Home অনুবাদ নাইপলের নোবেল-ভাষণ : দুই জগৎ / অভিজিৎ মুখার্জি অনূদিত

নাইপলের নোবেল-ভাষণ : দুই জগৎ / অভিজিৎ মুখার্জি অনূদিত

প্রকাশঃ November 18, 2016

নাইপলের নোবেল-ভাষণ : দুই জগৎ / অভিজিৎ মুখার্জি অনূদিত
0
0

তীরন্দাজ নাইপল

নোবেলজয়ী লেখক স্যার বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল এখন ঢাকায়। লিট ফেস্টে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি ঢাকা এসেছেন। এই প্রথম কোনো নোবেলজয়ী লেখক বাংলাদেশের কোনো সাহিত্য উৎসবে যোগ দিচ্ছেন। গতকাল তিনি ফেস্টের উদ্বোধনও করেছেন। ইতিপূর্বে আমরা তার একটা ছোটগল্প এবং নাইপলের উপর একটা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছি। আজ প্রকাশ করা হলো তার নোবেল-ভাষণটি। এর পরে প্রকাশিত হবে তার গল্প ও সাক্ষাৎকার। সবমিলিয়ে এই আয়োজনটি পাঠকদের কেমন লাগছে আমাদের ইমেইল করে বা ফেসবুক ফ্যানপেজে লিখে জানান। তীরন্দাজের ঠিকানা teerandaz.com ফ্যানপেজের ঠিকানা https://www.facebook.com/eteerandaz/?fref=ts

মোজাফফর হোসেন / অতিথি সম্পাদক

২০০১ সালে ভি এস নাইপল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। প্রথা হল, পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত লেখককে একটি ভাষণ দিতে হয়। এখানে সেই ভাষণেরই কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হল। অনুবাদ করেছেন অভিজিৎ মুখার্জি। তিনি ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে জাপানি ভাষার নানা ধরনের লেখা বাংলায় অনুবাদ করছেন। হারুকি মুরাকামির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে অনুবাদ করেছেন মুরাকামির ছোটগল্প  ও উপন্যাস কাফকা অন দ্য শোর। অভিজিৎ মুখার্জির প্রতি তীরন্দাজ-এর কৃতজ্ঞতা।

 

নাইপলের নোবেল-ভাষণ : দুই জগৎ

আমার ক্ষেত্রে সচরাচর এমনটা ঘটে না। এ যাবত আমি সর্বসমক্ষে পাঠই করেছি, ভাষণ দিইনি। লোকে আমাকে ভাষণ দিতে বললে বলে দিয়েছি যে ভাষণ দেওয়ার মতো কিছু আমার কাছে নেই। এবং কথাটা সত্যি। বলতে কী, একজন লোক, যে কিনা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে কথা, নানা আবেগ এবং আইডিয়া নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে, তার কাছ থেকে কিছু কথা পাওয়া যাবে না, এটা আশ্চর্যজনক বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু আমার তরফে মূল্যবান যা কিছু সব আমার বইগুলোতেই রয়েছে। এর অতিরিক্ত যেটুকু কোনও এক ক্ষণে আমার কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে, তা যে ঠিকমত কোনও সুস্পষ্ট অবয়ব ধারণ করে থাকে এমন নয়। আমি যে সে সম্পর্কে খুব সচেতন থাকি, তা নয়; ওটা অপেক্ষা করে থাকে আমার পরবর্তী বইটার জন্য। সত্যিই যখন লিখছি, ভাগ্য ভালো থাকলে, তখন ওটা আমার কাছে ধরা দেয় এবং আমাকে বেশ আশ্চর্যই করে দেয়। এই আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটারই প্রত্যাশায় থাকি যখন লিখতে বসি। এভাবেই আমি বিচার করি, আমি ঠিক কী করছি—কাজটা কদাপি খুব সহজ কিছু নয়।

লেখকের সামাজিক সত্তা আর তার লেখক সত্তা এ দুইয়ের মধ্যে ফারাক সম্বন্ধে খুব গভীরে গিয়ে লিখেছেন প্রুস্ত। ওঁর প্রথম দিকের লেখালেখির থেকে সাজিয়ে নিয়ে একটা বই হয়েছিল, Against Sainte-Beuve, তার কয়েকটা প্রবন্ধের মধ্যে আপনারা ওঁর ভাবনা-চিন্তার হদিস পাবেন।

