Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ দ্বিখণ্ডিতা > নাট্যকাব্য >> শুভাশিস সিনহা

দ্বিখণ্ডিতা > নাট্যকাব্য >> শুভাশিস সিনহা

প্রকাশঃ June 24, 2017

দ্বিখণ্ডিতা > নাট্যকাব্য >> শুভাশিস সিনহা
0
0

দ্বিখণ্ডিতা 

পুরুষসমীপে প্রথমা ও দ্বিতীয়ার স্বগত বিলাপ

প্রথমা :

জরির নকশা করা এই রাত আমাকে জড়ায়

আমার শীতল দেহ, আমার দুঃখের ডালপালা

আমার শরীর আহা কে সে এসে আগুনে পোড়ায়

ফুল ঝরে ঝরে পড়ে, আমি কার ধরে আছি মালা।

 

আমি তো তোমার অঙ্গে           লেগে আছি সঙ্গে সঙ্গে

তুমি কেন মাতো আনরঙ্গে!

এ হাতে তোমার ছোঁয়া            তোমারই নয়নে ধোয়া

এ শরীর নাচে যে ত্রিভঙ্গে।

 

তুমিও কি মনে রাখো সেই গান প্রথম সুরের

দাঁড়ালাম মুখোমুখি, শুনি গান হৃদয়পুরের।

 

আমি তো হরিণী জানি           বাঘে সিংহে টানাটানি

আঁধার বনের চারিধার

বাকলে মেখেছি কষ,             লুকায়ে রেখেছি রস

রূপারূপে চলে পারাপার।

তখন তোমার তীর               ছুঁয়েছিল এ শরীর

চুমু খেল শিরায় শিরায়,

শোণিতে তরঙ্গ ছোটে            শত কামপুষ্প ফোটে

তুমি শ্যামকৃষ্ণ আমি রাই।

দেখো দেখো

রাতের ছলনাঁধারে জ্বলে মায়াতারা

আমাকে জ্বালায় তারা আমি দিশাহারা।

জানি আমি মজে আছো নটিনীর বাহুতে উথাল

তোমাকে রেখেছে ঘিরে সোনালি রুপালি মোহজাল।

তুমি কি মোহের দাস                    শরীরেই বসবাস

নতুন নতুন বাঁকে ফেরো,

রঙে রঙে মাখামাখি                      কুহু কুহু ডাকাডাকি

কত ছলে জীবনকে ঘেরো।

যে দীঘিতে সাঁতরাও                     যার জলে ডুব খাও

ভাসন কী শেখো কিছু তার

ভেসে ডুবে আধো আধো                কিছু খোলো কিছু বাঁধো

এইভাবে চলে পারাপার।

তুমি তো ভেবেছো তাকে                 গিয়েছে পুরনো ডাকে

চিঠি তার পড়া হয় সবই,

কী প্রাণ ভেতরে কাঁপে                   ভেজে পোড়ে জলে তাপে

ভাবো তুমি স্থির এক ছবি।

ছবি আমি নই বাবু ছবি আমি নই

ছবির ভেতরে অনস্থির হয়ে রই।

পাথরে যে মূর্তি হয়, তারও তো ভেতরে এক প্রাণ

মানুষের ভাবনার সুরে সুরে গেয়ে চলে গান।

সে সুরের টানে যায়                  মানুষ ব্যাকুলি হায়

বসায় সকলে এক মেলা,

কতো যে কাঁদন ঝরে                হাসিতে উতল করে

করে খেলা করে অবহেলা।

কখনো কখনো ভাবি,                আমারই তো বেশি দাবি

আমারই তো পূর্ণ অধিকার,

নিশীথগভীরকালে                    বিস্তারিত মায়াজালে

আমারই বাহুতে মানো হার।

কথা নাই, শব্দ নাই, নীরবতা করে প্রতিধ্বনি

রাতের হৃদয়দোলে তালে তালে বাজে যে খঞ্জনি।

পরশ বোলাই গায়ে বিলি কাটি চুলে

গন্ধ পাই সুদূরের গন্ধচাঁপা ফুলে।

সে ফুলের কুঁড়ি যেন লেগে থাকে শরীরে তোমার

চুপি চুপি তুলি আমি দেখি আমি চিনি না সে কার।

তুমি বলো, ঘুমাও ঘুমাও

আমি বলি, ঘুম এনে দাও।

তবু আমি ধীরে ধীরে                     তোমার সকাশে ফিরে

দূরে রাখি প্রশ্ন মনের,

এ জীবন ক্ষণিকের                       যা পাই তা জানি ঢের

সুখ প্রেম অল্পক্ষণের।

সেই মুহূর্তের সব                         ভাবনার কলরব

হত যদি সহসা প্রকাশ,

কেটে যেত নিদ্রাঘোর                    ছিন্ন করে বাহুডোর

তুমি হতে ত্রাস মহাত্রাস।

ভয়ে যেতে সরে সরে                    এ যে কোন নারী ঘরে

কার সাথে বেঁধেছি জীবন,

কার সাথে করি বাস                     করি নিত্য সহবাস

কার কাছে করি সমর্পণ।

আমার তখন মনে                        কত কথা ক্ষণে ক্ষণে

বেদিশা মাতমে শুধু ঘোরে,

তোমাকে এ স্বত্ব দিয়ে                    নিজের শূন্যতা নিয়ে

মাখি আলো ফের নিশিভোরে।

কত নিশি ভোর হয়,                      কত কথা জমা রয়

রাতের জঠরে আবডালে,

তুমি তা জানো না প্রিয়                   এ বেদনা রমণীয়

এই রেখা নারীর কপালে।

তবু আমি শান্তি খুঁজি                      নিজেরে যখন বুঝি

তোমার ঘরের সহবাসী,

ভালো আছি ভালো আছি                   তোমারই তো কাছাকাছি

বাজে কই দূর পোড়াবাঁশি।

আমি তো জানি না সুর                     কোন দেশ কোন পুর

ওড়ে ভাসে হাওয়ায় হাওয়ায়,

হয়তো সে জানে ভালো                    যে জ্বালায় ঘরে আলো

পৃথিবীতে সন্ধ্যা ঘনায়।

হায় সন্ধ্যা, অস্তরাঙা পৃথিবীর সুধা পান করে

কত ভান ভনিতায় তোমার হাতটি এসে ধরে

ডেকে নিয়ে যায় কুঞ্জে জোনাকির মতো জ্বলজ্বলে

তোমাকে ঘিরিয়া নাচে তোমাকে ডোবায় রসাতলে।

সেখানে মরণসুধা ওষ্ঠে মাখো সকাতরে জানি

সেখানে পূর্ণতা পায় সব কথা হয়ে যায় বাণী।

কী নেই আমার বলো                  দেহভার টলোমলো

অঙ্গে অঙ্গে নাচে শত ঢেউ,

নয়নদর্পণে দেখি                       তোমারই প্রতিমা একি

কেঁপে উঠি, ভেঙে দেবে কেউ।

ভেঙে দেয়, ছুড়ে দেয়                 কাছ থেকে দূরে নেয়

তুমি থেকে ভাঙাচোরা তুমি,

একখানি বাঁয়ে যাও                    আরেকটি ডানে ধাও

অবশেষে তুমিহীনা আমি।

সন্ধ্যা তুমি রাত হও,  খুলে ফেলো ছলনাচাদর

সোনারূপা কারুকাজ যত ভান ভনিতা আদর

মিথ্যে বলে একবার পায়ে ঠেলে আসুক হে প্রেম

ফিরিয়া আমার কাছে, আমি তার সত্যি সোনাহেম

এখন কী দেখো তুমি, তাকিয়ে তাহার মুখপানে

খোঁজো বুঝি এই রূপ দেখিয়াছি আমি কোনোখানে

আহা… উহু… হাতে হাতে গলে আসে মাখন মাখন

গলে যাও ডুবে যাও নেচে ওঠো বুঝি

তারই নূপুরের তালে ছন্দ তোলে হৃদয় যখন

অন্ধকারে আমি শুধু তোমাকেই খুঁজি।

সে আমার দাসীর সমান, তবু কোন অভিরুচি

দেখো শোনো ফিরে ফিরে তাকে

এমন তো হতে পারে চামারের কুলির মুচির

মানুষ তোমাকে রাজা ডাকে!

