Home বিশ্বসাহিত্য ডেরেক ওয়ালকট > ‘আমার ভৌগোলিক ও আত্মিক সম্পৃক্ততা সেন্টলুসিয়াতেই’ >> সাক্ষাৎকার শেষপর্ব >>> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

ডেরেক ওয়ালকট > ‘আমার ভৌগোলিক ও আত্মিক সম্পৃক্ততা সেন্টলুসিয়াতেই’ >> সাক্ষাৎকার শেষপর্ব >>> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ July 29, 2017

ডেরেক ওয়ালকট > ‘আমার ভৌগোলিক ও আত্মিক সম্পৃক্ততা সেন্টলুসিয়াতেই’ >> সাক্ষাৎকার শেষপর্ব  >>> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : নোবেল বিজয়ী প্রয়াত ক্যারিবীয় কবি ডেরেক ওয়ালকটের সবচেয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল প্যারি রিভিউতে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন এডওয়ার্ড হির্শ। এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ সেই সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম। ইতিপূর্বে এই সাক্ষাৎকারের তিনটি পর্ব তীরন্দাজে প্রকাশিত হয়েছে। আজ প্রকাশিত হল সাক্ষাৎকারটির শেষপর্ব।]

শেষপর্ব

আমি ‘অ্যা ফার ক্রাই ফ্রম আফ্রিকা’ পড়ছিলাম। হঠাৎ সমস্বর কণ্ঠের প্রশংসাসূচক ধ্বনি শুনতে পেলাম। কবিতাপাঠের ক্ষেত্রে আমি আর কখনোই এরকম সাধুবাদ পাইনি। আমার মনে পড়ে না, আমাকে এরকমভাবে আর কখনো আনুষ্ঠানিক কবিতাপাঠ করতে দেয়া হয়েছিলো কিনা। কিছু কারণে আমি ভাবলাম যে, এই সাধুবাদের অর্থ হচ্ছে আমাকে থেমে যেতে হবে, তাদের দৃষ্টিতে আমার পড়ার পালা শেষ। সুতরাং আমি মঞ্চের বাইরের দিকে পা বাড়ালাম।

 ক্যারিবীয় দ্বীপে একটি শিল্পবোধসম্পন্ন প্রজন্ম কিভাবে তৈরি হল?

পৃথিবীর এই অঞ্চলটিতে একটি শিল্পবোধসম্পন্ন প্রজন্মের অস্তিত্ব প্রায় পাঁচ বছরের পুরানো। পাঁচ বছরের স্থায়ী বলা যায়। আমি মনে করি, এরপর লোকেরা তাদের অগ্রাহ্য করে। আমি এই পাঁচ বছরেরই মানবতা, একঘেয়েমি ও নিরর্থকতা দেখেছি। আমি তরুণ লেখকদের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। একই রকম হতাশা দেখলাম তৈরি হচ্ছে। তরুণদের ক্ষেত্রেও এই শিল্পবোধকে ছুঁড়ে ফেলার একই প্রবৃত্তি দেখতে পেলাম। আমি এই সমস্যা থেকে বের হচ্ছি। এখানে সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রেও সমস্যা আছে। আমরা একধরনের যান্ত্রিক ভাবনায়- যেখানে বলা হয় সরকার খাদ্য, বস্ত্র,  বাসস্থান এবং মৌলিক প্রয়োজনের দিকগুলির সঙ্গে শুধু যুক্ত থাকে। নর্দমার ময়লা জল পরিস্কারে কিংবা বিদ্যুতে অবশ্যই অগ্রাধিকার থাকবে। সরকার যদি শুধু এই চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে, একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি শুধু প্রবাহমান জলই চাইবে না, হাতে একটি বই এবং দেয়ালে একটি ছবি ঝুলানো দেখতে চাইবে। এরকম সরকার আমি একবারই দেখেছিলাম, যখন আমার বয়স আঠারো কি উনিশ। পঞ্চান্নোতে এসে শুধু দেখছি, নীতিবিসর্জন ও স্বার্থপরতা। এর চেয়েও খারাপ ব্যপার হচ্ছে, শিল্পের প্রতি এক অগভীর, দায়সারা গোছের সেবাদান। ক্যারিবীদের এই সংকীর্ণ মন নিয়ে আমি যারপরনাই বিরক্ত। একজন লোকও খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য যার একটিমাত্র প্রবণতা আছে আর তা সংস্কৃতি বিষয়ক। ত্রিনিদাদই সম্ভবত সংস্কৃতির  সবচেয়ে অনন্য উদাহরণ যেটি হাজার হাজার কার্নিভালে হাজার হাজার শিল্পীর যোগান দিয়েছিলো। এখন সরকার কার্নিভালে সহায়তা দেয়, কিন্তু সেটি একটি মৌসুমী ভাবনা। আমি আরো সার্বজনীন, আরো শিকড়িত, আরো সুগঠিত কোনো ক্যারিবীয় চিন্তনের কথা বলছি। কারণ আমরা উপনিবেশ ছিলাম, আমরা সবকিছুই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি এবং আমরা যা কিছু ভাবতাম সেসব ছিলো সাম্রাজ্যিক আর সেগুলোই আমাদের একগুঁয়েমি, নির্বুদ্ধিতা ও অন্ধত্বের দ্বারা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়ে আসছে।

আপনার ড্রিম অন মাঙ্কি মাউন্টেইন-এর মুখবন্ধটি সংবেদনহীন, গ্রামীন সংস্কৃতির সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাণিজ্যিকীকরণকে নাড়া দিয়েছিলো। ট্যুরিজম কতটা নেতিবাচকভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রভাবিত করেছে, সেটা আপনার কবিতা ও প্রবন্ধের অন্যতম একটি বিষয়। এ বিষয়টি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

