Home গদ্যসমগ্র ভ্রমণ নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ১
0

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ১

প্রকাশঃ November 9, 2016

নওশাদ জামিল / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির ১
0
0

ভ্রমণ / লঙ্কাপুরীর দিনরাত্তির – ১

শ্রীলঙ্কায় এসে আমরা যে হোটেল উঠেছি, সেখান থেকে কিছুদূর হাঁটলেই মাউন্ট লাভিনিয়ার বাস স্টপেজ। তার পাশেই একটা রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতা সারি। নাশতা শেষে চলে আসি টুকটুক স্টপেজে। বেশ কয়েকটা খালি টুকটুক দাঁড়িয়ে। দেশের সিএনজি যেমন, গড়নে-চলনে শ্রীলঙ্কায় টুকটুক তেমনই – পর্যটকদের প্রধান বাহন এটি। টুকটুক করে আমরা যাব হোটেল গালাদারিতে। কিন্তু এ হোটেল আমরা চিনি না, চেনার কথাও নয়। দুদিন আগে এসেছি শ্রীলঙ্কায়, উঠেছি কলম্বোর উপকণ্ঠে মাউন্ট লাভিনিয়ায়। ফলে শ্রীলঙ্কার রাস্তাঘাট তেমন চিনতে পারিনি এখনো। অবশ্য তাতে তেমন একটা সমস্যা নেই – হাতে আছে মোবাইল, মোবাইলে আছে ইন্টারনেট, ইন্টারনেটে আছে গুগল ম্যাপ। গুগল ম্যাপই আমাদের ট্যুরিস্ট গাইড! এছাড়া আনন্দের বিষয় শ্রীলঙ্কায় ভাষাগত সমস্যা তেমন নেই; কেননা শ্রীলঙ্কার মোটামুটি সবাই ইংরেজি বোঝেন, অনর্গল বলতেও পারেন। অতএব নো টেনশন!

ঘড়িতে তখন শ্রীলঙ্কান সময় সকাল ১০টা। ট্যুর পরিকল্পনা অনুসারে আজ আমরা যাব অনেক জায়গায়। প্রথমেই যেতে হবে হোটেল গালাদারিতে, সেখানে ঊর্মির সেমিনারের রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। আশা করি সেটা সকালেই হয়ে যাবে। তারপর সারাদিনই ঘোরাঘুরি; সারাটা দিন আমরা কাটাব কলম্বো শহরে, ঘুরব নানা ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী এই নগরীর অলিতে-গলিতে। সকাল ১০টার মধ্যেই আমরা রওনা হই কলম্বোর উদ্দেশে।

ট্যুর লিডার ঊর্মি গুগল ম্যাপ দেখে ইন্টারনেট ঘেঁটে সব তথ্য জেনে নিয়েছে আগেই। মাউন্ট লাভিনিয়া থেকে কলম্বো শহরের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। কলম্বোর প্রাণকেন্দ্রেই এ হোটেল, পাশেই পুরনো পার্লামেন্ট হাউজ। ধারণা করি টুকটুকওয়ালা এককথাতেই চিনবেন।

টুকটুকওয়ালাকে বলি, হোটলে গালাদারি যাবেন?

মাঝবয়সী এক চালক। ইংরেজি ভালোই বোঝেন। চমৎকারভাবে বলতেও পারেন।

টুকটুকওয়ালা বললেন, যাব।

জায়গাটা টুকটুকওয়ালা চিনেছেন কি-না, তা যাচাই করার জন্য বলি – ইটস নেয়ার দ্যা ওল্ড পার্লামেন্ট হাউজ।

টুকটুকওয়ালা মাথা নেড়ে বললেন, ইয়েস! ইয়েস!

পরম নিশ্চিন্তে উঠে পড়ি টুকটুকে। ১২ কিলোমিটারের পথ, ভাড়া খুব বেশি ওঠার কথা নয়। মাউন্ট লাভিনিয়া পার হলেই জায়গাটির নাম দেহিওয়ালা। দেহিওয়ালা পার হতেই কিছুদূর বাদে টুকটুক উঠে যায় এক উড়ালসেতুতে। কিছুক্ষণ পরেই আবার মূল রাস্তায়। ড্রাইভার কিছুদূর গিয়ে চলে এলেন একেবারে সমুদ্রের কাছাকাছি। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে এবার যাত্রাপথ। সমুদ্রের পাশে পর পর দুটি বড় রাস্তা। প্রথমটি রেললাইন, পরেরটি বাসের। টুকটুক সমুদ্রের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে কলম্বোর উদ্দেশে। একদিকে সমুদ্রের রূপলাবণ্য, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্য।

