Home অনুবাদ ডেভিড লেভিথান > ভূমিকম্পের কেন্দ্রে >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত উপন্যাস

ডেভিড লেভিথান > ভূমিকম্পের কেন্দ্রে >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত উপন্যাস

প্রকাশঃ January 15, 2018

ডেভিড লেভিথান > ভূমিকম্পের কেন্দ্রে >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত উপন্যাস
0
0

ডেভিড লেভিথান > ভূমিকম্পের কেন্দ্রে >> সোনালী ঘোষাল অনূদিত উপন্যাস

 

ধারাবাহিক উপন্যাস / পর্ব ১

 

[সম্পাদকীয় নোট : একটা পরিবার। বংশ পরম্পরায় এই পরিবারের সদস্যদের অদ্ভুত একটা বৈশিষ্ট্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তারা কোনো দুর্য়োগ, বিপর্য়য় দেখা দিলে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতো আর যে ভবিষ্যদ্বাণী করতো, তাই ফলে যেত, অর্থাৎ ঠিক ঠিক ঘটতো। কিন্তু তাদের কেমন লাগতো, কী হতো সেই সব ভবিষ্যদ্বাণী করা মানুষদের? অনেকটা থ্রিলার আর বাস্তবতার মিশেলে গড়ে উঠেছে এর কাহিনি। উপন্যাসটির নাম  In the Heart of the Quake। লেখক মার্কিন ঔপন্যাসিক ডেভিড লেভিথান। ঔপন্যাসিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বেশ জনপ্রিয়।]
আমার ভাই ঘুমোতে পারে না। ভূমিকম্প তাকে জেগে থাকতে বাধ্য করেছে। প্রাসাদোপম বাড়িগুলো তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ছে। আটকে পড়া নরনারীদের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ফুটপাতগুলো ফুলে ফেঁপে উঠে তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ছে। তার বিছানাটা কিন্তু আন্দোলিত হচ্ছে না। এসবই তার মনের আয়নায় ধরা পড়ছে। আমার ভাই, স্টেগের অবচেতন মনে কোনো কিছু সম্পর্কে অনুমান করার ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের পরিবারের এই ক্ষমতাটা বংশানুক্রমিক। এটা হচ্ছে এমন অনুভূতি যা ভবিষ্যতে কিছু ঘটলে সেটা দেখতে সহায়তা করে। ঘটতে বিলম্ব আছে এমন বিপর্যয়ের আগাম উপস্থিতি সে ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয়ের মাধ্যমে টের পেয়ে যায়। আর ঠিক এই মুহূর্তে তার অবচেতন মন ভূকম্পনের আভাসের ভয়ে যন্ত্রণায় ব্যাকুল। কিন্তু কবে, কখন, কোথায় ভূকম্পন অনুভূত হবে তার ভবিষ্যদ্বাণী করতে সে অক্ষম। আমরা স্টেগকে গরম দুধ, অতিরিক্ত বালিশ আর ঘুমপাড়ানি ওষুধ দিয়েছি। কিন্তু এগুলো কোনো কাজেই লাগছে না। তার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয়ের ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করা যাবে