একদা আমি ট্যুরিজমকে সংস্কৃতির পথে ভয়াবহ বিপদ হিসেবে দেখেছিলাম। এখন আমি বিষয়টিকে সেভাবে দেখি না, কারণ আমি নিজেই মাঝে-মধ্যে যেভাবে এখানে আসি সেটা সম্ভবত আক্ষরিক অর্থে এরকম যে, আমি নিজেই যেন আমেরিকা থেকে আসা একজন পর্যটক। কিন্তু একটা সংস্কৃতি তখনই বিপদে থাকবে যখন সে নিজেই এটা হতে দেয়। শীতে এখানে আসার, সূর্য উপভোগ করার অধিকার সবারই আছে। কেউ কারো উপর অনধিকার চর্চা করতে পারে না এবং  আমি মনে করি না যে, আমি যদি একজন আমেরিকান হই কেউ আমাকে বলুক- দয়া করে এখানে এসো না, এটা আমাদের বীচ; অথবা এই জাতীয় কিছু বলুক। আমি যে সময়ের কথা বলছি, নিশ্চিতভাবেই নতজানুতা ছিলো সেই অবস্থার একটি দিক। পরিচারকদের হাসতে হতো, এবং এই একই কাজ আমাদেরকেও করতে হতো। সেটা খুব উদারভাবেই করতে হতো। ট্যুরিজমে এই বিষয়টি মালিক ও চাকরের একটি বর্ধিত রূপ ছিল মাত্র। আমি একে এর বেশিকিছু মনে করি না। এখানে একটা প্রজন্ম আছে যারা নিজেদের এই প্রভাবের বাইরে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে আরেকটা বাস্তব ব্যাপার হচ্ছে, এটা ভারসাম্যের বাইরে চলে যেতে পারে এবং এই অঞ্চলে যারা আপনার অতিথি তাদের ব্যপারে একটা তিক্ততা ও শত্রুভাবাপন্নতা আছে। এটা অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু আবার ইস্পাত-কঠিন শৃঙ্খলা আরোপ করাটা এবং হোটেলে বিনোদনের জন্যে লোক থাকাটাও যথেষ্ট নয়। টুরিস্টদেরকে ধরে রাখার জন্যে বাইরে কোথাও ছোটখাটো প্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে, যাতে তারা নিজেদের চনমনে, সুখী, নির্বিকার ভাবতে পারেন। যদি এরকমটা হয় যে, সরকার অথবা সংস্কৃতি নিজেই সর্বেসর্বা, তখন সেটা তাদের অপদস্থ করতে পারে। কিন্তু সরকার যদি শিল্পের ক্ষেত্রে, লেখকদের ক্ষেত্রে, চিত্রশিল্পীদের ক্ষেত্রে, অনুষ্ঠানের আয়োজকদের ক্ষেত্রে- তৃণমূল স্তরে কিছু করে থাকে, আর সেখানে যদি গর্ব করার অনেক কিছু থাকে, আপনি যদি এমনটা না দেখেন যে তরুণরা শহরজুড়ে বিষণ্ন হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর তারা কিছু একটা ঘটার প্রত্যাশায় আছে, আমি তাহলে বলার কে। নিশ্চয়ই আমার সারাটা জীবন ক্যারিবীয় অঞ্চলে কাটানোর পর এবং নাটকের ওয়ার্কশপে উত্তেজনাপূর্ণ সতেরোটি বছর কাটানোর পর বলতেই পারি- হ্যাঁ, জেগে উঠুন, আপনি নিজেই সেটা করুন, এবং সরকারের উপর ভরসা ছাড়ুন। কিন্তু একটি জায়গা আছে যেখানে আপনাকে সরকারের দিকে ফিরে যেতে হবে এবং বলতে হবে, দেখুন জনাব, এটা হাস্যকর। আমি আমার ট্যাক্স পরিশোধ করি। আমি একজন নাগরিক। আমার জন্যে কোনো যাদুঘর নেই। ভালো একটা লাইব্রেরি নেই। এমন একটা জায়গা নেই যেখানে আমি পারফর্ম করতে পারি। এমন একটা জায়গা নেই যেখানে নাচতে পারি। এটা অপরাধ। মহানগরীর কতিপয় বুর্জোয়া মানসিকতার লোক, যাদেরকে ক্যারোল জীবনের ধারণা থেকে তুলে আনা হয়েছিলো, এদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও অবসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সম্পর্কে এটা আমার বারবার বলা কথার  পুনরাবৃত্তি। আমি বলতে চাই এটাই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম উপাদান। একটা ভালো সময়, একটা মাহেন্দ্রক্ষণ আসুক।

লোকাচারবিদ এবং নৃতত্ত্ববিদদের সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী? অনেকেই তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঢের সম্মানিত মনে করেন।

আমি তাদেরকে বিশ্বাস করি না। তারা হয়তো বিব্রত করে, নয়তো খুব বেশি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলে। তারা যদি স্বল্পভাষী হয় এবং এসব পরিহার করে, তবে তারা খুব ভালো সেবা দিতে পারবে। কিন্তু যখন তারা লোকজনকে বলতে শুরু করে তারা কে, তারা কী, লোকজন তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। আমি তাদের সেমিনারে গিয়েছি। সেমিনারে যে সব শ্রোতাকে নিয়ে এই লোকাচারবিদগণ কথা বলেন, সেসব লোকেরা তাদের তত্ত্ব বুঝতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়।