ছি ছি, ভুল, ভুল বলে,                  রাজার শেখানো বোলে

পোষা কথা করে উচ্চারণ,

পতিত পুরুষ, তাকে                    কে উঁচু আসনে রাখে

মনে মনে পায় সে মরণ।

শোনো প্রিয় সত্য বলি                  জগতের দীপাবলী

জ্বলে সেই মানুষের নামে,

যে নিজেকে রাখে ঢেকে                কিছুটা আড়াল রেখে

না জড়ায় কোনো বদনামে।

কথা যার পরিমিত                      লক্ষ্যে হয় উপনীত

দূরে রাখে শত প্রলোভন,

জীবন যে অভিশাপ                    বাড়ে যদি পরিতাপ

দিকে দিকে শতেক গুঞ্জন।

এ রজনী ভারী হয়ে আসে

ঘন ঘন ক্ষততারা হাসে

রাতের আকাশনীলে, একা আমি ভাবি

কখন আসবে, খুলবে ঘরের চাবি

ঘর সে তো ঘর নয়, হৃদয় মন্দির

তোমারই প্রেমের লোভে এখনো অধীর

প্রতি পলে পদশব্দ শুনি আমি ভ্রমে আর ঘোরে

ভাবি নিশি যদি নামে বেদনার মায়ানিশিভোরে।

তবু আমি গরবিনী                        নিয়মের মন্ত্রে কিনি

তোমার জীবনভাগ আধা,

আমারই আঁচল তলে                    ও জীবন ফুলে ফলে

শেষত রয়েছে জানি বাঁধা।

কে তোমাকে ধরে রাখে                 বাহিরে বাহিরে ডাকে

বলে ঘর বন্দী করে সাধ,

কোন পাপীয়সী সে যে                   চূড়িতে নূপুরে বেজে

ঘটায় তোমার পরমাদ।

আমি তার গন্ধ পাই                      বুঝি সে কামিনী রায়

কামে মোহে মজায় পুরুষ,

আলোকে কালোয় ঢাকে                  পতনের খাদে ডাকে

বীরকে বানায় কাপুরুষ।

জানে তারা অঙ্গে অঙ্গে                   বহু ঢঙে বহু রঙ্গে

বিস্তারিতে ছলনার জাল,

তুমিও তো অবশেষে                     সেই ¯্রােতে গেলে ভেসে

তার তোড়ে ছেঁড়ে শত পাল।

কত কথা শেখো তার কাছে

কত জানো প্রবোধের ভাষা

জীবনের বহু অর্থ আছে

বলো তার আছে বহু আশা।

মানুষের কাছে যেতে হয়

মানুষকে নিতে হয় চিনে

মানুষে মানুষে পরিচয়

বুঝেছো তা তুমি এতদিনে।

বলো তুমি নারীও মানুষ

সে কেবল নারী নয় কোনো

তুমি বলো, আমি তো ফানুস

উড়ি শূন্যে, তুমি বলো, শোনো।

শুনি আমি তোমার বচন

নিশিরাত দুই কর্ণভরি,

পুরুষের মধুপ্রবচন

এ সামান্যা কোন জ্ঞানে ধরি।

তুমি বলো, মাথা নাড়ি, তুমি হাসো, আমি

ভেতরে ভেতরে এক নিথর দীঘির জলে নামি।

দীঘিতে ডোবাই পা, শ্যাওলা জড়ায় আলগোছে

আমার ভেতরে এক অন্য আমি শুধু চোখ মোছে।

বাড়ে নিশি, জ্বলে চাঁদ,                    পুড়ে মরে শত সাধ

মাথা ঠোকে আকাশের গায়

আকাশ পাথরপ্রায়                         প্রত্যাঘাত দিয়ে যায়

নীল নীল রক্তে আমি নাই।

কী হয়েছে, প্রশ্ন করো                     আমি প্রেম থরোথরো

কী হয়নি তা-ই খুঁজে চলি,

তোমাকে করি গো পাঠ                   আধো আলো অকস্মাৎ

আমি দীপশিখা হয়ে জ্বলি।

আঁচ নাও আঁচ নাও                        হাত ধরে টান দাও

কোলে নিয়ে বসাও হৃদয়,

শরীর শরীর নয়                           আমি হৃৎরক্তময়

তোমার আপন পরিচয়।

তোমাতে আমাতে মিলে                  হাঁটব মায়ামিছিলে

কন্ঠে কাঁপা ধ্বনির শ্লোগান,

ভালোবাসা অবিরাম                       চোখজল নুন ঘাম

দুর্নিবার ছেঁড়াখোরা টান।

 

দ্বিতীয়া :

 

এই যে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছো তুমি

জানি, আমি তোমার ঐ মুহূর্তের বিরামের ভূমি।

এ বিহার ক্ষণিকের, শেষ হবে সহসা তোমার

বুকের ভেতরে বাজে অন্য বাঁশি অন্য হাহাকার।

তখন সন্ধান করো নিজেকে নিজেই তুমি ভুলে

কাকে ফেলে শুয়ে আছো বিস্মরণনদীটির কূলে।

পাল তুলে দিয়ে ডাকে যে পাড়ানি হাল বেয়ে বেয়ে

তোমারই ফেরার দিকে প্রতিদিন থাকে সে তো চেয়ে।

 

বলি আমি, সন্ধ্যা আছে                     তোমার আমার কাছে

এখনো আগুন রাঙা রাঙা,

নূপুরে নূপুরে বাজো                        তারায় তারায় সাজো

বাঁধো ঘর নিত্যঘরভাঙা।

শিখেছি কৌশল খুব                        কিসে ভাসে কিসে ডুব

পুরুষ মনের বাসনায়,

সেই জোরে আছো প্রিয়                    এ ছলনা রমণীয়

আমি জানি তুমি আসো নাই।

নোঙর ফেলেছ মিছে                       ডাক আসে পিছে পিছে

¯্রােতে ¯্রােতে ঘুরে যায় মন,

রাতের নিয়মে রাত                         ধরে যে তোমার হাত

আমি একা বেদনা তখন।

তখন বাজে না আর                        নূপুরের ঝংকার

তখন থেমেছে রাগিনীরা

কোথায় তোমার ঘ্রাণ                       বধেছে আমার প্রাণ

এভাবে বৃথা অভাগিনীরা।

তুমি ডাকো সন্ধ্যারানী                      তোমার বচন মানি

সুচতুর ধ্বনি-আভরণ

নিশীথে কাহারে ডাকো                     কাহার বাহুতে থাকো

কে জাগায় জীবন-মরণ।

হা কপাল সূর্যমূখী                          আলোর পরশে সুখী

আলো তার আধাবেলা থাকে,

অন্ধকারে আঁখিজল                         করে তাকে বিহোবল

পড়ে থাকে বিরহের বাঁকে।

আমার বিরহ তবু                           তোমাকে ছোঁবে না কভু

সন্ধ্যা গেলে তুমি যে অচেনা

আমার চোখের জলে                        ব্যথা ভাসে নিষ্ফলে

আমি সময়ের দামে কেনা।

হ্যাঁ হ্যাঁ আমি পণ্য জানি                    তবু আমি ধন্য মানি

এ জীবনে তোমার পরশ,

শুনেছ আমার সুর                           তালেমুখরা নূপুর

তোমাকে যা করে মোহবশ।

 

