Ha (1970)। এছাড়াও আরো কিছু পুরষ্কার জয়ের পাশাপাশি তাকে Academy of American Poets-এর চ্যান্সেলরশিপে ভূষিত করা হয়। ২০১৫ সালে এই কবি মৃত্যুবরণ করেন।

তার প্রথম কবিতা গ্রন্থ ছিল The Lost Pilot (1967), গ্রন্থ শিরোনামের কবিতাটি উৎসর্গ করেছিলেন তার বাবাকে। বাবা পাইলট ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমানে বোমার আঘাতে তিনি নিহত হন। টেটের বয়স তখন মাত্র পাঁচ মাস।

জেমস টেট সমকালীন মার্কিন গদ্যকবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করে গেছেন। তার কবিতার চরিত্রায়ন, হিউমার সেন্স নিজস্ব ভঙ্গিমায় উপস্থাপনের পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে আরো অনেকগুলো দিক উঠে আসে; যেমন- বিরহ, কৌতুক, অ্যাবসার্ডিটি, কারুণ্য, আশাবাদ, একাকীত্ব আর স্যুররিয়ালিজম। টেটের কবিতায় বিশেষ দিক হচ্ছে, তিনি কবিতায় একইসাথে এগুলি অবলীলাক্রমে মিশিয়ে দিয়ে তাকে কবিতা করে তুলতে পেরেছেন।

প্যারি রিভিউতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, “পাঠককে লেখার গভীরে প্রবেশ করাতে পারার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে। আমি আমার মজার কবিতাগুলোও ভালোবাসি, কিন্তু একইসাথে পাঠকের হৃদয়ে ব্যথাও জাগাতে চাই। আর একাজটা যদি একসাথে করা যায়, তবে সেটাই উৎকৃষ্টতম। কোনো কবিতা পড়তে পড়তে আপনি হাসবেন, কিন্তু শেষে গিয়ে আপনার দুঃখ জাগবে, কান্না জাগবে। একইভাবে কোনো কবিতার করুণ দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে একটা দুর্দশার মুখোমুখি হতে হবে। সে অবস্থায় হঠাৎ ব্যাঙ্গাত্মক রসবোধ আপনাকে হাসাবে, আনন্দ দেবে, একইসাথে আফসোস জাগাবে, অর্থাৎ আপনার হৃদয়ে গিয়ে বাজবে। এই ব্যাপারটিই সেরা।”

তার কবিতার চরিত্রগুলো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও নিজের খেয়াল চাপানোর ব্যাপারটি লক্ষ্য করা যায়। চরিত্রগুলোর বর্ণনায় গিয়ে তিনি ক্লিশে করে ফেলেননি। অথচ চরিত্রগুলোকে পাঠকের খুব পরিচিত কেউ বলেই মনে হয়ে উঠবে শেষমেশ। চরিত্র স্পষ্ট হতে থাকে তাদের কথায়, যাপনে বা ঘটনার প্রবাহে, চরিত্রের স্বাভাবিক প্রয়োজনে। ফলে চরিত্রকে আলাদা করে সাজানোর প্রয়োজন হয়নি।

‘এরকমই হয়’ শিরোনামের কবিতা লক্ষ্য করলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে আরো। কবিতাটিতে আমরা একটা ছাগল দেখতে পাই, যার সাথে অন্য কোনো ছাগলের বিশেষ তফাৎ নেই, সাদামাটা এক ছাগল। কিন্তু সে কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ, তার এই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা প্রকাশ পায় শহরজুড়ে তার অস্তিত্বের প্রভাবে। এই প্রভাব স্বাভাবিক, অতিরঞ্জিত নয়। জেমস টেট সেই স্বাভাবিক প্রভাবকেই কৌতুকদীপ্ত করে উপস্থাপন করেছেন। ‘নিখুঁত লক্ষ্যভেদ’ নামক কবিতাতেও অদ্ভুত খেয়াল দেখতে পাই। যেখানে বাড়ির উপর এসে বোমা পড়ে, বাড়ির মালিক ভ্যাবাকান্ত হয়ে বলে, “এই সরকারকেই আমি ভোট  দিয়েছিলাম। তাদের তো আমার বাড়িটাকে উড়াবার কথা না।” পরিস্থিতি অনুযায়ী কথাটি উদ্ভট, কিন্তু অযৌক্তিক নয়। এখানেই টেটের হিউমার সেন্সের দক্ষতা, যে-দক্ষতা তাকে মার্কিন কবিদের মধ্যে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দেয়। 

