Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৫]
0

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৫]

প্রকাশঃ January 1, 2017

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির [৫]
0
0

গল ফেস সৈকতের পাশেই দাঁড়িয়ে পৃথিবীসেরা গল ফেস হোটেল। একদম সমুদ্রঘেঁষে হোটেলটির অবস্থান, মাউন্ট লাভিনিয়া হোটেলও সমুদ্রের কাছে, তবে এতটা কাছে নয়। গল ফেস সৈকতে ঘুরতে ঘুরতে হোটেলটি দেখেছি কয়েকবার, সামনের রাস্তা দিয়েও আসা-যাওয়া করেছি দুয়েকবার। একদিন বিকালে কিছুক্ষণের জন্য দেখে আসি ইতিহাসখ্যাত গল ফেস হোটেল। হুমায়ূন আহমেদ ও শাকুর মজিদ হোটেলটির তারিফ করেছেন, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন। কবি মুজিব মেহেদী শ্রীলংকায় এসে অতিথি ছিলেন এ হোটেলে, তাঁর ফেসবুক স্টেটাসে খুব প্রশংসা করেছেন হোটেলটির। শুধু তাঁরা নন, পৃথিবীর অনেক লেখকই লিখেছেন হোটেলটির কথা।

ঊর্মি তার সেমিনার নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও ফোন করি- গল ফেস হোটেলটা দেখতে যাবো। আমার সঙ্গে যাবে?
বিকালের মলিন আলোয় তখন আমি গল ফেস সৈকতে দাঁড়িয়ে। খানিকটা সামনেই সেই গল ফেস হোটেল; ঊর্মির সেমিনার হচ্ছে যেখানে, সেই গালাদারি হোটেলটাও সৈকতের পাশেই। নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে তাকে বলি- তোমার সেমিনারের যদি সমস্যা না হয়, তাহলে চলে আসো সৈকতে।

galle-face-hotel-01
রাতের গল ফেস হোটেল

ঊর্মি বলল, ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। তখন সেমিনার শেষ হবে।
সেমিনার শেষে সেদিনের জায়গাটায় আসতে বলি তাকে- আমরা যেখানে সমুদ্রর দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম অনেকক্ষণ।
কলম্বোতে আমাদের প্রিয় একটা জায়গা গল ফেস সৈকত। পর পর কয়েকটা সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি এ সৈকতে। বসেছি পাথরের বৈঞ্চিতে, সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ভেবেছি- আহা! কোনোদিন আর কী আসা হবে শ্রীলঙ্কায়!
মনের কথা ঊর্মিকে বলতেই সে আগ্রহ নিয়ে বলল, আমরা আবার কোনো একদিন আসব। হয়তো ১০ বছর পরে, কিংবা তারও অনেক বছর পরে। বেঁচে থাকলে অবশ্যই আবার আসব শ্রীলঙ্কায়।
কথাগুলো শুনতে শুনতে ঊর্মির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি একদৃষ্টিতে। তার কথা শুনে প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের কথা ভেসে উঠল মনে। শ্রীলঙ্কায় আসেননি কবি, কিন্তু কী চমৎকার কবিতা লিখেছেন সিংহল সমুদ্র নিয়ে! পৃথিবীতে মানুষের যাত্রা ঠিক কত বছর আগে শুরু হয়েছিল, কোন জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদিও তা বিতর্কিত, কিন্তু কিছু ধর্মগ্রন্থের অনুসারীরা মনে করেন যে প্রথম মানবের পা পড়েছিল শ্রীলঙ্কায়। জীবনানন্দ দাশ সেই ইতিহাস টেনে বলেছিলেন, হাজার বছর ধরে পথ হাঁটার কথা, লিখেছিলেন সিংহল সমুদ্রের কথা।
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরেরবনলতা সেন ।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

(বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশ)

