Home অনুবাদ নগুগি ওয়া থিওঙ্গো / আমাকে আমি হয়ে উঠতে শেখাও! > শিশির ভট্টাচার্য্য অনূদিত

নগুগি ওয়া থিওঙ্গো / আমাকে আমি হয়ে উঠতে শেখাও! > শিশির ভট্টাচার্য্য অনূদিত

প্রকাশঃ May 15, 2017

নগুগি ওয়া থিওঙ্গো / আমাকে আমি হয়ে উঠতে শেখাও! > শিশির ভট্টাচার্য্য অনূদিত
0
0

[নগুগি ওয়া থিওঙ্গোর জন্ম ১৯৩৮ সালে কেনিয়ায়। ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক। ইয়েল ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য এবং ইংরেজির অধ্যাপক। আগে ইংরেজিতে লিখতেন, এখন লেখেন কেনিয়ার ভাষা গিকুইউতে। বহু পুরস্কার এবং দশটি সাম্মানিক ডক্টরেটে ভূষিত থিওঙ্গো লেখার জন্যে কারারুদ্ধ হয়েছেন এবং পরে প্রাণরক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমান রচনাটি ২০১৫ সালে কেনিয়াতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতার অংশবিশেষের ভাবানুবাদ। থিওঙ্গোর বক্তব্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা বিচারের ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। – অনুবাদক]

“উত্তর-ঔপনিবেশিক কেনিয়াতে গিনকুনিউন ভাষায় লেখা এটাই সম্ভবত প্রথম নাটক। এই নাটক প্রযোজনার উদ্দেশ্য ছিল অতি সরল : আপনি যদি বিশ্বাস করেন, জনগণই উন্নয়নের কর্তা এবং কর্ম (অর্থাৎ জনগণের দ্বারা জনগণের উন্নয়ন হওয়া উচিত) তাহলে আপনি তাদের সঙ্গে কাজ করবেন। যে-ভাষায় তারা কথা বলে, যে-ভাষা তারা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে, সে-ভাষা আপনিও ব্যবহার করবেন। শত শত লোকের সামনে অভিনীত হবার পর ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে এই নাটকের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা হয়। যেহেতু আমি ছিলাম এই নাটকের একজন সহনাট্যকার, ‘দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে’ আমাকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।”

……………

”যে অনুকরণ করে, সে সব সময় অনুসরণ করে। কোনো অনুকরণকারীর নিজের উপর বিশ্বাস নেই এবং এই বিশ্বাসহীনতার শুরু ভাষা দিয়ে। আপনি যদি পৃথিবীর সব ভাষাও জানেন, কিন্তু নিজের মাতৃভাষা বা আপনার সংস্কৃতির ভাষাটি না জানেন, তবে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছেন। মাতৃভাষা বা সংস্কৃতির নিজস্ব ভাষাটি জানার পর পৃথিবীর বাকি সব ভাষা এক এক করে অর্জন করার অপর নাম ক্ষমতায়ন।”

……………

১৯৬৯ সালে নাইরোবি থেকে শ খানেক মাইল দূরের এক শহর নিয়েরিতে গাকাম্বা নামে সাইকেল মেকানিক তার মটর সাইকেলের ইঞ্জিন ব্যবহার করে একটি ছোটোখাটো বিমান তৈরি করে ফেলেছিল। বিমানটির নাম দিয়েছিল সে কেনিয়া-১। গাকাম্বার এই বিমান উড্ডয়নের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তৎকালীন কেনিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল চার্লস নিওনিও, কারণ একেতো গাকাম্বার কোনো ফ্লাইং লাইসেন্স ছিল না, তার উপর তার বিমানের মানও ইওরোপীয় মানদণ্ডের ধারে-কাছে ছিল না। নিষেধ অমান্য করে গাকাম্বা তার বিমান নিয়ে আকাশে উঠে পড়ে। বিমানটি অবশ্য মাইলখানেক ওড়ার পর এক গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