জেমস টেট-এর আরো ১৩টি গদ্যকবিতা 

উঠোনের তারে

মিলি, উঠোনের তারে তুমি ভেজা জামা রৌদ্রে শুকাও। আমি জানালায় বসে তাই দেখতে থাকি। দৃশ্যটা এত ভালো লাগে! সহস্র উপায়ে আমি ভালোবাসি ওকে এবং ওর ধবধবে জামা, তাতে ওই বাতাসের দোল। যেন অনন্তকালীন, যেন নতুন সূচনা, যেন আগামীকালের এক প্রতিশ্রুতি। আহ, ওই ক্লিপগুলো! আমি ওই ক্লিপগুলো বড় ভালোবাসি। আরো ক্লিপ জমা করে রাখাও জরুরি; কেননা কে জানে কবে বন্ধ হয় যদি ক্লিপ তৈরি? …আমি চিত্রকর হলে চিন্তা ছিল না, মিলির ঐ ভেজা জামা মেলবার দৃশ্যটা এঁকে রাখতাম। আমার সে চিত্রটি ভালো লাগতো, অথবা সংগোপনে বেদনা জাগাতো। কেননা, জানি না আমি, তখন ওর মনে কোন্‌ ভাবনার ভিড়! ছোট বা বড়, নাকি ভাবনাবিহীন? ওর মাথার ওপরে ঐ চিল উড়ছে, সে কি দেখতে পাচ্ছে তা? ধোয়া কাপড়চোপড় তারে শুকাতে দেয়া, ওর অপছন্দ? ও কি পালাতে চাইছে কোনো নাবিকের সাথে? কোনো প্রাচীন জাহাজে, আর ভেজা জামাগুলো সব সমুদ্র-ঢেউয়ের মতো তরঙ্গায়িত। বিদায়ী পতাকার মতো ঐ মোজাগুলো পতপত ওড়ে। মিলি, ও মিলি, আমাকে কি ভুলে যাচ্ছো? আমি সেই নাবিক তোমার, প্রচণ্ড ঝড়ের কবলেও যে তোমাকে ভালোবাসবে।

কাঠের পা-ওয়ালা লোকটির জেল পলায়ন

লোকটির এক পা কাঠের তৈরি। এ অবস্থাতেই সে জেল ভেঙে পালায় একদিন।

ধরাও পড়ে যায়। আর তখন তার কাঠের পা’টা ছিনিয়ে নেয় ওরা। প্রতিদিন

লোকটির পেরুবার ছিল একটা করে পাহাড়, একটা করে প্রশস্ত নদী; তবেই সে

পৌঁছে যাবে তার কাঙ্ক্ষিত শস্যভূমিতে। যেখানে সমস্তদিন তাকে কাজ করতে

হবে মাত্র একটি পায়ে। এভাবে কেটে গেল বছরখানেক। ক্রিসমাস পার্টিতে ওরা

সেই কাঠের পা’টা ফেরত দিয়ে গেল। কিন্তু তখন আর এটা তার দরকার নেই।

কেননা তার পলায়ন ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। যার জন্য দরকার ছিল- ওই একটিই পা।

 

একটি আত্মজীবনীর ছিন্ন পাতা

শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে, এক বন্ধু’র খামারের আইল ধরে হাঁটছি আমি।

আজ, দিনটাকে তোমার জন্যই সাজিয়েছিলাম। হাঁটা থামিয়ে বললাম, বিশ্বাস করবে না হয়তো, শৈশবে কত সুখী ছিলাম আমি।

উদ্দাম বাতাসে, গাছের ডালপালা মুখের উপর ঠেকছে, আর আমি ভাবছি এই পথ ধরে বাড়ি ফেরার কথা।

