Home অনুবাদ ডেরেক ওয়ালকট > ‘ব্রিটিশদের দ্বারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে কিছুই সৃজিত হয়নি’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ৩ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

ডেরেক ওয়ালকট > ‘ব্রিটিশদের দ্বারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে কিছুই সৃজিত হয়নি’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ৩ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ July 17, 2017

ডেরেক ওয়ালকট > ‘ব্রিটিশদের দ্বারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে কিছুই সৃজিত হয়নি’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ৩ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : নোবেল বিজয়ী প্রয়াত ক্যারিবীয় কবি ডেরেক ওয়ালকটের সবচেয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল প্যারি রিভিউতে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন এডওয়ার্ড হির্শ। এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ সেই সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম। কয়েক পর্বে তীরন্দাজে এটি প্রকাশিত হবে। ইতিপূর্বে এর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হয়েছিল, আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব।]

পর্ব ৩

ক্যারিবীয় দ্বীপে এটি একটি ভয়াবহ ব্যপার। এখানকার মধ্যবিত্ত সমাজ হচ্ছে অর্থলিপ্সু, আত্মকেন্দ্রিক, উদাসীন, আত্মতুষ্ট, আত্মতৃপ্ত সমাজ। তারা তাদের সংকীর্ণতাকেই উপভোগ করে। এরা তাদের নিজস্ব লেখক শিল্পীদের ব্যপারে খুব সামান্যই কথা বলে। প্রত্যেক শিল্পীই এটাকে বাস্তবতা হিসেবে জানে। 

প্রশ্ন : ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে কিছুই সৃজিত হয়নি- এই বিবৃতিটি ট্রলোপের কাছ থেকে ধার করে পুনরাবৃত্তি করেছিলেন ভিএস নাইপল। এ ব্যপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
এই কথাটা বরং এভাবে ঘুরিয়ে  বলা উচিত- ব্রিটিশদের দ্বারা ওয়েস্ট ইন্ডিজে কিছুই সৃজিত হয়নি। আর এটাই এই প্রশ্নের মোক্ষম উত্তর হতে পারে।  ব্রিটিশদের বিদায়ের পর এবং এমনকি এখন পর্যন্ত যে জিনিসটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে, তাদের অলসতা ও উদাসীনতার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত একটি জাতির মানসিক ভগ্নদশা কাটিয়ে ওঠার জন্যে ব্যাপক উদ্যমে প্রচেষ্টা চালানো দরকার। ক্যারিবীয় দ্বীপে দারিদ্র্যজনিত বিষণ্নতা খুবই হতাশাজনক। এই পরিস্থিতির দিকে  কেউ যদি দৃষ্টিপাত করে এবং উত্তরণ ঘটাতে চায়, তবে একমাত্র উপায় হচ্ছে সামর্থ্য ও বিশ্বাসের চমৎকার গভীরতা নিয়ে কাজ করা। আর এই সামর্থ্য ও বিশ্বাসের গভীরতাটা হতে হবে ভবিষ্যত-নির্ভর, এটা অতীত-নির্ভর হলে চলবে না। আমি যখন এখানে ফিরে আসি, কত যে বিচ্ছিন্নতা, কত যে হতাশাময় অবস্থা অবলোকন করি! আমি জানতাম আমাকে এক ভয়াবহ দণ্ডাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে। আর এই অভিযোগ বাতিলের চেষ্টা করা মানে নিজের আদি বা শেকড়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এটা আপনার পরিবার বা অতীতের চেয়েও শ্রেয়তর অনুভবের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। কিন্তু আমি সেরকমটা করতে পারি না, করতে সক্ষম নই।

রবিনসন ক্রুশো চরিত্রটি আপনার কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?