05

গল থেকে ফেরার পথে আমরা এ রোড ধরেই ফিরেছিলাম। সমুদ্রের পাশ দিয়ে অদ্ভুত সুন্দর রাস্তা। সকালের সূর্যালোকে ঝলমল করছে সমুদ্র। দলবেঁধে ঢেউ আসছে কিনারে, আবার ফিরে যাচ্ছে কোমর দোলাতে দোলাতে। ঢেউয়ের দোলায় সূর্যরশ্মি পড়ে ঝলমল করছে পানি। সমুদ্রের তীরে নানা ধরনের গাছগাছালি। নারকেল গাছ প্রচুর। পামগাছও বেশ। সমুদ্র ও গাছপালার পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমরা দেখি কলম্বো শহর। ছিমছাম, নিরিবিলি। হাইরাইজ বিল্ডিং তেমন নেই। অধিকাংশ ভবনই দু-চারতলা বিশিষ্ট। বেশ প্রাচীন শহর, কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্য নেই। ঢাকার মতো গিজগিজ করা মানুষ নেই, গাড়িও নেই। গাড়ির বিকট হর্নও নেই। ফলে গাড়িতে বসেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল কলম্বোর কলতান, সমুদ্রের ছলাৎ ছলাৎ ঐকতান।

মিনিট ৪০ পরেই পৌঁছে যাই ঠিক হোটেলের সামনেই। মিটারে দেখলাম ভাড়া উঠেছে ৪৫০ রুপির মতো।

কলম্বোর গল ফেস হোটেল পেরিয়ে কিছুদূর এগোলেই পুরনো পার্লামেন্ট হাউজ। তার পাশেই গালাদারি হোটেল। হোটেলের ঠিক পেছনটায় কলম্বোর বাণিজ্যিক এলাকা। বিখ্যাত টুইন টাওয়ার। পোশাকি নাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। অধিকাংশ ভবন ছোট হলে কী হবে, কলম্বোর টুইন টাওয়ার ঢাকার সর্বোচ্চ ভবনের চেয়েও উঁচু। এ দুটি ভবন ছাড়া কলম্বোর বাকি সব ভবনই মাঝারি আকারের। অবশ্য বেশ কিছু হোটেল দেখলাম বহুতল বিশিষ্ট।

ভাড়া মিটিয়ে নামি হোটেলের সামনে। চারদিকে প্রখর রৌদ্রকিরণ। একপাশে সমুদ্র, তার থেকে খানিকটা সামনেই এ হোটেল। গালাদারির পাশেই দেখলাম আরেকটি হোটেল Ñ নাম হিলটন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একঝলক দেখে নিই গালাদারির অবয়ব। সুউচ্চ ভবন। রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া হোটেলের গেট। আমরা নির্বিঘেœ ঢুকি হোটেল লবিতে। তাতে ঝুলছে সেমিনারের বড় প্ল্যাকার্ড। পরিচয় দিতেই সেমিনারের দুজন স্বেচ্ছাসেবক অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। ঊর্মি রেজিস্ট্রেশন করল, কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই বুঝে নিল তার কাগজপত্র। দেখলাম ঊর্মির নামে সব গোছানো। তার ছবি দিয়ে সেমিনারের আইডি কার্ড। সেমিনারের ব্যাগ এবং সেমিনারের একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট বুক।

কলম্বোয় অনেকগুলো পাঁচতারা হোটেল রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি প্রাচীন এবং পৃথিবীখ্যাত। গালাদারি তত প্রাচীন নয়, নতুন হোটেল, কিন্তু এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে বেশ। হোটেল লবিতে বসে কফি পান করি। ঊর্মি মনোযোগ দিয়ে দেখছিল সেমিনারের ম্যাগাজিনটি। তাতে পত্রস্থ হয়েছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে তার একটি আর্টিকেলের সারাংশ। সেমিনার শেষ হলে প্রকাশিত হবে জার্নাল। তাতে স্থান পাবে তার গবেষণা প্রবন্ধ। প্রথম দিন সেমিনারের তেমন কোনো কাজ নেই। শুধু রেজিস্ট্রেশন। দ্বিতীয় দিন উদ্বোধন এবং সেমিনার শুরু। তিন দিনের সেমিনারের শেষ দিনে ঊর্মি উপস্থাপন করবে তার গবেষণাপত্র।

সেমিনারের প্রাথমিক কাজ সেরে বের হই হোটেল থেকে। এখন শুধুই ঘোরাঘুরি। বাইরে তীব্র রৌদ্রদহন। খাড়া হয়ে রৌদ্রকণা তাপ বিলাচ্ছে মাথার ওপর। রৌদের ঝলকানিতে উজ্জ্বল গোটা শহর। হোটেলের সামনে একটি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভাবিÑহোয়াট উড বি আওয়ার ফার্স্ট ডেস্টিনেশন?