আর তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের ভণিতা করছি একাকী। ছুঁয়ে দিচ্ছি চাঁদের ঐ কমলারঙের আঙুল।

গতরাত্রিতে, পুরনো দিনের স্মৃতি মৃদু পায়ে ফিরে এসেছিল।

ফজর পর্যন্ত খুব রাম গেলা হলো। রাতটি সফল ছিল, বেদনা জাগাতে পারেনি।

ঘুম ভেঙে উঠে দেখি দুপুর গড়িয়ে গেছে; আকাশে উড়ছে ঐ প্রকৃত সারস।

আমার বুদ্ধিশুদ্ধি পুরনো ন্যাকরার মতো, অথচ দ্যাখো, আমাকে ঠিকই ভালোবাসছে, আমার প্রেমিকা।

‘কপাল তোমার,’ বলতে তুমি। ওকে ‘পুতুল’ বলেই ডাকতে, আর আমাকে, মদনকুমার।

আমার এই অহিংস্র থাবার মাঝে নিজেরই পুরনো মাথা। ভেতরে জন্মদিনের উৎসব। বয়স কত হলো আমার, বলতে পারো?

সতেরো? সত্যিই ‘সতেরো’ ভাবছো তুমি? তা ভাবতে পারো! আমরা আমরাই যেহেতু। এখন কী করছি জানো?

ডাকছি, মাঠের গরুগুলোকে গোয়ালে ফেরার জন্য। ফিরেও আসছে ওরা।

আমি ভূমির কাছাকাছি আনতভঙ্গিতে বসছি, একরাশ খালাতো-মামাতো-ফুপাতো-চাচাতো চুম্বন বয়ে গেল আমার হাতে আর ঠোঁটের মাঝে

…তোমাকে এখনো মনে রেখেছি আমি, এটুকুই বলার ছিল; বিদায়, ভালো থেকো। এইতো ভালো আছি, গরুগুলো গোয়ালে ফিরেছে।

 

অমীমাংসা

ভালোবাসা এতটা গুরুত্বের দাবি রাখে না। বরং আমার ক্ষেত্রে তা পুরোটাই অনুশোচনা। আরকানশাস, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আছি, নক্ষত্র ঝরে পড়ছে আমাদের চোখের ভেতর। এক হাত দিয়ে আমি আকাশ সাজাই, চাঁদটাকে ফুটো করে ছেড়ে দিই হাওয়া। আর চুপসে যেতে থাকা বেলুনের মতো চাঁদ, ছুটতে ছুটতে গিয়ে সমুদ্রে পতিত হয়। তুমি কাঁদতে জানো না। আমিও এমন কিছুই পারি না, যা এক ছটাকও অর্থবহুল ছিল আগে। এসো, তোমাকে পাইনের কাঁটা দিয়ে আবৃত করে দিই। কখনো সকাল হলে, আমাদের শরীরের চারপাশে মন্দির গড়ে তুলব। ঝিঁঝিঁপোকা হাঁটু মুড়ে গান করবে। প্রতিরাতে বেদনা জাগাতে আসবে। কেননা, ওরাও একদিন ভুলে যাবে প্রাণখুলে গান গাইতে।

নিযুক্ত শ্রমিকদল

কাজটির জন্য পর্যাপ্ত বলদ কি আছে তোমাদের?

আজ্ঞে না, ঘাটতি আছে।

বেশ, কাজটি ঠিকঠাকমতো করতে আর কতগুলো বলদ দরকার?

আরো দশটির মতো, স্যার।

দেখি তোমাদের জন্য কী ব্যবস্থা করতে পারি!

আজ্ঞে, স্যারের দয়া।

অবশ্যই আমার দয়া! আর হ্যাঁ, লোকদের খাবারের জন্য কি মাছের কাবাব আছে পর্যাপ্ত?

আজ্ঞে না, ঘাটতি আছে। পঞ্চাশজনের জন্য মজুদ রয়েছে, আরো লাগবে।

ঠিক আছে, আমি পরদিন পাঠিয়ে দেব। তোমাদের কি মানচিত্র দরকার? পর্বতগুলোর আর মাটির তলার?