উনিশ শতকের ফরাসি সমালোচক সঁৎ ব্যোভ্‌ বিশ্বাস করতেন যে একজন লেখককে বুঝতে গেলে যথাসাধ্য জানার চেষ্টা করতে হবে লোকটি বাহ্যত কেমন আর বিশদভাবে তার জীবন সম্বন্ধে। পদ্ধতিটায় চমৎকারিত্ব আছে, এই যে তার কাজের ওপর আলো ফেলতে লোকটিকেই ব্যবহার করা। এর যুক্তিও প্রশ্নাতীত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রুস্ত অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই সেটিকে খণ্ডন করেছেন। “সঁৎ ব্যোভের এই পদ্ধতি,” প্রুস্ত লিখছেন, “নিজেকে সামান্য চিনলেও যেটা জানা যায়, সেটাকেই খেয়ালে রাখেনি। আমাদের নানা অভ্যাসে, সামাজিক জীবনে, আমাদের পাপাচারে যে সত্তাটি প্রকাশ পায়, তার থেকে ভিন্ন একটা সত্তা কিন্তু একটা বইয়ের জন্ম দেয়। সেই নির্দিষ্ট সত্তাটিকে যদি আমরা ধরতে চাই, তবে ঢুঁড়ে দেখতে হবে আমাদের নিজেদেরই একেবারে অভ্যন্তরে, এবং সেখানেই একটা কিছু খাড়া করার চেষ্টা করলে হয়তো জিনিসটাতে পৌঁছেও যেতে পারি।”

যখনই কোনও লেখকের জীবনী পড়ব, কিংবা এমন কোনও লোকের, যাকে প্রেরণা বা তাগিদের ওপর নির্ভর করতে হয়, প্রুস্তের এই কথাগুলো যেন আমরা মনে রাখি। খুঁটিনাটি সুদ্ধ পুরো জীবনটা, কিংবা ব্যতিক্রমী দিকগুলো, বন্ধুত্বের বিবরণ, সব মেলে ধরার পরেও লেখার রহস্যটা থেকেই যাবে। যতই নথিপত্র সংগ্রহ করি না কেন, সেগুলো যত চমৎকারই হোক না কেন, ওটি অধরাই থেকে যাবে। লেখকের জীবনী—এমনকি আত্মজীবনীও—এই অসম্পূর্ণতাটুকু কখনও এড়াতে পারে না।

কোনও কিছুকে একটু বড়ো করে নিয়ে দেখাতে, এবং প্রীতিকরভাবে, প্রুস্তের জুড়ি নেই। আসুন আবার একটু ফিরে যাই Against Sainte-Beuve প্রসঙ্গে। “আসলে,” প্রুস্ত বলছেন, “সর্বজনের জন্য যেটা পেশ করা হয়, সেটা একেবারে নিজের অন্তরতম সত্তার ক্ষরণ, একা বসে লেখা এবং একান্তই নিজের জন্য। কথাবার্তায় ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যা বলে লোকে, অথবা ড্রয়িংরুম নিবন্ধগুলোতে, যেগুলো কিনা নেহাতই ছাপার অক্ষরে কথাবার্তার চেয়ে বেশি কিছু নয়—তা একান্তই সত্তার একেবারে অগভীর উপরিতলের ব্যাপার, সেই অন্তরতম সত্ত্বার সঙ্গে সম্পর্কহীন, যে সত্তা অবধি পৌঁছতে গেলে জগতটাকে এবং সেই জগতে যাতায়াত করা সত্তাটিকে সরিয়ে রাখতে হয়।”

