Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ আমার প্রথম বই তাড়া খাওয়া মাছের জীবন আমাদের জীবন > আমার প্রথম বই > জব্বার আল নাঈম

তাড়া খাওয়া মাছের জীবন আমাদের জীবন > আমার প্রথম বই > জব্বার আল নাঈম

প্রকাশঃ June 26, 2017

তাড়া খাওয়া মাছের জীবন আমাদের জীবন > আমার প্রথম বই > জব্বার আল নাঈম
0
0

তাড়া খাওয়া মাছের জীবন আমাদের জীবন 

তখন বক্ররেখার ভেতর প্রবাহিত জীবন ছুটে চলছে শুধুমাত্র কবিতার ঘোরে। অার ঘোরের ভেতর টগবগ টগবগ করে দ্রুতগামী ঘোড়া ছুটে চলছে কবিতা নামক এক কাল্পনিক পরীকে খুঁজতে। দিনরাত একই চিন্তা, একই ধ্যান-জ্ঞান। কবিতাময় সময় থেকে কিছুতেই বের হতে পারছি না। এমন সময় বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে সুযোগ হয়, যাওয়া অাসা শুরু করি। পরিচয় ঘটে সময়ের সেরা তরুণ লেখকদের সঙ্গে। অামাকে অার অাটকায় কে? নিয়মিত লিখছি বিভিন্ন দৈনিক সাহিত্য পাতায়। ভালো লাগাটাও স্বাভাবিকভাবে (মনে মনে) অাগের চেয়ে কিছুটা বেশি। কেউ বাহবা দিচ্ছে। কেউ অভিনন্দন। বাহবা অার অভিনন্দনঅলারা বলতে থাকল একটা বই করতে। বই করার যে সাহস লাগে সেটা অামার তখন কম ছিল বিভিন্ন কারণে।

২০১৩-১৪ সালের দিকে ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক মাইনুল শাহিদ বললেন বই করার কথা। কবি সাইয়েদ জামিল তো দেখলেই বলতেন। এমন কি অামার পাণ্ডুলিপি গোছানোর পেছনে সাইয়েদ জামিল অার পলিয়ার ওয়াহিদের বেশ ভূমিকা আছে। ওয়াহিদসহ মিলে নিজের কবিতা কত যে কাটাছেঁড়া করেছি তার ইয়ত্তা নেই। রোজ কাটতাম অার ওয়াহিদের অফিসের ঠিকানায় মেইল করতাম। অাসার সময় সে প্রিন্ট দিয়ে নিয়ে অাসত। কাছাকাছি বাসা হওয়াতে সুবিধাটা ছিল। তারপরও চলতে থাকল পাণ্ডুলিপি থেকে কবিতা সংযোজন-বিয়োজন পর্ব। তখন মাজহার সরকারের সঙ্গে বেশ অাড্ডা দিতাম। অাড্ডার ফাঁকে ছড়াকার সুমন মাহমুদসহ পাণ্ডুলিপি নিয়ে বসি। মাজহার ভালো লাগার কথা জানায়। ভালো লাগার কথা জানিয়েই সে ক্ষান্ত হয়নি। পরে অামার সঙ্গে বাংলা বাজার গিয়েছে। শুভ্রপ্রকাশের রতনদার ওখানে গেটঅাপ মেকাপ দিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছি অামরা। শেষদিন তো কাজ শেষ করতে গিয়ে দেখি রাত একটা বেজে গেছে। কোন রিকশাচালক অাসতে চায় না। দুই বন্ধু হেঁটে গুলিস্তান পর্যন্ত অাসি। অামার মনে তখনও অানন্দ কাজ করছিল। কারণ নতুন বই অাসছে। ততদিনে মেলাও শুরু হয়ে গেছে। অামার বানান ভুলের বিড়ম্বনা বেশ রয়েছে। এজন্য সুমন মাহমুদকে অনেক জ্বালিয়েছি। তবে, পাণ্ডুলিপির ফাইনাল প্রুফটা দেখেছিল ছড়াকার কাদের বাবু ভাই। অামার পাণ্ডুলিপিটাতে একবার চোখ বুলিয়েছেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ ভাই। সেই চোখ বুলানোটা অনেক কাজ দিয়েছিল। শিখতে পেরেছি অনেক কিছু। সব কিছুর শেষে সত্যিকারের ঝামেলা এসে সামনে দাঁড়ায় নাম সিলেকশন করতে গিয়ে। কোন নামই ভালো লাগছিল না। নাম খুঁজি অার বাদ দেই। প্রকাশক বারবার নাম চাচ্ছেন। নাম দিতে পারছি না। একদিন ছবির হাটে কবি কামরুজ্জামান কামু ভাই, সাইয়েদ জামিল, পদ্ম চিৎকার, কাজী বর্ণাঢ্যসহ অাড্ডা দিচ্ছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে অামার পাণ্ডুলিপি এবং নামের কথা হয়। একেক জন একেক নাম বলেন। মনঃপুত হয় না। সবশেষে জামিলই বর্তমান নামটা বলে ‘তাড়া খাওয়া মাছের জীবন’। উপস্থিত সবাই নামটাকে সাপোর্ট করে। অামার কাছেও ভালো লাগে। অর্থাৎ পাণ্ডুলিপি ছাপাখানায় যাওয়ার পর নামটা ফাইনাল হয়। এবার বই অাসার পালা। প্রতিদিন বই অাসবে অাসবে করে মেলায় যাই। শুভ্রপ্রকাশের স্টলে হাজির হই। বই তো অাসে না। প্রতিদিন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ বই কিনতে অাগ্রহ দেখায়ও। কিন্তু বই তো অাসছে না। অামারও তর সহ্য হচ্ছে না। অাসবে অাসবে বলে প্রথম সপ্তাহ গেল। দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ফাল্গুন মাস। অথচ অামার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। বন্ধু ও পরিচিত জনরা ফোন দেয়। ইনবক্স করে। বই কবে অাসবে। বই কবে অাসবে।

