Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ টিনটিন : জন্ম হলো কি করে? > কমিকস্-কথন >> শিশির ভট্টাচার্য্য

টিনটিন : জন্ম হলো কি করে? > কমিকস্-কথন >> শিশির ভট্টাচার্য্য

প্রকাশঃ June 20, 2017

টিনটিন : জন্ম হলো কি করে? > কমিকস্-কথন >> শিশির ভট্টাচার্য্য
0
0

টিনটিন। বিশ্বজোড়া জনপ্রিয় কমিকস্ চরিত্র। এর স্রষ্টা রেমির ছদ্মনাম ছিল অনুসন্ধিৎসু খেকশিয়াল? গত সত্তর বছরে পৃথিবীর ৪৫টি ভাষায় টিনটিনের ১৮০ লাখেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে। এবার এই টিনটিন আর তার স্রষ্টাকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন ফরাসি ভাষার শিক্ষক-লেখক শিশির ভট্টাচার্য্য।

টিনটিন

জন্ম হলো কি করে?

টিনটিন। হার্জের টিনটিন। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কমিক চরিত্রগুলোর অন্যতম। ১৯২৯ সালের ১০ই জানুয়ারি টিনটিন প্রথম ছাপা হয় বেলজিয়ামের ‘পতি ভ্যান্তিয়েম’ পত্রিকায়। এর স্রষ্টার নাম জর্জ রেমি (১৯০৭-১৯৮৩)। জর্জ রেমির ছদ্মনাম বা সংক্ষিপ্ত নাম ‘হার্জ। ‘রেমি’র প্রথম অক্ষর ‘এর’ (জ) আর ‘জর্জ’এর প্রথম অক্ষর ‘জে’ (ঔ)  মিলে তৈরি হয়েছে ফারসি ‘এরজে’ বা ইংরেজির ‘হার্জ’।

হার্জের জন্ম ১৯০৭ সালের ২২শে মে তারিখে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের পাশের শহর এটেনবিকে। বাবা আলেক্সিস (১৮৮২-১৯৭০) একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। বাচ্চাদের কাপড় তৈরি করা হতো এই ফ্যাক্টরিতে। মা এলিজাবেথ দ্যুফুর (১৮৮২-১৯৪৬) ঘর সামলাতেন। হার্জের একটি ভাইও ছিল। দুজনের বয়সের পার্থক্য ছিল পাঁচ বছর। এই ভাইটির সাথে হার্জের খুবই কমই যোগাযোগ হয়েছে সারা জীবন।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮Ñ এই চার বছর হার্জ মিউনিসিপ্যালিটি পরিচালিত এক স্কুলে লেখাপড়া করেন। ‘এ সময়েই খাতার নিচের দিকে ছবি আঁকতাম’ পরে স্মৃতিচারণ করেছেন হার্জ। হার্জ খুবই ভালো ছাত্র ছিলেন। ক্লাসে প্রায় সব সময়ই প্রথম হতেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি হার্জ বেলজিয়াম বয় স্কাউট আন্দোলনেরও সদস্য ছিলেন।

ধর্মনিরপেক্ষ মিউনিসিপ্যালিটি স্কুল থেকে সরিয়ে হার্জকে ভর্তি করে দেয়া হয় সেন্ট বোনিফাস ইনস্টিটিউটে। এটি ছিল খ্রীষ্টধর্মীয় ভাবধারার একটি স্কুল। স্কুল বদলানোর সাথে সাথে বয় স্কাউট প্রতিষ্ঠানও বদলে যায়। বেলজিয়াম বয় স্কাউট আন্দোলন ছেড়ে হার্জকে যোগ দিতে হয় ক্যাথলিক স্কাউট ফেডারেশনে। এই পরিবর্তন মেনে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছিল হার্জের। এর পরও ‘কাঠবিড়ালী’ নামক ট্রুপের কমান্ডার নির্বাচিত হন হার্জ। হার্জ নিজের ছদ্মনাম দেন: ‘কিউরিয়াস ফক্স’ বা অনুসন্ধিৎসু খেকশিয়াল। স্কাউট আন্দোলনের সদস্য হিসেবে হার্জ কিশোর বয়সেই অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইটালী ও স্পেন সফর করেন। এ সময়ে আমেরিকা মহাদেশও হার্জের মনোযোগ আকর্ষণ করে, বিশেষ করে এর আদি অধিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে জানতে খুবই উৎসুক হয়ে ওঠেন হার্জ।