পর্বতগুলোর মানচিত্র আছে আমাদের, কিন্তু স্যার, মাটির তলার মানচিত্রের ঘাটতি আছে।

অবশ্যই ঘাটতি আছে। কারণ মাটির তলার কোনো মানচিত্রই নেই। তাছাড়া, তোমরা ওখানে যেতে রাজি হবে না। খুব গুমোট জায়গা।

সেখানে যাবার কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। মূলত এ কাজের জন্য অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা আমাদের নেই। আপনার প্রশ্নের সাপেক্ষে আমি জবাব দিয়েছি, স্যার। আপনিই বলেছেন, মানচিত্র লাগবে কিনা!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমারই তো ভুল। আমি সব মানচিত্র লুটে নিয়েছি। বলো, আর কী কী দরকার তোমাদের?

শস্যবীজ দরকার, লাঙল দরকার, কাস্তে দরকার, মুরগি, শুয়োর, গাভী, ঝুড়ি আর কিছু মেয়েমানুষ দরকার।

মেয়েমানুষ?

আজ্ঞে স্যার, মেয়েমানুষ। আমাদের কাছে কোনো মেয়েমানুষ নেই।

অতি দুঃখের কথা।

আজ্ঞে, আমরা দুঃখী।

কিন্তু তোমাদেরকে কোনো মেয়েমানুষ দিতে পারব না আমি।

আমরাও তাই ধরে নিয়েছি, স্যার।

তাহলে? মেয়েমানুষ ছাড়া তোমরা করবেটা কী?

ভুগব, স্যার। তারপর এই অভাব নিয়েই একে একে মারা যাবো আমরা।

তোমাদের মাঝে কেউ গান গাইতে পারে?

জি স্যার, আমাদের মাঝে অনেকেই চমৎকার গান গাইতে পারে।

তাদেরকে নির্দেশ দাও যেন গান গাওয়া শুরু করে দেয়। তাহলে তোমাদেরই হয়ত খুঁজে নেবে কোনো যুবতীরা, নয়তো তোমরা গান গাইতে গাইতে শান্তিতেই মরতে পারবে। আর এরমাঝে তোমরা নিজেদের কাজগুলো সেরে নিও ঠিকঠাক।

আজ্ঞে স্যার, যুবতী না পাওয়া পর্যন্ত আমরা আপ্রাণ কাজ করে যাবো।

 

রাত্রির চিত্রকর     

এক ভদ্রমহিলা, মাঝরাতে থানায় ফোন করে রিপোর্ট করলেন, তিনি এক লোককে দেখেছেন, পুকুরের ওইপারে রঙ করছিল। ঘটনা তদন্ত করতে পুলিশের গাড়ি চলে আসে। দুজন অফিসার ফ্ল্যাশলাইট হাতে করে পুকুরের চারপাশ হেঁটে দেখল। সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেল না। জুনিয়র অফিসার হ্যাচার, জনসনকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনার কী মনে হয়, স্যার? সে কী রঙ করতে পারে?” “অন্ধকার, গাধা! এছাড়া কী রঙ করবে এখানে?” বিমূঢ় কণ্ঠে তিনি জবাব দিলেন। হ্যাচারকে কিঞ্চিৎ আহত মনে হয়, “ব্যাঙগুলো অন্ধকারে, শাপলাও অন্ধকারে, পুকুরও অন্ধকারে। যা কিছু অন্ধকারে, তা কিছু আলোতেও থাকে দেখছি।” জনসন রেগেমেগে হাঁটা থামালেন। হ্যাচার বলল তখন, “যাই হোক স্যার, ওগুলোর সব আমি দেখে নিতে চাই। সম্ভব হলে দু’একটা পেইন্টিং কিনেও নেব। আমার ধারণা, খুঁজলে আরো অনেক পেইন্টিং মিলতে পারে। আমরা পুলিশ, স্যার, আমাদের সবকিছু জানা দরকার।”

 

