Home অনুবাদ নাদিন গর্ডিমার > ছেঁড়া শেকড় >> ছোটগল্প >>> অনুবাদ বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

নাদিন গর্ডিমার > ছেঁড়া শেকড় >> ছোটগল্প >>> অনুবাদ বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

প্রকাশঃ July 22, 2017

নাদিন গর্ডিমার > ছেঁড়া শেকড় >> ছোটগল্প >>>  অনুবাদ বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
0
0

নাদিন গর্ডিমার > ছেঁড়া শেকড় >> ছোটগল্প 

বাবা গিয়েছিল আগেই। আর মা যে কোথায় চলে গেল। বুঝতেই পারলাম না। বলেছিল – দোকান যাচ্ছি। তারপর বিকাল ঢলে পড়ল রাত্তিরের দিকে। অন্ধকার এল। মা এল না। মা এবং বাবা দুজনের চলে যাওয়ার ধরন আলাদা। বাবা যুদ্ধে গিয়েছিল আর ফেরেনি। মা দোকানে।

আমরা প্রতিমুহূর্ত যুদ্ধের ভেতর থাকি। আমি, আমার দাদা, ভাই। বাবার মতো আমাদের হাতে বন্দুক নেই। বাবা যাদের সাথে লড়াই করত তাদের দস্যু বলে। সারা দেশ বলে। সরকার বলে। তারা দাপিয়ে বেড়ায় এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। তাদের ভয়ে আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কিন্তু কতদূর যাব। কোথায় যাব। দুরের পৃথিবী তো আমরা চিনি না।

মা খবর পেয়েছিল দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে। ছুটে গিয়েছিল শোনামাত্র। কতদিন ভালো করে রান্না হয়নি। আমরাও ভুলে গিয়েছিলাম রান্নার স্বাদ। শুধু নুন মাখানো খাবার খেতে খেতে জিভের উপর শ্যাওলা জমে যাচ্ছিল। অনেক কসরত করে অনেক ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কির পর মা তেল পেয়েছিল কিন্তু কারা যেন তাকে রাস্তায় ফেলে তেলের বোতলটা কেড়ে নিয়েছিল। হয়তো দস্যুরা।  মা আর ফিরে আসেনি।

আমরা বাইরে যেতে ভয় পেতাম। এই বুঝি দস্যুরা তাড়া করল আমাদের। অবশ্য এখন আর সে ভয় ততখানি নেই। তিন বার ওরা আমাদের বাড়িটা আক্রমণ করেছিল। প্রথমবার যখন ওরা আসে তখন প্রাণ হাতে নিয়ে আমরা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম। ঘরে যা ছিল ওরা সব নিয়ে চলে গেছিল। দ্বিতীয়বার যখন এল তখন বাড়িতে কিছুই পেল না, না খাবার না তেল। রাগে ওরা আগুন লাগিয়ে দিল আমাদের ঘরে। দাউ দাউ করে জ্বলছিল বাড়িটা। মা অনেক কষ্টে কিছু টিন জোগাড় করে চারপাশ ঘিরে বাড়ির আদল দিয়েছিল। মাথার উপর আকাশ। এরপর ওরা যখন আসে তখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল। ভেবেছিল এখানে নিশ্চয়ই কোন লোকজন নেই।

