Home অনূদিত কবিতা ধূসর পাণ্ডুলিপি >> এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের একগুচ্ছ নতুন কবিতা [গুচ্ছ-২]

ধূসর পাণ্ডুলিপি >> এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের একগুচ্ছ নতুন কবিতা [গুচ্ছ-২]

প্রকাশঃ October 17, 2017

ধূসর পাণ্ডুলিপি >> এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের একগুচ্ছ নতুন কবিতা [গুচ্ছ-২]
0
0

ধূসর পাণ্ডুলিপি >> এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের একগুচ্ছ নতুন কবিতা [গুচ্ছ-২]

সামতান রহমান >>

কম্রভাস

অজস্র পাখি এক,

এইখানে বসো, উড়ালের থাকলে

তোমাকে উড়ে যাক।

যে বাসাইগাছ, জন্মে যাচ্ছে

তার ত্রিদিকডালে, তোমার থাকা

 

পানি খেলে, মরে যাও

বাতাস নিলে, ঝোড়ে যাও

তাকালে, চোখের ভেতর দিয়ে

তীর্থযাত্রীরা যত পাপ ধুয়ে নেয়।

 

জল ও বাতাস, উপযোগী হতে গেছে

তোমার গূঢ়ত্ত্ব জানা সমযোগ-

একটি সামান্য কথায়,

যে বলবে, তার, বলার বয়স আসন্ন

যে বলছে, তার, মুখ তৈরি প্রায় শেষ।

 

অনেক ভাষা, চেয়ে আছে

লুপ্তভাষা কত, তাদের কথাও হবে,

নীরবের হস্তলিপির জন্য বেশধ্বনিবিদ

সাদা পৃষ্ঠা মুছে নিয়েছে রঙে।

 

মান্তলবাসি

– এত উঁচু! ছবি এঁকে উঠলাম…

 

– ওঠার পরে?

 

– যদি না নামি?

 

– নেমে যাওয়া উঠে যাবে!

 

– এই যে কত অর্ধারোহী, ভাসারোহী জিরিয়ে নিচ্ছে একটা জীবন, উঠতে না পারা গাছের ছায়ায়!

 

– এমনকি ছায়াপোড়া এই মান্তলবাসির সেইসব গাছেরা, বাগান নিয়েছে কবে!

 

– যে আঁকতে জানে, সে বাগান করে দেবে…!

 

দেবাশীষ মজুমদার >>

গোপন

সাদা অ্যাপ্রোনে রোদ মেখে

হেরেমের নর্তকীর ঘামের মতন

বাঁক ঘেঁষে গড়িয়ে

গড়িয়ে

নেমে

যাচ্ছে

 

বিকেলের দিকে নোনতা দুপুর

 

শরীর তাকে এনেছে টেনে

গুমসুম পরে আছে একলা ফাঁকা ঘর

 

নবধারাজল, কল্পিত নীপবন

আকাঙ্ক্ষার তীব্রতায় শুকিয়ে মরুভূমি

 

ছুঁয়ে দেখো, ওর  জ্বর, ভীষণ জ্বর

 

নাগরিক

একটা মুনিয়া এ আঙুল সে আঙুল ঘুরে ধীরে

ধীরে উঠে আসছে বুকের খাঁচায়। আঁধার হবার

জন্য যে সমস্ত জিকির তল্লাটে, তাদের এড়িয়ে

শেখাচ্ছ উড়াল সংগীত; পাখিটা উড়ছে-

 

মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা ছাড়িয়ে

বিস্ময় উড়ছে, ঘাপটি মেরে কোথাও দাঁড়িয়ে রয়েছে

অদৃশ্য শিকারি অনচ্ছ, বহ্নি উড়ছে

 

ভ্রমণ শেষে জানতে এলে আনন্দ কোথায়, ছোট্ট

মুনিয়া এ আঙুল সে আঙুল ঘুরে ধীরে ধীরে

উঠে এসেছে ফের বুকের খাঁচায়

 

আনন্দের প্রতীক্ষা তার কিছুতেই ফুরাচ্ছে না

 

আনিনা তাহিন নেভিলা >>

আর্নেস্ট তোমাকে

 

একশো তলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিলো লোকটা

সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে; পাথর হয়ে উঠেছিলো পা-

এক দুই করে একশো তলা! কে বলেছিলো যেন-

মুখোমুখি শূন্যতার গর্ভে বসে কাঁদে তার প্রেমিকারা।

 

ছেঁড়ে যাওয়া, অথবা আসার একশো ফলকে

চোখা ঠোঁট মাছের আকস্মিকতায়,

গেঁথেছিল চুম্বন সহবাসের ফ্যাকাসে উন্মাদনায়!

