Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ৩
0

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ৩

প্রকাশঃ December 13, 2016

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ৩
0
0

নওশাদ জামলি / লঙ্কাপুরীর দনিরাত্তরি ৩

দুই ঘণ্টার কেনাকাটা

ভারত মহাসাগরের অতল ঠিকানায় সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে। একে একে জ্বলে উঠছে কলম্বোর নিয়ন আলো। ঝলমল করছে রাস্তা, সৈকত, শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো। গল ফেস গ্রীন থেকে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি পুরাতন পার্লামেন্ট ভবনের সামনে। কাছেই বাস স্টপেজ। শহরের বাসগুলো স্টপেজে থামছে সুশৃঙ্খলভাবে, যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে আবার। কোনো ফ্যাসাদ নেই। হেলপারদের চিল্লা-চিল্লি, হাঁকডাকও নেই। পাশেই বেশকিছু খালি টুকটুক যাত্রীর আশায় দাঁড়িয়ে। তেমন ভিড়ভাট্টা নেই। ফলে সহজেই মিলল টুকটুক। আমরা এখন যাবো ওডেল শপিং সেন্টারে; কলম্বোর বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর এটি, শপিংয়ের জন্য যার নামডাক খুব।

odel2
কলম্বোর রাজপথ

শ্রীলঙ্কায় আসার আগে দেশটি সম্পর্কিত কয়েকটি বই পড়ি, পাশাপাশি প্রচুর সময় ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাটি করি, তাতে একটা চমৎকার ধারণা তৈরি হয়। শ্রীলঙ্কায় কোথায় থাকব, কোথায় ঘুরব, মোটামুটি ট্যুর শিডিউল করা হয়ে যায়। ভ্রমণের শিডিউল তৈরি করেছে ঊর্মি। কলম্বোর সেরা শপিংমল কোনটা, ঊর্মি নেট ঘেঁটে আগেই জেনে নিয়েছে। ভেবেছিলাম ওডেলের কথা ভুলে যাবে। শপিংয়ের কথা কি আর ভুলে থাকা যায়, গল ফেস দেখার পরই ঊর্মির তাড়া- মার্কেটে চলো! কিছুক্ষণ গৌতম বুদ্ধের মতো মৌনব্রত অবলম্বন করি। অবশ্য তাতে লাভ হয়নি কিছুই।

গল ফেস গ্রীন থেকে বেশি দূরে নয় ওডেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই মার্কেটটির সামনে। ঢোকার মুখেই দেখি সুউচ্চ ক্লক টাওয়ার। সাদা ধবধবে মিনার, তার মাথায় ঘড়ি টানানো। নান্দনিক স্থাপনা বটে। গাছপালা ঘেরা বড় আকারের মার্কেট। সেটাও সফেদ রঙের। মার্কেটের ভবনটা পুরনো আমলের। তবে ভেতরে ঝলমল করছে পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিক সব শপিং সম্ভার। কী নেই তাতে? এক ছাদের নিচে নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষের কেনাকাটার অপূর্ব সমাহার।

শপিং নিয়ে আমার কোনো তাড়া নেই, তেমন আগ্রহও নেই। ঊর্মি ও বাঁধন ঢুকেছে ওডেল-রাজ্যে। মার্কেটের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি দেখছি রাতের কলম্বো। রাস্তা লাগোয়া মার্কেট, সামনের ফুটপাতে কোনো দোকান নেই। ভিখারিদের উৎপাতও নেই। মানুষের গা-ঘেঁষাঘেষি ভিড় নেই। ফুটপাত যেমন পরিচ্ছন্ন, রাস্তাও তেমনই। রাস্তা ভাঙা, এবড়ো-খেবড়ো নয়। কোথাও খোঁড়াখুড়িও নেই। ঢাকার রাজপথে সন্ধ্যা মানেই অসহনীয় যানজট, কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পিপিলিকার গতিতে ছোটে বাস, টেম্পু, সিএজি, প্রাইভেট কার, রিক্সা; কলম্বোতে ঘোরলাগায় সন্ধ্যায় বিখ্যাত একটি মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি- ছিটেফোঁটা যানজটও নেই। শ্রীলঙ্কায় লোকসংখ্যা খুবই কম; ঢাকার মিরপুরে যত মানুষ থাকেন, গোটা কলম্বো শহরে তত মানুষ নেই। মিরপুরের জনসংখ্যা কত হবে? ১৫ লাখ, ২০ লাখ? জানা যায়, বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি। অন্যদিকে গোটা কলম্বো শহরের জনসংখ্যা ৮ লাখের মতো!