আপনার প্রথমদিকের অন্যতম একটি বিখ্যাত কবিতা, অ্যা ফার ক্রাই ফ্রম আফ্রিকা, একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ হয় কবিতাটি- আমি আফ্রিকা হতে কিভাবে সরে যেতে পারি এবং বেঁচে থাকতে পারি? যাই হোক, ১৯৭০ সালের দিকে আপনি লিখেছিলেন যে, আফ্রিকার পুনর্জাগরণ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আরো লিখেছেন – আমরা শ্বেতাঙ্গ হওয়ার বাসনা হারিয়েছি, কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার বাসনা জাগ্রত করেছি, এই দুটি বিষয়ই হয়তো ভিন্নতর, কিন্তু উভয়ই হচ্ছে আপনার লক্ষ্য। আপনি আরও উদ্ধৃত করেছেন যে, আফ্রিকান হয়ে ওঠার দাবিটা বংশানুক্রমিক নয় বরং এটি অর্পিত বিষয়, চাকর হিসেবে আমাদের আগমনের সঙ্গে যুক্ত। আপনার এই মতামত বিতর্কমূলক। আফ্রিকার সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান লেখকগণের সম্পর্ক নিয়ে আপনার এখনকার ভাবনা কী?
মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিটি সন্তানেরই একটি দায়িত্ব থাকে। সন্তান পিতার কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়। ক্যারিবীয়রা তাদের নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করে তাদের নিজস্ব মর্যাদার মুখোমুখি হতে চায় না। সুতরাং অসংখ্য লোক আফ্রিকা সংক্রান্ত ধারণাকে ভুল অহং ও ভুল শৌর্যশালী ভাববাদে কাজে লাগায়। চরম মূল্য দিয়ে এবং ব্যাপক সমালোচনা করে আমি একটি জিনিসটি স্পষ্টভাবে দেখাতে চাইতাম। আর সেটা হলো ঐতিহাসিক ভাবপ্রবণতার মধ্যে সমূহ বিপদ রয়েছে। দুঃখ-দুর্দশা ও দাসত্ববোধের কারণেই আমরা ঐতিহাসিক ভাবপ্রবণতার দিকে অনেক ঝুকে পড়ি। দাসত্ববোধের এই অধ্যায়টিকে চাপা দিয়ে সোজাসুজি স্বর্গসদৃশ জাঁক করে সিংহশিকার কিংবা অনুরূপ কাজের দিকে সোজাসুজি প্রত্যাবর্তনের যৌক্তিকতা রয়েছে। দাসত্ববোধের ক্ষেত্রে আমি যে বিষয়টি বলি, তা হচ্ছে, আপনি কোনো তিক্ততা ছাড়াই এটি পরিহার করুন, কেননা তিক্ততা চরম চিন্তার দিকে ধাবিত করে এবং প্রতিশোধস্পৃহার জন্ম দেয়। ঐতিহাসিক অন্ধকারাচ্ছন্নতার উপর ভিত্তি করেই অনেক বেশি অভক্তি দেখা যায় এই ক্যারিবীয় অঞ্চলে। এই অনুভূতিটি অনেকটা এরকম- দেখো, তুমি আমার সাথে কী ধরণের আচরণ করেছো। যাই হোক, তুমি আমার প্রতি কী আচরণ করেছো- এগুলো একধরনের ছেলেমানুষী, ঠিক বলেছি কিনা? আবার দেখো, আমি তোমার কি ঘটাতে যাচ্ছি ধরনের আচরণিক ভুল।   ক্যারিবীয় অঞ্চলের অবৈধতা নিয়ে ভেবে দেখুন। কম লোকই পরম্পরা অনুযায়ী তার বংশবৃত্তান্ত খুঁজে বের করার দাবি করতে পারে। পুরো ক্যারিবীয় অঞ্চলের অবস্থাই অনুপযোগী হয়ে আছে। আমরা যদি শুরু থেকেই স্বীকার করে নিই, ঐতিহাসিক জারজতায় আমাদের লজ্জার কিছু নেই, তবেই আমরা মানুষ হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু আমরা যদি প্রতিনিয়ত মুখ গোমড়া করে থাকি এবং বলি- দেখো, সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের কি অবস্থা করেছে; এরূপ কথাবার্তায় আমরা কখনোই পরিণত হতে পারবো না। আমরা যখন নিস্তেজ হয়ে বসি, বিষাদগ্রস্ত কবিতা বা উপন্যাস লিখি, সেটি আমাদের পার করে আসা সময়ের চেয়েও অবাস্তবকে আলোকপাত করে। ক্যারিবীয় লেখনীর ক্ষেত্রে যা খুব বেশি রকমের হয়ে থাকে তা হলো আমরা একই রকম মেজাজ বা মর্জি নিয়ে লিখতে থাকি, পুরনো সেই একই ক্ষতকে চাপাচাপি ও ঘষাঘষি করতেই থাকি। এটি একারণেই নয় যে কেউ ভুলে যেতে যেতে চায়, উপরন্তু আপনি বরং এটিকে এমনভাবে গ্রহণ করবেন যেমনটা যে কেউ তার ক্ষতকে শরীরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, আপনি জীবনভর সেটিকে পরিচর্যা করে যাবেন।

