Home সাক্ষাৎকার ডেরেক ওয়ালকট > ‘…আমারও এরকম একটা বই হোক’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ২ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

ডেরেক ওয়ালকট > ‘…আমারও এরকম একটা বই হোক’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ২ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ June 11, 2017

ডেরেক ওয়ালকট > ‘…আমারও এরকম একটা বই হোক’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ২ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : নোবেল বিজয়ী প্রয়াত ক্যারিবীয় কবি ডেরেক ওয়ালকটের সবচেয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল প্যারি রিভিউতে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন এডওয়ার্ড হির্শ। এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ সেই সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম। কয়েক পর্বে তীরন্দাজে এটি প্রকাশিত হবে। ইতিপূর্বে এর প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছিল, আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় পর্ব।]

পর্ব ২

“আমিই প্রথম এই অগভীর হ্রদের দিকে তাকিয়ে আছি, আমিই প্রথম এই ভূ-ভাগ দেখছি। এখানে চাইলেই তুলি হাতে নেয়ার অসামান্য অধিকার আছে আমার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেখক সি.এল.আর. জেমসের পরবর্তী কালের সবাই, অর্থাৎ  আমার প্রজন্মের সবাই সত্যিকারের সৃজনী অনুভূতির শিহরণ অনুভব করেছিলেন।”

আপনি কিভাবে লেখেন? কবিতা এবং আরাধনার মধ্যে যোগসূত্র টানার জন্যে লেখালেখিটা কী আপনার কাছে তাত্ত্বিক, মানে পদ্ধতিগত কিছু?

আমি জানি না, ক’জন লেখক কিছু একটা লিখতে বসার আগেই তাদের লেখালেখির ব্যক্তিগত প্রস্তুতিমূলক প্রক্রিয়াটা কেমন, স্বীকার করতে চাইবেন না। কিন্তু আমি মনে করি সকল শিল্পী ও লেখক যেদিন বা যে-রাতে লিখতে বসেন তার পূর্বমুহূর্তে তাদের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যায়। আরো সংক্ষেপে বলতে গেলে এটি অনেকটা এরকম, প্রত্যেকটি লেখার পেছনেই লেখকের ব্রত এবং প্রচেষ্টা থাকে। এককথায়, এটাই রীতি। প্রত্যেক লেখকেরই নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি থাকে, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, এমনকি নিজস্ব দেহভঙ্গিও থাকে; আর সেসব নিয়েই তিনি শূন্য খাতার সামনে বসেন। এককথায় বলতে গেলে, লেখক লিখতে বসার আগে অনেক কিছু অতিক্রম করে তারপর লিখতে বসেন। আমি বোঝাতো চাচ্ছি, এটা অনেকটা ক্যাথলিকদের স্নানে যাওয়ার মতো, জলে ডুব দেয়ার আগে নিজেকে অতিক্রম করে যেতে হয়। অসাধারণ কিছু করার ঐকান্তিক চেষ্টা অবশ্যই প্রথাসিদ্ধ। আমি লেখালেখির ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব নিয়ামকগুলো কখনো সেইভাবে খেয়াল করে দেখিনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, যদি কেউ অনুভব করে তার মাথায় একটি কবিতা আসছে, তবে সে টাইপরাইটারের ঝনঝন অথবা, জানালার বাইরে থেকে আসা যানবাহনের শব্দ অথবা অন্য যে-কোনো শব্দই হোক না কেনো, সেখান থেকে নিভৃত কোনো স্থানে প্রস্থান করবে, যা তার চারপাশের সবকিছু থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। আপনি যখন যে-কাজ করবেন, তা প্রকৃতপক্ষে আপনার ব্যক্তিসত্তার পুনরাবৃত্তি নয়, সেটা আপনার অন্তর্গত সুপ্তাবস্থার পুনরাবৃত্তি। আর একারণেই আপনার নিজস্বতার পরিবর্তে আপনার সামনে যা আছে, তা আপনার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আবার একইভাবে বলতে গেলে, এটা বলা কিছুটা দম্ভও মনে হতে পারে- আমি যখন উপলব্ধি করি আমি ভালো কিছু লিখেছি, প্রথাগতভাবেই আমি স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই, প্রার্থনা করি। এটা অবশ্য সব সময় ঘটে না। প্রতিদিন করি না আমি। আমি সন্ন্যাসী নই, কিন্তু যখনই আমি ভালো কিছু করতে সমর্থ হই, স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিই, কারণ আমি অনুভব করি, এটি সামান্য সৌভাগ্য নয়, চলমান আশির্বাদ, যা অন্য যে-কারো কাছে ধরা দিতে পারতো। শুরু এবং শেষের মধ্যে, এবং যে মূল রচনাটি অগ্রসর হতে থাকে, সেই কাজের সঙ্গে একধরনের মোহ জড়িয়ে থাকে। মোহটি অনেকটা এরকম যে, আপনি সেখানে প্রবেশ করতে চাইবেন আর সেখানে আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিটি নিয়ামক রচনাটির অগ্রগতির জন্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করবে, তার সঙ্গে যুক্ত থাকা। এমন কোনো উপায় নেই যা দিয়ে আপনি এই মোহকে নিবৃত্ত করতে পারবেন। শেষের দিকে, আমি খুব ভোরে আমার  ঘুম ভেঙে যাওয়াটা প্রত্যক্ষ করি। এটা সম্ভবত মধ্যবয়সের শেষ স্তরে এসে। বিষয়টা আমাকে অনেকটা ব্যথিত করেছে। আমার অনুমান, এটা আমার প্রথাসিদ্ধ অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছিল। এরকম সময়ে আমি উঠে গিয়ে এক কাপ কফি বানাই, সেটাকে কেটলিতে ঢেলে দিই এবং একটা সিগারেট ধরাই। এই সময়ে এসে আমি নিশ্চিত হতে পারি না যে আমি কী লেখালেখি করার জন্যে ঘুম থেকে উঠেছি, নাকি এককাপ কফির জন্যে। মনে হয় আমি যেন ধুমপানের জন্যেই এতো ভোরে জেগে উঠি, লেখালেখির জন্যে নয়।