আমার জীবন ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই একটা সময় ছিলো যখন একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান চিত্রকর হিসেবে আমার একটা ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, যে অবস্থাটা এখন বিপন্নপ্রায়।  ক্রুশো এমন একটি চরিত্র যাকে জাহাজডুবির বিপন্ন ভাবনা থেকে সেই নির্জন দ্বীপে নিজেকে পুণর্নির্মাণ করে নিতে হয়েছিলো। আমি ক্যাস্টঅ্যাওয়ে নামে একটা কবিতা লিখেছিলাম। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, আমি ত্রিনিদাদের কোনো বালিয়াড়িতে সপ্তাহকাল থাকতে যাচ্ছি। আমার স্ত্রী রাজি হলো। আমি তীরবর্তী একটি দ্বীপে এক সপ্তাহ থাকলাম এবং এই কবিতাটি লিখলাম। আমি বলতে চাচ্ছি না যে, এটা আমার ক্রুশো ধারণার প্রারম্ভিক ভাবনা ছিলো। তবে তারও সম্ভবনা ছিলো। সাধারণত এখানকার বিস্তৃত সমুদ্রতট খুবই শূন্য, বিরান- শুধুমাত্র বেলাভূমি আর চারপাশের সবুজ তৃণভূমি ছাড়া কিচ্ছু নেই। ক্রুশো চরিত্রকেন্দ্রিক লেখা আমার কবিতাগুলো তাই একেবারেই আলাদা ধরনের। ক্রুশো বিষয়ক ধারণার একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায়ই বশ্যতা স্বীকার কিংবা প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে আর আমি সেটাকে বিপন্নতার রূপক মনে করি। আপনি বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে আপনার চারপাশে তাকাবেন এবং আপনার প্রয়োজনীয় উপকরণ আপনি পেয়ে যাবেন। সেই উপকরণ হতে পারে একটি কলম কিংবা একটি হাতুড়ি। আপনি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন বা তৈরি করে নেবেন তা একেবারেই অ্যাকাডেমিক। আপনি শুধু প্রয়োজনের তাগিদে সেগুলো বিনির্মাণ করতে পারবেন না, এর সঙ্গে সঙ্গে অনেক ধারণাও আপনার মধ্যে গড়ে উঠবে। আপনার ধারণা হবে যে, আপনি এখানে দীর্ঘকাল অবস্থান করবেন এবং সেই সাথে মালিকানার ধারণাও পোষণ করতে থাকবেন। খুব বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে এই বিষয়গুলোই আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে। এছাড়াও আরো কিছু পরিহাসপ্রবণ ধারণাও কাজ করেছে, সুসভ্য হওয়া সত্ত্বেও ফ্রাইডের অবস্থান সম্পর্কে আমি ভাবতে পেরেছি। বাস্তবে যা দেখি,  ঘটে তার উল্টো। ক্যারাবীয় দ্বীপগুলোতে যারা মহানগর বা মহাদেশগুলো থেকে আসে, তাদেরকে একটা পুনঃপরিশীলন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এখানে তারা যেটি মোকাবেলা করে তা হচ্ছে- যদি তারা সরাসরি কিছু দেখার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তাহলে তাদের অনেক কিছু শেখার সুযোগ আছে। প্রথমেই বলতে হয়, পাশাপাশি বাস করা জাতিগুলোর পারস্পরিক অভিযোজন ক্ষমতার কথা, বিশেষ করে বলতে হয় জ্যামাইকা ও ত্রিনিদাদ অঞ্চলের কথা। তারপর বলতে হয় ঐতিহাসিক ধারণাসমূহের কথা। আমার কাছে মনে হয়, ক্যারিবীয় ইতিহাসের ক্ষত-মোচনের দৃশ্যকল্প বা ইমেজগুলি এখানে রয়ে গেছে- যেমন করে ফেনিল ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ে ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায় তীরের সমস্ত জঞ্জাল, বিশাল মেঘমালা যেমন পাল্টে যায় মুহূর্তেই। ক্যারাবীয় অঞ্চলে  চলমান গতির একটা ধারণা সচল আছে আর সেই ধারণাটি সমুদ্র এবং আরেক ধরনের অনুভূতি দিয়ে কেউ সেখানে নিশ্চল না থেকে সাগরজলের মধ্য দিয়ে পরিভ্রমণ করতে পারে। এখানে সময় সুদীর্ঘ- শহরের চেয়ে দ্বীপাঞ্চলে এটি ভিন্নভাবে ঘটে । এখানে আমরা খুব একটা ঘড়িনির্ভর জীবন-যাপন করি না।  আপনাকে যদি কোনো স্থানে অবস্থান করতে হয়, সেখানে আপনি সময় নিজের মতো করে তৈরি করে নেবেন, আমার মনে হয় আপনি ধৈর্য্য ও সহনশীলতা শিখতে পারবেন আর নিজেকে একজন চিত্রকরের স্থলে একজন  জাত শিল্পী হিসেবে তৈরি করে নিতে পারবেন।
আপনার সাম্প্রতিক নাটক প্যানটোমিম ক্রুশো আর ফ্রাইডের মধ্যকার সম্পর্কটি বর্ণবাদ ও অর্থনৈতিক প্রভেদের বিষয়টি উদঘাটন করে দেখানো আছে। নাটকটিতে টোবাগোর একজন শ্বেতাঙ্গ হোটেল মালিক প্রস্তাব করেন, তিনি এবং তার কৃষ্ণাঙ্গ ভৃত্য মিলে অতিথীদের আপ্যায়নের জন্যে ক্রুশো কাহিনির উপর ব্যঙ্গাত্মক কিছু পরিবেশনা করবেন। এই নাটকটি কি সাম্রাজ্যবাদের রূপক?
