Home ছোটগল্প নাসরিন সিমি > কফিশপ ও একজন জয়িতার কথা >> ছোটগল্প

নাসরিন সিমি > কফিশপ ও একজন জয়িতার কথা >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ September 18, 2018

নাসরিন সিমি > কফিশপ ও একজন জয়িতার কথা >> ছোটগল্প
0
0

নাসরিন সিমি > কফিশপ ও একজন জয়িতার কথা >> ছোটগল্প

 

ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডের একটা কফিশপে বসে আছে জয়িতা। সামনে নিঃশেষ হয়ে আছে একটা কফির মগের শেষ পানীয়টুকু। জয়িতা বসে আছে বললে ভুল হবে সে অপেক্ষা করছে কারো জন্য। জয়িতার পায়ের কাছে রাখা ছোট্ট একটা ব্যাগে দুই-এক সেট কাপড় ও স্বর্ণের কিছু গহনা আছে আর আছে ওর পড়াশোনা শেষ করার যাবতীয় সনদপত্র।
বারবার হাতের ঘড়ি দেখছে আর কফিশপের দরজায় তাকাচ্ছে। নাহ এখনো আনাম আসছে না। অথচ চারটার মধ্যেই আনামের আসার কথা। জয়িতার হাতব্যাগে চট্টগ্রাম যাবার দুটো বাসের টিকেট রাখা আছে। সাড়ে পাঁচটায় বাস ছেড়ে যাবে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।
ক্রমশ মনে মনে অস্থির হয়ে উঠছে জয়িতা। জয়িতা ওর মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছে যাতে কোনো ফোন না আসে এই মুহূর্তে তারপর চট্টগ্রাম গিয়ে নতুন সিম কিনে নম্বর চালু করবে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল জয়িতা ও আনাম মিলে। তারপর আরো কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল একসাথে।
জয়িতার সাথে আনামের প্রথম দেখা প্রায় দুই বছর আগে। একদিন দুপুরে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দুপদাপ করে নামতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিলো জুতার হিল আর সিঁড়ির ভেজা টাইলসের বনিবনা না হওয়ায়। সেই সময় আনাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল। মাঝামাঝি এসে এই বিপত্তি ঘটে। সেসময় আনাম সিঁড়িতে জয়িতাকে ধরে না ফেললে নির্ঘাত হাত বা পা ভেঙে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
ঘটনার আকস্মিকতায় জয়িতা এতোটাই হতভম্ব হয়েছিল যে সরি বলতেও ভুলে গেছে সেসময়।
একটু সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন। নাহলে তো বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
জ্বি, সরি, আসলে স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেছে তো তাই তাড়াহুড়ো করছিলাম। আচ্ছা আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আপনি হেল্প না করলে তো আজকে মারা যেতেও পারতাম।
না না, ধন্যবাদের কি আছে, এটুকু তো মানবিক দায়িত্ব। আচ্ছা আমার নাম মাহবুব আনাম। এ বাড়ির ছয়তলার ভাড়াটে।
আমার নাম জয়িতা। আমরা চারতলার মাঝখানের ছোট ফ্লাটে থাকি।
ও আচ্ছা। ভালো থাকবেন। আসি বলে আনাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
জয়িতা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবছিলো আজকের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ভদ্রলোক সত্যি সত্যি তার হাতটা ধরে না ফেললে সে বড় কোন বিপদে পড়তে পারতো।
তিনজনের সংসার। জয়িতা, ওর স্বামী আর ছোট্ট মেয়ে টুকটুকি। পা ভেঙে বসে থাকলে বিপদের আর সীমা থাকতো না। দেখা যেত এই সুযোগে শাশুড়ি এসে হম্বিতম্বি শুরু করতো কিছু বলারও থাকতো না জয়িতার।