যে-সময় প্রুস্ত কথাগুলো বলেছিলেন, তখনও কিন্তু তিনি সেই বিশেষ বিষয়টি পেয়ে যাননি যা তাঁকে পরবর্তীকালে এক মহান সারস্বত-কীর্তির তৃপ্তি এনে দিয়েছিল। আমি যেটুকু তাঁর উদ্ধৃতি এখানে দিলাম, তাতে আপনারা বুঝতেই পারছেন যে উনি ওঁর স্বজ্ঞার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেন এবং ভাগ্যের উপযুক্তরকম সহায়তার প্রতীক্ষায় ছিলেন। এর আগে অন্যত্রও আমি এই কথাগুলো উদ্ধৃত করেছি। তার কারণ, এই কথাগুলোই বলে দেয় আমিও কীভাবে আমার কাজের রাস্তায় এগোনোর চেষ্টা করেছি। আমিও সজ্ঞা বা ইনট্যুইশনে আস্থা রেখেছি। শুরুর সময়েও রেখেছি, এখনও রাখি। আমি কোনও ধারণাই করতে পারি না যে কী ঘটতে চলেছে, লিখতে লিখতে এরপরে কোথায় গিয়ে পৌঁছোব। বিষয় খুঁজে পেতেও আমি ইনট্যুইশনে আস্থা রেখেছি, লেখার সময়ও ওটার দ্বারাই চালিত হয়েছি। শুরু করার সময় আমার মনে কেবল একটা ধারণা থাকে, একটা অবয়ব, কিন্তু ঠিক কী যে লিখেছি সেটা পুরোপুরি বুঝতে পারি তার পরে কয়েক বছর গেলে তবেই।

আগেই বলেছি, কোনওরকম মূল্য আছে এমন কিছু আমার থেকে পেতে হলে পড়তে হবে আমার বইগুলো। এবার আরেক পা এগিয়ে বলি, আমি নেহাতই আমার বইগুলোর সমষ্টিমাত্র। প্রত্যেকটা বইয়েরই ধারণাটা এসেছে সজ্ঞায় ভর করে, আর কাহিনিমূলক হলে, সেটাকে রূপও দেওয়া হয়েছে ওই একই উপায়ে। প্রতিটা বই-ই দাঁড়িয়ে আছে এর আগে অবধি যা কিছু হয়েছে তার ওপর, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, লেখালেখি জীবনের যে কোনো পর্যায়ে আমার সম্বন্ধে বলা যেতেই পারতো যে সর্বশেষ বইটাতেই ধরা আছে আগের অন্য বইগুলোও।

এসবেরই কারণ হচ্ছে আমার ব্যাকগ্রাউন্ড। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড একাধারে অত্যন্ত সরল, আবার খুবই গোলমেলে। জন্মেছিলাম ত্রিনিদাদে। ভেনেজুয়েলার বিশাল নদী ওরিনোকোর মুখে এটি একটি দ্বীপ। ত্রিনিদাদ তাই, ঠিক দক্ষিণ অ্যামেরিকাতেও নয়, আবার ঠিক ক্যারিবিয়ানেও নয়। এটার পত্তন হয়েছিল নয়া দুনিয়ার এক কৃষিমুখী উপনিবেশ হিসেবে, আর ১৯৩২ সালে আমার জন্মের সময় এর জনসংখ্যা তখন চার লক্ষ। এর মধ্যে দেড় লক্ষ ছিল ভারতীয়, হিন্দু এবং মুসলমান, প্রায় সকলেরই কৃষক পরিবারে জন্ম, এবং প্রায় সকলেই গঙ্গার অববাহিকায় সমতলভূমি থেকে আসা।

এদের নিয়েই আমরা একটা ছোট গোষ্ঠি। ভারত থেকে পাড়ি জমিয়ে এতগুলো লোকের এখানে আসাটা ঘটেছিল ১৮৮০ সালের পরে। বোঝাপড়াটা হয়েছিল এরকম : এখানকার মহালে পাঁচ বছর কাজ করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল লোকেরা। এই সময়টা কাটানোর পরে তাদের ছোট একফালি জমি দেওয়া হতো, সম্ভবত পাঁচ একর, নতুবা ভারতে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো। ১৯১৭ সালে গান্ধী ও অন্যান্যদের আন্দোলনের ফলে এই চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকপ্রথা রদ করে দেওয়া হয়। আর, সেই কারণেই হয়তো, অথবা অন্য কোনও কারণে, পরের দিকে আসা অনেকের ক্ষেত্রেই আর জমি কিংবা ভারতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মানা হয়নি। এই লোকগুলো তখন একেবারেই নিরাশ্রয় হয়ে হয়ে পড়লো। রাজধানী পোর্ট অব স্পেনের রাস্তায় তারা ঘুমাতো। ছোটবেলায় তাদের দেখেছিলাম। তখন সম্ভবত জানতাম না যে ওরা একেবারে নিরাশ্রয়—সম্ভবত অনেক পরে কখনো কথাটা মাথায় এসেছিল—আমার মনে লোকগুলো কোনও ছাপই ফেলতে পারেনি। ক্ষেতখামারের সেই উপনিবেশের হৃদয়হীনতার দিকটার এটাও একটা অংশ।