মোহ জানি, ক্ষণিকের, ভেঙে গেলে সকলি উধাও

আমাকে ঠেলিয়া দূরে কী আক্রোশে সহসা দাঁড়াও।

তাকাও অচিন চোখে, আমি কাঁপি ভয়ে ভয়ে, মরি

সকলি বিফল গেল? করো না এমন পায়ে পড়ি

হেসে হেসে ভালোবেসে একবার ধরে এই হাত

যাও, তবে অপেক্ষায় পার করি আমি সারারাত,

সারারাত সারাদিন শুধু এক সন্ধ্যার আশায়

পৃথিবীতে এইমতো শত শত নারী মরে যায়।

মরে যায় পুড়ে যায় বঞ্চনার মায়াবি আগুনে

তারা ফুল তুলে, মালা গাঁথে, ঘোরে বেপথু ফাগুনে।

তারা নারী, পরনারী, পরপুরুষের অভিসার

জগতের আলো নিবে গেলে অন্ধকারে পারাপার

তারা ঘাটে ঘাটে নৌকো, নোঙরে নোঙরে ক্ষতরাঙা

কখনো শ্রাবণে জল, ভাদ্রের আগুনে পোড়া ডাঙা।

অধিকার বলে কিছু নাই, শুধু সন্ধ্যার বিহার

মুহূর্তের কাম মোহ অতঃপর চিরকাল হার

হারি আমি প্রতি রাতে, যখন ফেলিয়া যাও তুমি

আগন্তুক রাজপুরুষের ঘোড়াক্ষুরে ক্ষত ভূমি।

এই তুমি চলে যাবে, পালাবে, নিশীথ ঘনায়েছে

পড়ে র’বে শূন্য ভূমি, মিটিমিটি তারা, নিভে গেছে।

 

তাদেরই সোদরা হই                    তাদেরই শোণিতে বয়

আমার আপন রক্তধারা,

অধিকার অনাচার                       জ্বলে নীতি ক্ষুরধার

আমরা সকলে বাস্তুছাড়া।

আমাদের দেশ নাই                     আমাদের নেই ঠাঁই

বিকি করি রূপের পসরা,

শিখি নৃত্য শিখি গীত                   শিখি ছলনাপিরীত

কবু ধরা কখনো অধরা।

প্রিয় হে যাবেই জানি                   ঘনিয়েছে রাত মানি

তবু শোনো অভাগীর কথা

তোমাকে ভরিয়ে দিয়ে                  শূন্য এক ডালা নিয়ে

আমি এক নিশিনীরবতা।

যে তোমার পথ চায়                    সেই গৃহবারান্দায়

ভাগ্য তার লেখে জয়টিকা

আমি যে পথের মাঝে                  কুড়ানো সে ফুল সাঁঝে

নিবে যার প্রেম দীপশিখা।

 

আমার মায়েরও ছিল এমনই প্রেমিক এক জানি

তাকে নিয়ে দেশে দেশে হতো কথা হতো কানাকানি।

সেও নাকি ফেলে গেছে সমাজের কাঁটার শয্যায়

ভীষ্মের মতোন, মাকে, চলে গেছে ভীষণ লজ্জায়

পৃথিবীর কোল ছেলে মরণের ওমের ভেতর

সেই মা যে কথা বলে শুনি আমি কাঁপি থরথর,

কেমনে জীবন গেছে বঞ্চনায় কী অনধিকারে

যাবে তুমি শোনো প্রিয় আমি মরি সেই হাহাকারে।

যে বেদনে মারে মাকে সেও এসে ঘোরে চারিধার

সন্ধ্যা যায় ভুলে ভুলে নিশি ঢাকে স্বত্ব অধিকার।

সে চাদর পরিয়েছো যে নারীকে বাসনা দেখার

কী যতনে বয়ে নেয় টলোমলো জীবনের ভার।

ভালোবাসা কেমন যে বাঁচায় এখনো তার প্রাণ

যাবে সখা, শোনো কথা, আমি পাই অন্যদেহঘ্রাণ।

এখনই তোমার গায়ে সেই চির আপন আশ্রয়

তোমাকে বাহুতে নিয়ে জিজ্ঞাসিবে বিষয় আশয়।

 

যখনই ভাবি সে কথা                        ত্রস্ত হয় নীরবতা

ভূমিকে আঘাত করি পায়ে

আঘাতে আঘাতে তাল                      ভাঙে ছদ্ম বোবাজাল

আঁকি রেখা আঁধারের গায়ে।

তখনই তা হয় নাচ                          পায় শত শত ছাঁচ

সবই জেনো অন্তরের ভাষা,

তোমাকে ঘিরিয়া রাখে                      দেখার মধুতে মাখে

তুমি মজো, সে যে সর্বনাশা।

নাশ করে সব আয়ু                          বন্দী করে প্রাণবায়ু

তারই মোহমায়ার পিঞ্জরে

জীবিতকে মেরে তার                        দেখো প্রাণ কী সঞ্চার

মাংস নাচে থরে কি বিথরে।

 

প্রথমা :

জানি আমি, তবু প্রেম নয়

কিছু ভান কিছু অভিনয়

ফুলে ফুলে বসে যে ভ্রমর

কোন ফুলে রাখে তার প্রাণ

ফুল ডাকে কাঁপে থরথর

আজ তাজা কাল বাসি ঘ্রাণ।

জানি আমি মানুষী তো নই

আজও কোনো ফুল, কোনো ভুল

তোমারই আশায় তবু রই

উড়াই তোমারই পথে চুল।

 

জ্বলে রোদ, জ্বলে সোনা হলুদ হলুদ

আকাশে উতলা ভাসে নীল এক শাড়ি

বাসনা পোড়ায় মন, এমন সময়

আসো তুমি আসো তুমি দেব খেয়া পাড়ি।

তখন জলের ’পরে আকাশের মুখ

সাদা নীল ছায়া ছায়া ভালোবাসা মাখা,

তোমারে ছোঁয়াবো প্রাণে সকল আদর

তোমারই পরানে সখা এই প্রাণ রাখা।

 

তখন আসো না তুমি,                তখন বিরানভূমি

আমার পরানে ধূ ধূ কাঁদে

তুমি থাকো বহুদূর                    ভাঙে পায়ে এ নূপুর

রাগ-রাগিনীর মায়া সাধে।

তোমার তখন কাজ                   চারিদিকে সাজ সাজ

মনে মনে কতো না হিসাব,

জীবনের আয়োজন                   কত শত প্রয়োজন

কত ভাব কত বা অভাব।

 

একদিন মনে আছে                  গিয়েছি তোমার কাছে

অসময়ে কোনো অবেলায়

ভাবিনি অনেক কিছু                  কেবল তোমার পিছু

হৃদয় ছুটেছে সহসাই।

সকল লোকের ভিড়ে                কেবল তোমাকে ঘিরে

মানুষের কতো না বিষয়,

দেখি দূর চেয়ে চেয়ে                আমি তো দূরের মেয়ে

আমার ঠিকানা সে তো নয়।

পরিচয় সে তো ফাঁকি               তাই দূরে দূরে থাকি

কাছে যেতে মানা যে আমার,

তখন চোখের কোণে                জল কত কথা বোনে

কত গান কত হাহাকার।

তবুও দাঁড়ায়ে রই                   মনে দ্বিধা মনে ভয়

একবার তাকালে কি ফিরে,

কেঁপে কেঁপে থাকি থির             বেলা বয়ে যায় ধীর

কী এক বেদনা আসে ঘিরে।

চুপি চুিপ ফিরে যাবো               পরে যদি কিছু ভাবো

মনে মনে ভাব উচাটন,

দেখি সে আলোর মুখ               গরবে উছলে বুক

তারে তবে দিয়েছি এ মন!