আমরা এখন প্রিয় কবির সিংহল সমুদ্রের পারে, দারুচিনি দ্বীপের ভেতরে। শ্রীলঙ্কা তো দারুচিনিরই দ্বীপ। চারদিকে সিনামন রব। কতকিছুর নামে সঙ্গে জড়িয়ে সিনামন, তার হিসাব নেই। সিনামন নামে শ্রীলঙ্কা আছে নানা হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্টসহ নানা স্থাপনা। কলম্বো ঘুরতে চোখে পড়ল পাঁচতারা সিনামন গ্রান্ড হোটেল। শপিং করতে গিয়ে চোখে পড়ল সিনামনের সাবান, ফেস ওয়াশ থেকে শুরু করে নানা কিছু। হোটেলে খেতে গিয়ে বুঝতে পারি সিনামনের উজ্জ্বল ও মোহময় ঘ্রাণ।
আমরা শেষ বিকালের আলোয় দেখতে যাই গল ফেস হোটেল। কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি হোটেলের গেটে। গেটে সামনেই হোটেলের লগো, তার ওপর ইংরেজিতে লেখা ১৮৬৪! বোঝা যায় দেড়শো বছর আগে নির্মিত হয়েছিল হোটেলটি। পুরনো বৃটিশ ধাঁচের ভবন। দেখতে মনে হয় রাজবাড়ি।