গালফ্‌ অব পারিয়া-র থেকে স্থলভাগের দুই কী তিন মাইল অভ্যন্তরে চৌয়ানা বলে একটা ছোট শহরে আমার জন্ম হয়। কী বানানের দিক থেকে, কী উচ্চারণের দিক থেকে, চৌয়ানা এক আশ্চর্য নাম। সেই অঞ্চলে ভারতীয়রাই ছিল সংখ্যায় বেশি আর তাদের অনেকেই ঠিক করলো যে ‘চৌহান’ বলে ভারতের যে একটি জাত বা কাস্ট, সেই নামেই তারা জায়গাটাকে ডাকবে।

……

আমার ছোটবেলায় একটা অস্পষ্ট গল্প চালু ছিল—এখন এই বয়েসে এসে আমি সেটার কথা ভেবে অস্থির বোধ করি—কিছু কিছু নির্দিষ্ট সময়ে আদি বাসিন্দারা মূল ভূখণ্ড থেকে নৌকো বেয়ে পার হয়ে এসে, দ্বীপের দক্ষিণাংশে বনের মধ্য দিয়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একধরণের ফল কুড়োতো কিংবা পুজোটুজো দিত, তারপর আবার গালফ্‌ অব পারিয়া পার হয়ে ওরিনোকো নদীর মুখের কাছে জলাভূমিতে ফিরে যেত। চারশো বছর ধরে এতরকম বিপর্যয়ের পরেও, ত্রিনিদাদ থেকে প্রাচীন অধিবাসীরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরেও যে এই আচারটা টিকে ছিল, এতেই এর বিরাট গুরুত্বটা আঁচ করা যায়। কিংবা হয়তো—ত্রিনিদাদ আর ভেনেজুয়েলার গাছগাছড়া, উদ্ভিদ, যদিও একই—ওরা নির্দিষ্ট কোনো একটা ফল কুড়োতে আসত। বলা মুশকিল, কারুকে এই নিয়ে কোনও কৌতূহল প্রকাশ করতে দেখিনি। এখন আর সেসবের স্মৃতিটুকুও নেই, আর সেই পবিত্র স্থান, যদি সেরকম কিছু একসময় থেকেও থাকে, এখন বারোয়ারি জমি।

অতীত অতীতই। সাধারণভাবে এটাই সম্ভবত ছিল মনোভাব। আর আমরা, ভারত থেকে এসে বসতি স্থাপনকারীরা, দ্বীপটার প্রতি এমনই মনোভাব পোষণ করতাম। আমাদের জীবন ছিল মুখ্যত আচারনির্ভর, আত্মসমীক্ষা করতে জানতাম না, অথচ ওটা থেকেই তো শেখা শুরু হয়। প্রাচীন চৌয়ানদের জমিতে বসবাসকারী আমাদের মধ্যে অর্ধেকেরই ভানটা ছিল—হয়তো ঠিক ভান নয়, হয়তো নেহাতই অনুভব করতো, স্পষ্ট কোনো অভিমত ছাড়াই—যে আমরা যেন সঙ্গে করে একটা ভারত নিয়ে এসেছি, যেটাকে ইচ্ছে করলেই, একেবারে অবিকৃতভাবে সেই সমতলের ওপর কার্পেটের মতো গড়িয়ে পেতে দেওয়া যেতে পারে।

চৌয়ানাতে আমার ঠাকুর্মার (দাদীর) বাড়িটার ছিল দু’টো অংশ। ইঁট আর প্লাস্টারের সম্মুখের অংশটাতে সাদা রঙ করা। এই অংশটা ছিল ভারতীয় বাড়ির মতোই, ওপর তলাটায় ছিল রেলিং দেওয়া একটা দারুণ ছাদ, আর তারও ওপর তলায় ছিল প্রার্থনাকক্ষ। নানা কারুকাজের অলঙ্করণে বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষার ছাপ ছিল, থামের গোড়াতে পদ্মফুল, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, আর এই সবই করা হয়েছিল কারিগরদের মনে ভারতের নানাকিছুর যে স্মৃতি ছিল তারই ভিত্তিতে। স্থাপত্য হিসেবে ত্রিনিদাদের পরিপ্রেক্ষিতে একটু অদ্ভুতই দেখাত। বাড়ির পিছনের অংশটা ছিল ফরাসি-ক্যারিবিয়ান স্টাইলে কাঠের তৈরি একটা বিল্ডিং। এদের মধ্যে সেতুর মতো করে সংযোগ সাধন করতো উঁচুতে স্থাপিত একটা ঘর। প্রবেশ করার গেটটা ছিল পাশ দিয়ে, দুটো বাড়ির মাঝখানে। কাঠের ফ্রেমের ওপর করোগেটেড লোহার একটা উঁচু তোরণ। খানিকটা বেড়ার আড়ালের কাজও হত এতে।

