Home ছোটগল্প তাপস রায় > প্রশ্নের ফাঁসে সরস্বতীর ত্রাহি ত্রাহি >> রম্যগল্প

তাপস রায় > প্রশ্নের ফাঁসে সরস্বতীর ত্রাহি ত্রাহি >> রম্যগল্প

প্রকাশঃ February 24, 2018

তাপস রায় > প্রশ্নের ফাঁসে সরস্বতীর ত্রাহি ত্রাহি >> রম্যগল্প
0
0

তাপস রায় > প্রশ্নের ফাঁসে সরস্বতীর ত্রাহি ত্রাহি >> রম্যগল্প
সরস্বতীর মন ভালো নেই।
বিকেলে পদ্ম সরবরে রাজহাঁসের পিঠে চেপে আর ভেসে বেড়ান না। বীণায় আগের মতো সুর তোলেন না। বৈতালিকের আয়োজন নেই, সন্ধ্যারাগও শোনা যায় না। তবে রেগে আছেন, বোঝা যায়। আগে ধর্মের দু’চারটে বাণী শোনাতেন, এখন ধরাধামের পিণ্ডি চটকান!
একেবারে অন্ধ হয়ে ছিলেন তিনি। যখন চোখ খুললেন, দেখে-শুনে ক্ষেপে গিয়ে জবানটাই বন্ধ হয়ে গেল। সত্যি বলতে, অধিক শোকে মানুষ হওয়ার উপক্রম! মর্ত্যে মাটি, পাথর হয়ে আছেন; ভেবেছিলেন বর্তে যাবেন, কিন্তু তা আর হলো না।
তবে এসব একদিনে হয়নি, ক্রমে ক্রমে হয়েছে। তিনি বুঝতে পারেননি। নাকি বুঝতে দেয়া হয়নি- এ নিয়েও তার মনে সংশয়। তিনি ‘নারদ’, ‘নারদ’ চিৎকার করছেন। ওদিকে নারদ গিয়ে উঠেছে নারায়ণ ভিলায়। এই বিপদে সে ছাড়া তাকে আর কে বাঁচাবে?
দেবীর বিপদও কম নয়। শিক্ষা বিভাগের সব দায়িত্ব ঈশ্বর তাঁর ওপর দিয়ে রেখেছেন। কত স্বপ্ন, কত আশা- ছয় ব্যাটারির টর্চের আলোর মতো শিক্ষার আলো তিনি ছড়াবেন। নয়-ছয় হবে না। প্রয়োজনে ব্যাটারি আরো বাড়াবেন। বঙ্গের ঘরে ঘরে রিডিং টেবিলের ড্রয়ারে শোভা পাবে জিপিএ-৫ সনদ। তিনি থাকতে কেউ ‘আদু ভাই’ হয়ে পস্তাবে- তা হবে না, তা হবে না।
একজন শিক্ষার্থীও ফেল করে গলায় দড়ি দেয়ার সুযোগ পাবে না।
প্রয়োজনে পরীক্ষার ফল যেদিন বেরুবে মিষ্টি সরবরাহ করতে গিয়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ময়রা ব্যাটা দেহখানাই ঝুলিয়ে দেবে। পরদিন পত্রিকায় ছাপা হবে তার ঝুলন্ত ছবি। স্বর্গের দোলনায় দোল খেতে খেতে দেবী সেই ছবি দেখে যমরাজকে বলবেন, দেখবেন বেচারার আত্মাটা যেন অন্তত শান্তি পায়। অনন্তের পথেই চলেছে বেচারা!
অন্যরা দেবীর সাফল্যে হিংসায় জ্বলবে। দেবী মিটিমিটি হাসবেন।
লক্ষ্মীদেবী তো প্রায়ই তেতে ওঠেন- লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোরা চড়ে সে। বাকোয়াজ সব বাকোয়াজ! সরস্বতীর চ্যালাদের মেধার দৌড় তার জানা। হয় ভর্তি পরীক্ষা, নয়তো ওই চাকরির ইন্টারভিউ পর্যন্ত। ভাইবা বোর্ডে বসলেই উ আ ক্যা কু। আরে ধন না থাকলে কলিতে কু করাও যায় না। টু শব্দেরও অনেক বিপদ। এরচেয়ে বাছারা আমার লাইনে আয়। মাল কামা, মান বাড়া।
কিন্তু সরস্বতী তা হতে দেবেন না। তিনি মুচকি হাসেন আর মনে মনে ভাবেন, মূর্খ, মহামূর্খ! ফকির, মিসকিন ইউরোপ, আমেরিকাতেও আছে। জাতির শিক্ষিতের হার যেদিন একশ একশ হবে সেদিন বুঝবি মান কি জিনিস!
