Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ তুষারকান্তি রায় >> আমার জীবনানন্দ

তুষারকান্তি রায় >> আমার জীবনানন্দ

প্রকাশঃ February 17, 2018

তুষারকান্তি রায় >> আমার জীবনানন্দ
0
0

তুষারকান্তি রায় >> আমার জীবনানন্দ

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ জীবনানন্দের ১১৯তম জন্মদিন। বাংলা ভাষার এই মহান কবির স্মরণে তীরন্দাজে শুরু হয়েছিল ‘আমার জীবনানন্দ’ নামের একটা সিরিজ। ইতিপূর্বে আমরা এই সিরিজের কয়েকটি স্বতন্ত্র লেখা প্রকাশ করেছি। এবার প্রকাশিত হলো কবি তুষারকান্তি রায়ের- ‘আমার জীবনানন্দ’।]

 

জীবনাননন্দকে যেদিন প্রথম দেখতে শিখেছি সেদিনই মনে হয়েছে, ‘কোথাও দেখিনি, আহা এমন বিজন ঘাস – প্রান্তরের পারে’। েআর কেন জানিনা আমার তখনি মনে হয়েছে, তিনি এক বিস্ময়কর জগত, যেন আর এক দুনিয়া, কে জানে জায়গাটা ঠিক কোথায়! অতল বিতল তলাতল পাতাল – জায়গাটা ঠিক কী জানিনা! কিন্তু মনে হয়েছে, সে এক অন্য দুনিয়া। সেখানে গেলে আর কেউ ফিরে আসেনা, ফিরে আসতে চায়না। সেই দুনিয়ায় গেলে এই দুনিয়াটা মিথ্যে মনে হয়, কিংবা এই দুনিয়ায় এলে ওই দুনিয়াটা। আর যে দুটো দুনিয়াতেই পা ফাঁসিয়েছে, তার যে কী দুরবস্থা হয় – যে জানে সেই জানে।
বাংলাদেশ – কবিতার দেশ। হাজার বছরের দোহা থেকে শুরু করে এই এখন পর্যন্ত প্রসারিত তার বৈচিত্র্য বিলসিত রূপের আঙ্গিনা। কিন্তু আমি যাঁর হাত ধরে হেঁটেছি কিংবা যাঁর কথা বলছি, তিনি যে আমায় বলেছেন, ‘পাড়াগাঁর দুপহর ভালবাসি- রৌদ্রে যেন গন্ধ লেগে আছে/ স্বপনের’ । হাজার বছর ধরে পথ-হাঁটা ক্লান্ত-প্রাণ এক কবি তিনি, চোখে তাঁর শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার। আমি তাঁকে বুঝবার চেষ্টা করছি দেখে তাঁর লেখা আমায় নিয়ে চলল তাঁর জগতে, তখন আমি যেন দড়ি-ছেঁড়া এক হারানো বাছুর। বিস্ময়ের শেষ থাকেনা- সীমাও হারিয়ে ফেলি। তিনি ছবি লেখেন, আর আমি তাঁর কারুকাজ দেখে নিমেষে জুড়িয়ে যাই। আমি অবাক হয়ে দেখি, তিনি মেলে ধরছেন তাঁর পেপার ক্যানভাস, আর তাতেই তাঁর কলমের ছোঁয়ায় ছলকে উঠছে জল। টলটল করে উঠছে এক সবুজ সবুজ দীঘি, ছায়া ছায়া গভীর তার জলের ওপাড়ে ঘন বন, চালাঘর, তাল নারকেল গাছের মাথাগুলো ঠেলে উঠছে দিগন্তরেখা। মাথার উপর গনগনে একটা সূর্য অথচ তলায় তলায় কেমন অবিচল! আমি অবাক হয়ে ভাবি- এমন তপ্ত চোখের সামনে কেবল অক্ষরের ছোঁয়ায় কীভাবে এমন ছবি আঁকা যায়! ভেতরে কে যেন বলে, খবরদার, ভুলেও কাউকে বোলো না এখানে এসেছিলে!
তাঁর কথায় বলতে ইচ্ছে হয়,

তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও- আমি এই বাংলার পরে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরী ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হ’য়ে আসে
ধবল রোমের নীচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে
নেচে চলে- একবার-দুইবার- তারপর হঠাৎ তাহারে
বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে যায় হৃদয়ের পাশে…