দ্য ফরচুনেট ট্র্যাভেলর কবিতাটি নানা অনুষঙ্গে পরিপূর্ণ। কবিতাটিতে ব্যাপক বৈচিত্র্যময় নানা স্থানের উল্ল্রেখ আছে। ফরচুনেট ট্র্যাভেলরের বিপর্যয়কে দীর্ঘায়িত করেছেন, যে কিনা একটি অনুন্নত দেশ হতে আরেকটি অনুন্নত দেশে গিয়েছিলো। ‘নর্থ অ্যান্ড সাউথ-এ আপনি লিখেছেন- এক সাম্রাজ্যবাদী শাসকের পতনের পর, একজন নব্যশাসকের মতো / আমি আমার দায়িত্ব কাঁধে নিই/ একক, ঘূর্ণয়মান, গৃহহীন কোনো উপগ্রহে। এটাই কি ফরচুনেট ট্র্যাভেলরকে পথ বাতলে দিয়েছিলো? আপনি কী স্বদেশ আর ভীনদেশের মধ্যেকার সেই পুরনো টানাপোড়েনকে অনুভব করেন?
আমার কাছে কখনোই মনে হয়নি যে, আমি সেইন্ট লুসিয়া ছাড়া অন্য কোথাও আছি। আমার ভৌগোলিক ও আত্মিক সম্পৃক্ততা সেন্টলুসিয়াতেই। এর একটি বাস্তবতাও রয়েছে। আজ  বিকেলেই আমি আমার নিজেকে বলেছি, আমি কি এখানেই থেকে যাবো, যদি আমার কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকেও? আমার মনে হয়, উত্তরটা ‘না’ হবে, মানে আমি কোথাও যাবো না এই স্থান ছেড়ে। আমি জানিনা যদি আমি এই সিদ্ধান্তের দ্বারা বিপর্যস্ত হই, তখন কী করবো। আমরা দরিদ্র, অন্ধকারে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষজনের মধ্যে পার্থক্য করতে বাধ্য হই এবং আপনিও সেটা করতে বাধ্য হবেন। কারণ  আপনার যখন-তখন বেরিয়ে পড়ার সুযোগ আছে। আসলে আপনি একজন ফরচুনেট ট্র্যাভেলর, একজন পর্যটক; আপনার ভাগ্যটাও এমন যে আপনি সবসময়ই বেরিয়ে পড়তে পারেন। আর এটা ভাবাও কঠিন যে, আপনার চারপাশে এমন লোক আছে যারা বেরিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অসমর্থ, অক্ষম; সেটা আর্থিক কারণেই হোক কিংবা অন্য কোনো বন্ধনের কারণে। আমি যতো বেশি এখানে আসি, নিজেকে ততোটাই কম উড়নচণ্ডী, কম পরিত্যক্ত মনে করি। আর এটা এমনও হতে পারে যে, যেহেতু বয়সের সাথে ব্যাপারটা গভীর হচ্ছে; আপনার প্রাত্যহিক জীবন, আপনি যে স্থান হতে উঠে এসেছেন, আপনি এবং যা কিছু ভুল বুঝেছেন, আপনার যা বোধগম্য হওয়া উচিত ছিলো- সেই সব জিনিসের সাথে আপনি জড়িয়ে যাবেন। আমি যা কিছু লিখছি তা বাসে আমার পাশে বসা লোকটির সত্যিকারের অভিজ্ঞতার বাইরে কিনা তা দেখতেই আমি প্রায়শঃই এখানে ফিরে আসবো। আমি লোকটির সাথে কথা বলতে ফিরে আসবো না, আমি ফিরে আসবো তার দুঃখবোধ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্যে। ভাগাভাগি করে নেয়ার কারণে ওই লোকটি হয়ে উঠতে পারে নির্দয় নিষ্ঠুর। পরিপার্শ্বই লোকটির প্রয়োজনীয় মনোবল বা সামর্থ্যের উৎস। এই ব্যক্তিটি সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসযজ্ঞে পতিত লোকদের যে-কেউ হতে পারে।

জন্মভূমিকে অভিশাপ দেয়া চূড়ান্ত শয়তানি- মিডসামারে আপনি এমন দাবি করার সময় কোন জিনিসটি আপনাকে তাড়িত করেছিল?
আমি এমনটাই মনে করি। আমি মনে করি আপনি যে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন সেটি আপনার মা। আপনি যদি এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, অভিশাপ দেন; তবে আপনি আপনার মাকেই অভিশাপ দিলেন।

আপনি তো নিউইয়র্ক সিটি, বোস্টন, ওল্ড নিউ ইংল্যান্ড এবং সাউদার্ন ইউনাইটেড স্টেট নিয়ে অনেকগুলো কবিতা লিখেছেন। আমি ফরচুনেট ট্র্যাভেলর-এর প্রথম সেকশানটা নিয়ে ভাবছি যেখানে একটি কবিতার শিরোনাম হচ্ছে ‘আমেরিকান মিউজ’।  আরেকটি কবিতায় উদ্ধৃত করেছেন – আমি আমিরেকার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অনুভূতি কেমন আপনার? মানে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে কেমন লাগে আপনার? আপনার কি মনে হয় আপনি আমেরিকান হয়ে উঠেছেন?
সেরকম যদি কিছু হয়েও থাকে, তবে সেটা স্বেচ্ছায়, মানে নিজের খুশিতেই হয়েছে। আমি মনে করি না যে  আমার মগজ ধোলাই করা হয়েছে। আমার মনে হয় না আমি পুরস্কার বা পারিতোষিক দ্বারা বিমোহিত হয়েছি। আমেরিকা আমার জন্যে অতিমাত্রায় উদার ছিলো- তবে সেটা কঠোরভাবে জনহিতকর চেতনা থেকে নয়; আমি সেই উদারতা অর্জন করতে পেরেছি। এটি আমাকে পর্যাপ্ত পরিমানে সহায়তা প্রদান করেছে। আমেরিকার প্রেমে-পড়া সম্পর্কে ওই লাইনটি সত্য কি না, সেটা আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়। আমেরিকার প্রেমে পড়ার বিষয়টি এজন্যেই ঘটেছিলো। আমি সেই সময় বাসে করে এক স্থান হতে আরেক স্থানে দীর্ঘ ভ্রমণ করছিলাম। স্থানটি দেখতে অবিকল আমেরিকার ভূ-ভাগেরই মতো। আপনি যদি কোনো ভূভাগের প্রেমে পড়ে যান, এরপর যে জিনিসটি উঠে আসে সেটি হচ্ছে জাতিগোষ্ঠীকে জানবার ইচ্ছা আপনার হবেই, তাই না? গড়পড়তা আমেরিকানরা গড়পড়তা রোমান অথবা ব্রিটিশদের মতো নয়। গড়পড়তা আমেরিকানরা পৃথিবীকে নিজেদের অধীন ভাবে না, তাদের মস্তিষ্কে সাম্রাজ্যবাদের ছক কাজ করে না। আমি তাদের মধ্যে সৌজন্য আর বিনম্র স্বভাবটিাকেই প্রত্যক্ষ করেছি। তাদের আদর্শ আছে। আমি পুরা আমেরিকায় প্রচুর ভ্রমণ করেছি। আমি সেই সবই দেখেছি যা আমি দেখতে চেয়েছি, বিশ্বাস করেছি।