এই উপরে

এই মোটেল, অবিকল প্রণয়-বান্ধব। আদর আর পূর্ণপ্রেমে- আমি একটু একটু করে ভাঁজ খুলছি তোমার। নব-আবিষ্কৃত ভূখণ্ড চুমেই চলেছি।

আর তুমি, ওইতো শুয়ে আছো আমারই বাহুর সীমানায়। সরু আর শুভ্র শরীর, বন্দি পাখির মতো কেঁপে কেঁপে উঠছো কেবল।

আমাদের মাঝখানে গাঢ় নীরবতা। কোনো মাপমতো শব্দ- আপাতত দরকার নেই।

নমনীয় ঋতু। বিছানার চারপাশে উপগ্রহের মতো ঘুরছি শুধুই, আর তুমি মৌন সম্মতিতে চোখ তুলে তাকিয়ে আছো।

অথচ বলছি না, তুমি তন্বী-তরুণী। তোমার স্তনদ্বয় খুব মুঠো উপচানো; আমার ভালো লাগে ছোট আকৃতি, এই হাতের মাপে।

তোমার ঊরুদ্বয়- মাংসল; অতিদূর থেকে হেঁটে আসা সুগন্ধি তাতে। আমার দাঁতের নিচে একটু একটু করে… একটু একটু করে…

জীবনের আহার্য যেন, অপরিহার্য এক ক্ষুধার দাবি।

এখন, তোমার ঐ ঠোঁট নড়ছে। এখন, তোমার দুইহাত ছুটে আসছে এই আমারই দিকে।

আর আমি তোমার শরীর থেকে একহাজার-দুহাজার ফিট ঊর্ধ্বে, যেন ভাসমান মেঘ।

তোমার ঐ ঠোঁট থেকে একটা বুদ্বুদ উঠে আসছে। ভেতরে একটিই শব্দ : “এসো”।

বিশ্বাস করো, আমি তো আসতেই চেয়েছি চিরকাল। অথচ এখন, এত উপর থেকে- কিছুই সম্ভব লাগছে না আর

কিছুই দৃশ্যমান লাগছে না আর! শুধু ভেসে আসছে এক উষ্ণতা, আহ্বান; শরীরী ভাষায়।

 

দেরি, তবে খুব দেরি হয়নি তখনো

পার্টি থেকে ফেরত যাওয়াদের দলে আমিই শেষ বান্দা ছিলাম। স্টেফানি আর জেরাডকে বললাম, শুভরাত্রি। ওরা শুয়ে পড়েছিল, আসলে বিছানায় প্রেম করছিল। তো প্রণয় থামিয়ে ওরা জবাব দিলো আর পার্টিতে এসেছি বলে ধন্যবাদ জানালো হাসিমুখে। রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ফিরছি তখন, সমস্ত পথ যেন জোছনার রৌদ্রে আলোকোজ্জ্বল। আমি ভাবছি কষে, কে ছিল ওরা, আমাকে কেনইবা দাওয়াত দিলো? নিজেকে গোয়েন্দা লাগে, অকাজের তথ্যে মাথা ভর্তি। অপরিচিতের কাছে প্রাণখুলে সব বলে দিলো? ব্যাপারটা আরো অদ্ভুত! আমি কেলগ স্ট্রিট থেকে ডানদিকে উইন্ডসোরের পথে মোড় ঘুরলাম। দেখি, ল্যাম্পপোস্টের নিচে এক মহিলা দাঁড়ানো। তাকে ভীত লাগছিল। “সাহায্য লাগবে কোনো?” বললাম। তাকে বিব্রত মনে হচ্ছিল, শেষে বলল, “আমি হারিয়ে গিয়েছি।” “তো কোথায় যাবেন?” বললাম। “রিচার্ড স্ট্রিটে,” মহিলা জানালো, “আমার খালাম্মা থাকে সেখানে।” “বেশি দূরে না তো,” বললাম তাকে, “চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি আমি।” এরপর, একসাথে হাঁটতে থাকি আমরা। তাকে শঙ্কিত লাগছিল খুব। তার বাস নাকি বেশ দেরিতে আসে, স্টেশনেও কেউ নিতে আসেনি, আর ফোন করলেও নাকি ধরছে না কেউ। তার খালার বাসার কাছে পৌঁছে গেলাম, বাড়িটাতে বাতি নিভে ছিল। দরজায় বারবার, বারবার ধাক্কা দিলেও কেউ খুলছিল না। কেমন খালা? “শুনুন,” বললাম, “আমি তো কাছেই থাকি, চলুন সেখানে যাই, পুলিশকে ফোন করে জানানো যাবে। তারাই ব্যাপারটা দেখবে তখন।” রাজি না হয়ে তার উপায় ছিল না যেহেতু, আবার আমরা হাঁটতে থাকি নীরবে; স্নিগ্ধ সে হাঁটা, ভীষণ সুরেলা। মহিলা, কৃতজ্ঞতার ভাষা হাত ছুঁয়ে জানালো আমাকে। তখন গভীর রাত, কিন্তু তখন- যেন মাত্রই শুরু হলো জীবন আমার।