স্কাউট আন্দোলনে অংশ নিতে নিতেই স্কাউটিং সংক্রান্ত বিভিন্ন গল্পের ছবি আঁকতে শুরু করেন হার্জ। হার্জের বয়স তখন ১৭ বছর। ১৯২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এসব ছবি স্কাউট আন্দোলনের পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। এই ছবিগুলোতে ‘হার্জ’ নামটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। এসব বইতে হার্জের আনাড়ি হাতের ছাপ সুস্পষ্ট। তবুও ১৯২৬ সালের মধ্যেই হার্জ কয়েকটি কমিক চরিত্র সৃষ্টি করেন; তোতর, আনতোঁ ইত্যাদি। তোতরের বিভিন্ন অভিযানের কাহিনি ছাপা হয় ১৯৩০ পর্যন্ত। টিনটিনের জন্ম তখনও হয়নি অবশ্য তবুও তোতরের মধ্যে টিনটিনের ছায়া খুঁজে পাওয়া যাবে।

১৯২৫ সালে হার্জের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ হয়। হার্জ কাজ নেন ‘ভান্তিয়েম সিয়েক্ল’ (বিংশ শতাব্দী) নামক ব্রাসেলসের এক দৈনিক পত্রিকায়। এটি ছিল জাতীয়তাবাদী ও ক্যাথলিক ভাবাপন্ন পত্রিকা। এর মালিক, সম্পাদক ছিলেন নরবের ওয়ালেজ। পত্রিকার গ্রাহকদের মাসিক চাঁদা আদায়ের দায়িত্ব যে বিভাগের সেই বিভাগে কাজ করতেন হার্জ। এই কাজ করতে করতেই হার্জ বেলজিয়াম বয় স্কাউট পত্রিকার জন্য তোতরের কাহিনি এঁকে চলেন।

হার্জের বাবা-মা ছেলের আঁকার হাত দেখে চমৎকৃত হলেন। তাঁরা ভাবলেন, ছেলে যখন আঁকতেই চায় তখন কাজটা আরও ভালোভাবে শিখুক না কেন। তখনকার দিনে গ্রাফিক আর্টের এক স্কুল ছিল  ব্রাসেলসের একোল স্যাঁ লুক (Ecole Saint Luc)। হার্জ ভর্তিপরীক্ষা দিলেন এই স্কুলে, কিন্তু পাস করতে পারলেন না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অঙ্কনবিদ্যা শেখার আশা ছেড়েই  দিলেন হার্জ। কিন্তু হাল ছাড়লেন না। অঙ্কন-বিদ্যার ওপর কয়েকটি বই কিনে নিয়ে পড়তে শুরু করে দিলেন তিনি।

১৯২৬ সালে হার্জকে বাধ্যতামূলক মিলিটারী সার্ভিসে যোগ দিতে হয়েছিল। সাধারণ সৈনিক হিসেবে শুরু করেছিলেন সৈন্যবাহিনীতে। কিন্তু উন্নতি হতে দেরি হয়নি। প্রথমে কর্পোরেল, পরে কমান্ডার হলেন। মিলিটারী সার্ভিস শেষ করে হার্জ আবার ফিরে এলেন ভ্যান্তিয়েম সিয়েক্ল (Vingtieme siècle) (অর্থ : ‘বিংশ শতাব্দী’) পত্রিকায়। এবার আর কেরানির কাজ নয়। ফটোকপি বিভাগে তিনি হলেন শিক্ষানবিশ। এছাড়া ছাপচিত্র আর বিশেষ সংখ্যার ইলাস্ট্রেশনের কাজও তিনি করতেন। বিংশ শতাব্দীর পরিচালক ওয়ালেজ হার্জের প্রতিভা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি তাকে বই পড়ায় উৎসাহ দিতেন, পরামর্শ দিতেন নিজেকে সংস্কৃতিবান করে তুলতে। গুরুত্বপূর্ণ সব কাজের দায়িত্ব দিতে শুরু করেন তিনি হার্জকে। ওয়ালেজ চাইতেন হার্জ নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠুক।