বোস্টন শহরকে আপনি ‘আমার নির্বাসনের শহর’ বলেছিলেন। বোস্টন নিয়ে আপনার অনুভূতিটা কেমন?
আমি নিজে সবসময় বলেছি, নির্বাসন শব্দটির ব্যবহার বন্ধ করা দরকার। প্রকৃত অর্থে, নির্বাসন হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে গৃহহীন হওয়া। জোসেফ ব্রডস্কি নির্বাসনে, আমি সত্যিকারের নির্বাসিত মানুষ নই। কেননা, আমার নিজের মাতৃভূমিতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। অনেক চেষ্টা করে আর আকাঙ্ক্ষা থাকলে আমি গৃহে ফিরে যাওয়ার মতো টাকা যে-কোনো সময় পেতে পারি। নিজেকে সমুদ্র, আকাশসহ সবকিছুর স্পর্শে  সতেজ করে তুলতে পারি। বোস্টন শহর নিয়ে আমি প্রথমে খুব শত্রুভাবাপন্ন ছিলাম। কারণ সম্ভবত আমি নিউইয়র্ক শহরটিকে বেশি ভালোবাসতাম। কৌতুকের ছলে আমি সবসময়ই বলি, বোস্টন কানাডার রাজধানী হওয়া উচিত। এটি এমন একটি শহর যা ক্রমান্বয়ে আপনার উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করবে। আর আমি যে শহরে থাকি সেটি অনেক বেশি আরামপ্রদ একটা শহর। শহরটা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালোভাবেই কাজ করছি এবং শিক্ষকতাকে খুব উপভোগ করছি। আমি কখনোই মনে করি না, আমার দুটি ঘর। আমার একটিই ঘর, একটি ঘরের দুটি স্থান।

আপনার উপর রবার্ট লাওয়েলের প্রচণ্ড প্রভাব রয়েছে। আমি আপনার স্মরণযোগ্য কবিতা- আরএসটিএল এবং মিডসামার কবিতার কথা ভাবছি। ওই কবিতা দুটিতে আপনি বলেছেন- স্থুলতা আমার ক্লাসগুলো দখল করে আছে। লাওয়েলের সাথে আপনার সম্পর্কটি কেমন, ব্যাখ্যা করবেন; মানে লওয়েলেরর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন?
একবার লাওয়েল এবং এলিজাবেথ হার্ডভিক ব্রাজিল ভ্রমণে যাচ্ছিলো। তারা ত্রিনিদাদে যাত্রাবিরতি নেয়। আমার মনে পড়ে, কুইন্স পার্ক হোটেলে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিলো এবং এতো বেশি হইচই করেছিলাম যে, আমি এলিজাবেথ হার্ডভিককে ঈডনা সেইন্ট ভিনসেন্ট বলে ফেলেছিলাম। সে তখন বললো- আমি এখনো ততোটা বৃদ্ধ হইনি। আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর আমরা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। আমি এবং আমার স্ত্রী মার্গারেট তাদেরকে বীচ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের কন্যা হ্যারিয়েটও সঙ্গে ছিলো। আমি আর লাওয়েল বীচে থেকে গিয়েছিলাম। তার স্ত্রী ও কন্যা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছিলো বলেই মনে হয়। আমাদের গ্যাসের লণ্ঠন বা প্রদীপ ছিলো। সেই সময়ে কেবল ‘ইমিটেশন্স’ প্রকাশিত হয়েছে এবং আমার মনে পড়ে, সে আমাকে হুগো আর রিল্কের কথা বলছিল আর তাদের সম্পর্কে আমার ভাবনা বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো। আমি তাকে রিল্কের উদ্ধৃতি মনে করে ওই বইয়ের দুটি স্তবক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। লাওয়েল তখন বললো,  ‘এগুলো আমারই।’ এমন যশস্বী খ্যাতিসম্পন্ন চমৎকার একজন মানুষ কর্তৃক আমার ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়াটা সত্যিই খুব কৌতুকর আর উষ্ণ ছিলো। লাওয়েল অনেকের সাথেই সততা ও  বিনয়সহ ব্যবহার করে। আমিও সেই স্মৃতিটি খুব লালন করি। আমরা যখন নিউইয়র্কে ফিরে গেলাম, ক্যাল ও লিজি অনেক লোকজন নিয়ে আমাদের জন্যে একটা বড় পার্টির আয়োজন করেছিল এবং আমরা আরো ঘনিষ্ট হয়ে উঠলাম। ক্যাল ছিলো দীর্ঘকায় স্থুল পুরুষ, কিন্তু অত্যন্ত শিষ্ট, মর্মস্পর্শী মজার মানুষ। আমি মনে করি, সে যখন শান্ত থাকে, কোনো বর্ণনা তার প্রকৃত শিষ্ট, আমেদিত, অমায়িক সৌন্দর্য তুলে আনতে পারে না। সে আমার পুত্র পিটার এবং হ্যারিয়েটের ছবি দীর্ঘ সময় ধরে তার ওয়ালেটে রেখেছিলো। ছবিগুলি সে বের করতো আর আমাকে দেখাতো। লাওয়েল খুব চমৎকার ভাবপ্রবণ একজন মানুষ ছিলেন। একবার আমি তার সাথে দেখা করতে যাই এবং সে আমাকে বলে, ‘চলো অ্যালেন গিন্সবার্গের সাথে দেখা করি এবং তাকে বিজয়ী হতে বলি।’ সে আমাদের প্রতি এতোটাই স্নেহার্দ্র ছিলো যে আমার পক্ষে এটা ভাবা খুবই কঠিন যে সে আমাদের মাঝে নেই। আমি আমার প্রতি লাওয়েলের স্নেহকে তার আতিথেয়তা থেকে আলাদা করতে পারি না। আমি তার চরিত্র ও নম্রতার কথা ভাবি, তার সরলতার কথা ভাবি, যা তাকে জানার একটা উপায় ছিলো। তার আথিথেয়তা গ্রহণ করার উদারতাকে আমি ভালোবাসতাম। ‘আমি আমেরিকান কবি, আমি বৈচিত্র্যময় হতে চলেছি, আমি আমার নিজস্ব স্বর অর্জন করতে চলেছি যা অন্য সবার স্বরের তুলনায় আলাদা’- এ জাতীয় কথাবার্তা বলার মতো কবি সে ছিলো না। সে এমন একজন কবি ছিলো যে বলতো,’আমি সবকিছুই গ্রহণ করতে শিখেছি।’ তাঁর বহুমুখী চিন্তনক্ষমতা ছিলো। এমনকি সে তাঁর মধ্যবয়সেও উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, ফ্রাঙ্কোইস ভিলন অথবা বরিস পাস্তেরনাক কিংবা অন্য সবার দ্বারা প্রভাবিত হলে তা স্বীকার করতে বিব্রত বোধ করতো না।