ষাঁড়ের পিঠে বিদ্ধকারী তীক্ষ্ণধার ফলা- রক্ত ঝরায়…

রক্তের উষ্মায় বেয়ে পড়ে অনুতাপহীন ক্ষুধা, যাতনা,

কেবলি তপ্ত শ্বাসে গুলে যায় একশোটি দিনের বারতা।

 

জ্বলন্ত অক্ষর ঘিলু খুলে খায় মস্ত সন্দেহ রাত-

কে তাকে তাড়ায়? চলন্ত পাখার ঘূর্ণিপাক ডাকে;

এমনকি তুলে নিয়ে যায়, ঘুড়ির লেজে বেঁধে

অসীম শূন্যতায়। সূতো কাটা নখরে খুবলে আনন্দ পায়

ত্বকের নিরামিষাশী মৃত আবেদন। তৃষ্ণা মেটায়।

 

কথা খুলে রেখে দেওয়া হাত, তুলে নেয়- বারুদ,

কপালের শিশির শীতল নলে, দূরবীন মগজ কাঁদে।

কেঁদে পালক হয়; মদের টেবিলে, লোহার জানালায়,

রোগীদেখা রোদের অববাহিকায় গলে যাওয়া ফলে।

বার বার উঠে যায়- নিজেকে পাঁজাকোলা করে

লোকটি ঝাঁপ দেয়! কোথায়! কিসে! প্রতিরাতে…

 

মাঝে মাঝে গোরের মতো শীতল মেঝেতে শুয়ে

আঁকি রঙ মৃত্যু পরবর্তী শোকের।

যারা ভালোবেসেছিলো বুকের শূন্যতায়

নব নব আবেগী আশ্রয়, শুশ্রূষায়-

গাছের কাঠামো সমেত ছায়ায়, ওভাবেই আছে-

 

মর্গের রুহানি ছায়ায় বুক ফাড়া হলে-

তারা কি নেবে জর্জরিত পাথরের ভার!

সভা থেকে এক জোড়া চোখ, ছুটবে কি

ফিরতি ট্রেনে কোন এক চিবুককে ভালোবেসে?

ছেঁড়া হলে শখের নরম ত্বক অচেনা হাতে-

ভেসে উঠবে কি ঠিকানা সেখানে!

কেয়ার অফ নাম! অথবা- এক খানা পথ;

যা কিনা গিয়েছে চলে মাতামহীর পরম কবরে।

 

আমি চলে গেলে,

তুমি চলে গেলে,

আরো যারা থাকে-

থেকে থেকে পঁচে যায় একই ভাবে;

কেউ হয় জৈব সার-

মৃত্তিকার জঠরে, কীটের আহারে;

বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে সেই আদিরসমিশ্রিত –

তরল ক্ষুধামন্দা নিয়ে-

সত্যকে নজরবন্দি করে, সীমান্তরেখায়-

মৃত্যুবীজ বুকে নিয়ে অনন্তকাল ক্লান্ত হয় জীবদ্দশায়।

 

প্রেম

‘ভালোবাসা’ একটি বহমান

প্রক্রিয়া।  বৈতরণী কলের

গানের মতো ভাসিয়ে নিয়ে

চলা- একাধিক হুজরায়।

কোথাও বা জল- আনন্দের,

কোথাও বেদনার বেদুইন

পথে। কোথাও বা ধাবমান

ধূলিঝড় শুধু! অবারিত

কল্পনার গাছ বেয়ে নেমে

আসা আয়ুষ্মতী ঝাড়ফুঁক

দীর্ঘশ্বাস। যার কোন প্রমাণিত

নাম নেই!

 

কেবল, অভাববোধ একখানা

দুরবিন কাঁচ ভাবনার। যা কিছু

নড়েচড়ে বুকের ভেতর, হাত

দিয়ে যায়না তো বোঝা!

ভোরের শুরুতে যে কাঁদে

মিনারে দাঁড়িয়ে, ভেজা

কাকের আর্দ্র পালকের মতো।

কি সেই প্রেম- সেও কি

জানে? যায় না যা দেখা,

ছোঁয়া, শোনা, ঘ্রাণে ও স্বাদে-

কি তাঁর মানে! সেও কোন

প্রবাহিত অজানা অনুভবে

বোধ করে টগবগানো রক্তের

বেলাল্লাপনা।

 

ভালবাসা- শিখিনি আজো!

শিখিনি ভালো’র মানে। কাছে

গেলে দেখিনা যাকে, দূরে

গেলে কাঁদি অনন্ত টানে!