 তাহলে ঠিক কোন সময়টায় আপনি লেখালেখি করেন?

সবসময় লেখালেখিটা একরকমভাবে ঘটে না। কখনো কখনো রাত সাড়ে তিনটা হতে পারে,  আর আপনি জানেন, এটা খুব একটা ভালো সময় নয়। তবে সচরাচর গড়-সময় পাঁচটা বলতে পারেন। এটা নির্ভর করে আমি কতোটা ভালোভাবে ঘুমাতে পেরেছি তার উপর। কিন্তু সেই সময়টা, দিনের পূর্ণ অংশটা ক্যারিবীয় দ্বীপে একটা নান্দনিক সময়- আমার জন্যে। আমি শীতল অন্ধকার আর উদীয়মান সূর্যের দ্যুতি ও পুলক ভালোবাসি। আমার মনে হয় আমি বলতেই পারি, বিশেষ করে যেখানটায় আমার অবস্থান, প্রত্যুষের আঁধার ও সূর্যোদয় এবং এককাপ কফি আর আমার লেখালেখি – এটা যেন একটা চিরাচরিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলতে পারি, এটি একটি ধর্মীয় আচরণের মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর নিজস্বতা আর বিশেষ পারিপার্শ্বিকতা রয়েছে। আমার নিজস্ব চেতনাবোধ যে জাগ্রত আছে, এটা আমি অনুভব করতে পারি।

