Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ অনূদিত ছোটগল্প টনি মরিসন > সুইটনেস [অনূদিত ছোটগল্প] >> অনুবাদ : রাজিয়া সুলতানা

টনি মরিসন > সুইটনেস [অনূদিত ছোটগল্প] >> অনুবাদ : রাজিয়া সুলতানা

প্রকাশঃ June 21, 2017

টনি মরিসন > সুইটনেস  [অনূদিত ছোটগল্প] >> অনুবাদ : রাজিয়া সুলতানা
0
0

সুইটনেস

এটা আমার দোষ নয়। তোমরা আমাকে এ জন্যে দোষ দিতে পারো না। আমি কিছুই করিনি। কীভাবে এটা ঘটলো এ ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। ওরা যখন আমার দু’পায়ের মাঝখান থেকে ওকে টেনে বের করে আনলো, এরপর আমার বুঝতে একঘন্টার বেশি সময় লাগেনি যে কিছু একটা ভুল হয়েছে। সত্যিই ভুল ছিলো। ও এতোটাই কালো যে আমাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দেয়। সেই রঙ, যেন মধ্যরাতের কালো। সুদানীয় কৃষ্ণত্ব বলতে পার। কিন্তু আমার গায়ের রঙ তো ফর্সা, চুল সুন্দর, যাকে আমরা বলি উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের কেশ। লুলা অ্যানের বাবাও ছিলো এরকমই। আমাদের কারও গায়ের রঙই ওর গায়ের রঙের মতো নয়। ওই রঙের কথা ভাবলে অনেকটা আলকাতরার কাছাকাছি কোনো রঙের কথা মনে হবে। তারপরও ওর চুল ওর গায়ের রঙের সঙ্গে মেলে না। একেবারেই আলাদা- সোজা আবার কোঁকড়ানো। অস্ট্রেলিয়ার নগ্ন আদিম উপজাতিদের চুলের মতো। তোমরা ভাবতে পারো, ও হয়তো ওর পূর্বপুরুষের মতো হয়েছে। কিন্তু কার মতো? তোমরা হয়তো আমার দাদীকে দেখেছো। তাকে শ্বেতাঙ্গিনী বলতে পারো। বিয়েও করেছেন একজন শ্বেতাঙ্গকে। আর এ ব্যাপারে তাকে কখনও কাউকে একটা কথা বলতে শুনিনি। আমার মা-খালাদের কাছ থেকে কোনো চিঠি এলে তিনি তা না খুলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার তাদের কাছেই ফেরত পাঠিয়ে দিতেন।  অবশেষে দেখা যেত, তার কোনো খবরই তারা পেতেন না এবং তাকে তার মতোই থাকতে দিয়েছিলেন তারা । সেইসময়ে প্রায় সব মিশ্রবর্ণের লোকেরা এরকম করতো। বিশেষ  করে তাদের চুলের রঙটা যদি সাদাদের মতো হতো, তাহলে কোনো কথাই ছিল না। কতো শ্বেতাঙ্গ শরীরের শিরায় শিরায় যে নিগ্রোরক্ত লুকিয়ে আছে, তা কল্পনা করতে পারো? আন্দাজ করো তো। আমি শুনেছি শতকরা কুড়ি ভাগই নাকি এমন। আমার মা লুলা মে নিজেকে শ্বেতাঙ্গিনী বললে সহজেই পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি তা ইচ্ছে করেই করেননি। এর জন্য তাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে তা তিনি আমাকে বলে গেছেন।