অবিরাম বৃষ্টির মতো ঝরে

গিয়ে মৃত্তিকাগর্ভে, গাছ হয়ে

উঠি ভোরে। অসমাপ্ত গল্পের

মতো- ভালোবাসা- চলমান

প্রক্রিয়ায় একখানা ক্রিয়া পদ

হয়ে বাঁচে

 

মনিরুল মিরাজ >>

শিমুল তুলার দিন

এই একটা একটা আমি যেন

একটা একটা শিমুল তুলার

দিন—

আমাদের দূরতম মাঠে,

 

বিকেলের মেঠো রাস্তা হেঁটে

গেছে—

ফুরানো ঋতু, পোটলা সমেত

দূরে আবছা দেখা যায়। এখানে হসন্ত

 

আমরা একাকিত্বের বসন্ত,

পাহারায় দেখি—

শব্দ ও শব্দ ও নিঝুমতায়,

ঘরের দিকে ফিরে আসে

শোকাতুর চোখ,

সান্তনার দিনগুলা আতা

গাছের নিচে, করে ঝুলঝুল

 

আমরা দূরতম মাঠে—

 

শুনি আরো দূর সাইরেন,

পাখিদের ডানার স্মৃতি

 

কোথাও পৌঁছাতে পারিনি

দেরি হয়ে যায়, দেরি হয়ে

আছে

 

হলদে পাখির দিন।কাপলা

গাছ। পাতাহীন

মিলে যাওয়া আর ফিরে

পাওয়া

আমতা হাওয়ায় এলানো হেতু—

আমাদের হাতে ঢের, সময়

পড়ে আছে।

 

পাখির চোখে কাল

আমরা ধরো বুঝে নেই—সবুজ

ধান ক্ষেত

আইল বেঁয়ে একটু পর পর,

একা একা কলমি

আমরা ধরো সমান্তরাল, দৃষ্টি

নিক্ষেপ

 

এক জোড়া পা দূরে হাঁটে,

আমরা হই দূরে দূরে—

আলগা বিভ্রান্ত—বসন্ত-

আরাম

আমরা হই আলগোছে চলে

যাওয়া, আগন্তুক গরম

 

একটু সহজ নদী

একটা নদী পাতা। একটা নদী

অনেকগুলো, একটু সহজ

ঠোঁটের কোণে আঁকা

 

ঘর বাঁধা এক পাখির নখে ভরে

আসে দল

আইল বেঁয়ে যে কলমি গাছ

তার

একই ঋতু, আইল ধরে হাঁটা—

পাখির চোখে কাল

 

সবুজ ধান ক্ষেত, দোলো,

ঢেউ-সবুজ আশকারা

সমান্তরাল দৃষ্টি শেষে, না

হলেও কৌণিক—

শীতল পাটি, পাশাপাশি চোখ

জোড়া।

 

চৌধুরী ফাহাদ >>

দ্বৈত জীবনের নৈঋত কথা

একটা সন্ধ্যাঠোঁট রাতের চিবুক ছোঁবে বলে ছায়াকে আঁধার চেনায়!

কেবল রাত জানে কতটা দ্রুত ফেরি করে এসেছি সময় ও ঘুম!

আর ফিরতেই জীবনকে পেরিয়ে যেতে দেখেছি এইসব তারার আকাশ…

শব্দের শব্দ ভেঙে হরেক পদের রাত ডাকছে-

ওপাড়ার গন্তব্যঘরে!

পার্থিব বেদনার কপাটে সিলগালা করে রপ্ত করছি

রাতদের রাতে চলে যাওয়া…

ফিরতেই সময়কে পেরিয়ে যেতে দেখি হৃদয়ের টার্মিনাল!

দৃশ্যের ব্যারিকেডে মেঘপাত্র রেখে

যে দিন গেছে চলে পথে অন্ধকার পথ,

স্রষ্টার চোখ রেখে

তাদের নামেও তুলে রাখি সেইসব সৃষ্টির রাজতিলক..

আর ঈশ্বর!

এইসব রাতপোড়া জোছনার ছায়াঘন মায়ার খামে বসে লিখে চলেন

দ্বৈত জীবনের নৈঋত কথা…

 

দিনিলিপি

রবি বার আসলে ড্রয়িং নিয়ে বসি…

পেন্সিল থেকে উঠে আসে রক্ত, কালিতে কালো মৌল প্রাণের অর্থ!

এখানে ইরেজার বলে কিছু নেই-

ছুটির রঙ নিয়ে আয়েশি শরীর দেবে যেতে থাকে ভেতরে আবার!