সামনে একটা খালি রিকশা ডেকে নিয়ে জয়িতা উঠে বসে দরদাম না করেই। এমনিতে দেরি হয়ে গেছে তারপর স্কুল ছুটির সময়ের আগে পৌঁছুতে না পারলে জয়িতাকে না দেখে টুকটুকি কান্নাকাটি শুরু করে দেবে ছুটির পর তারপর বাসায় ফিরে বাবার কাছে নালিশ করবে মেয়ে। ব্যাস শুরু হয়ে যাবে জয়িতার স্বামীর চেঁচামেচি। ভদ্রলোক একটা বেসরকারি অফিসে চাকুরি করে। জয়িতার থেকে প্রায় বার বছরের বড়। জয়িতা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে মামাবাড়িতে গেছে তখন ভদ্রলোক কী করে যেন ওকে দেখে পছন্দ করেন। প্রথমে ওর বড় মামার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয়। বড় মামা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সাথে সাথেই।
তারপর ভদ্রলোকের বাড়ি থেকে প্রস্তাব নিয়ে আসে জয়িতার চাচার কাছে। চাচারা প্রস্তাব পেয়ে যেন হাতে পূর্ণিমার চাঁদ পাওয়ার মতো খুশি হন। জয়িতা আর ওর মা চাচাদের সংসারে আশ্রিত ছিলেন ওর বাবা মারা যাওয়ার পর। সুতরাং এমন বিনাপণের প্রস্তাব পেয়ে তাঁরা আর বয়সের পার্থক্যের কথা চিন্তা ভাবনা করেননি। সাথে সাথেই জয়িতার বিয়েতে রাজি হয়ে গেছেন। একেবারে দিনক্ষণ ঠিকঠাক করে জয়িতা ও তার মাকে জানালেন।
তাদের আর এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কোন উপায় ছিলনা। জয়িতা ও তার মা একজন আরেকজনকে ধরে লুকিয়ে কাঁদলো বিয়ের দিন পর্যন্ত।
ভাদ্র মাসের এক দুপুরে জয়িতার বিয়ে হয়ে গেল রায়হান নামের এই লোকের সাথে। লোকটা সেইদিন বিকেলেই ওকে নিয়ে আসে শ্বশুরবাড়িতে।
আফা নামেন, স্কুলে আইসা পড়ছি। ভাড়া দেন বিশ টাকা।
বিশ টাকা কেন? ভাড়া তো পনেরো টাকা।
কিয়ের পনেরো টাকা ? আগে কোন কিছু না কইয়া এহনে কম ভাড়া দিবার চান কেন? এজন্যই মাইয়া মানুষ রিকশায় উঠাইতে নাই।
জয়িতা স্কুলের সামনে বসে লোকলজ্জার ভয়ে তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে বিশ টাকা বের করে দিয়ে দেয় রিকশাওয়ালাকে। রিকশাওয়ালা জোরে জোরে কথা বলছিল অনেকেই তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। জয়িতা কোনদিকে না তাকিয়ে স্কুলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।


স্কুলবন্ধের সময়ে জয়িতা কিছু সাংসারিক কাজকর্ম গুছিয়ে রাখে। আজ স্কুল বন্ধ। জয়িতা বাসার দরজা জানালার পর্দা খুলে সাবানপানিতে ভিজিয়ে রেখে দেয়। বাসায় আরেক সেট রাখা পর্দা ঝুলিয়ে দিয়ে ঘরের কাজ করে। কাজের বুয়া আসার পর তাকে দিয়ে কাপড় শুকাতে পাঠিয়ে দেয় ছাদে।
জয়িতারা এ বাসায় এসেছে তিন মাস আগে।আগে কখনো ছাদে ওঠেনি। সময় ও প্রয়োজন কোনটাই দরকার হয়নি।
দুপুরের পর বিকেল ঘনিয়ে আসে। এ সময়টুকু জয়িতা একা একা ঘর গোছাতে ব্যস্ত থাকে। টুকটুকি ঘুমায়, কখনো কখনো পাশের ফ্ল্যাটের সমবয়সী বন্ধুর সাথে খেলতে যায়।
টুকটুকিকে পাশের ফ্ল্যাটে খেলতে পাঠিয়ে জয়িতা এই প্রথম ছাদে ওঠে শুকনো কাপড় গুছিয়ে আনবার জন্য।
আরে সেদিনের সেই লোকটি ছাদের কিনারায় বসে আছে, জয়িতা দেখে।
আপনি এ সময় ছাদে? আনাম জিজ্ঞেস করে।
পর্দার কাপড় নিতে এসেছি।
ওহ তাই। আপনি পছন্দ করেছিলেন?
