Home ছোটগল্প নাসরীন জাহান > হু হু নীলাভ চরাচর >> ছোটগল্প

নাসরীন জাহান > হু হু নীলাভ চরাচর >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ October 26, 2017

নাসরীন জাহান > হু হু নীলাভ চরাচর >> ছোটগল্প
0
0

নাসরীন জাহান >> হু হু নীলাভ চরাচর >> ছোটগল্প

সেদিনও চাঁদ হেলে পড়েছিল।
ছাদের এপাশ থেকে ওপাশে চক্কর খেতে খেতে কয়েকবার আমি হতাশ অস্থির হয়ে আসমান পানে তাকিয়েছি। ভেতরের হাতুড়ির ঘণ্টা বারবার বলিয়েছে, তুমি তাকে ফোন করো।
আমি পারিনি।
আমি তার ফোনের অপেক্ষা করেছি।
চাতকের ভেতর আর্তনাদের মতো বারবার নিজের ফোনের দিকে তাকিয়েছি, এই বুঝি এল।
একেবারে একবারও যে করিনি তা নয়, অস্থিরতা নাভিশ্বাসে পৌছলে করেছি। ফোন বন্ধ।
নিরাশার প্রাণগ্রন্থিগুলি প্রায়ই আলগা হতে হতে নিজেকে বলে কেন আমি এমন একটা প্রেমের সাথে নিজেকে জড়ালাম, যেখানে লোকটি আমার ভার্সিটির অধ্যাপক আবার বিবাহিতও?
তার ক্লাস শুনতাম না।
নিমগ্ন হয়ে তাকে দেখতাম শুধু।
কী তার কণ্ঠ, কী তার বাচনভঙ্গি, চেহারায় এমন দুর্মর কিছু আছে…।
আমি মনোযোগ কাড়তে নানা কায়দা করে সাথে হয়েছি। সে জানিয়েছে, আমার মধ্যেও এমন প্রগাঢ় কিছু আছে, যা এড়ানো দুঃসাধ্য।
কিন্তু যেহেতু টিচার, ক্যাম্পাসে থাকে, আমার সাথে ইচ্ছে করলেও দেখা করতে পারে না।
নিঃসঙ্গ করে আমি ফলসা মাছের মতো তড়পাই। জানায় যে, দাম্পত্যে চরম অসুখী। গ্রামের অসুন্দর বউটা নিরন্তর তার সাথে কাজে কথায় লিপ্ত থাকে। তার মুখ অত্যন্ত খারাপ।
কেন তাহলে বিয়ে করলে?
পারিবারিক ভাবে হয়ে গেল, বলেছিল যে, আমার বিয়ে, সংসার কিছুতে ইচ্ছে ছিলো না। আমি কিছুর বিনিময়ে এর মধ্যে জড়াতে চাইনি, এটাই আমার কাল হয়েছে। বিরক্ত হয়ে মাকে বলেছিলাম, যা খুশি করো।
ব্যাস!
তারা কেন এমন বিয়ে করালো?
মেয়েদের প্রচুর ঐশ্বর্য আছে।
আমি নিমগ্নতার আঘ্রানের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে প্রহর পার করি।
ঘণ্টা ঘণ্টা পার হয় আমার প্রগাঢ় অন্ধকারের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে।
তার স্পর্শ, তার কথা এসবের প্রত্যাশায় আমি প্রতি মুহূর্তে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হই।
যেন মহাসাগরের ওপার থেকে মাঝে মাঝে ধ্বনি ভেসে আসে, আমি তোমাকে নিয়ে একদিন ঠিক অনেক দূরে চলে যাব।
নিজেকে ভেঙেচুড়ে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়াই। রঙতুলিতে কত যে মূর্ত করতে চাই তাকে। কিছুতেই পারি না।
ক্যানভাস যেন জল। তাকে আঁকতে গেলেই স্রোতের মতো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তাদের একটি সন্তান আছে।
এই বিষয়টি আমার চেতনায় প্রখর আগুন লাগিয়ে দেয়। এমন একটি মহিলার সাথেও শয্যার আমূল জড়াজড়িতে তাদের একটি সন্তানও হয়। সারি সারি ঘুন পোকা … যায়।