যদিও একশবার বলেও তিনি ‘একশ একশ’ কথাটির মানে কাউকে বুঝাতে পারেননি। বঙ্গে এর মানে বোঝে চারচাকার হেল্পার। হায়! তাকে হেল্প করার কেউ নেই।
ঈশ্বরও এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি সকলের ভালো চান। তারপরও খুশখুশে কাশির মতো দুষ্টের দল উসখুশ করছে। তিনি সবই বুঝতে পারেন। তার একবার মনে হয় লক্ষ্মীই ঠিক। পরমুহূর্তেই জিভে এমন কামড় দেন, মা কালী লজ্জা পেয়ে যান। তবে তিনি মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে এসেছেন। তারপর থেকেই এ বাংলায় কারো ওপর লক্ষ্মী-সরস্বতী একত্রে ভর করেন না। যার যার চ্যালা তার তার ঠ্যালা। এবার সে সে সামলাও।
দেবী সরস্বতী পরিকল্পনা করেই এগুচ্ছিলেন। মহাপরিকল্পনা। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতি না এগুলে চলে? জাতাজাতি করে হলেও ঠ্যালাগুতো দিয়ে জাতিকে এগিয়ে দিতে হবে। নইলে এই যে, এত এত উঁচু বিল্ডিং, তারই মধ্যে কোল্ড স্টোরেজের মতো কর্পোরেট অফিসগুলো; সেই অফিসের প্রতিটি টয়লেটের দরজায় সেটে দেয়া কি সম্ভব- দয়া করে কমোডের ওপর পা তুলে বসবেন না।
দেবী পায়ের ওপর পা তুলে বসে ছিলেন না। সঠিক পথেই ছিলেন। পরিকল্পনা করে কাজও করছিলেন। শুধু বুঝতে পারেননি, তার পরিকল্পনা থেকে পরি অনেক আগেই উড়ে গেছে। মাঝখান থেকে কে বা কারা প্রশ্ন ফাঁসের গুজব রটিয়ে ঈশ্বরের কান ভারি করছে।
গুজব হলো গুজব! এর চেয়ে খারাপ কাজ হয় না। গজব পড়বে ওদের ওপর। দেবী ভাবেন, ভাগ্য ভালো কুম্ভকর্ণের ঘুম এখনও ভাঙেনি। তার অধীনস্ত অনেকে তো বিশ্বাসই করে না! বিশ্বাস কি তারও হয় নাকি? শত্রুর অভাব নেই। নইলে নিজ মায়ের পেটের বোন তার চ্যালাদের ফুসলিয়ে নেয়। কারো ভালো কেউ দেখতে পারে না আজকাল। তারপরও কথা যখন উঠেছে তদন্ত তো করতেই হবে। নইলে দন্ত বিকশিত করে দেবসভায় কিছু বলার মুখ থাকবে না। এই মুখ নিয়ে তিনি ও-মুখো হবেনই-বা কি করে! দেবী নারদকে পাকড়াও করে দায়িত্বটা তার ঘাড়েই দিলেন।
নারদ নতজানু হয়ে বললেন, ‘দেবী, ওরা ভয়ানক ক্রিয়েটিভ।’
দেবী বললেন, ‘হতেই হবে। নইলে এত এত জিপিএ-৫ দিচ্ছি কেন?’
‘তা বটে! প্রশ্ন ফাঁসের কর্ম ওরা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে।’
‘কর্ম নয়, বলো অপকর্ম। তা আগে জানাওনি কেন?’
‘নারায়ণ, নারায়ণ। পৃথিবী জানে আপনি অন্তর্জামি।’
‘জানলেই তো হবে না। প্রমাণ লাগবে। প্রমাণ আছে?’
নারদ মুখের ওপর আর কিছু বলার সাহস পান না। মনে মনে তিনি নারায়ণের নাম জপেন। তাকে চুপ থাকতে দেখে দেবী বলেন, ‘তুমি সরেজমিনে অবস্থাটা আগে দেখে এসো। শোনা কথায় কান দেয়া বোকামি।’
দেবীর নির্দেশ পেয়ে নারদ পরীক্ষার আগের দিন রাতে মর্ত্যে এলেন। রাতের ক্যাম্পাস তিনি ঘুরে দেখবেন। যদি কোনো ক্লু পেয়ে যান। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এমন ক্লু পেলেন, সব ক্লিয়ার হয়ে গেল। ‘নারায়ণ নারায়ণ’ বলে তিনি ভাবতে লাগলেন, মর্ত্যে না এসে সোজা মরতে যাওয়াই ভালো ছিল। যা দেখলেন তাতে চোখ দুটো সটান কপালে উঠে গেল।
ওদিকে টেলিভিশন, পত্রিকা, ফেইসবুকের পোস্ট থেকেও ঘোস্টদের মতো গেল গেল রব উঠেছে। কে করছে এমন কুকর্ম ধরা যাচ্ছে না। যাবেই বা কীভাবে? দেখাই তো যায় না। ভূতের কাজই বটে। তবে বারো ভূতের কাজ এটা বোঝা যায়। ব্যর্থতা বোঝাই সেই বোঝা এবার মাথায় চেপে বসেছে। প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোই যাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের একেবারে হাসফাস উঠে গেছে।
ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের ‘বাইছা লন’ ‘দেইখ্যা লন’ অবস্থা। ফেসবুকের ইনবক্স, মোবাইলের ম্যাসেঞ্জারে একটাই রব- পাইছো? এখনও পাও নাই! আমি পাইছি। এরপর ভিক্টরি সাইন আর হরেক রকম ভেটকি হাসির ইমো।
যারা পেয়েছে তাদের একেক জনের অবস্থা একেক রকম। কেউ ‘ইউরেকা, ইউরেকা’ বলে দ্রুত ঘরে ফিরে যাচ্ছে। আর্কিমিডিস পেয়ে গৌরবে চিৎকার করেছিল। এরা ঠিক উল্টো, ফিরছে চোরের মতো। কেউ ভাবছে এই হলো জীবনের সেরা পাওয়া। তাদের মনজুড়ে ‘আমি পাইলাম ইহাকে পাইলাম’ ভাব। কারো আবার খুশিতে ‘পথ হারিয়ে কোন বনে যাই’ অবস্থা!