তিনি আর আমার বাবা যখন কোর্টে বিয়ে করতে যান, সেখানে দুটো বাইবেল ছিলো। তাদের হাত রাখতে হয়েছিলো নিগ্রোদের জন্য রাখা বাইবেলের ওপর। অন্যটা ছিলো শ্বেতাঙ্গদের জন্য। বাইবেল! এর যে অন্যথা কিছু হতে পারে, ভাবা যায়? এক ধর্ণাঢ্য শ্বেতাঙ্গ  দম্পতির ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন আমার মা। প্রত্যেক বেলাতেই তারা তার হাতের রান্না খেতো। স্নানের সময় যখন তারা বাথটাবে বসতো, মাকে বলতো  তাদের পিঠ ঘষে দিতে। ঈশ্বরই জানেন আর কী কী একান্ত নিজেদের কাজ তারা তাকে দিয়ে করিয়ে নিতো। শুধু এক বাইবেল! বাইবেল একটাই, তবু তিনি তা স্পর্শ করতে পারেন নি। রঙ যতো ফর্সা হবে, ততোই তাকে ভালো বলা হবে। সামাজিক সমাবেশ, পাড়া, গীর্জা, মেয়েদের সমিতি সবখানে এমনকি কৃষ্ণাঙ্গদের স্কুল পর্যন্ত- একই অবস্থা। তোমরা কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারো চামড়ার রঙ অনুসারে আমাদেরকে এইভাবে  ভাগ করে দেখা মন্দ একটা কাজ। কিন্তু আর কীভাবেইবা আমাদের নুন্যতম সম্মানটুকু ধরে রাখতে পারতাম? ওষুধের দোকানে আমাদের গায়ে যে থুথু ছিটিয়ে দেওয়া হতো, এড়িয়ে যেতে পারতাম? বাসস্টপে কনুইয়ের গুঁতো থেকে, শ্বেতাঙ্গদের জন্য রাস্তার সবটুকু পাশ ছেড়ে দিয়ে নালার ওপর গিয়ে দাঁড়ানো থেকে, মুদির দোকানে বিনামূল্যে যে কাগজের ব্যাগ শ্বেতাঙ্গরা পায় সেই ব্যাগের প্রতিটির জন্য পাঁচ পয়সা (নিকেল)করে দেওয়া থেকে- আর কী কী ভাবে রক্ষা পেতে পারতাম আমরা? গালাগালের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। এখানে যা কিছু বললাম, সে সব তো বটেই, আরও অনেক কিছু শুনেছি আমি। শুধুমাত্র তার গায়ের  রঙের কারণে দোকানে আমার মা হ্যাট মাথায় দিয়ে কেনাকাটার সময় কিংবা মহিলাদের ওয়াশরুম ব্যবহার করার সময় তাকে, বিরত রাখা হতো না। বাবাও জুতোর দোকানের সামনে বসে জুতো পায়ে দিয়ে দেখতে পারতেন। তাকে পেছনের কোনো রুমে যেতে হতো না। তৃষ্ণায় মরে যাওয়ার উপক্রম হলেও দু’জনার একজনও “শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য” নির্ধারিত ঝর্ণার পানি পান করতেন না।

আমার বলতে ঘৃণা হয়, শিশু লুলা অ্যান একদম প্রথম থেকেই হাসপাতালের প্রসূতি  বিভাগে আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিলো। জন্মের সময় সব বাচ্চার চামড়ার রঙ- যেমন  আফ্রিকার বাচ্চাদের গায়ের রঙ ফ্যাকাশে থাকে, সেরকম ছিলো। কিন্তু দ্রুত তা বদলে গেলো। আমার চোখের সামনে ওর রঙ নীল হলো। তারপর কালো। সেই দেখে মনে হচ্ছিলো আমি পাগল হয়ে যাবো। ক্ষণিকের জন্য হয়েছিলাম বৈকি! কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি ওর মুখের ওপর কম্বল চেপে ধরেছিলাম। চাপও দিয়েছিলাম। কিন্তু যতোই আমার ইচ্ছে হোক না কেন, ও এই ভয়ংকর গায়ের রঙ নিয়ে না জন্মাক- শেষ পর্যন্ত সেই কাজটা আমি করতে পারিনি। এমনকি এও ভেবেছিলাম ওকে কোথাও কোনো এতিমখানায় দিয়ে দেবো। কিন্তু যেসব মা তাদের বাচ্চাদের গীর্জার সিঁড়িতে ফেলে রেখে আসে, তাদের মতো হতে আমি ভীষণ ভয় পেতাম।