আহা মন, কত সাধে                বাসনার ডালে বাঁধে

ঝাঁকে ঝাঁকে হলুদিয়া পাখি,

করে গান করে খেলা                কেটে যায় সারা বেলা

আধা বেলা থাকে তবু বাকি।

 

জানি আমি কাজ শেষে হবে না তোমার ফেরা ঘরে

কোনো দূর সন্ধ্যাপুরে সে রমণী আছে দীপ ধরে।

বাতির আলোয় কাঁপে থরথর মুখটি যে তার

আমারই হৃদয়ক্ষত জ্বলে সে প্রদীপে বারবার।

কাজ শেষে অন্য কাজ, অন্য দাবি করে গুঞ্জরণ

আপন পথের মুখ সহসা সেদিকে সন্তরণ।

তুমি ডোবো তুমি ভাসো, আহা রঙে তরলে গরলে

আমি যে তখন বসে জানালায় ভাসি আঁখিজলে

কেবল গোধূলি গেছে রঙ ঢেলে চোখে আর মনে

আমিও তখন মরি একা একা ঘোর সন্তরণে,

দাঁতে দাঁতে খুটি নখ, ঠোঁটে ঠোঁটে বসাই কামড়

রাত বলে চাঁদ বলে তারা বলে পোড়ামুখি মর।

আমি জন্মপুড়ামুখি পুড়ে পুড়ে ছাই করি দেহ

জনমের তৃষ্ণা জানি ভালোবাসা মমতা ও ¯েœহ।

আহা

একবার যদি আমি দাঁড়াতাম সেখানে সহসা

দেখতাম কী মুহূর্ত রচনা করেছে সেই নারী,

কেমনে সে বেঁধে রাখে হৃদয়ের সকল ভরসা

দূরে থেকে চেয়ে চেয়ে হতাম গো অনুরাগী তারই

আমি তো ঘরের মায়া চৌকাঠের বেড়িপরে তার

সাজিয়েছি বোবাঠারে সযতনে মায়ার সংসার,

মায়া কে পোষে এ কালে, মোহ ডাকে পাখি হয়ে গানে

ভাসে ডোবে পুরুষ যে মোহের জোয়ারে জলে বানে।

 

শোনো শোনো প্রাণপতি                     আমি জেনো নারী সতী

আমার প্রেমের নেই খাদ,

তোমারই আশায় কাঁদি                      তোমাতেই প্রাণ বাঁধি

ঘোচাও সকল পরমাদ।

যেয়ো না ছলনাকূপে                        একা একা চুপে চুপে

আমি তো রেখেছি রূপাসন,

চাঁদের জোছনা খেলে                        পরিহাসে অবহেলে

এ হৃদয়ে জ্বলে হুতাশন।

সত্য আমি গুণহীনা                          বাজাতে পারি না বীণা

জানি না তো গান কিবা নাচ,

কৌশলের কোনো কথা                      ভানে ভরা নীরবতা

নয় জানি আমার রেওয়াজ।

মানুষ তো তাই, সে যা আছে

সেইটুকু নিয়ে সেও বাঁচে

মানুষ তবুও কাঁচ, আলো দিলে ভাসে যে আকাশ

ধবধবে সাদা, আহা, হৃদয়ের সরল আভাস

সে আলো তো জ্বালে প্রেম, মানুষ ঐ প্রেমের কাঙাল

আমিও মানুষই হই, পাখি ভেবে বন্দী করে জাল।

ভুল জানো প্রিয় তুমি জেনো সবই ভুল

মানুষ কখনো নয় বাগানের ফুল,

কয়েকবারের ঘ্রাণ নেয়া হলে বাসি হয়ে যায়

মানুষের মনোফুল চিরকালই সুবাস ছড়ায়

সেই গন্ধে ফিরে আসো, সন্ধ্যা হয়, গিয়েছে গোধূলি

রঙে রঙে রাঙা আমি তোমারই ঘরের বুলবুলি

ঘরে আছে শত পথ, শাখা মেলে ছকের ভেতর

জানে যে খেলার লোক সেই পায় হাজারো খবর।

না না প্রিয় ঈর্ষা আমি করি না কারোকে

আমি শুধু বলি কথা যা বাজে এ বুকে

হ্যাঁ হ্যাঁ আমি দ্বার জেনো বন্ধ করে রাখব এ রাতে

অপেক্ষার তিথিগুলো পুষ্প হয়ে ঝরুক প্রভাতে

অনাদরে ধূলি মেখে মানুষের পায়ে পায়ে লেগে

এ জীবন গেল হায় আকন্ঠের প্রেম ভিক্ষা মেগে।

 

দেখি আমি তুমি দেখো                      তারই মুখ, চোখে মেখো

তারই রূপজৌলুসবাহার,

অপলকে চেয়ে থাকো                       কাছে নিয়ে কাছে ডাকো

এভাবেই দৃশ্যের আহার।

মক্ষিরানী অতঃপর                           প্রেমে কামে থরথর

বৃন্ত থেকে খসে খসে পড়ে,

তোমারই পরশ পেলে                       সে কুসুম দল মেলে

চারিদিকে জাগে থরে থরে।

সন্ধ্যাবেলা জাগো জানি                      কর্মযবনিকা টানি

মাথা ঘুমে, খোলে যে হৃদয়,

সেই হৃদয়ের ছোঁয়া                          তারই প্রেমজলে ধোয়া

হা জীবন অগাধ বিস্ময়।

 

দ্বিতীয়া :