কি?
এই যে পর্দার ডিজাইন ও রঙ।
আমি নিজে ব্লক করেছিলাম পর্দাগুলো। বলে একটু লজ্জা পায়।
আরে তাই নাকি! বাহ্, অনেক সুন্দর লাগছে তো।
জয়িতা ভাবে কেউ তো কখনো ওর পছন্দের প্রশংসা করেনি শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া।
আপনি এখানে কেন? জয়িতা প্রশ্ন করে।
এই ছাদের ঘরখানা যে বাড়িওয়ালার কৃপায় পাওয়া তাই এই অধম ব্যাচেলর এখানেই রাত্রিবাস করেন।
আনামের কথার ঢঙে জয়িতা হেসে ফেলে।
আপনার হাসিটাও তো চমৎকার।
জয়িতা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আবার উপরে উঠে আসে।
শুনুন একটা কথা বলবো।
আনাম তাকিয়ে থাকে জয়িতার দিকে।
আপনি আমার সাথে সবসময় কথা বলবেন না। শুধু যখন একা দেখা হবে তখন কথা বলবেন। এমনকি আমাকে চেনেন না এমন ভাবে থাকবেন।
ওকে তাই হবে। সুন্দরী মেয়েদের কথা আমি ফেলতে পারিনা। কিন্তু জানতে পারি অন্য সময় কথা বললে অসুবিধা কি হতে পারে?
টুকটুকির বাবা দেখলে ভীষণ রাগ করবে। আমাকে বকাঝকা করবে। তাকে আমি খুব ভয় পাই।
ও আচ্ছা, বুঝতে পারছি। ঠিক আছে চিন্তা করবেন না। আমাকে দিয়ে আপনার কোন ক্ষতি হবেনা।
আপনি কি করেন? মানে চাকুরি না বিজনেস?
আপনার কোনটা পছন্দ?
মানে কি, আমার পছন্দ হতে যাবে কেন?
আসলে আমি দুটোই করি।
একটা কলেজে ইতিহাস পড়াই আর এক বন্ধুর সাথে শেয়ারে একটা প্রকাশনা চালাই। বিজনেস মূলত সেই বেশি দেখাশোনা করে, আমি শুধু ঘরে বসে মতামত দেই।
ও আচ্ছা। আপনি পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছিলেন?
না, বিয়ের পর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করি তারপর টুকটুকির জন্মের পর আর পড়াশোনা করা হয়নি।
এই যা হয় আর কী, আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়েদের বেলায়।
বই পড়তে ভাল লাগে?
হ্যাঁ, খুব। তবে এখন আর পড়াশোনা হয়না। বই পাইনা যে হাতের কাছে।
আচ্ছা তাই নাকি। এদিকে আসুন বলে পর্দাসমেত হাত টেনে নিয়ে আসে জয়িতাকে আনাম ওর ঘরে।
জয়িতা চমকে উঠে কিছুটা। তারপর দেখে ঘরের একটা দেয়াল জুড়ে বিশাল আলমারি জুড়ে শুধু বই আর বই।


এরপর পার হয়ে গেছে বেশ কয়েক দিন। মাঝে মাঝে অবসরে দুই-একটা বই পড়াও হয়েছে জয়িতার। রাতে অবশ্য লুকিয়ে রেখেছে বইটা যাতে ওর স্বামীর চোখে না পরে। বই দেখলে হাজারটা প্রশ্ন করবে, এমনিতে ভদ্রলোক জয়িতাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। কোথাও গেলে একটু সময় পরপর ফোন দেবেন। বাসায় ফিরে টুকটুকির কাছে সব জেনে নেবেন সারাদিন কোথায় কী ঘটেছে- সেই বৃত্তান্ত। জয়িতার বইপড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখার সময়গুলোকে তার কাছে মনে হয় ফালতু সময় ব্যয় করা। এর চেয়ে রান্নাবান্না, সেলাই, বাচ্চা লালন পালন ও পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্ন করে সময় পার করা হচ্ছে তার কাছে মেয়েদের আসল কাজ। এর জন্য অধিক পড়াশোনার দরকার নেই।