ফলত শিশু অবস্থা থেকেই দুটো জগতের ধারণাটা আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল। করোগেটেড লোহার উঁচু গেটের বাইরে এ্কটা জগত, এবং বাড়ির একটা জগত, কিংবা নিদেনপক্ষে বলা যায় ঠাকুর্মার (দাদীর) বাড়ির একটা জগৎ। আমাদের জাতপাতের ধারণার একটা অবশিষ্টাংশ যেন, যেটা দিয়ে অপাংক্তেয় করে বাইরে ঠেলে দিয়ে প্রবেশ রুদ্ধ করে দেওয়া যায়। সদ্য আগত বলে ত্রিনিদাদে আমরা ছিলাম একটু দুর্বল একটা গোষ্ঠী, এই বিচ্ছিন্নতাটুকু একধরণের সুরক্ষাও দিত; এর মাধ্যমে—তখনকার মতো, নেহাতই তখনকার মতো—আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ম মেনে নিজেদের মতো করে, আমাদের নিজস্ব এক ক্রমবিলীয়মান ভারতে বাস করতে পেরেছিলাম। অদ্ভুত এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতার সৃষ্টি হয়েছিল এতে। অন্তর্মুখী হয়ে আমরা দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছিলাম; বাইরের জগতটার অস্তিত্ব তখন এক অন্ধকারের মধ্যে; কিছু নিয়েই আমাদের কোনও কৌতূহল ছিল না।

……

যখন লেখালেখি শুরু করেছিলাম, সামনের পথটা সম্বন্ধে কোনও ধারণাই ছিল না। শুধু একটা বই বা’র করার ইচ্ছে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরগুলোর পরেও আমি ইংল্যান্ডেই থেকে গিয়েছিলাম আর সেখানেই আমি লেখার চেষ্টা করছিলাম। মনে হয়েছিল যে আমার অভিজ্ঞতা বড্ড কম, বই লেখার পক্ষে যথেষ্ট নয়। এমন কোনও বই খুঁজে পাইনি যা আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের কাছাকাছি। অল্পবয়েসি একজন ফরাসি কিংবা ইংরেজ কিন্তু যতখুশি বই পেয়ে যেতে পারত যা দিয়ে সে শুরু করতে পারে। আমার জন্য ব্যাপারটা এরকম ছিল না। আমাদের ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমার বাবার গল্পগুলো ছিল সবই অতীতের ব্যাপার। আমার জগতটা তো অন্য জগৎ। অনেক বেশি নগরকেন্দ্রিক, অনেকটাই মিশ্র। আমাদের বৃহত্তর পরিবারের এলোমেলো, সূত্রহীন জীবনযাত্রার সাধারণ বাহ্যিক খুঁটিনাটি—শোয়ার ঘর কিংবা শোয়ার জায়গা, খাওয়ার সময়, স্রেফ লোকের সংখ্যা—সামলে ওঠা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। কী আমার বাড়ির ভেতরের জীবন, কী তার বাইরের জগতটা, সবকিছুই অনেক কিছু ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে। একইসঙ্গে আমাদের নিজেদের ব্যাপারগুলোও এত বিশাল—যেমন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা আর আমাদের ইতিহাস—আমার সেসব জানা ছিল না।