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত জনসংখ্যা, তা নিয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই। ঢাকার রাস্তায় যাঁরা চলাচল করেন, নিশ্চয়ই তাঁরা বুঝতে পারবেন অতিরিক্ত জনসংখ্যা কাহারে কয়? ফুটপাত, রেললাইন, বস্তি, কাঁচাবাজার, আবাসিক এলাকা, মার্কেট, টার্মিনাল, বাণিজ্যিক এলাকা- চারদিকে মানুষ আর মানুষ। গোটা ঢাকা শহরই যেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভা! আয়তন ও অবকাঠামো অনুযায়ী ঢাকার জনসংখ্যা হওয়া উচিত ছিল ৩০ লাখ, তাহলে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারতেন। সুস্থ্য ও স্বাভাবিকভাবে বাস করতে পারতেন, ঠিকভাবে নাগরিক সুবিধাও পেতেন। ঢাকার লোকসংখ্যা এখন প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি। ৩০ লাখ মানুষের অবকাঠামো দিয়ে কি দুই কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করা যায়?

ভয়াবহ ভিড়ের দেশে দুটির বেশি সন্তান নেওয়াটা অসভ্যতা, বর্বরতা! আমরা কবে সভ্য হবো, কবে? ‘লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তি’র লেখাটি পাঠ করতে যদি ১ ঘণ্টা সময় নেন, তাহলে এরই মধ্যে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করবে ৪৮০টি শিশু! প্রতি মিনিটে জন্ম নেয় ৮টি শিশু। একঘণ্টায় ৪৮০টি শিশু জন্ম নেয় বাংলাদেশে; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কি তাহলে খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থানের যথাযথ ব্যবস্থা করতে পারব? ঢাকা মহানগরে নাকি প্রতিদিন মানুষ বাড়ছে ১ হাজার ৪১৮ জন। তাহলে বছরে ঢাকায় মানুষ বাড়ছে পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ৫৭০ জন!

তুলনা ঠিক নয়, তারপরও কীভাবে যেন তুলনা চলে আসে ঢাকা ভার্সেস কলম্বো। কলম্বো ছিমছাম, নিরিবিল, যানজটমুক্ত- তার প্রধানতম কারণ জনসংখ্যার আধিক্য নেই। ঢাকায় যত কোলাহল, ভিড়ভাট্টা- তার প্রধান কারণই হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা। বিশ্বাস করবেন কিনা কে জানে, দৃঢ়ভাবে বলি ঢাকাকে বাঁচাতে আরেকটি নতুন ঢাকা গড়তে হবে। নতুন দিল্লির মতো হতে পারে নতুন ঢাকা। সেটি ঢাকার উপকণ্ঠে পদ্মার তীরে হতে পারে না কী?

ঢাকার মহাসমস্যার কথা ভাবতে ভাবতেই মোবাইল বেজে উঠল তারস্বরে। ঊর্মি ফোন করে বলল, তাড়াতাড়ি আসো, জামা পছন্দ হয়েছে তোমার জন্য। সুবিশাল মার্কেট ওডেল, ঊর্মিকে খুঁজে পেতে ঘুরতে হলো কয়েকটি ফ্লোর। চারদিকে প্রচুর কেনাকাটার সামগ্রী। থরে থরে সাজানো সব। তৈরি পোশাকের বিশাল ভাণ্ডারের জন্য ওডেলের ব্যাপক খ্যতি। শুধু তৈরি পোশাক নয়, স্পোর্টস, ডিলাইট, সুগন্ধি ও প্রসাধনী, বই, সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের অ্যালবাম- ডিভিডি, জুতা, হাতব্যাগ, জুয়েলারি, লাগেজসহ আছে নানা সামগ্রী। এ ছাড়াও আছে বৃহৎ কিডস কর্নার। আছে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা। একটি ফ্লোর জুড়ে শুধুই নানা জাতের চা ও কফির সম্ভার। সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার!

odel
ওডেল ডিপার্টমেন্টাল স্টোল

গোটা মার্কেটে প্রচুর টুরিস্ট। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি ইউরোপ-আমেরিকান প্রচুর। চাইনিজ, জাপানিরাও কেনাকাটা করছেন দেদার। নিজের জন্য নিই শার্ট, গেঞ্জি। বাঁধন কেনে গেঞ্জি, প্যান্ট। ঊর্মি কেনে কয়েক সেট গহনা, ব্যাগ, জামা। তার বোনের মেয়ে আমীরাহর জন্য কেনে জামা। পাক্কা দুই ঘণ্টা ওডেলে কাটিয়ে বুঝতে পারি, আমাদের সঙ্গে নেই অঢেল ডলার!

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close