Home অনুবাদ ডরিস লেসিং > যাদুবিদ্যা সে তো বিক্রির জন্য নয় >> ছোটগল্প >>> সালেহা চৌধুরী অনূদিত

ডরিস লেসিং > যাদুবিদ্যা সে তো বিক্রির জন্য নয় >> ছোটগল্প >>> সালেহা চৌধুরী অনূদিত

প্রকাশঃ October 3, 2017

ডরিস লেসিং > যাদুবিদ্যা সে তো বিক্রির জন্য নয় >> ছোটগল্প >>> সালেহা চৌধুরী অনূদিত
0
0

ডরিস লেসিং > যাদুবিদ্যা সে তো বিক্রির জন্য নয় >> ছোটগল্প 

দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকার পর ফারকারার পরিবারে ছোট্ট টেডির জন্ম হলো। এই পরিবারের মিস্টার ও মিসেস ফারকারার, দাস দাসীরা এই ঘটনায় আনন্দ প্রকাশ করে, অভিভূত হয়। ওরা দূর থেকে নানা সব পাখি শিকার করে, ডিম আর ফুল এনে দেয়। তারা বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ করার জন্য অনেক কিছু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। আত্মহারা হয়ে বলতে শুরু করলো – এই বাচ্চারা, কি সুন্দর কোমল লাল চুল, নীল চোখ। তারা বার বার মিসেস ফারকারাকে অভিন্দন জানালো। যেন এমন একটা মহৎ ঘটনার কৃতিত্ব নিয়ে তাদের আনন্দের শেষ নেই। তিনিও ভাবলেন সত্যিই এই ঘটনাটা মহৎ। তিনি চারপাশের এইসব নেটিভ আদিবাসীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ হাসলেন। তিনিও তাঁর হাসিতে বোঝাতে চাইলেন, ওদের এই আনন্দ প্রকাশের জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ।

পরে যখন প্রথমবারের মতো টেডির মাথার চুল কাটা হলো, গিডিওন নামের স্থানীয় আদিবাসী রান্নার লোক, সে চুল অত্যন্ত সন্মানের সঙ্গে হাতে তুলে নিল। এরপর ছোট্ট শিশুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো – ছোট্ট হলুদ মাথার শিশু। ওরা আদিবাসীরা সাদাদের সন্তানদের এই নামেই ডাকে – লিটিল ইয়েলো হেড। গিডিওন আর টেডি প্রথম থেকেই মস্ত এক বন্ধু হয়ে ওঠে। যখন কাজ শেষ হয়ে যায় গিডিওন টেডিকে কাঁধে করে বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা বড় গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে। দুজনে এরপর খেলা করে। গাছের ছোট ছোট ডাল, ঘাস আর গাছের পাতা দিয়ে নানান খেলনা বানায়। ভেজা মাটি দিয়ে নানান সব পশুপাখির মূর্তি তৈরি করে। যখন টেডি হাঁটতে শেখে গিডিওন ওর সামনে গিয়ে গোল হয়ে বসে। ঠোঁট দিয়ে কত সব শব্দ করে ওকে উৎসাহিত করে। তারপর যখন টলমল পায়ে টেডি পরে যায়, গিডিওন ওকে ধরে ফেলে। তারপর দুজনের হাসতে হাসতে নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যায় একসময়। মিসেস ফারকারার এই পুরনো রান্নার মানুষটাকে পছন্দ করেন। কারণ, গিডিওন সত্যিই টেডিকে ভালোবাসে।