একটা সময় অামি চুপ মেরে যাই। বই প্রসঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেই। বই তো অাসছে না। নতুন লেখকের বই নিয়ে যা হওয়ার কথা তাই হচ্ছিল। তখন অাবার নতুন প্রেম করছি। প্রেমিকার সঙ্গে প্রতিদিন বলি বই অাসবে। প্রকাশকও বলে অাজ অাসবে কাল অাসবে। কিন্তু অাসছে না। লজ্জা পাই। মনে মনে ক্ষোভ লালন করি অার বলি এই বইয়ের দায়িত্ব অামি অার নেব না। এতদিনে অামার কত বই বিক্রি হত… অাসলে যাদের নতুন বই বের হয় তারা এমনটা বলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৮ তারিখ চলছে। মেলা শেষে বাসার দিকে ফিরছি। রাত তখন প্রায় ১০টা। অামার মোবাইলে প্রকাশকের ফোন অাসে। রাগে ফোন রিসিভ করলাম না। অাবারও ফোন দেয়। ধরি না। বাসায় অাসি। বাসায় অাসার পর অাবারও ফোন। কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘অাগামীকাল মেলায় অাইসেন। বই অাসবে। অার অাপনার বন্ধুদের জানায়েন।’ অামার এতদিনের রাগ মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে ম্লান হয়ে যায়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম। বই স্টলে অাসার মিনিট পাঁচেক অাগে অামি হাজির। তখন একা ছিলাম। এদিক-সেদিক তাকাই। পরিচিত কেউ অাসলে অাড্ডা দেব। এমন সময় কবি মাসুদুজ্জামান ভাইয়ের ফোন অাসে। নাঈম, অাপনি কই? বললাম, মেলায় বই এসেছে? হ্যাঁ এসেছে। ততক্ষণেও বই এসে পৌঁছেনি। তিনি বললেন অামি পাঁচ মিনিটের মধ্যে অাসছি। অাপনার বইয়ের প্রথম ক্রেতা এবং পাঠক হবো। অামার টেনশন হল, বই তো অাসে না। রতনদার বোনকে বললাম বই কখন অাসবে। তখন তিনি স্টলে বসতেন। বললেন, দুই মিনিটের মধ্যে চলে অাসবে। সত্যি সত্যি বই চলে এসেছে। বই দেখে অামি বেশ অানন্দিত। তখন কাকে ফোন দেবো। ভাবতে ভাবতে কাউকেই ফোন দিতে পারছি না। মেলা শুরুর সময় তখন। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেই। সেই দিনই প্রায় ৪০ কপি বই বিক্রি হয়েছে। কবি মাসুদুজ্জামান ভাই হাজির। তিনি ছিলেন অামার বইয়ের প্রথম ক্রেতা। তিনি বই কিনলেন। অটোগ্রাফ নিলেন। অটোগ্রাফ দিচ্ছি এমন ছবি তুললেন। অামি বুঝতে পারছি তিনি অামাকে উৎসাহ দিচ্ছেন। সানজিদা অাপা, সানজিদা রহমান অামাদের ছবি তুলে দিচ্ছেন। তিনিও বই নিলেন। অটোগ্রাফ নিলেন। মনে মনে অামি দারুণ উৎসাহ বোধ করছি। বেশ বই বিক্রি হচ্ছে। তবে, প্রথম দিনের মতো পরবর্তী দিনগুলোতে তেমন বিক্রি হয়নি। দিনদিন সংখ্যাটা কমেছে।

২০১৫ সালের বইমেলার অানন্দ অতীতে আর কোন দিনই পাইনি। ভবিষ্যতে পাব কিনা জানি না। অামার রোমাঞ্চের শেষ হল না। দুই একটা পত্রিকা ছাড়া প্রায় সব পত্রিকায় তাড়া খাওয়া মাছের জীবন বইয়ের কাভার ছাপানো হল। ইত্তেফাক অালাদা ফিচার করল। কাদের বাবু ভাই ‘টিন@টিন বইমেলা বুলেটিন’-এ আমার বই  নিয়ে কাভারে লিখলেন। বিভিন্ন জাতীয় অনলাইনগুলেতে বইয়ের নিউজ প্রকাশিত হল। কয়েকজন সিনিয়র ফেসবুকে অামার বই নিয়ে অালাদা স্ট্যাটাস দিলেন। অাসলে একজন তরুণকে উৎসাহ দেয়ার এগুলো ছিল দারুণ উপলক্ষ্য। অামাকে উৎসাহের কথাগুলো লিখে সবটুকু প্রকাশ করা এখানে প্রায় অসম্ভব। এর পরের বইমেলায় অামার অারেকটি কবিতা বই এসেছে। কিন্তু তাড়া খাওয়া মাছের জীবন প্রকাশিত হওয়ার পর যে অনুভূতি ছিল, তা অার কখনও ফিরে আসেনি, আসবার কথাও না, হয়তো। সেই ভালোলাগা মুহূর্তগুলো অামাকে এখনও অানন্দ দেয়। লেখালেখিটাকে সিরিয়াসলি নিই। অামার বিশ্বাস যারা জীবনে প্রথম বই প্রকাশ করেন তাদের কারো কারো অনুভূতি হয়ত অামার চেয়ে বেশি বা কম ছিল না বা হবে না। কিন্তু অামার অনুভূতি ছিল অামার মতোই। পুরোটা কাউকে বলে প্রকাশ করা হয়তো কখনই অসম্ভব হবে না। সে এক তুলনাহীন অনুভূতি।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close