Home কল্পবিজ্ঞান দেবার্ঘ্য গোস্বামী > ‘অপার্থিব’ সম্বন্ধে পার্থিব ভাবনা-সুলুক >> পঠনপাঠন

দেবার্ঘ্য গোস্বামী > ‘অপার্থিব’ সম্বন্ধে পার্থিব ভাবনা-সুলুক >> পঠনপাঠন

প্রকাশঃ September 8, 2017

দেবার্ঘ্য গোস্বামী > ‘অপার্থিব’ সম্বন্ধে পার্থিব ভাবনা-সুলুক >> পঠনপাঠন
0
1

দেবার্ঘ্য গোস্বামী > ‘অপার্থিব’ সম্বন্ধে পার্থিব ভাবনা-সুলুক

সংগীতের যেমন নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব ভাষা আছে  ছবি ও সিনেমার যেমন, বিজ্ঞানেরও তেমনি নিজস্ব ভাষা আছে। অনিন্দ্য সেনগুপ্ত আদ্যন্ত সেই ভাষাতেই লিখেছেন তার উপন্যাস ‘অপার্থিব’। কথাশিল্পে এ ভাষা ব্যবহারের কিছু ঝক্কি আছে। শব্দোত্তর অনুভূতি ছুঁয়ে ফেলার জন্য সংগীতের যেমন সুর ও স্বর  আছে, ছবির আছে রং রেখা আকার, সিনেমার আলো আঁধার, ক্যামেরার অবস্থান, দৃশ্যের স্থায়ীত্ব ইত্যাদি আছে, বিজ্ঞানে তেমনি ব্যবহার হয় অঙ্ক  অথবা ছবি। মুশকিল হলো কথাশিল্পে এদের খুব বেশি ব্যবহারের অবকাশ থাকে না। তাই ফাইনম্যানিয় প্রতিভা ও প্রজ্ঞা না থাকলে কথা ছেঁকে কথাতর জায়গাতে পৌঁছানো কিছুটা কঠিন হয়ে পরে। অনিন্দ্যবাবু এ কাজটি বেশ করেছেন। পড়তে গিয়ে আটকাতে হয়না শব্দের কানাগলিতে পথ হারিয়ে। এ ব্যাপারে লেখকের অবশ্য একটি সুবিধে ছিলো। গল্পের ভাষা বিজ্ঞানের হলেও  বিষয় কিন্তু বিজ্ঞান নয়।  কল্পবিজ্ঞান বলতেও খানিক আপত্তি আমার। সাধারণভাবে কল্পবিজ্ঞানে যেভাবে হাতে গরম ও প্রমাণিত বিজ্ঞান-তত্ত্বের ভিত্তির ওপর ভবিষ্যত বিজ্ঞানের অনুমাননির্ভর ঘটনাকে নির্মাণ করা হয় এখানেও তাই হয়েছে। ভিতখানিতে কোনো  তথ্যপ্রমাদ খুঁজে পাইনি (একটি বেশ বড় সংশয় ছাড়া, সেটা পরে বলছি)।  কিন্তু প্রায় প্রতিটি ভবিষ্যত-অনুমানই বহু  ব্যবহৃত , তাই “কল্প”-এর অবকাশ এখানে কম।  আর সেকারণেই পূর্বানুমানগুলো, যা পরে ঘটবে বলে মনে করা হয়েছে মোটামুটি সজ্ঞায়িত, শব্দ ছেঁকে না-শব্দ তুলে আনার কাজটি করাই  ছিল। লেখক সেগুলি ব্যবহার করেছেন ভীষণ সুচতুরভাবে। এখানে বিজ্ঞান ততটুকুই যতটুকু ভাষায় ধরা গেছে।