এরপর ওদের আর কোন বাচ্চা হয়নি। একদিন গিডিওন বলে –  মিসেস ফারকারার মাথার উপরে যে ঈশ্বর বাস করেন তিনি এই শিশুকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই হলুদ মাথার ছোট্ট মানুষটা এই বাড়ির সবচেয়ে ভালো জিনিস। এই কথা বলবার জন্য মিসেস ফারকারার এই পুরনো রান্না করবার মানুষটির জন্য এক ধরনের উষ্ণতা অনুভব করেন। তাই মাসের শেষে তিনি গিডিওনের বেতন বাড়িয়ে দেন। এই লোকটা অনেকদিন থেকে ওদের জন্য কাজ করছে। ওর পুরো পরিবার এই বাড়ির সীমানার ভেতরে বাস করে। কাজেই অনেকের মতো গিডিওনদের কখনো তাদের নিজস্ব গ্রামে যেতে হয় না। গ্রামটা ওদের বাড়ি থেকে কয়েকশো মাইল দূরে। কখনো টেডির বয়সী একটা কালো শিশু জঙ্গল থেকে মুখ বাড়িয়ে টেডির দিকে তাকায়। একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেছে ওরা। বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে সোনালি চুলের এবং নীল চোখের একটি শুভ্র শিশুকে। দুজনে দুজনের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে অনেক সময় ধরে তাকিয়ে থাকে। একবার টেডি কৌতুহলবশত হাত বাড়িয়ে কালো ছেলেটার গাল এবং চুল স্পর্শ করতে চেয়েছিল। একবার গিডিওন বলেছিল – ও মিসেস ওরা দুজনেই শিশু। কিন্তু একজন জন্মগ্রহণ করেছে বস হবার জন্য আর একজন জন্মগ্রহণ করেছে চাকর হবার জন্য। মিসেস ফারকারার একটু মলিন হেসে বলেন – ঠিক তাই গিডিওন, আমিও এমন কিছু ভাবছিলাম। গিডিওন বলে – এমনই তো ঈশ্বরের অভিলাষ মিসেস। মিস্টার ও মিসেস ফারকারার দুজনেই খুব ধার্মিক মানুষ। এখন ঈশ্বরের আর্শিবাদে ধন্য মিসেস ফারকারার গিডিওনের সঙ্গে একধরনের বন্ধন অনুভব করেন।

টেডির যখন ছয় বছর বয়স হলো, তাকে একটা ছোট সাইকেল কিনে দেওয়া হলো। মোটরচালিত সাইকেল যার আর এক নাম স্কুটার। আর টেডি গতির ভেতর যে মাদকতা থাকে, তা এই সাইকেল পাওয়ার পর বুঝতে পারলো। সে সারাদিন পাখির মতো এই স্কুটারে বাড়ির চারপাশে উড়তে লাগলো। বাড়ির চারপাশে, নানা সব ফুলগাছের সারির ভেতর দিয়ে, বাড়ির হাঁস মুরগীকে সচকিত করে, কুকুরকে আর্ত চিৎকারে জাগিয়ে। তারপর শেষ পর্যন্ত রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে কয়েকবার ঘুরপাক খেল। তখন সে চিৎকার করে ডেকে বললো – গিডিওন আমার দিকে তাকাও। গিডিওন হাসতে হাসতে বললো – হলুদ মাথা, তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে হে। গিডিওনের যে ছেলে এখন রাখাল বালকের কাজ কওে, সে এসে দাঁড়ায়। ছেলেটা এসেছে স্কুটারটা দেখতে। সে অবশ্য খুব কাছে আসতে ভয় পায় কিন্তু টেডি তার স্কুটার নিয়ে একটু বাহাদুরি দেখাতে শুরু করে। তারপর চিৎকার করে বলে – এই কালো ছেলে, শিগগির আমার স্কুটারের সামনে থেকে ভাগো। এরপর ছেলেটার চারপাশে এমন গতিতে ঘুরতে শুরু কওে যে ছেলেটা ভয় পেয়ে বনের ভেতর পালিয়ে যায়। গিডিওন বেশ একটু মৃদু ভর্ৎসনার সঙ্গে বলে – তুমি ওকে এমন ভয় দেখালে কেন?