এই নাটকটির বিষয়বস্তু সাদামাটা। এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। এই পদধারী ইংরেজ ভদ্রলোক জনসম্মুখে তার দুঃখ প্রদর্শনে রাজি নয়। সে তার কণ্ঠে-কথায় দৃঢ়তা প্রদর্শন করে। আবেগ অনুভূতি এমন একটি জিনিস যা অভিজাত ইংরেজরা পরিহার করে চলে। কিন্তু একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান তাকে স্বীকার করতে বাধ্য করে যে, সে এরকম আবেগ প্রদর্শনে সক্ষম  এবং তার প্রদর্শনও দুষণীয় কিছু নয়। কিছু পরিশোধনও সম্ভব। আর এটাই নাটকের মূল বিষয়বস্তু। এটাকে দুটি ভাগে দেখা যেতে পারে, একসঙ্গেও দেখা যেতে পারে, আবার একই জায়গায় রেখে কী ঘটে দেখা যেতে পারে। আমি আসলে বর্ণবাদের দ্বন্দ্ব নিয়ে নাটকটি লেখার কথা সত্যিই কখনো ভাবিনি। যখন আমেরিকায় এই নাটকটি মঞ্চস্থ হল, সেখানকার বর্ণবাদ সমস্যার প্রকটতার কারণে এটি খুব টানটান উত্তেজনাপূর্ণ প্রডাকশনে পরিণত হলো। কিন্তু যখন এটা এখানে মঞ্চস্থ হলো, সত্যিকারের গভীর ঐতিহাসিক তিক্ততার সুরকে ম্রিয়মাণ করে দিল। এটি যা নির্দেশ করে, সেটা প্রকৃতপক্ষে একটি প্রহসন। আমি এটাকে প্রহসন হিসেবেই লিখেছি। আর এই নাটকটি যা বোঝায় তা হচ্ছে, আমরা আমাদের দুঃখবোধকে ধরে রাখতে পারি না; অশ্রু নির্গত হয়, অশ্রু আবার নতুনভাবে তৈরি হয়। অবশ্য নাটকের অভ্যন্তরে একটি জায়গায় রয়েছে যেখানে উভয় চরিত্রই একজন শ্বেতাঙ্গ ও একজন কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার সংক্রান্ত বাস্তবতার  মুখোমুখি হয়েছে। এভাবেই তারা তাদের ইতিহাসের মুখোমুখি হয়। কিন্তু যখনই সেই দৃশ্যটি সরে যায়, মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টিও উবে যায়, এখান থেকেই নাটকটি শুরু হয়। আমার চেনাজানা অনেককেই বলতে শুনেছি, তারা মনে করেন নাটকটির সমাপ্তি ঘটেছে অন্তরঙ্গপূর্ণ আবহে। কিন্তু এই সমালোচনাটি করা হয়েছে আমেরিকায়। একত্রে বসবাস করার বা পূণর্মিলনের বা অভিযোজনের এমন কিছু ধারণার সহজ সমাধান রয়েছে, মাঝে-মধ্যে যা লোকজন কর্তৃক প্রত্যাখাত হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় এটা ঠিক নয়।
ষাটের দশকের মাঝের ও শেষের দিকের সাহিত্যকর্ম দ্য ক্যাস্টঅ্যাওয়ে  এবং দ্য গালফকে আপনি আপনার আগের লেখা থেকে কিভাবে কোন অর্থে আলাদা করে দেখবেন?