নারদ নিজেও একটি সংগ্রহ করে মনে মনে বললেন, গোল্লায় যা।
সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে নারদের মনে হলো, প্রত্যেকটি কেন্দ্রের চারপাশে যেন গরুর হাট বসেছে। একটু পরেই তিনি বুঝলেন, এ গরুর হাট নয়, গরুদের সাহায্য করার হাট। বজ্রআঁটুনি ফসকা গেরোর এর চেয়ে যুৎসই উদাহরণ আর হয় না! কেন্দ্রের ভেতরে চলছে পরীক্ষা শুরুর প্রস্তুতি, বাইরে চলছে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করার প্রস্তুতি। বলিহারি!
পরীক্ষা শুরু হতেই নারদ প্রশ্নপত্র দুটো মেলালেন। আরে! এ যে মেলালেই মিলিবে অবস্থা। বিস্ময়ে আলজিভ বেরিয়ে আসার উপক্রম। তিনি হাতেনাতে ধরেও ফেললেন দু’একটিকে। মোবাইলগুলো কব্জায় নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দিলেন কয়েদখানায়। সত্যি এ ঘোর অমানিশার চিহ্ন। সেই ঘোর নিয়েই তিনি সটান হাজির হলেন দেবীর দরজায়।
সব শুনে দেবী ক্রোধে চোখ বুজলেন। বীণার তার বিনা কারণে ফটাং করে ছিঁড়ে গেল। হাঁস পালাল নিরাপদ আশ্রয়ে। সাদা শরীরে কলঙ্কের কালো কে লাগাতে চায়? ওদিকে নারদ ‘নারায়ণ নারায়ণ’ জপতে লাগলেন।
দেবী হঠাৎ চোখ মেলে তাকালেন। তার সব অর্জন অপাত্রে বুঝি যায়! তিনি দুটো কাগজ টেনে নিয়ে খচখচ লিখে নারদের দিকে ছুড়ে বললেন, নিয়ে যাও। আমি নিজে প্রশ্ন করে দিলাম। এবার দেখি কীভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়?
নারদ প্রশ্ন নিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করতে করতে মর্ত্যে ফিরলেন। ফিরেই দায়িত্বরতদের নিয়ে জরুরি সভায় বসলেন। টেবিলের ওপর দুই সেট প্রশ্ন রাখা। এক সেট সভা প্রধানের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এখানে আগামীকালের পরীক্ষার প্রশ্ন রয়েছে। আপনারা এই প্রশ্নে পরীক্ষা নেবেন। দেবী নিজে এই প্রশ্ন করেছেন। দেখবেন, সম্মান যেন থাকে। যদি এই প্রশ্নও ফাঁস হয়, তাহলে কাল এসে দ্বিতীয় সেটের প্রশ্ন দিয়ে যাব।’
শুনে সভা-প্রধান সহাস্যে বললেন, ‘প্রভু আপনি কেন কষ্ট করে আবার আসবেন। আপনাকে আসতে হবে না।’
নারদ দুহাত কপালে তুলে বললেন, ‘নারায়ণ, নারায়ণ, তাই যেন হয়।’
‘প্রভু, হবে হবে, সব হবে। নিশ্চিন্তে থাকুন। বললাম তো, আপনাকে কষ্ট করে আর আসতে হবে না।’ লোকটি পুনরায় বলল।
নারদের এবার সন্দেহ হলো। সে এতটা নিশ্চিত হচ্ছে কীভাবে? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি বলল, ‘প্রভু, আমরা আছি কী করতে! আপনি সভায় যখন বক্তব্য রাখছিলেন আমি তখনই দুই সেট প্রশ্ন কপি করে নিয়েছি।’ বলেই লোকটি তার মোবাইল সেট নারদের দিকে এগিয়ে দিলো।
নারদ হাতে নিয়ে দেখলেন, মোবাইলের স্ক্রিনজুড়ে দ্বিতীয় সেটের প্রশ্ন তার দিকেই তাকিয়ে হাসছে নির্লজ্জের হাসি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close