সম্প্রতি আমি আপনাকে বলতে শুনেছি যে, আপনি মেথোডিজম দ্বারা নিজেকে গভীরভাবে বিনির্মাণ করে নিয়েছেন। এটি মূলত কীভাবে করতে পেরেছেন?
ব্যক্তিগত একটি দিক হতে, আমার মনে হয়, আমার মধ্যে খুব সাদামাটা, সোজাসুজি ধরনের মেথোডিজম রয়েছে। মেথোডিজমে বিশ্বাসের পেছনে যে প্রশান্ত, প্রায়োগিক কারণ রয়েছে, আমি তার প্রশংসা করি। এটা খুবই বাস্তবসম্মত জীবনাচরণ পদ্ধতি। আমি কোনো  গোঁড়ামিপূর্ণ ধর্মীয় মৌলবাদ নিয়ে কথা বলছি না। এর যথার্থ শালীনতা বোঝানোর জন্যে সর্বোৎকৃষ্ট শব্দপ্রয়োগ করছি মাত্র। একজন মেথোডিস্ট হওয়ার সুবাদে আমি শালীনতা ও বোঝাপড়ার শিক্ষা পেয়েছি। সবসময়ই, যে-কেউ তার নিজস্ব আচার আচরণের জন্যে স্রষ্টার কাছে দায়ী থাকেন, কোনো পুরোহিত কিংবা দেবদূতের কাছে নয়। একদিক থেকে আমার মনে হয় আমি আমার প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে এসব বলতে চেয়েছি। প্রটেস্টান্টিজমে শক্তিশালী একটি দিক আছে যা বিষয়গুলোকে কার্যকরভাবে সহজবোধ্য করে তোলে। আমার জীবন ও কর্মের এই পর্যায়ে এসে নিজেকে একজন তক্ষক মনে হয়, ঠিক যেরকম সাবলীল ও যথার্থভাবে  কোনো তক্ষক তার পরিমণ্ডল আর কাঠামো তৈরি করে নেয়, সেইরকম আর-কি। চতুষ্পদী শোক নিয়ে আসলে আমি কাজ করছি, অথবা করেছি, এবং আমি অনুভব করি সেখানে কিছু একটা আছে যা খুবই সাধারণ, সেখানে নিগূঢ় কিছু নেই, এটা আপনি জানেন। যতটা সম্ভব আমি নিগূঢ়তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আর সেজন্যই হয়তো আমি আমার মিত্রাক্ষর কবিতায় সহবোধ্য, সংক্ষিপ্ত, খুবই কথ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ চতুষ্পদী শোক লেখার চেষ্টারত অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করি; যা প্রকৃতপক্ষে কবিতা হয়ে ওঠে তার ঐসব ত্রিমাত্রিকতায়। অন্য সকল কাঠামোকে তখন অতি অলঙ্কৃত এবং বাহুল্য বলে মনে হয়। এর মানে আমরা বলতেই পারি, একজন তক্ষক ঠিক ততোটাই প্রথাসিদ্ধ হয়ে ওঠে, যতোটা সে তার অবকাঠামো পরিমাপ করে সেগুলোকে চতুর্মাত্রিকভাবে সাজান এবং সেই অনুযায়ী  চলেন। এভাবেই তক্ষকের চেয়েও কবিতার কাঠামোই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে|
অ্যানাদার লাইফ থেকে জানা যায়, আপনি পেশা হিসেবে আঁকাআঁকির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন এবং কবিতায়  মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও সম্প্রতি আপনি আবারও জলরঙ নিয়ে কাজ করছেন বলে মনে হচ্ছে। কী এমন ঘটেছিল যে আপনি আবার আঁকাআঁকিতে ফিরে এলেন?
অ্যানাদার লাইফে আমি যা বলতে চেয়েছি, চিত্রকর্ম সেরকম যুক্তির দ্বারা নির্দেশিত বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজ নয়। এটি এমন একধরনের কর্ম যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তুলির আঁচড়ের মধ্যদিয়ে খু্বই কায়িকভাবে এগিয়ে যায়। আমি সবসময়ই অনুভব করে আসছি যে কয়েক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তি, কয়েক ধরনের পূর্বনির্দেশনা, কোনো কাজ করার পূর্বেই সে সম্পর্কে কয়েক ধরনের সমালোচনা সবসময় আমার আঁকাআঁকির ক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। আমি সুন্দরভাবে নিয়মিত আঁকাআঁকির চর্চা করে আসছি। আমি মনে করি, আমি জলরঙে পারদর্শী হয়ে উঠছি। আমি রঙ ব্যবহার খুব একটা অসুন্দর নয়। আমার মনে হয় আমি যথার্থ তৈলচিত্রও করতে পারতাম।প্রকৃতপক্ষে, আমি যদি চাইতাম, তবে একজন ভালো চিত্রকর হতে পারতাম। আমি আমার সেই ইন্দ্রিয়ানুভূতি অনুভব করতে পারি। আমি জানি এই অনুভূতিটা কেমন, কিন্তু আমি তাতে পরিপূর্ণ হতে পেরেছি, এরকমটা অনুভব করি না।  জলরঙে মোটামুটি ভালো ছবি আঁকতে পারি, এরকম একজন আঁকিয়ে হতে পেরেই আমি তুষ্ট। কিন্তু মোটামুটি মানের ভালো কবি হিসেবে আমি তুষ্ট নই। এটি একেবারেই ভিন্ন একটি বিষয়|
আমার একথাটি কি ঠিক যে, আপনার প্রথম কবিতাদ্য ভয়েস অব সেন্ট লুসিয়া’ খুবই অল্প বয়সে, অর্থাৎ মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়েছে? আমি এটাও পড়েছি যে, কবিতাটি স্থানীয়ভাবে দারুণ একটা বিতর্ককে উস্কে দিয়েছিল।
আমি এমন একটি কবিতা লিখেছিলাম, যেখানে আমি চার্চের পরিবর্তে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে স্রষ্টাকে জানার কথা বলেছিলাম। কবিতাটি ছিলো মিল্টনীয় ভাবধারার এবং প্রকৃতিকে জানার পথ হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে।