‘ভ্যান্তিয়েম সিয়েক্ল’ পত্রিকায় অনেক দায়িত্ব পালন করতেন হার্জ: পেজ মেকিং, ইলাষ্ট্রেশন, লেটারিং সব কাজই করতে জানতেন তিনি। ওয়ালেজ চাইছিলেন পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বাড়–ক। ভাবলেন, অল্পবয়সীদের জন্য একটি সাপ্লিমেন্ট সংখ্যা বের করা যাক। স্বাভাবিকভাবেই হার্জকেই তিনি এই দায়িত্ব দিলেন। ‘পতি ভান্তিয়েম’-এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১লা নভেম্বর, ১৯২৮ তারিখে। এ সময়ে হার্জের সেক্রেটারি জার্মেন কিয়েকেন্সের সাথে হার্জের বিয়ের কথা পাকা হয়। বিয়ে হয় বছর চারেক পরে, ১৯৩২ সালে।

পতি ভান্তিয়েম পত্রিকার বিভিন্ন সিরিজের আঁকাআঁকির কাজ করতেন হার্জ। পরের জন্য ছবি আঁকতে আঁকতে ক্লান্ত হয়ে একদিন ঠিক করলেন নিজেই একটি কমিক সিরিজ সৃষ্টি করবেন। তোতরের পুরোনো ছবিগুলো হাতের কাছেই ছিল। তোতরের নামের দুই একটা অক্ষর পরিবর্তন করে চরিত্রটির নাম দিলেন ‘টিনটিন’। টিনটিন কিশোর কিন্তু পেশায় সাংবাদিক। কিশোরের মাথায় একটি ঝুটি লাগিয়ে দিলেন হার্জ আর সাথে দিলেন একটি ফক্স টেরিয়ার কুকুর, যার নাম মিলু (আনন্দবাজারের বাংলা অনুবাদে ‘কুট্টুস’), টিনটিনের চিরসাথী।

আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘ব্রিঙ্গিং আপ ফাদার’, ‘ক্যাটঝেনজ্যামার কিস্’ি, ‘ক্র্যাটি’ ইত্যাদি কমিক সিরিজ পড়ে হার্জ ঠিক করলেন তিনিও একটি কমিক সিরিজ সৃষ্টি করবেন। এই কমিকে ছবি থাকবে এবং কথাও থাকবে। ১৯২৯ সালের প্রথম সিরিজে সাংবাদিক টিনটিন অ্যাডভেঞ্চারে চললেন সোভিয়েত দেশে। সপ্তাহে দুইটি করে প্লেট আঁকতেন হার্জ। পরের সপ্তাহে কী ঘটবে টিনটিনের ভাগ্যে তা হার্জ নিজেও আগে থেকে জানতেন না অনেক সময়।

২৩শে জানুয়ারি ১৯৩০ তারিখে হার্জ নতুন একটি সিরিজ শুরু করেন : কুইক এ- ফ্লুপকে। ৮ই মে তারিখে বলশেভিকদের দেশে টিনটিনের অ্যাডভেঞ্চার শেষ হলো। খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হার্জের টিনটিন। সপ্তাহের যেদিন সাপ্লিমেন্টারি বের হতো সেদিন ভ্যান্তিয়েম সিয়েক্ল পত্রিকার বিক্রি বেড়ে যেতো প্রায় সাত গুণ।

সোভিয়েত দেশ থেকে ফিরে টিনটিন রওয়ানা হলেন কঙ্গোতে। ১৯৩২ সালে হার্জ টিনটিনকে পাঠালেন আমেরিকায়। শুরু হলো ‘আমেরিকায় টিনটিন’। টিনটিনের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছিল। এ বছর হার্জের সাথে যোগাযোগ হয় প্রকাশক ক্যাস্টারম্যানের। এই যোগাযোগের সূত্র ধরে অচিরেই টিনটিনের প্রথম এ্যালবাম প্রকাশিত হলো। প্রথমদিকে অবশ্য খুব একটা বিক্রি হতো না টিনটিনের এ্যালবাম।