টেডি বলে – তাতে কি? ওতো একটা নিগ্রো ছেলে। এই বলে হাসতে থাকে। এই কথা শোনার পর গিডিওন যখন মন খারাপ করে ওর কাছ থেকে কঠিনভাবে সরে আসে, তার মুখটা বুকের উপর ঝুলে পড়ে। এরপর তাড়াতাড়ি বাড়িতে গিয়ে একটা কমলা এনে গিডিওনের হাতে দেয়। বলে – গিডিওন কমলাটা তোমার জন্য। সে সরি বলবে, মন থেকে সেরকম সাড়া পায় না। আবার গিডিওন মন খারাপ করে থাকবে, তাকে হারাতে হবে, এই ভাবনাও অসহ্য ওর কাছে। একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিডিওন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কমলাটি হাতে তুলে নেয়। বলে – এইতো কিছুদিন পর হলুদ মাথা তুমি স্কুলে যেতে শুরু করবে। তারপর কত বড় হবে তুমি। মাথা একটু শান্তভাবে নাড়িয়ে গিডিওন বলে – এভাবেই চলবে আমাদের জীবন। এরপর মনে হয় গিডিওন টেডির সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখতে চায়। কারণ অবশ্য এই নয় যে ও রাগ করেছে। কিন্তু যা অবশ্যম্ভাবী তা মেনে নেওয়াই ভাল। টেডি হাত বাড়িয়ে তখন হাসছে। তার কাঁধে পা ঝুলিয়ে যে বসেছে, তার সঙ্গে সে খেলছে। এখন মনে হয় গিডিওন তার কালো চামড়ার স্পর্শ সাদা চামড়ার সঙ্গে লাগাতে চায় না। সে সবসময়ই দয়ালু কিন্তু মনে হয় একটা যান্ত্রিক নিয়ম পালন করছে। গিডিওন এই মুহূর্তে দেখলো ঠোঁট ফুলিয়ে টেডি মন খারাপ করে আছে। এই ভঙ্গিটার দিকে তাকিয়ে গিডিওনের মনে হয়, টেডি এখন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ হয়ে উঠেছে। যখন সে রান্নাঘরে আসে গিডিওনের কাছে কিছু চাইতে, এমন করে কথা বলে ঠিক যেমন করে কথা বলে একজন সাদা মানুষ তার কৃষ্ণাঙ্গ কাজের মানুষের সঙ্গে।

কিন্তু একদিন টেডি হাতের মুঠিতে দুই চোখ ঢেকে চিৎকার করতে করতে রান্নাঘরে ঢোকে। তার সারা শরীর বেদনায় কাঁপছে। গিডিওনের হাত থেকে গরম সুপের পাতিল ঝপ করে পড়ে যায়। দৌড়ে টেডির কাছে গিয়ে জোর করে চোখের উপর থেকে ওর মুঠিবদ্ধ হাত দুটি সরায়। – সাপ সাপ। চিৎকার করে টেডি। টেডি সেদিন স্কুটারে ঘুরতে ঘুরতে একটা বড় ফুলের ঝাড়ের পাশে একটু বিশ্রাম নিতে দাঁড়িয়েছিল। তখন একটা গাছের সাপ বাড়ির ছাদ থেকে ঝুলতে ঝুলতে টেডির চোখে থুতু ফেলে। মিসেস ফারকারার এই ঘটনার কথা শুনে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসেন – গিডিওন গিডিওন আমার টেডি অন্ধ হয়ে যাবে। চোখ দুটো তখন বড় হয়ে ফুলে আছে। কোনমতে দেখছে টেডি। টেডির চোখের ভেতর থেকে ক্রমাগত এক ধরনের বেগুনী জলীয় পদার্থ ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে। গিডিওন বলে – একটু দাঁড়ান আপনি। আমি আসছি।

খানিক পরে দেখতে পান গিডিওন ফিরে আসছে এবং ওর হাতে ঝুলছে একটা ছোট চারাগাছের মতো একটা অজানা লতার গাছ।

