Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ নগুগির সঙ্গে নাট্যালাপ > স্মৃতিচারণা >> আলম খোরশেদ

নগুগির সঙ্গে নাট্যালাপ > স্মৃতিচারণা >> আলম খোরশেদ

প্রকাশঃ June 24, 2017

নগুগির সঙ্গে নাট্যালাপ > স্মৃতিচারণা >> আলম খোরশেদ
0
0

নগুগির সঙ্গে নাট্যালাপ

বর্তমান বিশ্বের একজন প্রধান লেখক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার কেনিয়ার নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো যে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন সেটা জানতাম। কিন্তু তিনি যে খোদ ন্যুয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়েরই নাট্যকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর ছাত্র বন্ধুবর সুদীপ্ত চট্ট্যোপাধ্যায় ও সালেক খানের সরাসরি শিক্ষক, সে-খবর জেনেছি মাত্র কিছুকাল আগে। তারা দুজনেই তাঁর সাক্ষাত ছাত্র ও দুজনেই সমান অভিভূত তাঁর অসামান্য গুণপনায়। এ-খবর পাওয়া অব্দিই তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল আমার। আমি নিজেও তাঁর একজন গুণগ্রাহী পাঠক। তাঁর ওপর ছোট্ট একখানা প্রবন্ধ ও তাঁর লেখা উপন্যাস Weep Not Child-এর আলোচনা লিখেছি কয়েক বছর আগেই। গেল বছর আমার সম্পাদিত সমকালীন বিশ্বের ছোটগল্প গ্রন্থ ‘দ্বাদশ কাহিনী’র একটি কাহিনী হিসেবে নির্বাচন করেছিলাম নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর অসাধারণ গল্প Minutes of Glory-কে। সে-গল্পের অনুবাদ বিষয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একবার কিছুক্ষণের জন্য টেলিফোনে কথাও হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। কিন্তু একেবারে সামনাসামনি দেখা ও মুখোমুখি বসে আলাপ হলো মাত্র সম্প্রতি এক হিমেল সন্ধ্যায়, গ্রিনিচ ভিলেজের একটি রেস্তোঁরায়।

ন্যুয়র্ক ভিত্তিক বাঙলাদেশি নাট্যসংগঠন ড্রামা সার্কেল-এর কর্ণধার মুজিব বিন হক অনেকদিন ধরেই তাঁর দলের জন্য একটি বিদেশি নাটক অনুবাদ করে দেবার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। এ নাটক, সে নাটক পড়ে শেষ পর্যন্ত আমি মনস্থির করি প্রিয় লেখক নগুগির বহু বিখ্যাত ও বির্তকিত নাটক I Shall Marry When I Want অনুবাদ করব। সুদীপ্তর কাছ থেকে বইটা ধার করে এনে এক বসায় পড়ে ফেলি এবং বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার আশ্চর্য সাদৃশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পেয়ে তৎক্ষণাৎ তা তর্জমা করার সিদ্ধান্ত নিই। বেশ কিছুদিন খেটে ’শরিয়তি শাদি’ নামে তার প্রাথমিক খসড়াও তৈরি করে ফেলি। মুজিব বিন হক কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন নাটকটির মহড়ায়। তখনই মনে এল নগুগি যখন এই শহরেই আছেন তখন তাঁর কাছ থেকে কেনিয়ায় এ-নাটকের মঞ্চায়ন অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে কিছু জেনে আসি না কেন? জানা ছিল, ইংরেজি ভাষায় আর সাহিত্যচর্চা না করার সিদ্ধান্ত নেবার পর নগুগির মাতৃভাষা গিকুয়ু বা কিকুয়ু ভাষায় লেখা এটিই তাঁর প্রথম রচনা। এবং এ-নাটকটি তিনি তাঁর গ্রামে খোলা আকাশের নিচে সম্পূর্ণ অপেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে মঞ্চায়ন করেন, যে পদ্ধতির নাম তিনি দিয়েছিলেন Peasant Theater।  অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল সে-নাটক। কিন্তু তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিবাদী চরিত্রে ভীত হয়ে শাসকশ্রেণী নাটকটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নাট্যকার নগুগিকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। সেটি ১৯৮৩ সালের কথা। সেই থেকে নগুগি নির্বাসিতের জীবনযাপন করছেন এদেশে ওদেশে। সে যাক, নাটকটির ন্যুয়র্ক মঞ্চায়ন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি সানন্দে সম্মতি দিলেন।

কথা মতো, ন্যুয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে, নগুগির ক্লাসঘরের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। নগুগি সেখানে Performance Theory পড়ান। জনপ্রিয় শিক্ষক তিনি, তাই ছাত্রছাত্রীদের নানা জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে ক্লাশ থেকে বেরুতে বেরুতে সাতটা বেজে গেল। করমর্দনের শেষে তিনিই প্রস্তাব দিলেন কোন কফিখানায় গিয়ে বসতে। আমাদের সঙ্গে তাঁর সাহায্যকারী, সিয়েরা লিওনের চৌকস যুবক মোস্তফাও ছিল। তিনজনে মিলে খাস ন্যুয়র্কারের ভঙ্গিমায় কফি ব্যাগেল নিয়ে গল্পে মাতি আমরা।