শুনেছি, সম্প্রতি জার্মানিতে তুষারের মতো সাদা রঙের এক দম্পতির কালো রঙের  এক বাচ্চা হয়েছে- যার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি। জমজ বাচ্চা দুটোর একটা সাদা হয়েছে, আরেকটা কালো। সত্য কিনা জানি না। শুধু জানি আমার এই শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়ানো মানে একটা নিগ্রোশিশুকে আমার স্তনবৃন্ত চুষতে দেওয়া। বাসায় পৌঁছানো মাত্রই আমি ওকে বোতল ধরালাম।

আমার স্বামী লুইস একজন কুলি। সে রেলের কাজ থেকে ফিরে আমার আর বাচ্চার   দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি সত্যিই একটা পাগল আর বাচ্চাটা যেন এসেছে  বৃহস্পতি গ্রহ থেকে। ক্ষিপ্ত হবার মতো মানুষ না সে। তবুও যখন বললো- “হা ঈশ্বর! এইটা কী?” তখনই বুঝেছিলাম আমরা বিপদে আছি। সেই থেকে শুরু হলো ঝগড়াঝাটি আর মারধোর। বিয়ে ভেঙে গেলো আমাদের। এর আগে তিন বছর   একসঙ্গে ভালোই সময় কেটেছিলো। কিন্তু মেয়ের জন্মের পর দোষ এসে পড়লো আমার ওপর। সে লুলা অ্যানের সঙ্গেও এমন আচরণ করতো যেন ও ছিলো অপরিচিত কেউ, একজন শত্রু। লুইস কখনো ওকে ছুঁয়েও দেখেনি।

আমি কোনোভাবেই তাকে বোঝাতে সক্ষম হইনি যে আমি কখনোই অন্য কোনো   পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করিনি। সে একেবারে নিশ্চিত ছিলো যে আমি মিথ্যে বলছিলাম- এ নিয়ে তর্ক আর তর্ক। শেষে যখন বললাম- তারই বংশধারা থেকে মেয়েটির গায়ের রঙ কালো হয়েছে, আমার বংশ থেকে নয়, তখন পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ হলো যে সে হঠাৎ করেই আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। তখন আমাকে আরও কম পয়সায় বাসা খুঁজতে হলো। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম খুঁজে পেতে। আমি জানতাম বাসা ভাড়ার জন্য আবেদন করতে বেরুলে মেয়েকে সাথে নিয়ে বাড়িওয়ালার কাছে যাওয়া যাবে না। এজন্য আমি আমার কিশোর-বয়সী এক কাজিনের কাছে ওকে রেখে বাসা খুঁজতে যেতাম। আমি মেয়েকে খুব একটা বাইরে নিতাম না। স্ট্রলারে করে নিয়ে যখন বাইরে যেতাম, ওকে দেখার জন্য লোকজন নিচু হয়ে উঁকি দিয়ে সুন্দর কিছু বলতে গিয়ে আঁৎকে উঠে ভ্রু কুঁচকাতো। আমার খারাপ লাগতো তখন।  উল্টোটা হলে অর্থাৎ আমার গায়ের রঙ কালো আর মেয়ের গায়ের রঙ সাদা হলে আমি নিজেই বেবিসিটার হতে পারতাম। উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের চুল হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গ হলে শহরের অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া মুশকিল। যে সময়ে লুলা অ্যানের জন্ম হয়েছিলো সেটা ছিলো নব্বইয়ের দশক। বাসা ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বাড়িওয়ালারা গ্রাহ্য করতো না। কারও কাছে বাসা ভাড়া দিতে না চাইলে কোনো-না-কোনো কারণ তারা খুঁজে বের করে ফেলতো। আমার ভাগ্য ভালো যে সাত ডলার ভাড়া বাড়িয়ে হলেও মিস্টার লীহ্‌ আমার কাছে বাসা ভাড়া দিয়েছিলো। তবে ভাড়ার টাকা দিতে সামান্য দেরি হলে সে চেঁচামেচি করতো।