আমি কবিতাটি স্থানীয় সংবাদপত্রে পাঠাই এবং কবিতাটি ছাপাও হয়। অবশ্য তরুণ বয়সে পত্রিকায় নিজের ছাপানো লেখা দেখতে পাওয়া একটি বিশাল প্রাপ্তি। তারপর পত্রিকাটি একটি চিঠি ছাপে। চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন একজন পুরোহিত। তিনি কাব্যিক ভাষায় বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, আমি যা লিখেছি সেটা ঈশ্বরনিন্দায় পূর্ণ, জঘন্য অপরাধ। তিনি আরো লিখেছিলেন, চার্চই হচ্ছে স্রষ্টাকে পাওয়ার পথ। এমন একজন পূর্ণবয়স্ক বিজ্ঞ ইংরেজ যাজকের কাছ থেকে  এধরনের প্রত্যুত্তর, বিশেষ করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আমার মতো কম বয়সী একজন তরুণের জন্যে একটা বড়ধরনের আঘাত ছিল। বিচলিত হওয়ার আরো একটি কারণ ছিল। যাজক এই কথাগুলি কবিতার মতো করে লিখে পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য  এরকমটা করার কারণও ছিল। তিনি আমাকে দেখাতে চেয়েছেন যে, তিনিও ছন্দাকারে লিখতে সক্ষম। তিনি লিখেছিলেন মিত্রাক্ষর ছন্দে, আর আমার লেখাটি ছিল গদ্যছন্দে। এখন আমি কল্পনা করতে পারি, যদি আমি দুটো লেখার দিকে তাকাই, তবে আমার কবিতা-ই তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
অধিকাংশ আমেরিকান ইংরেজ পাঠক মনে করেন, ইন অ্যা গ্রীন নাইট আপনার প্রথম বই। বহির্বিশ্বে পরিচিত হওয়ার আগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজে আপনি নিজের খরচে  তিনটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। আপনার প্রথম পুস্তিকা টুয়েন্টি ফাইভ পোয়েমস কীভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, একটু বলবেন
আমি প্রতিদিনই একটি এক্সারসাইজ খাতায় লিখতাম। প্রথম যখন লিখতে শুরু করি, তখন গভীর মৌলিকতা নিয়েই লিখতাম। আমি লিখতাম ঠিক ততোটাই দুর্বোধ্য কিছু যতোটা আমি অনুভব করতে পারি, বুঝতে পারি। আমার মনে পড়ে, যখন আমি অডেন, এলিয়ট বা অন্য সবার বই পড়তাম, আমি অন্যরকম আনন্দবোধ করতাম। ভিন্নরকম অবমুক্তির বোধ আমার মধ্যে কাজ করতো। একদিন মনে হতো আমি স্পেনসারের মতো লিখবো, আরেকদিন মনে হতো আমি ডিলান টমাসের মতো লিখবো। একদিন যখন উপলব্ধি করলাম, আমার নিজেরই ভালো  লাগার মতো যথেষ্ট পরিমাণে কবিতা লিখে ফেলেছি, আমি সেগুলোকে ছাপার আকারে দেখতে চাইলাম। আমাদের সেন্ট লুসিয়া বা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কোনো প্রকাশনা সংস্থা ছিল না। এলিয়ট, অডেন  কর্তৃক প্রকাশিত একটি ফ্যবের প্রকাশনার কালেকশন ছিল, বইগুলোর বাহ্যিক কাঠামো ও টাইপফেস আমার খুব ভালো লাগতো। আমি ভাবতাম, আমারও এরকম একটি বই হোক।
সুতরাং আমি ওই লেখাগুলো থেকে পঁচিশটি কবিতা বাছাই করে একটি সংকলন তৈরি করলাম এবং আমার মনে হলো, এটি চমৎকার দেখাবে। দেখে মনে হবে একটি প্রকাশিত বই এবং বিদেশ থেকে আনা। আমি আমার মায়ের কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘আমি একটি কবিতার বই বের করতে চাই এবং এ জন্যে আমার দুশো ডলার লাগতে পারে।’ তিনি ছিলেন একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষিকা ও দর্জি। আমার মনে পড়ে, তিনি খুব হতাশ হয়েছিলেন, কারণ তিনি চাইছিলেন সত্যি সত্যি বইটা হোক। বেতনের উপর নির্ভর করে একজন নারীর পক্ষে এরকম একটা প্রকাশনায় সাহায্য করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু কোনো একটা উপায়ে টাকাটা জোগাড় করেছিলেন। টাকাটা তিনি আমার হাতে তুলে দিলে আমি তা ত্রিনিদাদে পাঠিয়ে দিই এবং পরে ছাপানো বই পেয়ে যাই। বইটি যখন ছাপা হয়ে ফিরে আসে, আমি সেটি বন্ধুদের কাছে বিক্রি করলাম এবং মায়ের খরচ করা টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলাম। তখন একটি ছাপানো বই পাওয়া একমাত্র উপায়ই ছিল সেটি- নিজে প্রকাশ করা।
আপনার প্রথম দিকের কবিতাগুলো নিয়ে ফ্রাঙ্ক কলিমোর একটি অন্তর্দর্শী প্রবন্ধ লিখেছিলেন। উনিশ বছরের উঠতি বালকের জন্যে এটি অবশ্যই একটি বিরাট রকমের অভিজ্ঞতা। উপরন্তু তিনি ছিলেন সাড়া জাগানো ক্যারিকীয় সাহিত্য পত্রিকা বিমএর সম্পাদক। তিনি এমন একজন মানুষ যাকে এডওয়ার্ড ব্রেথওয়েটদ্য গ্রেটেস্ট অব ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান লিটারারি গডফাদারস’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