গাকাম্বার লেখাপড়া হাইস্কুলের বেশি এগোয়নি। ভালো ইংরেজি বলতে পারতো না সে, নিওনিওর মতো ইংরেজি বলারতো প্রশ্নই আসে না। গাকাম্বা হয়তো তার মাতৃভাষা গিনকুনিউন ভালো বলতে পারতো। নিওনিও ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ফোর্ট হারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, ইংল্যান্ডের লিংকনস ইন থেকে পাশ করা ব্যারিস্টার। উনি এত ভালো ইংরেজি জানতেন যে নাইরোবির ইওরোপীয় বাসিন্দা  বা  সেটেলারেরা [লক্ষ্য করুন, ইওরোপীয়রদের কখনও অভিবাসী বা ইমিগ্র্যান্ট বলা হয় না!] বলতো, নিওনিও নাকি ইচ্ছে করলে নাক দিয়েও ইংরেজি বলতে পারে!

এখানে যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করবার সেটা হচ্ছে, গিনকুনিউনভাষী অর্ধশিক্ষিত গাকাম্বা যখন বিমান তৈরি করতে চেয়েছে, ইংরেজিভাষী বিলাতফেরৎ নিওনিও তখন বলেছে: ‘এটা সম্ভব নয়!’ গাকাম্বা নিজের স্বপ্ন দেখেছে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। নিওনিও ইওরোপীয়দের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের  ইংরেজিতে বলেছে : ‘সাবধান! ও চেষ্টাটিও করতে যেও না!’ গাকাম্বা যখন বলেছে : ‘আফ্রিকাও যন্ত্র তৈরি করতে সক্ষম’,  নিওনিও তখন বলেছে : ‘এসব কাজ ইওরোপের উপর ছেড়ে দাও!’

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। ১৯৬৯ সালে আমি নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যোগ দেবার কিছুদিন পরের কথা। শেক্সপীয়র থেকে এলিয়ট ছিল ইংরেজি বিভাগের মূল সিলেবাস। আমরা নিজেদের প্রশ্ন করলাম, ইংরেজ জাতির সাহিত্য কেন কেনিয়ার ইংরেজি বিভাগের মূল পাঠ্য বিষয় হবে? আমরা দাবি করলাম, নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ বিলুপ্ত করা হোক। আমরা কিন্তু কেনিয়ায় ইংরেজি সাহিত্য নিষিদ্ধ করার কথা বলিনি। নতুন যুগের বাস্তবতায় পাশ্চাত্যের সঙ্গে কেনিয়ার সম্পর্কটাকে একটু বদলে দিতে চেয়েছিলাম আমরা। ‘ওখান থেকে শুরু হয়ে এখানে শেষ হবে’- এটা হচ্ছে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া আমাদের দিক থেকে আত্মধ্বংসী, ‘আমি’-কে অস্বীকার করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। কিন্তু ‘এখান থেকে শুরু হয়ে ওখানে শেষ হবে’- এটা হচ্ছে উপনিবেশ-বিরোধী প্রক্রিয়া। প্রগতিপন্থী এই প্রক্রিয়ায় আমার ‘আমিত্ব’ নিশ্চিত হয়।

আমরা চেয়েছিলাম, কেনিয়া হবে আমাদের সাহিত্যের ভিত্তি। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আমরা বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকাবো। ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের পরিবর্তে আমরা একটি সাহিত্য বিভাগ খুলতে চেয়েছিলাম। এই বিভাগে কেনিয়াকে কেন্দ্রে রেখে প্রথম ক্ষুদ্রতর বৃত্তে পূর্ব আফ্রিকান, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান, আফ্রো-আমেরিকান এবং দ্বিতীয় বৃহত্তর বৃত্তে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং ইওরোপের সাহিত্যের চর্চা ও আলোচনা হতো। ইংরেজি বিভাগ চাইতো, ইংরেজি ভাষার মধ্যে সাহিত্যের আলোচনা সীমিত রাখতে। আমরা চেয়েছিলাম, সাহিত্যকে ইংরেজির ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে মুক্তি দিয়ে বাকি পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করতে। নাইরোবিতে শুরু হওয়া এই বিতর্ক আফ্রিকা এবং অন্যত্র ছড়িয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব’ নামে পরিচিত হয়।

নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগের ছাত্ররা এখন বিশ্বের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াচ্ছে। আমাদের এই সাহিত্য বিভাগ ১৯৭৪ সালে কেনিয়ার প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের সাহিত্যের সিলেবাস পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয়। গুরুত্বের ক্রমানুসারে নতুন সিলেবাসে প্রথমেই স্থান পায় কেনিয়ার সাহিত্য, তারপর আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সাহিত্য এবং তারপর বাকি পৃথিবীর সাহিত্য। এর মানে হচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষা পাশ করেছে এমন কোনো শিক্ষার্থীও কেনিয়ার সাহিত্য সম্পর্কে জানবে এবং আফ্রিকার সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক  সে ব্যাপারেও তার কমবেশি ধারণা থাকবে। এই সিলেবাস দিয়ে এমন সব বিশ্বনাগরিক তৈরি করার কথা ছিল যারা কেনিয়ার সাহিত্যের জমিনে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকাতে সক্ষম হবে।

পাশ্চাত্য সমর্থিত দানিয়েল মোয়ার (শাসনকাল ১৯৭৮-২০০২) স্বৈরাচারী সরকার সিলেবাসসহ সাহিত্যের এই পুরো শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) বাতিল করে দেয়, কারণ (তাদের মতে) বিশ্বসাহিত্যের সংক্রমণ থেকে ইংরেজি ভাষাকে বাঁচাতে হবে। ইংরেজি ভাষার কারাগারের  লৌহকপাট সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করতে হবে যাতে কেনিয়ার সাংস্কৃতিক বন্দিরা সেই কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়ে মুক্ত হতে না পারে।

ইংরেজি ভাষার কারারক্ষিদের ব্যস্ত রাখা দরকার। সুতরাং ভাষার পর তারা আক্রমণ করলো কেনিয়ার সংস্কৃতিকে। নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রেরা নাইরোবি থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে কামিরিথু গ্রামের কৃষিশ্রমিক, ভূমিহীন ও বেকারদের সঙ্গে মিলে ‘নাগাহিকা নিদিন্দা’ (যার অর্থ : ‘আমি বিয়ে করবো, যখন আমার ইচ্ছে হবে!’) শিরোনামে এক নাট্যাভিনয়ের আয়োজন করেছিল। উত্তর ঔপনিবেশিক কেনিয়াতে গিনকুনিউন ভাষায় লেখা এটাই সম্ভবত প্রথম নাটক। এই নাটক প্রযোজনার উদ্দেশ্য ছিল অতি সরল : আপনি যদি বিশ্বাস করেন, জনগণই উন্নয়নের কর্তা এবং কর্ম (অর্থাৎ জনগণের দ্বারা জনগণের উন্নয়ন হওয়া উচিত) তাহলে আপনি তাদের সঙ্গে কাজ করবেন। যে-ভাষায় তারা কথা বলে, যে-ভাষা তারা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে, সে-ভাষা আপনিও ব্যবহার করবেন। শত শত লোকের সামনে অভিনীত হবার পর ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে এই নাটকের প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করা হয়। যেহেতু আমি ছিলাম এই নাটকের একজন সহনাট্যকার, ‘দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে’ আমাকে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