মা নেই। ভয় আরও পেয়ে বসল। মাথার উপর দাদা আছে। কিন্তু সে-ও তো তেমন কিছু বড় নয়। ছোট ভাইটা সবসময় কাঁদত খিদেতে। আমি পেটের সাথে তাকে গামছা দিয়ে বেঁধে রাখতাম। যেমন ভাবে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাকে তার থলিতে রাখে মা। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। তারপর আমাদের ঠাকুরদা এবং ঠাকুমা এল গ্রাম থেকে। আমরা একা আছি বলে। মা তেল কিনতে গিয়ে আর ফেরেনি। চিন্তায় অস্থির লাগছিল ঠাকুমার চোখমুখ। তবু ঠাকুরদার চেয়ে  ঠাকুমাকে দেখে আমাদের সাহস কিছুটা হলেও বেড়ে গেল। আসলে আমাদের দাদুর চেয়ে ঠাকুমার শারীরিক উচ্চতা এবং গঠন এবং মুখের মধ্যে তেজস্বী ভাব আমাদের মনে জমে থাকা ভয় মুছে দিল। ঠাকুমা বলল – এখানে আর কিসের জন্য থাকবি? চল, আমার সাথে চল। আমি মায়ের কথা ভেবেছিলাম, যদি ফিরে আসে আর আমাদের দেখতে না পায়। ঠাকুমার নাছোড় আবেদনের কাছে তা ধোপে টেকেনি। আমাদের প্রায় জোর করেই তার বাড়িতে নিয়ে এল। ভাই ঘুমোচ্ছিল ঠাকুমার পিঠে। দাদা ধরেছিল  ঠাকুরদার হাত। আমি আস্তে আস্তে ওদের পিছু পিছু হাঁটছিলাম। আমরা সবাই ভয় পাচ্ছিলাম দস্যুদের। ভাই ভয়ের বয়সে পা দেয়নি বলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। অনেক দিন সেখানে থাকতে হয়েছিল। মা তবু ফিরে আসেনি। এখানে এসেও খাবারের কষ্ট আমাদের কমেনি বরং বেড়েছিল। ভাইকে মাঝে মাঝে একজন মহিলা এসে দুধ খাইয়ে যেত। আমরা বুনো শাক খুঁজতে চলে যেতাম নদী পেরিয়ে, গাছের ছায়া পেরিয়ে। কিন্তু আমরা সেখানে যাবার আগেই কেউ তুলে নিয়ে গেছে শাকপাতা।

ঠাকুরদার কিছু ভেড়া, গবাদি পশু আর শস্যক্ষেত ছিল। দস্যুরা তা লুট করে নিয়ে যাওয়ায় এখন সর্বস্বান্ত। ফলে জল খেয়ে আমাদের উপোষ করে থাকা ছাড়া আর কোন রাস্তা ছিলনা। আমরা কাঁদতাম। জমিতে বীজ ফেলার সময় এল। ঠাকুরদা তাও পারল না। কারণ, ঘরে কোন বীজ অবশিষ্ট ছিল না। তার অশক্ত শরীরের মত বাড়িটাও ভেঙেচুরে যেতে লাগল। তখন ঠাকুমা ঠিক করল এভাবে দিন কাটতে পারবে না। দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমাদের নিতেই হল। ঠাকুরমা-ই অবশ্য সিদ্ধান্তটা নিল। আমাদের ঠাকুরদা গুনগুন করে মৃদু স্বরে প্রতিবাদ জানাল। ঠাকুমা পাত্তা দিল না – এই শিশু বাচ্চাগুলো কি অকালে মারা পড়বে?

আমরা সেই দেশ খুঁজতে লাগলাম যেখানে যুদ্ধ নেই, যেখানে দস্যু নেই। দূরে, অনেক দূরে সেরকম জায়গা নিশ্চয়ই আছে। ঠাকুমা চার্চের পোশাক দিয়ে দিল একজনকে তার বদলে পেল   কয়েক মুঠো শুকনো দানা। তা সেদ্ধ করে ঠাকুমা বেঁধে নিল কাপড়ের খুঁটে। আমরা অবাক চোখে তাকালাম তার দিকে – তুমি চার্চে যাবে কীকরে?