মেয়েকে বলেছিলাম আমাকে ‘মা’ বা ‘মামা’ না ডেকে ‘সুইটনেস’ বলে ডাকতে।   আমাদের জন্য সেটাই ছিলো নিরাপদ। এমন কালো গায়ের রঙ আর মোটা ঠোঁট নিয়ে আমাকে ‘মামা’ বলে ডাকলে লোকে ধন্দে পড়বে। তাছাড়া তার চোখের রঙও বেশ হাস্যকর। কাক-কালো রঙ, আবার নীলচে আভা, কেমন যেন ডাইনী ডাইনী দেখতে।

মা আর মেয়ে শুধু দু’জন আমরা অনেকদিন একা ছিলাম। নিশ্চয়ই তোমাদের বুঝিয়ে  বলতে হবে না একজন পরিত্যক্ত স্ত্রী হওয়াটা কতোটা দুর্বিসহ। আমার মনে হয়  আমাদেরকে ওভাবে ছেড়ে চলে যাওয়াতে লুইসের একটু খারাপও লাগতো। তাই সে কয়েকমাস পর-পর আমরা কোথায় আছি, তা খুঁজে বের করে প্রত্যেক মাসে টাকা পাঠাতে শুরু করে। যদিও আমি কখনই তার কাছে পয়সা চাইনি, আদায় করার জন্য      কোর্টেও যাইনি। প্রতিমাসে লুইসের পাঠানো পঞ্চাশ ডলার আর রাতে হাসপাতালে আমার চাকরিটা আমাকে আর লুলাকে ওয়েলফেয়ার ছেড়ে দিতে সাহায্য করেছিলো। এই একটা ব্যাপার ভালো হয়েছিলো। আমার মতে ওরা একে ‘ওয়েলফেয়ার’ বলা বন্ধ  করে ‘রিলিফ’ বললেই ভালো করতো, যেমনটি আমার মায়ের আমলে বলা হতো।  সেটা শুনতে অনেক ভালো শোনায়। নিজেকে গুছিয়ে নেবার আগে স্বল্পসময়ের একটা ব্যবস্থা। শ্বাস নিতে পারা আর কি।

এছাড়াও ওইসব ওয়েলফেয়ার ক্লার্ক থুথুর মতোই নীচপ্রকৃতির মানুষ। শেষে আমি যখন একটা কাজ পেলাম এবং আমার আর ওদের সাহায্য নিতে হলো না, তখন আমার আয় ছিলো ওদের আয়ের চাইতে বেশি। ওরা কখনই আমার মতো এতো বেশি উপার্জন করতে পারতো না। ওদের স্বল্প বেতনের চাকরির জন্যেই ওরা এতোটা নীচ হয়ে থাকে। সে জন্যেই ওরা আমাদের সঙ্গে ভিক্ষুকের মতো আচরণ করতো। বিশেষ করে যেভাবে ওরা লুলার দিকে তাকিয়ে পরে আমার দিকে তাকাতো, দেখে মনে হতো যেন আমি ওদেরকে ঠকানোর তালে আছি অথবা এইরকম একটা কিছু। পরে আমার অবস্থার উন্নতি হলো। কিন্তু আমি সতর্ক থাকতাম। মেয়েকে মানুষ করার ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলাম। আমাকে কঠোর হতে হয়েছিলো অনেক। লুলার আচার-আচরণ শেখার প্রয়োজন ছিলো। নমনীয় থাকা, কোনোও ঝামেলা না-বাধানো- এইসব। ও ওর নাম যতোবার হয় পরিবর্তন করুক, সে ব্যাপারে আমার মাথাব্যথা ছিলো না। কিন্তু আমি জানি, ওর গায়ের রঙ ওকে সারাজীবন ক্রুশের মতোই বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু সে দোষ তো আমার নয়। সে ভুল আমার নয়। কিছুতেই নয়।