জয়িতার ইচ্ছে করে দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে। স্কুলে বসে শোনে অন্য মহিলাদের দেশে বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার গল্প, শপিংয়ের গল্প, গিফট দেয়া-নেয়ার গল্প।
কার কোন আত্মীয়স্বজন বন্ধু আছে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে তার সঙ্গে তাদের কেমন সখ্য সেই গল্প। জয়িতা তখন চুপচাপ বসে থাকে কোনো কথা না বলে। জয়িতার মনে পড়ে মায়ের কথা। কতদিন মন খুলে মায়ের সাথে কথা বলা হয়নি।
মায়ের মোবাইল ফোন নেই। চাচা বা চাচীর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কথা বলতে হয় সন্ধ্যার পর মায়ের সাথে।
জয়িতার চোখ চিকচিক করে। ও তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে যায়।
এর মধ্যে চুপিচুপি বেশ কয়েকবার ছাদে যাতায়াত করেছে জয়িতা। ও জানেনা কী এক অদৃশ্য ভালোলাগা ওকে টেনে নিয়ে যায় ছাদের ঘরটায়। আনামের একটু-আধটু স্পর্শ শিহরিত করেছে। কখনো বাঁধা দেয়নি জয়িতা।
সেদিন দুপুরের পর ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়। টুকটুকি পাশের ফ্ল্যাটে খেলতে গেছে। জয়িতার কি মনে হলো, ঘরের দরজা টেনে দিয়ে সোজা ছাদের উপর একেবারে ঝুমবৃষ্টির মধ্যে ভিজতে থাকে চোখ বন্ধ করে।
ভিজতে ভিজতে টের পায় কে যেন ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় বৃষ্টির ফোঁটার মতো একটার পর একটা। তারপর পাঁজাকোলে করে নিয়ে যায় ছাদের ঘরটায়। জয়িতা চোখ বন্ধ করে থাকে। কোন বাঁধা দেয়নি সেদিন। তারপর কিছু সময় পার করে দুজনে উথালপাথাল ঘন নিশ্বাসের ভেতর। কোথা থেকে কি হয়ে গেছে, কেউ বুঝতে পারেনা। জয়িতার বুক কেঁপে ওঠে। এ-কী করছে সে যদি সামনের মাসে ঠিকঠাক মতো পিরিয়ড না হয়। আনামকে বললে বলে চিন্তা করো না। টেনশনের কিছু নেই। পরের দিন একপ্যাকেট আই-পিল এনে জয়িতাকে দেয় আনাম।
এর পরের ছয়টা মাস কি করে কেটে যায় কেউ কিছু টের পায় না।
একদিন বাড়িওয়ালা সন্ধ্যা বেলা জয়িতাকে ডাকে। টুকটুকিকে নিয়ে জয়িতা তিনতলায় বাড়িওয়ালার বাসায় যায়।
জয়িতার মনে কেমন সন্দেহ হতে থাকে। বুকটা ঢিপঢিপ করে কাঁপতে শুরু করে।
কিছু ভুমিকা পালন করে তারপর আসল কথা শুরু করে বাড়িওয়ালা। জয়িতাকে সাবধান করে। ছাদে উঠতে পারবেনা বলে হুকুম জারি করে এবং তিন মাস সময়ের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেবার কথা বলে।
জয়িতার মাথা ঘুরে যায়। পৃথিবীটা ঘোলাটে হয়ে আসে। সোফা থেকে উঠতে গিয়ে আবার বসে পড়ে। এক গ্লাস পানি চেয়ে খায়।
আস্তে আস্তে নিজের বাসায় ফিরে এসে বেডরুমে শুয়ে পড়ে।
এখন কি হবে! কি করবে! বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়ার কথা বলছে, সেটা কি করে ম্যানেজ করবে। তাছাড়া ওর স্বামীকে কি বলবে কোনোকিছু বুঝে উঠতে পারে না জয়িতা।