আমি সরাসরি নাটক প্রসঙ্গে চলে যাই। নগুগিও সাগ্রহে সাড়া দেন। মুহূর্তে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে তাঁর চোখ মুখ। তিনি মোস্তফার কাছ থেকে একটুকরো কাগজ চেয়ে নিয়ে তাতে এঁকে দেখাতে লাগলেন নাটকের মঞ্চবিন্যাস ও আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ। সেই সঙ্গে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন আমার ছোট ছোট প্রশ্নসমূহের। অপেশাদার অভিনেতাদের সাফল্য বর্ণনায় তাঁকে রীতিমতো উত্তেজিত মনে হচ্ছিল। নাটকের দক্ষিণা ছিল যৎসামান্য, যেন গ্রামের সাধারণ মানুষজন তা দেখতে পারে, কিন্তু মোড়লশ্রেণিকে বেশি দাম দিতে বাধ্য করেছিলেন তারা, এই কথা বলে শিশুর সারল্যে হাসেন নগুগি। নাটকের পটভূমি হিসেবে উল্লেখ করলেন, বিদেশি ধর্মপ্রচারক শ্রেণি ও স্থানীয় বহুজাতিক সংস্থা ’বাটা’ কোম্পানীর অর্থনৈতিক ও ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ তিনি এই নাটক রচনা করেন। এ-কারণে তাদের অনাচারের প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী, খেটে-খাওয়া গ্রামবাসীরা এমন বিপুলভাবে সাড়া দিয়েছিলো এই নাটকের প্রতি। এ-প্রসঙ্গে মোস্তফা সম্প্রতি নাইজেরিয়ায় শাসকশ্রেণির হাতে নিহত কবি, নাট্যকার ও পরিবেশকর্মী কেন্ সারোউইয়া ও শেল কোম্পানির দ্বন্দ্বের সঙ্গে এর সাদৃশ্যের ইঙ্গিত করলে নগুগি প্রবলভাবে মাথা দুলিয়ে বললেন, দুটো ঘটনার চরিত্রই হুবহু এক। শুধু তফাৎ, একদিকে বাটা কোম্পানি ও অন্যদিকে শেল কোম্পানি। আর কেন্ সারোউইয়া প্রতিবাদ করতে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলেছেন, তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণ নিয়ে পালাতে পেরেছেন বিদেশে। এ-ঘটনার বর্ণনায় নগুগিকে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে খুব ক্ষুব্ধ মনে হলো। বিশ্ব পুঁজিবাদের নগ্ন ও নির্মম আচরণ বিষয়ে তিনি আমাদের সতর্ক করে দিলেন এবং বললেন ’কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো’ বইখানা আরেকবার পড়ে দেখতে। তাঁর মতে বর্তমান সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক ছিলনা বইখানা আর কখনও।

মাতৃভাষা কিকুয়ুতে লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা তুলি আমি। বলি, কিছুদিন আগে এই ন্যুয়র্কেই প্রখ্যাত নাইজেরিয় লেখক চিনুয়া আচেবের সঙ্গে এ-বিষয়ে আমার আলোচনার কথা। চিনুয়া, সোয়েঙ্কা প্রমুখ ইংরেজিতে লেখার পক্ষপাতী, মূলত বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর বিবেচনাতে। কিন্তু কট্টর দেশপ্রেমী ও মাতৃভাষার অনুরাগী নগুগি মনে করেন আফ্রিকান এবং অন্যান্য স্বল্পপরিচিত দেশ ও ভাষার লেখকদের এই প্রলোভন উপেক্ষা করে মাতৃভাষাতেই লেখা উচিত, কেননা তাঁদের প্রথম ও প্রধান দায়বোধ থাকা উচিৎ স্বদেশের জনগোষ্ঠীর প্রতি। এতে পাঠকসংখ্যা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তিনি মনে করেন বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নেয়া উচিত। অবশ্য তিনি এও মনে করেন যে, কোন ভাল লেখারই প্রসার কখনও আটকে থাকে না। উদাহরণস্বরূপ তাঁর আলোচ্য নাটকটির কথাই বললেন। এর মঞ্চায়ন তিনি দেখেছেন ফরাসি, জার্মান ও সুইডিশ ভাষায় এবং অচিরেই বাংলা ভাষায় তার মঞ্চায়ন দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, সেটাও জানাতে ভুল করলেন না। আমি কৃতার্থ বোধ করলাম। ইতোমধ্যে ঘণ্টা দুয়েক গড়িয়ে গেছে। ওয়েট্রেস বিল রেখে গেছেন অনেক আগেই। আমরা কথা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াই। আমি তাঁকে ‘দ্বাদশ কাহিনী’ বইটির একটি কপি উপহার দিই। তিনি বাংলা ভাষায় অনূদিত তাঁর একটি লেখার প্রথম নিদর্শন পেয়ে স্পষ্টতই খুশি হন। ধন্যবাদ জানান বার বার করে। তারপর তাঁর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উষ্ণতাটুকু আমার করতলে গেঁথে নিয়ে, আমি বাড়ি ফিরি গভীর পরিতৃপ্তিতে।

ন্যুয়র্ক, ১৯৯৫

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close