মনে নাই কবে এসে দাঁড়িয়েছি রুপালি আঁধারে

তখন তো কেউ নাই, শুধু আছে জীবনের আশা

জীবন লতার মতো জড়ায়ে জড়ায়ে রাাখে কত ছলনায়

তুমি তবে এসে কবে দাঁড়িয়েছো সম্মুখে আমার

আমার তো পথ নাই, তুমি দিলে পথ

যখন থামিয়া গেল এক অশ্বরথ।

ঘোড়ার লাগামখানা যেন এক চামর সোনার।

যেন কোনো দূর হতে আসে এক রাজার কুমার।

আমার তো গান শেষ                       কন্ঠ জুড়ে অবলেশ

এ জীবনে কত সুর গে’ল,

যখন ফিরিব বলে                           নয়ন পেছনে চলে

তখন তোমাকে যেন পে’ল।

তুমি এসে কড়া নেড়ে                       এ বাসনা দিলে ছেড়ে

আরেক নতুন কামনায়,

বারবার বন্দী হই                           পাখির মতোন রই

পোষা প্রেমে পোষা বাসনায়।

শোনো তবে একদিন                       আমারও বেজেছে বীণ

আমিও মজেছি প্রিয় সুরে,

তোমারই মতোন কেউ                     তুলেছে অচিন ঢেউ

বেঁধেছে আপন বাহুডোরে।

নিশীথে সে যেত ফেলে                    আঁধারে প্রদীপ জ্বেলে

নিজের আপন ঠিকানায়,

আমারে সে পাশে রেখে                    যেত যে আড়ালে ঢেকে

সব ভুল সব যেত হায়।

সে আমারে ডেকে নিত                    পরানে যে প্রাণ দিত

মনে মনে হত শত কথা,

তখন আমার মনে                          কী কথা তাহার সনে

চোখের পানিতে যথা তথা।

তখন ভেঙেছি চূড়ি                         নূপুর ফেলেছি ছুড়ি

সবাই এমনই প্রতারক,

তখন একলা আমি                         জানে সব অন্তর্যামী,

ধিক্কার জানাই সব ঠক।

আমাকে তুমি তো নিলে                    নতুন যে ভাষা দিলে

বোবা কন্ঠে এলে কত কথা

তোমারই আশ্রয় হায়                      আমাকে দিয়েছে ছায়

তুমি তো আমার নীরবতা।

আমার জীবন ডোবা                       পদ্ম কি পায় শোভা

নাই কোনো পুষ্পরতন,

জানি তুমি শুধু মায়া                       সোনার বরণ কায়া

স্মৃতিভর রাখি গো যতন।

ধুলার ওপরে ফুল                          গন্ধে করে যে ভুল

নাই তার কুঁড়ির সুবাস,

কে আঙুলে ছোঁয় তাকে                    পরশ পরশ মাখে

সে ক্ষণিক, বেঘোর, উদাস।

আমারে জড়ায়ে নিও                       তোমার নিশীথে প্রিয়

ভেঙে ফেলি নাচের নূপুর

কেবল বুকের কাছে                        লুকিয়ে ঘুমায়ে আছে

দেখি এক রমণীসুদূর।

নিও গো তোমার সাথে                    তোমারই তোমারই রাতে

আকাশ মেলাবে কী চাদর

অধিকারে কাছে টেনে                      হৃদয় ছেনিতে ছেনে

বিলাবে যে রক্তে আদর।

আদরের কাঙালিনী                         আমারে করো গো ঋণী

আমি হব দাসী যে তোমার,

কেবল সঙ্গে নাও                           যেখানে নিশীথে ধাও

তোমার সোনার সংসার।

রঙে রঙে সং সেজে                        চূড়িতে নূপুরে বেজে

করি যত জলসা মুখর,

সব হয়ে যায় মিছে                         পারি না তো যেতে পিছে

সবহরা তার অনুচর।

কাগজে কাগজে লেখা                      জীবনের যত রেখা

একবার বলো সব ভুল

প্রাণের যেখানে সুখ                         যেখানে ভরে এ বুক

সেখানে ফুটেছে সব ফুল।

আমি তো জীবনভর                         ঘুরেছি এ চরাচর

আজ প্রিয় কাল অভিশাপ

তোমারই চোখের তারা                     করে হায় দিশাহারা

আগুনে আবার দিই ঝাঁপ।

আমি কি শরীর শুধু                          নিরজনে করি ধু ধু

রক্তে মাংসে চোরাবালি,

তুমিও কি ঢুকে পড়ে                        আছো প্রাণ হাতে ধরে

মনে আর মনে জোড়াতালি।

আমি তো পদ্ম নই                           ধুতুরার ফুল সই

বলো যদি বলো তাই মানি

তোমারই পথের পরে                        আছি হিয়া থরথরে

মানুষী-বাসনা কতো জানি।

যখন তোমার পাশে                          মজে নারী সহবাসে

প্রতিদিন আপন নিয়মে

অধিকার লেখা হয়                        নাই সমাজের ভয়

প্রেম বাঁচে দমে আর দমে।

আহা

তখন তোমার গায়ে                      কভু ডানে কভু বাঁয়ে

লেগে থাকে শরীরদোসর

তখন মনে কি পড়ে                      কার দুই চোখে ঝরে

বিরহের জল ঝরঝর।

তখন কি পড়ে মনে                      নূপুরের নিক্কনে

কার মন ভেঙে পড়ে পায়ে

কার ভালোবাসা, প্রেম                   আগুনে পোড়ানো হেম

উড়ে চলে বসন্তবায়ে।

মনে কি পড়ে তখন                      কে তোমার পরশন

মাখে দেহে পরম যতনে

মানুষ নিন্দা করে                         ঠারে কত মন ভ’রে

তবু সে তো রাখে না সে মনে।

মনে পড়ে তখন কি                      সবাই তো করে ছি ছি

তবু তাকে দেখি নাই ফিরে

তোমারই ভরসা মনে                     ফেরায় যে প্রলোভনে

থাকি তো তোমারে ঘিরে ঘিরে।

শুধু রাত এসে নেবে                      তোমাকে ফিরায়ে দেবে

আপনার আপন জনারে,

আমি কাঁদি একা একা                    কাঁদে জীবনের লেখা

ঘুরে মরে দুয়ারে দুয়ারে।

ঘর তো আমার নাই                       হাওয়ার মাঝারে ঠাঁই

ভরি সব নাচে আর গানে,

তোমারে কিছুটা দেই                      আর কিছু নিজে নেই

রাখি বাকি মরণশিথানে।

প্রিয় হে তবুও শোনো                     যেখানে জীবন বোনো

নিপুণ হাতের ইশারায়

আমাকে কখনো নেবে                     মুহূর্তের ঠাঁই দেবে

সেই কুটিরের জলসায়।

জীবন নতুন গান                           বাঁধিবে সে নিশিপ্রাণ

থরে থরে আনন্দ জমাট,

কেউ নাই তখন যে                        রাতের মাধবী সেজে

খোলে হৃৎময়ূরের হাট।

নেবে না নেবে না জানি                   বৃথা এই কানাকানি

কালিমা কে মেখে নেয় বুকে,

কালি সে কালোতে থাক                   যেখানে পথের বাঁক

আশার পাখিরা মরে ধুকে।

কখনো ভাবি এ খেলা                     আর নয় এই বেলা

তোমাকে দূরেই দেব ঠেলে,

চূড়িতে আঘাত দেব                       এ হাত ফিরিয়ে নেব

বিচ্ছেদের কাঁটা দেব ফেলে।

কাঁটায় রঙিলা হও                          ক্ষতের বেদনা সও

আমাকেও নাও চিনে ভালো,

ভাবি এই অন্ধকারে                        ঘুরে মরো দ্বারে দ্বারে

কোথা সেই এক রত্তি আলো।

আলো নয় আলেয়া যে                    মরে প্রতিবার সাঁঝে

কোথায় হারিয়ে যায় একা,

কেবল দেহটি থাকে                       ঘৃণায় হিংসায় রাখে

হৃদয়কে দিয়ে মুচলেকা।

প্রথমা :

কেন আসো এই রাতে, কেন আসো এই মরাকালে

প্রেতিনী বাতাস ঘোরে পাতা ঝরা খালি-খালি ডালে।

আমার যে দিন গেছে পিঞ্জরে বাঁধিয়া এক পাখি

শোনায় দুখের গান, আমি তারে পাশে পাশে রাখি।

সে-পাখির দিন যায় দ্বিপ্রহর অপরা‎হ্ন‎ সকল প্রহর

কেবল সে রাতের নিশুতি গান বুকে বাঁধে পাঁজরে পাঁজর

কেন এলে ঘুমানো পাখিরে বৃথা জাগাতে রাত্তিরে

কেন এসে চেয়ে দেখো পলকনিভানো চোখটিরে

কাজের শেষের পরে ক্লান্তি মাখা দেহটিকে নিয়ে

তুমি যাও তার কাছে,  পেরেশান ঘাম মুছে দিয়ে

সন্ধ্যার আগুন লাগা আকাশ যৌবনে টলমল

তখনই তোমার ঠোঁটে মাখে সে যে প্রেমের তরল

তখনই তোমার বুকে ওম খোঁজে চাতকিনী ওরে

জানি আমি তবু আসো, কেন ফিরে এই মরাঘরে!