 

আতা ফল রঙা বিকেলের দিকে চেয়ে চেয়ে সোমবার কিছু কাজকর্ম হয়…

 

মঙ্গলে ভরসা রাখি না বলে জ্যোতিষী রেখে গেছে অভিসম্পাত,

দূর-দূর দৃষ্টি অসুর, জানালা জুড়ে রাত…

বুধবার প্রেমিকার।

 

বিগতের সমবেদনা নিয়ে উঠে ধুনট প্রহর

তাই বৃহস্পতি তোলা থাকে পান পাত্রে…

 

হৃৎমত্ত পথে ঐহিক যাত্রালাপের আগে শুক্রবার আমার ঘুম কিনে নিলেও-

ঘুমের জন্য আরাধনা চলে সারারাত!

পাশে বসে শনি গুনে বৃত্তাবর্ত ভ্রমণের অভিঘাত…

 

সারাজাত সৌম >>

 

সৌন্দর্য

যেন রোদে ডুব দিয়ে বিড়ালটি

মানুষের আকার পেলো—

আর তুমিও—

লোমে বিলি কেটে পার হচ্ছো

ঘর—

বিছানা—

বালিশ—

তুলোগুলো উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়

আঁচড়ের দাগে—কানের কাছে

এখন ঘুম—

আর অগণিত শিশুরা মুখে স্তন গুঁজে

পাহারা দিচ্ছে মায়ের সৌন্দর্য।

 

বিদ্যুৎ

আমি এখন স্ত্রী ছাড়া আছি—

তিনি অন্য ঘরে জমকালো সোফায়

বিদ্যুৎ বিকিরণ করছেন

যিনি এই মিস্ত্রি—

খুলছেন—লাগাচ্ছেন

সে ধনী—

আমার বান্ধবীর মতো—

খুব জামা কেনার শখ ছিলো তার

অথচ কাল সারারাত তারা কেউই জামা পরেননি!

 

প্রবাল কুমার দাস >>

সিনেমাটিক প্রথম চুম্বন

অগোছালো চুলের মতো উড়ে যাচ্ছে মেঘ,

বৃষ্টির শব্দের ঋণে গলা কাটা যাচ্ছে কুয়োর ব্যাঙের।

চিলের এখন বসন্তকাল; রক্তের মতো সজীব তার ঠোঁট

শত্রুর জঙ্ঘাস্থি পাটকাঠির মতো ভেংচি কাটছে তার দিকে।

ন্যাপথালিন আসক্ত রাত নেইলপলিশকে মুচকি হেসে বলে-

গায়ের রঙে কী গতর নড়ে!

দেশী ব্র্যান্ডের মদের পেয়ালায় অন্তরীক্ষ থেকে নেমে আসে

স্বর্গীয় প্রেমের গন্দম।

মৈথুত রাত জোকাস্টাকে স্মরণ করছে পুত্রস্বামীর দায়ভার এড়াতে;

থীবির বাতাসে যার গন্ধ লেগে আছে লিপস্টিকের মতো।

ভিজে দুপুরের গন্ধ,সলতের মতো জ্বলতে থাকা সূর্য

এশিরিয়া সাগরে তুফান তুফান যুদ্ধ বিকল যন্ত্রের ন্যায় গোঙাচ্ছে।

সিনেমাটিক দৃশ্যায়নের এই তো কেবল শুরু!

অতঃপর লক্ষ থেকে লক্ষান্তরে অদৃশ্য হবে দৃশ্যপটের প্রথম চুম্বন।

আমাদের প্রথম অগ্নিমরণ।

 

বধির মন্দিরায় বৃহস্পতির রঙিন কষ্ট

 

দ্রাক্ষা পুঞ্জের ঝলসিত তরলের রঙে গা ভেজায় শানিত শোণিতের চিৎকার।

 