‘ফারাওঁয়ের চুরুট’ যখন প্রকাশিত হচ্ছিল তখন হার্জের সাথে এক তরুণ চীনা ছাত্রের পরিচয় হয়। ছাত্রটির নাম চ্যাং চং জেন। চ্যাং-এর সূত্রেই চীন ও এর সভ্যতার সাথে হার্জের পরিচয়। চীনা ইতিহাস ও চীনা সমাজ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন হার্জ। পৃথিবীর আরও নানা বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন তিনি। নিজের কাজে অধিকতর মনোযোগী হয়ে ওঠেন হার্জ।

এক সময় প্রকাশিত হলো ‘নীল কমল’। এর পর প্রতি ১৫ মাসে একটি এ্যালবাম বাজারে আসতে শুরু করে। ১৯৩৭ সালে ‘কানভাঙ্গা মূর্তি’, ১৯৩৮ সালে ‘কৃষ্ণদ্বীপের রহস্য’, ১৯৩৯ সালে ‘অটোকারের রাজদণ্ড’। একই সাথে ‘কুইক এন্ড ফ্লুপকে’ নামে যে সিরিজটি শুরু করেছিলেন হার্জ তার কাজও চলতে থাকে, তবে টিমেতালে। এ সময়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন হার্জ। কমিক সিরিজ ছাড়া তিনি ইলাস্ট্রেশনও করতেন। সাময়িকী ও বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতেন। বিজ্ঞাপনের কাজও করতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। হার্জকে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে যেতে হলো বেলজিয়ামের উত্তর সীমান্তে। হার্জের দায়িত্ব ছিল সৈন্যদের ট্রেনিং দেয়া। কাজ অনেক, কিন্তু তার পরও প্রতি সপ্তাহে পতি ভ্যান্তিয়েমের জন্য টিনটিনের দুটি করে প্লেট পাঠাতে ভুল করতেন না তিনি। তখন প্রকাশিত হচ্ছিল ‘কালো সোনার দেশে’। ৯ই মে ১৯৪০ পর্যন্ত চললো এই কাহিনি। এদিন জার্মান বাহিনী ঢুকে পড়লো বেলজিয়ামে। ভ্যন্তিয়েম পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেল চিরদিনের জন্য।

হার্জ অগত্যা ল্য সোয়ার (Le Soir) (অর্থ : ‘সন্ধ্যা’) নামে অন্য একটি পত্রিকায় কাজ নিলেন। এর পরিচালক ছিলেন রেমোঁ বেকের। বেকের একটি ক্যাথলিক সংগঠনের পরিচালক ছিলেন। হার্জের সাথে পরিচয় সেই ত্রিশের দশকের প্রথম দিকে। হার্জ তাঁর দুটি বইয়ের ইলাস্ট্রেশন করেছিলেন। পতি ভ্যান্তিয়েমের মতো ল্য সোয়ার পত্রিকাও হার্জের উপস্থিতিকে কাজে লাগালো। ১৯৪০ সালের ১৭ই অক্টোবর তারিখ একটি সাপ্লিমেন্ট বের করলো তারা ‘যুব-সন্ধ্যা’ বা ‘ল্য সোয়ার-জ্যনেস’ নামে।

যুদ্ধের সময় পত্রিকা প্রকাশ করা সহজ ছিল না। কাগজ জোগাড় করা মুসকিল হয়ে পড়ছিল। ২৩শে সেপ্টেম্বর, ১৯৪১ তারিখে শেষবার প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে গেল সাপ্লিমেন্ট ল্য সোয়ার-জ্যনেস। এর পর ‘কাঁকড়া-রহস্য’ প্রকাশিত হয়ে চললো দৈনিক পত্রিকায়। সপ্তাহে দুটি প্লেটের জায়গায় তখন প্রতিদিন দুটি করে প্লেট দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই গল্প বলার ধারা বদলাতে হলো হার্জকে।