ফ্রাঙ্ক কলিমোর প্রকৃত অর্থে সাহিত্যের একজন পুরোধা ছিলেন। আমি হ্যারি সিমন্সের কাছ থেকে তাঁর সম্পর্কে জেনেছিলাম। আমি কখনোই তাঁর মতো এমন একজন অমায়িক, মার্জিত, বিবেচক ও নিঃস্বার্থ মানুষ দেখিনি। বার্বাডোজে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করার পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার কথা আমি জীবনে কোনোদিনই ভুলবো না। এতো তরুণ বয়সে এমন একজন পরিপূর্ণ বয়সের মানুষের ভালোবাসা ও স্নেহময় অভ্যর্থনা পাওয়া সত্যি দুর্লভ ব্যাপার ছিল। তিনি জর্জ ল্যামিংকেও একইভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তাঁর মতো এরকম আরো অনেকেই হয়তো আছেন যারা লেখকদেরকে তাদের সৃষ্টিকর্মের জন্য ভালোবাসেন এবং আমাদের দিক থেকেও সেরকমটাই ঘটেছিল। তিনি খুব বেশি কর্তৃত্ব দেখানো মানুষ ছিলেন না। তিনি কখনো এমনটা করেননি যাতে মনে হতে পারে আপনি একজন স্কুল-শিক্ষার্থী হিসেবে ভালো করেছেন আর তিনি স্কুলশিক্ষক হিসেবে বাহবা দিচ্ছেন। আমার সৌভাগ্য যে, আমি খুব তরুণ বয়সেই এরকম প্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা অভিনন্দিত হয়েছি যারা বয়সে আমার চেয়ে অনেক বেশি বড় ছিলেন অথচ এমনভাবে আচরণ করতেন যেন আমরা সমবয়সী। কলিমোর এর সবচেয়ে চমৎকার দৃষ্টান্ত, নিঃসন্দেহে।
উনিশ বছর বয়সে আপনি একবার নিজেকেইংরেজি প্রীতিতে উন্মত্ত গর্বিত, উচ্ছ্বসিত কবিহিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আপনি এটাও বলেছিলেন যে, আপনি একজন তরুণ লেখক হিসেবে নিজেকে ক্রিস্টোফার মার্লো মিল্টনের অকৃত্রিমভাবে দীর্ঘায়িতদ্য মাইটি লাইন’-এর মধ্য প্রতিফলিত হতে দেখেছিলেন। আপনি কি আপনার সেই সময়ের বোধ সম্পর্কে আমাদের বলবেন?