বেহুঁশ পেট্রোলের যৌবনের গন্ধধূপে গা গুলিয়ে ওঠে

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের।

দরজা ভাঙে, হিসহিস শব্দ শোনা যায় সঙ্গমরত সাপের।

বধির মন্দিরা বাজে নিশ্বাসের তালে।

উলঙ্গ চাঁদ ভাসে, তারা খসে আলোকবর্ষের ছায়াপথে বিদ্রোহ করে।

শল্যবিদ বৃহস্পতি রঙিন চামড়ার নিচে প্রৌঢ় প্রেম খোঁজে।

মন্থর পৃথিবী পাতা ওল্টায় ক্যালেন্ডারের

আর করমচার রঙে ঠোঁট ঘষে।

ডিগবাজী খাওয়া কষ্ট তবু তাকে ছুঁতে পারে না।

রিমোট কন্ট্রোলের বোতামে তার দুঃখ আটকে থাকে।

সজিনার পাতায় হলুদ রঙ ধরে গণিকার হাতে ফিকে হওয়া মেহেদির বেশে।

খনিজ সুখ হেসে ওঠে পেটানো শরীরে।

লোকজ রীতিতে যাকে সুশীলেরা নিষিদ্ধ বলে।

নিউজ বুলেটিনে যোগ হয় আরেকটি সুপেয় খবর।

বনরূপার সিঁথিতে পড়ে আরেক পরত কালো সিঁদুর।

বায়বীয় সন্ধ্যায় জীবনের চৌরাস্তায় নেমে আসে গুচ্ছাকার স্বর্গীয় কামরস।

অতঃপর উর্বর মাটিতে বেড়ে ওঠে নীলকণ্ঠের সবুজ চারা

আত্মতৃপ্তির কালো মোড়কে।

 

আশরাফ জুয়েল >>

নিগূঢ় আগুনে

তুমি নেই, ভয় পাই আগুন্তক, বিনিদ্র  সোহাগে,

যোগাযোগ ব্যতিরেকে; প্রত্নতত্ত্ব সন্ধ্যার ফাগুনে,

পুড়ে যাই; ছাই হই- যৌনভাতী আসক্ত ইশারা-

শব তবু, ভেসে চলে বাতাসের নিগূঢ় আগুনে।

 

রতি ঋদ্ধ চোরা পাখি- চরিত্রের কোপন কৌশলে

জেগে ওঠে রাত, বাজে বিহঙ্গের বিশদ নিনাদে।

ধীরে কাঁদে প্রাণ। আমি চতুর্বর্ণ, একলা একাকী,

বহ্নি রেখা বুকে জ্বলে, আকরিক আঘাত বিষাদে।

 

এই শব, জরা দেহে চোলাইয়ের পুরোনো আঁচড়ে-

আশপাশে শুয়ে থাকে একাকীত্বের বিভক্ত মানুষ।

দূর একে পাখি ফেরে জনাকীর্ণ উড়ুক্কু আঁধারে,

ঝড়ে উড়ে ঘর ভাঙে কান্না-ভোজী রঙের ফানুস।

 

মন বনে চির রোগা নিরুচ্চারী আবেগ আদর-

তুমি নেই, শূন্য চাঁদ- অনাদৃত আহত চাদর।

দ্যুতির পেয়ালা

ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি তরল ছায়ার নিকটবর্তী।

কবে দেখা হবে তোমার সুহাসিনী বুকের কুরুশ কাঁটার সাথে?

গোপন মেঘের একাকী সড়ক কবে খুলে বসবে স্বীকৃতির ক্রুশ?

 

বিতর্কের তির্যক তীর অরণ্যের ঘাঘরা ভেদ করে

ঝুলে আছে হন্তারক অশ্রু-আগুনের বুকে।

নি:শ্বাসের উপর শুয়ে আছে শ্বাসের অনানুষ্ঠানিক ছাই।

 

উত্তাপের ডান পাশে জমা বরফ-

শিরা উপশিরায় মদ জাগানিয়া তিরতিরে

জবানবন্দির মতো

 

বসে আছি সে দিনের অপেক্ষায়,

যেদিন প্রাক-সূর্যাস্তের প্রস্তাবিত আকাঙ্ক্ষার মতো

মাটিপোড়া পূর্বপুরুষেরা স্মৃতিধৌত ফসিল হয়ে উঠবেন;

দ্যুতির পেয়ালায় আমি দুরন্ত বাজ।

 

সোম রাতের মোহ

আমি তো পাঠ করি তোর দৃষ্টিসহ্য ফড়িঙ এর স্পষ্ট হরফ-

শরীরের অসংখ্য মরুভূমি- ঝুলন্ত বাগান আর ভাঁজের কারাগার।

প্রবেশের ম্যানুয়াল হাতে আমি খুঁজি সীমান্ত ভাজ্য বিকিরণ রশ্মি।

 

রহস্যের ভেতর আওড়াতে থাকি সোম রাতের মোহ-

আসন্ন ঢেউয়ের দেহে আগুন ঢেলে গুন গুন করে তুই গাইতে থাকিস

ভব্য বালিশ সঙ্গীত- তোর সঙ্গত বুক জুড়ে অচেনা বিউগল।

আমার ঠোঁটের কাছেই ঈশ্বরের মদের দোকান,

অন্তত মাসের শুরুতে আমি ক্রয় করতেই পারি এক পোয়া সুক্ষ্ণচ্ছেদ।

তারপর পুনরুত্থানের আলোয় স্নান করিয়ে তাঁদের মুখে রুয়ে দিতে পারি

পবিত্র পঙতি- কবিতা!