কামিরিথু গ্রামের লোকেরা বলছিল : ‘আফ্রিকান ভাষা দিয়েই আমরা শুরু করবো!’ যারা আমাকে কারারুদ্ধ করেছিল তারা বলছিল : ‘না, আমরা ইংরেজি দিয়ে শুরু করবো!’ গাকাম্বার বিমান এবং কামিরিথু গ্রামের নাটক- এই দুই গল্প থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম? কেনিয়ার ভিতর থেকে যে উদ্যোগ নেয়া হবে, বাইরের ভাষা, সংস্কৃতি বা অর্থনীতির স্বার্থে সেটাকে ধ্বংস করে দিতে হবে। কেনিয়ার মাটি থেকে যা কিছু উঠে আসবে সেটাকেই সন্দেহ করতে হবে। যা কিছু বাইরে থেকে আসবে, ধরা যাক ইওরোপ থেকে, তাকেই বিনাপ্রশ্নে স্বাগত জানাতে হবে।

এটা কি কোন কাকতালীয় ঘটনা, কোনো সমাপতন? এবার তাহলে আমি আমার চতুর্থ গল্পটি বলি। ১৯৩৮ সালে মবিউ কোইনাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ছেলের এই সাফল্যে আবিভূত হয়ে কোইনাজের বাবা ছেলেকে একটা পাথরের বাড়ি উপহার দিতে চাইলেন। কোইনাজ সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই পাথরগুলো দিয়ে ‘গিনথুঙ্গুনরি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়’ গড়ে তুলবেন। কেনিয়ায় স্থানীয়রা একধরনের বিদ্যালয়-আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। স্থানীয় লোকদের অর্থানুকূল্যে এই বিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হতো। যখনি এইসব বিদ্যালয় প্রকল্পের নেতারা পরস্পর মিলিত হতেন, তাদের প্রথম কাজ ছিল পকেটে বা মানিব্যাগে যত টাকা আছে সব টাকা টেবিলের উপর রাখা। স্থানীয় সাধারণ লোকজন তাদের ‘যা কিছু আছে’ তাই দিয়ে এই বিদ্যালয়গুলো গড়ে তুলেছিল। এই বিদ্যালয়ের স্লোগান ছিল : ‘আফ্রিকা শুধু আফ্রিকানদের জন্যে, দেশে কিংবা বিদেশে!’ গিনথুঙ্গুনরি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে এই স্বাধীন বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

এই বিদ্যালয় আন্দোলন এমন কিছু একটা অর্জন করতে চেয়েছিল যা আগে কখনো অর্জিত হয়নি। কেনিয়ানরা বলছিল : ‘আমরা এটা করতে পারি।’ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বলছিল : ‘তোমরা যা করতে পারো, আমরা তোমাদের তা করতে দেবো না!’ ১৯৫২ সালে গিনথুঙ্গুনরি মহাবিদ্যালয় এবং আফ্রিকার সব স্বাধীন বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। আফ্রিকান ভাষায় প্রকাশিত সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। কিছু সম্পাদককে কারারুদ্ধ করা হয়, অন্যরা বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়। আফ্রিকান ভাষার কবি গাকারা ওয়া ওয়ানজাউ এবং স্ট্যাননি কাগিনকাকে নির্যাতন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। আফ্রিকার নিজস্ব ভাষিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে চুড়ান্তভাবে অপমান করার উদ্দেশ্যে গিনথুঙ্গনরি কলেজটিকে একটি কারাগারে রূপান্তরিত করা হয়। যারা ভাষিক ও সাংষ্কৃতিক স্বাধিকার দাবি করতেন, সেই কারাগারে তাদের ফাঁসি দেওয়া হতো।

এর পর আফ্রিকার ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি ইংরেজিভাষী অভিজাত গোষ্ঠী গড়ে ওঠে কেনিয়ায়। ১৯৫২ সালের পর থেকে নিয়ম করা হয় যে একজন ছাত্র অংক, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা ইতিহাসে যত ভালোই করুক না কেন, এইসব বিষয়ে সবগুলো প্রশ্নের জবাবও যদি সে ইংরেজি ভাষায় দিতে পারে, তবুও ইংরেজি ভাষা ও ব্যাকরণের পরীক্ষায় কৃতকার্য না হয়ে সে পরের শ্রেণিতে প্রমোশন পাবে না। শিক্ষা, বিশ্ববীক্ষা এবং ঔজ্জ্বল্যের অপর নাম হয়ে দাঁড়ায় ইংরেজি ভাষা। ১৯৬৪ সালে সদ্যস্বাধীন কেনিয়া সরকার কর্তৃক গঠিত ওমিন্ডে শিক্ষাকমিশন প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার সর্বস্তরে আফ্রিকান ভাষার শিকড় উপড়ে ফেলে বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজি মাধ্যম ব্যবহারের সুপারিশ করে।