ও হ্যাঁ, ছোট্ট লুলার সঙ্গে আমি কীরকম আচরণ করেছি কখনও কখনও সে কথা ভাবলে আমার খারাপ লাগে। কিন্তু তোমাদের বুঝতে হবে, আমার কাজ ছিলো ওকে রক্ষা করা। পৃথিবী সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা ছিলো না। চামড়ার ওই রঙ নিয়ে আর যাই হোক কঠোর বা দাপুটে হওয়া চলে না। যতোই তুমি সঠিক পথে চলো না কেন, স্কুলে মারামারি অথবা মুখে মুখে উত্তর দেয়ার কারণে তোমাকে পাঠানো হবে কিশোর অপরাধের তালাবন্ধ রুমে। কাজে নিয়োগ দেয়া হবে সবার পরে আর ছাটাই করা হবে সবার আগে। ও এসব কিচ্ছু জানে না। ওর চামড়ার কুচকুচে কালো রঙ দেখে যে শ্বেতাঙ্গরা ভয় পাবে অথবা হাসাহাসি করবে এবং ওকে এজন্য বিপদেও ফেলতে পারে, এসব কথা ও জানে না। আমি একবার একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। লুলা অ্যানের মতো গায়ের রঙ এতো কালো নয় ওর। বয়স খুব বেশি হলে দশ। কোত্থেকে একদল শ্বেতাঙ্গ ছেলে এসে ওকে ল্যাং মারলো। পড়ে গিয়ে যখন ও হামাগুড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলো, আরেকজন এসে পেছনে লাথি দিয়ে আবার ওকে ফেলে দিলো। সেই ছেলেগুলোর ওর এরকম অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল্ লাগার উপক্রম। তাই পেট ধরে নিচু হয়ে হাসছিলো ওরা। মেয়েটি নিস্তার পেয়ে চলে যাবার অনেকক্ষণ পরও ওরা হিহি করে হাসছিলো। কী তাদের গর্ব! আমি বাসের জানালা দিয়ে ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম। তা না হলে আমি ওকে সাহায্য করতে পারতাম। ওই শ্বেতাঙ্গ আবর্জনা থেকে ওকে টেনে তুলে দূরে নিয়ে যেতাম। দেখো, আমি যদি লুলা অ্যানকে ভালোমতো না শেখাতাম, সে জানতো না যে এই শ্বেতাঙ্গ ছেলেগুলোকে এড়াতে হলে সবসময় ওদের পেছনে ফেলে রাস্তা পার হয়ে যেতে হবে। সেই প্রশিক্ষণ সত্যিই কাজে এসেছে। এ নিয়ে আমার গর্বের শেষ নেই।

তোমাদের বুঝতে হবে যে আমি আসলে মন্দ মা ছিলাম না। কিন্তু আমার একমাত্র সন্তানকে রক্ষা করতে হবে বলেই হয়তো-বা ওকে কষ্ট দিয়েছি, ওর সঙ্গে কঠোর হয়েছি। আমার কোনো উপায় ছিলো না। সাদা চামড়ার বিশেষাধিকারের জন্যই  আমাকে ওর ব্যাপারে কঠিন হতে হয়েছে। প্রথমে আমি ভুলতেই পারছিলাম না, গায়ের রঙ কালো হওয়ার যে কী ব্যথা! আমি এই যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে যদি ওকে শুধু ভালোবাসতে পারতাম, ভালো হতো! আমি সত্যি ওকে ভালোবাসি, এটাই আমি মনে করি।

গত কিছুদিনের মধ্যে ওর সঙ্গে যখন আমার দুবার দেখা হলো, ওকে বেশ ভালো আর আকর্ষণীয় দেখা্চ্ছিল। মনে হচ্ছিল অদম্য আর আত্মবিশ্বাসী। যতবারই ও আমাকে দেখতে এসেছে– আমি দেখতাম ও ওর গায়ের রঙের সুবিধাটুকু নিয়ে মনোরম সাদা পোশাকে নিজেকে সজ্জিত করেছে। তখন ও যে এতো কালো- তা আমার মনেই থাকতো না।