না। বিছানায় শুয়ে আমি তার কথা শুনতে পাচ্ছি। মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় দেয়ালের দিকে কষ্ট করে তার এগিয়ে যাবার শব্দ টের পাচ্ছি। ভয়ে আর হতাশার গ্লানিতে সে কেঁদে চলেছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছি। রাত্রিকালীন দুঃস্বপ্নে ভূকম্পনের আগমন-বার্তা টের পাওয়ার কয়েকদিন পর এক রাতে চুপিসারে তার ঘরে গেলাম। ভেবেছিলাম সে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ঠিকমতোই ছিল। শাস্ত, চন্দ্রালোকে পূর্ণ তার ঘর। আমি নিঃশব্দ চরণে তার শয্যার সামনে উপস্থিত হলাম। দেখলাম চোখ দুটো সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় সে শুয়ে রয়েছে।
ফিসফিস করে সে বলছিল, “থামাও, দয়া করে একে থামাও।”
আমরা সবেমাত্র এক প্রবল ঘূর্ণিবাত্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। স্টেগের অবচেতন মন আগেই এই বিপর্য়য়ের আগাম সঙ্কেত পেয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের জীবনরক্ষা পেয়েছিল। তবে এর অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটার জন্য ও মানসিকভাবে প্ৰস্তুত ছিল না। সামান্যতম প্রত্যাশার আগেই সে এর সংস্পর্শে এল। মানসিক স্থৈর্য হারিয়ে ফেলল। তার মনে হল পৃথিবীটা দুলে দুলে উঠছে। এই অনুভূতিটা ঠিক কেমন সে আমাকে জানাবে। আমাদের আটউড পরিবারের ধারাবাহিক উপাখ্যানে আমি তা লিপিবদ্ধ করে রাখবো। তারপর আমরা দুজনে একসঙ্গে তার স্বপ্নের রহস্য সমাধানের সূত্র বের করার জন্য অনুসন্ধান চালাব। ঘটনাটা ঠিক কখন, কোথায় ঘটবে এই রহস্যের সন্ধানে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করবো।
নামহীন একটা ধ্বংসস্তূপের উপর উপবেশনকারী একটা পুতুল স্টেগের নজরে এল। তাকে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় পুতুলটা না দেখার ভান করল।
সাহায্যের জন্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ স্টেগের কানে এল। আগুন আর গ্যাসের গন্ধ তার নাসারান্ধে প্ৰবেশ করল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, সে অনুভব করল মাটিটা দুলছে। মনে হচ্ছিল, সেও বুঝি পড়ে যাবে। নিজেকে স্থির, অবিচল রাখার জন্য সে কিছুই করতে পারছে না। বারবারই সে পড়ে যাচ্ছিল। আর ঠিক তারপরই ছাদ ধসে পড়ল, কড়ি-বরগাগুলো তাকে মাটিতে চেপে ধরল। দ্রুত অপসৃয়মাণ গাড়িগুলোর উপরে গির্জা-মন্দির হুড়মুড় শব্দে ভেঙে পড়ল।
সারাটাক্ষণ সে তীক্ষ্ণ আর্তনাদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। জেগে ওঠার পরেও সেই আর্তনাদের রেশ মিলিয়ে গেল না।