গল ফেস হোটেল
গল ফেস হোটেল

পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষের পা পড়েছে হোটেলটিতে। পৃথিবীর সেরা ও সুন্দরতম ১০০ জায়গা নিয়ে সাড়াজাগানো বই ‘হান্ড্রেড প্লেসেস টু সি বিফোর ইউ ডাই’। বইটির ওই গৌরবময় তালিকায় নাম আছে হোটেলটির।
হোটেলটির ক্যাটলগে লেখা রয়েছে বিখ্যাত মানুষদের নাম, যাঁরা অতিথি ছিলেন এ হোটেলে। ভেতরে ঢুকে দেখি লবিতে, রিসিপশনেও বিখ্যাত মানুষদের ছবি টানানো- ভিআইপিদের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। প্রিয় লেখক আন্তন চেখভ শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে এসে ছিলেন এখানে। রিসিপশনে ঢোকার মুখে তাঁর ছবি টানানো। নিচে লেখা আনন্ত চেখভ সম্পর্কে কিছু তথ্যবিবরণী। রাশিয়ার পৃথিবীখ্যাত এ লেখক হোটেলটির অতিথি ছিলেন ১৮৯০ সালে। হিসেব করি সেটাও প্রায় একশো ১৫ বছর আগের কথা। সায়েন্স ফিকশনের মস্তান লেখক আর্থার সি ক্লাক তো এই হোটেলের প্রেমে পড়েছিলেন। দীর্ঘ সময় তিনি এ হোটেলে কাটিয়েছেন, তারপর শেষ জীবনেও চিরদিনের জন্য থেকে যান শ্রীলঙ্কায়। সিমন উইনচেস্টার, বার্নার্ড শ, মার্ক টুয়েনসহ অতিথি ছিলেন অনেক কবি-সাহিত্যিক। রিসিপশনে তাঁদের নামগুলো পড়তে পড়তে জেগে উঠছিল অদ্ভুত এক ভালোলাগা। সমুদ্রের পারে তাঁরা হেঁটেছেন, সমুদ্রের গর্জনে বিমোহিত হয়েছেন, কফি পান করতে ভেবেছেন লেখার কথা, তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস যেন মিশে আছে দেয়ালে দেয়ালে।
শুধু লেখক-সাহিত্যিক নন, রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে নানাক্ষেত্রে বিখ্যাত বহু মানুষ ছিলেন গল ফেস হোটেলে। খানিকটা আফসোস হলো, যদি আবার কোনোদিন আসি শ্রীলঙ্কায়, থাকব এ হোটেলে।
ভারত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এ হোটেলে বিশ্ববিখ্যাত যাঁরা থেকেছেন তাঁদের মধ্যে আছেনÑভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী, জাপানের রাজা হিরোহিতো, প্রথম স্পেসযাত্রী ইউরি গ্যাগরিন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিব, স্পেনের রাজা আলফনসো, ডেনমার্কের রাজকন্যা আলেকজান্দ্রা ও রানি ইনগ্রিদ, পোপ জন পল, প্রিন্স ফিলিপ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যুগোশ্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মহাসচিব কার্ট ওয়ার্ল্ডহেইম, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট রিচার্ড এটলি, প্রিন্সেস এলি ও সদরুদ্দিন আগা খান, জওহুর লাল নেহরুসহ নানা বিখ্যাত মানুষ। আমাদের ড. মুহাম্মদ ইউনুসও আছেন এ তালিকা। এ ছাড়াও চার্লস কনরাড, রিচার্ড এফ গর্ডন, রকফেলার থেকে শুরু অনেক মানুষ কলম্বো এসে অতিথি ছিলেন এ হোটেলের। পৃথিবীবিখ্যাত অনেক ক্রীড়াব্যক্তিত্ব, অভিনয়শিল্পী, সামরিক ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে তালিকায়। তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। সেখানে একটা নাম দেখে রক্ত নেচে ওঠল- বিপ্লবের মহান পুরুষ চেগুয়েভারাও ছিলেন এ হোটেলের অতিথি।
সমুদ্র লাগোয়া হোটেলটির উন্মুক্ত রেস্তোরাঁ। ভিড়বাট্টা বেশ। বিকালের নাশতার জন্য অতি উত্তম জায়গা। আমরা সমুদ্রের ধারে পেয়ে যাই একটা ফাঁকা টেবিল। ঝলমল করছে টেবিলগুলো। পাশের টেবিলগুলোয় বসে আছেন যাঁরা, তাঁদের সবাই বিভিন্ন দেশের টুরিস্ট। ঠিক পাশের টেবিলেই বসেছেন তিনজন চাইনিজ। নাকি জাপানিজ? চিউ-মিউ করে কি যেন বলছেন এক ভদ্রলোক, তাঁর পাশে বাসা দুই তরুণী হো-হো হাসছেন। হাসির শব্দে আশপাশের লোকজন ফিরে ফিরে দেখছেন তাঁদের।
গুড আফটার নুন ম্যাডাম! গুড আফনার নুন স্যার! পাশেই দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে স্বাগত জানালেন সুন্দরী ওয়েট্রেস। অপরূপা সুন্দরী। পাঁচতারা হোটেলে অনেক ভিনদেশি জব করেন। বোধ হয় ফরেনার।
আর ইউ অ্যা শ্রীলঙ্কান সিটিজেন?
আমার প্রশ্ন শুনে মেয়েটির মুখের হাসি বেড়ে গেল খানিকটা। অসম্ভব সুন্দর হাসি। মেয়েটির দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারলাম না। বউকে পাশে নিয়ে অন্য মেয়েদের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়।
অপরূপ হাসি ছড়িয়ে মেয়েটি বললেন, ইয়েস! তারপর আগ বাড়িয়ে তিনি বললেন, মাই মাদার ইজ অ্যা ব্রিটিশ, অ্যান্ড মাই ফাদার ইজ ফ্রম শ্রীলঙ্কা। দ্যাটস হোয়াই পিপল থিংক আই অ্যাম অ্যা ফরেনার।
ঊর্মি অর্ডার করল নাশতার। আমরা অপেক্ষা করছি নাশতার জন্য। পাশ থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন। হু-হু করে আসছে সমুদ্রের বাতাস। কিছুক্ষণ পরই এলো নাশতা। চিকেন স্টিক, চিকেন কাটলেট উইথ টিউমারিক সস, মিনি বিফ বার্গার। শেষে কফি। বিকালের নাশতা চমৎকারই লাগল।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে ভাবি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর বহু দেশে গেছেন। শ্রীলঙ্কাতেও এসেছিলেন কয়েকবার। তিনি কেন এ হোটেলে আসেননি কে জানে!
রেস্তোরাঁর যেখানটায় বসেছি আমরা, তার পাশেই হোটেলের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। ভেজার সম্ভাবা নেই, খানিক উঁচু দেয়াল আছে সমুদ্রের পাশে। ঢেউয়ের ঝাপটায় না ভিজলেও স্পষ্টতই শোনা যাচ্ছিল সমুদ্রের গর্জন।
[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close