আমার মেয়ে আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে যা আমার সবসময়ই জানা উচিত ছিলো।  সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মা’র আচরণ কীরকম হওয়া দরকার- এই ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা এমন একটা বিষয় যে তারা কখনও নাও ভুলতে পারে। তাই যত তাড়াআড়ি  পেরেছে ও আমাকে সেই ভয়ংকর অ্যাপার্টমেণ্টে একা ফেলে রেখে যতোদূর সম্ভব চলে গেছে। নিজেকে পরিপাটি পোশাকে সাজিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় চাকরি পেয়েছে। মেয়ে আমাকে ফোন করে না, দেখতেও আসে না। কখনও কখনও টাকা, জিনিসপত্র পাঠায়। কিন্তু অনেকদিন আমি ওকে দেখিনি- কতদিন হবে জানি না।

উইনস্টন হাউজ- এই জায়গাটা আমার পছন্দের। শহর থেকে বাইরের একটা ব্যয়বহুল  নার্সিংহোম আছে এখানে। আমি যেখানে থাকি সেটা ছোট, গৃহতুল্য, সস্তা। এখানে চব্বিশ ঘণ্টা নার্স ও ডাক্তার থাকে এবং সপ্তাহে তারা দু’বার আসে। আমার বয়স মাত্র তেষট্টি- অবসরে যাবার মতো এতোটা বয়স আমার হয়নি। কিন্তু আমার হাড়ের রোগ হয়েছে, ভালো সেবাযত্ন খুব প্রয়োজন। তবে এখানে একঘেয়ে লাগে। শরীরের দুর্বলতা বা ব্যথার চেয়ে বেশি খারাপ সেটা। কিন্তু নার্সরা ভালো। যখন এদের একজনকে বললাম যে আমি নানী হতে চলেছি, তখন সে আমার চিবুকে চুমু খেলো। তার হাসি আর মন্তব্য ছিলো মন-ভরানো, যেন কাউকে মুকুট পরিয়ে সম্মান দেয়া হচ্ছে। লুলার কাছ থেকে পাওয়া নীলকাগজে লেখা নোটটা আমি ওকে দেখালাম। নিচে লুলার স্বাক্ষর-  “কনে”। বিয়ে করেছে ও। আমি অবশ্য এসব তেমন খেয়াল করি না। ও খুশি হয়ে লিখেছে-“ভাবতে পারো সুইটি, আমার একটা বেবি হবে- এই খবর দিতে আমার যে কী সুখ! আমি তো রীতিমত রোমাঞ্চিত! আশা করি তুমিও রোমাঞ্চিত হবে।” দেখলাম, এই থ্রিলটা ওর বাচ্চাকে নিয়ে, বাচ্চার বাবাকে নিয়ে নয়। যে কারণে তার নাম একবারও উল্লেখ করে নি। আমি ভাবি, ওর বর ওর মতোই এমন বিশ্রীরকমের কালো কি না। তাই যদি হয়, তবে বাচ্চাকে নিয়ে আমার মতো ওকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। আমি যখন ছোট ছিলাম- এখন সামান্য পরিবর্তন হয়েছে সেই সময়ের। টেলিভিশন, ফ্যাশন ম্যাগাজিন, বিজ্ঞাপন এমনকি মুভিতে পর্যন্ত এখন নীলাঙ্গী, কৃষ্ণাঙ্গী- সবরকম মানুষকেই দেখা যায়।