মিসেস ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই লতার গাছ টেডির চোখ ভাল করে তুলবে। গিডিওন খুব তাড়াতাড়ি সেই গাছের শরীর থেকে সমস্ত পাতা ছিঁড়ে নেয়। কেবল একটু শিঁকড় ঝুলছে তখন। চারাগাছটাকে না ধুয়েই সমস্ত পাতাগুলো মুখে পুরে চিবাতে থাকে। বেশ জোরে। মিসেস ফারকারার কাছ থেকে টেডিকে কেড়ে নিয়ে জোর করে তার মুখের সেই গাছের পাতার দলা টেডির চোখে ঘসতে থাকে। এতে টেডি আরো জোরে চিৎকার করে ওঠে। মিসেস ফারকারারও এই কান্নায় ওকে বাধা দিতে চান। – গিডিওন গিডিওন। ক্রমাগত চিৎকার করতে থাকেন তিনি। দুই ঘণ্টার মধ্যে টেডির চোখের ফোলা কমে গেল। যদিও চোখ দুটো তখনও কিছুটা ফোলা এবং বেশ সুস্থ নয়। তবু টেডি সবকিছু দেখতে পারছে। এরপর মিস্টার ও মিসেস ফারকারার রান্নাঘরে এসে গিডিওনকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানায়। মনে হলো এত বড় উপকার কেবল ধন্যবাদ দিয়ে, বলে, শেষ হয় না। কি করে বোঝাবে গিডিওনের প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ তারা। ওর ছেলেমেয়েদের জন্য নানা সব উপহার দেওয়া হলো। তার বেতন অনেক বাড়িয়েও দেওয়া হলো। মিসেস ফারকারার বললেন – গিডিওন ঈশ্বর হয়তো তার অসীম করুণার খানিকটা দেখাতে তোমাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। গিডিওন বলে – ঈশ্বর সত্যিই বড় দয়ালু মিসেস।

যখন এমন কোন ঘটনা এইসব খামারবাড়িতে ঘটে, তা কখনও চাপা থাকে না। সব্বাই সে খবর জানতে পারে। এই জেলার এ মাথা থেকে ও মাথায় সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে, যদিও মিসেস ফারকারার কেবল তাদের প্রতিবেশীদের খবরটা বলেছিলেন। এই বনে অনেক গোপনীয়তা লুকিয়ে আছে। এই মালভূমিতে বা আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে বাস করে যারা, তারা জানে এইসব বনের ভেতর যেসব গাছ, পাতা, শেকড়-বাকড় আছে তাদের গুণের কোনো শেষ নেই। তারা জানে মাটির গুণ। অনাদিকাল থেকে যা এইসব কালো মানুষেদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এটা হলো কালো মানুষদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। এখন এই ঘটনার পর তারা আবার বলাবলি করতে লাগলো, কবে কীভাবে সেরে উঠেছিল, সেই সব সেরে ওঠার গল্প, লতপাতার গুণ, নানান ঘটনা।

বোধহয় এইসব গল্প একটি পার্টিতে শহরের একজন ডাক্তারের কানে যায়। তিনি বলেন – ননসেন্স! এসব বুজরকি। এরকম গল্প শুনে খোঁজ করতে গিয়ে দেখেছি সব বানানো আর মিথ্যে। ভালো কোনকিছু কোনদিন সেখান থেকে বেরিয়ে আসেনি।

তবু দেখা গেল একদিন সকালে একটা অদ্ভুত বড় গাড়িতে চড়ে সেই ডাক্তার ফারাকারার বাড়ির সামনে এসে হাজির। সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন শহরে ওষুধের গবেষণা করেন এমন একজন বিজ্ঞানী। তার হাতের একটা ব্যাগে নানান সব টিউব ও রাসয়ানিক জিনিসপত্তর।

মিস্টার ও মিসেস ফারকারার তাদের দেখে তখন প্রায় কিংকর্তব্য বিমূঢ়। অবশ্য বেশ খুশীও বটে। বেশ একটু দামী মনে হয় নিজেদের এদের আগমনে, চলনে বলনে এমনই ভাবভঙ্গি তাদের। তারা সেই বিজ্ঞানীকে তাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে বললেন। এরপর ছেলের চোখ ভালো হয়ে উঠবার সেই ঘটনা তারা আবার সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। এইভাবে তাদের বলাটা বোধহয় শতবার বলা। তখন ছোট্ট টেডিও সেখানে। তার নীল চোখ একেবারে সুস্থ সুন্দর ঝকঝক করছে। যেন সে দাঁড়িয়ে আছে বাবা-মার কথা যে সত্য তার প্রমাণ দিতে। সেই বিঞ্জানী বললেন – এটা যদি সত্যি হয় তাহলে এর ওষুধ বানিয়ে বাজারে বিক্রি করলে কত মানুষের যে উপকার হবে। ফারকারার বেশ একটু সহজ সরল মানুষ। তারা বুঝতে পারলেন সত্যিই তো এমন যদি হয় তাহলে কত মানুষের উপকার হবে। কিন্তু সেই বিজ্ঞানী যখন বারবার এসব থেকে কত টাকা আসতে পারে বলতে থাকলেন, এবং এই বিষয়ে জোর দিয়ে কথা বলতে থাকলেন,  মিস্টার ও মিসেস ফারকারের একটু অস্বস্তি হতে থাকলো। ওরা এই অলৌকিকতাকে এত বেশি ঐশ্বরিক বলে ভেবেছে যে, এখন টাকা দিয়ে তার ওজন হওয়াতে তাদের ভাল লাগছে না। বিজ্ঞানী বুঝতে পারেন এসব টাকা-পয়সার কথা তাদের ভালো লাগছে না। তিনি তখন তার প্রথম যুক্তিটাকেই আবার ব্যাখ্যা করলেন – মানবতার সেবা। তার এসব কথাবার্তা যান্ত্রিক মানুষের মতো শোনালো। বোধকরি এই প্রথম নয়, এসব গল্প তিনি আগেও শুনেছেন এবং সবটা যে মিথ্যে সেটা জেনেছেন।