 

আমরা নিজেদের বাড়িতে ছিলাম না। এখনও পর্যন্ত সেখানে প্রত্যাবর্তন করাটা নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে না। কোনো এক অদ্ভুত পস্থায় আমি আর স্টেগ দুজনেই নির্বাসিত
হয়েছিলাম। সঠিক খবর সংগ্রহের জন্য অপারেশন সিক্রেট স্টর্ম-এর অনুমোদিত প্রতিনিধি জেমস টেগার্টের মাধ্যমে সরকার আমাদের অনুসন্ধান করছিল। আমাদের পারিবারিক এই ইন্দ্ৰিয়চেতনা, অর্থাৎ আসন্ন কোনো দুর্য়োগের কথা আমরা আগেই জানতে পারি, সেটা তার জানা ছিল। সরকারের নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমার পিতার এই চেতনাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন।
বছর দুয়েক আগে কার্যাদি সাধনের জন্য টেগার্টের প্রেরিত একজন দূতের হাতে আমার মা, বাবা দুজনেই প্রাণ হারান।
তাদের সেই শূন্যস্থানে টেগার্ট আমার ভাই স্টেগ আর আমাকে চাইছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি এ আশা দুরাশা মাত্র। এর কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু টেগার্ট এমনই একজন ব্যক্তি যে প্রত্যুত্তরে “না” শুনতে অভ্যস্ত নয়। আমাদের দুজনকে কেনমোর আর কানসাস- যে দুটো শহরে আমরা টর্নেডোর মোকাবিলা করেছিলাম, সেখান থেকেই ধরবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এখন মাতামহের অতন্দ্র তত্ত্বাবধানে সে আমাদের বাড়িতেই রয়েছে। আইনসম্মতভাবে কিছু করা যাবে বলে আমাদের মনে হয় না। কিন্তু পুরোপুরি (একশো ভাগ) নিশ্চিত না হয়ে আমরা ফিরে যেতে চাইছি না। এই সময়ে আমরা ওয়াশিংটনের ষোলো নম্বর রাস্তায় অবস্থিত মার্টি চেস্টারের অ্যাপার্টমেন্টেছিলাম। ডি. সি. মার্টি কনগ্রেশন্যাল কমিটিতে কাজ করেন। আমাদের বাবা-মা ১৯৬০ সালে এক ভয়ঙ্কর দাবানল থেকে তার বাবা-মাকে বাঁচিয়েছিলেন।
(জীবদ্দশায় আমাদের পিতামাতা শত শত লোককে দৈব দুর্বিপাক থেকে রক্ষা করেছিলেন। প্রাণে বেঁচে যাওয়া সেইসব মানুষজনের অধিকাংশ আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি।)
মার্টি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা বিভাগ (FBI) এবং সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি (CIA)-র সঙ্গে তার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে টেগার্টকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে আমার মাতামহ- যাঁর সঙ্গে আমরা থাকি, আমাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে লাগলেন। সবার অলক্ষ্যে দাদুর বাড়িতে কীভাবে ঢোকা যায়, সেই উপায়টা জানা ছিল। কিন্তু আমরা যদি সেখানে থাকি তাহলে ধরা পড়ে যেতে পারি। নিজেদের উদ্দেশ্য ও কাজগুলিকে গোপন রাখার জন্য দিনের বেশিরভাগ সময়টাই আমরা মার্টির অ্যাপার্টমেন্টেই থাকতাম। স্টেগ টিভিতে নানান অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটাত। আমি তাকে ঘুমোতে নিয়ে যাবার জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু জানতাম, মুখে প্রকাশ না করলেও সে ঘুমোতে ভয় পেত। স্টেগ যখন টিভি চ্যানেলগুলো ঘোরাতে ব্যস্ত থাকত আমি তখন আটউড পরিবারের ধারাবাহিক উপাখ্যানগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। সবচেয়ে পুরাতন ধারাবাহিক উপাখ্যানটি লেখা হয়েছিল ১৮৪৩ সালে। তখন থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের অবচেতন মনে জেগে ওঠা বা অবলোকন করা ঘটনা এবং তৎসক্রান্ত