বছরের প্রারম্ভেই কেউ আমার কাছে  ষড়ঋতু’র কবিতা চেয়েছিল।

দিতে পারিনি- আমি তো তোর দেহের পরিতপ্ত ছায়াকক্ষে জিইয়ে

রাখছি আমার সমস্ত শব্দচাবিকে।

 

ওরা একদিন ক্ষেপণাস্ত্রকে বানাবে পাখি

ওরা একদিন পারমাণবিক বোমাকে বানাবে প্রজাপতি-

ছাই হয়ে সেদিন তুই মিশে যাবি আমার অভ্যন্তরে।

 

জব্বার আল নাঈম >>

চার নম্বর মৃত্যু

মানুষের হাতে খবরের কাগজ পৌছার পূর্বেই আমার মৃত্যু হবে

প্রবল বর্ষণের দিনে

ধুয়ে-মুছে যাবে নরকের ঘ্রাণ

টিনের চালে দারুণ বৃষ্টি-শব্দে যখন আহত হবে চর্তুদিক

আনন্দে উদ্বেলিত আমার তৃতীয় স্ত্রী

পরকীয়ায় মজবে

এরপর রাজকোর্টে বিয়ের মামলা করবে

মাইকে মৃত্যু সংবাদের পরিবর্তে-

নির্বাচনী প্রচারণায় নামবে মোয়াজ্জেন

ততক্ষণে আমার সকল উপার্জন ভাতের প্লেটে নিয়ে

খেতে বসবে প্রথম স্ত্রী

 

দ্বিতীয় স্ত্রী গর্ভপাত ঘটিয়ে বলবে

খোদা আমাকে বেশ বাঁচা বাঁচিয়েছে

 

অথচ তিন স্ত্রী মিলে মোট চার বার খুন করল আমাকে!

 

মুহূর্তের কথা

বাতাসের শরীরে পাঁচ হাজার বছর আগের কথারা ধুতি পরে দাঁড়িয়ে আছে। দশ হাজার বছর পরের কথার সঙ্গে মিলিত হবার কোমল ইচ্ছায়। মধ্যস্ততার টেবিলে শুধুই কালক্ষেপণ; অচেনা যুবক দেখছে, শহর ঝুলছে সময়ের বারান্দায়।

একদল পূর্বেকার কথা—সুঁইসুতায় মালা বানিয়ে অনর্গল শুনিয়ে যাচ্ছে বোকা সংসারের চামচাদের। হাততালি আর মুচকি হাসিতে স্বাগত জানায় সভাসদগণ।

অতপর সামনে থাকা সকল পুস্তক আগুনে পুড়িয়ে বারবিকিউ আয়োজন করলাম। পুড়তে থাকল মগজ আর সমালোচকগণ; নগরে উঁচু ঢেউয়ের বিষণœতা। হিসাব শেষে দেখলাম শরীরে বহন করা হাড়ের বয়স বড়জোর পাঁচ হাজারের বেশি নয়!

তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে দেখি মায়ের কক্ষে যিনি বসে আছেন তিনি আমার মা নন; দশ হাজার বছর পরের একজন, না নারী না পুরুষ। বোধে চিমটি কেটে তপস্যার ঘুমে অনাহুত হাত টেনে বললাম, কেবল আমিই মধ্যযুগ

অথচ আগের পাঁচ হাজার বছর আর পরের দশ হাজার বছরের জাঁতাকলে আটকে আছি এখনও। নতুন করে শূন্যতার সমান কিছু ভাবছি…

 

সাজ্জাদ সাইফ >>

সুবিলের ধারে

সবদিকে আঁধার নিয়ে নেমে

আসা স্মৃতির ভিতর তোমাকে

দেখেছি

সুবিলের ধারে;

অস্তগমণের ঠিক আগেকার

সূর্যটি

যেরকম বজায় রাখছে প্রতাপ,

মহাশূন্য প্রচণ্ড বিকারে

কম্পমান ক্রমেই,

অলসতা পেয়ে বসে;

 

এরকম অলসতা ভালো লাগে

স্নিগ্ধতা এসে কি রকম

প্রতিটি গোলাপে টঙ্কার তুলে

দিচ্ছে দেখো!

 

আর যতো দ্যুতিময়

আক্ষেপের গল্প, চিত্তচাঞ্চল্যের

গীতি

আমাকে ডাকেনি আজ

কারো আড্ডায়

 

অতঃপর

পল বেছানো পথের প্রমিতি

হতে

একটি সরু নদী

এঁকেবেঁকে এসে

স্রোত উজাড় করে

ঢুকে যাচ্ছে হৃদয় অভিমুখে;

যেরকমটা চাই আরকি-

একটা পৃথিবী মানুষের

সমস্ত গোলকধাঁধাঁর কাছ থেকে

অব্যাহতি পেয়ে

বারবার ফিরে আসছে বোধে!