কোনো কিছু না ভেবেই আনামকে ফোন করে সব বলে জয়িতা। আনাম চিন্তা করতে নিষেধ করে। পরদিন দেখা করার সময় ঠিক করে ফোন কেটে দেয়।
পরদিন ওরা ঠিক করে জয়িতা আর আনাম ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পালিয়ে যাবে। তারপর সেখানে গিয়ে বিয়ে করবে। প্রথমে ওরা এক বন্ধুর বাসায় উঠবে এবং সেখানে থেকেই বাদবাকি সবকিছু করার সিদ্ধান্ত নেয় দুজনে।
জয়িতা মনে মনে সাহসী হয়। চুপচাপ একটা ব্যাগে গুছিয়ে নেয় দরকারি জিনিসপত্র। তারপর পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুপুরের পর মেয়েকে পাশের ফ্ল্যাটে রেখে পা বাড়ায় অজানার উদ্দেশ্যে।
মার্কেটে এসে আশেপাশে তাকায়। কাউকে পরিচিত না দেখে সোজা চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সোজা কফি শপের ভেতরে ঢুকে বসে। ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন করে আনামকে। নিজের অবস্থান জানিয়ে খবর দিয়ে মোবাইল ফোনটা অফ করে রেখে দেয় জয়িতা।

জয়িতা অপেক্ষা করে কফিশপে। পাঁচটা বাজে। কফিশপের ওয়েটার এসে বার দুয়েক সামনে ঘুরে যায়। সময় বয়ে চলে। বড় অস্থির সময়। আস্তে আস্তে বিশ্বাসের ঘরে ভাঙন শুরু হয়। হাতঘড়িতে ছয়টা পার হয়ে যায়। জয়িতার মনে পড়ে এ সময়ে টুকটুকির ক্ষিদে পায়। একগ্লাস চকলেট হরলিক্স দুধ খুব পছন্দ করে সে। একটা ডিম খায় বিকেলে। সকালে শুধু বাটার দিয়ে ব্রেড। জেলি তার পছন্দ নয়। সারাদিন পরিশ্রম করে যে মানুষটি এসে ওকে না পেয়ে বাসায় তালা ঝুলছে দেখবে, তার অবস্থা কি হবে। গতবছর হার্টের একটা ছোটখাটো অসুখ ধরা পড়েছিল। মানুষটি যেমনই হোক না কেন প্রতিমাসে জয়িতার মাকে টাকা পাঠায় যাতে তার কোনো অসুবিধা না হয়। জয়িতার মাথা ঘুরে আসে। কে যেন সামনে এসে দাঁড়ায়, বলে :
তুই কোথায় যাচ্ছিস পোড়ামুখী?
যে প্রেমের কারণে স্বামী-সন্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছিস, সে প্রেম যদি শেষ পর্যন্ত টিকে না থাকে তবে তুই কোথায় যাবি? কার কাছে যাবি? এই পৃথিবীতে কেউ তোকে ঠাঁই দেবেনা, সবাই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে। তখন কোথায় যাবি? আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না তোর। যা, ফিরে যা নিজের সংসারে।
জয়িতা চোখের সামনে শুধু অন্ধকার দেখে। ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বের করে সুইচ অন করে।
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি মেসেজ, পাশের ফ্ল্যাটের নম্বর থেকে।
‘মামনি, তুমি কোথায় গেছো? বাসায় ফিরে এসো তাড়াতাড়ি।’
মেসেজটা পড়ার পর জয়িতা দৌড়ে মার্কেট থেকে বের হয়ে আসে। সামনে জ্যাম ফেলে জয়িতা দৌড়ায়। আরো জোরে দৌড়ে ছুটে চলছে জয়িতা ওর সংসারের দিকে।
পেছনে পড়ে থাকে কফিশপের ভেতরে ছোট্ট একটা কাপড়চোপড়ের ব্যাগ।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close