প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লিখে রেখে গেছেন। বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়কে বারোটি খণ্ড তারা লিখে রেখে গেছেন। স্টেগের প্রথম ভূমিকম্প সম্পর্কে আগেই সতর্কীকরণ বার্তা পাবার পর আমি দাদামশাইকে ভূকম্পন সম্পর্কিত বইগুলো মধ্যস্থতাকারীদের মারফত পাঠাতে অনুরোধ জানাই। একশো বছরেরও বেশি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী মূল্যবান বইগুলো পাশে নিয়ে আমি বসেছিলাম। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাদের গমন পথ অনুসরণ করে পারিবারিক উপাখ্যানগুলোকে সযত্নে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার মহান দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম, স্টেগ যদি তার অবচেতন মনে বিপর্যয় সম্পর্কে আগাম সতর্কীকরণ বার্তার একজন অন্যতম বাহক হয়ে ওঠে, তাহলে আমি সেই ইতিহাসের ধারক হব। মনে হচ্ছিল এটা একটা নিরপেক্ষ পেশা হয়ে উঠবে।
স্টেগকে সাহায্য করার কোনো পস্থা খুঁজে পাওয়া যায় কি না দেখতে পারিবারিক উপাখ্যানগুলোতে চোখ বুলাচ্ছিলাম।
আমার প্রপিতামহের পিতা খ্রিস্টোফার ১৯০৬ সালের ১৬ এপ্রিল লিখেছিলেন :
চায়ের পেয়ালা ধরতে পারছিলাম না। সারা টেবিলে চা ছলকে পড়ে গেছে। ট্রেনের অন্যান্য আরোহীরা আমাকে স্নায়বিক দুর্বলযুক্ত একজন যথার্থ প্রবীণ ব্যক্তি বলে ভাবতে শুরু করে। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমি তো আর সত্যি সত্যি বৃদ্ধ নই। হাঁটতে পারব না নিজের আসনেই বসেছিলাম ।
খ্রিস্টোফার আটউড তখন ট্রেনে করে সানফ্রান্সিসকোর পথে। আগের রাতে তার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় ১৯০৬ সালে যে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে, তার প্রথম সতর্কবার্তা জানিয়ে দিয়েছিল। এর ঠিক কয়েকদিন বাদে খ্রিস্টোফার ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পূর্বাভাস পান। (ইতালির মাউন্ট ভিসুভিয়াসের বিস্ফোরণের সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী তিনি করেছিলেন।)
১৯৬৪ সালে বাবা যখন মাত্র পনেরো বছরের কিশোর তখন নির্ঘুম রাতে দেখা একটা স্বপ্ন সম্পর্কে লিখছেন :
আমার খুব শীত করছিল। মনে হচ্ছিল যেন এক তুষার এলাকার ভিতরে রয়েছি। দূরে বরফ ভেঙে পড়ার শব্দ কানে আসছে। এটা কেবলমাত্র বরফ নয়, এটা বরফ বিছানো বিস্তৃত প্রান্তর। আমি মাটির ওপর দাঁড়িয়ে টলছিলাম আর বিভিন্ন জিনিস হঠাৎ আমার দিকে নিক্ষিপ্ত হতে লাগল। একটা গাড়ি আমাকে প্রায় চাপা দিতে যাচ্ছিল। সেটা আচমকা শূন্যে লাফিয়ে উঠল আর একটা বড় বাড়ির ভেতরে হুড়মুড় শব্দে ভেঙে পড়ল। আমি ভূপাতিত হলাম, মাটির গভীরতর অংশে ঢুকে গেলাম।
অচিরেই আমার ঠাকুরদা এডওয়ার্ড সেই একই স্বপ্নে আচ্ছন্ন আক্রান্ত হলেন। ঠাকুরদার বর্ণনানুযায়ী, জাহাজগুলোকে শূন্যে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। নোঙরগুলো নির্জীব লাট্টুর মতো দুলছিল। বিভিন্ন দিক থেকে সেগুলো তার দিকে এগিয়ে আসছিল। তিনি ধরণীতে শায়িত হলেন |
ঠিক এভাবেই তিনি ১৯৬৪ সালে নোঙর বাঁধার স্থানে আমেরিকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সংঘটিত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। মাত্র পাঁচ মিনিটে দুই শত বিলিয়ন টনের সমকক্ষ প্রায় কুড়ি হাজার মেগাটন শক্তি একেবারে মুক্তি পেয়ে অতীব শক্তিশালী বিস্ফোরক ‘ট্রাইনাইট্রোটলিন’ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে বেরিয়ে এসেছিল।