01

তিনজন মিলে ঠিক করি – প্রথমে দেখব কলম্বোর একটি বিখ্যাত বৌদ্ধবিহার। হোটেল গালাদারি থেকে খানিক দূরেই মন্দিরের অবস্থান। হোটেলের পাশেই পেয়ে গেলাম টুকটুক। যেতে যেতে ঢুকে পড়ি শহরের হৃৎপিণ্ডে। টুকটুক যাচ্ছে বিহারের দিকে। আমরা দেখছি কলম্বোর রাস্তাঘাট, মানুষজন, বাড়িঘর। দেখছি তার নান্দনিক সৌন্দর্য। কী ছিমছাম শহর! ধুলোবালির উৎপাত নেই। রাস্তাগুলো ঝকঝকে, তকতকে। সঙ্গে ফুটপাতও পরিচ্ছন্ন। মানুষজনও বেশ সচেতন, রাস্তায় কিছুই ফেলে না। যদি কিছু ফেলতে হয়, নির্দিষ্ট দূরত্বে আছে সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিন। সেখানেই ময়লা ফেলে তারা।

শহরের ভবনগুলোও সুন্দর, নান্দনিক। অধিকাংশ পর্তুগিজ, ব্রিটিশ ঘরানার ভবন। নতুন ভবনও আছে প্রচুর। সেগুলোও সুন্দর। এক ভবনের সঙ্গে অন্য ভবনের বেশ দূরত্ব। তাতে আপন গতিতেই বাতাস চলাচল করতে পারে। সমুদ্রছোঁয়া বায়ু বইতে পারে। যেতে যেতে চোখে পড়ে একটা মস্ত বড় লেক। শহরের বুক চিরে বয়ে চলেছে এই শান্ত-সুন্দর লেক। লেকের চারপাশে প্রশস্ত হাঁটার পথ, পথিককে ছায়া দিতে পথের সঙ্গে প্রচুর গাছপালা। নগরবাসী বিকেলবেলা ঘুরতে পারেন, হাঁটতে পারেন। লেকের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে টুকটুক। বিমুগ্ধ হয়ে আমি তাকিয়ে সেই লেকের দিকে – পানি কী টলমলে, স্বচ্ছ! নগর পরিকল্পনাবিদরা কৃত্রিমভাবে তৈরি করেছেন এই লেক। ঢাকাতে লেক আছে কিছু। সবগুলোই এখন দখলে সংকীর্ণ, আবর্জনায় জীর্ণ। কলম্বোর পরিচ্ছন্ন লেকের দিকে তাকিয়ে ঢাকার কথা ভাবতে ভাবতে নিঃশব্দে ঝরে কয়েকছত্র দীর্ঘশ্বাস!

তিরিশ মিনিট পর টুকটুক থামল মন্দিরের সামনে। আমরা এলাম ঐতিহ্যবাহী গঙ্গারামায়া টেম্পলে। ভাড়া মিটিয়ে অবাক নয়নে দেখি মন্দিরের বাইরের সৌন্দর্য। লেকের পাশেই তিন-চারটি বড় আকারের ভবন। প্রতিটি ভবন টেরাকোটায় উৎকীর্ণ। মন্দিরগাত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গৌতম বুদ্ধের গুণগাথা। টেরাকোটার কাজ দেখে সত্যিই অভিভূত। মন্দিরের বাইরের অংশের ছবি তুলি কিছু। এবার ভেতরে ঢোকার পালা।

ঢোকার পথে স্পষ্ট নিদের্শনা – জুতা খুলে প্রবেশ করতে হবে মন্দির আঙিনায়। গোটা মন্দির ও মন্দির প্রাঙ্গণ কার্পেট বিছানো। ফলে ধুলোবালি, কাদার ফ্যাসাদ নেই। আমরা যথারীতি জুতা খুলে প্রবেশ করি মন্দির প্রাঙ্গণে। গেট থেকে ঢুকতেই হাতের বাম দিকে বড় একটি মন্দির ভবন, ডান দিকে মিউজিয়াম। সামনেই মন্দিরের অফিস। প্রাঙ্গণে ঢোকার মুখেই টিকিট কাউন্টার। জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ৭০০ রুপি। খানিকটা অবাক হয়ে মনে মনে বলি-মন্দির দেখতে এত টাকা লাগবে!

হঠাৎ কাউন্টারে একটা চার্টে চোখ যায় বাঁধনের। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০০ রুপি। অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য তা ৭০০ রুপি। বাঁধন উৎসাহী হয়ে বলল, আমরা সার্কভুক্ত বাংলাদেশের নাগরিক।

কাউন্টারের টিকিট বিক্রেতা বলেন, পাসপোর্ট দেখাতে হবে।

পকেট হাতড়ে দেখি আমার সঙ্গে পাসপোর্ট নেই। বাঁধনের সঙ্গেও নেই। আমরা পাসপোর্ট রেখে এসেছি হোটেলে। শুধু ঊর্মির পাসপোর্ট আছে তার ব্যাগে। অগ্যতা টিকিটের পুরো মূল্যই পরিশোধ করতে হলো দুজনের। তবে ঊর্মির টিকিট মূল্য রাখল ৫০০ রুপি।

মন্দির আঙিনায় ঢোকার মুখেই বড় আকারের দুটি বুদ্ধমূর্তি। ধ্যানস্থ মূর্তিগুলো যেন স্বাগত জানাল আমাদের। মন্দিরের সামনেই গাইড রয়েছেন। নগদ ডলারের আশায় চকচক করছে তাদের চোখ। গাইড নেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। গাইড থাকলে মহাযন্ত্রণা, সারাক্ষণ বকবক করেন। সবচেয়ে উত্তম হলো – নিজেরাই ঘোরো ইচ্ছেমতো। [চলবে…]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close