এবার আসি বিষয়ে। উপন্যাসের বিষয় রাজনীতি।  ভীষণভাবে রাজনীতি। আর লেখকের মুন্সিয়ানা হলো এতো তীব্র এতো প্রত্যক্ষ রাজনীতি নিয়েও এটি মেনিফেস্টো হয়ে যায়নি। এটি উপন্যাস। কোনো ঘরানাতে দাগিয়ে না দিয়েও এটি পড়া যায়। পড়ে  আনন্দ পাওয়া যায়। রাজনীতিটিও কিছু নতুন নয়। রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কিংবা আমার মতো অশিক্ষিত লোকেরাও বড় হয়েছি পুঁজি, শ্রেণী, শোষণ, অন্তর্ঘাত এইসব শব্দবন্ধ  শুনে শুনে।  এখানেও সেই গল্প আছে। সুখপাঠ্যভাবেই আছে। কিন্তু যে গল্পটা বিশেষ প্রচ্ছন্নে সেটায় মজা বেশি পাওয়া গেলো। রাজনীতিটির ভেতরে আরেকটি রাজনীতির গল্প এখানে আছে। এখানে আছে দারিয়াস মজুমদার। ভবিষ্যতের পৃথিবীর  প্রায় দিগন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া “প্রান্ত” থেকে উঠে আসা  মানুষ। মূলত তার স্মৃতিচারণেই আমরা পাই সেই পৃথিবীর প্রান্তিক জীবনের গন্ধ। সম্ভবত স্বশিক্ষিত। অবশ্যই সুশিক্ষিত। কায়েমী শক্তি “কর্পোরেশন”-এর তৈরি সিস্টেমের বাইরে থাকা মানুষ। বুক বাজিয়ে এনার্কিস্ট রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। প্রত্যক্ষভাবে সেই রাজনীতিতে অংশ নিয়ে কর্পোরেশনকে কাঁপিয়েছেন বহুবার। জেল খেটেছেন। এখানে আছে কিছু বিজ্ঞানী। এদের স্মৃতিচারণ থেকে এও জানা যায় কর্পোরেশনের দম আটকানো শোষণের গল্প। কিন্ত তবু এরা  কেন্দ্রের মানুষ। কর্পোরেশনের নকশা করা পড়াশুনো করেই বড়  হয়েছেন (অন্তত কর্পোরেশন তাই জানে)। প্রচণ্ড মেধাবী প্রতিভাধর। আপাতভাবে রাজনৈতিকভাবে নিস্পৃহ, জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন। দারিয়াস কিছু নাক উঁচিয়ে। এদের রাজনৈতিকভাবে অদীক্ষিত, কর্পোরেশনের যন্ত্রপ্রতিম কর্মচারী ভেবে এসেছেন। এদের আপাত নিস্পৃহতায় হাত পা ঠাণ্ডা হয়েছে তার। আবার বার বার ফিরে এসেছে তার হীনন্ম্যতায়। উল্টো দিকে দারিয়াসের প্রতি বিজ্ঞানীদের স্নেহ, প্রেম সবটাই যেন উপর থেকে ঝুর-ঝুরিয়ে পড়া।আর একজন আছে। ডং উইল জাং। তার সম্পর্কে শুধু এটুকু বলার যে, ইনিও কেন্দ্রের মানুষ। ক্ষমতাশালীও বটে। মৃত্যুর পরও মৃতদেহের কি হবে তা নিয়ে কর্পোরেশনের সাথে দর কষাকষির ক্ষমতা ধরেন। আর সবচেয়ে বড় অন্তর্ঘাতটি করে সেই কেন্দ্রবাসী প্রতিভাধর মানুষেরা। দারিয়াসের কাজ কিছুটা শ্রদ্ধাবনতই। প্রজ্ঞা পরিশীলিত নৈর্ব্যক্তিক চিন্তা, প্রচলিত শিক্ষার সাথে এক অসমীকরণ তৈরি হয় রাজনৈতিক নিস্পৃহতার। কেন্দ্রের ছত্রছায়া, সিস্টেমের ছাঁচে আপাত-যাপন, যন্ত্রায়িত হতে ব্যর্থ হয় ব্যক্তিগত বোধ। এমনকি ধার কমেনা এতটুকুও লুকোনো দাঁত-নখে, বরং সিস্টেমের সঙ্গত তাকে শিখিয়ে দেয় লুকোনোর প্রকরণ। প্রচলিত শিক্ষা আর ব্যক্তিগত বোধ ও প্রতিভা একসাথে জারিত হয়ে শেখায় এমন অন্তর্ঘাত যা সিস্টেমেরও কল্পনাতীত। প্রত্যক্ষ এনার্কিজম ও বহিরাক্রমণ থেকেও অবশেষে কার্যকর হয় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। এ প্রসঙ্গে  উত্তরকথায় লেখকের ‘হোক কলরব’ রেফারেন্সটি মজা আরো বাড়িয়ে তোলে। অবশেষে উপন্যাসটি তাকে অতিক্রম করে যায়। অতিক্রম করে যায় দারিয়াসের উন্নাসিকতা ও হীনন্ম্যতা। অতিক্রম করে যায় বৈজ্ঞানিকের দাক্ষিণ্যসুলভ প্রশ্রয়। হ্যাঁ, একবার চেতনা আক্রান্ত হলে একাসনে সব। যদিও সে আক্রান্ত  বিজ্ঞানীর সচেতন চেষ্টার ফসল, রাস্তা চিনে পৌঁছে যাওয়া। দারিয়াসের কাছে তা ঘটনাচক্র।