কাব্যিক প্রভাব বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন?
আমাকে সে যা-কিছু বলেছিলো, তার মধ্যে অন্যতম হলো, ‘তুমি কবিতায় তোমার সামর্থের চেয়েও বেশি ঢেলে দেবে।’ সে আরো পরামর্শ দিয়েছিলো, আমি যেনো লাইনের প্রথম বড় হাতের বর্ণটি বাদ দিয়ে ছোট হাতের অক্ষর ব্যবহার করি। আমি সেটা করেছিলাম এবং এর ফলে আমি অনেকটা সতেজ বোধ করেছিলাম। ব্যাপারটা আমাকে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছিলো। এটা খুবই সাদামাটা পরামর্শ। একজন তরুণ লেখক আপনাকে যা বলতে পারে তার মধ্যে এটি অন্যতম, মনে দাগ কাটার মতো ব্যাপার- একটি ছোটখাটো সূচনা বলতে পারেন। আমি মনে করি, লাওয়েলের রুদ্ররূপ সততায়, কবিতার অভ্যন্তরে প্রবেশের কাল্পনিক ক্ষমতায় (যা আগে ছিলো না)- এর দ্বারাই প্রভাবিত হতো অন্যরা। যেন তার জীবন একটি উপন্যাসের পরিচ্ছদমাত্র। এটি এজন্য নয় যে, আপনি এর একটা চরিত্র। বরং এটি এই জন্যে যে, কবিতায় না-থাকা কিছু জিনিস, কিছু গতানুগতিক বর্ণনা, আপনাকে উদ্দীপ্ত করতে পারে। লাওয়েল গতানুগতিকতাকে গুরুত্ব দিতেন। গতানুগতিকতাকে গতানুগতিক রেখে সেটিকে কাব্যিক করে তোলার ব্যাপারটিকে বড় ধরনের কৃতিত্ব হিসেবেও অভিহিত করা যায়। আমি মনে করি, স্পষ্টতার ক্ষেত্রে তিনি যা করতেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান ছিলো সরলতার অভিমুখ।

যুক্তরাষ্ট্রে আপনার প্রথম কবিতাপাঠের ঘটনাটি সম্পর্কে বলবেন, মানে, আপনার কবিতাপাঠের সময়ে যা ঘটেছিলো? মঞ্চে আপনার সম্পর্কে লাওয়েলের ভূমিকার আতিশয্য আপনার জন্যে নিশ্চয়ই প্রণোদনামূলক ছিলো।
লাওয়েল ঠিক কী বলেছিলো আমি জানি না, কারণ আমি পর্দার আড়ালে ছিলাম। আমার মনে হয় এটা গাগেনহেইমে ঘটেছিল। আমি চেলসি হোটেলে ছিলাম। আমি সেদিন চুল কাটানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম আর তাই বোকার মতো একটা সেলুনে গিয়ে বসে পড়লাম। খৌরকার ইলেকট্রিক ক্ষুর নিলেন, এবং একেবারেই উন্মাদ প্রকৃতির চুলছাঁটাই করে বসলেন। এরকম চুলছাঁটাই আমার জীবনে আর কোনো দিন ঘটেনি। আমি খুব ক্ষেপে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্ষেপে গিয়ে তো আর চুল ফিরিয়ে আনা যায় না। আমি এমনকি হ্যাট ব্যবহারের কথাও ভাবছিলাম। কিন্তু যাই হোক, আমি কোনোভাবে চালিয়ে নিলাম। আমার মাথাটি ঠিক নরকের মতো দেখাচ্ছিলো। আমার পড়ায় এর কিছু প্রভাব পড়লো। আমি ‘অ্যা ফার ক্রাই ফ্রম আফ্রিকা’ পড়ছিলাম। হঠাৎ সমস্বর কণ্ঠের প্রসংশাসূচক ধ্বনি শুনতে পেলাম। কবিতাপাঠের ক্ষেত্রে আমি আর কখনোই এরকম সাধুবাদ পাইনি। আমার মনে পড়ে না, আমাকে এরকমভাবে আর কখনো আনুষ্ঠানিক কবিতাপাঠ করতে দেয়া হয়েছিলো কিনা। কিছু কারণে আমি ভাবলাম যে, এই সাধুবাদের অর্থ হচ্ছে আমাকে থেমে যেতে হবে, তাদের দৃষ্টিতে আমার পড়ার পালা শেষ। সুতরাং আমি মঞ্চের বাইরের দিকে পা বাড়ালাম। ঘটনাটাতে আমি খুবই আঘাত পেয়েছিলাম। আমি মূলত হেঁটে আসার সময় তাদের হাততালির বিষয়টি এভাবে অনুভব করেছিলাম- এটা হয়তো তাদের বলার প্রক্রিয়া- ভালো হয়েছে, ধন্যবাদ, সুন্দর ছিলো। দায়িত্বরত কেউ আমাকে ফিরে যেতে বললেন এবং পাঠ সমাপ্ত করতে বললেন। কিন্তু আমি অস্বীকৃতি জানালাম। আমাকে নিশ্চিতভাবেই খুব অহংকারী দেখিয়েছে। কিন্তু আমি ভাবলাম, যদি আমি ফিরে যাই, সেটা হবে দেমাক দেখানো। আমি ত্রিনিদাদে ফিরে গেলাম। যেহেতু লাওয়েলের প্রারম্ভিক বক্তব্যটি আমি শুনতে পাইনি, ফেডারেল বিল্ডিংয়ের কয়েকজনের কাছে পরে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। ফেডারেল বিল্ডিং ভয়েস অব আমেরিকার রেডিও টেপগুলি আর্কাইভে জমা রাখে। আমি বললাম, আমি োওয়েলের টেপটা শুনতে চাই এবং তরুণটি উত্তর দিলো,’আমরা সম্ভবত সেটি মুছে ফেলেছি।’ কয়েক বছর পর আমি ক্যালের কাছে সত্যিই যা শুনলাম, সেটি ছিলো খুবই খোশামুদে ধরনের কথা।