– ক্ষিদের চেয়ে বড় ধর্ম কিছু নেই। তাছাড়া বহুদূর যেতে হবে আমাদের। জিনিস যত কম হয় ততই মঙ্গল।

আমরা ভেবেছিলাম পথে নদী পাব। জল আমাদের তৃষ্ণা মেটাবে। কিন্তু কোন জলধারা চোখে পড়ল না। ঠাকুরমা তার জুতো জোড়া বিক্রি করে এক বোতল জল কিনল।

আমরা ক্রুগার পার্ক পেরিয়ে এগিয়ে যাব। এতদূর অবধি রাস্তা আমাদের জানা ছিল। আমাদের সাথে আরও অনেক লোক এসে জুটল। একজন লোক আমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি ক্রমাগত ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করছিলাম – ক্রুগার পার্ক এল?  লোকটি বলল – না আসেনি। সারাদিন ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের ক্লান্ত লাগছিল। রাস্তায় আমরা বাঁদর দেখলাম, কচ্ছপ দেখলাম।  লোকটা কচ্ছপটিকে ধরল মেরে  রান্না করবে বলে। আমার খুব খিদে পাচ্ছিল। কিন্তু একসময় বাধ্য হয়ে কচ্ছপটাকে সে ছেড়ে দিল। এখানে আগুন জ্বালালে ধুয়ো হবে। আর ধুয়ো দেখলেই পুলিশ আর বনরক্ষক ছুটে আসবে। দস্যুরা ছুটে আসবে। তখন অনেক হ্যাপা। তাই সাদা মানুষদের আস্তানা দূরে রেখে আমরা ক্রমাগত হেঁটে যেতে লাগলাম।

একটা হরিণ দৌড়ে গেল আমাদের পাশ দিয়ে। এত উঁচুতে লাফ দিল মনে হল আকাশে উড়ে যাচ্ছে। জলের সন্ধান না জানায় আমাদের তৃষ্ণা বেড়ে যাচ্ছিল। মুখ শুকিয়ে যাচ্ছিল আমার। জন্তুদের পিছু পিছু গিয়ে আমরা জলাশয় দেখে নিচ্ছিলাম। নদীতীরের গাছগুলোতে থোকা থোকা ডুমুর ধরে আছে। পিঁপড়ে ভর্তি। তবু আমরা পেড়ে খেলাম।  আর কোনকিছুই যা জন্তুরা পারে, আমরা খেতে পারলাম না। যুদ্ধও বোধ হয় মানুষকে পুরোপুরি জন্তু বানিয়ে দিতে পারেনা।

দিনের বেলায় সিংহগুলো ঘুমিয়ে ছিল। ওদের গায়ের রঙ ঘাসের রঙের সাথে মিলেমিশে  একাকার হয়ে আছে, তাই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। সে আমাদের দেখিয়ে দিল। বলল – সাবধানে, আমাদের অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে। আমার খুব ক্লান্তি লাগছিল। ইচ্ছে করছিল সিংহগুলোর মতন ঘুমিয়ে থাকি। আমার ছোট ভাই দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি যখন পিঠে চাপিয়ে তাকে বহন করতাম মনে হত ওর ওজন একবিন্দু কমেনি। আমরা দিনে হাঁটতাম, আমরা রাতেও হাঁটতাম। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেতাম সাদা মানুষেরা তাদের আস্তানায় রান্না করছে। মাংসের ঝোলের গন্ধ ভেসে বেড়াত বাতাসে। আমি নাকের ভেতর বাতাসটাকে অনেকক্ষণ বহন করতাম। একজন, আমাদের দলের একজন মহিলা ওদের কাছে যেতে চাইল। বলল- ওদের কাছে কিছু খাবার চাইবে। ঠাকুমা বাধা দিল।