আমি এমন একটা পরিবেশ থেকে উঠে এসেছি যা ছিলো এককথায় রাজকীয়। এই পরিবেশে গাম্ভীর্যপূর্ণ দেহভঙ্গিই ছিল পছন্দের, উদ্দামতার দ্বারা এটি কখনো বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। এটি একটি জমকালো আলঙ্কারিক সমাজ। এটা ছিল মূলত শরীরবৃত্তীয় ঠমক প্রদর্শনের সমাজ, শৈলী প্রদর্শনের সমাজ। শৈলীর সর্বোচ্চ অর্জনই হচ্ছে অলঙ্কার, এটি কথায় বাচনে বক্তব্যে বা অন্য কোনো কিছুতে প্রদর্শিত হতো না। সেই সমাজটা তাই বিনত বা পরিশীলিত সমাজ ছিল না। একজন ক্যারিবীয় পারফরমারকে যথাযথ আড়ম্বড় নিয়ে উঠে আসতে হতো। চাকতি প্রতিযোগিতায় একজন ক্যালিপসীয় পারফরমার আর একজন ষাঁড়-যোদ্ধার কোনো তফাৎ নেই। এখানে তাকেও লাফিয়ে পার হতে হয়। তিনি হয়তো সবচাইতে বুদ্ধিদীপ্ত ক্যালিপসো লিখে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি সেটি প্রকাশ করতে চান, তবে তাকে সেরাটাই নিংড়ে দিতে হবে এবং তার যতরকম কলাকৌশল আছে, সব প্রয়োগ করে শ্রোতাগণকে নাড়া দিতে হবে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে পরিশীলিত পারফরমেন্স একটি অসম্ভব ব্যাপার এবং সেটা না করাটাই স্বাচ্ছন্দের বিষয়। এখানে মার্জিত হওয়ার চেয়ে বড় বেশিরকমের চাকচিক্য প্রদর্শন করা এবং সন্তর্পণে নিজেকে উপস্থাপন করাটাই উত্তম। এখানকার সব বড় খেতাবগুলোই হচ্ছে আলঙ্কারিক। আমি এমন একটি স্থানে বেড়ে উঠেছি যেখানে আমি কবিতা শিখলে আপনাকে চিৎকার করে তা উগরে দিতে হবে। এখানকার তরুণেরা কবিতা মুখস্ত করে, পারফর্ম করে, লিখে এবং এভাবেই কবিতাকে বিকশিত করে। আপনি যদি সেই কবিতাগুলোর ভেতরের বজ্রধ্বনি বা শক্তি অনুমান করতে চান, তবে অন্যদের সাথে বিড়বিড় করে কথা বলা, ছোট্ট শীতল কণ্ঠে আপনি তা বলতে পারবেন না। শারীরীক ঠমক প্রদর্শন করা এমন একটি সমাজ থেকেই উঠে এসেছি আমি। এখানকার সাহিত্যও সেই ধাঁচের। সাহিত্য বলতে আমি চাকচিক্যময় সাহিত্যের কথা বোঝাতে চাচ্ছি; সেটা গ্রীক সাহিত্যই হোক অথবা অন্য কোনো সাহিত্য। কবিতায় আবৃত্তির উপাদান এমন একটি জিনিস যা আমি কখনোই হারাই না বলেই আমার বিশ্বাস।আমি এটা হারাই না মানে হারাতে চাই না, কারণ এটি কণ্ঠের দ্বারা পারফর্ম করার একমাত্র উপকরণ। যখনই আমরা কোনো কবির সান্নিধ্য পেতাম, তাকে বলতাম, ঠিক আছে, আপনি একটি কবিতা শোনান তো দেখি। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে তিনি বিড়বিড় করে আমাদের কবিতা শোনাতেন। আমি এইরকম মিনমিন করে কবিতা-পড়া কবিদের দলভুক্ত কবি নই।