আহার শেষ হলে ফারকারার দম্পতি গিডিওনকে ডাকে। বলেন – ইনি হচ্ছেন শহরের একজন বড় ডাক্তার। একজন নামি-দামী বস। উনি কেবল গিডিওনের সঙ্গে কথা বলতেই এত দূর এসেছেন। কথাগুলি শুনে গিডিওন একটু ভয় পেল। মিসেস ফারকার বললেন – টেডির চোখ অলৌকিকভাবে সেরে উঠেছে শুনেই এই বিগ বস এখানে এসেছেন।

গিডিওন তখন একবার মিস্টার ফারকারার, তারপর মিসেস ফারকারার, এরপর টেডির দিকে তাকায় – যে-ছেলেটি এই ঘটনাকে সত্যি করার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে। এসব দেখে বেশ একটু ক্রোধের সঙ্গে গিডিওন বলে – বিগ বস কি জানতে এসেছেন কোন ওষুধে টেডির চোখ সারালাম আমি? গিডিওন এমনভাবে কথা বললো যেন কোনো এক গুপ্ত সংবাদ ফাঁস করতে হবে বলে সে সবিশেষ রাগান্বিত। মিসেস ফারকারার খুব ভাল করে গিডিওনকে বললেন – যখন এই ওষুধ বাজারে যাবে, কত মানুষ তা কিনবে, কত মানুষ ভালো হয়ে যাবে, সাপের থুতুতে আর কাউকে অন্ধ হতে হবে না, সারা আফ্রিকার মানুষ এতে উপকৃত হবে। গিডিওন কথাগুলি শুনছে কিন্তু তার দৃষ্টি মাটির দিকে। তার কপালের চামড়া কুঁকড়ে উঠলো, যেন এসব শুনতে তার ভালো লাগছে না। মিস্টার ফারকারার যখন তার বক্তব্য শেষ করলেন, গিডিওন কোনো উত্তর করলো না। বিজ্ঞানীপ্রবর তখন একটা বড় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চুমুকে চুমুকে কফি পান করছেন। বেশ একটু হাসি তার মুখে। তিনিও বললেন ওষুধ বানানোর কথা। বললেন, ওষুধের জগতে কতটা উন্নতি হয়েছে সেসব কথা। তিনি বললেন, গিডিওনের জন্য একটা বড় উপহার এনেছেন তিনি।

এরপর বেশ কিছুক্ষণ নিস্তদ্ধতা। গিডিওন বললো, কোন চারাগাছটি সে এনেছিল মনে করতে পারছে না। তার মুখটা কিছুটা স্ফীত, তাতে যেন বিদ্রোহের ভাব। সাধারণত সে যখন ফারকারারদের দিকে তাকায়, সবসময়ই বেশ বন্ধুত্বসুলভ দৃষ্টি থাকে তার। কিন্তু এখন সেটা নেই। ফারকারাররা গিডিওনের এই তাকানোতে বেশ বিরক্ত। আরো বিরক্ত গিডিওন যেভাবে তাদের দোষী বলে ধরে নিচ্ছে সেটার জন্য। মনে হলো লোকটা কোনো যুক্তি-তর্কের ধার ধারেন না। মনে হলো গিডিওন কিছুতেই তার ভাবনা থেকে সরে আসবে না, সে বলবে না চারাগাছের কথা। এইসব জ্ঞান আফ্রিকার কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা দরকার, যারা ছেঁড়া শার্ট পরে মাটি কাটে এমন কয়েক জনের কাছে। তারা তো জন্মসূত্রেই নিরাময়ী ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। যারা এই গ্রামের উইচ ডাক্তার তাদের জানা আছে অনেক কিছু, যদিও কতকগুলি হাড়হাড্ডি নিয়ে বসে থাকে তারা।