আপনি যোসেফ ব্রডস্কির বন্ধু হলেন কিভাবে?
এটি আসলে যথেষ্ট হাস্যকরই, ব্রডস্কির সাথে লাওয়েলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ হয় আমার। রজার স্ট্রস, সুশান সন্তাগকে সাথে নিয়ে আমি বোস্টনে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। আমরা যোসেফের জন্যে কোথাও অপেক্ষা করছিলাম। সম্ভবত সেটি বিমানবন্দরে হবে। কিন্তু অজানা কোনো কারণে তার আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। শেষকৃত্যের সময় আমার সংরক্ষিত আসনের পাশের আসনে একজন বসলেন। আমি তাকে চিনতাম না। একসময় আমি উঠে দাঁড়ালাম, তার দিকে তাকালাম এবং ভাবলাম, এই লোকটি যদি না কাঁদে, তবে আমিও কাঁদবো না। লোকটি কী করছে তা দেখার জন্যে আমি তার দিকে আড়চোখে তাকালাম। কিন্তু তাকে খুব রুক্ষ মনে  হলো। তার এই রুক্ষমূর্তি আমার অশ্রু সংবরণে সাহায্য করলো। আসলে ও লোকটিই ছিলেন ব্রডস্কি। পরে আমাদের সাক্ষাৎ হলো। আমরা এলিজাবেথ বিশপের বাড়িতে গেলাম এবং তাঁকে কিছুটা জানতে পারলাম। এরপর থেকে ব্রডস্কির সাথে আমার যে হৃদ্যতা তৈরি হলো সেটা ঘটেছিল খুব দ্রুত এবং আমার মনে হয় সেটি স্থায়ী ছিলো কিনা সুনির্দিষ্টভাবে বলাটা দুষ্কর। আমি যোসেফের পরিশ্রম, তাঁর শৌর্য ও তাঁর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করি। তিনি এমন একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত উদাহরণ, যিনি একজন পূর্ণাঙ্গ কবি, যিনি কবিতাকে কঠোর সাধনা ভিন্ন অন্য কিছু মনে করেন না। তিনি কঠোর সাধনা করেন এবং করতে পারেনও। লাওয়েলও কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু যোসেফের মধ্যে আপনি এই পরিশ্রমের ব্যাপারটি সুস্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারবেন শুধু তাঁর সমূহ জীবনযাপন প্রক্রিয়ার কারণে। আমরা যে-কেউ যে ধরনের জীব যাপন করি বা করার প্রত্যাশা করি, সেটা পুরাপুরি সেরকমই। যোসেফের সাধনা এমন একটি উদাহরণ বিশেষ, যা আমি নিজের গভীরে সবসময় লালন করি।

প্রথম কখন আপনি সিমাস হিনির বন্ধু হলেন?
আলভারেজ একটা রিভিউ করেছিলেন সিমাসের বইয়ের উপর। খুবই হতাশাজনক রিভিউ ছিলো সেটি। সিমাসকে তিনি একধরণের ব্লু-আইড বয় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে সবসময়ই একধরনের ব্লু-আইড বয় থাকে। আমি রিভিউটির উপর খুব ক্ষুব্ধ হলাম এবং আমার সম্পাদকের মাধ্যমে কিছুটা অশালীন ভাষায় একটি চিরকুট পাঠালাম। চিরকুটটি তাকে উদ্দীপ্ত করার জন্যে পাঠিয়েছিলাম। পরবর্তীতে, নিউইয়র্কে কারো বাড়িতে আমরা একসাথে পানীয় গ্রহণ করি। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব জোরদার হতে শুরু করে। আমি তাকে অনেকবার দেখেছি যখন সে বোস্টনের হার্ভাডে থাকতো। আমি যোসেফ ও সিমাসের মতো বন্ধু পেয়ে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করতাম। আমরা তিনজনই ছিলাম আমেরিকান পরিচয়ের বাইরের মানুষ। সিমাস আইরিশ, যোসেফ রাশান আর আমি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান। আমরা কখনো এসব নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হতাম না- কে উদার কবি, কে রুক্ষ কবি, কে মুক্তছন্দের কবি, কে কবি নয়; এসব নিয়ে কথা হতো না। আমরা এরকম বিতর্ক না করে অন্যদের বিতর্কের মধ্যে থাকাটাই ভালো মনে করতাম। আমেরিকান সাহিত্যপটের প্যারিমিটারে ছিল আমাদের তিনজনের অবস্থান। আমরা ওখানে কোনো অনুরক্ত বা সমালোচক গোষ্ঠী বা ব্যক্তির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না থেকেই শান্তিতে ঘুরে বেড়াতে পারতাম।