 

প্রশস্ত পথজুড়ে

ঘুম ঘুম গাড়িগুলো শিশিরস্নাত পথ ধরে আঁচরে চলেছে।

যতটা অন্ধকার, তারও বেশি গাঢ়, চালকের মনে ও মগজে।

আর আশা আর হতাশার মাঝখানে আটকে আছে- এ শহর।

ঋতুদের আনাগোনা

তেমন যায় না বোঝা,

শুধু ওই রাস্তা সাফাইয়ের লোকদের মনে ও মগজে কিছুটা :

 

‘হান্স, জলদি এসো। একটা পাতা ঝরছে, আমার ভেতর!’

 

ঈগল-নাশক কোম্পানি

এমনও পাখি আছে, আমাদের চাইতে বড়। এমনও পাখি আছে শোবার ঘরে, বিছানার চাইতে বিশাল।  কোথাও মৃত এক পাখির ছবি দেয়ালে ঝোলানো, কোথায়? মনে পড়ছে না। এমনও পাখি রয়েছে, যার ডানার ছায়ায় ঢেকে যেতে পারি আমরা সবাই।

প্রতিরাতে পাখিটির ডাক শুনি আমি। তার পালক ঘরজুড়ে পালক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেখানেই পা ফেলো তুমি, সেখানেই পাখির পালক। ফাঁকামতো দেখেশুনে হাঁটতে পারো, তোমাকে তখন সেই পাখির মতোই দেখাবে। খুব ছোট্ট পাখি, বনসাই, একটি ডানার।

যদি তাই হও, মা দেখলে তোমাকে পাখি ভেবে নির্ঘাৎ খুন করবে। আর না হও যদি, এই না হবার বেদনায় নিজেই নিজেকে তুমি খুন করবে। অথচ আসল কথা, সবগুলো ঘরই এখন ঈগলের কান্না বোঝাই। ওদের তো তাড়ানো যাবে, বাড়িটা যদি তাতে ভেঙে পড়ে ওদের ছাড়া?

…কোথাও, মৃত এক পাখির ছবি দেয়ালে ঝুলছে। যেখানেই পা ফেলছো, সেখানেই পাখির পালক। তুমি এক বনসাই পাখি। নিজেকে কোথায় আর তাড়ানো যাবে? কোথাও পাখির ডাক। বিস্তৃত ডানার ছায়া।

 

উপরের দিকে থুতু ফেলা নিষেধ

“বরফ ভাঙবার শাবল নিয়ে এই কাঁচের লিফটে ওঠা ঠিক না মোটেই।”

আমি বললাম শিলার কানে। লিফটেই, এরূপ এক মহিলা আমাদের পাশে দাঁড়ানো। বাইরের দৃশ্যে মন না দিয়ে আমি বন্ধ দরজা-পানে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকি; বাইরে দেখার কিছু নেই! বরং ভাবছিলাম ঐ মহিলা যদি আচমকা ক্ষেপে যায় শাবল-সমেত? যদি প্রকাণ্ড মুরগির মতো উনি ডানা ঝাপটায়? শিলা কী ভাবছে তখন- ভাবতেই অবাক লাগে, ওর নজরও কি ওই শাবলের দিকে? শাবলটি মনে মনে নৃত্যরত; স্থির দাঁড়িয়েই, ভেতরে ভেতরে আমি পালাতে থাকি। কাঁচঘেরা লিফটে লক্ষ্যই করল না কেউ : আমার আর শাবলের মাঝে, শাবল আর কাঁচের মাঝে, কাঁচ আর আমার মাঝে- দাঁড়িয়ে রয়েছে কত দুশ্চিন্তা।

