Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৪]
0

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৪]

প্রকাশঃ December 21, 2016

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৪]
0
0

হনুমান সেতু ও অন্যান্য 
ওডেল থেকে বের হতে হতেই রাত ৯টা বেজে গেল। এখন ফিরতে হবে কলম্বোর পাশেই মাউন্ট লাভিনিয়ায়, অস্থায়ী আস্তানায়। মার্কেটের সামনেই পেয়ে যাই টুকটুক। রাতের কলম্বো দেখতে দেখতে আমরা যখন মাউন্ট লাভিনিয়ার দিকে যাচ্ছি, তখন মনটা ভার ছিল বাঁধনের। অল্পদিনেই শ্রীলঙ্কাকে বেশ ভালো লেগেছে তার। বিমানের ফেরার টিকেট কাটা হয়ে গেছে আগেই, ঢাকা ফিরেই পরের দিন চাকরি ভাইবাতে অ্যাটেন্ড করবে। মাত্র তিন দিনের জন্য এসেছিল, রাত পেরোলেই ভোরের মিহিন লঙ্কার বিমানে দেশে ফিরবে।
শ্রীলঙ্কা ট্যুরে এখন পর্যন্ত সবকিছুই হয়েছে ঠিকঠাক। তবে একটা বিষয় মেলেনি পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে। তৃতীয় দিনে ঠিক করেছিলাম, ঊর্মি তার সেমিনারে যাবে, আমি আর বাঁধন যাবো এডামস পিক দেখতে। বাঁধনের শ্রীলঙ্কা আসার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এডামস পিক দেখা- হযরত আদম (আঃ) পা মোবারকের পবিত্র চিহ্ন দেখার খুব ইচ্ছা তার। শ্রীলঙ্কায় এসে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি- এডামস পিক দেখতে যেতে প্রায় একদিন লেগে যাবে, আসা-যাওয়ায় দুদিন কাবার; অগ্যতা এডামস পিক দেখার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হলাম!