সব কথা বলাও যেতো না যুদ্ধের সময়। বেলজিয়াম তখন দখলদার জার্মান বাহিনীর অধিকারে। এ বিষয়ে হার্জ একটি কথাও বলেননি, একটি ছবিও আঁকেননি। এজন্য অনেকে অভিযোগ করেন, বাস্তব জীবনে কী ঘটেছে তা নিয়ে হার্জের যেন কোনোই মাথাব্যথা ছিল না কখনো। সমসাময়িক বাস্তব থেকে এই যে ‘পলায়ন’ এটা হার্জের অন্য অনেক কাহিনিতেই দেখা যায়।

১৯৪১ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ব্রাসেলস মুক্ত হলো। দখলদার বাহিনী ক্ষমতায় থাকাকালে যেসব সাংবাদিক নিয়মিত কাজ করে গেছেন কোনো না কোনো পত্রিকায়, তাদের সবার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। হার্জ কখনো ‘ল্য সোয়ার’ পত্রিকায় কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেননি। কিন্তু তবুও কাজ তো তিনি করেছেনÑ এই অজুহাতে বেশ কিছুদিন কোনো পত্রিকায় কাজ পাননি তিনি। অন্য অনেকের মতো শারীরিক কোনো লাঞ্ছনার শিকার অবশ্য তাঁকে হতে হয়নি। বাজারে নানা গুজব শোনা যাচ্ছিল হার্জ সম্পর্কে (‘তিনি নাৎসী সমর্থক’, ‘তিনি কোলাবোরেটর’ ইত্যাদি)। হার্জ অবশ্য এসবে কান না দিয়ে এক মনে নিজের কাজ করে যেতেন। এ সময়ে হার্জ যুদ্ধপূর্ব সময়ে প্রকাশিত এ্যালবামগুলো ঠিকঠাক করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

২৬শে ডিসেম্বর ১৯৪৬ তারিখে প্রকাশিত হলো টিনটিন জার্নাল। এ সময়কার রচনা: ‘সূর্যদেবের বাণী’। এ সময় থেকেই আসলে হার্জের খ্যাতি ছড়াতে শুরু করে। ১৯৪৮ থেকে ফ্রান্সেও প্রকাশিত হতে শুরু করে টিনটিন জার্নাল। হার্জ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৬০ সালে দশ লাখ কপিরও বেশি বিক্রি হয় টিনটিন অ্যালবাম।

পঞ্চাশের দশকের শেষে হার্জ প্রচুর দেশভ্রমণ করেন : ইতালি, ইংল্যা-, সুইডেন, গ্রীস, ডেনমার্ক। ১৯৭১ সালে প্রথমবারের মতো হার্জ আমেরিকায় পা রাখেন। দক্ষিণ ডাকোটা ভ্রমণকালে প্রথম রেড ইন্ডিয়ানদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। এদের সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল সেই কিশোর বয়সে যখন তিনি বয়স্কাউট ছিলেন।

ষাটের দশকের পর টিনটিনের প্রকাশনা চলতে থাকে, তবে অনেক টিমেতালে। ১৫ মাসে ১টি অ্যালবামের জায়গায় এক একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হতে কমবেশি ৫ বছর সময় লেগে যাচ্ছিল। ‘তিব্বতে টিনটিন’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৬৩ সালে ‘কাস্তাফিওরার অলঙ্কার’ (‘পান্না কোথায়?’), ১৯৬৮ সালে ‘ফ্লাইট ৭১৪ ফর সিডনি’, ১৯৭৬ সালে ‘টিনটিন ও পিকারো’ (‘বিপ্লবীদের দঙ্গলে’) প্রকাশিত হয়।

টিনটিন কাহিনি নিয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র তৈরি হয় ৬০ ও ৭০-এর দশকে। এর পর গত কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছে একটি থ্রি-ডি চলচ্চিত্র। এসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হার্জের পরিচিতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। অনেক অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন হার্জ। ১৯৭৯ সালে ব্রাসেলসে টিনটিনের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত ‘নীল কমল’ কাহিনিতে চীনের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি হার্জের সমর্থনের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৩ সালে হার্জকে সম্বর্ধিত করেন তাইওয়ানের চিয়াং কাই শেক। ১৯৭৬ সালে ৪২ বছর পর পুরোনো বন্ধু চ্যাং-এর খোঁজ পাওয়া যায়। ১৯৩৪ সাল থেকে এই চীনা বন্ধুটির সাথে হার্জের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।