 

এক্ষুণি ডুবে যাবে সূর্য;

এইসব গালগল্পের পর

তোমাকে ভাবতে ভালো লাগে

কি যে!

 

মানবতা

মানুষের স্মৃতির কাছে এসে

ইতিহাস খুলে দেয়

গৌরবগাঁথা, রাজদন্ডের গ্লানি;

দিকে দিকে ধসে যায় পাথরের

গম্বুজ, প্রাচীন ক্যাথিড্রাল-

সময় যেন সেই বৃদ্ধ

গ্যালিলিও, গৃহবন্দিত্বের দুপুরে

যার দরজায়

এসে থামে পদাতিক সৈন্য,

গুপ্তহত্যার আগে বুক ধড়ফড়

দ্রুতগামী হয় পৃথিবীর৷

 

এত এত আঁতকে ওঠার ভিতর

মানুষের ফিসফিসানিটুকুও

লটকে থাকছে গাছে, ফুলে ও

সৌরভে!

 

বিভীষিকা তবে এক জ্বর, হাম

নিঃশ্বাস ফুলে ফুলে ওঠে

শিশুদের ফুসফুসে;

এরই মাঝে

পাথরকুচির মতো সংকীর্ন

জন্মের মধ্য দিয়ে উকি দিয়ে

আছে যে অন্ধকার

তারই নাম মানবতা নাকি?

 

আসমা অধরা >>

কথোপকথন

কেমন আছো

বহুদিন পর জানতে চাইলে

 

—–কেউ যে কারো নয় তাই

—–কেউ বলে না, কেমন আছো ভাই?

 

—–তাই হবে হয়তো, মানুষ হয়ে থাকলে ভাবা             যেত। তবু  বলি কেউ যে কারো নাই।

—–তুমি থাকো না হয় একটু।  নাচেনা মতো হয়ে, এই আধমানুষের পাশে।

 

—–চেনা গণ্ডি বড়ই স্বার্থপর।

না চেনাই যে ভালো, পর হয়েও থাকে তবু।

মরে গেলেও কাঁধ দ্যায় তখন। চেনার তবে কী  দরকার?

—–আজকাল বড় কষ্ট দিয়ে কথা বলতে শিখেছো দেখছি!

 

—–পাশেই আছি তো এখন,

আর কষ্ট? ওটা পেতে নেই যে! আমাকেই খুঁড়ে দ্যাখো, কতো কতো লাল কালো দাগ। পুরোনোগুলোতে কালশিটেও পড়েছে খুব।

—–সে সব দাগেই তো আগুন জ্বলে, বিষফলে, বিজলী চমকায়। জলের উদাস আর কোথায় বলে দাও!

 

—–জল কোথায় পাই বলো? এক নিজের চোখ; সেও বেঈমান!

—–কেবলই চোখ ধুয়ে এলাম।

এবার গাই ঘুমপাড়ানিয়া গান।

 

—–ঘুম তো সেই কবেই পর হয়ে গেছে,

যেদিন থেকে তুমি দূরের হলে।

—–আচ্ছা আবার আমায় কি… একটু?

 

—–হাহা, ভালোবাসার কথাই বলতে চাইছো তো? আমি তো ভালোবাসাই ভুলে গেছি, সেই কবে বাসতাম কি বাসতাম না, আর তোমারও যাবার পর যে যুগ ঘুরে এলো!

—–আমার জন্য না হয় এক ছাদ ভালবেসেই দ্যাখো।

 

—–এখন এই যুগে আমার গায়ে রামধনু রঙ, জানো? আমার নোনাজলের হিসেব শুধু আমার চশমার কাঁচটা গুনে রেখেছে! তুমি তো পিছুও ফিরে দ্যাখোনি একবার …

—–আমিও যে চশমার কাঁচে মুছেছি রাত    বিরেতের লালচে নিঃশ্বাস তাও তো কেউ দ্যাখেনি!

 

—–আচ্ছা বলতো, তোমার আঁচিলটা ক্যামন আছে? ওর নাকি খুব একা একা লাগে, তুমি তো জানোনা সেদিন আমায় স্বপ্নে এসে বলল।

—–এবার কিন্তু হারিয়ে যাব তোমার ছায়ার আড়ালে, বন্ধ করে রেখো আমায় আবার। আজকাল তোমার শরীর কাঁচ কাঁচ হয়ে আসে সামনে, ওপাশটাও স্পষ্ট দেখতে পাই; দেয়াল, সুইচগুলো। নেবে তো আমায় ?