111
মাউন্ট লাভিনিয়া এসে আমরা থামি বার্গার কিংয়ের সামনে। বার্গার কিং ফাস্ট ফুডের দোকান। দুয়েকবার খেয়েছি; বার্গার যেমনটা হয়, পরিচিত স্বাদ। শ্রীলঙ্কান খাবার বেশি পছন্দ হয়নি বাঁধনের, খাবার নিয়ে সে এক্সপেরিমেন্ট করতে রাজি নয়, এ ছাড়াও রাত ২টার দিকে রওনা হবে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, ভোর ৬ টায় তার প্লেন ছাড়া কথা। ফলে ফুড-এক্সপেরিমেন্ট স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
ঊর্মি বলল, বার্গার কিংয়ে তো খেয়েছি কয়েকবেলা, এবার চলো কেএফসিতে। শ্রীলঙ্কান কেএফসির স্বাদ নিতে হবে।
বার্গার কিং থেকে খানিক দূরে কেএফসি। দোতলায় বড় স্পেস নিয়ে এ রেস্তোঁরা। এককোণায় বাচ্চাদের খেলার ঘর, বাংলাদেশেও দেখেছি সেটা। পরিচিত খাবার অর্ডার করি। ফ্রাইড রাইস, চিকেন, ভেজিটেবল। সঙ্গে কোমল পানীয়। খাওয়া শেষে রাত ১১টার দিকে আমরা হাঁটতে হাঁটতে ফিরি হোটেলে। কেএফসি থেকে কাছেই হোটেল। রাস্তায় তেমন মানুষ নেই। মাঝেমধ্যে শো করে ছুটে যাচ্ছে টুকটুক কিংবা প্রাইভেট কার। ছিনতাইয়ের শিকার হবো না তো- মনে কুডাক শুনি। আনন্দের কথা শ্রীলঙ্কার রাস্তায় কোনো সমস্যা হয়নি। গোটা পরিবেশই খুব পর্যটক-সহায়ক।
তিনজন এসেছিলাম শ্রীলঙ্কায়, রাত ২টার দিকে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হবে বাঁধন। বাকি দিনগুলো শ্রীলঙ্কায় থাকব আমরা দুজন। সকালে কাজ আছে বেশ কিছু। নতুন একটা হোটেলে উঠব, সেটিও মাউন্ট লাভিনিয়ায়। সেদিন একফাঁকে হোটেল বুকিং দিয়ে এসেছি, একনজর দেখে এসেছি। ঠিক যেন হোটেল নয়, বাংলো টাইপ বাড়ি। তিনতলা বিশিষ্ট গাছগাছালি ঘেরা যেন এক বাগানবাড়ি। হোটেলটির নাম আইভরি ইন।
কেএফসি থেকে রাতে খেয়ে আমরা এলাম হোটেলে। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে শরীর ক্লান্ত। ব্যালকনিতে বসে আছি উদাস হয়ে। সমুদ্রের বাতাস এসে উড়িয়ে দিল সমুহ ক্লান্তি। বাঁধন ঘুমাবে কিছুক্ষণ, তারপর রাত ২টার দিকে রওনা হবে এয়ারপোর্টে। ঊর্মি ল্যাপটপে বসে কাজ করছে সেমিনারের। আমার তেমন কাজ নেই। রুমে এসে শুয়ে শুয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ি। শ্রীলঙ্কার নানা টুরিস্ট আকর্ষণ নিয়ে ম্যাগাজিন। হোটেলে ওঠার পর রুমে এ ম্যাগাজিন দিয়ে গেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। পর্যটক আকর্ষণের জন্য দেশটির কত উদ্যোগ, কত পরিকল্পনা- পর্যটন শিল্পে তুমুল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা।
শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, ঐতিহ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে। দেশটিতে যদি গৃহযুদ্ধ না থাকত, ধারণা করি এশিয়ার আরেক সিঙ্গাপুর হতে পারত শ্রীলঙ্কা। গৃহযুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে দেশটির। ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে উঠছে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে জেগে উঠছে রাবণের দেশ।
ম্যাগাজিনটির কাগজ উন্নত মানের, ছাপা ঝকঝকে। তাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার বরাত দিয়ে ছাপা হয়েছে দারুণ একটি খবর। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাঝের সমুদ্রে তৈরি হবে  সংযোগ সেতু। দুই দেশের মধ্যে দূর হবে বিচ্ছিন্নতা। সংযোগ তৈরিতে নির্মাণ করা হবে পৌরাণিক যুগের সেই ‘হনুমান সেতু’। রামায়ণ অনুসারে সীতাকে উদ্ধারের জন্য লংকায় অভিযান পরিচালনা করেন দেবতা হনুমান। কথিত আছে সাগরে পাথর ফেলে তৈরি করা হয়েছিল একটা মজবুত সেতু। পৌরাণিক সেই সেতু দিয়েই লঙ্কায় প্রবেশ করেছিলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ।
পুরাণের ঘটনা যদি বাস্তবায়িত হয়, সেই সেতু যদি আবার নির্মিত হয়, তবে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে তৈরি হবে নতুন একটা যোগসূত্র। জানা যায়, ভারত ও শ্রীলঙ্কার সরকারপ্রধান এ সম্পর্কে একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেবতা হনুমানের তৈরি সেতুর ঐতিহ্য অনুসরণে ভারত মহাসাগরের উপর তৈরি হবে হনুমান সেতু। সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ৩০ কিলোমিটার। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এ সেতু নির্মাণ অসম্ভব কিছু নয়।
কিছুক্ষণ পড়াশোনার পর আমি আর ঊর্মি হোটেলের ব্যালকনিতে বসে থাকি আনমনা হয়ে। সামনে ভারত মহাসাগর, সমুদ্রের অনেক ভেতরে কয়েক বিন্দু আলো কাঁপছে তিরতির করে, রাতের রহস্যময় আলো-আঁধারিতে তা যেন রূপ নিয়েছে জাদুর গোলকে। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস আসছে হালকা পরশ নিয়ে, দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়- সত্যিই শ্রীলঙ্কা এক মায়াপুরীর দ্বীপ।
কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে বাঁধন এখন বেশ ফুরফুরে। লাগেজ গুছিয়েছে, তৈরি হয়েছে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। ঠিক রাত ২টার দিকে গাড়ি এলো তাকে নিতে। আমরা যখন তাকে বিদায় দিই, আমাদের বেশ খারাপ লাগছিল। এয়ারপোর্টে ৪টার মধ্যে পৌঁছালেই হবে। আশা করি ১ ঘণ্টার মধ্যেই সে পৌঁছে যাবে। মিনিট ৪০ পরে ঊর্মি ফোন করে বাঁধনকে। একবার নয়, কয়েকবার; অদ্ভুত বিষয় ফোন রিসিভ করেনি সে। অজানা শঙ্কা ভর করে আমাদের মনে! মাঝরাতে রাস্তায় কোনো ঝামেলা হলো কিনা, ছিনতাইকারীর হাতে পড়ল কিনা- খুব দুর্ভাবনায় পড়ে যাই আমরা। মিনিট দশেক অপেক্ষা করে আবার ফোন করে ঊর্মি। এবারও ফোন রিসিভ করেনি সে, চিন্তায় আমাদের তো হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম!
উচ্চস্বরে চিল্লাচিল্লি করে উর্মি বলল, তোমাকে বলেছিলাম, বাঁধনের সঙ্গে যেতে। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারতে। তাই না?
প্রতিউত্তরে আমি তাকে বলি- বাঁধনের সঙ্গে আমি যেতে চেয়েছিলাম এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। সে বলল একাই যেতে পারবে।
ঊর্মির চোখমুখে রাজ্যের টেনশান। মাঝরাতে কোথায় যাব, কীভাবে খোঁজ নেব- চিন্তার জাল আচ্ছন্ন করে আমাকেও। তারপরও ঊর্মিকে অভয় দিয়ে বলি, হয়তো গাড়িতে সে ঘুমিয়েছে। মোবাইল সাইলেন্ট করা আছে। ঠিকই জেগে উঠে ফোন করবে। ঠিকমতোই পৌঁছাবে।
আমার কথায় কিছুটা শান্ত হয়ে ঊর্মি বলল, তুমি তো ড্রাইভারের ফোন নাম্বারটাও নিতে পারতে? সেটাও করনি।
এবার তাকে বলি, সেটা ঠিক। তবে ড্রাইভার তো হোটেল কর্তৃপক্ষের। ফলে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। সহজেই ড্রাইভারের নাম, ফোন নাম্বার সব খুঁজে বের করা যাবে।
বাঁধনের অবস্থান খুঁজতে, ড্রাইভারের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করতে আমরা যখন হোটেল রিসিপশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই বেজে উঠল ঊর্মির ফোন। অতঃপর ফোন করেছে বাঁধন। আমাদের দীর্ঘক্ষণ টেনশনে রাখার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না তার। গাড়িতে ঘুমিয়েই পড়েছিল সে। ভুলে মোবাইল ছিল সাইলেন্ট করা। ঘুম থেকে জাগল এয়ারপোর্টের সামনে এসে, তখন দেখে তার মোবাইলে ৯টি মিসড কল!

[চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close