আমার ঠাকুরদা আর বাবা দুজনেই যথাসময়ে এই বিস্ফোরণের আগাম সতর্কবার্তা ঘোষণা করে প্রচুর প্রাণহানি রোধ করতে পেরেছিলেন।
আমি ভাইকে আমাদের পরিবারের ধারাবাহিক উপাখ্যানগুলো পড়ে শোনাতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এর কিছু কিছু ঘটনা হয়তো তার হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত করতে সক্ষম হবে।
কিন্তু স্টেগ এগুলোর দিকে তেমন একটা ভ্রুক্ষেপ করলো না। একবার আমি পারিবারিক উপাখ্যানকে এড়িয়ে আলাস্কায় বাবার প্রত্যক্ষ করা একটা মুভি থিয়েটারের দোতলা অংশ সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হবার ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তার কাছে তুলে ধরেছিলাম। দুঃস্বপ্নের মধ্যেও এই ঘটনা আরও খারাপ অবস্থায় স্টেগকে তাড়া করে বেড়াত। মুভি থিয়েটারের দুঃস্বপ্ন তার মাথায় সদাসর্বদা ঘোরাফেরা করতে লাগল। এর পতন হওয়া অবধি তাকে অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সত্যিসত্যি ঘটনাটা ঘটেছিল।
স্টেগ বেশ কিছুদিন কেনমোরে আমাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়া জ্যাক আর রাচেল এডের সঙ্গে ইমেলের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখত। রাচেল আমারই সমবয়সী, জ্যাক আমাদের থেকে বড়। তার বয়স সতেরো আর ভাই স্টেগের এগারো। স্টেগের মতোই রাচেল ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয়ের অধিকারী ছিল। তার পরিবার যদিও একে বার্তা বলে গণ্য করতো। কেনমোরে রাচেল আর জ্যাকের বাড়ি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ের আগমনবার্তা স্টেগ আর রাচেল আগেই পেয়ে গিয়েছিল। আমরা তাদের কথা প্ৰথমে বিশ্বাস করিনি— ধারাবর্ণনা অনুসারে কয়েক দশক ধরে আটউড পরিবারের সঙ্গে এডের পরিবারের প্রবল প্ৰতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। কিন্তু কেনমোরেতে জ্যাক ও রাচেল আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার পর মনে হয়েছিল অস্বাভাবিক কোনো ঘটনায় ভুল প্রমাণিত না হওয়া অবধি অতীতের সব শক্ৰতা ভুলে আমরা মিত্ৰতা সূত্রে আবদ্ধ হই।
রাত্রিকালীন দুঃস্বপ্নে দেখা ভূমিকম্প সম্পর্কে স্টেগ ওদের দুজনকে কিছুই জানায়নি। রাচেল সম্প্রতি এরকম কোনো বার্তা পেয়েছে কি না। স্টেগ ভাসা ভাসা ভাবে তা জানতে চেয়েছিল। প্রত্যুত্তরে এরকম কোনো বার্তা না পাবার কথাই সে জানিয়েছিল। স্টেগ আমার কাছে যদিও এটা স্বীকার করবে না, তাই আমি তাকে বোঝাই যে এতে সে নিষ্কর্মা প্রতিপন্ন হবে, দুঃস্বপ্নের বোঝা তাকে একা একাই বহন করতে হবে, সম্পূর্ণ একাই।
কোনো কিছু ভাবনাচিন্তা না করেই আমি বললাম, “মনে হয় রাচেলকে তোমার কী ঘটতে পারে, বলা উচিত।” সপ্তাহখানেক একভাবেই কেটে গেল। পারিবারিক উপাখ্যানের পঠিত অংশ তার উপর আরোপ করে উত্তরের প্রতীক্ষায় রইলাম। দশ ফুটের চেয়ে কম দূরত্বে বসে থাকা সত্ত্বেও সে না শোনার ভান করল। তার পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে টিভি সেটের সামনে দাঁড়িয়ে উপদেশের ছলে বললাম, “ব্যাপারটা মন থেকে উড়িয়ে দাও।” যদিও আমি টিভিটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিলাম। তবুও সে তার মনকে টিভির মধ্যে কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করে বলল, “বিশ্বাস কর, যদি ক্ষমতা থাকত আমি ব্যাপারটা ছেড়ে দিতাম।”