মাঝে মাঝে আমরা থামতাম। সবাই মিলে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে নিতাম। আমাদের জিনিসপত্র যা-কিছু ছিল, সব ভরে রাখতাম ঝোপের নীচে। একদিন সেরকমই ঘুমিয়েছিলাম। যেখানে ঘুমিয়েছিলাম তার অল্প দূরেই হাতিঘাসের জঙ্গল। হাতির সমান উচ্চতা এক-একটা ঘাসের। ঘন হয়ে আছে ঘাসগুলো। সকালবেলায় দাদুর খুব পায়খানা পেয়েছিল। সে তো আর আমার ভাইয়ের মতো সবার সামনে করতে পারে না। দাদু হাতিঘাসের জঙ্গলে আড়াল খুঁজে নিয়েছিল। অনেকক্ষণ হয়ে গেলেও দাদুর ফিরে আসার নাম নেই। সঙ্গীরা অস্থির হয়ে পড়ছিল। তবু উৎকণ্ঠা নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিল। আমি ঘাসগুলোর দিকে তাকিয়েছিলাম। দাদু ঘাস সরিয়ে ঠিক এসে পড়বে আমাদের কাছে। কিন্তু আসার কোন শব্দ পেলাম না।  ছোট আকারের মানুষ, বড় বড় ঘাসের জমিতে ঢাকা পড়ে গেছে তার অবয়ব, কিন্তু সে আসছে। আমরা খুব নীচু গলায় দাদুকে ডেকে যাচ্ছিলাম। যাতে শুধুমাত্র দাদুই শুনতে পায়, কিন্তু কোন দস্যুর কানে শব্দ না যায়। সারাদিন সেখানে রইলাম। সারা রাত্রি। তবু দাদু এলনা। স্বপ্নের ভেতর দাদু এসে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে একটা ঝোপের কাছে, যেখানে কোন মানুষ যেতে পারে না। ঘুম ভাঙলে দেখলাম তখনও ঠাকুরদা ফেরেনি। আমরা আবার সন্ধান শুরু করলাম। কতকগুলো বিটকেলে পাখি উড়ে গেল আকাশে। যে-লোকটা আমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে ঠাকুমার দিকে তাকাল – এখানে বেশিক্ষণ আটকে থাকলে বাচ্চাগুলো না খেয়ে মরে যাবে। ঠাকুমা ঝোপের দিকে শেষবারের মতো তাকাল তারপর ভাইকে তুলে নিল কোলে। তুলতে গিয়ে তার কাপড়ের উপরের অংশ ছিড়ে স্তন উন্মুক্ত হল। কিন্তু সেখানে ভাইয়ের খাবার মতো কোন উপাদান নেই।  আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। বুঝতে পারছিলাম এই জায়গাটা এবার খালি হয়ে যাবে। আমি লম্বা ঘাসের জমিটার দিকে তাকিয়েছিলাম। ঠাকুমা আমার হাত ধরে টান দিল – চল।

একটা তাঁবুর কাছে এসে আমরা থামলাম। তাঁবুটা পুরো একটা গ্রামের সমান। বাড়ির বদলে প্রত্যেক পরিবার অল্প অল্প করে জায়গা নিয়ে আছে। ভেতরে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে। মাথার উপর ছাদ আছে। পাহাড়ের মতো এই তাঁবুর ভেতর কত কত মানুষ, শিশুর কান্না। এর মধ্যেও কেউ কেউ পার্টিশান দিয়ে নিজের নিজের পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত ঘেরাটোপ রচনা করেছে। সেই আড়াল এতটাই ভঙ্গুর যে একটি  মাঝারি উচ্চতার বাচ্চা উঠে দাঁড়ালেই তার নজরে পড়বে সবকিছু। তবু এখানেও  জীবন আছে, আছে সদ্যজাতের কান্না।

ভাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছিল। ঠাকুমা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে একজন ডাক্তারবাবু আসে নিয়মিত । আর একজন সিস্টার। তার মুখের হাসি এত মিষ্টি যে আমার বারবার তাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। সে আমার মাথার চুল নেড়ে আদর করল।  জানতে চাইল আমরা কোথা থেকে আসছি। ভাইকে কোলে নিল। আদর করল খুব। তারপর আমাদের গুড়ো পাউডারের প্যাকেট দিল। আমি আর দাদা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেললাম সেই প্যাকেট। আমার খুব খিদে পেয়েছিল। আমি জিব দিয়ে চেটে চেটে খেতে লাগলাম। আমার মুখের চারদিকে লেগে যাচ্ছিল গুড়োগুলো। আমি চেটে নিচ্ছিলাম সারামুখ। খাবারটা আমার পেটের মধ্যে সাপের মতো খলবল করে নেমে যাচ্ছিল। আমি টের পাচ্ছিলাম। তারপর আমাকে ডাকা হল একটা রুমে। আমার শরীরে ছুঁচ ফুটিয়ে একটা শিশিতে রক্ত টেনে নেওয়া হল। আমার মনে হচ্ছিল আমার শরীরে কোন জোর নেই। অথচ আমার ঠাকুমা তখনও নির্বিকার দাঁড়িয়েছিল। সই-সাবুদ করে যাচ্ছিল সমস্ত কাগজে। তারপর আস্তে আস্তে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। হাঁটতে শুরু করলাম বাড়ির দিকে। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পথে একজন মহিলার সাথে ঠাকুমার খুব ভাব হল। ঠাকুমা জিজ্ঞেস করল – হ্যাঁ-গো, মাদুর বানাবার ঘাস কোথায় পাওয়া যায়? বউটি দূরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে একটা জঙ্গল দেখিয়ে দিল। আমাদের ঘুমনোর জন্য কয়েকটা মাদুর বুনলো ঠাকুমা। আমরা সেই মাদুরে বসে খেলবার চেষ্টা করতাম। দাদা কেমন মনমরা হয়ে থাকত সবসময়। আমার মনে হত দাদা নয়, আমার ঠাকুরদাই যেন বসে আছে আমার সামনে।

ঠাকুমা একটা কার্ড পাঞ্চ করে আমাদের জন্য পোশাক নিয়ে এল। আমি দুটো পোশাক পেলাম, একটা জামা আর একটা প্যান্ট। আমার স্কুলে যাওয়ার পোশাক। খুব আনন্দ হল আমার। ঠাকুমা বলল – আমার নাতনীটি সবকিছুর মধ্যে আনন্দ পায়। ও সারা দুনিয়াতে আনন্দেরই সন্ধান করবে  কেবল।

গ্রামের লোকেরা  আমাদের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। এই গ্রামের সব মানুষ আমাদের ভাষায় কথা বলে। তাই আমার খুব ভালো লাগছিল। সহজেই ভাব হয়ে গিয়েছিল ওদের সাথে। ঠাকুমা বলল – ওরাও একদিন আমাদের মতো পালিয়ে এসেছিল। তখন ক্রুগার পার্ক ছিল না।

অনেকদিন হল আমরা এই তাঁবুতে। প্রায় দু-বছর। আমি এখন এগারো। ভাইয়ের চার। ওর শরীর বাড়েনি। মাথাটাই বাড়ছে কেবল। এখনও স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি সে। ঠাকুমা তাঁবুর চারদিকে অল্পস্বল্প বীন আর বাঁধাকপির চাষ করেছে। কিন্তু এতেই সে পরিতৃপ্ত নয়, সে আরও কাজ খুঁজে বেড়ায় এবং পায়ও।  বাড়ি  তৈরি হচ্ছে যেখানে, সেখানে গিয়ে ঠাকুমা  মাথায় করে ঝুড়িতে ইট, সিমেন্ট, পাথর বয়ে নিয়ে আসে। এতে আমাদের চিনি চা দুধ আর সাবান কেনার পয়সা হয়। আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করি। ঠাকুমা বিশ্বাস করে এই মেয়েটা একদিন পড়তে পড়তে বড় হবে। দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া বিজ্ঞাপনের কাগজ কুড়িয়ে এনে বইয়ের মলাট দিই আমি। অন্ধকার হওয়ার আগেই ঠাকুমা আমাদের পড়তে বলে। মোমবাতির অনেক দাম। তবু আমার জন্য একটা মোমবাতি জ্বেলে দেয় রাতে। আমি পড়ি। চার্চে যাওয়ার জন্য জুতো আর কেনা হয়নি তার। আমাদের নতুন জুতো কিনে দিয়েছে স্কুলে যাওয়ার। সেগুলো পরিষ্কার করার জন্য সুন্দর পালিশ। ঠাকুমা আমাদের জুতো পরিয়ে দেয়। এই তাঁবুতে আমাদের ছাড়া আর কারো জুতো নেই।  টানটান করে ফিতে বেঁধে দিতে দিতে ঠাকুমা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখন তার শরীর থেকে ভালোবাসার গন্ধ পাই আমি। মনে হয় কোথাও কোন যুদ্ধ চলছে না, আমরা নিজেদের বাড়িতেই আছি।