ফারকারার প্রান্তরে প্রান্তরে ঘুরেছেন, কত সব গাছপালার পাশ দিয়ে গেছেন কিন্তু ওইসব গাছপালার ক্ষমতা বা রহস্যের কথা তারা কিছুই জানেন না।

তবু তারা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে গিডিওনকে বোঝাতে শুরু করলো। তারা কত সব যুক্তি দেখালো।  কিন্তু গিডিওন বললো – আসলে এমন কোন গাছটাছ কোথাও নেই। আবার বললো  – থাকলেও এরকম সময়ে সেসব জন্মায় না। আরেকবার বললো গাছটাছ আবার কি? আমার মুখের থুতুতেই চোখ সেরে গেছে টেডির। এইভাবে একটার পর একটা কিছু বলে সব যুক্তি খ-ন করতে চেষ্টা করলো সে। এমন সব কথা বললো যা কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠলো। বেশ একটু বাজে ব্যবহার করা মানুষ এখন গিডিওন। একগুঁয়েমি আর কঠিন। ফারকারার এই গিডিওনকে চেনেন না। এত শান্ত একজন ভদ্র মহিলা, এমনটা হয় কি করে। চোখ নিচু করে গিডিওন গায়ের অ্যাপ্রোণ নাড়াচাড়া করছে মাটির দিকে তাকিয়ে। কি করে  এমন একজনকে চিনবেন মিসেস ফারকারার? গিডিওনের মাথায় যেটা আসছে সেটাই সে বলছে। বার বার বলছে, কী করে কী ঘটেছিল, তা সে জানে না।

এরপর হঠাৎ করে মনে হলো সে বলতে রাজি। এরপর চোখ তুলে সেইসব সাদা মানুষদের উদ্দেশে রাগত দৃষ্টি ছুঁড়ে আর্তনাদ করা কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে বললো – ঠিক আছে তোমাদের আমি সেই গাছের পাতা চেনাবো।

এরপর একজনের পিছে আরেকজন এমনভাবে একট লাইন বানিয়ে বান্টু সম্প্রদায়ের হেঁটে যাওয়া পথ ধওে সবাই রওনা দিল। ডিসেম্বরের আফ্রিকায় তখন গ্রীষ্মের গনগনে সূর্য। মাথার উপর বৃষ্টির মেঘ থাকলেও তখন সব কিছু তপ্ত। মাথার উপর ব্রোঞ্জের উত্তপ্ত ধাতব একটা পাতের মতো সূর্যটা ঝুলে আছে। মাঠে আগুনের হলকা। পায়ের নিচের মাটিও জ্বলছে। ওদের মুখে ধুলিমাখা ঝড়ের গরম বাতাস এসে লাগলো। ভীষণ ভয়াবহ একটা দিন ছিল সেটা। যখন ওদের বারান্দায় বসে বরফ দেওয়া সরবত পান করার কথা তখনই তারা ঘুরছে গিডিওনের পিছু পিছু, সেই বিশেষ গাছের সন্ধানে।

ফারকারার মনে করিয়ে দিলেন, যেদিন সাপে কামড় দিয়েছিল দশ মিনিটের মধ্যে কি করে গিডিওন চারাগাছটা খুঁজে পেয়েছিল। এখন পাচ্ছে না। বস বললেন – আর কতদূর গিডিওন? এরপর বেশ রাগান্বিত কণ্ঠে  গিডিওন বললেন – বস আমিতো সেটাই তখন থেকে খুঁজছি। এরপর হঠাৎ করে ঘাসের মধ্যে থেকে যান্ত্রিকভাবে একটা চাপড় তুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। এইভাবে সেই গরমে দুই ঘণ্টা ধরে তারা জঙ্গলে ঘুরতে থাকলো। তাদের শরীর থেকে তখন ঘাম ঝরছে, মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে পড়ছে। সকলে একেবারে চুপ।

বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরে এসে হঠাৎ করে মনে হয় গিডিওনের রাগ চলে গেল। এরপর চারপাশে তাকিয়ে ঘাস থেকে কিছু নীল ফুল তুলে আনলো। যে রাস্তা দিয়ে ওরা এসেছিল সেরকম ফুল সেখানে অজস্র। ফুলগুলো সে বিজ্ঞানীর হাতে তুলে দিল, কোনদিকে না তাকিয়ে। এরপর বড় বড় পা ফেলে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল। যেমন করে চলে গেল, তাতে মনে হলো তোমাদের ইচ্ছে হলে আমার পিছন পিছন আসতে পার, না হলে যেখানে আছো থাক।

বাড়িতে ফিরে সেই বিজ্ঞানী গিডিওনকে ধন্যবাদ দিতে রান্নাঘরে এলেন। কিন্তু গিয়ে দেখেন গিডিওন নেই। এরপর ফুলগুলোকে কোনমতে ব্যাগে পুরে সেই মস্ত ডাক্তার চলে গেলেন।

গিডিওন ঠিক সময়ে রাতের খাবার বানোনোর জন্য রান্নাঘরে ফিরে আসলো। তখনও তার মুখে রাগের ছায়া। একটা কিছুতে ভয়ানক ক্ষুদ্ধ সে। এরপর অনেকদিন চলে গেল, সবকিছু আগের মতো হয়ে উঠলো।

তারা শহরে খোঁজও নিয়েছিল। ফারকারার অবশ্য তাদের জন্য কাজ করবার লক্ষ্যে লোকজনদের নানান প্রশ্ন করেছিল – লোকজন এ ব্যাপারে কিছু জানে কিনা। লোকেরা উত্তর করেছে – এমন লতা বা চারাগাছের কথা আমরা জীবনেও শুনিনি। একজন বিশ্বাসভাজন রাখাল বালককে মিস্টার ফারকারার এরকম একটা লতাগাছের কথা বললে সে বলে¬ – রান্নাঘরের সেই লোকটাকে গিয়েই প্রশ্ন করেন না কেন। তিনি তো একজন গাছ-গাছড়ার গুণাগুণ জানা বিশেষজ্ঞের ছেলে। ও সারাতে পারে না এমন কিছু নেই। তারপর বলে – তোমাদের সাদা ডাক্তারদের মতো এত ভাল অবশ্য সে নয়।

এরপর যখন এই ঘটনার রেশ কেটে গেছে, একদিন হাসতে হাসতে মিসেস ফারকারার গিডিওনকে প্রশ্ন করেছিলেন – কখন তুমি আমাদের সেই লতাগাছ দেখাবে গিডিওন? গিডিওন তখন হাসে। বলে – কেন মিসেস, আমি তো সেদিন দেখিয়েছিলাম, আপনি কি ভুলে গেছেন?

ইতিমধ্যে টেডি স্কুলে যেতে শুরু করেছে। একদিন সে রান্নাঘরে এসে বলে – গিডিওন তুমি না একটা মহা হতভাগা। মনে আছে কী করে তুমি আমাদের সবাইকে নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটিয়েছিলে। কেমন একটা মিথ্যে ট্রিক করেছিলে তুমি। বাবাকে পর্যন্ত কোনমতে কাঁধে কওে বাড়িতে বয়ে আনতে হয়েছিল।

কথা শুনে গিডিওন বেশ একটু বিনীত হাসি হাসে। তারপর অনেক হাসির পর নিজেকে একটু সোজা করে, চোখ দুটো একটু মুছে, তারপর টেডির দিকে একটু বিষাদের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে – ওরে আমার ছোট্ট হলুদ মাথা, কত বড় হয়ে উঠছো তুমি দেখ, কত তাড়াতাড়ি দেখবে তোমার নিজের একটা খামার বাড়ি হয়ে যাবে, হলুদ মাথা।

[সংক্ষেপিত]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close