আপনার প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে রয়েছে প্রবল আত্মবিশ্বাস নাগরিক অধিকারের অগ্নিময় চেতনার অনুভূতি। সম্প্রতিমিডসামার’ নামে একটি কবিতায় আপনি লিখেছেন– “আমার শৈশবের দ্বীপে কেটে গেছে চল্লিশ বছর, বোধ হয় / কবিতার উপঢৌকন পছন্দযোগ্য করেছে আমাকে / আমার সকল অভিজ্ঞতা প্রজ্বলিত হয়ে আসে অগ্নিদেবীর অনলে।”
আমি কখনো নিজের উপঢৌকন, মানে প্রাপ্তি নিয়ে ভাবিনি। আমাকে এখানে নিজের প্রাপ্তির কথা বলতে হলো এই কারণে যে আমি বিশ্বাস করি আমি আর যা কিছু নিজের মতো করে এসেছি, সেগুলোর মতোই কবিতা-জ্ঞানও একধরনের বিশেষ উপহার বা উপঢৌকন। আমি বাল্যকাল থেকেই আমার নিজের মধ্যে একধরনের তীব্র কর্মস্পৃহা উপলব্ধি করতাম। আমার মনে হতো, আমাকে স্পষ্টবাদী হতে হবে, আর সেটা আমার অভিজ্ঞতার আলোকে নয়, বরং আমি চারপাশে যা প্রত্যক্ষ করি সেগুলোর উপর ভিত্তি করে।আমি আমার শৈশব হতেই জানতাম এটাই হচ্ছে পরম নান্দনিকতা। আপনি যদি সেন্ট লুসিয়ার কোনো পাহাড়চূড়ায় যান, আপনি একই সময়ে একটা নতুনত্ব ও অন্তহীন সময়ের যুগপৎ অনুভূতি অনুভব করবেন। আর আপনি যে পাহাড়চূড়ায়ই অবস্থান করেন না কেন, এরকমটা নিশ্চিতভাবেই অনুভব করবেন। এটি একটা আদি-অনন্ত ব্যাপার, সবসময় এটাই হয়ে আসছে। একই সঙ্গে এই বিষয়টিও আমি অবগত ছিলাম যে আমার চারপাশের দরিদ্র মানুষগুলো  লেখালেখির বা আঁকাআঁকির উপাদান হিসেবে রোমান্টিক অনুভূতিতে যথেষ্ট পরিমানে নান্দনিক নয়। আমি জীবনযাপন করেছি তাদের মধ্যে, তাদেরকে দেখেছি খুব কাছ থেকে, এবং সেসব জিনিসও দেখেছি যা দেখার জন্যে আমার দূরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আর আমি আমার লেখার বিষয়বস্তু হিসেবে এরকমই উপলব্ধি করেছি, লেখালেখিকে আমার পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছি। এটি এমন একটি ব্যাপার যা অন্য সব লেখকও তাদের নিজেদের মতো করে বলেছেন, এমনকি যদি তা বিরক্তিকর হয়ে ওঠে, তবুও। এসব বিষয় নিয়ে  ইয়েটস বলেছেন, জয়েসও বলেছেন। এটা খুবই মজার ব্যপার এবং এ ব্যাপারে জয়েস বলেছিলেন, তিনি শুধু তার জাতিগোষ্ঠী অর্থাৎ আইরিশ জাতির জন্যে লিখতে চান। আপনি হয়তো ভেবে থাকতে পারেন, জয়েস বেশি রকমের মহাদেশীয় মননশীলতার লেখক। বস্তুত, জয়েস তাঁর ভেতরে আঞ্চলিকতাকে লালন করেছিলেন এবং শেক্সপীয়র-উত্তর সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি সর্বজনীন মননশীলতার লেখক ছিলেন জয়েস। কবি হিসেবে আমরা যা করতে পারি তা হচ্ছে, শুধুমাত্র সততার সাথে সঙ্গতি রেখে কুড়ি মাইল দূরত্বের কোনো বিষয় সম্পর্কে না লিখে আমাদের বলয়ের ভেতরে যা কিছু আছে তা দেখবো আর তাই নিয়ে লিখে যাবো।
নতুন বিষয়বস্তু উদ্ভাবনের জ্ঞানকে কিভাবে আপনি প্রচলিত উপাদানের মধ্যে প্রোথিত করেবেন?
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সাহিত্যের একটি বিষয় সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে, আমরা যতটা বঞ্চিত ছিলাম, ততদূর পর্যন্ত প্রসারিত ছিল আমাদের নাগরিক অধিকার। তখন পর্যন্ত এরকম একটা দীর্ঘ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারার আনন্দ ছিল সীমাহীন, যা বর্ণনাতীত। তবুও কল্পনা তাঁর পরিসীমা চায় এবং তার সীমার ভেতরেই প্রফুল্ল হয়। এই সংকীর্ণতার ভেতরেই কল্পনা তার স্বাধীনতা খুঁজে পায়। এককথায় বলতে গেলে, যে-জীবন অস্পষ্ট, অনির্ধারিত; আপনাকে তাকে ভারসাম্য দিতে হবে। আমাদের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান লেখক-প্রজন্ম প্রথমবারের মতো সেই পরিসীমার স্থান বা মানুষকে নিয়ে লেখার সুযোগ পেয়ে প্রগাঢ় প্রফুল্লতা অনুভব করেছিল এবং একইসাথে, একজন ডিফো, একজন ডিকেন্স, একজন রিচার্ডসনকে পূর্বসূরি হিসেবে ধরে নিয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে এর ঐতিহ্যকে রপ্ত করতে পারায় উল্লসিত ছিল। আমাদের পৃথিবীটা আমাদেরকে আকুল করে তুলেছিল একে রূপ দেয়ার জন্যে। এটি আমাদেরকে পালিয়ে যেতেও বাধা দিচ্ছিল, কারণ, আমাদের মস্তিষ্কে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না, ছিল না সাহিত্যের অতিরঞ্জন। এটি ছিল একেবারেই নতুন একটা কিছু। একেবারেই নতুন।