যে-কোনো লেখকের ক্ষেত্রে ত্রিশ ও চল্লিশের মধ্যবর্তী বয়সটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আপনি হয়তো একদিকে কাজ করেই যাবেন, অথবা আপনি কোনো তরুণের মতো অতীত সাহিত্যকর্মের দিকে ফিরে তাকাবেন। এইভাবে দূরবর্তী একটা সময়ে এসে এরকম পেছন ফিরে তাকানোটা একটা দারুণ ব্যপার, নিঃসন্দেহে।   আপনাকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে একটা শোরগোল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে চল্লিশ বছর বয়সে পা দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আপনি কীভাবে এটা করা যায়, শিখতে পারেন। এরপরও আপনার ভয় থেকেই যাবে আপনার সৃষ্টিকর্ম প্রকৃত অর্থে মাঝারি ধরনের, কিংবা ব্যর্থ, নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করার মতো কিছু হয়ে উঠছে না। তবে এমন একটা জায়গায় আপনি আপনার নিজেকে খুঁজে পাবেন, যখন আপনি বলতে পারবেন, আহ্, আপনি যা হয়ে ওঠার ভয়ে ভীত ছিলেন,  তাই হয়ে উঠেছেন : অমুক লোক, তমুক লেখক,  কারো কারো নামও হয়তো উল্লেখ করবেন এবং তারা যা প্রত্যাশা করেছিলো সেটাও বলবেন, আর আপনি এভাবেই পূর্ণতা অর্জন করবেন। কিন্তু আপনার লেখা পরের বইগুলো আপনার অর্জিত পরিচিতির বিরুদ্ধে কাজ করবে। এই জায়গায় এসে আমার মনে হয় না যে, এই লেখাগুলো তেমন গভীর নয়। লেখকের কলুষতার এতে বোধ আরো প্রগাঢ় হতে পারে। একদিকে দেখা যাবে কবিতাগুলোর অধিকাংশই শান্ত কোমল, অন্য দিকে একই সময়ে এরা ভূতলে আলোড়ন তুলছে, তুলছে কম্পন। আপনি জানেন, সবসময় যে কেউই রুক্ষ প্রাচীরে মসৃণ প্রাচীরপত্র সাঁটিয়ে দিতে পারে। এটা হচ্ছে এমন কিছুর উপর আচরণের কোমলতা আরোপ করা, যা মূলত একেবারেই অকার্যকর, বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং অমীমাংসিত। এই বইটিতে এরকম অসংখ্য রুক্ষ বিষয় বা অসামঞ্জস প্রসঙ্গ বাদ পড়েছে। তারপর এই যে অসন্তুষ্টি তা কারো কারো ক্ষেত্রে জীবনভর চলতে থাকে।
আপনি ১৯৫৯ সালে ত্রিনিদাদ থিয়েটার ওয়ার্কশপ গঠন করেছিলেন এবং শেষে সেটি ১৯৭৬ সালে ছেড়ে আসেন। এ ব্যপারে কিছু বলবেন? আপনি একবার বলেছিলেন এমন একটা থিয়েটার তৈরি করবেন যেখানে যে-কেউ একই প্রতীতি নিয়ে শেক্সপীয়র কিংবা ক্যালিপসো উভয়ই মঞ্চস্থ বা পরিবেশন করতে পারবেন। আপনার এই অভিপ্রায় কি সফল হয়েছিলো?