আমি নিশ্চল অবস্থায় দাঁড়িয়ে তার চোখর নীচে কালি, বিবর্ণ গাত্ৰবৰ্ণ লক্ষ্য করলাম। শেষ কবে তাকে রসিকতা করতে দেখেছিলাম তা স্মরণে আনতে চেষ্টা করলাম।
গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে উঠে তীব্র আর্তনাদ করে অনুনয়ের সুরে সে বলে উঠল, “আমাকে এভাবে খেয়াল করাটা বন্ধ কর।”
জানতে চাইলাম, ‘কী বলতে চাইছ?” প্রত্যুত্তরে তার কাছ থেকে ভালো কোনো কিছু শুনতে চেয়েছিলাম। তার কথায় মর্মাহত হলাম, মনে হল যেন কেউ আমায় সজোরে চপেটাঘাত করেছে।
পায়চারি করতে করতে সে উচ্চৈঃস্বরে বলে চলল, “অনুগ্রহ করে আমার দিকে লক্ষ্য রাখা বন্ধ কর, কিছু বলতে দেবার জন্য অপেক্ষা কর! রাতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা বন্ধ কর। আমার অবচেতন মনকে প্রস্তুত করানোর আশা ত্যাগ কর। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে কী ঘটে চলেছে তার হদিশ নেওয়া বন্ধ কর। কেননা কারণটা আমারও অজানা। হায় ঈশ্বর! আমার মনে কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে, আমি কিছুই জানি না।”
তাকে শান্ত হতে বলে সতর্ক করলাম। পদচারণা করতে করতে সে হোঁচট খেল।
সে বলল, “তাকাও”, একাদশবর্ষীয় বালক অপেক্ষা তার কণ্ঠস্বর অনেক বেশি পরিণত শোনাচ্ছিল। “আমি জানি আমার অবচেতন মনের সঙ্গে একাত্ম হবার তোমার প্রবল ইচ্ছা। আমিও চাই অবচেতন মনে তুমি আমার সঙ্গী হও। তাহলে আমিও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব, বাড়ি ফিরতে পারব, স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব। অনেক লোকের প্রাণরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলাম ভেবে আমি আর দুশ্চিন্তা করব না। পরিবারের অন্য সদস্যরা যদি প্রাণহানি থেকে অসংখ্য মানুষকে বাঁচাতে পারে তাতেও গ্রাহ্য করব না। আমি এগুলো সব ভুলে যেতে চাই।”
তীব্র বেদনায় আর্তনাদ করে বললাম, “এভাবে বোলো না, কারণ ঘটনা যে-কোনো সময় ঘটতেই পারে, আর তখন…” অবজ্ঞাপূর্ণ বিরোধিতাসহ সে বলল, “আমি এগুলো ভুলে যেতে চাই। শুনতে পাচ্ছ, আমি চাই এগুলো আমার জীবন থেকে মুছে যাক৷”
তারপরেই সে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সজোরে দরজা বন্ধের শব্দ কানে এল। বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ার আওয়াজ অনুভব করলাম। তার কান্নার আওয়াজ শোনার প্রত্যাশায় উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করে ব্যর্থ হলাম।
টিভিটা প্রথমে বন্ধ করলেও নীরবতা অসহ্য মনে হওয়ায় আবার টিভি চালালাম। দরজার চাবি ঘোরানোর শব্দ শুনলাম। কয়েক মুহূর্ত পরেই মার্টি ঘরে প্রবেশ করল।
যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে সে জিজ্ঞাসা করল, “কী ব্যাপার?” তার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
টাইটাকে আলগা করতে করতে সে বলল, “একটা জরুরি ঘোষণা দিতে এখানে এসেছি। কিন্তু স্টেগ কোথায়? তাকে তো দেখছি না।”
সত্য গোপন করে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বললাম, “সে ঘুমাচ্ছে। যা বলার আমাকেই বল।”
মার্টি হেসে বললো, “আমি তোমাদের মাতামহের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনি জানিয়েছেন যে তোমরা এখন বাড়ি ফিরতে পারো।”

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close