বছরের পর বছর ধরে মনে হচ্ছে আপনার লিখনশৈলী আরো মসৃণ, আরো স্পষ্ট, কম গ্রন্থিল আর অধিক নিত্য-নৈমিত্তিক হয়ে উঠছে। একই সময়ে কিছুটা নির্ঝঞ্ঝাট এবং ভয়ঙ্করও বটে। এটি কি আপনার মাঝবয়সের কাব্যশৈলীর যথার্থ মূল্যায়ন হল বলে আপনি মনে করেন? একজন তরুণ ওয়ালকট মিডসামার বইটি লিখেছেন, আমি কল্পনাও করতে পারি না।
সবকিছুরই অবশ্য পরিবর্তন হয়। যখন আমি ‘অ্যানাদার লাইফ’ শেষ করলাম, আমার কাছে মনে হলো যথাযথভাবে ছোটকবিতা লেখা আরও দরকার। এগুলো বড় গ্রন্থ বা সেরকম কিছু বলে মনে হচ্ছিল না। লিখনশৈলী তখনো সেই একই রকম ঘূর্ণন, একই রকম ঝুল অবস্থায় অগ্রসর হচ্ছিল। ‘মিডসামার’ লেখার সময়ে আমার মনে হলো আমি আর কবিতা লিখতে চাই না, যদিও সেটি কিছুটা দাম্ভিক বলে মনে হতো। আমি সম্ভবত শুধু অনুভব করেছিলাম, অনেক বেশি পরিশ্রম করছি। আমি আমার আঁকাআঁকিতে উন্নতির করার জন্যে নিখাদ মনযোগী হতে চাইছিলাম। আঁকাআঁকির সময় আমি দেখলাম আমার মাথায় কবিতার লাইন আসছে। কিন্তু আমি নিজে সেগুলো নষ্ট করে ফেলতাম। আমি প্রচণ্ড অকবিসুলভ ভাবনায় ডুবে গিয়ে বলতাম- ঠিক আছে, আমি সবকিছুকে অবদমিত রাখবো। তাও যদি কাজ না করে, তাহলে আমি সবকিছু ভুলে থাকবো। এরপর যা ঘটতে লাগলো, লাইনগুলো বারবারই ঘুরে-ফিরে আসতে লাগলো। সম্ভবত লাইনগুলোর অতিরিক্ত জ্বালাতনের কারণে শেষে খেয়াল অনুসারে লাইনগুলোকে সন্নিবিষ্ট করলাম এবং দেখলাম, সেগুলো খুব দুর্বল লেখা। অনিবার্যভাবে এরকম অবস্থায় আপনি প্রবহমানতায় ফিরতে চেষ্টা করবেন। আমি সেরকম কিছুই করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি মনে করি সেটা ছিল কল্পনার বিপরীতে কিছু করা, যা একরৈখিক, গীতিময়, মসৃণ বা সুপাঠ্য ছিলো না। বরং তা ছিলো অ্যান্টিমেলোডিক। আপনি কবিতার জন্যে যদি কবিতাকে ব্যক্তিত্ব দান করেন, কবিতাটি অ্যান্টিমেলোডিক হয়ে উঠছে কিনা উপলব্ধি করার জন্য তা বেশ উত্তেজক হয়ে উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে শব্দভাণ্ডার আরো দুরূহ হয়ে ওঠে, ছন্দ আরো উপভোগ্য হয়ে ওঠে এবং এরকম আরো অনেক কিছু ঘটতে পারে। অতএব তখন যা কিছু ঘটেছিলো সেসব কবিতা না লেখার ইচ্ছে থেকে ঘটেছিলো, অথবা কবিতা লেখার ধারণার বিপরীতে কবিতার মতো একটা কিছু হচ্ছিল। এই কবিতাগুলোর সবগুলোই ছিলো অনেক সমৃদ্ধ, পরস্পরবিরোধী, অধিক জটিল। এভাবেই দেখা গেল, ধীরে ধীরে একটি বইয়ের অভ্যুদয় ঘটেছে। অনিবার্যভাবেই, আপনি আপনার চারপাশের ছড়ানো-ছিটানো, খণ্ড-বিখণ্ডিত জিনিস ছেড়ে যেতে পারবেন না। আমি যে সব অংশকে কিছুটা উপযুক্ত মনে করেছি, সবগুলোকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম, আচ্ছা এসব কি খুবই সাধারণ জিনিস নাকি সাধারণ নয়, এদেরও, মানে এই লাইনগুলোরও অন্য সব ক্ষুদ্র জিনিসের মতো বিশালভাবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। এই ব্যাপারটিই ‘মিডসামার’-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে।

‘কালেক্টেড পোয়েমস’ প্রকাশ করতে পেরে কেমন বোধ করছেন?
কবিতা লিখলে আপনাকে একটি ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে যে আপনি আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পৌঁছেছেন। আপনি হয়তো এ ব্যাপারেও সচেতন থাকবেন যে, আপনার লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে আপনার কল্পনাশক্তি কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছে। আশ্চর্যজনক হলো এই সময়টা আমার একটি কঠিন সময়। আমি সম্পূর্ণ ভীত। এটি এই কারণে নয় যে প্রচারণা থেকে পালিয়ে বেড়ানো সম্পর্কে আমার আছে একধরনের ভয়। নিজেকে এভাবে বিকশিত হতে দেখার জন্যেও ভয়, তাও নয়। আমি মনে করি না যে, যে-বালকটিকে আমি জানি সে তেমনই আছে, একদিন যে কবিতা লিখতে শুরু করেছিল- সে কোনো প্রশংসা, কোনো প্রচারণা চায় না। কিন্তু এর সবই যন্ত্রণাদায়ক বলে মনে হয়। আমার মনে পড়ে ডিলান টমাস কোথাও বলেছিলেন, তিনি যে সময়ে বিখ্যাত ছিলেন না, সেই সময়টাকেই তিনি বেশি উপভোগ্য মনে করতেন। আমি যা বলতে চাই তা হল, আমার আরেকটি বই প্রায় প্রস্তুত অবস্থায় আছে, আর আমি আশা করি সেই বইটার কবিতাগুলোর মাধ্যমে কালেক্টেড পোয়েমসের সকল খুঁত ঢেকে দেওয়া যাবে। কালেক্টেড পোয়েমস প্রকাশের প্রায়শ্চিত্ত সাধন করা সম্ভব হবে।

[সমাপ্ত]

তৃতীয় পর্ব

http://teerandaz.com/%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A6%9F-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A6%A6%E0%A7%87/

দ্বিতীয় পর্ব

http://teerandaz.com/%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%95%E0%A6%9F-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%93-%E0%A6%8F%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A6%AE/

প্রথম পর্ব

ডেরেক ওয়ালকট > ‘কবিতা লেখা একধরনের প্রার্থনা’ [সাক্ষাৎকার] / ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close