হ্যাঁ, আমি মনে করি আমি সেটি করতে পেরেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অভিনয়শিল্পীগণ বিস্ময়কর। তাদের অধিকাংশই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাধ্যমিক শিক্ষালয়ে মাত্র পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু সেখানে তারা যে ধ্রুপদী প্রশিক্ষণ ও পাঠ লাভ করেছেন তা ছিলো সুবিস্তৃত ও মনোমুগ্ধকর- বিশেষত অসংখ্য শেক্সপিরীয় সাহিত্যকর্ম এবং অন্যান্য শ্রেষ্ঠ লেখকদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। একটা সময় লোকেরা অনেক বেশি পরিমানে পড়াশোনা করতো, বড় কবিদের বেলায় আমরা সেটা দেখেছি। সুতরাং অধিকাংশ ইংরেজ লেখকেরই ইংরেজি ভাষার ধ্রুপদী থিয়েটারগুলো সম্পর্কে জানাশোনা ছিলো। তাদরে নিজস্ব একটা বাচনভঙ্গি ছিলো, আর এই বাচনভঙ্গিটা ছিলো সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত এবং সেটা ছিলো চমৎকার শৈলীসম্পন্ন। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অভিনয়শিল্পীদের মুখেই আমি প্রথমবারের মতো কিছু দারুণ শেক্সপিয়রীয় উদ্ধৃতি শুনেছি।  আমরা এখন যে উভলিঙ্গীয় বিবিসি- টাইপ উচ্চস্বরের শেক্সপিয়রীয় বাচনভঙ্গি শুনি,  সেটি নিশ্চিতভাবেই শেক্সপিয়রীয় বাচনভঙ্গি নয়। এটি অমসৃণ, অশিষ্ট জিনিস- উচ্চমার্গীয় অশালীনতা থেকে অত্যুত্তম বিশুদ্ধতা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি; আমাদের এখানেও এটা দেখতে পাওয়া যাবে। শৈলীর ক্ষেত্রে আমাদের এখানে অশালীনতা থেকে শুরু করে পরিশুদ্ধতা- সবই আছে। ভাষার অলঙ্করণের ক্ষেত্রে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান লেখকদের প্রবল আগ্রহ দেখা যাবে।  একই সঙ্গে এটাও বলা যায়, একজন অভিনয়শিল্পীও আসলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেখকদের মতোই নবীন : তিনি যা কিছু স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করবেন সেটিই নির্দিষ্টতা পায়। এক্ষেত্রে পথিকৃতের বিষয়টিও রয়েছে। আমার ক্ষেত্রে নাটক রচনা করা কবিতা লেখার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর ছিলো, কারণ এটি জনসম্পৃক্ত কর্ম ছিলো। লোকজন একত্রিত হয়ে নাটক উপভোগ করে এবং নাটক থেকে বিভিন্ন উপাদান ভাবনা পায়। আমি যখন ১৯৫৮ সালে আমেরিকা যাওয়ার ফেলোশীপ পেয়েছিলাম, এমন একটা জায়গা পেতে চাইলাম, যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিনয় শিল্পীরা কোনো সঙ্গী ছাড়াই আসতে পারে, এসে তারা একত্রিত হতে পারে এবং একটা কিছু করার চেষ্টা করতে পারে, সাধারণ খুটিনাটি বিষয়সমূহ খুঁজে বের করতে পারে। যেমন ধরুন, কোনো রকম প্রভাব ছাড়াই কিংবা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজেদের মতো করে কথা বলতে পারা, কথ্যভাষায় এমন শ্রদ্ধার সাথে কথা বলা যেনো মনে হয় আমরা শেক্সপীয়র অথবা চেখভ মঞ্চস্থ করছি এবং লোকজনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিজস্ব  মনস্তত্ত্বটা বুঝতে পারছি। প্রথম দু’বছর আমাদের খুব কঠিন সময় গিয়েছিলো। খুব কম লোক আসতো। আমরা নিশ্চিত ছিলাম না আমরা কী করছি। আমরা