কেনিয়ার শাসকদের এই কেনিয়া-বিরোধী, আফ্রিকা-বিরোধী মনোভাব কীভাবে সৃষ্টি হলো? ওয়াল্টার রডনি তাঁর ‘হাউ ইওরোপ আন্ডারডেভেলপ্ড আফ্রিকা’ পুস্তকে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, পিয়ের ফোঁস্যাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। বিংশ শতকের শুরুতে ফোঁস্যাঁ বলেছিলেন : “উপনিবেশকে মেট্রোপলের (অর্থাৎ প্যারির) সঙ্গে সুদৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে, যাতে মুক্তি পাবার পরও উপনিবেশের লোকজন ভাষা, চিন্তা ও আত্মার দিক থেকে ফরাসিই থেকে যায়।”

কেনিয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আফ্রিকান ভাষা ব্যবহার যখন বেআইনি হয়ে গেলো, তখন আফ্রিকান ভাষাভাষীরা একেকজন অপরাধীতে পরিণত হলেন। এদের  ‘ধরিয়ে দেবার’ জন্যে উৎসাহী লোকের অভাব ছিল না। যেসব শিশুকিশোর স্কুলে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলতো, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে পকেটে দুর্গন্ধযুক্ত চামড়া রাখতে বাধ্য করতো, যাতে ভবিষ্যতে তাদের সহজেই সনাক্ত করা যায়। কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে একটি প্ল্যাকার্ড বহন করতে হতো, যাতে লেখা থাকতো : ‘আই এ্যাম স্টুপিড!’ সার্কাসে পশুদের এভাবেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। পশুর যে আচরণ প্রশিক্ষকের পছন্দ নয়, সেই আচরণের জন্যে শাস্তি দেয়া হয়, আর যে আচরণ প্রশিক্ষকের পছন্দ, তার জন্যে দেয়া হয় পুরস্কার। একদিন সেই পশুদের সন্তানদের কাছে তাদের বাবা-মায়ের আচরণই স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হয়, ঠিক যেমন করে কোথাও ইংরেজি ভাষা উচ্চারিত হতে শুনলেই আমাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরে আর আফ্রিকান ভাষা শুনলেই জিহ্বা শুকিয়ে যেন বমি আসে।

চার্লস নিওনিওর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। নিওনিও এবং রানীর অ্যাকসেন্টে তাঁর ইংরেজি বলা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ওঁর আফ্রিকান ভাষাবিরোধী মনোভাবকেও দলছুট কোনো নেকড়ের অস্বাভাবিক আচরণ বলা যাবে না। আসল ঘটনা হচ্ছে, আফ্রিকার প্রত্যেক মধ্যবিত্তের মনে একজন নিওনিও বাস করে। ইওরোপ আফ্রিকাকে দিয়েছে চিবিয়ে চিবিয়ে ইংরেজি বলার ক্ষমতা আর আফ্রিকা তার বিনিময়ে ইওরোপের হাতে তুলে দিয়েছে পুরো মহাদেশের খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ। এটা ঠিক যে ইওরোপ তার তলোয়ারের জোরেই আফ্রিকা জয় করেছে, কিন্তু তার ভাষা বিজিতদের একটি অংশের মনে সেই জয় চিরস্থায়ী করে দিয়েছে।