 

যদি আমি তারে পাই                        কখনো বা সে সন্ধ্যায়

দেখাব হৃদয় খুলে তাকে

প্রেমের শতেক কথা                         কেমনে যে নীরবতা

ধরে থাকে চোরাগলিবাঁকে।

যদি আমি দেখি তাকে                      কোনো সে পথের বাঁকে

প্রশ্নতীর ছুড়ব সে বুকে

কেন সে এমন ধারা                         ঘরকে করিলো ছাড়া

সুখ কাড়ে আপনার সুখে।

জীবন এমন নয়                             এত ছল অভিনয়

বিবেকের এত প্রতারণা,

তারই সে ছলের দায়                        অন্ধকার যে ঘনায়

আরেকটি জীবন কল্পনা।

প্রথমা-দ্বিতীয়া পরস্পর কথামালা

দ্বিতীয়া :

শোনো তুমি কথা এই                     তোমাতে বা আমাতেই

জীবনের শত পরিহাস,

তুমি আধা আমি আধা                      কামনার ডালে বাঁধা

আমাদের যত অবকাশ।

আমাকে দিও না শাপ                       পতঙ্গ দেয় ঝাঁপ

না জেনেই মরণ আগুনে,

আমরা মরেছি বৃথা                          বেদনার পরিণীতা

দূরে থেকে ব্যথা দুই বোনে।

কখনো নাচের তালে                        গানের মায়াির জালে

নূপুরে চূড়িতে বেজে উঠি

কখনো নিশুতি রাতে                        হাত রেখে তারই হাতে

ভেতরে ভেতরে ধরি টুটি।

মর মর পুড়ে মর                            কাঁপি দেহ থরথর

হিংসায় দেহলতা পোড়ে,

জানি আমি সব কথা                        জানি এই নীরবতা

আমাকেই শুধু এসে খোঁড়ে।

শোনো বোন কথা শোনো                  স্বপ্নের জাল বোনো

একদিন আমাদের দিন,

ভাসাবে চাঁদের আলো                      হবে বাসা বড়ো ভালো

শোধ হবে জীবনের ঋণ।

একদিন বুক ভরে                           রুপা রূপা পিঞ্জরে

পাখি এক গাবে প্রিয় গান

আমাদের আধোপ্রাণ                        পিপাসার আধো গান

সুরে সুরে ভরবে বাখান।

একদিন তুমি আমি                         হব আরও আরও দামি

সোনার রূপার চেয়ে বড়

জীবনের জলসায়                           আমাদের ভরসায়

প্রাণ পাবে গানের ভ্রমর।

 

শোনো সখি, মিথ্যা আমি বলব না কখনো তোমাকে

জীবনের ঘাটে ঘাটে পসরা বিছিয়ে হাঁকে হাঁকে

কত লোক এসে গেছে সওদায় মজে গেছি কত

মুঠো ভরে পেয়ে গেছি পুরুষের দেহ শত শত।

মুদ্রার ধ্বনিতে বাজে জীবনের হিসাবের তাল

জীবন এমনই বুুিঝ বুঝেছি এমন ইন্দ্রজাল।

প্রেম ভালোবাসা দূর, বহুদূর আমার জীবনে

তাকে আমি ক্ষণিকের ঠাঁই দিই রঙধরা মনে

প্রেম নাই, দেহ আছে, ভালোবাসা-ভরা জোছনায়

রাতের জঠর থেকে ছড়ায় কতো যে রোশনাই।

তারই মাঝে একদা এসেছে সেই পুরুষ আমার

মজে গেল দেহে ভাবে রসে মোহে মধুএকাকার।

দেখি সে মুখের রেখা বড়ো চেনা চিনি যেন তাকে

চুপি চুপি এসে ঘরে আমাকে সে সন্ধ্যামণি ডাকে।

 

প্রথমা :

সন্ধ্যামণি! বাহ্! কতো মায়া, কতো ভালোবাসা মুখে

আমার জীবন গেছে নিশীথের ঢুলুঢুলু চোখে।

 

দ্বিতীয়া :

শোনো শোনো, করি শেষ, আমি দিই সাড়া, প্রাণে মনে

আমাকে জড়িয়ে ধরে, তবু চমকায় ক্ষণে ক্ষণে।

বলি, কিছু হলো নাকি, বলো না আমায়

সে যে শুধু অপলকে চমকি তাকায়।

বলি আমি, পুরুষ হে, কী আছে বাসনা বলো মোরে

সে কেবল আলগোছে ধীরে আমাকে জড়িয়ে ধরে

তড়পায়, কি যে এক ভাষা আছে আমি তো বুঝি না

রাতের আঁধারে আমি, অসহায়, তাকেও  খুঁজি না।

 

প্রথমা :

আহা! করুণা কেমন! মিছেমিছি ভয়ের আড়াল

এভাবেই পুরুষের বিস্তারিত করুণার জাল।

দ্বিতীয়া :

না না শোনো, আমি বলি, ভয় নাই, তুমি আর আমি

এভাবেই পার করে দেব এই ঘোর দিবাযামী।

হাসে সে নীরবে কেন, জানি না কী অর্থ তার, জানি

ভুল ভুল হাওয়া করে কোথা থেকে শুধু কানাকানি।

কেবলই তো রাত বাড়ে, সন্ধ্যা ঠিক নিয়েছে বিদায়

তখনই সে অন্য লোক, ফেলে সব ঝটিকা দাঁড়ায়।

আমার তখন সবে গল্প শুরু, চোখে জমা জল

ছুড়ে মারে বাহুডোর, স্তব্ধ করে চলে কোলাহল।

আমি ডাকি, শোনো প্রিয়, গল্পের আধেক আছে বাকি

সে তাকায়, রূঢ় চোখ, জীবন এমনই এক ফাঁকি।

প্রথমা :

 

: এই সব বলো কেন, আমার কী আসে যায় যায় তাতে

সন্ধ্যায় যে-নাট্য হয়, তারই শেষ দেখি আমি রাতে।

খুঁজে ফিরে উত্তরের নানান ধরণ উচ্চারণ

বলি আমি, এই বুঝি এইবার ঘটেছে মরণ।

পূর্ণ আমি সেজে উঠি পরমপূর্ণের দিকে যেতে

শূন্য এই হৃদয়ের ভার নিয়ে থাকি হাত পেতে

কত কথা জমে থাকে নিশুতির মজ্জায় মজ্জায়

রক্তলাল, আহা কী ক্ষরণ, আমি মরেছি লজ্জায়।

ধুয়ে আসে প্রতারণামাখা এক গন্ধময় জলে

আপন শরীর সে যে, তাকায়, আশ্লেষে, কোন বলে

আমাকে বাঁচাবে এই শীতল মরণগ্রাস থেকে

আহা

সাপের মতোন সত্য শিরায় শিরায় এঁকেবেঁকে

কোন সে কোটরে যায় ঢুকে, বলি, বিষ মারো বিষ

রাতের বক্ষের মাঝে কে সে দেয় অবিরাম শিস

বাসো বাসো ভালোবাসো, এই হলো ভালোবাসাদায়

যে হৃদয়ে ক্ষত দেয়, দেহ কাঁপে তারই ইশারায়

যে করে বঞ্চনা, তারই ঠোঁটে চেপে ঠোঁট বুকে বুক

রক্তক্ষরণের থেকে ছেঁকে তুলি ভুলে ভরা সুখ

এই তো জীবন, জানি যাপনের সব দায়ভার

করেছি সকল চূর্ণ নারীত্বের সব অহংকার

নারী প্রতীক্ষিতা, শুধু অপেক্ষায় কাটাবে সময়

ধূলিমাটি ধুয়ে দেবে, মুছে দেবে গ্লানি, অপচায়

তারপর কেঁদে ওঠা, নাও, আমাকে তোমার কাছে

আমারই ভেতরে তবু তোমার ঠিকানা আজো আছে!