সেই খামে ফিরতি ঠিকানা নেই। ভেবেই নিচ্ছি আমি সেই মন্দ মা-ই রয়ে গেছি। এজন্য মৃত্যুর দিন পর্যন্ত শাস্তি পেতে হবে আমাকে। কিন্তু যা করেছি ভালো উদ্দেশ্যেই করেছি। আসলে, ওকে এভাবে বড় করার প্রয়োজন ছিলো। লুলা অ্যান আমাকে ঘৃণা করে। ও আমাকে টাকা পাঠায়- আমাদের সম্পর্কটা এখন এইখানে এসে দাঁড়িয়েছে। বলতেই হয়- ওর পাঠানো এই নগদ টাকার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। অন্য রোগীদের মতো বাড়তি খরচের জন্য আমার হাত পাততে হয় না। একা একা যে তাস খেলি তার জন্য আমাকে লাউঞ্জের জীর্ণ, নোংরা কার্ড দিয়ে খেলতে হয় না। আমার তা কেনার সামর্থ্য আছে। আমার মুখের জন্য বিশেষ ফেসক্রিমও আমি কিনতে পারি। কিন্তু আমি  বোকা নই। আমি জানি এই টাকা পাঠানো আমার কাছ থেকে দূরে থাকার একটা  ছল ওর। সামান্য যে বিবেকটুকু অবশিষ্ট আছে ওর, সেটাই আমাকে বোঝায়।

মনে হতে পারে আমি হয়তো বিরক্তিকর আর অকৃতজ্ঞ একজন নারী। ছোটছোট যেসব কাজ আমি করেছি, ভুল করেছি, সেজন্য গভীর অনুতাপ আছে আমার। মনে আছে, যখন  প্রথমবার সে ঋতুবতী হলো তখন আমার প্রতিক্রিয়া কীরকম ছিলো। আবার ও যদি হোঁচট খেতো, অথবা ওর হাত থেকে যদি কিছু পড়ে যেত, আমি চিৎকার করতাম। সব সত্যি ছিলো। আমি সত্যিই খুব রেগে যেতাম। এমনকি ওর জন্মের সময় ওর গায়ের রঙ কালো দেখে আমি ক্ষিপ্ত হই। প্রথমে মনে হয়েছিলো… না থাক। সেইসব স্মৃতি আমাকে দ্রুত পেছনে ফেলে আসতে হবে। এর কোনো মানে হয় না। আমি জানি যে অবস্থার শিকার ছিলাম, তারপরও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সব কিছু মানিয়ে চলার।  আমার স্বামী আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলো যখন, লুলা অ্যান আমার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ালো। ভারী এক বোঝা। কিন্তু আমি তা ভালোভাবেই বহন করেছি।

হ্যাঁ, আমি লুলার সঙ্গে অনেক কঠিন আচরণ করেছি। যখন ওর বয়স বারো পূর্ণ   হলো এবং তেরতে পড়বে, তখন আমাকে আরও কঠোর হতে হয়েছিলো। সে মুখে মুখে তর্ক করতো, যা রান্না করতাম তা খেতে চাইতো না। নিজের মতো করে চুল সাজাতো। আমি বেণী করে দিলে স্কুলে গিয়ে তা খুলে ফেলতো। আমি চাইনি ও বখে  যাক। আমি ঠাস করে দরোজা বন্ধ করে দিয়ে সাবধান করতাম ওকে। বলতাম- কী  কী বলে ওকে গালি দেয়া হবে। এরপরও আমার কিছু কিছু শিক্ষাদান ওর কাজে এসেছে। দেখো, আজ ও কী হয়েছে? এক ধনী কর্মজীবী নারী। আর কী চাই?

এখন সে সন্তান সম্ভবা। খুব ভালো, লুলা অ্যান। যদি ভেবে থাকো মাতৃত্ব শুধু পাখির কূজন, পা নাড়ানো, ডায়াপার পরানো, এইসব- তবে প্রচণ্ড ধাক্কা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাক। প্রবল ধাক্কা! তুমি, তোমার নামহীন ছেলেবন্ধু, যাকে যেখান থেকে তুলে নাও- যে কেউ- চিন্তা করে দেখো- উহ্! বাচ্চা! কিচি কিচি কু!

শোনো, তুমি খুব শিগগির জানতে পারবে এজন্য কী প্রয়োজন, জানতে পারবে এই পৃথিবীটা কেমন আর তুমি যখন একজন মা হবে, তখন কিভাবে সবকিছু বদলে যায়।

ভাগ্য প্রসন্ন হোক তোমার। আর ঈশ্বর, তুমি আমার এই সন্তানকে সাহায্য কোরো।

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close