আফ্রিকা এখন নিজের ব্যবহার্য বহু জিনিষ নিজেই তৈরি করতে শুরু করেছে। কিন্তু কাপড়, দই, পানীয় জলের বোতল নির্মাণেই কি আমরা থেমে থাকবো?  বাইসাইকেল কেন নয়? বিদ্যুৎচালিত গাড়ি, বিমান, দেশের প্রতিরক্ষার অস্ত্র কেন আমরা বানাবো না? কেনিয়ার সরকারকে কেনিয়ার শিল্প-উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে হবে। রাষ্ট্র ও জাতির ক্ষেত্রে চিরকালীন বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই, চিরকালীন জাতীয় বা রাষ্ঠ্রীয় স্বার্থ শুধু আছে। আজ যে-জাতি আমাদের অস্ত্রসজ্জিত করছে, কাল হয়তো সেই জাতিই আমাদের অস্ত্র কেড়ে নিতে দ্বিধা করবে না। প্রতিটি জাতিরই নিজের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার রয়েছে। ন্যূনতম পর্যায়ে হলেও এসব ক্ষমতা একটি জাতির থাকতেই হবে। আফ্রিকার আজকের নিওনিওরা কেন বলছে না : ‘আমাকে আর একটা বিমান বানিয়ে দেখাও!’

চলুন, আমরা চিন্তা ও ভাষার স্বাধীনতা, উৎপাদনের স্বকীয়তা এবং উৎকর্ষের জন্যে সংগ্রাম করি। এই সংগ্রাম আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হতে হবে। এর নিরিখেই নির্ধারিত হবে, কীভাবে আমরা কেনিয়া এবং আফ্রিকার দিকে তাকাবো এবং আমাদের শিক্ষায়তনে, অর্থনীতিতে, পরিকল্পনা প্রণয়নে, এমনকি মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা কী কী গ্রহণ করবো এবং কী কী বর্জন করবো। এই সংগ্রাম আমাদের জীবনযাত্রার ধরন, জাতীয় চরিত্রের অংশ হয়ে উঠতে হবে। এই সংগ্রামই নির্ধারণ করবে ‘কেনিয়ান’ বলতে কী বোঝায়। আসুন নির্ভরতা, অনুকরণ এবং ভিক্ষার সংস্কৃতিকে আমরা ‘না’ বলি।

যে অনুকরণ করে, সে সব সময় অনুসরণ করে। কোনো অনুকরণকারীর নিজের উপর বিশ্বাস নেই এবং এই বিশ্বাসহীনতার শুরু ভাষা দিয়ে। আপনি যদি পৃথিবীর সব ভাষাও জানেন, কিন্তু নিজের মাতৃভাষা বা আপনার সংস্কৃতির ভাষাটি না জানেন, তবে আপনি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছেন। মাতৃভাষা বা সংস্কৃতির নিজস্ব ভাষাটি জানার পর পৃথিবীর বাকি সব ভাষা এক এক করে অর্জন করার অপর নাম ক্ষমতায়ন।

গিনথুঙ্গুনরি শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় যাঁরা গড়ে তুলেছিলেন বা কেনিয়ার স্বাধীন স্কুলগুলো যারা পরিচালনা করতেন, তাদের কাছ থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তাঁরা তাদের পকেটে যা কিছু ছিল তা জনগণের উন্নয়নের জন্যে দান করতেন। এখন আমরা কী করি? জনগণের উন্নয়নের টাকা নিজের পকেটে ভরি। জনগণ যাদের বিশ্বাস করতো, তারা তখন নেতা হতো। এখন অল্প কিছু লোক যার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়। যদিও কেনিয়া তখন উপনিবেশ ছিল, সে যুগের নেতারা কেনিয়া এবং কেনিয়ানদের কথা ভাবতেন এবং হানাদার বিদেশীদের কবল থেকে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। যখনি আমরা বাইরের কারও দৃষ্টিভঙ্গী থেকে কেনিয়ার দিকে তাকাবো, আমরা এমন একটি স্বপ্নের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো, কেনিয়ার সাধারণ নারী ও পুরুষকে একদিন যে স্বপ্নটি রক্তের দামে কিনতে হয়েছিল।

অনুবাদক : শিশির ভট্টাচার্য্য, অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close