নিজেকে গোপন রাখতে পারি না, একথা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি তার ওপর।
যে বলে, বিশ্বাস করো, আমরা বিচ্ছিন্ন থাকি। আমরা কেউ কাউকে পছন্দ করি না। একরাতে ড্রিংক করে এসে…।
এমন বেদনাবিধুর নিমগ্নতার মধ্যে কথাগুলো বলে, আমার ভেতর দ্বিধার খড়কুটোও থাকে না। কিন্তু আমার অন্তরাত্মায় ছলকে যায় অন্য অনুভূতি- দু’জন দু’জনকে পছন্দ করি না- মানে? আমার এতো দুর্মর কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে তার স্ত্রীও অগ্রাহ্য করে, তার এত অযোগ্যতা থাকতেও? আমি চরাচরে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে দিই। আমার প্রাণের ঘোর তমস প্রস্রবণে আমি নিজেই কত যে ডুবজল খাই।
একেক সময় নিঃসঙ্গ বিছানায় তন্দ্রার মধ্যে দেখতে পাই যে তার স্ত্রীকে আমূল জড়িয়ে শুয়ে আছে। ভেতরটা ধরাস করে ওঠে।
বিছানা থেকে নেমে পায়চারী করি, নাহ, এভাবে চলতে পারে না। আমি তুমুল জোরে তাকে বলবো, সে যেন এই অসুখের সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আমি আর একা একা এমন সম্পর্কের ভার টেনে জীবন কাটাতে পারবো না।
এর আগে ইঙ্গিতে বলেছি তাকে অবশ্য, সে চুপ করে থেকেছে।
এইবার ইঙ্গিতে নয়।
আমি পুড়ে পুড়ে দাবাগ্নিরতর আর ছাই হয়ে যাচ্ছি। হাঁটতে পারি না, কারও সাথে উচ্ছ্বাসে কথা বলতে পারি না।
ধীরে ধীরে আমি বিলীয়মান এক ছায়া হয়ে যাচ্ছি, তাকে জানাতে হবে।
একদিন বসে, শিব কুমারের যন্ত্রর দেখতে যাব যাদুঘরে, আমি আর কারো ধার ধারি না, যাবে তুমি আমার সাথে?
আমার মধ্যে ধরিত্রীর বৃষ্টির নহর বয়ে যায়। আমি এক নীল কাকাতুয়া হয়ে চরাচর ভাসিয়ে দিতে থাকি কুহু শব্দে।
যেন পায়ে ঘুঙুর, এইভাবে আমি চরাচরে ঘূর্ণি তুলে নাচতে থাকি।
প্রহরের পায়ে যেন লাগাম পড়েছে।
কিছুতেই কাটতে চায় না।
আমি নিখুঁত সেজে পাবলিক লাইব্রেরির গেটে গিয়ে দাঁড়াই।
প্রচণ্ড ভিড়।
গাড়ি ছাড়া কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না।
এখানেই দাঁড়াতে বলেছে সে আমাকে।
গাড়ি এলে তুলে নেবে।
পায়ের মধ্যে টাটানি ধরে যায়। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অপেক্ষা করা কতটা মৃত্যুর মতো, আমি হাড়ে হাড়ে বুঝছিলাম।
ফের তার ফোন বন্ধ।
একটা একটা করে গাড়ি যাচ্ছে। নিজেকে ক্রমশ ফতুর ভাবার আগেই টান টান দাঁড়াই। একটি গাড়ি গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি শিশু আর সুন্দরী এক মহিলা মাথায় ফুল দিয়ে উচ্ছ্বাসে তার সাথে কথা বলছে। আমার প্রেমিকের এক হাত মহিলার কাঁধে রাখা। প্রচণ্ড ভিড়ের কুয়াশা ঠেলে আমার হৃৎপিণ্ডে তুমুল শক্ত পা ফেলে গাড়িটি ভেতরে চলে যায়।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close