ভালো তো, তাহলে ইংরেজি ভাষার কবিতার সুবৃহৎ ঐতিহ্যের সাথে আপনার নিজেকে কিভাবে সম্পর্কিত দেখেন?
আমি বিষয়টিকে এভাবে দেখি না। আমি প্রথমত, এবং প্রকৃত অর্থেই একজন ক্যারিবীয় লেখক। ইংরেজি ভাষা কারো বিশেষ সম্পত্তি নয়। এটি চিন্তন-ক্ষমতার সম্পদ। ভাষা নিজেই নিজের সম্পদ। আমি কখনোই ইংরেজি সাহিত্যের বড় কবিদের মতো লেখার চেষ্টা করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি বলে অনুভব করিনি। এরপর এ থেকে অনেকগুলো আঞ্চলিক সমালোচনার জন্ম হয়েছে। একজন ক্যারিবীয় সমালোচক হয়তো বলবেন, আপনি ইংরেজ হতে চেষ্টা করছেন; একজন ইংরেজ সমালোচক হয়তো আপনাকে ইংরেজ-গোষ্ঠীতে আপনাকে স্বাগতম জানাবেন। এগুলো হচ্ছে সেই বর্ণচ্ছটার শেষ প্রান্ত থেকে উঠে আসা দুটি আঞ্চলিক মন্তব্য। ইংরেজ হওয়ার চেষ্টা করাটা দোষের নয়। আমি সুস্পষ্টভাবেই একজন ক্যারিবীয় কবি। অকপটে আর সত্যিকারভাবে বললে, আমি তুলনামূলকভাবে উত্তম ক্যারিবীয় কবিদের সঙ্গ পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে থাকি। কখনও কখনও কিছুটা নিঃসঙ্গও বোধ করি। যেমনটা ঘটবে বলে আমি ভেবেছিলাম, ক্যারিবীয় কবিতায় একটা বলিষ্ঠ তেজ, একটা দৃঢ় শৃঙ্খলা, একটা ঝোড়ো গতি থাকবে; আদতে তা দেখতে পাই না। ক্যারিবীয়দের সংগীতপ্রিয়তা এইসব সমস্যার একটি উৎস হতে পারে। প্রতিটি সংস্কৃতির একটি বিশেষ নিজস্ব ঝোঁক থাকে এবং স্পষ্টতই ক্যারিবীয় কাব্য, কর্মদক্ষতা, প্রতিভা সবকিছুই এর সংগীতে প্রোথিত হয়ে আছে। আবার আধুনিক ক্যারিবিয়া হচ্ছে একটি নবমুকুলিত পুষ্প বিশেষ। একটা ঐতিহ্যের শেষে নয় আমাদের অবস্থান শুরুতেই বলে মনে করি। আমার নিজের অবস্থানও এখানেই।
আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে ইংরেজি কবিতার সাথে আপনার সম্পর্ক বছরের পর বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে? যেমনটা আপনার কাব্যকলায় উন্নতির সাথে মনে হয় আপনি ক্রমাগত এক নতুন দুনিয়ার কবিদের কাতারে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন- যেখানে হুইটম্যান থেকে শুরু করে সাঁ ঝঁ পার্স, এইমে সেজার, পাবলো নেরুদার মতো কবিগণ রয়েছেন।
কার্লোস ফুয়েন্তেস প্যারি রিভিউয়ের এক সাক্ষাৎকারে সেন্ট্রাল আমেরিকার অপরিহার্য অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তাতে ছিল গোটা ক্যারিবীয় অঞ্চল বা অববাহিকার কথা এবং এই অববাহিকা ইতিমধ্যেই একটি অসাধারণ উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মার্কেস পূর্ণাঙ্গ নতুন জগতের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন, যেমনটা তুলে ধরেছিলেন বোর্হেস, যেমনটা মার্কিন লেখকরা এখনো করে যাচ্ছেন। মূলত, অধিকাংশ মার্কিন কবিই আমেরিকান তুলাদণ্ড হাতে তুলে নেয় না। এটা একারণে নয় যে আমরা মহাকাব্য লিখতে চাই। এটা বরং এই জন্যে যে, এর দ্বারা আমাদের বোঝা যাবে না। যে জায়গাগুলো এখনো অসংজ্ঞায়িত রয়ে গেছে, সেখানে জ্ঞানের সংসর্গে কর্মচঞ্চলতা আসে, সেসব কথা এখনও বর্ণিত হয়নি, এখনো আঁকা হয়ে ওঠেনি। এর মানে এই যে, আমি এখানে একজন দিশারী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি। আমিই প্রথম এই পর্বতের দিকে তাকিয়ে লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমিই প্রথম এই অগভীর হ্রদের দিকে তাকিয়ে আছি, আমিই প্রথম এই ভূ-ভাগ দেখছি। এখানে চাইলেই তুলি হাতে নেয়ার অসামান্য অধিকার আছে আমার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেখক সি.এল.আর. জেমসের পরবর্তী কালের সবাই, অর্থাৎ  আমার প্রজন্মের সবাই সত্যিকারের সৃজনী অনুভূতির শিহরণ অনুভব করেছিলেন। আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন সবার এই কর্মচাঞ্চল্য আমাদের সহগামী হয়েছিল। এটি আমেরিকান চিন্তনের একটি অংশভাক্ মাত্র; আর আমেরিকা বলতে আমি আলাস্কা থেকে কারাকাস পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডকে বা সমুদ্র পরিবেষ্টিত অঞ্চলকেই বুঝিয়েছি।

[চলবে]

প্রথম পর্ব

ডেরেক ওয়ালকট > ‘কবিতা লেখা একধরনের প্রার্থনা’ [সাক্ষাৎকার] / ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close