আমাকে ছুঁয়ে থাকে তাঁর অসামান্য বিষয়, বিষণ্ণ প্রকৃতি, ইতিহাসের ধূসর পটভুমি, আত্মমগ্ন সৌন্দর্যচেতনা, রোমান্টিক মনন, মনের জটিল রহস্যময়তার স্বরূপ উপলব্ধি। সেই কবি-প্রাণ সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে ঘুরেছেন। ঘুরেছেন বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে,  গেছেন আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে। কখনো বা ক্লান্তিহীন নাবিকের মতো চলে গেছেন, ‘বেবিলন,নিনেভে, মিশর, চিন, উরের আরশি থেকে ফেঁসে অন্য এক সমুদ্রের দিকে।’ অথবা পরিক্রমা করেছেন ভারত সমুদ্রের তীরে, কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে অথবা ‘টায়ার সিন্ধুর পারে’। সেখানে পেয়েছেন কোন এক বিস্মৃত নগরীর, কোন এক অতীত- বিলীন প্রাসাদের সন্ধান। সেখানে ছিল পারস্য গালিচা, ছিল কাশ্মিরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল। আর ছিল কমলা রঙের রোদ, কাকাতুয়া, পায়রা, মেহগনির ছায়াঘন পল্লব। যার মন সর্বদা খুঁজে ফেরে কোন এক দারুচিনি বনানীর ফাঁকে নির্জনতা। আবার কখনও ডুবুরির মতো ডুব দিয়েছেন জীবনের গভীরে। তুলে এনেছেন সাতরাজার ধন কতো মণিমুক্তা। তাই দিয়ে গড়েছেন এক আশ্চর্য মণিহার। সেই মনিহারের কোথাও সবুজ বনানীর নম্র মাধুর্য, কোথাও অন্ধকার বিদিশার নিশা, কোথাও রক্তরাঙা প্রবালের উজ্জ্বলতা।
তাঁর সঙ্গে চলতে চলতে মনে হয়, তিনি যেন এক রহস্যময় চোখ দিয়ে দেখতে শেখাচ্ছেন, আশ্চর্য অলৌকিক সেই শক্তি। শিরশিরিয়ে ওঠে আপাদমস্তক। তিনি বুঝিয়ে দিতে চাইছেন, চোখটাই সব, সবারই চোখ আছে কিন্তু সবাই দেখতে পারে না, দেখতে জানেও না। এই যেমন-গড়িয়ে আসা সুগন্ধী অন্ধকার, ঢাল পাড় থেকে উঠে আসা হাওয়া, শান্ত নদীর শব্দ, ওপারের নিবিড় দিগন্ত। এ সবই তো জীবনের চরম ঐশ্বর্য- এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা পাওয়ার আছে মানুষের! তাই হয়তও, ‘এশিরিয়া ধুলো আজ – বেবিলন ছাই হয়ে আছে।’
ডুমুরের গাছে ভোরের দয়েল পাখি, বিষণ্ণ চড়াই, শ্যামার নরম গান, কাকের শব্দ, কুকুরের উদাস ডাক, ছিন্ন খজ্ঞনার নাচ, ধলেশ্বরীর চড়ায় গাঙশালিখের ঝাঙ্ক, ধবল কাক, লক্ষ্মী পেঁচা, শঙ্খচিল, মাছরাঙা, ধূসর সন্ধ্যা, কামরাঙা লাল মেঘ, শরতের রোদের বিলাস, মধুকুপী ঘাস, ইত্যাদি যাঁর কথাছবির প্রিয় অনুষঙ্গ তাঁর শেষ পর্বের ভাবনায় কিন্তু সমাজ এবং সময়ের নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত, রূঢ়তা এসেছে। তিনিও অনুভব করেছেন, ‘বাংলার লক্ষ গ্রাম নিরাশার আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল।’
সুতরাং, আমার প্রিয় জীবনানন্দ গতানুগতিক প্রবাহের কবি নন। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ তিনি সেই বিরল প্রতিভার একজন। তাঁর বিশিষ্ট ভাষারীতি, ছন্দ- স্বাতন্ত্র্য, শব্দ ব্যবহারের নিজত্ব সকলকে অভিভূত করে। প্রতীক ও চিত্রকল্পের ব্যবহারে অনন্য তিনি। প্রসন্ন বেদনার কোমল উজ্জ্বল বড়ই নতুন এবং নিজস্ব। বাংলা কাব্যের কোথাও তাঁর তুলনা পাওয়া ভার।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close