একদিন হল কি কয়েকজন সাদা মানুষ আমাদের তাঁবুর সামনে এসে দাঁড়াল। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। ওরা তাঁবুর বাসিন্দাদের ছবি তুলতে লাগল। সবার ছবি তুলতে লাগল, আমারও। তারপর ঠাকুমার কাছে এল। প্রশ্ন করতে লাগল নানারকম। ঠাকুমা বুঝতে পারছিল না ওদের ভাষা। ওরা একজন দোভাষিকে ডাকল। সে-ই সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিল ঠাকুমাকে – তোমরা এখানে আছো কেন?

-যুদ্ধ চলছে। আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে।

– কতদিন আছো ?

– দু-বছর।

– ভবিষ্যতে তুমি কী স্বপ্ন দেখ?

–  কিছুনা। আমি শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবি।

– কিন্তু এই বাচ্চাগুলো, এদের নিয়ে তোমার কি কোন চাওয়া নেই?

– আছে। আমি চাই ওরা বড় হোক। পড়াশোনা করে ভালো চাকরি করুক। পয়সা রোজগার করুক। নিজেদের জীবন আনন্দে কাটাক।

– দেশে ফিরতে চাও না ? তোমাদের সেই মোজাম্বিকের গ্রামে ? সেই মাটির রাস্তা ধরে …

– আমি আর ফিরে যাব না।

– যখন যুদ্ধ থেমে যাবে ? যখন এই তাঁবু থাকবে না ?

ঠাকুমা বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ, এ-কথার কোন উত্তর দিচ্ছিল না। বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় বলে ফেলল – আমাদের কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু নেই, সব ছিঁড়ে গেছে, শেকড়টাও।

আমার কান্না পাচ্ছিল। ঠাকুমা এরকম বলল কেন ? আমি ফিরে যাব নিজেদের দেশে। ঠিক ফিরে যাব একদিন। যখন দস্যুরা থাকবে না চারপাশে। যখন বোমা বারুদ আর অস্ত্রশস্ত্রের শব্দ থেমে যাবে। তখন আমি, আমরা সবাই, ক্রুগার পার্কের পাশ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে আমাদের দেশের দিকে, সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা আবার ফিরে আসব দেশে। শেকড় মানে যেখানে ঘাসের ভেতর রয়ে গেছে আমার ঠাকুরদা। দেশ মানে যেখানে কোথাও না কোথাও  অপেক্ষা করে আছে আমার মা।

নাদিন গর্ডিমার   

১৯২৩ সালের ২০ নভেম্বর তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার গোয়েটনে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বের বর্ণবাদবিরোধী  সরব যোদ্ধাদের  মধ্যে তিনি অন্যতম। বর্ণবাদকেন্দ্রিক এবং বর্ণবাদ পরবর্তী সময়ের সমস্যা এবং শঙ্কাই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়। লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্য তিরিশটিরও বেশি। তার মধ্যে পনেরটি উপন্যাস। বার্গার্স ডটার, দ্য লেট বুর্জোয়া অয়ার্ল্ড,  জুলাই’স পিপল এবং  মাই সানস স্টোরি  ইত্যাদি তাঁর জনপ্রিয় এবং সফল উপন্যাস। ১৯৭৪ সালে দ্য কনজারভেশনিস্ট উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার পান। ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটি তাঁকে একজন মহৎ মহাকাব্যিক উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করে। বর্ণবাদী সরকারের হাতে বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে তাঁর বই। তবু আদর্শে অবিচল থেকেছেন তিনি। ২০১৩ সালে  নব্বই বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close