শুধু বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চেষ্টা,  অনুসন্ধান ও উদ্ভাবন করে যাচ্ছিলাম। আমি একটি নাটকও মঞ্চায়ন না করার ব্যপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, যতক্ষণ না আমাদের নিজের মধ্যে একটি ঐক্যতান তৈরি হয়। আমার তো কোনো কোম্পানি গঠনের দুশ্চিন্তা ছিল না। ঐ সময়ে আমি যা কিছু করতে চেয়েছিলাম সেটা হচ্ছে অভিনয়শিল্পীর জন্ম হোক এবং তারা একসাথে কাজ করা শুরু করুক। এটা করতে দীর্ঘ সময় লেগে গিয়েছিল। তারপর অবশেষে আমরা একটা নাটক মঞ্চায়ন করলাম এবং প্রায় সতের বছর একটা দারুণ দল হিসেবে আমরা কাজ করেছিলাম। এই দলটিতে যুক্ত হয়েছিলো নৃত্যদল এবং কয়েকজন তুখোড় অভিনেতা। আমার মনে পড়ে, একবার টেরি হ্যান্ড এসেছিলেন জোকার অব সেভিল-এর পারফরমেন্স দেখতে। তিনি বর্তমানে রয়াল শেক্সপীয়র কোম্পানির অন্যতম সহযোগী সদস্য। আমার তখনকার স্ত্রী মার্গারেটের পরামর্শে আমরা কাজটা করি। আমাদের জায়গাটি ছিলো খুব ছোট, অনেকটা ষাঁড়ের লড়াই অথবা মোরগের লড়াইয়ের বৃত্তের সমান। আমরা তাকে স্যান্ডউইচ, কফি, কমলা ও অন্যান্য খাবার খেতে দিলাম। এবং এরই মধ্যে চারপাশে জমায়েত হওয়া  মানুষেরা গানগুলো জানতে শুরু করলো এবং তারাও অভিনয়-শিল্পীদের সাথে গাইতে লাগলো। টেরি আমাকে বললেন- ডেরেক, ব্রেখট যা করতে চেষ্টা করেছিলো তুমি সেই কাজটিই যথারীতি করে যাচ্ছো। যাই হোক, আমি দারুণ বোধ করলাম, কারণ আমি জানতাম তিনি কি বোঝাতে চাইছেন। ব্রেখট তার নাটকে শ্রোতাদের অংশগ্রহণের চিন্তা করেছিলেন, যেখানে মঞ্চ হবে মুষ্টিযুদ্বের রিঙের মতো একটা স্থান, অথবা কোনো গোলাকার স্থান হবে সেটি। কিন্তু কয়েক বছরের কলহ এবং লড়াইয়ের পর দলটি ভেঙে গেলো। যদিও আমি তখনও অভিনয়শিল্পীদেরকে দল হিসেবে নয়, এককভাবে ব্যবহার করেছি। আমি আর ঐ সংগঠনটিকে চালিয়ে নিইনি। কিন্তু এরপরও বলবো, সতেরো বছর একটি থিয়েটার কোম্পানি চালিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়।
আপনি লিখেছেন আপনি প্রথমে নাটক লিখতে শুরু করেছিলেন ‘এই বিশ্বাসে যে, কেউ নিছক একটি নাটকই সৃষ্টি করে না, সৃষ্টি করে একটি থিয়েটারও এবং শুধু থিয়েটারই নয়, এর পরিবেশও।’ কিন্তু এরই মধ্যে ১৯৭০ সালে আপনি ড্রিম অন মাঙ্কি মাউন্টেইন-এর মুখবন্ধ লিখলেন। গর্ব করার মতো অনুভূতির স্থলে প্রতিস্থাপিত হলো অবসাদ, আর নির্মল অনুভূতি, মনে হয় পথ ছেড়ে নেমে এলেন হতাশায়। আসলে কী ঘটেছিলো, মানে এরকমটা ঘটলো কেন?
ঠিক এই মুহূর্তে আমি ‘অ্যা ব্রাঞ্চ অব দ্য ব্লু নীল’ নামে একটা নাটক লিখছিলাম। নাটকটি অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে, একটি ছোট্ট অভিনয়দলকে নিয়ে, কীভাবে তারা ছিটকে পড়েছিলো সেটি নিয়ে। আমি তখন পর্যন্ত জানি না- এবং আমাকে খুব দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল- যদি এটি খুব বাজেভাবে শেষ হয়, তাহলে কী দাঁড়াবে। পুরো অভিনয়দলটির আবির্ভাব, এর পরিসমাপ্তি একটি প্রশ্ন হয়েই দেখা দিয়েছিল।
সমস্যাটির কি আদৌ এই প্রশ্নের সাথে সম্পর্ক রয়েছে যে, রাষ্ট্রের উচিৎ শিল্পবিকাশে সহযোগিতা করা?