……

কাহিনিমূলক এবং পর্যটনে বেরিয়ে লেখা বই, দু’রকমই লিখতে গিয়ে আমি খানিকটা করে আমার দেখার ধরন অর্জন করেছি, আপনারা বুঝতেই পারবেন যে সাহিত্যের যে কোনো ফর্মই আমার কাছে সমান মূল্যবান। যেমন যেবার ভারত নিয়ে আমার তৃতীয় বইটা লিখতে বেরোলাম—প্রথম বইটার ছাব্বিশ বছর পরে—অনুধাবন করলাম যে পর্যটনমূলক কোনও বইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন ধরনের লোকেদের মাঝখানে লেখক ভ্রমণ করছেন। লোকেদের নিজেরাই নিজেদের চিনিয়ে দেওয়াটা জরুরি। খুবই সহজ একটা আইডিয়া, কিন্তু তার জন্য লাগবে একটা নতুন ধরনের বই; প্রয়োজন হল ভ্রমণের নতুন একটা ধরন। পরে, যখন দ্বিতীয়বারের জন্য আমি ইসলামি দুনিয়াটা দেখতে গেলাম, ঠিক এই পদ্ধতিটাই অবলম্বন করলাম।

সর্বদাই ইনট্যুইশনের মাধ্যমেই চলেছি। সাহিত্যগতভাবে কিংবা রাজনৈতিক, আমার নিজস্ব কোনও সিস্টেম নেই। আমাকে পথ দেখায় এমন কোনও রাজনৈতিক ধারণা আমার নেই। সেটা হয়তো পূর্বপুরুষদের থেকেই পাওয়া। এ বছর প্রয়াত হলেন ভারতের লেখক আর কে নারায়ণ, তাঁরও কোনও রাজনৈতিক ধারণার বালাই ছিল না। আমার নিজের বাবা, একটা খুব কঠিন, নিরালোক সময়ে যিনি নিজের গল্পগুলো লিখেছিলেন, কোনও পুরস্কারের প্রত্যাশা করেননি, তিনিও কোনও রাজনৈতিক ধারণার অধিকারী ছিলেন না। এর কারণ হয়তো এই যে বহু শতক ধরে আমরা কর্তৃপক্ষের খুব একটা নিকটবর্তী কিছু ছিলাম না। সেটা আমাদের একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ জুগিয়েছিল। আমার মনে হয়েছে যে আমরা কোনোকিছুর মধ্যে কৌতুক রসের আর করুণ দিকগুলো সম্পর্কেই বেশি আগ্রহী।

……

আমার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। যা করতে পেরেছি তাতে আমি খুশি, সৃষ্টিশীলতায় নিজেকে যতদূর ঠেলে নিয়ে যেতে পেরেছি তাতে তৃপ্ত। যেহেতু ইনট্যুইশনের ওপর নির্ভর করে একভাবে আমি লিখে গেছি, এবং যেহেতু আমার বিষয়বস্তুগুলোর প্রকৃতি বেশ দিশেহারা করে দেওয়ার মতো, প্রত্যেকটি বইকে আমি আশির্বাদস্বরূপ জ্ঞান করি। প্রত্যেকটা বই আমাকে আশ্চর্য করে দিয়েছে, যতক্ষণ না লিখতে বসেছি ওটার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতনই ছিলাম না। তবে আমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হতো শুরুটা করা। মনেই হয়—এবং এই উৎকণ্ঠাটা এখনও মনের মধ্যে জাজ্বল্যমান—শুরু করার আগেই আমি ব্যর্থ হয়ে বসতে পারতাম।

Against Sainte-Beuve বইতে প্রুস্তের যেসব চমৎকার প্রবন্ধ আছে, তারই একটার মাধ্যমে, আমি যেভাবে শুরু করেছিলাম, সেভাবেই শেষ করব। “প্রতিভার অধিকারী হলে যেসব মনোজ্ঞ জিনিস আমরা লিখি”, প্রুস্ত বলছেন, “সেগুলো আমাদের ভেতরেই আছে, একটু অস্পষ্ট হয়ে, সেইসব সুরের স্মৃতির মতো, যেগুলো ভালো লেগেছিল কিন্তু তার অবয়বটা আর মনে করতে পারছি না। অপরিজ্ঞাত সত্যের ঝাপসা স্মৃতি নিয়ে মেতে থাকতে পারে যেসব লোকেরা, তারাই আশির্বাদধন্য…প্রতিভা আসলে একধরণের স্মৃতি, যার সহায়তায় তারা শেষপর্যন্ত সেই অস্ফুট সংগীতকে কাছে টেনে আনতে পারে, পরিষ্কার শুনতে পায়, লিপিবদ্ধ করে নিতে পারে…।”

প্রুস্ত বলেন প্রতিভা, আমি বলব, সৌভাগ্য আর প্রভূত পরিশ্রম।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close