আশির দশকের প্রথম দিকে হার্জ সভাসমিতিতে খুব একটা যেতেন না। বার্ধক্য সত্বেও একটা নতুন এ্যালবামের কাজ করছিলেন তিনি। একই সাথে ব্রাসেলস মেট্রো স্টেশনে বিশাল একটি ফ্রেস্কো তৈরির কাজও হাতে নিয়েছিলেন। হার্জের বয়স তখন প্রায় ৭৩ বছর। শরীর ভালো যাচ্ছিল না। ভুগছিলেন রক্তশূন্যতায়। ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ তারিখে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হার্জকে বেলজিয়ামের সেন্ট-লুক ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ৩রা মার্চ রাত ১০টায় এই ক্লিনিকেই হার্জ দেহ রক্ষা করেন।  মৃত্যুর পর হার্জের খ্যাতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় হার্জের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। অনেক পত্রিকাতেই কয়েক পাতা জুড়ে হার্জের জীবনকাহিনি ছাপা হয়।

টিনটিন চরিত্রটির আবির্ভাব এবং এর জনপ্রিয়তা আশ্চর্যজনক। পৃথিবীর ৪৫টি ভাষায় টিনটিনের ১৮০ লাখেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে গত ৭০ বছরে। সব বয়সের পাঠকদের কাছেই টিনটিন সমান জনপ্রিয়। গবেষকরা অনেক রকম হাইপোথিসিস বা কল্পানুমান হাজির করেছেন এই জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করতে। কিন্তু আগাগোড়াই দুর্বোধ্য রয়ে গেছে টিনটিনের জনপ্রিয়তা। ‘কী বলবো, আমি নিজেও এর বিক্রি দেখে হতবুদ্ধি হয়ে যাই!’ স্বীকার করেছেন হার্জ নিজেই।

টিনটিনের নাম করা মাত্রই মনে আসে অন্য আরও ‘টিন’ জনের এবং তিনজনের কথা। প্রথমেই আসবেন বদরাগী হুইস্কীপিপাসু ক্যাপ্টেন হ্যাডক। এঁর সঙ্গে টিনটিনের প্রথম দেখা ‘কাঁকড়া রহস্যে’। এর পর আছেন বিজ্ঞানী ‘ক্যালকুলাস’, যাঁর সাথে টিনটিনের পরিচয় ‘লাল বোম্বেটের গুপ্তধন’ কাহিনিতে। এছাড়া আছেন দুই ‘প্রায় জমজ’ পুলিশ অফিসার জনসন এ- জনসন। এরা দুজন প্রায় একই রকম দেখতে আর একই রকম বোকা বলে দুজনে মিলে একজন। দুই এক্কে এক! একেবারে প্রথম দিককার টিনটিন এ্যালবাম কঙ্গোতে টিনটিন থেকেই আছেন এঁরা দুজন। আর প্রথম থেকেই টিনটিনের সাথে আছে কৌতুহলী ফক্স টেরিয়ার জাতের কুকুর মিলু। স্মরণ করুন, হার্জের ছদ্ম নাম ছিল ‘কৌতুহলী খেকশিয়াল’। কৌতুহলে মানুষের চেয়ে কিছু কম যায় না মিলু। ‘তিব্বতে টিনটিন’ এ্যালবামে সে হুইস্কি খেয়ে মাতাল হয়, স্বপ্ন পর্যন্ত দেখে!

হার্জ তার পাঠকদের ছেড়ে গেছেন দুই দশক আগে। গত নব্বই বছরে অনেক পাঠকও টিনটিনকে ছেড়ে গেছেন। অনাগত ভবিষ্যতে বহু নতুন পাঠকের জন্ম হবে, তারা মরেও যাবে একদিন। টিন-এজার টিনটিনের টিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকবে না কখনোই, মরা-তো দূরের কথা। চিরকিশোর টিনটিন প্রজন্মান্তরে কিশোর আর টিনটিন-এজারদের সঙ্গ দিয়ে যাবে — এতে কোনোই সন্দেহ নেই।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close