 

যাও তুমি চলে যাও                      আমার কাছে কী চাও

কেন এসে বাড়াও যাতনা

নিজের বিষেই জ্বলি                      কাঁটাভরা পথে চলি

আর কোনো পথ তো পাবো না।

কেড়েছ আমার সবই                     মুছে গেছে সব ছবি

জীবনের সুখের প্রেমের,

সাদা এক পাতা দেখি                   মেলে আছে মুখে একি

পড়ে দাগ কার কলমের।

কেন তুমি নিলে কেড়ে                   অপরের স্বজনেরে

কেন তার ভেঙে দিলে মন,

ছলনায় আর ভানে                       মোহভরা নাচে গানে

করে দিলে তাকে উচাটন।

কেন কেড়ে নিলে বলো                  আমি থাকি ছলছল

হারানোর একা সন্ধ্যায়,

আমার কী থাকে আর                    বুক ভরা বেদনার

বাঁশি বাজে একা নিরালায়।

অপরের অধিকার                         কেড়ে নাও, এ বিচার

নারী হয়ে তোমার কী সাজে,

পরের চোখের জলে                      যে বিহারতরী চলে

ডুবে যাবে জেনো নদীমাঝে।

মানুষ ক্ষমতা পায়                        আবার সে তা হারায়

না হলে কি ফুরায় জীবন,

যে পাপ করেছো তাকে                   সময় হিসাবে রাখে

প্রতিদান করবে লিখন।

 

দ্বিতীয়া :

 

বলো না এমন কথা বুকে বড়ো লাগে

কোন পাপে কে যে দোষী সে মিটুক আগে।

তোমার বঞ্চনাদোষে পাপী বলো যাকে

পাপেরই তো অভিশাপ কুরে খায় তাকে।

মানুষের থুতু ঘৃণা সব সয়ে যাকে ডাকি ঘরে

তাকে আমি পাই নাকো নিজ করে আপন অন্তরে।

খাঁচার ভেতর তাকে পুষমানা পাখি করে বাঁধি

কত কথা ঘুরে ফেরে ভোলাতে যে তাকে আধাআধি।

আমার কথা সে শোনে, আমার বুকে সে কান পাতে

আহারে তবুও তার শ্রুতি ভরে আনকথা মাতে।

তখন কেবল চাঁদ হয়তো উঠেছে নীলিমায়

তখন হয়তো সবে জোছনার দুধাভা ছড়ায়

কেবলি মাখনমেঘ থোকা থোকা ভেসে যেতে থাকে

কেবলি হয়তো পাখি নীড়ে ফিরে চুপি চুপি ডাকে

শরীর খুলেছে সবে খোলসের প্রথম আড়াল

ছিড়ে ছিঁড়ে ঘিরে রাখা নিষেধের সব মায়াজাল

আগুন লেগেছে সবে বাসনার পাতায় পাতায়

কুড়ানিরা দেখে হেসে দূর থেকে শিখায় শিখায়।

 

তখনই সময় তাকে                          ফেরায় পুরনো বাঁকে

সবই আছে তবু যেন নাই,

ডাকি আমি প্রিয় শোনো                     এ প্রেমের জাল বোনো

তারপর দেখো ঠিকানায়।

সাঁঝের সকল খেলা                          করো নাকো অবহেলা

নিশীথের ফিরিবার দায়,

শত অশ্রুকণা বেচে                          শতবার প্রাণে যেচে

পেয়েছি তোমাকে কী আশায়।

শোনে আধা বাকি আধা                     কোথায় যে থাকে বাঁধা

করে শুধু বৃথা হাঁসফাঁস,

বাহুতে বেঁধেছি তাকে                       বেঁধেছি জলের বাঁকে

ওঠে কেন তার নাভিশ্বাস।

আমার দিনের শুরু                          বুক কাঁপে দুরু দুরু

যদি সব বিফলে ফুরায়

আকাশ, চাঁদ ও তারা                        সকলেই দিশাহারা

যদি আমি আমাকে হারাই।

প্রেম সে কেমন তার                         রূপখানি দেখিবার

এ জীবনে কতো ছিল সাধ

কেমনে পুষি যে তাকে                       নিজের মনের বাঁকে

দিয়ে তাকে পরানের বাঁধ।

চোখের জলের বানে                         প্রিয়কে যে কাছে টানে

এমনই প্রেমের বড়ো লোভ

সকল কালিমা মেখে                         তবু তাকে রেখে ঢেকে

মিটাতে চেয়েছি জ্বালা, ক্ষোভ।

আমাকে সে খুঁজে নেবে                      সবই যে ফিরিয়ে দেবে

জীবনের মধুর সময়

বাঁকে বাঁকে কত মায়া                        আহা সে সোনার কায়া

এর চেয়ে আর কিছু নয়।

কিছু তো হলো না তার                       অভাগীর এ অসার

আকাক্সক্ষা মিটে নাই জেনো

তোমারও যা ক্রন্দন                          আমারও সে হয় বোন

দুইজনে একই রেখা মেনো।

কাড়িনি তোমার কিছু                         ধরিনি কারও তো পিছু

শুধু এক জীবনের লীলা

শেষে যা মেলায় বৃথা                         বাসনার জ্বলে চিতা

যে জীবন স্বপনসলিলা।

একবার এ জীবনে                            শুধু ভাবি সেই ক্ষণে

পাই তাকে এক নিশিভর,

চাঁদের মাখনে গলে                           জোছনার পলে পলে

সারারাত গাইবে ভ্রমর।

এক নিশি দু’য়ে শুধু                           চারিদিকে সব ধু ধু

আমরা দুজন সচেতনা,

গভীর শ্বাসের জোটে                          কত মধুফুল ফোটে

দিশা পায় মনের বেদনা।

এক রাত এক রাত                            যদি তার হাতে হাত

গেছে নিশি জাগরে জাগর

বৃথাই গিয়েছে আশা                           আমি সখি প্রেমনাশা

সে কেবল রঙের নাগর।

 

প্রথমা :

যে কথা বলেছ, তার                   সকলি চমৎকার

খুলে দিল সকল দুয়ার,

ভাবিনি কী অপরাধে                     বারবার  বাঁধ সাধে

জীবনের প্রেম পারাপার।

বিরোধে নিয়েছি মনে                    গোপনহৃদয়রণে

সে তো নয় বিরোধী আমার,

সে-ও হতভাগী মানি                     করে কত কানাকানি

তাকে নিয়ে ব্যথাপারাবার।

কত যে যাতনা সয়                      কত ঘৃণা কত ভয়

কত ব্যথা কত অপমান

অধিকার নেই যার                       কী বা আছে আর তার

বুক ভরা চাপা অভিমান।

আমরা সে অভিমানী                     দুয়ে মিলে এক জানি

তুমি আধা বাকি আধা আমি

জীবনে ফিরেছি প্রেমে                    গ্লানি যাতনায় ঘেমে

খুঁজে ফিরি প্রিয় প্রাণস্বামী।

সকলি ছলনা ধরে                        পুরুষের ভাব করে

হতভাবে ক্ষত করে চলে,

পৃথিবী তোমার নয়                       আমারও কি প্রাণে সয়

যেতে ফুল পায়ে পায়ে দলে!