আইডেনটিটি পলিটিক্স নিয়ে আরেক সনাতন প্রশ্ন উঠে আসে এ গল্পে। বিজ্ঞানীদের  এককুঠুরি  ছোটবেলায়, প্রান্তিক শোষণ ছুঁয়ে ফেলে কেন্দ্রের স্বস্তি ওম। প্রজেক্ট করোনায় দারিয়াসের অংশ নেওয়ায় কেন্দ্রের কারবারি লেনদেন ছুঁয়ে ফেলে প্রান্ত। ভেঙে ফেলার দায় কার, অন্তর্ঘাত কার কর্তব্য, সে প্রশ্ন হয়ে ওঠে অপ্রাসঙ্গিক।

প্রসঙ্গত, উপন্যাসটি পড়ার আগে লেখকের লেখা, এই উপন্যাস সংক্রান্ত তিনটি ছোটগল্প পড়েছিলাম। তাতে সেই পৃথিবীর প্রান্তের ছবি অনেক যত্নে আঁকা ছিল। উপন্যাসটিতে প্রান্তের বর্ণনা আসে যেন খানিক প্রসঙ্গান্তরে। যদিও অন্তর্ঘাত আর অন্তর্ঘাতের রাজনীতিতেই নিশ্চিতভাবে আবর্তন করে উপন্যাসের কেন্দ্র, হয়তো প্রান্ত ও পৃথিবী নেপথ্যে রাখাটা ছিল সচেতন প্রয়াস। তবুও মনে হয়  চরিত্রগুলো হয়তো খানিক সাবলীল প্রশ্বাস নিতে পারতো, হয়তো হেঁটে চলে গল্প জুড়তে পারত, যদি তাদের নেপথ্য পটভূমি  আরও একটু যত্নে আরও একটু সময় নিয়ে তৈরি করা হতো।

গল্পটির একটি রহস্য মোড়ক আছে, যা গল্পের একদম শেষে সমাধান হয়। কিন্তু রহস্যটি খানিকটা আগে থেকেই অনুমান করা যায়। দুটি চাঁদের রহস্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা কিছুটা আরোপিত লাগে। এখানে আরেকটি তথ্যগত সংশয় আছে যার কথা আগে বলেছিলাম। তিনশো মিলিয়ন বছর, ব্রহ্মাণ্ডের মোট বয়সের সাপেক্ষে তেমন বড় কোন সংখ্যা নয়। ধরে নেওয়া যায় আজকের পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে তাকালে তারাদের যা অবস্থান দেখা যায়, তখনও খুব সাংঘাতিক কিছু আলাদা হবে না। পৃথিবী থেকে ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরের কোন গ্রহের আকাশে কিন্তু তারাদের আপেক্ষিক অবস্থান (সৌর পরিবারের অন্য গ্রহদের কথা ছেড়েই দিলাম), অনেকটাই আলাদা হবে। এই দুই আকাশ আলাদা (অথবা এক) করতে কিন্তু বিজ্ঞানী হওয়ারও প্রয়োজন নেই (দারিয়াসের বয়ানে কালপুরুষ ঘুরে ঘুরে এসেছে কয়েক বার)। আমাদের কাছে এই মুহূর্তেই দুই তিন বা তার বেশি বিকল্প আছে, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ না করেই মহাকাশে কোন মহাকাশযানের আপেক্ষিক অবস্থান বের করার। একেবারে শেষে ২২ ঘণ্টার ঐহিক গতি না বার্ষিক গতির কথা বলা হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় থাকল। আর সেই দুইয়ের কোনটার কারণেই বাতাসের দাপট বাড়া সম্ভব নয় (Coriolis force আছে বটে, তবে তার ফলাফল ভিন্ন)।  তা সত্ত্বেও শেষটি নিয়ে কথা বলতে হয়।

শেষটি পাঠক আমিকে এক দমবন্ধ দ্বন্দ্বে হাজির করে।

ভেঙে ভেঙে ক্ষয়ে যাওয়া সময় জুড়ে ইউটোপিক মোক্ষ কি? কেঁচে গণ্ডুষ নতুন করে শেখার শেখা? না দু-হাতে আগলানো স্মৃতির নিস্পৃহ চারণ!

পড়াকালে নিশ্চিতভাবে বসবাস করতে হয় দুই মলাটের মাঝেই।

গ্রন্থের নাম : অপার্থিব (কল্পবিজ্ঞান)

লেখক : অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

প্রকাশনা : বৈভাষিক

মূল্য : ১৮০ ভারতীয় রূপী

প্রাপ্তিস্থান : বাতিঘর চট্টগ্রাম (অনলাইনেও অর্ডার করা যায়)

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close