এখন আমার বয়স পঞ্চান্ন এবং জীবনভর আমি লড়াইয়ের চেষ্টা করেছি, লিখেছি, ব্যঙ্গ করেছি, এবং একটি বিষয়কে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছি যে, রাষ্ট্র তার শিল্পীদের কাছে অপরিসীম ঋণে আবদ্ধ থাকুক। আমি যখন তরুণ ছিলাম, বিষয়টি আমার কাছে শিহরণ জাগানোর মতো ছিলো। এখন আমি বৃদ্ধ, আমাকে ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। এটি একটি ব্যপার। কিন্তু আমি শুধু পথই চাই, তা নয়; আমি আনন্দ চাই, শিল্পও চাই। ক্যারিবীয় দ্বীপে এটি একটি ভয়াবহ ব্যপার। এখানকার মধ্যবিত্ত সমাজ হচ্ছে অর্থলিপ্সু, আত্মকেন্দ্রিক, উদাসীন, আত্মতুষ্ট, আত্মতৃপ্ত সমাজ।তারা তাদের সংকীর্ণতাকেই উপভোগ করে। এরা তাদের নিজস্ব লেখক শিল্পীদের ব্যপারে খুব সামান্যই কথা বলে। প্রত্যেক শিল্পীই এটাকে বাস্তবতা হিসেবে জানে। এখন ব্যপারটি হচ্ছে, আপনি এমন কী বলবেন, নিজের পৃষ্ঠদেশ সরিয়ে নেবেন, নাকি এই বাস্তবতাকে চিরতরে বাতিল করে দেবার চেষ্টা করবেন। আমি এরকম কিছু করিনি এবং এমনটি আমার দ্বারা করাও সম্ভব নয়। ত্রুটিটা হচ্ছে এই যে, ব্রিটিশরাজ এটিকে উত্তরাধিকারসূত্রে শখের চর্চা হিসেবে রেখে গেছে। আর আমরা এখনও শিল্পকে উত্তরাধিকার পরম্পরায় শখের চর্চা চালিয়ে নিচ্ছি।এই মনোভাবটি বুর্জোয়া পুঁজিপতিদের কিছু বাজে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এটা ফরাসি বুর্জোয়া শ্রেণীই হোক কিংবা ডেনিস, ব্রিটিশ, স্পেনীয় বুর্জোয়া পুঁজিপতি যারাই হোক, এটা বুর্জোয়াদের সৃষ্টি। ক্যারিবীয় অঞ্চলের- যতদূর আমার ভাবনায় আসে, প্রায় প্রতিটি স্তরেই এই সমস্যাটি  রয়ে গেছে এবং প্রায় অভিন্নভাবেই। ক্যারিবীয় দ্বীপে হাতে গোনা কয়েকজন মানবহিতৈষী রয়েছেন। এখানে টাকা যাদের আছে, আপনি শুধুমাত্র তাদের বাড়ি-গাড়ি দেখবেন, আর এখানে যে-কোনো দ্বীপের জীবনযাত্রার মান দেখবেন- কেউ কিছু দিতে চায় না। যদি তারা দিয়ে থাকে, আমার জানা নেই তারা কী দেয়, হয়তো সেটা কোনো মজুতদারতকে দেয়। এটা সাধারণত টাকা আঁকড়ে ধরে রাখা ক্ষুদ্র বণিকশ্রণির কাজ। কোনো তিক্ততা ছাড়াই আমি বলতে পারি, আমি কিছু উপার্জন করেছি কী করিনি, সেটা আমি আমেরিকাতেই করেছি, ক্যারিবীয়ে দ্বীপ করা সম্ভব হয়নি, সম্ভব হতোও না।

[চলবে]

প্রথম পর্ব

ডেরেক ওয়ালকট > ‘কবিতা লেখা একধরনের প্রার্থনা’ [সাক্ষাৎকার] / ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

দ্বিতীয় পর্ব

ডেরেক ওয়ালকট > ‘…আমারও এরকম একটা বই হোক’ [সাক্ষাৎকার পর্ব ২ ] >> ভাষান্তর মাইনুল ইসলাম

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close