পৃথিবীতে কত কাল                      এভাবেই যাদুজাল

রাত হয়ে চলে দুই ভাগ,

সন্ধ্যা যে এক ভাগে                      আরেকটি নিশি জাগে

একে রাগ একে অনুরাগ।

জেনেছি হে সখা আজ                    জীবনের কারুকাজ

নকশায় আঁকে বঞ্চনা,

দুজনের দহনের                           রক্ষত দেহ ও মনের

প্রেম জানি এক সান্ত¦না।

দূর থেকে করি ঘৃণা                       তোমারই গানের বীণা

তোমারই নূপুরধ্বনি, হায়

সে-বীণাতে ব্যথা বাজে                   সে নূপুর কাঁটাসাজে

তোমাকে বেড়ায় ছলনায়।

তবে কোন পথে যাবো                    কোথায় সে খুঁজে পাবো

মুক্তির পরম ঠিকানা,

পরের কামনাভার                          অর্ধেক হাহাকার

কোথা গেলে হবে সব জানা।

কোথায় দু’হাত ভরে                       নেব সব নিজ করে

সযতনে রাখব লুকিয়ে,

নিজের প্রেমের ধন                         মণিমানিকরতন

আঁখিজল যায় যে শুকিয়ে।

সেই ছোটকালে মা যে                     বলেছে প্রেম বিরাজে

মানুষের মনের ভেতর

পতির উছিলা করে                        নিতে হবে তাকে ধরে

সেই ভেবে আছি থরথর।

মায়ের মায়ার ঘর                          বড়ো প্রিয় ঘরদোর

সব ফেলে নেমেছি আঁধার,

জানি না কোথায় যাবো                    কেমন ঠিকানা পাবো

চোখে আহা অকূল পাথার।

তবু অমৃত আশা                             আমৃত্যু ভালোবাসা

চাতকের তৃষা নিয়ে চলে,

সেই তো দেখালো পথ                     সেই তো চালায় রথ

তারই আঁচে শত তারা জ্বলে।

ভয়ে ভয়ে দুরু দুরু                         সেই তো জীবন শুরু

অনিশ্চিত পথের রচনা

কে হবো রূপসি, গুণী                       কেউ টিয়া টুনটুনি

মধুর ভাষায় সুবচনা।

কে এসে খুঁড়েছে বলো,                     হৃদয়ের সে অতল

জলে রোদে বেড়ে ওঠা চারা,

কেবল ঝড়ের তোড়ে                        তার শাখা পাতা ওড়ে

ভয়ে মরে দিকদিশাহারা।

পুরুষ তখন আসে                           প্রবোধে প্রবোধে হাসে

ভালোবাসা হাসে তার ঠোঁটে,

হৃদয়ে কম্পন জাগে                          নিশীথবীণার রাগে

কত সুর এসে জানি জোটে।

পুরুষ পুরুষ নয়                              মানুষই তো পরিচয়

আমাকেও নেবে সে মানুষ,

আহা রে দেখেছি তার                       ভাবনা চমৎকার

ওড়ায় সে রঙের ফানুস।

দিন যায় রাত যায়                           প্রাণে মনে বাহিরায়

তারই সাথে চিনিব ভুবন

কোথায় সে চলে যায়                        পাই নাকো তার ঠাঁই

সে চলেছে ভুবনমোহন।

খড়কুটো প্রাণে ধরে                          তবু থাকি নিশিভরে

ফেরারী সে ডাকবে আমায়

কী অবোধ ভাবনায়                          এত কাল কেটে যায়

মানুষী তো আমি হই নাই।

কেন এই প্রবঞ্চনা                            প্রেমহীনা বিবসনা

কতকাল কাটাবো এমন,

কেমন বেদনাভার                            করে থাকে হাহাকার

কবে তার ঘোচে প্রভঞ্জন।

দ্বিতীয়া :

সখি সে জানি না ভালো                       কোথা জ্বলে সেই আলো

আঁধারের পথ ফুরাবার,

এসো দুজনায় মিলে                             খুঁজি আকাশের নীলে

মিলনের দূর পারাবার।

হৃদয় ক্যামনে রূপে                              পতিত যে হয় চুপে

অতলে হারায় প্রাণধন,

তারই খোঁজ করি এসো                         তারপর ভালোবেসো

সে-পতিরে হয়ে উচাটন।

আমার জমানো কথা                            তোমার ঐ নীরবতা

দুয়ে মিলে হবে যে কথন

তারই শ্রুতি শুনে শুনে                          দেখি কী সে জাল বুনে

নিজেকে বোঝায় তার মন।

আধেক না গাওয়া গান                         আধেক না পাওয়া প্রাণ

মিলেমিশে হবে একাকার,

যেখানে পাবে সে স্থান                          একই সে শুনবে গান

একই সুর একই হাহাকার।

পুরুষ তখন কিসে                               যাবে বলো মজে মিশে

কার থেকে কারে নেবে খুলে

সুরে আর আঁখিজলে                            রসাতলে কি অতলে

যাবো সখি নিজ মন ভুলে।

আমাদের দুজনের                               আধো আধো জীবনের

গাবে গান এক একতারা

তারে তারে ছিঁড়ে যাওয়া                        হারিয়ে হারিয়ে পাওয়া

আকাশের নীল, মেঘ, তারা।

 

আমরা হয়েছি নারী, দুজনেই শুধু শুধু নারী

ভেবেছি অপূর্ণ নিজে, পূর্ণ হবো পেলে ভাগ তারই

এমনই ভেবেছি প্রিয়, এসে কেউ ভরাবে জীবন

ভুলে গেছি আপন আপন, প্রাণ এ শরীর মন।

নখে দাঁতে ভেতরে ভেতরে তাই খুঁড়ি আপনাকে

যে ক্ষরণ জন্মে আদি থেকে, কারা রাখে তাকে ঢেকে

জগতে অছিলা ভরে প্রেমের ছলনা পেতে রাখা

প্রেমের ভালোবাসার কত মন্ত্র বিশ্বাসে যে মাখা

আমাদের প্রতীক্ষার বঞ্চনার দামে কেনা প্রেম

পুরুষ রেখেছে তাকে বন্দী করে কামনাহেরেম।

 

এসো আজ দুজনার                      পূর্ণতার মোহনার

খুঁজি বাঁক নিজ নিজ পথে,

অতঃপর মিলে যাবে                     সবই গণিতে হিসাবে

জীবনের নতুন দ্বৈরথে।

পুরুষের চোখে নয়,                      খুঁজে নেব পরিচয়

আপনার আপন দর্পণে,

নিজেকে চিনব নিজে                     নিজের অশ্রুতে ভিজে

জীবনের নতুন তর্পণে।

আকাশ ছুঁয়েছে ভূমি                      সেইখানে আমি তুমি

কল্পনার খুঁজে ফিরি দেশ

নিজেরই প্রেমের মধু                      চেখে নেব শোনো বঁধু

ওড়াব হাওয়ায় নিজ কেশ।

আমাদের মনপ্রাণ                         গাবে যে মুক্তির গান

দেহঘরভাঙা আত্মসুরে

আধো আধো স্বর ভুলে                   হাওয়ায় হাওয়ায় ফুলে

পূর্ণ হবো দূরে বহু দূরে…

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close