 

দ্যা কাউবয়

আমার নামে কেউ একজন গুজব রটিয়েছে, যে, আমার কাছে এক ভিনগ্রহচারী রয়েছে। আমি জানি কাজটা কার। রজার লসন, আস্ত এক ভাঁড়, বাজে লোকদের তালিকায় প্রথম সারির। আজতক আমি তার রোষানলে পড়িনি, তাই জানতাম আমার সময়ও চলে আসবে দ্রুতই। বাড়ির বাইরে মানুষের জনারণ্য, গাড়ি পার্ক করে আছে, ছবি তুলছে। না দেখার ভান করে থাকি, দরকার ছাড়া তত বেরুই না আমি। বেরুলেই প্রশ্নের বাণ।

“সে দেখতে কেমন?”

“কী খাওয়াচ্ছেন তাকে?”

“ধরলেন কিভাবে?”

এবং খুব সহজ ভঙ্গিতে ভিনগ্রহচারীর অস্তিত্ব আমি নাকচ করে চলি। তাতে উৎসাহ বেড়ে যায় আরো। কাগজের লোকজন আমার বাগানটা মাড়িয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলেছে। খুবই বিরক্তিকর। দিনদিন আরো লোক জড়ো হতে থাকে, আরো গাড়ি পার্ক হয় রাস্তাজুড়ে। বোঝা গেল, রজার লসন বেশ কোমর বেঁধেই নেমেছে। এর সুরাহা জরুরি। শেষমেশ ঘোষণা দিলাম, “ভিনগ্রহচারী মহাশয় গতরাত ১১ টা ০২ মিনিটে, ঘুমের ভেতরেই শান্তিতে মারা গিয়েছেন।”

“তার মৃতদেহ দেখান তবে,” সবাই হৈ হৈ করে উঠল।

“আহ, তখনই ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে সেটা,” আমি বললাম।

“বিশ্বাস করি না একথা,” একজন জানালো।

“বাড়িতে কোনো মৃতদেহ নেইরে বাবা, আর থাকলেও এতক্ষণে কবর দিয়েছি,” বললাম আমি।

বিরক্ত হয়ে তারা অর্ধেক চলে গেলো। বাকি অর্ধেক তর্কে ছিল, তবে আগের চাইতে আরো শান্তস্বরে। আমি বাজারে গেলাম কিছু সদাই আনতে। ঘণ্টাখানেক পর ফিরে দেখি, ততক্ষণে চলে গেছে আরো অর্ধেক। রান্নাঘরে ঢুকতেই চমকে উঠি। সম্মুখে স্বচ্ছ, অদৃশ্যপ্রায় এক তিনফুট প্রাণি দাঁড়িয়ে, গোলাপিরঙের চোখ।

“আমি মারা গেছি- কেন বললে? এটা তো মিথ্যে কথা,” সে বলল।

“তুমি ইংরেজি জানো দেখছি,” বললাম আমি।

“রেডিওটা শুনতে শুনতে শিখেছি। টিভিও দেখেছি। এমন কঠিন কিছু না। টিভিতে সবগুলো চ্যানেলই দেখেছি। কাউবয়দের খুব ভালো লেগেছে। বিশেষত জন ফোর্ড-এর সিনেমাগুলোতে,” বলল সে।

“তো এখন আমি কী করতে পারি?” বললাম।

“সত্যিকারের কোনো কাউবয়ের সাথে দেখা করিয়ে দাও না আমাকে? খুব খুশি হবো,” বলল সে।

“আমি কোনো সত্যিকারের কাউবয়কে চিনি না। হয়ত খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তুমি বাইরে বেরুনোমাত্র লোকজন পাগল হয়ে উঠবে। তার উপর কাগজের লোকজন পিছু লেগেছে। শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে তখন,” আমি বললাম।