 

—–সে তুমি সহ্য করতে পাবেনা যে!

এবারে আমি বদলে গিয়েছি, অতো অবহেলা করে কি মানুষ বাঁচে বলো? তাই মরে গিয়ে আর ফিরে তাকাই নি, এ তো শারীরিক আমি নই, আজ তোমার লালচে কান্নায় নেমে এলাম, তুমি যাবার পরেই যে চলে এলাম, এ জায়গার নাম অচিনপুর!

—–আজ থেকে অনেক বছর আগেই রিপুরা আমার পরাজয় বলে গেছে। আমায় ফিরতে দাও তোমার কাছে আর একবার, কেনারাম বেচারাম সুখে।

 

—–সে পথে কাঁটা বিছিয়ে নিজেই তো চলে গেছিলে। ভোর হয়ে এলো বলে, এর পর আর থাকার অনুমতি নেই, তবে যাই?

—-যাও, আমার মৃত বাতাসের ঈশান অঙ্গীকার নিয়ে যাও। আমি ফিরবোই তোমার ছায়ায়।

 

—–এসো তবে, আমি উত্তর দিশাতেই আছি শেষ রাত অবধী। আজকের পর হয়তো তোমার অপেক্ষা থাকতেও পারে…

 

আদম পাহাড় ও নার্সিসাস

স্নায়ুজুড়ে প্রতিদিন এতো

এতো লৌহশলাকা বুনতে

বুনতে ভোর গুলোকে নিছক

বোকা লাগে। কেবল শরীরের

বেঁচে থাকাকে জীবন বলা

গেলে ফিলসফি ধুয়ে মুছে

যতখানি জল জমা হয়,

তা দিয়ে সৎকার সম্ভব? শিরা

জুড়ে বিষপিঁপড়ের মতো কত

মানুষের মুখ পিলপিল করে

বেড়ায়, যেন এক ব্যস্ত শহর।

অথচ দেখো, চিলের মতো

চক্ষুজুড়ে ক্ষীপ্রতা নিয়ে

তীক্ষ্ণ একটা আঁচড় কাটা

যায় না, বুকের মধ্যে নিজের

কবর নিয়ে যত উড়াউড়ি।

কান্নার উপর কয়েক পরত

হাসি নামের গ্যালভানাইজিং

পড়লে কোনো ক্যানভাসারের

সাধ্য কী তা অশ্রু বলে চালায়,

নির্ঘাত ব্যাবসায় মার খেয়ে

ঠাণ্ডা হয়ে বসে থাকবে।

 

কারো বসে থাকার ভঙ্গি

ভাবতে ভাবতে দেখি

অন্ধকার। যেখানে কবিতার

বুননের সাথে গঠনও বদলায়

ঘনঘন। তখন জন্মচক্রের

ভেতর বাবার আদল ভেসে

ওঠে, নিজের শিরার হাত

ধরাধরি করে বিকেল বরাবর

চলে যাওয়া খুব সহজ তখন।

জিকিরের দানা আঙুলের ডগা

পেরিয়ে যায় একে একে, তবু

সেখানে কারো নাম গেঁথে

দিতে গেলে আত্মার রূপ এতো

চিৎকার করে ওঠে কেন?

 

ও আদমপাহাড়!

বুকে ব্যথা হয়, ব্যথা হয়।

আর সওয়ারী কাতর হলে সে

ঘোড়াকে রুখবে, এমন প্রাণ

কোথায়!

 

এত সব যন্ত্রণা, আচার নামের

অত্যাচার, আর শোণিতের রঙ

পেরিয়ে নার্সিসাস ভর করা

শরীরে সন্দেহ খুব উচ্ছৃঙ্খল

হয়ে ওঠে। যাকে জীবন বলে

জানা যায়, যাকে যন্ত্রণা ভিন্ন

কোন নাম দিতে গেলে কেঁপে

ওঠে সমগ্র, তাকে বর্ণনা করে

করে যে ফিলোসফার হলো

তার নাম কী দেবো ভেবে

আবার হাসি পায়। জীবন

আসলে ব্লু হোয়েল,

স্নায়ুজুড়ে নিজের ছবি এঁকে

বদলে দেয় রক্তপ্রবাহের ধরন।

 

আর আদমপাহাড়,

তোমার বাহুমূলে খুব খঞ্জর

তোমার নাসারন্ধ্রে খুব

সায়ানাইড

তোমার বুকে ভালোবাসা

নামের প্রচ্ছন্ন প্রহ্লাদ

 

জীবন, স্নায়ুজুড়ে বুনে চলো

লৌহশলাকা, শোনিতের বনে

তবু মরচে রঙের ফুল

ফোটেনা, এত আকাল!

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close