“আমি অদৃশ্য হতে পারি। এমন কঠিন কিছু না,” সে বলল।

“ভেবে দেখব। ওয়োমিং বা মন্টানার দিকে কাউবয় পাওয়া যেতে পারে। তবে অনেক দূরের পথ,” আমি বললাম।

“প্লিজ, আমি কোনো ঝামেলা পাকাবো না,” সে বলল।

“তাহলে কিছু পরিকল্পনা আগে সাজাতে হবে,” আমি বললাম।

বাজারের ব্যাগ রেখে ভাবলাম, আধ্যাত্মিক কিছু নয়, সে একটা বুদ্ধিমান বাচ্চার মতো।

“তোমার ব্যাগে কি অনন্তমূলের শেকড় হবে?” সে বলল।

“না, কিন্তু কমলার জুস হবে, খেতে পারো, পুষ্টিকর,” বললাম।

সে কমলার জুস খেয়ে মুখখানা পাংশুটে করে ফেলল।

“আমি একটা মানচিত্র আনছি, কিভাবে যাবো তার পরিকল্পনা করা যাক,” আমি বললাম। যখন মানচিত্র নিয়ে ফিরলাম, দেখলাম, রান্নাঘরের টেবিলের উপর সে তা-ধেই তা-ধেই করে নৃত্য জুড়েছে। চেহারায় দুঃখী দুঃখী ভাব। “মানচিত্র তো এনেছি,” বললাম তাকে।

“আর লাগবে না। এইমাত্র ঐশী বাণী এসেছে। আজরাতে মরতে চলেছি আমি। খুবই খুশির ব্যাপার। তুমি আমার এই আনন্দ উদযাপনে সাহায্য করো,” সে বলল আমাকে।

শুনে আমার বুক ফেটে কান্না এলো। “তুমি মরবে কেন?” আমি বললাম।

“ফাদার এইসব ঠিক করেছেন। এখানে এসেছি, তোমার সঙ্গে ভালোমতো সাক্ষাৎ করেছি- তারই পুরষ্কারস্বরূপ হয়ত। কী যে ভালো লাগছে!” সে বলল তখন।

“কিন্তু আমি তো তোমাকে কাউবয়ের কাছে নিয়ে যেতে চাই,” আমি বললাম।

“উমম, তাহলে মনে করো তুমিই আমার সেই কাউবয়,” হাসিমুখে, নির্দ্বিধায় বলল ভিনগ্রহচারী।

 

ছোঁয়াচে

মাতাল হলেই আমি একমাত্র মানুষ এই নিউ ইউর্ক সিটিতে। কোনো আলো নেই, অসুবিধা নেই, ওতে অভ্যাস আছে। ঐতো সিঁড়িগুলো কবরস্থানের পাশে বৃদ্ধ বটবৃক্ষটির শেকড়ের মতো- পাক খেয়ে উঠে গেছে অনন্ত-পানে। “ওঠা বারণ”- তাই কেউ আর ওঠে না তাতে। ওইযে নষ্ট অটোমোবাইলগুলো পড়ে আছে আঁধারকে আঁকড়ে ধরে, হাড়-সর্বস্ব, জীর্ণ। তখন, গলির মোড়ে অন্ধকারে দেখা যায় কারো সিগারেটের জ্বলন্ত অঙ্গার। এরমানে, আমি একা নই। এরমানে, ঘোর কেটে গেছে। এরমানে, আমাকে ঠেলছে কেউ মৃতদের ভিড়ের দিকে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. Man with wooden leg escapes prison. He’s caught.
    এর ভাষান্তর -লোকটির এক পা কাঠের তৈরি। এ অবস্থাতেই সে জেল ভেঙে পালায় একদিন।
    ধরাও পড়ে যায়।
    টেইটের ভাষাভঙ্গি ভীষণরকম নির্মেদী।
    ভাষান্তরে সেই ‘বিশেষ’ টিই অনুপস্হিত!
    এত মেলে ধরা – ভাল লাগছে না যে!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close